নষ্ট গলির মেয়ে (পতিতা) যখন বউ [২]

লেখিকা- মিম

পর্ব-১১
———————————–
অাজকাল বড্ড ব্যস্ত সময় কাটে মায়ার। দুই টিচারের কাছে পড়া। সপ্তাহে একদিন ক্লাস। প্রতিদিন রান্না শিখা। সংসারী হওয়ার তোড়জোড় চেষ্টা। সোহানের বাসায় কাটানো সময়গুলোতে ওর পিছনে লেগে থাকা। সময়গুলো সুন্দর যাচ্ছে। সোহান মায়ার জন্য অনেকটা টনিকের মতো। মন ভালো হওয়ার টনিক। অতীত ভুলে থাকার টনিক। সুখে থাকার টনিক। কিভাবে স্টাইল করতে হয়, রেস্টুরেন্টে বসে কিভাবে খেতে হয়, পার্টিতে লোকের সাথে কিভাবে মিশতে হয় সব এই তিনমাসে মায়াকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছে সোহান। সংসারের খুটিনাটি কাজগুলো সোহানের কাছ থেকেই শিখছে মায়া। বিশেষ করে রান্নাটা। অফিস থেকে ফিরে হাতে ধরে মায়াকে রান্না শিখায় সোহান। সংসার…. মায়ার সংসার। নিজের সবটুকু দিয়ে সংসারটাকে ঢেলে সাজায় মায়া। অবসরে ঘরের দেয়ালগুলো হাতড়ে বেড়ায় সে। ভালো লাগে এভাবে হাতড়াতে। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে হয় দেয়ালগুলোকে অাষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে। এটা ওর নিজের সংসার। সংসারটা ছিলো ওর জীবনের সবচেয়ে বড় অনাকাঙ্খিত পাওয়া। অার সোহান হচ্ছে মায়ার নজরে ফেরেশতা। তিনমাসে অবশ্য সাতদিন গালি খেয়েছে সোহানের কাছ থেকে। তাও যে সে গালি না, চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশ্রি গালি। একেবারে কান পঁচে যাওয়ার মতো। কিন্তু মায়ার কান পঁচেনি। অাসলে গালিগুলো সে কানেই তুলেনি। যে মানুষের এতগুলো ভালো দিক অাছে তার এই একটা খারাপ দিক তো অাড়াল করা যেতেই পারে। গালি দেয়ার ঘন্টা দুয়েক পরই মায়ার জন্য কিছু না কিছু রান্না করে সামনে এনে দাঁড়িয়ে থাকে সোহান। কিন্তু তার মুখে সরি কথাটা একবারও উচ্চারন হয় না। সোহানের ভাষ্যমতে এত ফর্মালিটি তার অসহ্য লাগে। সংসারে এসব সরি টরির ফর্মালিটি না দেখানোটাই ভালো বলে মনে করে সোহান। মাঝে মাঝে সোহানের চাহনিতে মায়া টের পায় সে তাকে ভালোবাসে। অাবার কখনো তার মনে হয় সোহান ওকে ভালোবাসে না। বড্ড দ্বিধায় ভুগে মায়া। ইচ্ছে হয় সোহানকে জিজ্ঞেস করতে অাপনি কি অামাকে ভালোবাসেন? সাহস হয়না জিজ্ঞেস করার। প্রত্যেকটা ব্যাপারেরই সীমাবদ্ধতা থাকে। মায়ারও সীমাবদ্ধতা অাছে। যত যাই হোক সে একজন পতিতা এ কথা ভুললে তো অার চলবে না। সোহান যা করছে সেটাই তো অনেক। এরচেয়ে বেশি অাশা করাটা হবে দিবাস্বপ্ন দেখা। এসবভেবে কখনো মায়ার মনখারাপ হয়। অাবার কখনো নিজের মনকে নিজেই বুঝায় ।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অাঁধার নেমে অাসছে বাইরে। অাশেপাশের বাসাগুলোতে এক এক করে লাইট জ্বলছে। নিজের রুমেও লাইট জ্বালালো মায়া। হাত মুখ ধুয়ে অায়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল অাঁচড়াচ্ছে ও। সোহান অাসার সময় হয়েছে। পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে চুলটা অাটকে নিলো মায়া। সোহান ঘরে ফিরেই মায়ার পাঞ্চক্লিপটা খুলে চুলগুলো এলোমেলো করবে। এটা তার প্রতিদিনকার অভ্যাস। কলিংবেল বাজছে। দরজা খুলে দেখে সোহান দাঁড়িয়ে। ভীষন ক্লান্ত দেখাচ্ছে সোহানকে। ঘরে ঢুকেই সোফায় গা এলিয়ে দিলো সোহান। ওর পা থেকে জুতো জোড়া খুলে নিচ্ছে মায়া।
-” জঘন্য একটা দিন ছিলো। কুত্তার মতো খাটতে খাটতে জীবন শেষ। মাথা ঝিমঝিম করছে।”
মায়া কোনো কথা বলছে না। সোহানের গায়ের শার্টটা খুলে দিলো। সোহান চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে সোফায় বসে অাছে। দশ মিনিট পর হাতে গরম তেলের বাটি নিয়ে অাসলো মায়া। তার পিছন পিছন রতন এলো এক বোল কুসুম গরম পানি সহ। সোহানের পায়ের কাছে বোলটা রাখলো রতন। সোহান বোলে পা ডুবিয়ে বসে অাছে। অার মায়া সোহানের মাথায় গরম তেল মালিশ করে দিচ্ছে।
দশ মিনিট পর সোহান বললো,
-” তয়লা অার ট্রাউজার বের করো গিয়ে অামি গোসল করবো।”
সোহানের ওয়াশরুমে তয়লা অার ট্রাউজার রেখে অাসলো মায়া। চুলায় দুধ বসিয়েছে সে।মায়া জানে সোহান ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই এক মগ স্ট্রং কফি চাইবে।
মায়ার রুমে বসে কফির মগে চুমুক দিচ্ছে সোহান। এক হাতে মগ ধরে রেখেছে। অন্য হাতে মায়ার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে।
-” তোমাকে একটা ব্যাপারে জানানো হয়নি। তুমি নেক্সট মান্থ থেকে বিজনেস শুরু করছো। পরশু থেকে অামার এক পরিচিত ভাই অাছে উনি তোমাকে ঐ ব্যবসায়ের অাটঘাট বুঝাবেন।”
-” অামি? বিজনেস? ”
-” হ্যা তুমি। তোমাকে যদিও জানানো উচিত ছিলো। কিন্তু তোমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার রাইট অামি মনে করি অামার অাছে। তাই তোমাকে জানানোটা প্রয়োজন মনে করিনি। অামি তোমার ভালো চাই সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই তোমার কোনো সন্দেহ নেই?”
-” সন্দেহ নেই। কিন্তু কিসের বিজনেস?”
-” লেডিস শপ। মেয়ে মানুষের সমস্ত কিছু ওখানে তুমি সেল করবে। অাসলে সেল তুমি করবে না। অাটজন মেয়েকে কাজে রেখেছি। ওরা সেল করবে। অার তুমি হচ্ছো ওদের বস। দোকান নিয়ে নিয়েছি। ডেকোরেশনের কাজ চলছে। বাহির থেকে সব প্রোডাক্ট অানাচ্ছি। অর্ধেক প্রোডাক্ট এসেছে। বাকিগুলো অন দ্য ওয়ে। এখানে তোমার জন্য সবচেয়ে খুশির সংবাদ কোনটা তুমি জানো? ঐ অাটটা মেয়ে তোমার মতই পতিতা ছিলো। ঐ নষ্ট গলি থেকে ওদের তুলে এনেছি। এর মধ্যে দুটা মেয়ে প্রেগনেন্ট। ওরা অন্য এলাকার। অার তোমার পাড়া থেকে এনেছি তিনজনকে। অার বাকি তিনটাকে এনেছি ঢাকার বাহিরের পতিতালয় থেকে।”
মায়ারবিস্ময় অাকাশের চূড়ায় উঠে যাচ্ছে। অাবারো একটা অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। যা সে কখনোই কল্পনা করতে পারেনি। শুধুও কেনো? সেই অাটটা মেয়েও কখনো কল্পনা করতে পারেনি এমন কিছু ঘটতে পারে। অাটটা জীবন, না না পেটের বাচ্চাগুলো সহ দশটা জীবন এখন ভালো দিন দেখতে পাবে। এতবড় বিস্ময়ের ধাক্কা সামাল দিতে পারছে না মায়া। দুচোখ উপচে পানি ঝড়ছে। সোহানের গলা জড়িয়ে কাঁদছে মায়া। সোহানের গেন্জির ডানদিকের কাঁধের জায়গাটা ভিজে যাচ্ছে মায়ার চোখের পানিতে। সোহান মায়াকে কান্না থামাতে বলছে না। সে জানে এটা খুশির কান্না। তাই মায়াকে কাঁদতে দিচ্ছে সে। মায়ার পিঠে -চুলে অালতো করে হাত বুলাচ্ছে সোহান। সেই সাথে ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি লেগে আছে তার।

পর্ব-১২
———————————–
-” আপনি কি সত্যিই পুরুষ মানুষ? ”
-” কেনো? কোনো সন্দেহ আছে?”
-” পুরুষ মানুষ এত ভালো হয় জানতাম না।”
-” তোমার কি ধারনা এসব অামি তোমার জন্য করছি?”
-” তাহলে?”
-” যা করছি নিজের জন্য করছি। নিজের মানসিক শান্তির জন্য করছি। এখানে তোমার যতটুকু না স্বার্থ অাছে তার চেয়ে বেশি অামার স্বার্থ অাছে। মনের শান্তি খুব বড় জিনিস মায়া। অামার সব থেকেও কিছুই ছিলো না। কেনো ছিলো না জানো? মনের শান্তি ছিলো না। এখন অামি শান্তি পাই। প্রচন্ড রকমের শান্তি। ”
-” শুধুমাত্র শান্তির অাশায় অামার জন্য এতকিছু করছেন”
-” মনের খোড়াকের যে কত মূল্য তা হয়তো তোমার জানা নেই মায়া।”
সোহানের ফোন বাজছে। স্ক্রিনে অালিশার নাম ভেসে উঠছে। আলিশা হচ্ছে সোহানের প্রথম প্রেমিকা। ফোনটা রিসিভ করছেনা সোহান। অালিশার নামটা দেখেই ফোনটা সাইলেন্ট করে ফেলে রেখেছে সোহান। প্রথমবার কেটে যাওয়ার পর অাবার ফোন করছে অালিশা।
-” ফোনটা রিসিভ করছেন না যে?”
-” ওর সাথে কথা বলার মুডে অামি একদমই নেই।”
-” কে উনি?”
-” অালিশা। অামার প্রথম গার্লফ্রেন্ড। ঐ যে বিষ খেয়েছিলো না? ঐ মেয়েটা।”
-” তো রিসিভ করেন।”
-” ধুর। এসব প্যারাদায়ক মানুষ অামার পছন্দ না।”
-” অারে বারবার ফোন করছে। রিসিভ করেন।”
ফোনটা রিসিভ করে মায়ার কানে দিয়ে সোহান বললো
-” তুমিই কথা বলো।”
চোখ বন্ধ করে উল্টাদিকে ফিরে শুয়ে অাছে সোহান। মায়া কি বলবে বুঝে পাচ্ছে না। ওপাশ থেকে অালিশা হ্যালো হ্যালো করেই যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পর মুখ খুললো মায়া।
-” জ্বি, হ্যালো?”
-” সোহান কোথায়?”
-” জ্বি…. উনি…. উনি ওয়াশরুমে।”
-” তুমিই ওর ওয়াইফ তাই না?”
-” জ্বি?”
-” কি অাশ্চর্য? এমন অাতেলের মতো জ্বি জ্বি করছো কেনো?”
-” না মানে, হ্যা অামি উনার ওয়াইফ।”
-” বিয়েটা কি লাভ নাকি এ্যারেন্জড?”
-” উনি অামাকে দেখেছে এর কিছুক্ষন পরই বউ বানিয়ে ফেলেছে। এখন অামি জানি না এটা লাভ না এ্যারেন্জড।”
-” কিহ্? এটা কেমন উত্তর? হোয়াটএভার……. তুমি কি জানো অামি কে?”
– ” জ্বি। অাপনি অালিশা। উনার প্রথম প্রেমিকা।”
-” ওহ অামার গল্প করেছে তাহলে। বিয়ের কতদিন হলো?”
-” তিনমাস।”
-” এতদিনে নিশ্চয়ই টের পেয়ে গেছো সোহান একটা পাগল।”
-” কই না তো। উনি তো দিব্যি সুস্থ অাছেন।”
-” যেই ছেলে প্রতিদিন গালি দেয় তাকে কি করে তুমি সুস্থ বলো? কোনো সুস্থ মানুষের ভাষা এত জঘন্য হতে পারে না।”
-” অামাকে তো কখনো গালি দেয়নি।”
-” অার ইউ সিরিয়াস? গালি দেয়নি?”
-” না তো।”
-” ওহ্ ঠিকই তো গালি দিবে কেনো? তুমি তার ওয়াইফ। পরম প্রিয় মানুষ। অামি তো প্রেমিকা ছিলাম। প্রেমিকারা শত কিছু হলেও ছেড়ে যায় না। কিন্তু বউরা এত কথা শুনে সংসার করবে না। বউ কখনো প্রেমিকা হতে পারেনা। প্রেমিকার জায়গা নিতে পারে না। এজন্যই তোমার হাজবেন্ড তোমাকে গালি দেয় না। এখন সে নিশ্চয়ই হারে হারে টের পায় অালিশাকে ছেড়ে কতবড় ভুল করেছে। তোমার হাজবেন্ডকে জিজ্ঞেস করে দেখো অালিশা কি ছিলো?”
-” জ্বি।”
-” সবে তো তিনমাস গেলো অারো কতদিন যাক। এরপর সে বুঝবে অামি ওর কি ছিলাম।”
-” জ্বি।”
-” কত গালি সহ্য করেছি ওর। কখনো পাল্টা গালি দেইনি। রাত বিরাতে ফোন করে করে অামাকে গালি দিতো। অামি চুপচাপ সব সহ্য করেছি।”
-” জ্বি।”
-” এই মেয়ে তোমার সমস্যা কি ? অাতেলের মতো জ্বি জ্বি করছো কেনো?”
-” একটা কথা বলি। মনে কিছু নিবেন না প্লিজ। অাসলে অামার হাজবেন্ড পাগল না, পাগল হচ্ছেন অাপনি। অাপনার কথায় তাই মনে হচ্ছে”
-” স্টুপিড মেয়ে তুমি….”
-” অামাকে অাগে শেষ করতে দিন প্লিজ। একটা সময় ভালোবাসা ছিলো ভালো কথা। এখন তো অাপনার বিয়ে হয়েছে সোহানেরও হয়েছে। অহেতুক কেনো নিজের সংসার ফেলে অামার হাজবেন্ডের পিছনে লেগেছেন। এতই যেহেতু ভালোবাসেন তাহলে অন্য লোককে বিয়ে করলেন কেনো? সোহানের রাগ ভাঙানো পর্যন্ত ওয়েট করতেন। শুনেছি একটা বাচ্চাও নাকি অাছে। বাচ্চা তো অাকাশ ভেঙে পড়েনি। অাপনার অার অাপনার হাজবেন্ডের মধ্যে কিছু হয়েছে বিধায় বাচ্চাটা জন্ম হয়েছে। যাকে ভালোবাসেন তাকে ফেলে অন্য কাউকে বিয়ে করলেন, অাবার বাচ্চাও হলো তখন সোহানকে মনে পড়েনি?”
-” স্টুপিড, তোমার হাজবেন্ড অামাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। অামি ছাড়িনি।”
-” ঠিকাছে ছেড়ে গিয়েছে। অাপনিও তো নিজের রাস্তা সুন্দর গুছিয়ে নিয়েছেন। বিয়ে করেছেন, বাচ্চা হয়েছে, সংসার করছেন। অাপনি করছেন তাতে দোষ নেই, অার সোহান বিয়ে করেছে বলে এতো জ্বলছে কেনো অাপনার?”
-” এই স্টুপিড……”
-” ওয়েট অাপু, অামার নাম স্টুপিড না। অামার নাম মায়া।”
-” গালি, চড় থাপ্পর এসব তো খাওনি। খেলে বুঝবা সোহান কি জিনিস। অামি যাস্ট তোমাকে এলার্ট করার জন্য ফোন দিয়েছিলাম। ”
-” এলার্ট করতে চাইলে অামার নাম্বারে কল করতেন। অামার হাজবেন্ডের ফোনে কেনো? তাও এতো রাতে? অার অামাকে নিয়ে এত না ভাবলেও চলবে। সোহান অামাকে গালি দিলেও সে অামার হাজবেন্ড, মাথায় তুলে নাচলেও অামার হাজবেন্ড। ”
-” কতদিন যে এই ভালোবাসা থাকে অামি দেখবো।”
-” সারাদিন হাজবেন্ডকে কাছে পাইনা। রাতের বেলা যাই একটু াছে অাসার সুযোগ পাই। সে মূহূর্তে অাপনি বিরক্ত করছেন। তাহলে ভালোবাসাটা থাকবে কিভাবে?”
আলিশা কথায় পেরে উঠতে পারছে না। চেয়েছিলো ফোনে সোহানকে কতক্ষন ঝাড়বে। সে সুযোগ তো পেলোই না, উল্টো শুদ্ধ ভাষায় কতখানি অপমান হতে হলো । ফোনটা কেটে দিয়ে বিছানার উপর অাছাড় দিলো অালিশা। মায়ের মেজাজ দেখে ভয়ে দৌড়ে পালালো অালিশার ছেলে অাফিফ। একেবারে বাবার কোলে ঘাপটি মেরে বসে গিয়েছে সে।
” বাবা কাজ করছি। এখন অাম্মুর কাছে যাও।”
-” অাম্মু ফোন অাছাড় দিয়েছে। কাছে গেলে অামাকেও আছাড় দিবে।”
আলিশার হাজবেন্ড রুপমের বুঝতে বাকি রইলো না তার বউ কারো সাথে ঝগড়া লেগেছে। ছেলেকে কোলে নিয়ে আালিশার মুখোমুখি দাঁড়ালো সে।
-” তোমাকে কতদিন না করেছি ছেলের সামনে উল্টাপাল্টা মেজাজ দেখাবে না? বাচ্চাটা ভয় পায় দেখো না?”
-” তো মেজাজ খারাপ হলে কি করবো?”
– তুমি তোমার রাগ কিভাবে হ্যান্ডেল করবে সেটা তোমার ব্যাপার। অামি চাইনা তোমার কারনে অামার ছেলের উপর কোনো ব্যাড এ্যাফেক্ট পড়ুক। ”
-” তুমি কি মিন করতে চাচ্ছো? আফিফকে ভয় দেখিয়ে টর্চার করি?”
-” অবশ্যই করো।”
তুফান এবং অাগুন দুটো একসাথে লেগেছে অালিশার সংসারে। তুমুল তর্ক হচ্ছে ওদের দুজনের মাঝে। অন্যদিকে মায়ার উত্তর শুনে উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে হাসছিলো সোহান। সে খুব ভালোই জানে মায়াকে আলিশা কি কি বলেছে। সোহানের সাথে কোনো মেয়ে দেখলে সহ্য হয় না আলিশার। এর অাগের দুজনকেও ফোনে যাচ্ছে তাই বলেছিলো অালিশা। সেই দুজন আলিশাকে কিছু না বলে পুরো বিষ ঝেড়েছিলো সোহানের উপর। এজন্যই মায়াকে তার পছন্দ। অন্য সবার মতো সোহানকে কোনো ধরনের প্রেশার দেয় না সে। মায়াকে তার কাছে অনেকটা নদীর পাড়ের বাতাসের মতো মনে হয়। মায়া এবং নদীর বাতাস এ দুটোর মধ্যেই একধরনের শীতলতা আছে। প্রান জুড়ানো শীতলতা। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে সোহানের বুকে হাতাচ্ছে মায়া। নাক মুখ সোহানের পিঠে সেটিয়ে রেখেছে।
– ” তুমি তো দেখি বেশ ভালোই উত্তর দিতে জানো”
-” মেয়েটা অাপনাকে ভালোবাসে না।”
-” কিভাবে বুঝলে?”
-” ভালোবাসলে অাপনার বদনাম করতে পারতো না। অাপনার ভালো দিকগুলো মাথায় রেখে খারাপটা ঝেড়ে ফেলতো। অামার একদম সহ্য হচ্ছিলো না অাপনার বদনামগুলো শুনতে তাই উত্তর দিয়েছি। অার নয়তো কিছু বলতাম না।”
-” কেনো সহ্য হচ্ছিলো না? ভালোবাসো অামাকে?”
সোহানের প্রশ্নে কলিজায় ধুক করে উঠলো মায়ার। কি উত্তর দিবে? সত্যটা বলার অধিকার আদৌ অাছে কি? চুপ করে রইলো মায়া।
-” থাক উত্তরটা দিতে হবে না। চল ঘুরে অাসি।”
-” এত রাতে?”
-” হুম। তাতে কি হয়েছে?”
-” কোথায় যাবো?”
-” মেঘনা ব্রিজ।”
-” ওখানে যেয়ে কি করবো?”
-” ব্রিজের রেলিংয়ের উপর থেকে তোমাকে নিয়ে নদীতে ঝাপ দিবো। এরপর দুজন মিলে সাঁতরাবো।”
-” কি বলেন এগুলো?”
-” অারে মেয়ে, ওখানে যাবো। কিছুক্ষন ঘুরাঘুরি করবো, বাতাস খাবো। এরপর অাবার চলে অাসবো। মোটকথা গাড়ি নিয়ে ঘুরবো। অনেকদিন হয় দূরে কোথাও যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি না। বোর হচ্ছি খুব। ”
-” অাচ্ছা অামি কাপড়টা পাল্টে অাসি।”
-” পাল্টাতে হবে না। যেভাবে অাছো সেভাবেই চলো।”
মধ্যরাত। গোল চাঁদটা ক্ষনে ক্ষনে সাদা মেঘের অাড়াল ঢাকা পড়ছে। বলা যায় মেঘ জোছনার লুকোচুরি। ফাঁকা রাস্তায় গাড়িটা ছুটে চলছে। রাস্তার দুধারের হলুদ ল্যাম্পপোস্টগুলো মৃদু অালো ছড়াচ্ছে। গাড়ির সবকয়টা জানালা খুলে রেখেছে সোহান। জানালায় দু হাতের উপর থুতনি ভর দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে অাছে মায়া। প্রচন্ড বাতাসে খোপা করা চুল থেকে ধীরে ধীরে কিছু চুল বেরিয়ে অাসছে। বারবার চুলগুলোকে খোপার ভাছে গুজে দেয়ার চেষ্টা করছে মায়া।
-” খোপাটা খুলে ফেলো। চুলগুলো উড়ুক।”
-” আপনি খুলে দিন।”
কাছে এগিয়ে এলো মায়া। এক হাত বাড়িয়ে খোপাটা খুলে দিলো সোহান। ফের জানালার উপর মুখ রেখে বাহিরে তাকিয়ে অাছে মায়া। চুলগুলো উড়ছে তার। সোহান কিছুক্ষন পরপরই মায়ার দিকে তাকাচ্ছে। মায়াকে হ্যাচকা টানে কাছে অানলো সোহান। মায়ার ঠোঁটে অালতো করে চুমু খেলো সে।

পর্ব-১৩
———————————–
ব্রিজের রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে সোহান আর মায়া। দমকা বাতাসে মায়ার চুল প্রচন্ড রকমে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। চুলগুলো খোপা করছে মায়া। বাঁধ সাধলো সোহান।
– বাঁধার দরকার কি?
– চুলে জট লেগে যাচ্ছে।
– লাগুক।
– জট ছাড়াতে পরে হিমশিম খেয়ে যাবো। একগাদা চুল ছিঁড়বে।
– তোমার কাছে ছোট একটা আবদার ধরেছি আর সেটা তুমি রাখতো চাচ্ছো না?
– ব্যাপারটা তেমন না।
– ব্যাপার যেমনই হোক, চুল খোলা রাখবে ব্যস। এবার জট লাগুক না সব চুল ছিড়ে যাক সেটা আমার দেখার বিষয় না।
মুচকি হেসে সোহানের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো মায়া। তার এক হাত জড়িয়ে ধরে বললো
– ঠিকাছে আবার রাখবো। তবে শর্ত একটাই বাসায় যেয়ে জটগুলো আপনি ছাড়িয়ে দিবেন।
– আর কিছু?
– নাহ, আপাতত জট ছাড়ালেই চলবে।
– ঠিকাছে দিবো।
ব্রিজের উপর দিয়ে বাস ট্রাক কিছুক্ষন পরপরই আসা যাওয়া করছে। তবু মন্দ লাগছে না মায়ার। ভালো লাগা কাজ করছে ভিতরে। নদীর পানি কালো দেখাচ্ছে। একদম বুড়িগঙ্গার পানির মতো। মায়ার জানামতে মেঘনার পানি এমন কালো না। হতে পারে অন্ধকারের জন্য এমন দেখাচ্ছে। দিনের আলোতে দেখতে পারলে আরো ভালো লাগতো।
-মায়া।
– হুম।
– চল বাসায় যাই।
– এখনি?
– আরো কিছুক্ষন থাকতে চাচ্ছো?
– নাহ। অনেকক্ষন তো হলো।
– তুমি চাইলে আরো কিছুক্ষন থাকতে পারো।
– না। চলুন যাই।
খুব দ্রুত গতিতে ছুটছে সোহানের গাড়ি। মায়া গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে ঘুমুচ্ছে। কিছুক্ষন পরপরই ঘাড় বেকায়দায় হেলে যাচ্ছে মায়ার। আর সোহান কিছুক্ষন পরপর মায়ার ঘাড় এক হাত দিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে। মেয়েটা এত বেশি ঘুমকাতুরে যে একবার ঘুমিয়ে পড়লে আর কোনো হুঁশ থাকে না। এই যে এতবার সোহান ওর ঘাড় ঠিক করে দিচ্ছে একবারের জন্যও মায়ার ঘুম ভাঙেনি। সোহান ভেবে কূল-কিনারা করতে পারে না একটা মানুষ এমন গভীর ঘুম কিভাবে ঘুমায়?
বাসা অব্দি পৌঁছে গেছে সোহানের গাড়ি। মায়া এখনও ঘুমে। ওর এমন শান্তির ঘুম দেখে সোহানের ইচ্ছে হচ্ছে না ওকে ডেকে তুলতে। বাসায় রতনের মোবাইলে ফোন করে সোহান বললো গেইট খোলা রাখতে। মায়াকে কোলে নিয়ে কলিংবেল বাজানো সম্ভব না।
বেডরুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিংরুমে যাচ্ছে সালমান। রতনকে এতরাতে গেইট খুলতে দেখে জিজ্ঞেস করলো
– গেইট খুলছো যে?
– সোহান স্যার আসতেছে তো তাই গেইট খুলে রাখছি।
– তুমি জানো কিভাবে ভাইয়া আসছে?
– ফোন দিয়া কইলো গেইট খুইলা রাখতে।
– ওহ।
সালমান রতনের পিছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে সোহানের সাথে দেখা করবে বলে। একটা মেয়েকে কোলে করে তার ভাই দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। ব্যাপারটা ঠিক হজম হচ্ছে না সালমানের। কে এই মেয়ে? সালমানকে এভাবে হুট করে দেখে বেশ অবাক সোহানও। দুজন দুজনের দিকে ব্যাপক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। দুজনের চোখে বহু প্রশ্নরা ছুটোছুটি করছে। সালমান কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময় সোহান ইশারায় তাকে থামিয়ে দিলো। মায়াকে বেডরুমে শুইয়ে দিয়ে দরজা লক করে বাহিরে বেরিয়ে এলো সোহান।
– তুই কখন এসেছিস?
– মেয়েটা কে?
– আসার আগে ফোন দিলি না কেনো?
– তুমি মেয়েটাকে এতরাতে কোলে করে এনেছো। কি হয় ও তোমার?
– কি আশ্চর্য! উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন কেনো করছিস?
– তুমিও তো উত্তরদিচ্ছো না।
– ওর নাম মায়া।
– কি হয় ও তোমার?
– ওয়াইফ।
– তুমি আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করে ফেললে?
– হুম করেছি। তো?
– তো মানে? তুমি কি আমাদের একেবারে বাদ দিয়ে দিতে চাচ্ছো?
– নাহ। সেটা চাইবো কেনো? বাদ দেয়ার ইচ্ছে হলে তো সেই কবেই দিতাম। আসলে কথা হচ্ছে কি জানিস? আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি সেই খবরই তো বাবা মা নেয়ার সময় পায় না। তো এত ব্যস্ত লোকদের আমার বিয়ের খবর জানিয়ে করবোটা কি? অহেতুক এসব খবর বলে উনাদের টাইম ওয়েস্ট করতে চাই না।
– আমি? আমি কি করেছি?
– কিছুই করিসনি।
– তাহলে আমাকে বললে না কেনো?
– কথা এতো পেঁচাচ্ছিস কেনো সালমান? বিয়ে করে ফেলেছি তো করে ফেলেছি।কাকে জানালাম,কাকে জানালাম না সেসব এখন ঘেটে তো লাভ নেই।
– ভাইয়া তুমি কেমন যেনো হয়ে গেছো। খুব বেশিই গা ছাড়া ভাব দেখাচ্ছো তুমি। মনে হচ্ছে আমি তোমার ভাই না।রাস্তার অপরিচিত কেউ।
– একটা কথা কোথা থেকে কোথায় টানছিস সালমান? আমি বিয়ে করেছি। খুবই সামান্য একটা ব্যাপার। এমন তো না যে আমি এখানে বিয়ের পার্টি দিয়েছি অথচ তোদের জানাইনি। এতটা রিয়েক্ট কেনো করছিস?
– বিয়েটা সামান্য ব্যাপার না কি সেটা অামি জানি না।কথা হচ্ছে তুমি আমার ভাই। তোমার প্রতি আমার কিছু অধিকার আছে, এক্সপেক্টেশন্স আছে। সেগুলো আমি তোমার কাছে ডিমান্ড করতেই পারি। অনুষ্ঠান করো আর না করো তুমি কবুল বলার টাইমে এটলিস্ট তোমার সামনে দাঁড়ানোর অধিকারটুকু তো আমার আছে।
– বিয়েটা তো হয়ে গেছে। এখন তো আর আমি ঘটনা বদলাতে পারবো না।
– ধুর…।
একরাশ বিরক্তি আর রাগ নিয়ে সালমান রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিলো। সোহান খুব স্বাভাবিক গতিতে ফ্রেশ হয়ে মায়ার পাশে এসে শুয়ে পড়লো। ঘরে ছোটখাটো তুফান হয়ে গেলো আর মায়ার কোনো খবর নেই। ওর ঘুমে তিল পরিমান ব্যাঘাত ঘটেনি। মায়ার ঘুম দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ফেললো সোহান। ফোন হাতে নিতেই চোখে পড়লো দুটো মেসেজ এসেছে আলিশার নম্বর থেকে। প্রথম মেসেজে আলিশা তাদের প্রেমের স্মৃতিচারন করেছে। আর দ্বিতীয় মেসেজে লিখেছে
– কোথায় তুমি? কি করছো? একটা রিপ্লাই দেয়ার সময়ও কি পাচ্ছো না?
সোহান একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে মেসেজগুলো পেয়ে। রিপ্লাই দিতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে রিপ্লাই দিয়েই দিলো সোহান
– ব্যস্ত ছিলাম।
মেসেজটা সেন্ড হওয়ার দুই মিনিটের মধ্যে রিপ্লাই চলে আসলো। মনে হচ্ছিলো আলিশা এতক্ষন ফোন হাতে নিয়েই বসে ছিলো রিপ্লাই পাবার আশায়।
– এত রাতে কিসের ব্যস্ততা তোমার?
– বউ আছে। ব্যস্ত থাকাটাই স্বাভাবিক।
– খুব ভালোবাসাবাসি হয় তাই না?
– তুমি যখন রুপমকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলে তখন তো আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি তোমাদের ভালোবাসাটা কোন পর্যায়ে হয়।
– ভালোবাসা কেমন হবে আন্দাজ করে নাও। ভালোবাসা যদি এত বেশিই হতো তাহলে তো আর তোমাকে এতরাতে মেসেজ করতাম না।
– এভাবে নিজের হাজবেন্ডকে বদনাম করে কি মজা পাও আলিশা? রুপম যথেষ্ট ভালো একজন মানুষ। তোমার সাথে ওর বিয়ে হওয়ার আগে থেকে ওর সাথে আমি বিজনেস করি। ওকে খুব ভালোই চিনি আমি। বরং আমি বলবো রুপমের ভালোবাসা বুঝার মতো জ্ঞান বুদ্ধি তোমার হয়নি।
– তোমার মতো করে ভালো তো ও বাসে না।
আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে না সোহানের। আলিশাকে প্রচন্ড রকমের ছ্যাচড়া মনে হয় তার। সে খুঁজে পায় না এমন একটা ছ্যাচড়া মেয়ের সাথে প্রেম করলো কিভাবে? ফোনটা সাইলেন্ট করে মায়াকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো সোহান। প্রচন্ড ঘুম ভর করছে চোখে। অন্যদিকে সোহানের ফোনে একের পর এক মেসেজ এসেই চলছে। মাঝেমাঝে আলিশা ফোনও দিচ্ছে। সোহানের ইগনোরেন্স প্রচন্ড কষ্ট দিচ্ছে আলিশাকে। দুচোখ বেয়ে পানি ঝড়ছে ওর।

পর্ব-১৪
———————————–
আজ সকালে ঘুম থেকে মায়ার আগে সোহান উঠে পড়েছে। অপেক্ষা করছে মায়ার ঘুম থেকে উঠার। ওকে সালমানের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে হবে। আর নয়তো তালগোল পাকিয়ে ফেলবে। অনেকক্ষন অপেক্ষা করার পর মায়াকে ডেকে তুললো সোহান। মায়ার চোখ যেনো আজ খুলতেই চাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কেউ আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছে। সোহান বারবার মায়াকে আলতো ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে উঠানোর চেষ্টা করছে। চোখ কচলাতে কচলাতে মায়া বললো,
– চোখ মেলতে পারছি না। ঘুমটা কাটছেই না।
– উঠো। চোখে মুখে পানির ঝাপটা দাও। জরুরি কথা আছে।
মায়াকে বিছানা থেকে টেনে তুললো সোহান। কোনোমতে ওয়াশরুমে যেয়ে ইচ্ছেমতো চোখে মুখে পানির ছিটা দিতে লাগলো মায়া। বেলকনি থেকে তয়লা নিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সোহানের মুখোমুখি এসে বসলো সে।
– কি জরুরি কথা?
– সালমান এসেছে।
– কখন আসলো?
-গতরাতে।
– আমাকে দেখেছে?
– হুম।
– এখন কি হবে?
– সেটাই বলছি। ও জানে তুমি আমার ওয়াইফ। একটু রাগ করেছে ওদের ফেলে বিয়ে করেছি ভেবে। যদি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করে তাহলে বলবে তোমার মা গ্রামে থাকে। তোমার গ্রামে আমি গিয়েছিলাম। ওখানে আমি তোমাকে প্রথম দেখেছি। দেখা মাত্রই তোমাকে ভালো লেগেছে। তাই বিয়ে করে নিয়ে এসেছি। এখানে নতুন করে স্কুলে ভর্তি করিয়েছি। তিনমাস হয়েছে আমাদের বিয়ের।
– যদি সত্যি কথা মুখ ফসকে বের হয়ে যায়?
– সেজন্যই তো বলছি বেশ কেয়ারফুললি সালমানকে হ্যান্ডেল করতে হবে।
– আচ্ছা উনি কি খুব বেশি ক্ষেপে আছেন?
– হুম একটু ক্ষেপে গিয়েছে। ক্ষ্যাপাটা স্বাভাবিক। ওকে ফেলে বিয়ে করেছি বিষয়টা ওর গায়ে লেগেছে। ব্যাপার নাহ। ওর রাগ বেশিক্ষন থাকে না।
– আপনার বাবা মা কে বলে দিলে?
– বলুক। সমস্যা কোথায়?
– আসলে তো আপনার আমার বিয়ে হয়নি। সবাইকে এভাবে মিথ্যা বলাটা কি ঠিক হচ্ছে? তাছাড়া উনারা বেশ কষ্ট পাবেন শুনলে যে উনাদের না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছেন।
– বিয়ে হয় নি তো কি হয়েছে। বিয়ে করে ফেলবো তোমাকে। এত মাথা ঘামিও না তো মায়া।
“বিয়ে করে ফেলবো তোমাকে” কথাটা ঘন্টার মতো মায়ার কানে খুব জোরে শব্দ করে বেজে চলছে। বুকটা হঠাৎ করে ধুক করে উঠলো মায়ার। বিয়ে? সত্যিই? নষ্ট গলির মেয়ে নামক সিলমোহরটা কি এবার ওর উপর থেকে উঠে যাবে? সোহান কিছু একটা বলছে। সোহানের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মায়া। কিন্তু একটা কথাও কানে ঢুকছে না ওর। ঘোরের মাঝে ডুবে আছে ও। কি বললো সোহান? বিয়ে? আচ্ছা সত্যিই কি বিয়ে হবে ওর? চোখে পানি ছলছল করছে। কিন্তু পানিটা চোখ থেকে বেরিয়ে আসতে দেয়া যাবে না। সোহানের কাছে সুখের অনুভুতিটা ধরা পড়ে যাবে। লজ্জাজনক ব্যাপার। সোহানের আলতো ধাক্কায় ঘোর কাটলো মায়ার।
– এই মায়া, কি জিজ্ঞেস করছি? শুনো না?
– হুম?
– কি ভাবছিলে?
– কিছু না।
– দুপুরে কি রান্না করবে?
– আপনি যেটা বলবেন।
– সালমান চিংড়ি ভুনা খুব পছন্দ করে। ওটা মাস্ট রাঁধতেই হবে। আর গরু বা মুরগি যেটা ভালো লাগে সেটা করো। ভিনেগার দিয়ে মাখানো সালাদটা বানিয়ে রেখো। ও আবার সালাদ ছাড়া ভাত খেতে পারে না।
– আচ্ছা।
– এখন তোমাকে কিছু রান্না করতে হবে না। তুমি ভালো মতো ফ্রেশ হয়ে কাপড়টা পাল্টে নাও। চুল-টুল ভালোভাবে আঁচড়ে নাও। আমি চাই না সালমানের সামনে তুমি পাগল ছাগলের মতো যাও।
– আমাকে কখনো দেখেছেন পাগল ছাগলের মতো থাকতে?
– হুম। কত দেখেছি। এখনও তো দেখছি। এই যে চুলগুলো জট বেঁধে কেমন হয়ে আছে।
– চুলের জটগুলো তো আপনার খুলে দেয়ার কথা ছিলো।
– হুম ছিলো। তুমি তো ঘুমিয়ে পড়ছিলে।
বিছানা ছেড়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে চিরুনি নিয়ে এলো মায়া। সোহানের হাতে চিরুনি ধরিয়ে উল্টোমুখ হয়ে বসলো সে।
– নিন, জট খুলে দিন। আমি এখন সজাগ আছি।
সোহান মুচকি হাসছে। পরম যত্নে মায়ার জটগুলো ছাড়াচ্ছে। এমন আহ্লাদ সোহানের খুব পছন্দ। জীবনটাকে সুন্দর করার জন্য এই আহ্লাদগুলো টনিক হিসেবে কাজ করে। এই টনিকটার খুব প্রয়োজন ছিলো সোহানের।বহু খোঁজ করেছে টনিকের। খোঁজ করতে করতে মায়ার দাঁড়ে এসে উপস্থিত হয়েছে সোহান। অবশেষে সে তার টনিক খুঁজে পেয়েছে। ঘড়িতে কয়টা বাজে দেখার জন্য সোহানের ফোন হাতে নিয়েছে মায়া । অনেকগুলো মিসডকল আর মেসেজ জমা পড়েছে। সবগুলো আলিশার। মেসেজগুলো এক এক করে পড়ছে মায়া।
রাত ৩.৫০ মিনিট
জানো ও তোমার মতো করে একদম ভালবাসতে জানে না। তোমার ভালোবাসায় মাদকতা ভরপুর ছিলো। কিন্তু রুপম, ওর ভালোবাসায় আমি তেমন কিছু খুঁজে পাই না।
রাত ৩.৫৫ মিনিট
তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছো?
রাত ৪.০৫ মিনিট
– ফোনটা রিসিভ করো একটু। তোমার কন্ঠটা খুব শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে।
রাত ৪.১২ মিনিট
– আমি জানি তুমি জেগে আছো। কেনো এমন করছো আমার সাথে?
ভোর ৪.৩০ মিনিট
– তোমাকে খুব বেশিই মিস করছি। একটু কথা বলো প্লিজ।
ভোর ৪.৩৩ মিনিট
– অকে কথা বলতে হবে না। মেসেজের রিপ্লাইটা এট লিস্ট দাও।
ভোর ৪. ৩৭ মিনিট
– আমি তোমাকে এখনও ভালোবাসি সোহান। তুমি বললে এখনই ছুটে আসবো তোমার কাছে।
ভোর ৪. ৪০ মিনিট
-আচ্ছা তোমার কি কখনো জানতে ইচ্ছে হয়না আমি কেমন আছি?
ভোর ৪.৫৫ মিনিট
– তোমার ইগনোরেন্স একদম সহ্য হচ্ছে না সোহান।
ভোর ৪.৫৮ মিনিট
– তুমি কি খুব ব্যস্ত মায়াকে নিয়ে?
ভোর ৫.০৫ মিনিট
– মায়া খুব সুন্দরী তাই না সোহান? এজন্যই ওর মাঝে এতটা ডুবে থাকো। আচ্ছা ও কি আমার চেয়ে আরো বেশি সুন্দর?
ভোর ৫.১৫ মিনিট
– এই নিয়ে ১১ টা মেসেজ দিলাম। একটার রিপ্লাই দিলে না। ১৪ টা কল করলাম রিসিভও করলে না। আমি এতটা অবহেলা পাওয়ার যোগ্য?
সোহানের আগের পাঠানো মেসেজের রিপ্লাইগুলোও দেখলো মায়া। অসহ্য লাগছে ওর। আলিশার মেসেজ, সোহানের রিপ্লাই দেয়া এসব ওকে প্রচন্ড যন্ত্রনা দিচ্ছে। রাগে চোখ দিয়ে পানি ঝড়ছে। ওর আর এক সেকেন্ড এখানে বসতে ইচ্ছে হচ্ছে না। উঠে দাঁড়ালো মায়া। মুখ আড়াল করে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছে।
– কি ব্যাপার? উঠে পড়লে যে? জট তো এখনও খোলা হয়নি
ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে মায়া উত্তর দিলো
– লাগবে না। বাকিটা আমি করে নিবো।
মায়ার আচরনটা বেশ অদ্ভুদ লাগলো সোহানের। একটু আগেই না আহ্লাদ করে বললো জট খুলে দিতে কিছুক্ষনের মধ্যে কি হয়ে গেলো?

পর্ব-১৫
———————————–
টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছে মায়া। সোহান অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো। সে দেখতে পাচ্ছে মায়া মুখটা কালো করে রেখেছে। কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময় দেখলো সালমান এসেছে রুমে। চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো,
– তোমার ওয়াইফের সাথে ইন্ট্রোডিউস করাও।
সালমানকে দেখে মায়া তার চেহারা স্বাভাবিক রাখার যথেষ্ট চেষ্টা করছে। ঠোঁটের কোনে হাসি ধরে রাখার প্রানপন চেষ্টা চালাচ্ছে।
– ওর নাম মায়া। মায়া এটা সালমান। আগে তো ওর ছবি তোমাকে দেখিয়েছি।
– কেমন আছেন ভাইয়া?
– হুম ভালো। ওকে দেখে মনে হচ্ছে ও আমার যথেষ্ট ছোট হবে বয়সে ।
– হুম ও তোর বেশ ছোট। শি ইজ অনলি এইটিন।
– এত ছোট মেয়েকে বিয়ে করলে?
– করলাম। ছোটগুলোই ভালো। কোনো কিছু বললে চুপচাপ মেনে নেয়।
– এত ডিফারেন্সে কোনো মেয়ে আজকাল বিয়ে রাজি হয় নাকি?
– ও হয়েছে। কারন ও আলাদা।
– কেনো? ওর কি পিছনে ডানা আছে নাকি?
সালমানের কথায় হাসি পাচ্ছে মায়ার। তবে মনখুলে হাসতে পারছে না। মনে হচ্ছে বুকের মধ্যে কেউ পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। তবুও খানিকটা জোর করে হাসলো মায়া।
– শুনো আমি কিন্তু এত ফর্মালিটিজ মেইনটেইন করতে পারবো না। আমি তোমাকে নাম ধরেই ডাকবো। বয়সে ছোট মেয়েকে আমি ওসব ভাবী টাবী ডাকতে পারবো না। তোমার কোনো প্রবলেম নেই তো?
– না ভাইয়া নাম ধরেই ডাকবেন। আমি আপনার ছোট।
– প্লিজ আমাকেও নাম ধরেই ডাকো। আর এসব আপনি টাপনি বলো না তো। নিজেকে বেশি মুরুব্বি মনে হয় এসব শুনলে।
– ভাইয়া আপনাকে নাম ধরে ডাকবো ব্যাপারটা কেমন দেখা যায় না?
– কেমন দেখা যাবে কেনো? যেখানে আমি পারমিশন দিচ্ছি সেখানে তো কেমন দেখার কোনো প্রশ্নই আসে না।
– তবুও….
– মায়া ও যথেষ্ট ফ্রি মাইন্ডেড ছেলে। তাছাড়া সম্পর্কে ও তোমার ছোট। নাম ধরে ডাকতে তো কোনো আপত্তি আমি দেখছি না ।মায়া খানিকটা ইতস্তত করে বললো,
– জ্বি ডাকবো।
– তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো? আমাদের সাথে বসে পড়ো।
– আমি একটু পর খাবো। আপনি খান।
– আপনি? ভাইয়া মায়া তোমাকে আপনি করে ডাকে?
– হুম।
– এটা কেমন কথা? ও তোমাকে আপনি ডাকে কেনো?
– শুরু থেকে আপনি করে ডাকে। আমি কখনো বাঁধা দেইনি। তাই ও এখন পর্যন্ত আপনিতেই সীমাবদ্ধ আছে। তুমি পর্যন্ত আসতে পারেনি।
– তোমাদের সত্যিই বিয়ে হয়ছে তো?
সালমানের প্রশ্নে বেশ চমকে গেলো মায়া। ব্যাপারটা সালমানের নজর এড়ালো না। সে আরো সন্দেহ নিয়ে মায়াকে দেখছে। মায়া, সালমান দুজনকেই দেখছে সোহান। সে বুঝতে পারছে সালমানের মনে মায়ার চমকে যাওয়াটা খটকা লাগছে।
– কি ব্যাপার? তুমি এমন চমকে উঠলে কেনো? ভাইয়া তোমরা কি বিয়ে করোনি?
– আসলে কেউ বিশ্বাস করে না আমরা বিবাহিত। এ নিয়ে ছয় সাতজন এই প্রশ্ন করেছে। তাই মায়া এমন চমকে গেছে।
– লোকজন সন্দেহ করাটাই স্বাভাবিক। একে তো মায়া এত ছোট। তার উপর ও তোমাকে আপনি করে বলে। আজকাল কেউ আপনি করে বলে নাকি?
– আচ্ছা তুই এই আপনি কথাটার পিছনে হাত ধুয়ে লেগেছিস কেনো বল তো?
– শুনতে কেমন যেনো লাগছে। এনিওয়ে, বাদ দেই সেসব আমি এবার ১৫-২০ দিন থাকবো। মায়া আমি কিন্তু ভোজনরসিক মানুষ। হুটহাট এটা সেটা খেতে ইচ্ছে হয়। আমাকে কিন্তু বানিয়ে দিতে হবে।
– হুম দিবো।
সোহানের ফোনটা বেজে উঠলো। আলিশা ফোন দিচ্ছে। স্ক্রিনে আলিশার নামটা দেখতে পেয়েছে মায়া। মনের ভিতরটাতে খচখচ শুরু হয়েছে আবার। যদিও সোহান ফোনটা রিসিভ করেনি। তবুও খচখচ চলছেই। মুখে আপেলের টুকরা ঢুকিয়ে চিবুতে চিবুতে সোহান জিজ্ঞেস করলো
– তুই তো ৫-৬ দিনের বেশি থাকিস না। তোকে ধরে বেঁধেও রাখতে পারিনা। এবার হঠাৎ ১৫-২০ দিন থাকবি যে?
– শিমুর সাথে অনেকদিন ধরে কথা কাটাকাটি হচ্ছে।
– কি নিয়ে?
– ওকে সময় দেই না। ওর সাথে দেখা করতে আসি না।
— ভুল তো কিছু বলে নি। তুই লাস্ট ঢাকা এসেছিলি পাঁচ মাস আগে। বিগত পাঁচ মাসে শিমুর সাথে একদিনও দেখা করিসনি। ও যে এখনও তোকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে না এটাই অনেক।
– পরীক্ষার প্রেশার ছিলো। বাবার সাথে ব্যবসার কাজও করতে হয়েছে। তাই ওকে সময় দিতে পারিনি।
– এটা কোনো কথা হলো না সালমান। কাজ কাজের জায়গায়। এটার সাথে তুই সম্পর্কগুলো গুলিয়ে ফেলছিস কেনো। কাজের ফাঁকে ওর জন্য সময় বের করাটা তোর উচিত ছিলো। সম্পর্কের যত্ন নিতে শিখ। আর নয়তো সব সম্পর্ক এক এক করে ভাঙতে শুরু করবে। বাবা- মা কে দেখিসনা? দুজনের সাথে দুজনের শুধুমাত্র একটা কাগজের সম্পর্ক রয়ে গেছে। ভিতর থেকে কারো প্রতি কারো কোনো টান নেই। সবটাই হয়েছে অযত্ন অবহেলার কারনে।
– এজন্যই তো ১৫-২০ দিনের সময় নিয়ে এসেছি। প্রতিদিন ওর সাথে মিট করবো। দূরে, শহরের বাইরে ঘুরবো। শুনো মায়া তোমাকে কিন্তু অবশ্যই শিমুর সাথে দেখা করাবো। তবে সেটা কাল। আজকে না। আজকে ওর রাগ ভাঙাবো।
– শিমু কি তোমার প্রেমিকা?
– হ্যা। তোমার চেয়ে একটু বড়। বেশি না। মাত্র একবছরের। সমবয়সী বলা চলে।
ফোনটা আবার বাজছে সোহানের। এবার লাগাতার বেজে চলছে। ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিয়েছে সোহান। সালমানের সাথে মায়া কথা বলছে ঠিকই। তবে নজর পড়ে আছে সোহানের ফোনের দিকে। যন্ত্রনাটা ক্রমশ বাড়ছে মায়ার। যন্ত্রনা আড়াল করার চেষ্টা করছে তবু চোখে মুখে ভেসে উঠছে । প্রিয় কোনো কিছু হারানোর ভয়গুলোর যন্ত্রনা বুঝি এমনই হয়। হাজার চেষ্টায়ও লুকিয়ে রাখা যায় না। খাওয়া শেষে সোহান বেরিয়ে গেলো অফিসের জন্য। প্রতিদিনের মতো আজ মায়া গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসে নি। কাজের মিথ্যে অযুহাতে কিচেনের ওদিকটাতেই পড়ে ছিলো। সোহানের চোখ এড়ায়নি ব্যাপারটা। তার মনেও খচখচানি চলছে। সমস্যাটা কোথায় মায়ার? সুযোগ বুঝে ধরতে হবে এই মেয়েকে।

পর্ব-১৬
———————————–
গাড়িতে উঠে বসেছে সোহান৷ ফোনটা এখন আবার বাজছে। আলিশা আবার ফোন করছে। এবার প্রচন্ড রকমে ক্ষেপে গেলো সোহান। কোনো মানে আছে এসব ছ্যাচড়ামির? ফোনটা কেটেই সাথে সাথে রুপমকে কল করলো সোহান। রিং হচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না। রিং হতে হতে কেটেই গেলো কলটা। কলটা কাটতে না কাটতেই আলিশার কল এসে পড়েছে। এবারের কলটা রিসিভ করলো সোহান।
– সমস্যা কি তোমার?
– মায়া।
– মায়া কি তোমাকে কামড়েছে?
– এরচেয়ে বড় কিছু করেছে। তুমি আমাকে এত ভালোবাসতে। আজ ওকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেলে?
– তোমাকে ভুলেছি আরও অনেক আগেই।
– জানি। তবু কেনো জানিনা তুমি মায়ার সাথে আছো মনে হলেই প্রচন্ড রকমে কষ্ট পেতে থাকি। অসহনীয় কষ্ট।
– তোমার কষ্ট হয়? ভুল বললে আলিশা। তোমার হিংসে হয়। এত হিংসে কোথায় পাও তুমি? নিজে তো বিয়ে শাদী করে দিব্যি সংসার জুড়িয়ে বসেছো। আমি করলে দোষ কোথায়?
– বাবার জোড়াজুড়িতে সংসার জুড়িয়েছি।
– বাচ্চাটা কি তাহলে বাবার জোড়াজোড়িতেই হয়েছে? বাবার জোড়াজোড়িতেই কি রুপমের সাথে ফিজিক্যালি এটাচড হয়েছো? রুপমের সাথে এক বিছানায় শুয়ে কি করবে না করবে সেগুলো নিশ্চয়ই তোমার বাপ তোমাকে শিখিয়ে দেয়নি। যা করেছো সম্পূর্ন নিজের ইচ্ছায় করেছো।
– আমি কিন্তু তোমাকেই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।
– ভালোই বলেছো। তোমার বাপ আমার নামে মামলা দিবে আর আমি তোমাকে বিয়ে করে ঘরে তুলবো তাই না? আমার রাগ হ্যান্ডেল করার এ্যাবিলিটি তোমার নেই। তোমাকে বিয়ে করলে আমাদের সংসার কখনোই টিকতো না।
– কাকে কি বলছো? তোমার কম গালি আমি হজম করি নি সোহান।
– গালি দেয়ার টাইমে চুপ থাকলেও পরে গিয়ে আমার উপর ঠিকই বিষ ঝেড়েছো।
– কেনো তোমার মায়া বুঝি বিষ ঝাড়ে না?
– কখনোই না। আমি যত যাই বলি না কেনো আমার বউ সব চুপচাপ হজম করে। আর আমি সব দেখেশুনেই বিয়ে করেছি। ও তোমার মতো ছ্যাচড়া না। যথেষ্ট ভদ্র। এজন্যই ওকে বিয়ে করেছি আমি।
– হোয়াট ডু ইউ মিন বাই ছ্যাচড়া?
– ছ্যাচড়া মিনস ছ্যাচড়া। তুমি চূড়ান্ত পর্যায়ের ছ্যাচড়ায় পরিনত হচ্ছো দিন দিন। আমি এখন বিবাহিত। তোমার লজ্জা করে না এভাবে আমাকে ডিস্টার্ব করতে?
– মোটেই না। কেনো লজ্জা করবে? তোমার উপর প্রথম অধিকার আমার। এরপর এসব মায়া টায়ার অধিকার।
আলিশাকে কষে দুগালে চড় মারতে ইচ্ছে হচ্ছে ওর৷ সেইসাথে রুপমের জন্য প্রচন্ড মায়াও হচ্ছে। ছেলেটা কত ভালো। আর আলিশা? উফফফ! আর ভাবতে পারছে না সোহান। রাগে দাঁত কিড়মিড়াচ্ছে আর আলিশাকে ইচ্ছেমতো গালি দিচ্ছে। গালি শুনেও আলিশার মাথাব্যাথা নেই। প্রতিটা গালির প্রত্যুত্তরে সোহানকে আই লাভ ইউ বলেই চলছে। ফোনটা কেটে দিয়েছে সোহান। রুপমকে ফের ফোন করেছে ও। এবার ফোনটা রিসিভ করেছে রুপম। রিসিভ হতে না হতেই সোহান একগাদা গালি শুনিয়ে দিলো রুপমকে। হুট করেই এতগুলো গালি স্তম্ভিত ফিরে পেতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো রুপমের।
– কি আশ্চর্য! এভাবে গালাগাল করছো কেনো সোহান?
– তোরে আরো গালি দেয়া উচিত ছিলো।
– আবার তুই তুকারিও করছো? হয়েছেটা কি?
– তোর বউ আমার কলিজা জ্বালায়া ফালাইতাসে।
– কি করেছে?
– গতকাল রাত থেকে লাগাতার ফোন মেসেজ দিয়েই যাচ্ছে। বউয়ের সাথে থাকোস তুই। তবু তোর বউ আরেক বেটারে জ্বালায় কেমনে? তুই ব্যাটা নাকে তেল দিয়া ঘুমাস আর তোর বউ আমারে জ্বালায়। আমার বউ এসব দেখলে আমার সংসারে আগুন জ্বলবে। তোর বউরে আমি বকা দেই সে আমাকে লাভ ইউ বলে। কি করোছ তুই সারাদিন? বউরে সময় দিতে পারোস না? তুই সময় দিলেই তো তোর বউ আমার পিছে লাগে না।
– আলিশা আবার শুরু করেছে এসব?
– হ্যা করছে। স্ক্রিনশট দিবো তোরে?
– আই এ্যাম এক্সট্রিমলি সরি সোহান।
– রাখ তোর সরি। আমার সংসারে যদি এসব নিয়া কোনো দ্বন্দ হয় তাহলে কিন্তু তোর সংসারেও আগুন জ্ালাবো।
– সোহান তোমার ওয়াইফ কি এটা নিয়ে রাগ করেছে? আমি কি ভাবিকে বুঝিয়ে বলবো ব্যাপারটা?
– মায়া এখনও এসব দেখেনি। তোর বউ যা শুরু করছে এসব বন্ধ না হলে আজকেই সব দেখে ফেলবে। ও এসব দেখলে নিশ্চয়ই আমাকে লাভ ইউ জানু লাভ ইউ বেবি বলে ঘুরে বেড়াবে না।
– সোহান তুমি ঠান্ডা হও। আমি আলিশাকে দেখছি।
– মানসিক রোগের ডাক্তার দেখা তোর বউকে। শালী পাগল হয়ে গেছে হিংসায়।
– হ্যা দেখাবো। তবু তুমি প্লিজ ঠান্ডা হও।
ফোনটা কেটে দিলো সোহান। এতক্ষনে নিজেকে কিছুটা হালকা লাগছে ওর।
কিচেনে আনমনে কাজ করছে মায়া। সোহানের কথামতো রান্না করেছে দুপুরে। খাবার সেড়েই সালমান বেরিয়ে গেছে শিমুর সাথে দেখা করতে। সবজি পাকোড়া ভিষন পছন্দ সোহানের। অফিস থেকে ফিরে আসলে নাস্তা খেতে দিবে সোহানকে। আলিশার কথা ভাবতে ভাবতে তেলের মধ্যে পাকোড়া দিতে গিয়ে হাতের আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিলো তেলে। হালকা চিৎকার করলো মায়া। ডাইনিং টেবিল মুছছিলো রতন। মায়ার গলার আওয়াজ পেয়ে কিচেনে এসেছে সে। এসে দেখে মায়া হাত ঝাড়ছে। সিংকের ট্যাপ ছেড়ে বললো
– ভাবী ফোস্কা পড়ছে। শিগগির হাত কলের নিচে দেন।
কলিংবেলের আওয়াজ শুনে রতন দৌড়ে গেট খুললো। অন্যান্য সময় মায়া গেট খুলে দেয়। আজ রতনকে দেখে একটু অবাক হলো সোহান। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিগ্গেস করলো
– মায়া কোথায়?
– ভাবী হাত পুইড়া ফালাইসে। রান্নাঘরে কলের নিচে হাত দিয়া দাড়ায়া আছে।
রতনের কথা শুনে সোজা রান্নাঘরে চলে গেলো সোহান। রান্নাঘরের দরজায় দাড়িয়ে মায়াকে বললো
– কি ম্যাম? হাত পুড়ে ফেললেন?
– হ্যা। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি নাস্তা দিচ্ছি।
– নাস্তা পরে হবে। তুমি এসো আমার সাথে। মেডিসিন লাগাতে হবে।
– লাগাবো। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি আসছি।
সোহান আর কথা না বাড়িয়ে মায়ার হাত টানতে টানতে রুমে নিয়ে আসলো। সোহান মায়ার আঙ্গুলে অয়েনমেন্ট লাগাচ্ছে সেই সাথে আঁড় চোখে ওকে দেখছে। মুখটা বেশ মলিন হয়ে আছে ওর। বুঝাই যাচ্ছে মনটা বিশাল রকমে খারাপ। মেডিসিন লাগিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে বললো
– এখানেই চুপ করে বসে থাকো। এক পাও নড়বে না। কথা আছে তোমার সাথে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। এই রতন, আমার রুমে নাস্তা দিয়ে যাও তো।
কথাগুলো বলেই ট্রাউজার আর টাওয়েল হাতে ওয়াশরুমে গেলো সোহান। জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো মায়া। গলির সামনে রিকশা আর গাড়িতে মিলিয়ে বেশ ভালোই জটলা পেকেছে। বেশ হাউকাউ হচ্ছে। রিকশা ড্রাইভার বকছে কার ড্রাইভারকে আর কার ড্রাইভার বকছে রিকশাওয়ালাকে। কেউ কারো দোষ স্বীকার করতে রাজি না। অনেকটা সময় ঝগড়া চলার পর এলাকার লোকজন এসে তাদের থামিয়েছে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। রিকশাগুলো টুংটাং শব্দ করতে করতে যার যার গন্তব্যস্থলে যাচ্ছে। হুট করেই ঘরের লাইট অফ হয়ে গেলো। সোহান লাইট অফ করেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই মায়া দেখলো সোহান ওর একদম কাছাকাছি চলে এসেছে।
– লাইট অফ করলেন যে? আাসেন নাস্তাটা সেড়ে নিন।
সেখান সড়ে আসতে চাইলো মায়া। বাঁধ সাধলো সোহান। দুহাতে জানালার গ্রিল ধরে রেখেছে সে। এর মাঝখানে মায়া বন্দী হয়ে আছে। জানালার গ্রিলে পিঠ সেটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মায়া। মায়ার মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে ওর ঠোঁটে চুমু খেলো সোহান। এক হাতে মায়ার কোমড় জড়িয়ে ধরে অন্যহাতে মায়ার চুলের খোপা খুলে দিতে দিতে বললো
– কি হয়েছে?
– কিছু না তো?
– সত্যিই কিছু হয়নি?
ফোন বেজে উঠলো সোহানের। মায়া বললো
– আপনার ফোন এসেছে।
– আসুক।
– আলিশা ফোন করেছে বোধহয়। যান গিয়ে রিসিভ করুন।
মায়ার কোমড় আরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো
– ঘটনা তাহলে এখানে?
– কিসের ঘটনা?
– কলিজা পোঁড়ার ঘটনা।
– কিসের কথা বলছেন?
– কলিজা পোঁড়ার স্মেল এত্ত সুন্দর হয় আগে জানা ছিলো না। এর আগেও কলিজা পোড়াঁর স্মেল পেয়েছি। কিন্তু তেমন ভালো লাগেনি। আজ ভীষন রকমে ভালো লাগছে। কেনো জানো? সেই পোঁড়া গন্ধের মাঝে ভালোবাসার ঘ্রান খুঁজে পাচ্ছি। কেউ একজন খুব করে ভালেবাসতে শুরু করেছে আমাকে। তার ভালোবাসার ঘ্রানটা নাক দিয়ে ঢুকে ঠিক বুকের বা পাশটাতে যেয়ে প্রচন্ড রকমে আঘাত করছে। ব্যাথা করছে খুব। ব্যাথাটা খুব তৃপ্তির। মনে হচ্ছে বহুদিনের চাওয়াটা বুঝি পূরন হয়েছে। আচ্ছা সেই কেও একজনটা কি তুমি?
চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে মায়া। মায়ার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে সোহান বললো
– মুখ ফুটে বলতে চাচ্ছো না? নো প্রবলেম। বলতে হবে না। আমি অনুভব করে নিবো।

পর্ব-১৭
———————————–
মায়া এখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জা পাচ্ছে মায়া। সত্যিটা ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জা। ইশ! কি ধরাটাই না খেলো! আচ্ছা সোহান কি ওর ভালেবাসাটাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহন করবে? নাকি নষ্ট গলির মেয়ে বলে ভালোবাসাটা গ্রহন করবে না? সোহানকে কি সরাসরি এ ব্যাপারে জিগ্গেস করবে? সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না মায়া। এভাবে আর সোহানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। লজ্জা এবং দ্বিধা মিলিয়ে বড্ড অস্থির হয়ে যাচ্ছে সে। কিছুক্ষন সোহানের কাছ থেকে দূরে থাকাটা অতি আবশ্যক মনে হচ্ছে মায়ার।
– চুলোয় ভাত বসিয়ে আসছি।
– কাজের লোক আছে ঘরে।
– আমার কিছু হোমওয়ার্ক বাকি রয়ে গেছে। ওগুলো কমপ্লিট করে আসি।
– তুমি কি এখান থেকে পালাতে চাচ্ছো?
মায়া খুব অবাক হয় সোহানের ধারনা করার ক্ষমতা দেখে। মায়ার মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই সব বুঝে নেয় সোহান। এমনটা তো নাকি শুধুমাত্র খিব প্রিয় কারো ক্ষেত্রেই অনুভব করা যায়। পূর্নিমার ছবিতে দেখেছে ও। নায়কের মনের খবর না জেনেই সব বলে দিতো পূর্নিমা। তাহলে কি মায়াও সোহানের প্রিয় কেউ? নাহ, এতটাও আশা করা ঠিক না। এতটাও আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখা মায়ার মতো মেয়েদের মানায় না। স্বপ্ন ভেঙে গেলে একদম আকাশ থেকে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। মিথ্যে আশা রেখে কষ্ট পাওয়ার শখ নেই মায়ার। মন থেকে বাদ দিতে চায় কথাগুলো। তবু একটা কথা মনের মধ্যে জোরপূর্বক উঁকি দিয়েই চলছে। সোহান তাকে ভালোবাসতেও তো পারে। ঐ তো আজ সকালেই না বললো দরকার পড়লে বিয়ে করে নিবে। ভালো না বাসলে কি কথাগুলো বলতো?
– কি চিন্তা করো?
– আচ্ছা আপনি কি….
– আমি কি?
– নাহ কিছু না।
– কি জিগ্গেস করতে চাচ্ছো বলে ফেলো।
– তেমন কিছু না।
– বুঝলাম তেমন কিছু না। যেমনই হোক আমাকে বলো। আমি শুনতে চাচ্ছি।
– না, আসলে…… রাতে কি খাবেন?
– কথা কেনো ঘুরাচ্ছো?
– আপনি আমাকে এতটা কিভাবে বুঝেন?
– তোমাকে বুঝার চেষ্টা করি তাই বুঝি।
– আমাকে কেউ কখনো বুঝতে চায়নি।
– সবাই আর আমি তো এক না।
– হুম সবার চেয়ে আলাদা আপনি।
– চলো ঘুরে আসি।
– কোথায়?
– জানি না। তুমি রেডি হয়ে এসো।
– আচ্ছা।
– মায়া, শুনো…
– জ্বি?
– শাড়ি পড়ে নাও। ঐযে কলাপাতা রঙের একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম না? ওটা পড়ে এসো।
মুচকি হেসে মাথা ঝাঁকালো মায়া। এর আগে মায়া নিজের ইচ্ছায় দুদিন শাড়ি পড়েছিলো। আজ সোহানের আবদারে শাড়ি পড়বে সে। সোহানের ফরমায়েশ মতো সাজতে ভীষন পছন্দ করে মায়া। আরো বেশি ভালো লাগে যখন মায়া সোহানের কথামতো সেজে তার সামনে যায়। আর সে একনজরে মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। সোহানের নজরে একধরনের তৃপ্তি দেখতে মায়া।
আজও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের হাতা ভাজ করে কনুইয়ের উপরে তুলছে সোহান। শাড়ি পড়ে পিছনে এসে দাঁড়ালো মায়া। আয়নাতে দেখা যাচ্ছে মায়াকে। আায়নাতেই তাকিয়ে মায়াকে দেখছে সোহান। ফের তার নজরে তৃপ্তি দেখতে পাচ্ছে মায়া। তবুও সোহানের মুখ থেকে একটুখানি প্রশংসা শোনার আশায় আছে মায়া।
– আমাকে কেমন লাগছে?
– কথা বলো না তো। দেখতে দাও।
আর কিছু বললো না মায়া। সোহান ওকে মনভরে দেখতে চাচ্ছে। মায়াকে মনভরে দেখাটা সোহানের একধরনের প্রিয় কাজ। সে কথা মায়ার অজানা নেই। কয়েক সেকেন্ড পর ঘুরে দাঁড়ালো সোহান। হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বললো,
– নতুন করে তোমার প্রশংসা করতে হবে?
– নাহ৷ থাকুক। আপনার চোখ দেখে বুঝে নিবো।
পাশাপাশি রিকশায় বসে আছে সোহান আর মায়া। আজ সোহানের খুব শখ হয়েছে মায়াকে নিয়ে রিকশায় করে ঘুরে বেড়াবে আর বাদাম খাবে। মায়া বাদামের খোসা ছেড়ে সোহানের হাতে দিচ্ছে আর সোহান বাদাম চিবুচ্ছে।
– বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে
– কিভাবে বুঝলেন?
– ঠান্ডা বাতাস লাগছে গায়ে।
– একটা কথা বলি?
– একশটা বলো।
– হাসবেন না তো?
– কথা না শুনে কিভাবে বলবো আমার হাসি পাবে কি পাবে না?
– আপনার সাথে বৃষ্টিতে ভিজার খুব ইচ্ছে।
মায়ার দিকে তাকিয়ে রহস্যের হাসি হাসছে সোহান। মায়ার মুখে বাদাম ঢুকিয়ে দিয়ে বললো
– আমার সাথে ভিজবে?
– হুম
– পূর্নিমা কি সিনেমাতে নায়কের সাথে বৃষ্টিতে ভিজে?
– হুম। আবার নেচে নেচে গানও গায়।
ভীষন শব্দ করে হেসে উঠলো সোহান। মূহূর্তেই মুখটা কালো করে ফেললো মায়া। সোহান ফের পূর্নিমাকে নিয়ে হাসছে। বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। মায়া বুঝে পায়না পূর্নিমাকে নিয়ে হাসার কি আছে? মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেললো মায়া।
– মায়া,,,
– কি?
– এদিকে তাকাও।
– না।
– আরে তাকাও তো।
– আপনি পূর্নিমাকে নিয়ে হাসেন কেনো?
– আমি জানি না। ওর কথা শুনলেই কেনো যেনো আমার হাসি পায়। বিশেষ করে নেচে নেচে গান গাওয়ার ব্যাপারটা। আমাকেও কি এখন নাচতে হবে?
কথাটা বলেই ফের হাসতে শুরু করেছে সোহান। এবার মায়ারও হাসি পাচ্ছে। কোনোমতে হাসি চেপে রেখে মায়া বললো
– আমি কি আপনাকে বলেছি আমার সাথে নাচতে হবে?
– তুমি চাইলে একটু না হয় নেচে দেখালাম।
– এতটা করতে হবে না। আমার সাথে একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই হবে।
মায়ার কথা শেষ হতে না হতেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে।
– অলরেডি বৃষ্টি পড়া শুরুও হয়ে গেছে।
– ভিজবেন তো আমার সাথে? নাকি হুড তুলে দিবেন?
– অবশ্যই ভিজবো।
ধীরে ধীরে বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে ঠান্ডা বাতাস। ফুটপাতে থাকা লোকজন ছুটছে কোনো ছাউনি বা দোকানের ভিতর একটু আশ্রয় নিতে। কেউবা রিক্সার হুড তুলে দিয়েছে নিজেকে বৃষ্টি থেকে আড়াল করতে। কেউ বৃষ্টিতে ভিজতে রাজি না। একমাত্র মায়া ছাড়া।
এতক্ষন অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলো মায়া। আশপাশের লোকজনগুলোকে দেখছিলো। সোহান সেই কখন থেকে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে সেদিকে কোনো খেয়াল নেই মায়ার। তার বাঁ হাতটা আলতো করে চেপে ধরলো সোহান। সোহানের স্পর্শ পেয়ে সোহানের দিকে তাকালো মায়া।
– কিছু বলবেন?
– কেউ একজন সেই কখন থেকে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে কিছু একটা বলার আশায়। কথাটা কি জানো? সেই কেউ একজন তোমাকে ভীষন রকমে ভালোবাসতে শুরু করেছে। তুমি হচ্ছো তার সুখে থাকার টনিক। তোমার নেশায় মানুষটা ভিতর থেকে তিলতিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ মানুষটার শরীরের রগ গুলোতে বোধহয় আজকাল রক্তের বদলে তোমার ভালোবাসার নেশা ছুটোছুটি করে। মানুষটাকে চিনেছো? নাকি নামটা বলতে হবে?
ডানে বামে মাথা নাড়লো মায়া। মুখ থেকে কথা বেরোচ্ছে না ওর। প্রচন্ড রকমে সুখ ভর করেছে ওর উপর। এতদিন মাথায় ঘুরতে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ মিললো। কেউ একজন তাকে ভালেবাসে। সত্যিই ভালোবাসে। মানুষের চোখ মিথ্যা বলে না। সোহানের চোখও মিথ্যা বলছে না। এই মূহূর্তে নিজেকে নষ্ট গলির মেয়ে মনে হচ্ছে না মায়ার। মনে হচ্ছে গায়ে লেগে থাকা এতদিনের পুরোনো দাগটা বুঝি উঠে গেছে। সোহানের চোখের ভাষায় ডুবে আছে মায়া। চোখ উপছে পানি ঝড়ছে ওর। বৃষ্টির পানিতে চোখের পানি আড়াল হচ্ছে।

পর্ব-১৮
———————————–
বাসায় ফিরে এসে ভেজা শাড়ী গায়ে দিয়েই ফ্লোরে বসে আছে মায়া। ঘোরটা তার এখনও কাটেনি। কানের মধ্যে লাগাতার বেজেই যাচ্ছে, ” কেউ একজন তোমাকে ভালোবাসে।” কথাটার মধ্যে কিছু একটা তো আছে। নেশা জাতীয় কিছু। ভয়ানক নেশা। পুরো শরীরটাকে অবশ করে দেয়ার ক্ষমতা আছে নেশাটার মধ্যে। মায়ারও এই মূহূর্তে শরীরটাকে অবশ মনে হচ্ছে। এজন্যই বোধহয় উঠে গিয়ে কাপড় পাল্টানোর জোরটা পাচ্ছে না।
কাপড় পাল্টে মাথা মুছতে মুছতে মায়ার রুমেএসেছে সোহান। মায়া এক দৃষ্টিতে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। এতটাই ঘোরের মাঝে ডুবে আছে যে সোহানের উপস্থিতি টের পেলো না সে। মায়ার মুখোমুখি হাঁটু ভেঙে বসলো সোহান। ওর গালে হাত দিয়ে জিগ্গেস করলো
– কি গো?
– হুম?
– কি ভাবছো এত মন দিয়ে? আর কাপড় পাল্টাচ্ছো না কেনো?
– হুম
– হুম হুম করছে কেনো? কেনো সমস্যা?
– নাহ।
– তাহলে?
– কিছু না।
– উঠো যাও। কাপড় পাল্টে আসো।
উঠে দাঁড়ালো মায়া। ড্রয়ার থেকে সালোয়ার কামিজের সেট হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগুলো মায়া।
কিছুক্ষন আগেই একদম কাক ভেজা হয়ে বাসায় এসেছে সালমান। কাপড় পাল্টে সোহানকে খুঁজতে খুঁজতে মায়ার রুমে চলে এলো সালমান। খাটে বসে ফোন টিপছে সোহান।
– ভাইয়া?
– কি?
– ফ্লোরে পানি কিসের?
– ঐ তো মায়া ভিজা শাড়ি পড়ে এতক্ষন ফ্লোরে বসে ছিলো। শাড়ির পানি ওগুলো।
– ফ্লোরে বসে ছিলো কেনো? রাগ করে?
– আরে নাহ। এমনি।
– ও বোধহয় বেশ চুপচাপ স্বভাবের তাই না?
– কথা বলে। তবে বেশিও না কমও না। আমার সাথে তো বেশ ভালোই কথা বলে। তুই নতুন তাই হয়তোবা কথাটা একটু কম বলছে।
– হয়তোবা।
– তুই তো অনেক কথা বলিস। ওর সাথে কথা বলতে থাক। দেখবি ও তোর সাথে কথা বলবে।
– হুম সেটা তো করবোই। শিমুকে বলেছি মায়ার কথা।
– ওহ আসল কথাই তো জিগ্গেস করলাম না। শিমুর সাথে সব ঠিক হয়েছে?
– হুম হয়েছে। কানে ধরে উঠ বস করিয়েছে এই মেয়ে আমাকে?
– পাব্লিক প্লেসে?
– হ্যাঁ।
– ওসব কোনো ব্যাপার না। ভালোবাসায় এমন শাস্তি পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।
– মায়াও কি দেয় নাকি?
সোহান উত্তর দেয়ার আগেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হতে হতে বললো
– মোটেই না। আমি কখনোই তোমার ভাইকে পানিশড করি না।
– মায়া, ঘটনা কি বলো তো?
– কি ঘটনা?
– আমি বাসা থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত একটু মরা মরা লাগছিলো। এখন খুব ফুরফুরে মনে হচ্ছে।
– হুম৷ একটা উত্তর খুঁজছিলাম। পেয়ে গেছি।
– কি উত্তর?
– উহুম। তোমাকে একদম বলা যাবে না।
– একান্ত গোপন কিছু?
– হুম। খুউউব গোপন।
চুল মুছছিলো মায়া। ওর হাত টেনে সামনে
এনে বসালো সোহান। মায়ার হাত থেকে তয়লাটা নিয়ে মাথা মুছে দিচ্ছে সে। বেশ রিল্যাক্স মুডে সালমানের সাথে গল্প করছে মায়া। সোহান চুপচাপ ওদের গল্প শুনছে আর মায়ার চুল মুছছে। রাত সাড়ে দশটা বাজে। বাসার কাজের লোক এসে বললো
– ভাই, রাত হইছে অনেক। খাবেন না?
– কয়টা বাজে?
– সাড়ে দশটা।
– কখন বাজলো? টেরই তো পেলাম না। যাও খাবার সাজাও টেবিলে। আমরা আসছি।
আলিশার বাসার ড্রইং রুমে বসে আছে তার বাবা আকরাম এবং বড় ভাই আদনান। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে আলিশার ছেলে। মাথা নিচু করে বসে আছে বাপ- ভাই দুজন। প্রচন্ড তর্ক চলছে আলিশা রুপমের মাঝে। নির্বাক শ্রোতা হয়ে ওদের তর্ক শুনছে আাকরাম সাহেব এবং আদনান। এখানে জোর গলায় রুপমকে বলার কিছুই নেই তাদের। তারা দিব্যি বুঝতে পারছে দোষ তাদের মেয়ের। এই মূহূর্তে আকরাম সাহেবের মনে হচ্ছে মেয়ে জন্ম দিয়ে জন্ম-জন্মান্তরের ভুল করেছেন তিনি। কি বেইজ্জতটাই না হতে হচ্ছে তাকে।
– আপনি শুনতে পাচ্ছেন আপনার মেয়ের গলার জোর কত! অন্যায় করেও একটা মানুষ এভাবে কিভাবে ঝগড়া করতে পারে খুঁজে পাই না আমি।
– বাবা কি শুনবে? হ্যাঁ? কথা হচ্ছে আমার তোমার মাঝে। ওদের কেনো ডেকে এনেছো?
– তোমার অসভ্যতামি দেখানোর জন্য। মেয়েকে কি শিক্ষা দিয়ে বড় করেছে সেসব দেখানোর জন্য। এখন মুখ খুলেন না কেনো বাবা? বিয়ের সময় তো মুখ বড় করে বলেছিলেন এত লক্ষী মেয়ে নাকি পুরো বাংলাদেশ খুঁজে পাবো না। এই আপনার লক্ষীর নমুনা?
– বাবা আমি আসলে কি বলবো বুঝে পাচ্ছি না। আমার মেয়ে এসব করবে আমার ধারনার বাইরে ছিলো।
-এই মেয়ের মাথায় কয়দিন পরপরই সোহানের ভূত চাপে। কেনো? আমি কি ওকে কম ভালেবাসি? ও যেসব কাহিনী করে ওকে কবেই ঘর থেকে বের করে দিতো অন্য কেউ হলে। ওকে এখন পর্যন্ত ঘরে রেখেছি আমি। আদনান, তোমার তো ঘরে বউ আছে। তোমার বউ এসব করলে কি তাকে ঘরে রাখতে।
চুপ করে বসে আছে আদনান। উত্তর দেয়ার মতো ভাষা এবং ইচ্ছা কোনোটাই আপাতত খুঁজে পাচ্ছে না। ঘরের সবাই এখন চুপ৷ ফ্যানের আওয়াজ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা পালন করে মুখ খুললো রুপম।
– আপনাদের মেয়ে আপনারা নিয়ে যান। আমার দ্বারা এসব সহ্য করা আর সম্ভব না।
– রুপম, বাবা এভাবে বলো না।
– প্লিজ আর কোনো রিকুয়েস্ট করবেন না।
– বাচ্চাটার কথা ভাবো।
– এমন ভাবে বলছেন মনে হচ্ছে আমার ছেলেকে আপনার মেয়ে দেখাশোনা করে?আমার ছেলেকে আমিই পালবো। আপনার মেয়েকে কোনো দরকার নেই।
– কিহ্! আমি ছেলেকে দেখাশোনা করি না? তো করে টা কে শুনি? তোমার মা কবর থেকে উঠে এসে আমার ছেলের দেখাশোনা করে?
– দেখো আদনান তোমার বোনকে নিয়ে বের হও। ও কিন্তু আমার হাতে এখন থাপ্পড় খাবে।
সোফা ছেড়ে উঠে বসতো বসতে আদনান বললো,
– শুধু থাপ্পড় না। ও এরচেয়ে আরও বেশি কিছু ডিজার্ভ করে। থাপ্পড়, কিল- ঘুষি যা পারো সব দাও। পারলে মেরে ফেলো। মরার পর আমাদের খবর দিও। আমরা এসে দাফন দিবো। সেই সাথে মিলাদের ব্যবস্থাও করবো। শুনো বাবা, আমি গেলাম। তোমার বাড়িতে তুমি তোমার মেয়েকে নিয়ে আসবে কিনা সেটা একান্ত তোমার ব্যাপার। ওকে নিয়ে বাসায় ঢুকার আগে আমাকে ফোন দিয়ে জানিও। আমি আমার ওয়াইফ নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবো। এসব আজেবাজে মানুষের সাথে এক ছাদের নিচে থাকা সম্ভব না। ইজ্জত থাকবে না আমার।
হনহন করে বেরিয়ে যাচ্ছে আদনান। পিছন থেকে ইচ্ছেমতো মুখপ যা আসছে তাই বলছে আলিশা। সেসব কথার ধার ধারছে না আদনান। ওর মতে বাজে লোকের কথা কানে তুলতে নেই। কয়েক মিনিট পর আকরাম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে খুব ঠান্ডা এবং দৃড় কন্ঠে বললেন
– রুপম তোমাকে ঘরে রাখবে না। আমিও তোমাকে ঘরে নিবো না। অতএব তুমি যেদিক খুশি সেদিক যেতে পারো।
বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন আকরাম সাহেব। পর্দার চিপা থেকে ছেলেকে বের করে কোলে তুলে নিলো রুপম। সেও বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। বাপ বেটা আজ বাহিরে ডিনার করবে। রাগে পুরো শরীর কাঁপছে আলিশার। ফ্লোরে বসে হাউ মাউ করে কদছে।

পর্ব-১৯
———————————–
ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছে মায়া আর সালমান। ফোনে কথা বলছে সোহান। কলিংবেল বেজে উঠলো বাসার। সোফা ছেড়ে উঠে এসে গেইট খুলে দিলো মায়া। একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচন্ড রকমে বিধ্বস্ত দেখা যাচ্ছে মেয়েটাকে। চুল আউল-ঝাউল হয়ে আছে। চোখ নাক ফুলে আছে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। মেয়েটাকে চিনে না মায়া। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাও ওকে দেখছে। একদম পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুটেখুটে দেখছে মায়াকে মেয়েটা। কয়েক সেকেন্ড বাদে মুখ খুললো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা।
– তুমিই কি মায়া?
– হ্যাঁ।
– সরো এখান থেকে। আমি ভিতরে যাবো।
– কেনো সরবো? কে আপনি?
মায়ার প্রশ্ন শুনে সোফা ছেড়ে উঠে আসলো সালমান। আলিশা দাঁড়িয়ে আছে গেইটের বাহিরে। এতরাতে আলিশাকে দেখে কিঞ্চিৎ বিরক্ত সালমান। এই মেয়ে যখনই আসে কোনে না কোনো ঝামেলা বাঁধায়৷ আজও নির্ঘাৎ ঝামেলা করবে। তারউপর চোখ মুখ ফুলে আছে। তারমানে বাসা থেকে ঝগড়া করে এখানে এসেছে।
– তুমি এখানে কেনো?
– তোমার ভাই কোথায়?
-,ভাই কোথায় সেটা বলা জরুরি না। জরুরি হচ্ছে তুমি এতরাতে এখানে কেনো সেটা জানা। কেনো এসেছো?
– সোহানকে ভীষন প্রয়োজন।
– ভাইয়া বাসায় নেই। যাও এখান থেকে।
– আমি জানি ও ঘরেই আছে৷ প্লিজ আমাকে ভিতরে যেতে দাও
– সালমান, ইনি কি আলিশা?
– হ্যাঁ। তুমি জানো ওর কথা?
– হুম জানি। তোমার ভাই বলেছিলো। উনার সাথে এতরাতে কি কাজ আপনার?
– সেটা তো তোমার জানার প্রয়োজন নেই। যার কথা আমি তার সাথেই বলবো।
– উনি আর আমি আলাদা না৷ উনাকে বলা যে কথা আমাকে বলা একই কথা। আপনি আমাকে বলতে পারেন।
– তোমাকে কেনো বলবো?
– না বলতে পারলে চলে যান।
– এটা সোহানের বাসা। ওর বাসায় কে আসবে কে যাবে সেটার ডিসিশন ও নিবে। তুমি না।
পিছন থেকে এসে মায়ার কাঁধ জড়িয়ে ধরলো সোহান। আলিশাকে ভালোভাবে দেখছে সে।
– এটা মায়ার বাসা। আমার না। যেদিন বিয়ে করেছি সেদিন থেকে এই ঘর সংসার ওর নামে করে দিয়েছি। এই ঘরে কে আসবে কে যাবে সেসব ডিসিশন আামার বউ নিবে। আমার বউ। বুঝতে পারছো কথাটা? আমার গার্লফ্রেন্ড না, ও আমার বউ।
– তাহলে আমি কে?
– তুমি রুপমের বউ।
– রুপম যে আমাকে তোমার জন্য ঘর থেকে বের করে দিলো?
– আমার জন্য? কেনো? আমি কি করেছি?
– আমি তোমাকে ভালোবাসি সেসব তুমি রুপমকে বলেছো। ও আমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। আব্বুও বাসায় যেতে নিষেধ করেছে। তোমাকে ভালেবেসেই তো ঘর ছাড়তে হয়েছে আমাকে। এখন তোমার ঘর ছাড়া আমি কোথায় যেয়ে উঠবো?
– আমার তো কোনো ঘর নেই। চিটাগাং যেটা আছে সেটা বাবার। এখানে যেটা আছে সেটা আমার বউয়ের। ও যদি তোমাকে ঘরে থাকতে দেয় তাহলে থাকতে পারো আমার কোনো আপত্তি নেই। কি গো? থাকতে দিবে ওকে এখানে?
– একদম না। আলিশা আপুকে বর্তমানে আমার কাছে কুমীর মনে হচ্ছে। খাল কেটে কুমীর ঢুকানোর মতো বোকা আমি না। যদি উনি হাজবেন্ড বাচ্চাসহ আমার বাসায় আসে তাহলে অবশ্যই মেহমানদারী করবো। দেখেন আপু ভালো ঘরের মেয়েরা এতরাতে হাজবেন্ডের ঘর ফেলে সাবেক প্রেমিকের বাসায় এসে উঠে না। সোহান যদি সিঙ্গেল থাকতো তাহলে নাহয় অন্য কথা ভাবতাম। কিন্তু সোহান তো আার একা নেই। উনার সাথে আমি আছি। আপনার এখানে এতরাতে আসাটা খুবই দৃষ্টিকটু মনে হচ্ছে। আর রুপম ভাই আমার হাজবেন্ডের জন্য আপনাকে ঘর থেকে বের করেনি। আপনার দোষেই আপনাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে৷ বিয়ের পর কোনো বউ তার হাজবেন্ডকে ফেলে পুরোনো প্রেমিকের পিছনে ছুটবে এটা কোনে পুরুষই মেনে নিবে না। বাসায় যান। রুপম ভাইকে সরি বলেন। নিজের সংসারকে আগলে রাখার চেষ্টা করেন।
– সংসার সোহানের সাথে করার কথা ছিলো। রুপমের সাথে না।
– তাহলে করলেন না কেনো সোহানের সাথে সংসার? রুপম ভাইয়ের সাথে সংসার করছেন কেনো?
– শোনে মেয়ে, তোমাকে আমার অসহ্য লাগছে৷ সরো তো এখান থেকে। সোহানের সাথে কথা বলতে দাও।
– আপনাকে আমার আরো বেশি অসহ্য লাগছে। আসলে আমি এত ছ্যাচড়া মেয়ে মানুষ দেখে অভ্যস্ত নই তো তাই। তবু হজম করছি। মাথা যথেষ্ঠ ঠান্ডা রেখে কথা বলছি। মনে হয় বেশিক্ষণ ঠান্ডা রাখতে পারবো না। আপনি এখান থেকে চলে গেলেই বোধহয় আপনার জন্য ভালে হবে। আর নয়তো কখন আবার কি করে বসি!
– সোহান তোমার ওয়াইফ আমার সাথে মিসবিহেভ করছে।
– হ্যা করছে। এটা ওর বাসা। ওর বাসায় ও যা খুশি করতে পারে। আমি বলার কে?
– তুমি কি গাধা হয়ে যাচ্ছো? তোমার তেজ কোথায় গেছে? আগে তোমার উপর কোনো কথা বলতে পারতাম না। এখন তোমার বউ বলে কিভাবে?
– তোমার প্রশ্নের মাঝেই উত্তর আছে। বউ… তুমি ছিলে প্রেমিকা। আর মায়া হচ্ছে বউ। যে অধিকারটা প্রেমিকাকে দেয়া যায় না সেটা বউকে দিতে হয় না। বিয়ে হওয়ার সাথে সাথে অধিকারটা তার হয়ে যায়। পার্থক্যটা বুঝতে পারছো? অযথা নিজের সাথে মায়াকে কম্পেয়ার করো না। আমার জীবনে মায়া আর তোমার অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা।
আলিশা এগিয়ে এসে সোহানের হাত ধরে কিছু একটা বলতে এগিয়ে আসছিলো। বাঁধ সাধলো মায়া। সোহানের দিকে আলিশার এগিয়ে যাওয়া হাতটা ধরে ফেললো মায়া।
– আপনি বেডরুমে যান। আমি আলিশা আপুর সাথে কথা বলে আসছি।
সোহান নিজের রুমে চলে গেলো। রুপমকে ফোন করেছে সে। আলিশার দিকে প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে মায়া। রাগে চোখ লাল হয়ে গেছে মায়ার।
– আমি প্রচন্ড রকমের হিংসুটে স্বভাবের। অন্য মেয়ে আমার হাজবেন্ডের দিকে তাকালে আমার সহ্য হয় না। আর সেখানে আপনি রাত বিরাতে মেসেজ, ফোন দিয়ে বিরক্ত করছেন। বাসায় এসে হাজির হয়েছেন। আমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও উনার হাত ধরতে চাচ্ছেন। আপনি কি আসলেই মেয়ে মানুষ? একটা মেয়ে এতটা নির্লজ্জ কিভাবে হয়? ছিঃ! আপনি একটা জঘন্য মেয়ে মানুষ। চুপচাপ নিজের ঘরে ফেরত যান। আমাদেরকে বিরক্ত করতে আসবেন না। সারাদিন শেষে কোথায় হাজবেন্ডের সাথে একটু সময় কাটাবো তা না। কোথ্থেকে ফালতু ঝামেলা এসে হাজির হয়েছে।
শেষের কথাগুলো বলতে বলতে গেট লাগিয়ে দিলো মায়া। বাহিরে দাঁড়িয়ে লাগাতার গেট ধাক্কা দিচ্ছে আলিশা। প্রচন্ড চেঁচামেচি করছে ও৷ মায়া বেডরুমে যেয়ে সোহানকে বললো
– উনি তো খুব সিনক্রিয়েট করছে। লোকজন শুনছে এসব৷
– রুপমকে ফোন দিয়েছি। ও নিতে আসছে ওকে।
– আচ্ছা উনি কি পাগল?
– ভবের পাগল। স্বার্থে টান পড়লে পাগলামি শুরু করে।
মিনিট পনেরো পর রুপম এসেছে আলিশাকে নিতে। এতক্ষন দরজায় ধাক্কা দিয়েই গেছে আলিশা। হাত জ্বালা করছে খুব। তবু থামেনি ও। হাতে রক্ত জমাট বেঁধে লাল হয়ে গেছে। রুপম এসে কিছুক্ষণ টানা হেঁচড়া করেছে আলিশাকে। শরীরে সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে সোহানের দরজায় এসে ধাক্কা দিচ্ছে। পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন দাঁড়িয়ে ওদের তামাশা দেখছে। অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন এসেও জড়ো হয়েছে এখানে। প্রচন্ড লজ্জা লাগছে রুপমের। দিশেহারা হয়ে আলিশাকে কোলে করে নিয়ে গাড়িতে বসালো রুপম। ঝড়ের গতিতে কার ড্রাইভ করছে সে। আলিশা রুপমের হাতে মুখে এলোপাতাড়ি চড় থাপ্পর দিয়েই যাচ্ছে আর মুখে যা আসছে তাই বলছে। প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে রুপমের। আর সহ্য হচ্ছে না তার এসব যন্ত্রনা। অনেকটা দূরে এসে গাড়ি সাইড করে থামালো সে। স্টিয়ারিং এর উপর মাথা রেখে চিৎকার করে কাঁদছে রুপম। মনের বোঝাটা হাল্কা করার খুব বেশিই প্রয়োজন ছিলো ওর। দম আটকে মারা যাবার উপক্রম হচ্ছিলো। চোখের পানির সাথে বুকের ভিতরের চাপটা একটু একটু করে বেরিয়ে যাচ্ছে।

পর্ব-২০
———————————–
সোহানের বাসার ড্রইংরুমে মাথা নিচু করে বসে আছে রুপম। মুখোমুখি বসে আছে মায়া আর সোহান৷ আলিশাকে বাসায় লক করে এসেছে রুপম। সাথে করে ছেলেটাকে নিয়ে এসেছে যাতে আলিশা বাচ্চাটাকে মারধর না করতে পারে। রুপম জানে আলিশা এখন বাসায় তুমুল ভাংচুর চালাবে। বাচ্চাটা দেখলে ভয়ে বেহুঁশ হওয়ার উপক্রম হবে। তাই সাথে করে নিয়ে এসেছে। সালমানের বেডরুমে বসে এখন ইউটিউবে কার্টুন দেখছে। সোহানকে কিছু বলতে চাচ্ছে রুপম। কিন্তু গলার ঠিক মাঝখানটাতে এসে ঠেকে যাচ্ছে কথাগুলো। প্রায় বিশ মিনিট যাবৎ এভাবেই বসে আছে সে। এর মাঝখানে সোহান দুইবার জিগ্গেস করেছে পানি খাবে কিনা। সেই উত্তরটাও গলা দিয়ে আসছেনা রুপমের। সোহানও খুব বেশি জোরাজোরি করছে না কিছু বলার জন্য। সে বুঝতে পারছে রুপমের মনের অবস্থাটা এখন কেমন হতে পারে? সোহান ফের রুপমকে জিগ্গেস করলো
– তোমাকে অনেক স্ট্রেসড দেখাচ্ছে। স্ট্রং কফি খাবে? দিতে বলবো?
কোনোমতে গলায় শক্তি জুগিয়ে উত্তর দিলো রুপম।
– নাহ। একগ্লাস বরফ মিশানো পানি দেয়া যাবে? গলা পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে।
মায়া সোফা ছেড়ে ছুটে গেলো ডাইনিং রুমে। ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে বড় একটা গ্লাস পানিতে তিনটুকরা বরফ ছেড়ে দিলো।
রুপমের দিকে গ্লাস এগিয়ে দিলো মায়া। হাতে গ্লাস নিয়ে খুব দ্রুত পানি গিলছে সে। দেখে মনে হচ্ছে বিগত এক সপ্তাহ ধরে বোধহয় সে পানি খায় না। রুপমের মুখ দেখে বড্ড কষ্ট হচ্ছে মায়ার। করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে মানুষটার দিকে। পানি খেয়ে খুব বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিলো রুপম। তার চোখে পানি ছলছল করছে। মায়ার দিকে তাকিয়ে বললো
– ভাবী আসলে….
গলায় কথা ধরে আসছে তার। থেমে গেলো সে। মায়া স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মানুষটার চোখে পানি৷ এবার তারও কান্না পাচ্ছে। বহু কষ্টে চোখে পানি আটকে রেখেছে মায়া। কোনোমতে গলার স্বরটা ঠিক করে ফের বলতে শুরু করলো রুপম।
– ভাবী আমার বাচ্চাটা রাতে কিছু খায়নি। ওকে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম। খায় নি। ও আসলে ভয় পেয়েছে খুব আমাদের ঝগড়া দেখে। আপনি ওকে একটু খাইয়ে দিবেন প্লিজ?
মায়ারও গলা ধরে আসছে। মুখ ফুটে কিছু বললো না ও। উপরে নিচে মাথা ঝাঁকিয়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটলো সে।
– রুপম?
– হুম?
– তুমিও তো বোধহয় খাওনি। হাত মুখ ধুয়ে আসো। আমি টেবিলে খাবার দিতে বলছি।
– প্লিজ সোহান আমি খাবো না। গলা দিয়ে খাবার নামবে আমার।
– যা হয়েছে ওগুলো আপাতত একটু সাইড করো। অল্প কিছু খেয়ে নাও।
– বিষ আছে ঘরে?
– কি ধরনের কথা বলছো?
– লজ্জায় কষ্টে আমার মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। চোখে মুখে অন্ধকার দেখছি আমি৷ মরে যেতে হচ্ছে। বাচ্চাটার কথা ভেবে এ ধরনের স্টেপ নিতে পারছি না। আমি মরে গেলে ছেলেটার কি হবে? আলিশার তো বাচ্চাটার দিকে কোনো খেয়ালই নেই।
– আসলে রুপম তোমাকে কি বলা উচিত এই মূহূর্ত্বে আমার জানা নেই। আমি যাস্ট চুপচাপ তোমার অভিযোগগুলো শুনতে পারবো। কিন্তু সলিউশন কি দিবো তা আমার জানা নেই।
– ওকে আমি প্রচন্ড রকমে ভালোবাসি সোহান। একতরফা ভালোবেসেই গেছি। ওর কাছ থেকে কখনো ভালোবাসা পাইনি৷ একজন ওয়াইফ তার হাজবেন্ডকে কিভাবে আগলে রাখে, কতটা যত্ন করে সেসব আমার জানা নেই। আলিশার কাছে কখনো সেসব পাইনি আমি। বিয়ের আগে খুব এক্সপেকটেশনস ছিলো আমার ম্যারিড লাইফটা একদম আদরে মাখামাখি টাইপ হবে। আমার ওয়াইফ আমার ছোটখাটো প্রতিটা বিষয় খেয়াল রাখবে। কিছুই হলো না জানো? কিচ্ছু পাইনি এই বিয়ে থেকে আমি। ওর প্রেগনেন্সির খবর যখন ও জানতে পারলো পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলো এ্যাবরশন করানোর জন্য। নয়টা মাস ওকে যে কিভাবে কন্ট্রোল করেছি! উফফ! মনে হলে এখনো আমার দম আটকে আসে। প্রথম প্রথম ভাবতাম ও হয়তোবা আমার সাথে এডযাস্ট হতে আনকমফর্টেবল ফিল করছে। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি ওকে নিজের করে নেয়ার জন্য। স্টিল নাউ চেষ্টা করেই যাচ্ছি ওকে আপন করে পাওয়ার জন্য। কিন্তু এই রুপমের দিকে তার একবারের জন্য ঘুরেও তাকাতে ইচ্ছে হয় না। মাঝেমাঝে নিজেকে রাস্তার কুকুর বিড়াল মনে হয়। নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করি, রুপম তুই কি মানুষ? নাকি রাস্তার ক্ষুদার্থ কুকুর যে কি না একটু ভালোবাসার আশায় এতগুলো বছর যাবৎ আলিশার পিছনে ঘুরেই যাচ্ছিস।
কথাটা বলেই হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো রুপম। সালমানের রুমে বসে রুপমের ছেলেকে খাওয়াচ্ছে মায়া। বাচ্চাটা খুব তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে। খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। মায়া ইতিমধ্যেই ভাব জমিয়ে ফেলেছে ওর সাথে। বাহির থেকে কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। ভাত মুখে নিয়ে বসে আছে সে।
– কি হলো বাবা? খাচ্ছো না কেনো?
– আন্টি… বাবা কি কাঁদে?
মায়া আর সালমান একজন আরেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। বিছানা ছেড়ে সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালো সালমান। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বারান্দার দিকে এগোতে এগোতে মায়াকে বললো,
– মায়া তুমি ওকে চাঁদ দেখিয়েছো?
– না তো।
– ধুর বোকা। তুমি আফিফকে চাঁদ দেখাওনি? কত্তবড় চাঁদ উঠেছে। একদম বড় গোল রুটির মতন দেখতে। চলো বাবা, আমরা চাঁদ দেখবো। তারা গুনবো। আর ভাত খাবো।
তারা গুনার কথা শুনে ব্যাপক খুশি আফিফ। ব্যাপারটা তার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। আজ পর্যন্ত তারা কখনো সে গুনে দেখেনি। সালমানের কোলে থেকেই লাফালাফি শুরু করেছে তারা গুনবে সেই খুশিতে।
রুপমের দিকে আরও এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো সোহান। এবার খানিকটা থেমে থেমে পানি খেলো সে। গ্লাসটা টি টেবিলের উপর রেখে আবার বলতে শুরু করলো রুপম।
– এই যে আমার এত প্রপার্টি অর্থ-বিত্ত। লাভ কি এসবের? আমার তো ঘরে শান্তি নেই। আমার চেয়ে ভালো আছে আমার অফিসের পিওন। তুমি ওকে চিনো না?
– আনিস নাম যে ওর কথা বলছো?
– হ্যা। তুমি জানো ওর বউটা প্রায়ই সেজেগুজে বক্সে ভরে খাবার নিয়ে আসে। অফিসের একটা কোনায় বসে ওর বউ ওকে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়ে যায়। আমি আমার রুম থেকে বসে দেখি ওদের। তুমি জানো আনিসের মুখটা ঐ মূহুর্তে আমি বসে বসে দেখি৷ ও যে সুখে আছে সেটা তখন ওর মুখটা দেখলেই আমি বুঝি। অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে। আবার আফসোসও হয়৷ আনিসের জায়গায় থাকলে খুব সুখে থাকতাম জানো। ওর হতে পারে অঢেল টাকা নেই। কিন্তু ও আমার চেয়ে বড়লোক। ওর ঘরে সুখ আছে যা আমার ঘরে নেই।
বেডরুমে বসে সিগারেট ফুঁকছেন সোহানের বাবা। কিছুক্ষণ আগেই তার একজন ক্লাইন্ট ফোন করেছিলো। কথায় কথায় সেই ক্লাইন্টের কাছ থেকে তিনি জানতে পারলেন তার বড় ছেলে বিয়ে করেছে। কিছুদিন আগেই নাকি এক পার্টিতে পরিচয় করিয়েছে সোহান তার ওয়াইফকে। ভদ্রলোক বেশ প্রশংসা করলেন মায়ার। ছেলের বিয়ের কথা অন্য লোকের মুখে শুনে এতক্ষণে তুফান চালানোর কথা ছিলো। কিন্তু তিনি যথেষ্ঠ ঠান্ডা মাথায় বসে সিগারেট ফুঁকছেন। তিনি যতটুকু সোহানকে চিনেন তার ছেলে এতটাও বেপরোয়া না যে বাপ মাকে ন জানিয়ে বিয়ে করবে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে সোহান বিয়ে করে নি। ঘটনা এখানে অন্যকিছু। আর যদি বিয়ে করেও থাকে নিশ্চিত মেয়ের মাঝে কোনো সমস্যা আছে। ফ্যামিলিকে জানিয়ে বিয়ে করতে গেলে বাবা অবশ্যই মেয়ের খেঁাজ নিবে সেটা সোহান জানে। নিশ্চিত এমন কোনো সমস্যা আছে যেটা বাবাকে জানানো যাবে না। তাই সে চুপচাপ বিয়েটা সেড়ে নিয়েছে। কিন্তু এখন সত্যিটা জানা খুব দরকার। সোহান কি বিয়ে করেছে নাকি করে নি? সোহানকে জিগ্গেস করে লাভ নেই। সত্যিটা বলার হলে অনেক আগেই বলে দিতো। খবরটা অন্যভাবে নিতে হবে। কাকে জিগ্গেস করবে? জাহিদকে? নাহ, সেও মুখ খুলবে না। সালমান? ওকে জিগ্গেস করা যেতে পারে। ছোট ছেলের নম্বরে ডায়াল করলেন তিনি। ফোন রিসিভ করছেনা সে।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 4.8 / 5. মোট ভোটঃ 4

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment