নষ্ট গলির মেয়ে (পতিতা) যখন বউ [১]

লেখিকা- মিম

পর্ব-০১
———————————–
-” স্যার, সব ধরনের মাইয়্যার কালেকশন আছে আমার কাছে। কেমন পিস চান বলেন। সামনে এক্ষুনি হাজির করমু।”
-” বয়স বেশি হওয়া যাবে না। ১৭-১৮ হলে বেস্ট। হাইট, ফিগার একদম পারফেক্ট হতে হবে। চেহারা নরমাল হতে হবে। আপনাদের মতো হলে হবে না।”
-” আমাগো মতো মানে?”
-” আপনাদের চেহারায় স্পষ্ট ভেসে উঠে আপনারা প্রস্টিটিউট।”
কথাটা শোনা মাত্রই এতক্ষনের হাসিমাখা মুখটাতে কালো ছায়া পড়ে গেলো জোনাকি আক্তারের। কথাটা তার মোটেইপছন্দ হয়নি। মনে মনে গালি দিচ্ছে সে সোহানকে। শালা হারামি একটা। বেশ্যার শরীর মজা লাগে আর চেহারা মজা লাগে না। ভ্রু কুঁচকে তার চামচা ফখরুলকে বললো,
-” ঐ, চুমকি আর মায়ারে ধইরা আন। ”
-” চুমকি তো সার্ভিসে আছে।”
-” মায়া কই?
-” ওর আইজ শরীর ভালানা
সোহানের দিকে ঘুরে জোনাকি বললো,
-” চুমকিরে দেখতে হইলে বসা লাগবো আর মায়ার জন্য আরেকদিন আসতে হইবো।
-” চুমকিকে না হয় অল্প সময়ের জন্য ডেকে দাও।
-” না স্যার আমগো ধান্দা বেইমানির হইলেও তা আমরা ঈমান দিয়া করি। রুটিরুজি আমগো। বেইমানি কেমনে করি কন? তবে আপনে এত শর্ত দিসেন কেন তা জানা যাইবো?
-” এত জেনে তুমি কি করবা? মায়াকে কি একটু দেখার ব্যবস্থা করা যায়?
-” স্যার সবাই মনে করে আমগো খালি শরীর আছে মন নাই। কিন্তুু আমগো ও মন আছ। ওরা আমার দায়িত্বে এখানে থাকে। তাই ওগো ভালোমন্দ দেখার দায় ও আমার। ”
-” অার কেউ নেই?”
-” না অাপনে যেমন মাল চাইতাছেন এইরকম মাল অার নাই।”
-” দেখো অন্যান্য কাস্টমারের চেয়ে আমি বেশি টাকা দিবো।”
-” না স্যার, পারমু না।”
মেজাজ খারাপ হচ্ছে সোহানের। এটা কেমন ফাজলামি। এত ব্যস্ত মানুষ সে। কাজ ফেলে এখানে এসেছে অথচ ওকে এভাবে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে? খুবই অপমানজনক ব্যাপার। এই মহল্লায় ওর অাসাই ঠিক হয়নি। দেশে এত জায়গা থাকতে এখানে কেনো এসেছিলো মরতে?
-” শোনো মহিলা, এই যে এত ভাব নিচ্ছো না? এতটা ভাব নেয়ার কিছু নেই। তুমি যাস্ট একটা প্রস্টিটিউট। রাজ্যের কাজ ফেলে এসেছি এখানে। অার তুমি এভাবে ইনসাল্ট করছো আমাকে? তোমরা একটা কাস্টমারের কাছে কত পাও? উর্ধে ১৫০০। এর বেশি তো কখনোই পাও না।অামি তোমাকে পার মান্থ ফিফটি থাউজেন্ড পে করতাম। ফিফটি থাউজেন্ড বুঝো? পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রতি মাসে। আর তোমার মেয়ের খরচ সব অামি আলাদা বহন করতাম।”
-” দেখেন স্যার, আপনের এইখানে ভাল্লাগলে আবার আইসেন আর যদি আমাগোর চেহারা আর এই মহল্লা পছন্দ না হয় তাইলে আর আইসেন না।”
রাগে ফুঁসছে সোহান। মেজাজ আসমানের চূড়ায় উঠছে। বেশ্যাটা এমন ভাব নিচ্ছে মনে হচ্ছে যেনো প্রতি কাস্টমারের কাছ থেকে ও প্রতিমাসে পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকা পায়। যত্তসব বেশ্যার দল।
সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। ফোনে কাউকে বলতে বলতে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে,
-” কোথায় পাঠিয়েছো আমাকে? একটা মেয়েকেও দেখায় নি এরা। তুমি জানো সময় ব্যাপারটা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ন। এত কাজ ফেলে আসছি আমি। আজাইরা টাইম ওেস্ট করলাম এখানে। অন্য কোথাও খোঁজ নাও। আজই মেয়ে চাই আমার।”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে শেষ করলো সোহান। বেশ চেঁচাচ্ছিলো সে। ওপাশ থেকে তার বিজনেস ম্যানেজার কি বলছে সেগুলো পাত্তা না দিয়েই একনাগারে বলে শেষ করলো কথাগুলো। সোহানের চেঁচামেচিতে আশপাশের রুমগুলো থেকে উঁকি দিচ্ছে কিছু পতিতা। খুব দ্রুতগতিতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে সোহান। পিছন পিছন যাচ্ছে তার পি,এস, জাহিদ। সে একজন নির্বাক দর্শক। প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও সে বলে না। সোহান যত চেঁচামেচি করুক,রাগ করুক তার মাঝে কখনোই কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। সোহানের রাগ উঠলে বেশিরভাগ তুফান জাহিদের উপর দিয়েই যায়। কিন্তু সে একদম স্বাভাবিকথাকে। তার চেহারা দেখলে মনে হয় কোথাও কিছু হয়নি। পরিস্থিতি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং শান্ত আছে। নিচে নেমেই সোহানের চোখ গেলো সরু গলির উল্টো দিকের জরাজীর্ন দোতলা বিল্ডিংটা তে। জানালার পাশে একটা মুখ দেখা যাচ্ছে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে। চোখ আটকে গেছে সেখানে। মনে হচ্ছে আশপাশের সবকিছু থমকে গেছে। সে নিজেও থমকে আছে। মেয়েটা এতক্ষন ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলো। সোহানের ঘোর কাটলো জানালার পাশ থেকে মেয়েটার সরে যাওয়ার পরপরই। ভীষন ভাবে মনে ধরেছে মেয়েটাকে। এমন একটা মুখই সে খুঁজছিলো। সোহানের সিক্সথ সেন্স বলছে এটাই মায়া। নামটার সাথে এই মুখটাই মানায়।
-” জাহিদ।”
-” জ্বি স্যার?”
-” এক্ষুনি উপরে যাও। জোনাকিকে যেয়ে এই মেয়েটার কথা বলো। অামার ওকে পছন্দ হয়েছে। কত টাকা লাগবে জিজ্ঞেস করো যেয়ে?”
-” ওকে স্যার।”
জাহিদ গেছে জোনাকির সাথে কথা বলার উদ্দেশ্যে।
আর সোহান যাচ্ছে সেই মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে। দোতলায় উঠে সেই রুমে যেয়ে দেখে মেয়েটি সেখানে নেই। রুম থেকে বেরিয়ে বাহিরের করিডোরে আশপাশে চোখ বুলাচ্ছে। কোথ্থাও নেই। কতক্ষনের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেলো নাকি। লম্বা করিডোর ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে। একটা রুমের দরজার পর্দা উড়ছিলো। পর্দার ফাঁক দিয়ে মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে। কেউ একজন তার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। রুমে ঢুকে পড়লো সোহান। চমকে উঠলো রুমে থাকা দুজন মানুষ। পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখছে মেয়েটাকে সে। এমন মেয়েই সে খুঁজছিলো।
-” আচ্ছা তুমিই কি মায়া?”
কোনো উত্তর দিচ্ছে না সে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সোহানের মুখের দিকে। পাশে থাকা মহিলা এগিয়ে এসে বললো,
-” আপনেরে কি জোনাকি বুবু পাঠাইছে? স্যার আমার মাইয়্যাডা অসুস্থ। আজকা সার্ভিস দিতে পারবো না।”
-” যেটা জিজ্ঞেস করেছি সেটার উত্তর দাও। এটাই কি মায়া?”
-” হ স্যার।”
-” কি হয়েছে ওর?”
-” দুইদিন ধইরা তুমুল জ্বর আইছে স্যার।”
কাছে এগিয়ে এসে মায়ার কপালে হাত রাখলো সোহান। টেম্পারেচার সত্যিই অনেক বেশি।
-” ডক্টর দেখিয়েছো ওকে?”
-” না স্যার আজকা যামু সামনের ফার্মেসিতে। ঐখানে একটা ডাক্তার বসে। উনারে দেখামু।”
কিছু না বলেই বেরিয়ে এলো সে। বাহিরে আসা মাত্রই জাহিদের মুখোমুখি হলো সোহান।
-” স্যার উনি আপনাকে উপরে যেতে বলেছেন।”
উপরে জোনাকির রুমে এলো সোহান। মহিলা পায়ের উপর পা তুলে সোফায় বসে আছে। মহিলার সামনাসামনি চেয়ার টেনে বসলো সোহান।
-” কত চাও?”
-” যা কইছেন তাইই থাকবো।”
-” আমার কিছু শর্ত আছে।”
-” কি?”
-” ওকে অন্য কেউ ইউজ করতে পারবে না। শুধুমাত্র অামাকে সার্ভিস দিবে। আমি যখন যেখানে ডাকবো সেখানেই ওকে পাঠাতে হবে। ঢাকার বাহিরে আমি প্রায়ই যাই। দেশের বাহিরেও যাই। আমি যেখানে যাবো সেখানে ওকেও নিয়ে যাবো। ওর যাবতীয় খরচ আমি চালাবো।আর তোমার টাকা আলাদা দিবো। এখন যাও ওকে রেডি হতে বলো। ওকে নিয়ে বাহিরে যাবো।
-” স্যার আজকা মাইয়্যাডারে সার্ভিসে দিমু না। ছেমড়ি অসুস্থ। সুস্থ হইলে যা খুশি কইরেন।”
-” ওকে ডক্টর দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি। আর আমি টাকা দিচ্ছি। অতএব মুখ বন্ধ রাখো। আমি যা খুশি তা করবো এখানে তোমার কিছু বলার নেই।”
-” টাকাটা তো এখনও পাই নাই।”
-” জাহিদ ওকে আজকেই টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করো। অফিসে কাউকে ফোন দিয়ে বলো টাকা নিয়ে আসতে।আর তুমি মায়ার কাছে খবর পাঠাও। ওকে বলো রেডি হতে।”

পর্ব-০২
———————————–
গাড়িতে বসে আছে সোহান। তার পাশে মায়া। হসপিটাল যাচ্ছে ওরা দুজন। জাহিদকে বসিয়ে এসেছে জোনাকির ওখানে। অফিসের একজন কর্মচারী টাকা নিয়ে অাসবে সেখানে। জোনাকিকে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে এরপর সেখান থেকে আসবে। এখন পর্যন্ত কোনো কথা হয়নি তাদের মধ্যে। মায়াকে খুব অস্থির দেখাচ্ছে। একবার হেলান দিয়ে বসছে অারেকবার সোজা বসছে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করলো সোহান।
-” তোমার কি বেশি খারাপ লাগছে?”
-” বমি করবো।”
-” ওয়েট ওয়েট। গাড়িতে করো না প্লিজ।”
কোনোমতে গাড়িটা একদিকে পার্ক করলো সোহান। গাড়ি থেকে বেরিয়েই গড়গড় করে বমি করতে শুরু করলো মায়া। সামনের দোকান থেকে দৌঁড়ে একবোতল পানি কিনে অানলো সে। মায়ার দিকে পানির বোতলটা এগিয়ে দিলো। কুলি করে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিলো মায়া।
– ” গাড়িতে বসবে এখন? নাকি অারও কিছুক্ষন এখানে দাঁড়াবে?”
-” না, এখন ঠিক আছি। গাড়িতে বসবো।”
গাড়িতে এসে বসলো দুজন। বেশিদূর আর বাকি নেই। খুবজোর পাঁচ থেকে সাত মিনিট সময় লাগবে।
-” তুমি কি গাড়িতে উঠলে বমি করো?”
-” না। জ্বর এসেছে তো। তাই গতকাল থেকে বমি হচ্ছে।”
-” দুদিন হয়ে গেছে এখনও ডক্টর দেখানো হয়নি কেনো?”
-” ডক্টরের কাছে যেতে ভালো লাগে না।”
-” অসুস্থ শরীর নিয়ে পড়ে থাকতে ভালো লাগে?”
-” হুম ভালোই লাগে। কাজ থেকে তিন চারদিন অবসরে থাকা যায়। নিজের মতো করে কয়টা দিন কাটানো যায়। আর নয়তো সারাবছর অন্যের পুতুল হয়ে বসে থাকতে হয়।”
মায়ার কন্ঠে কিছুটা অভিযোগের অাভাস পাচ্ছে সোহান। মায়ার দিকে একবার তাকলো সে।
ডক্টরের চেম্বারে বসে অাছে দুজন। চোখে চশমা লাগিয়ে সামনে বসে আছে ডাক্তার।
-” নাম কি তোমার মামনি?”
-” মায়া।”
-” সুন্দর নাম। বয়স কত?”
-” ১৮ বছর তিন মাস।”
-” এই ভদ্রলোক কি হোন তোমার?”
-” জ্বি উনি…..”
-” ও আমার ওয়াইফ।”
থতমত খেয়ে গেলো মায়া। এটা কি বললো লোকটা? বউ? ডক্টর মাথা তুলে একবার সোহানকে দেখছে আরেকবার মায়াকে দেখছে। লোকটাকে দেখে তো মনে হচ্ছে ভালোই পয়সাওয়ালা, কিন্তু বউটা? সেরকম তো কিছু মনে ক্ষচ্ছে না। ড্রেস আপ দেখে তো মনে হচ্ছে নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের। লোকটা কয়েক সেকেন্ড সেসব ভেবে নিজের মনকে বুঝ দিলো এটা বলে, যার যার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। আমি অত ঘেটে কি করবো?
-” তা কি সমস্যা আম্মু?”
-” জ্বর, মাথাব্যাথা। গতরাত থেকে বমি করেছি চারবার।”
-” মাথাব্যাথা কি সর্বক্ষন থাকে?”
-” না। রাতের দিকে বেশি হয়।”
মায়ার প্রেশার চেক করে ডক্টর বলল
-” প্রেশার তো অনেক লো। শ্বশুড়বাড়িতে কি খাবার দাবার ঠিকমতো দেয় না নাকি?”
-” নতুন বিয়ে তো। খাওয়া দাওয়া টা ঠিকমতো করতে চায় না। লজ্জা পায় বোধহয়।”
-” তুমি কি করো? জোর করে খাওয়াতে পারো না?”
-” জ্বি খাওয়াবো।”
মায়া মাথা নিচু করে সোহানের মিথ্যা কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনছে। বউ? শব্দটা কেমন যেনো? কথাগুলো মিথ্যা। কিন্তু শুনতে ভালো লাগছে। বিশেষ করে বৌ শব্দটা। একদম হৃদয় গহীনে কাঁপন ধরানোর মতো। প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে ফার্মেসি থেকে মেডিসিন কিনছে সোহান। পা থেকে মাথা পর্যন্ত গাড়িতে বসে তাকে দেখছে মায়া। কখনো কোনো পুরুষকে এতটা খুঁটে খুঁটে দেখা হয়নি তার। আজ কেনো যেনো ইচ্ছে হচ্ছে লোকটাকে দেখতে। হয়তোবা আজ পর্যন্ত কোনো পুরুষ ওর কপালে হাত রেখে জ্বর মাপে নি তাই। হয়তোবা ওকে কেউ আজ পর্যন্ত বউ ডাকেনি তাই। গাড়িতে এসে বসেছে সোহান। সন্ধ্যা হতে চলেছে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে বলতে শুরু করলো,
-” কি খাবে বলো? ”
-” কিছু না। খেতে ভালো লাগে না। তিতা লাগে সবকিছু।”
-” সেটা তো একটু লাগবেই। তাই বলে তো আর খাওয়া অফ করলে চলবেনা। জোর করেহলেও খেতে হবে।”
-” আপনার যেখানে ভালো লাগে সেখানেই চলেন।”
-” তুমি কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার নামটা জানতে চাও নি”
-” আমরা কাস্টমারের নাম জিজ্ঞেস করি না।”
-” কেনো?”
-” প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় সাতটা কাস্টমার আসে। কতজনের নাম মনে রাখবো? তাই আর জিজ্ঞেস করি না।”
-” পুরোনো নিয়ম বাদ।এখন থেকে এত কাস্টমার তোমার কাছে যাবে না।শুধুমাত্র আমি যাবো। জোনাকির সাথে আমার ডিল হয়েছে। তাছাড়া সম্পর্কটা কিন্তু শুধুমাত্র ব্যবসার মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চাচ্ছি না। আমি চাচ্ছি সম্পর্কটা গভীরভাবে তৈরীকরতে। সেটা তোমাকে পরে ডিটেইল বুঝিয়ে বলবো। ”
-” ঠিকাছে।”
-” তুমি এখন পর্যন্ত আমার নামটা জানতে চাচ্ছো না।”
মায়া মুচকি হাসলো।
-” কি নাম আপনার?”
-” সোহান। তুমি কিন্তু বেশ শুদ্ধ করে কথা বলো। তোমার ওখানে এত শুদ্ধ করে কেউ কথা বলে না। তুমি কোথ্থেকে শিখলে?”
-” পূর্নিমার কাছ থেকে।”
-” পূর্নিমা কে?”
-” বাংলা ছবির নায়িকা।”
অট্টহাসি হাসছে সোহান। এভাবে অহেতুক হাসার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছে না মায়া। মুখটা কালো হয়ে যাচ্ছে তার। পূর্নিমা তার খুব প্রিয়। প্রিয় লোককে নিয়ে কেউ হাসাহাসি করলে মায়ার কষ্ট হয়। এখনো হচ্ছে। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেললো ও।
-” কি ব্যাপার মুড অফ করে ফেললে যে?”
-” এমনি।”
-” তোমার পূর্নিমাকে নিয়ে হেসেছি বলে?”
-” হুম। ও অামার পছন্দের মানুষ। খুব পছন্দের।”
-” ওকে সরি। অার কখনো বলবো না। ঠিকাছে?”
-” হুম।”
রেস্টুরেন্টের বাহিরে গাড়ি থেমেছে। মায়াকে গাড়ি থেকে নামতে বললো সোহান। গাড়ি থেকে নেমে আশপাশে তাকাচ্ছে মায়া। মেয়েগুলো কত্ত স্মার্ট। ওর সাথে এই মেয়েগুলো কোনোদিক দিয়েই যাচ্ছে না। খুব সাদাসিধে জামা পড়ে অাছে ও। একটুও সাজগোজ নেই। বড্ড বেমানান লাগছে ওকে।
-” কি হলো দাঁড়িয়ে অাছো কেনো?”
ও ভেতরে যাবে কিনা বুঝে পাচ্ছে না। সোহান ওর মুখ দেখে বুঝে গেছে ওর ভিতরে কি চলছে।
-” তুমি অনেক বেশি সুন্দর। এখন চলো ভিতরে।”

পর্ব-০৩
———————————–
রেস্টুরেন্টের ভিতরে মুখোমুখি বসে অাছে দুজন। কিছুক্ষন অাগেই ওয়েটার খাবার দিয়ে গেছে। সোহান লক্ষ্য করছে মায়া কাঁটা চামচ ছুরি দিয়ে ঠিকভাবে খেতে পারছে না। ওপাশ থেকে চেয়ার ছেড়ে এপাশের চেয়ারে এসে বসলো সোহান। মায়ার হাত থেকে চামচ নিজের হাতে নিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে মায়াকে। কখনো এভাবে যত্নআত্তি পায়নি সে। এই প্রথমবার এতটা যত্নঅাত্তি পাচ্ছে। অাবেগটা একটু অাধটু উঁকি দিচ্ছে। যদিওবা মাত্র কয়েকঘন্টার পরিচয় এমন আবেগ উঁকি দেয়ার কথা না। তবু দিচ্ছে। মানুষটাকে জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। নিজের মনের সমস্ত অপ্রকাশিত কথাগুলো, ইচ্ছেগুলো জানাতে ইচ্ছে হচ্ছে।
-” এভাবে তাকিয়ে অাছো কেনো? কিছু বলতে চাও?”
-” হুম।”
-” বলো কি বলবে?”
-” আমি কে সেটা তো আপনি ভালো করেই জানেন। তাহলে এত যত্ন নিচ্ছেন কেনো?”
-” তোমার পছন্দ হচ্ছে না?”
-” সেটা বলিনি। পছন্দ অবশ্যই হচ্ছে।”
-” যেহেতু পছন্দ হচ্ছে সেহেতু চুপচাপ যত্ন উপভোগ করো। এত কেনো কেনো করছো কেনো?”
-” আপনার রাগ বেশি তাই না?”
-” না আমি যথেষ্ট ঠান্ডা মানুষ।”
-” তাহলে আমার সামান্য প্রশ্নে রেগে গেলেন কেনো?”
-” আমি এমনই।”
-” তারমানে আপনি রাগী।”
-” তুমি অনেক কথা বলো।”
-” না। কিন্তু আজকে আপনার সাথে কথাা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে।”
-” তাই? পছন্দ হয়েছে আমাকে?”
-” হুম পছন্দ হয়েছে। অাপনার রাগটাকেও ভীষন ভালো লেগেছে। ”
-” বাহ্ তাহলে তো সোনায় সোহাগা। হাজার ধমকালেও পালাবে না। জানো জাহিদকেও অনেক বকা দেই। বেচারা একটা টু শব্দও করে না।”
-” জাহিদ কে?”
-” ঐ যে একটা ছেলেকে দেখলে না আমার সাথে?”
-” হুম।”
-” ঐটাই জাহিদ।”
-” আপনার বয়স কত?”
-” ৩০।”
-” অাপনার তো বিয়ের বয়স হয়েছে। বিয়ে না করে আমার মত মেয়ের পিছনে কেনো ছুটছেন?”
-” বিয়ে করলে বুঝি পুরুষ মানুষরা তোমাদের পিছে ছুটে না?”
-” ছুটে তবে বিয়ের পাঁচ ছয় বছর পর। সংসার করতে করতে তিতা হয়ে যায়। তখন অামাদের কাছে অাসে।আর কতগুলা থাকে জাত লুচ্চা। ওগুলা বিয়ের পরদিনই চলে অাসে অামাদের কাছে।”
-” আমি জাত লুচ্চা না। একজনকে নিয়ে থাকতেই পছন্দ করি। আর সংসার করে মনটাকে বিষিয়ে তুলতে চাই না। তাই তোমার কাছে আসা।”
-” সবাই তো খারাপ হয় না।”
-” ম্যাক্সিমাম মেয়ে মানুষই এমন ত্যানা প্যাচানো টাইপ হয়। তিনজনের সাথে প্রেম করেছি। তিনোটাই একই স্বভাবের ছিলো। অহেতুক ঘ্যানর ঘ্যানর করতো। কিছু থেকে কিছু হলেই ব্রেকঅাপ করবো, সুইসাইড করবো, হাত কাটবো। উফফ! কি যে পেইন দিতো মেয়েগুলা।”
-” আপনি না একটু আগে বললেন একজনকে নিয়েই থাকতে পছন্দ করেন। তাহলে তিনজন আসলো কেমন করে?”
-” একসাথে তো তিনজনের সাথে প্রেম করিনি। যখন যার সাথে প্রেম করেছি তখন তাকে নিয়েই পড়ে থেকেছি। অন্য কোথাও নজরদেইনি। আমি যথেষ্ট লয়্যাল পারসন। প্রতিটা প্রেমের ইতি টানার পর নতুন প্রেমে জড়ানোর আগে ছয়মাস করে সময় নিয়েছি।”
-” সময় কেনো নিয়েছেন?”
-” ওদেরকে পুরোপুরি ভুলার জন্য।”
ঠিক এই মূহূর্তে সোহানের কথায় মায়ার মনে হচ্ছে একটা মানুষ জীবনে কয়টা প্রেমকরতে পারে? যেহেতু একেকজনকে ভুলার জন্য ছয়মাস সময় লেগেছে তারমানে প্রেম গভীর ছিলো। যেহেতু গভীর ছিলো তাহলে ছেড়ে দিলো কেনো? নাকি মেয়েগুলোই ছেড়ে চলে গেছে?
-” সম্পর্ক কে ভেঙেছিলো?”
-” প্রথম দুটো আমি ভেঙেছি। সারাদিন লাগাতার প্যানপ্যানানি,অভিযোগ চলতেই থাকতো এই দুইটার আর শেষেরটা আমার রাগ হজম করতে পারেনি। যখনই বকতাম তখনই কাঁদতো আর কি কি জানি বলতো। ওর কান্নার জন্য কথাগুলো স্পষ্ট বুঝতাম না। তখন আরও বকা দিতাম। শেষমেষ ইচ্ছেমতো অভিশাপ দিয়ে ব্রেকআপ করে ফেলেছে।”
-” আপনি কি গালিও দেন?”
-” হ্যা দেই। সবচেয়ে বেশি গালি খায় জাহিদ আর আমার ম্যানেজার। আর ওদের চেয়েও বেশি গালি খেয়েছে আমার প্রথম প্রেমিকা। গালি দেয়ার টাইমে কিন্তু কখনো প্রতিবাদ করেনি। অামি ঠান্ডা হওয়ার পর আমাকে ধোলাই দিতো । তখন আমি ফোন কান থেকে রিয়ে রাখতাম। এরপর উল্টো অামাকেই সরি বলতো। মাঝে মাঝে অতিষ্ঠ হয়ে বলতো আমি মরে যাবো। একবার এক ক্লাইন্টের উপর মেজাজ খারাপ হয়েছিলো খুব। ক্লাইন্টের ঝাল ওর উপর ঝেড়েছি। সেদিন রাতে এই মেয়ে বিষ খেলো। ওর বাবা আমার উপর মামলা দিলো। এরপর আর কি ব্রেকআপ করে দিলাম।”
-” আপনি জেলও খেটেছেন?”
-” নাহ্। টাকা দিয়ে মামলা তুলেছি।”
-” এরপর ঐ মেয়ে যোগাযোগ করতে চায়নি?”
-” হুম করেছে। আমি পাত্তা দেইনি। কয়দিন পর বাপ মা বিয়ে দিয়ে দিলো ওকে। এখন দুই বাচ্চার মা। বেশ ভালোই আছে। এইবার আসি সেকেন্ড গার্লফ্রেন্ড প্রসঙ্গে। এইটা তো একদম গালির উপর পি এইচ ডি করা ছিলো। আমি একটা দিলে ও দিতো পাঁচটা। সবচেয়ে বেশি জ্বালিয়েছে এই মেয়েটা। মারাত্মক প্যানপ্যানানি স্বভাবের ছিলো। সারাক্ষন এটা করোনি কেনো? ওটা করনি কেনো? ফোন দিতে লেট করলে কেনো এগুলো চলতেই থাকতো। প্রতিটাদিন এই মেয়ের সাথে ঝগড়া হতো। শেষমেষ এটাকে বাদ দিলাম। ঠান্ডা, ঝামেলা ছাড়া মেয়ে মানুষ আমার খুব পছন্দ।”
-‘ আপনি কি অামাকেও গালি দিবেন?”
-” সেটা পরিস্থিতি নির্ভর।”
-” জোনাকি বুবুর সাথে কতদিনের চুক্তি করেছেন?”
-” সময় ফিক্স করিনি।”
-” আপনার ঘরে কে কে আছে?’
-” ঢাকার বাসায় আমি একা থাকি। দুইজন সার্ভেন্ট আছে। ফ্যামিলি চিটাগাং থাকে। ওখানে মা বাবা আর ছোট ভাই আছে। বাবা ওখানকার অফিস দেখে আর আমি এখানকার।”
-” আপনার পরিবার যদি জানে আপনি আমার মতো মেয়ের কাছে আসবেন উনারা বকবেনা?”
-” ফ্যামিলিটা আমার পছন্দ না। আসলে এটা ফ্যামিলি না। সবাই সবার প্রয়োজনের তাগিদে সবাইকে ব্যবহার করছি। ছোট থেকেই দেখে আসছি মা বাবা কুকুর বিড়ালের মতো ঝগড়া লেগে থাকে। দুজনেরই পরকিয়া চলছে বহুবছর আগে থেকে। কয়েকবার এদের দুজনকে বলেছি তোমরা ডিভোর্স নিয়ে নাও। এভাবে আমাকে আর সালমানকে টর্চার করো না। উনারা ডিভোর্স নিবে না। এভাবেই চলবে। অামরা দুইভাই আয়ার হাতে বড় হয়েছি। বাবা মা কে খুব কমই কাছে পেয়েছি। বাবার সাথে ব্যবসায়িক কথা ছাড়া কোনো কথা হয় না। মায়ের সাথে লাস্ট কথা হয়েছে পনেরোদিন আগে। বেশিরভাগ কথা হয় ছোটটার সাথে। ও বেশিরভাগ ফোন করে। মাঝে মাঝে অামার এখানে এসে থাকে। আমি তেমন একটা যাই না ওখানে। শান্তি লাগে না। ঐ বাড়িতে ঢুকা মাত্রই অশান্তি শুরু হয়ে যায় আমার।”
মায়া খুব মন দিয়ে সোহানের কথাগুলো শুনছে। লোকটার বাপ মা থেকেও নেই আর ওর বাবা কে সেটা ওর জানা নেই। কি অদ্ভুদ দুনিয়া! কেউ পায় না আর কারো কারো থেকেও নেই।
-” অাচ্ছা মায়া ঐটা কি তোমার মা ছিলো? ঐ যে চুল আঁচড়ে দিচ্ছিলো যে?”
-” হুম।”
-” উনিও কি তোমার মতই?”
-” হ্যা। অামি জন্মসূত্রে পতিতা। অামার মা পনেরো বছর বয়সে অামাকে জন্ম দেয়। চেয়েছিলো ওখান থেকে অামাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে পারেনি। অাম্মার ডিমান্ড ছিলো বেশি। অাম্মাকে উনারা ছাড়েনি। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছি। এরপর অামাকেও এই কাজে নামিয়ে দিলো আম্মা বলতো অামাকে পালিয়ে যেতে। দুবার ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছিলামও। ঘন্টাখানেক বাদে ফিরে এসেছি মায়ের কথা ভেবে। মা তো একা হয়ে যাবে।অামিই বা যাবো কোথায়? রাস্তার লোকেরাও তো কেমন করে যেনো তাকায়। ভেবে দেখলাম বাহিরে যেয়েও লাভ নেই এরচেয়ে ভালো মায়ের কাছে যাই। ”
-” জীবন কেমন যেনো! খুব এলোমেলো। খুব ছন্নছাড়া। যাই হোক সেসব বাদ দাও। পেট ভরেছে তোমার? অারো কিছু খাবে?”
-” না।”
-” চলো অামার বাসায় যাবে?
-” অামার তো শরীরটা ভালো না অাজই?”
-” অামি সেসব কিছু করবো না। তুমি তোমার মত থাকবে। শোনো সুস্থ হওয়ার জন্য ভালো একটা পরিবেশ দরকার। ওটা তোমার ওখানে নেই। সুস্থ হলে তুমি চলে যেও। আবার অামার এখানেও থাকতে পারো। যাবে আমার সাথে?”
-” ………………”
-” অামাকে বিশ্বাস করতে পারো।”
-” হুম যাবো।”

পর্ব-০৪
———————————–
সোহানের বাসার ড্রইংরুমে বসে আছে মায়া। পাশেই দশ বারোটা শপিং ব্যাগ। এসবগুলো শপিং মায়ার জন্য করেছে সোহান। রেস্টুরেন্ট থেকে ফেরার পথে মার্কেট হয়ে এসেছে দুজন। নিজেকে বেশ সুস্থ মনে হচ্ছে মায়ার। মন ভালো থাকলে শরীরটাও ভালো লাগে সেটা আবারও প্রমানিত হলো। বাসার কাজের লোক দুটো মায়াকে আড়চোখে দেখছে। এর অাগেও তারা এই বাসায় একজন মেয়েকে প্রায়ই আসতে দেখতো। মেয়ে অাসতো, রাতে থাকতো, পরদিন সকালে চলে যেতো। অাবার কখনো দু তিনদিন এখানে থেকে যেতো। সোহান এতক্ষন ফোনে কথা বলছিলো। কলটা কেটেই চলে এলো মায়ার মুখোমুখি।
-” কি ব্যাপার? বসে অাছো যে? এখনো ফ্রেশ হচ্ছো না?’
-” বাথরুমটা কোন দিকে?”
-” ওহ অামার সাথে এসো।”
বাসায় পড়ার জন্য কিছু প্লাজো, গেন্জি অার স্কার্ট কিনে দিয়েছে সোহান ওকে। ব্যাগ থেকে একটা গেন্জি অার স্কার্ট হাতে নিয়ে সোহানের পিছু পিছু যাচ্ছে মায়া। একটা রুমে এসে লাইট জ্বালালো সোহান। সুন্দর সাজানো গোছানো একটা রুম। রুমে এসে অাঙুল দিয়ে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে সোহান বললো,
-” ওটা ওয়াশরুম। ফেসওয়াশ সাবান সব রাখা অাছে। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো যাও। অামি এই রুমেই অাছি। কিছু লাগলে অামাকে বলো।”
মায়া কিছু না বলেই ওয়াশরুমে চলে গেলো। জাহিদের নাম্বারে ডায়াল করলো সোহান।
-” জোনাকিকে বলেছো মায়া যে অামার এখানে থাকবে তিন চারদিন?”
-” জ্বি স্যার।”
-” ঝামেলা করেনি তো?”
-” না স্যার।”
-” রাতে খেয়েছো?”
-” জ্বি না স্যার।”
-” তোমার ফ্যামিলিতে কে কে যেনো অাছে?”
-” মা বাবা, ছোট দুই বোন।”
-” যাও ওদের নিয়ে বাহির থেকে খেয়ে এসো। অাজকে তোমার টাকা দিয়ে বিল পে করো। কাল অামি তোমাকে টাকা দিয়ে দিবো।”
-” লাগবে না স্যার। বাসায় রান্না হচ্ছে।”
-” যাও তো। কথা বাড়িওনা ।”
-” স্যার কাল যাই। অার নয়তো অাজকের রান্নাটা ওয়েস্ট হবে।”
-” কি রান্নাকরেছে অাজ ঘরে।”
-” চিংড়ি দিয়ে কচুশাক, বেগুন-ডিমের তরকারি অার ডাল।”
-” ওহ তোমার প্রিয় খাবার রান্না হয়েছে অাজ ।”
” অাপনি জানেন এগুলো অামার প্রিয় খাবার?”
-” অামি সবই খেয়াল করি জাহিদ। তুমি অামার সাথে প্রতিদিন আট নয় ঘন্টা কাটাও। তোমার পছন্দ অপছন্দ লক্ষ্য করাটাই স্বাভাবিক।”
-” জ্বি স্যার।”
-‘ অাচ্ছা কালই যেও। এখন রাখি।”
-” জ্বি স্যার।”
ফোনটা রেখে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে অাছে সোহান। মিনিট দশেক পর বেরিয়ে এলো মায়া। ওকে খুব ফ্রেশ দেখাচ্ছে। এর অাগে স্কার্ট সে কখনো পড়েনি। অাজই প্রথম নিজের কাছে উদ্ভট লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে লুঙ্গি পড়েছে।
-” জ্বর টা কি এখন অাছে মায়া?”
-” নাহ তেমন নেই। সহ্য করার মতো।”
-” এই শামীম, ড্রইং রুম থেকে মেডিসিনের প্যাকেটটা দিয়ে যাও তো। মায়া, তুমি বসো এখানে।”
খাটের একপাশে জানালার দিকে পিঠ ঠেকিয়ে বসলো মায়া। বাহির থেকে বাতাস এসে ওর ঘাড়ে পিঠে লাগছে। পিছনের চুলগুলো বাতাসে উড়ে বার সামনের দিকে এলোমেলো হয়ে অাসছে। কাজের লোক শামীম এসে মেডিসিনের প্যাকেটটা দিয়ে গেলো। সেইসাথে এক বোতল পানি। প্রেসক্রিপশন দেখে ট্যাবলেট বের করে দিচ্ছে সোহান। মায়ার দিকে মেডিসিন অার পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বললো
-” খাও।”
মেডিসিন খেয়ে পানির বোতলটা সোহানের দিকে এগিয়ে দিলো মায়া। চুলগুলো খোপা করতে যাচ্ছিলো ঠিক সে সময় সোহান বললো,
-” উড়তে দাও মায়া। দেখতে ভালো লাগছে।”
-” অাপনাকে যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি। খুব রহস্যময় লাগছে অাপনাকে। এতটা যত্ন পাওয়ার অধিকার অামার নেই। তবু দিচ্ছেন। কেনো বলুন তো?”
-” অাসো পুরো ব্যাপারটা ক্লিয়ার করি। চাইলে অামি অন্য দশটা কাস্টমারের মতো ব্যবহার তোমার সাথে করতে পারতাম। সেটা হতো শুধুমাত্র শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য। মানসিক চাহিদা মিটতো না।সারাদিন নানান কাজে ব্যস্ত থাকি। আমার ইচ্ছে হয় ব্যস্ততার মাঝেও কারো সাথে মন খুলে দুমিনিট কথা বলি। কেউ অামাকে ফোন করে খোঁজ খবর নিক। অামি ভালো অাছি কি না, অামার মনটা ভালো অাছে কিনা সেসব খোঁজ করুক। অামার খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয়গুলো খেয়াল করুক। দিনশেষে কারও সাথে কথা বলে অামার সারাদিনের মানসিক ক্লান্তিটা মিটাই। শরীরের চাহিদা টাকা দিলেই মিটে,মনের খোড়াক টাকায় মিলে না। এবার অাসি তোমাকে কেনো সিলেক্ট করলাম সে প্রসঙ্গে। প্রথমটা ফিন্যান্সিয়ালি আমার স্ট্যাটাসের ছিলো। একদম খাপে খাপ মিলে। কিন্তু প্রেম করে বিশেষ শান্তি পাইনি। মনের খোড়াক মিটে নি। দ্বিতীয়টা ছিলো মিডেল ক্লাস। অাস্ত একটা জাদরেল ছিলো ঐটা। সেখানে শান্তি পাওয়ার কোনো প্রশ্নই অাসে না। অার তিন নম্বরটা অামাকে বুঝতো না। বলতাম একটা বুঝতো অারেকটা।সেটা ছিলো নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের। সেখানেও শান্তি পাইনি। সব ক্লাসের মেয়েদের সাথে প্রেম করে দেখেছি। সুবিধা করতে পারিনি। শেষমেষ তোমাদের পাড়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কেনো জানো? তোমাদের মেন্টালিটি একটু অন্যরকম। তোমরা সহজে কঠিন ব্যাপার হজম করতে পারো। তোমাদের কাছে প্রতিদিন কমপক্ষে সাত অাটটা কাস্টমার অাসে। একেক কাস্টমার একেক রকম। কাউকে তোমাদের পছন্দ হয় অার কাউকে হয়না। তবু তাদের শুয়ে পড়ো তোমরা। ব্যাপারটা যথেষ্ট ধৈর্য্যের। চাইলেই যার তার সাথে শুয়ে পড়া যায় না। যাকে ভালো লাগে না তার সাথে ইন্টিমেট হওয়াটা খুবই পীড়াদায়ক কাজ। তোমরা কাজটা বেশ হাসিমুখে সামাল দাও। তাছাড়া প্রতিদিন সাত অাটজনের সাথে ইন্টিমেট হওয়াটা কোনো মুখের কথা না। যথেষ্ট কষ্টের কাজ।তবু তোমরা করো। যে মেয়ে হাসিমুখে এই কঠিন ব্যাপারগুলো সামাল দিতে জানে সে অারও অনেক কিছুই সামাল দিতে পারবে। একজন পুরুষের মনের খোড়াক হাসিমুখে মিটানো তাদের পক্ষে কোনো ব্যাপার না। তুমি যেমন ভালোবাসার কাঙাল তেমনি অামিও। তুমি এখানে একদম অামার বউয়ের মতো করে থাকবে। ধরে নাও এটা তোমার সংসার। তুমি যাস্ট অামার ছোট বড় সমস্ত ব্যাপারগুলো, ভালো লাগা-মন্দ লাগাগুলোকে দেখবে। অার প্লিজ কখনো কোনো বিষয় নিয়ে প্যানপ্যান করতে পারবে না। অামি হাজার বকা দিলেও কখনো অামার সাথে রাগ করতে পারবে না। তুমি কি রাজি?”
মায়ার কাছে কথাগুলো এলোমেলো লাগছে। শুরুর দিকে সব ঠিকই লাগছিলো। যখন শুনলো তুমি অামার বউয়ের মতো থাকবে, এটা তোমার সংসার এরপর থেকে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এতটাও কি পাওয়ার যোগ্যতা সে রাখে। হতে পারে সে মিথ্যে বউ, মিথ্যে সংসার তবুও অনুভুতিটা সত্যিকারের মনে হচ্ছে। শুধুমাত্র মনের খোড়াক মিটানোর বিনিময়ে এতকিছু করছে লোকটা? মনের খোড়াকের এত মূল্য? কান্না পাচ্ছে মায়ার। কেনো পাচ্ছে সেটা সে জানে না। জ্বরটা অাবার বাড়ছে। বোধহয় খুশিতে জ্বর বেড়ে যাচ্ছে। মানুষটাকে একবার ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।
বড্ড দ্বিধা দ্বন্দে ভুগছে মায়া। সে কি একটাবার মানুষটার হাত ধরার অাবদার ধরবে? একটাবার চোখে মুখে অালতো করে ছুঁয়ে দেখতে চাইবে?

পর্ব-০৫
———————————–
সোহানের দিকে এগিয়ে এসে বসলো মায়া। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বলেই ফেললো,
-” অামি অাপনার হাতটা একটু ধরি?”
সোহান মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে মায়ার হাতটা ধরলো। হাত প্রচন্ড রকমে গরম ছিলো মায়ার। সোহান টের পাচ্ছে মায়ার জ্বরটা অাবার বেড়েছে। কপালে হাত রেখে দেখলো সত্যিই জ্বর বেড়ে গেছে।
-” মায়া তোমার তো জ্বর অাবার বাড়ছে। তুমি শুয়ে পড়ো। অার রাত জেগো না।”
-” অাপনি অামার হাতটা একটু ধরে রাখবেন প্লিজ? অামি ঘুমিয়ে গেলে অাপনি হাতটা ছেড়ে দিয়েন। অাপনাকে সারারাত এখানে বসতে হবে না।”
-” ঠিকাছে। অামি অাছি। তোমার হাত ছাড়বো না তুমি ঘুমাও।”
-” না না সারারাত ধরে রাখতে হবে না। অামি ঘুমান…….”
-” হয়েছে থামো। অামি বুঝেছি। এখন চোখ বন্ধ করো তো।”
সোহান একহাতে মায়ার হাত ধরে রেখেছে। অারেকহাতে ফেইসবুকিং করছে। মায়ার দুচোখে প্রচন্ড রকমে ঘুম ভর করছে। বহুবছর এমন চোখ জুড়ানো ঘুম পাচ্ছে তার। এই ব্যবসায় নামার পর থেকে এভাবে কখনো ঘুম ভর করেনি ওর চোখে। মিনিট দশেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো মায়া। মায়া ঘুমিয়ে গেছে টের পেয়ে খুব সাবধানে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। নিজের রুমে এসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অাছে। ড্রেসিং টেবিলের উপর থাকা সিগারেটটা মুখে নিয়ে জ্বালালো। অন্ধকারে ধোয়াগুলো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পুরো রুমে বিশ্রি গন্ধ ছড়াচ্ছে ঠিকই। সিগারেট বেশি একটা খাওয়া হয়না সোহানের। খুব বেশি মন খারাপের মূহূর্তগুলোতে সে একটা দুটা সিগারেট ধরায়। মনটা অাজও তার খারাপ। অাজ তার ত্রিশতম জন্মদিন ছিলো। কেউ তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়নি। শুধুমাত্র সালমান ছাড়া। যারা জন্ম দিয়েছে তাদেরও বড় ছেলের জন্মদিন মনে নেই। ফেইসবুকে তার অাসল জন্মতারিখটা দেয়া নেই। যেটা অাছে সেটা হচ্ছে ভুয়া। অাত্মীয় বন্ধুরা নোটিফিকেশন পেয়ে সেইমিথ্যা দিনেই তাকে শুভেচ্ছা জানায় খুব অান্তরিকতার সাথে। সব মিথ্যা। অাত্মীয়-বন্ধুরা মিথ্যা। জন্মদিনটা মিথ্যা। তাদের অান্তরিকতাগুলোও মিথ্যা। সবাই সোহানের সত্যিকারের জন্মদিন ভুলে গেছে। কেউ মনে রাখেনি। মনে রাখার প্রয়োজনটা বোধ করে না। গভীর ভালো সম্পর্ক কার সাথে অাছে তার? মনে পড়ছে না কারো নাম। প্রানপন চেষ্টা চালাচ্ছে সোহান। কে অাছে তার এমন প্রানের বান্ধব যে তাকে মন থেকে পছন্দ করে। সালমান ছাড়া অাপাতত খুঁজে পাচ্ছে না। অন্য দশটা মানুষের মতো তারও খুব ইচ্ছে হয় কেউ রাত বারোটা এক মিনিটে অনেকগুলো ফুল চকলেট হাতে নিয়ে ওর দরজার কলিংবেল চাপুক। এরপর সে এসে দরজা খুলে দেখবে কেউ একজন হাসিমুখে ফুল চকলেটগুলো ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলবে,
-” হ্যাপি বার্থডে সোহান। মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্যা ডে।”
এরপর সে চোখে মুখে একরাশ খুশি এবং বিস্ময় নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে থ্যাংকস জানাবে। এই স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে গেছে তার। অাজ অব্দি বাস্তবায়ন হয়নি। তিনজন প্রেমিকার একজনও কখনোই বারোটা একমিনিটে তাকে উইশ করে নি। বরাবরই তারা দশ পনেরো মিনিট লেইট ছিলো। এটা নিয়ে সোহানের ক্ষোভের শেষ ছিলো না। এই ক্ষোভে সে কোনো প্রেমিকার সাথেই তার জন্মদিনে দেখা করতো না। অাজ সেঁধে সেঁধে একজনের কাছ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিতে ইচ্ছে হচ্ছে। মানুষটা হচ্ছে মায়া। জন্মদিনটা এখনও শেষ হয়নি। এখনও অাধাঘন্টা সময় অাছে। সোহানের মনে হচ্ছে ইচ্ছেটা পুরন করা উচিত। হাত থেকে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে মায়ার রুমে গেলো সোহান। বেঘোর ঘুম ঘুমাচ্ছে মায়া। সবুজ রঙের ডিমলাইটে ওর মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখে মনেহচ্ছে বহুবছর ধরে জমানো ঘুমটা অাজ ঘুমাচ্ছে মায়া। এত অারামের ঘুমটা ভেঙে দেয়া কি ঠিক হবে? ডাকতে যেয়েও অার ডেকে তুলেনি সোহান। রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। নাহ্ অার ভেবে কাজ নেই। জন্মদিন তো চলেই গেছে। কে উইশ করলো অার কে উইশ করলো না সেসব ঘেটে লাভ নেই। শুধুশুধু মন খারাপ হবে। যেখানে নিজের বাবা মায়েরই মন থাকেনা সেখানে অন্যের কাছে অাশা করাটা বোকামি। সবার ভাগ্যে সব থাকে না। ওর ভাগ্যে অান্তরিকতা,টান এসব নেই। এসব ভাবতে ভাবতে পাশে থাকা কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে গেলো সোহান। প্রতিবছর সে এভাবেই নিজের মনকে স্বান্ত্বনা দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন সকালে উঠে অাগের দিনের শুভেচ্ছা না পাওয়ার কষ্টটা সে ভুলে যায়। কাল সকালেও হয়তো তাইই হবে।
ভোরের অালো ফুটতে শুরু করেছে । মায়ার জানালা ভেদ করে অালো ওর মুখে এসে লাগছে। ঘুমটা ভেঙে যাচ্ছে একটু একটু করে। অাধাখোলা চোখে অাশপাশের দেয়ালগুলো দেখছে মায়া। দেয়ালগুলো অপরিচিত। এটা কোথায়? চোখজোড়া কঁচলে নিয়ে ভালো করে চোখ মেলে তাকালো মায়া। এতক্ষনে দেয়ালটা পরিচিত লাগছে। এটা সোহানের বাসা। এত বছর একটা রুমকে ঘুম থেকে উঠে দেখেছে সে। অাজ রুমটা ভিন্ন। তাই ঘুম থেকে উঠেই অভ্যাসবশত সেই রুমটা দেখতে চেয়েছিলো মায়া। হুট করে নতুন বাসাটা চিনতে পারেনি সে। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো মায়া। গতরাতে বেলকনিতে থাকা ছোটছোট গাছগুলো চোখে পড়ে নি মায়ার। গাছে তাজা ফুল ফুটেছে। সকাল সকাল চোখের সামনে তাজা ফুল দেখলে মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। বেলকনিতে যেয়ে ফুলগুলো ঘেটে ঘেটে দেখছে মায়া। এর অাগে ওর পাড়াতে দুবার ফুলগাছ কিনে এনেছিলো মায়া। দুবারই গাছ মরে গেছে। ওর মা বলেছিলো এটা নষ্ট গলি। এখানে ভালো জিনিস টিকে না। এরপর অার গাছ কিনেনি ও। পিছন থেকে সোহানের গলার অাওয়াজ পেয়ে চমকে গেলো মায়া।
-” কি ব্যাপার? এভাবে লাফিয়ে উঠলে কেনো?”
-” নাহ্। হঠাৎ ডাকলেন তো তাই।”
-” চা পছন্দ নাকি কফি?”
-” কফি তো কখনো খেয়ে দেখিনি। খেলে বলতে পারবো কোনটা বেশি ভালো।”
” ফ্রেশ হয়েছো?”
-” না।”
-” যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। অামি কফি দিতে বলছি।”
মায়া ওয়াশরুমে চলে গেলো অার সোহান গেলো কিচেনে কফির ফরমায়েশ দিতে। কফি হতে হতে সোহান নিজেও ফ্রেশ হয়ে এলো। দুই মগ কফি নিয়ে মায়ার রুমে এসে দেখে মায়া মুখ মুছছে। সোহানকে দেখে মায়া বললো,
-” বারান্দায় বসি?”
-” বসো। এই রতন দুইটা চেয়ার দিয়ে যাও তো এখানে।”
বেলকনিতে বসে ধোঁয়া উঠা গরম কফির মগে চুমুক দিচ্ছে ওরা দুজন।
-” কি? কফির টেস্ট কেমন?”
-” হুম খুব ভালো।”
-” তো এখন বলো? কোনটা প্রিয়?”
-” লাল চা বেশি প্রিয়”
-” ঠিকাছে কাল থেকে তোমার জন্য লাল চা বানানো হবে।”
-” মাঝে মাঝে কফিও খাবো।”
-” ঠিকাছে। এখন শোনো, অামি চাচ্ছিলাম তোমাকে উন্মুক্ত স্কুলে ভর্তি করাবো। অামি চাচ্ছি পড়াশোনাটা অাবার কন্টিনিউ করো তুমি। বাসায় তোমার জন্য টিচার রেখে দিবো। তোমাকে এসে পড়াবে। অার ইংলিশ শিখানোর জন্য অালাদা টিচার রাখবো। সে তোমাকে ইংলিশে কথা বলা শিখাবে।”
মায়ার মনে হচ্ছে সে অাকাশ ভেঙে নিচে পড়ে যাবে। পড়ালেখা? আবার? ঠিক শুনছে তো?
-” অাপনি অামাকে পড়াবেন?”
-” হুম। কেনো পড়তে চাও না?”
-” সত্যিই পড়াবেন?”
-” মিথ্যামিথ্যি পড়ানো যায় নাকি?”
-” কেনো যেনো মনে হচ্ছে অাপনি অালাদিনের জ্বীন”
-” অামি মানুষ। কোনো জ্বীন টীন না।”
-” এখানে তো তাহলে অামাকে পার্মানেন্টলি থাকতে হবে।”
-” থাকবে। সমস্যা কোথায়?”
-” জোনাকি বুবু মানবে?”
-” সর্বক্ষন জোনাকি জোনাকি করো কেনো? কি করবে এই মহিলা তোমাকে? খেয়ে ফেলবে? ও মানবে না ওর বাপসহ মানবে। ”
-” রেগে যাচ্ছেন কেনো?”
-” কানের কাছে বারবার জোনাকির কথা বলো না তো। ভালো লাগেনা এই মহিলাকে অামার। কেমন যেনো চাড়াল টাইপ। অাস্ত একটা জাদরেল। ওকে দেখলেই অামার সেকেন্ড গার্লফ্রেন্ডের কথা মনে পড়ে যায়।”
মায়া শব্দ করে হাসছে সোহানের কথায়।
-” তুমি হাসছো কেনো?”
-” দ্বিতীয় প্রেমিকা অাপনাকে খুব জ্বালিয়েছে তাই না?”
-” অনেক বেশিই।”
-” অাপনার মুখ দেখলেই বুঝা যায়। ওর কথা বলার সময় অাপনার মুখটা দেখার মতো হয়।”
-” মজা লাগছে খুব তাই না?”
-” খুব বেশিই।”
-” তোমাকে নিয়ে স্টুডিওতে যাবো অাজকে। তোমার পাসপোর্ট অার স্ট্যাম্প সাইজ ছবি তুলতে হবে।”
-” কেনো?”
-” তোমার স্কুল ভর্তি অার পাসপোর্ট বানানোর জন্য লাগবে।”
-” অামার পাসপোর্ট?”
-” হুম।”
-” কেনো?
-” অামি বছরে দুই তিনবার দেশের বাহিরে যাই। তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো এজন্য।”
এই মূহূর্তে সত্যি সত্যিই সোহানকে অালাদিনের জ্বীন মনে হচ্ছে মায়ার। মনে হচ্ছে এটা একটা স্বপ্ন। কিছুক্ষন পরই বোধহয় স্বপ্নটা ভেঙে যাবে।

পর্ব-০৬
———————————–
বিকেল হয়েছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের তেজ কমে গিয়েছে অনেকটাই। সাদা মেঘে কমলা রঙের অালো ছড়িয়ে পড়ছে। মায়া ফুল গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। সন্ধ্যামালতিগুলো ফুটতে শুরু করেছে। অাজ সকালে সোহান ওর হাতে একটা ফোন দিয়েছে। ফোনটা সোহানের আলমারিতে পড়ে ছিলো। দুপুরের দিকে ড্রাইভারকে দিয়ে সিম কার্ড পাঠিয়েছে। মায়ের সাথে অনেকক্ষন কথা বলেছে ও। মা খুব খুশি। এবার বুঝি তার মেয়ে এই নরক থেকে মুক্তি পেলো। সোহানকে প্রানভরে দোয়া দিয়েছেন তিনি। সোহান বলেছে ঘরটাকে নিজের সংসার হিসেবে অাগলে রাখতে। অাচ্ছা সংসার কিভাবে আগলে রাখে? মা কে তো কখনো দেখেনি সংসার করতে। মেয়ে মানুষ তো মায়ের কাছ থেকেই সংসার করা শিখে। এখন কি হবে? ওর তো খালা মামিও নেই বা কোনো বড় বোন নেই সংসার করা শিখাবে। তবে কি সংসার সামলানোর ক্ষেত্রে জিরো মার্কস পাবে? না না, জিরো পেলে কি চলবে নাকি? একজন লোক শখ করে ওকে সংসারের দায়িত্ব দিয়েছে। তার শখটা তো পূরন করতেই হবে। কিভাবে সংসার শুরু করা যায়? রান্না করে নাকি ঘর পরিষ্কার করে? আজ শুরুটা নাহয় রান্না দিয়েই হোক। সোহানকে ফোন করে জিজেস করা দরকার সে কি খেতে চায়? সোহানের নাম্বারে ডায়াল করলো মায়া।
-” হুম মায়া।”
-” ইয়ে বলছিলাম মানে রাতে রান্না করবো। কি রান্না করবো?”
-” তুমি না অসুস্থ?”
-” এখন একটু ভালো আছি।”
-” এখন রান্না করার দরকার নেই। সুস্থ হও এরপর রান্না করো।”
-” করি না একটু।”
-” কি খেতে ইচ্ছে করছে বলো আমি আসার সময় নিয়ে আসবো।”
-” না আমার জন্য না। আপনার জন্য রান্না করতে চাই। আপনার প্রিয় কিছু।”
-” অামার জন্য?”
-” হুম।”
-” কিছু করতে হবে না। তুমি এই অসুস্থ শরীরে অামার জন্য কিছু করতে চেয়েছো এতেই অামি খুশি। খুব বেশিই খুশি হয়েছি।”
-” বেশি কিছু করবো না। শুধু একটা পদের কথা বলেন। অামি তাই করবো”
-” এসব জোরাজোরি অামি একদম পছন্দ করি না মায়া। কাজ করছি। অাজাইরা প্যাচাল বন্ধ করো। যত্তসব …..”
রাগ করে ফোনটা কেটে দিলো সোহান। কি হলো কিছুই বুঝলো না মায়া। পুরো ব্যাপারটা মাথার উপর দিয়ে গেলো তার। মাত্রই না বললো খুব খুশি হয়েছে। তাহলে এমন রাগ দেখালো কেনো? একটু কষ্ট পেলো মায়া। তার কি দোষ? লোকটাই তো বললো এটাকেনিজের সংসার ভাবতে। হতে পারে ব্যস্ত। তাই হয়তো এমনটা করলো।
জোনাকির মুখোমুখি বসে অাছে মায়ার মা বিউটি। জোনাকি পান চাবাচ্ছে অার বিউটির সাথে কথা বলছে।
-” তোর মাইয়্যার তো কপাল খুইল্লা গেছে রে বিউটি।”
-” হ বুবু।”
-” বেডার হাব ভাবে তো লাগতাছে তোর মাইয়্যারে এক্কেবারে তার কাছে রাইখা দিবো। বিয়া-শাদি করবো নাকি? জানোস কিছু?”
-” না তেমন কিছু তো কইলো না।”
-” কেন জানি মনে হইতাছে তুই জানোস। জাইনাও না জানার ভান করতাছোস।”
-” ছিঃ বুবু। কি কন? সত্যিই জানি না অামি।”
-” বুবু…….।”
-” কিরে কুসুম? এমনে হাঁপাইতাছোস ক্যান?”
-” কাজলের ব্যাথা উঠছে। ডাক্তার লাগবো।”
-” এহ্ ডাক্তার লাগবো। ডাক্তার খরচা দিবো কেডা? তোর বাপে? অাজকা সাতমাস ধইরা কাজলের ইনকাম বন্ধ। ওরে উল্টা খাওয়াইতে হইতাছে। ঐ বিউটি যা তো কাজলের কাছে। অার কুসুম তুই ফখরুলরে গিয়া কইবি দাইরে খবর দিতে। অার বিউটি শোন, যদি মাইয়্যা হয় সোজা অামার কাছে নিয়া অাইবি অারযদি পোলা হয় এতিমখানায় দিয়া অাইসা পড়বি। ”
-” বুবু মাস দুয়েক মার কাছে থাকতে দেন। দুধের বাচ্চাটা মা ছাড়া কেমনে থাকবো?”
-” ইশশ, পীড়িত কত্ত! এত পীড়িত কই পাস বিউটি? বাচ্চা একটা লগে ঝুলায়া রাখলে কি বেডারা ওর কাছে যাইবো নাকি? মাইয়্যা হইলে না হয় ছাড় দেওন যায়। পোলা হইলে এক চুলও ছাড় দিমু না অামি। ওর পোলার লাইগা কি অামি অামার ধান্দা লাটে উঠামু? বেহুদা কথা বাড়াইস না তো। যা, কাজলের কাছে যা।”
বিউটি দৌড়েগেলো কাজলের রুমে। ব্যাথায় কোঁকাচ্ছে সে। বিউটি পাশে বসতেই হাত চেপে ধরলো কাজল।
-” বুবু শোনো।”
-” কি রে বইন?”
-” অামার যদি মাইয়্যা হয় তুমি যেমনে পারো অামার মাইয়্যাডারে এইখান থেইকা সরায়া ফালাইবা। ওরা কেউ জানার অাগেই কামডা সারতে হইবো।
-” কেমনে সরামু? ফখরুলরে দেখোস না কারো বাচ্চা হইতে নিলে দরজার বাইরে কেমনে খাড়ায়া থাকে। ”
-” তাইলে বুবু বাচ্চারে লবন খাওয়াইয়া মাইরা ফালাইও। অামি চাই না অামার মাইয়্যাডা এইখানে পইচা মরুক। এখানে পইচা মরার চেয়ে একবারে মইরা যাওয়া ভালো।”
-” কি কস পাগল ছাগলের মতো?”
-” ঠিক কইতাছি বইন। নিজে এতকাল পইচা মরছো। তুমি বুঝো না পইচা মরার কষ্ট কি?”
-” অাইচ্ছা দেখি কি করা যায়। তুই অাল্লাহ রে ডাকতে থাক কাজল। কালেমা পড় বেশি কইরা।”
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কাজশেষ করে অফিস থেকে বেরিয়েছে সোহান। গাড়িতে উঠে হুঁশ হলো মায়ার কথা। ব্যবহারটা কি বেশিই খারাপ হয়ে গেলো? ভালো কথাই জানতে চেয়েছিলো মেয়েটা। রাগ না দেখালেও চলতো। এত রাগ সোহানের অাসে কোথ্থেকে সেটা সে নিজেও বুঝে না।
বাসায় এসে পৌঁছেছে সোহান। ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছে মায়া। ঘরে ঢুকেই মায়ার কপালে হাত দিয়ে দেখলো কপালে জ্বর অাছে কিনা। নাহ, টেম্পারেচার তেমন নেই। হালকা অাছে। সম্ভবত ১০০ ডিগ্রি হবে।
-” মায়া…”
-” জ্বি।”
-” যাও চুল বেঁধে অাসো। অামি ফ্রেশ অাসছি একসাথে রান্না করবো।”
-” অাপনি রান্না করবেন?”
-” অামি একটামেয়ে মানুষের চেয়ে ভালো রাঁধতে পারি। এখন যাও। ভালোমতো চুলটা খোপা করবে। রান্নায় যাতে চুল না পড়ে। খাবার চুল দেখলে অামার মেজাজ বিগড়ে যায়।”
-” জ্বি যাচ্ছি।”
মায়ার খুশি খুশি লাগছে। খুব দ্রুত চুলটা অাটসাট করে বেঁধে কিচেনে চলে এসেছে সে। লোকটা রাগি হতে পারে। কিন্তু ভালো। অনেক ভালো। খুব পছন্দ হয়েছে লোকটাকে মায়ার। এমন মানুষকে মনের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসা যায়। কিন্তু মায়ার ভালোবাসতে বারন। সে যে নষ্ট গলির মেয়ে। ঐ পাড়ার মেয়েদের শুধু ব্যবসা করাই মানায়, ভালোবাসা ব্যাপারটা তাদের সাথে যায় না।
-” চলে এসেছো?”
-” জ্বি।”
-” কি রান্না করতে চাও? ”
-” অাপনার কি পছন্দ?”
-” অামার তো কত কিছুই পছন্দ। তুমি কোনটা ভালো রাঁধতে পারো সেটা বলো।”
-” অামি ডাল ভুনা করতে পারি, অালুভর্তা, ডিমভাজি, অার মাছভুনা করতে পারি।”
-” ব্যস এতটুকুই?”
-” হুম। অার কিছু পারি না।”
-” যাস্ট এই কয়টা মেনু পারো। অার তুমি অামাকে জিজ্ঞেস করছো কি খেতে চাই অামি? যদি বলতাম অামি মোরগ পোলাও খাবো তখন তুমি কি করতে?”
-” শামীম ভাইয়ের কাছ থেকে শিখে নিতাম।”
-” ওর মোরগ পোলাও জঘন্য হয়। অাল্লাহ বাঁচিয়েছে অামি তোমাকে তখন রাঁধতে না করেছি। অার নয়তো ঐ মোরগ পোলাও অামাকে গিলতে হতো।”
-” তাহলে এখন কি করবো?”
-” কি অাবার করবে? অামি তোমাকে শিখাবো। যাও ডিপ থেকে মুরগি নিয়ে অাসো। মুরগি নরম হতে হতে পেঁয়াজ কেটে, চাল ধুয়ে রেডি করি।”
মাথার বা পাশটা চিনচিন ব্যাথা করছে মায়ার। মাথাব্যাথাটা বোধহয় শুরু হচ্ছে। কিন্তু সেদিকে পাত্তা দেয়ার তিল পরিমান শখ নেই মায়ার। সে রান্না শিখতে চায় সোহানের কাছ থেকে ।ভালো একটা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন সময় কাটাতে চায়। ভালোবাসতে বারন, কিন্তু পাশে দাঁড়াতে তো বারন নেই। পেঁয়াজ কাটছে সোহান। পাশে দাঁড়িয়ে মায়া শসা ছিলছে।
-” অাচ্ছা কখনো কাউকে ভালো লাগেনি তোমার?”
-” নাহ। সবাই এক ধাচের ছিলো। কিন্তু হুট করে একজনকে ভালো লাগতে শুরু করেছে।”
-” অামাকে?”
-” মনে হয়।”
-” ভালো লাগার মানুষটা নিঃসন্দেহে অামি। সেটা তোমার মুখ দেখেই বুঝা যায়। এবং সেটা অামি গতরাতেই টের পেয়েছি যখন তুমি অামাকে বলেছো আমার হাত ধরে তুমি ঘুমাতে চাও ।কারও হাত ধরে ঘুমানোর অর্থ জানো? অর্থটা হচ্ছে পাশের মানুষের মধ্যে তুমি নির্ভরতা খুঁজে পাচ্ছো।

পর্ব-০৭
———————————–
সোহান মায়ার প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। খুব সুন্দর ঘ্রান বেরোচ্ছে খাবার থেকে।
-” মায়া, নাও শুরু করো।”
-” অাপনি খাবেন না?”
-” হ্যা খাবো তো। এই যে অামার প্লেটে খাবার বাড়ছি।”
প্রথম লোকমা মুখে তুলেই তিন চার সেকেন্ড থমকে ছিলো মায়া।
-” কি ব্যাপার? খাবার মুখে নিয়ে বসে অাছো কেনো?”
-” অসম্ভব ভালো হয়েছে।”
-” তোমাকে বলেছিলাম না অামি একটা মেয়ে মানুষের চেয়েও বেশি ভালো রাঁধতে পারি।”
-” হুম তাই তাো দেখছি।”
-” নেক্সট উইক তুমি রান্না করে খাওয়াবে। অামি যাস্ট তোমাকে এটা সেটা এগিয়ে দিয়ে হেল্প করবো। কিন্তু রেসিপিটি বলবো না।”
-” ঠিকাছে।”
-” কাল থেকে প্রতিদিন তোমাকে একটা দুটা করে রান্না শিখাবো। ”
-” অাপনি ব্যস্ত মানুষ। অাপনার কি সময় হবে রান্না শিখানোর?”
-” এসব অামি তোমার জন্য না যতটুকু করছি তারচেয়ে বেশি করছি অামার নিজের জন্য। অামি মানুষটা খুব একা। তোমার সাথে সময় কাটাতে পারলে অামার ভালো লাগবে।”
এতদিন মায়ার ধারনা ছিলো টাকা থাকলেই বুঝি সব সুখ পায়ের কাছে পড়ে থাকে। ধারনাটা পুরোপুরি ভুল। টাকা থাকলেও মানুষের মনে কষ্টথাকে। একাকিত্বের কষ্ট টাকায় ঘুঁচে না।
-” অাপনার তো এত টাকা। তবু অাপনি একা কেনো? পয়সাওয়ালা লোকের পিছনে তো মেয়েদের লাইন লেগে থাকে।”
-” সমস্যাটা তো সেখানেই মায়া। সব টাকার পিছনে ছুটে। অামার পিছনে ছুটে না। টাকা অাছে তো অামার অস্তিত্ব অাছে, টাকা নেই তো অামার অস্তিত্বও নেই। মন থেকে কেউ কাছে টানে না। একটাবার কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে না, সোহান তুই ভালো অাছিস তো?”
কষ্ট হচ্ছে সোহানের জন্য। এত টাকা থেকে লাভ কি যদি না কেউ সুখের দেখা না পায়?
কিছুক্ষন অাগে কাজলের সন্তান পৃথিবীর মুখ দেখেছে। মেয়ে হয়েছে তার। রুমে বসে থাকা দাই বাদে বাকি সবার মুখ কালো। মেয়ের অাশা তারা কেউ করেনি। বিউটি কুসুমকে নিয়ে বুদ্ধি বের করছে কিভাবে এই বাচ্চাকে এখান থেকে সরানো যায়। দাইকে না হয় টাকা পয়সা খাইয়ে মুখ বন্ধ করানো যাবে। কিন্তু ফখরুল? ওকে কি করবে? ও গো ঘরের বাইরে পায়চারি করছে। মেয়ের ছোট অাঙুলগুলো ধরে কাঁদছে কাজল। মেয়ে হওয়ার কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো? এখান থেকে বাচ্চাটাকে বের করার কোনো উপায় নেই। কাজল চায়না ফের এই গলিতে কোনো মায়া অথবা কুসুম অথবা চুমকি তৈরী হোক। এই মেয়েগুলো জন্মসূত্রে পতিতা। অারও এমন অনেক অাছে এখানে যারা জন্মসূত্রে এই ব্যবসায়ী। কাজল দেখেছে তাদের মায়েদের চাপা কান্না যখন তাদের মেয়েদের ঐ লোকগুলোর হাতে একা রুমে তুলে দেয়া হতো। সবচেয়ে কম বয়সে কাজে লাগানো হয়েছিলো কুসুমকে। মাত্র বারো বছর ছিলো মেয়েটার। অাটাশ বছর বয়সী কোনো এক যুবকের তৃষ্ঞা মেটাতে তাকে পাঠানো হয়েছিলো এই বাড়ির পূর্ব দিকের ঘরটাতে। ঘরের ভিতর চিৎকার করছিলো কুসুম অার বাহিরে ওর মা। ওদের চিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে যাচ্ছিলো। অতটুকুন মেয়ে, যার বয়স ছিলো দুই বেনি করে বাড়ির উঠানে খেলার, সেই মেয়েকে পাঠানো হয়েছিলো কোনো এক দানবের ভোগের বস্তু হওয়ার জন্য। হ্যা দানব, সেই অাটাশ বছরের যুবকটাকে সেদিন কুসুমের কাছে দানব ছাড়া অার কিছুই মনে হয়নি। মানুষ খেঁকো দানব। না, মানুষ খেঁকো না শরীর খেঁকো দানব। টানা চার ঘন্টা কুসুমের উপর দিয়ে কোন তুফান গিয়েছিলো সেটা মনে হলে কুসুম এখনও ঘোরের মাঝে লাফিয়ে উঠে। মায়ারও একই হাল হয়েছিলো। তবে ওর বয়সটা একটু বাড়তি ছিলো যখন ওকে ধান্দায় নামানো হয়। সম্ভবত চৌদ্দ কি সাড়ে চৌদ্দ ।ওকে এক প্রকার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো কাস্টমারের কাছে। কাজলের মেয়েরও একদিন এমন পরিস্থিতি অাসবে, কুসুমের মায়ের মতো তাকেও একদিন মেয়ের রুমের বাইরে বসে তার বাচ্চার অার্তচিৎকার শুনতে হবে। এসব সহ্য করার মতো ক্ষমতা তার নেই। খাটের পাশে থাকা ড্রেসিং টেবিলটার উপর ধারালো ব্লেড চিকচিক করছে। কিছুক্ষন অাগেই এই ব্লেডটা দিয়ে নাড়ি কেটে অালাদা করা হয়েছে ওর সন্তানকে। খুব ধীরে ধীরে উঠে বসলো কাজল। দাই, বিউটি অার কুসুম মিলে খুব ধীর অাওয়াজে কি যেনো বলা বলি করছে। টেবিলের উপর থেকে ব্লেডটা হাতেনিলো কাজল। খুব অাস্তে করে মেয়ের গলায় ব্লেডটা দিয়ে শুধু একটা অাঁচড় কাটলো। যে ব্লেড দিয়ে নাড়ি কাটা হয়েছিলো সেটা দিয়েই নিজ সন্তানের গলার রগ কাটলো কাজল। বাচ্চাটা জোরে একটা চিৎকার দিয়ে থেমে গেলো। অার কোনো অাওয়াজ তার গলা থেকে অাসছে না। কিছুটা ছটফট করছে সে। কচি হাত পা গুলো এদিক সেদিক ছড়াচ্ছে। একটা পর্যায়ে চার হাত পা লম্বা করে টেনে নিঃশ্বাসটা পুরোপুরি ছেড়ে দিলো বাচ্চাটা। এতক্ষন বাকি তিনজন চোখ বড় করে বাচ্চাটার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। বাচ্চার চিৎকার শুনে তিনজনই তাকিয়ে ছিলো বাচ্চার দিকে। তাকিয়ে দেখে কাজলের হাতে রক্তমাখা ব্লেড অার বাচ্চার গলায় রক্ত। ঘটনা চোখের সামনে একদম স্পষ্ট ছিলো তবু তাদের কাছে অস্পষ্ট লাগছিলো। সামনে এগিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী এক শিশুকে অাগলে নিতে সাহস হচ্ছিলো না তাদের। নিঃশ্বাস ত্যাগের পর ঘোর কাটলো কুসুমের। কাজলের মুখে মাথায় এলোপাথারি চড় থাপ্পর দিচ্ছে সে।
-” ***** কি করলি তুই এইডা? ঐ **** মারলি কেন মাইয়্যাডারে তুই?”
-” মইরা গিয়া বাঁইচা গেছে অামার মাইয়্যা। অামাগো মতো পইচা মরতে হইবো না ওর।”
কাজলের চোখেমুখে বিন্দুমাত্র কষ্টের ছোঁয়া নেই। ওর চেহার স্বস্তির শান্তি দেখা যাচ্ছে।
রাতে ঘুমানোর অাগে কফি খাওয়ার অভ্যাস অাছে সোহানের। গরম কফির মগে চুমুক দিচ্ছে অার টিভি দেখছে। মায়া নিজেকে প্রস্তুত করছে সোহানের জন্য। মানুষটা এখন পর্যন্ত ওর গায়ে হাত দেয়নি। হতে পারে অসুস্থ ছিলো তাই। অাজ নিশ্চয়ই ওকে বসিয়ে রাখবে না তার অধিকারটা চাইতে অাসবে নিশ্চয়ই। ইতিমধ্যে জোনাকিকে পঞ্চাশ হাজার দেয়া হয়ে গেছে। অার ওরপিছনে অনেক টাকাই খরচ করেছে সোহান টাকাগুলোতো এমনি এমনি অার খরচ করেনি। এগুলো তো সে অবশ্যই উসুল করবে। খানিকটা সেজেগুজে সোহানের পাশে যেয়ে বসলো মায়া। ওর দিকে একনজর দেখেই পরক্ষনে মুখ ফিরিয়ে টিভির স্ক্রিনে নিয়ে গেলো সোহান। টিভিরদিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো,
-” ফুল প্রিপারেশন নিয়ে এসেছো মনে হচ্ছে।”
-” ……………”
-” দেখো, হুট করেই কারো গায়ে হাত দেয়াটা অামার পছন্দ না। এখানে এসেছো। কিছুদিন থাকো। দুজন দুজনকে বুঝি এরপর নাহয় দেখা যাবে।”
-” অাপনি তো অনেকগুলো টাকা দিয়ে এসেছেন।”
-” তো?”
-” টাকা উসুল করবেন না?”
-” দেখো অামি কিন্তু তোমাকে এখানে শুধু ফিজিক্যাল রিলেশনের জন্য অানিনি। তোমাকে এখানে অানার মূলউদ্দেশ্য হচ্ছে একাকিত্বটা দূর করা। অামার টাকা উসুল করা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। অামার টাকা কিভাবে উসুল করবো সেটা অামারটা অামি বুঝবো।”
সোহানকে যত দেখছে তত মায়ার বিস্ময়ের মাত্রা বেড়েই যাচ্ছে। এমন মানুষও অাছে নাকি দুনিয়ায়? একটা যুবতি মেয়ে হাতের কাছে এসে ধরা দিচ্ছে অার সে কি না বলছে হুট করে কারো গায়ে হাত দেয়া তার পছন্দ না? সোহানকে বিরল প্রজাতির প্রানী মনে হচ্ছে মায়ার।
-” অামার সাথে একটু কথা বলবে মায়া?”
সোফায় পা উঠিয়ে বসতে বসতে হাসিমাখা মুখে মায়া বললো,
-” অবশ্যই বলবো। একটু কেনো? অনেক অনেক কথা বলবো।”
-” অাঠারো বছর অাগের ঘটনা। অামার রেজাল্ট দিয়েছিলো সেদিন। ফাইনাল এক্সামের রেজাল্ট। ফার্স্ট হয়েছিলাম। অাম্মুকে বলেছিলাম, অামি ফার্স্ট হয়েছি। অামি চিকেন ফ্রাই খাবো। অামাকে চিকেন ফ্রাই করে দাও। অাম্মু বললো চলো তোমাকে বাহির থেকে খাইয়ে নিয়ে অাসি। অামি বললাম, তোমার হাতেরটা খাবো। দোকানেরটা খাবো না। অাম্মু উত্তরে কি বলেছিলো জানো?”
-” কি?”
-” মুরগীতে মসলা মাখাতে গেলে হাতে মসলার দাগ বসে যাবে। মসলার বাজে স্মেল অাসবে হাত থেকে। অহেতুক হাতের চামড়া নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না। অামি পাল্টা অারকিছু বলিনি। অাসলে বলার কিছুই ছিলো না। জোর করে তো অার কারো কাছ থেকে ভালোবাসা অাদায় করা যায় না। তাই অামিও অার জোর করিনি। যে ভালোবাসার সে এমনিতেই বাসবে। সোজা ফ্রিজ থেকে মুরগি নামিয়ে মসলা মেখে নিজেই ফ্রাই করেছি। তখন তো রান্না সম্পর্কে বিশেষ অাইডিয়া ছিলো না। ঘরে যত ধরনের মসলা ছিলো সবগুলো থেকে একটু একটু করে দিয়েছি। বানিয়ে এনে সবার অাগে অাম্মুকে দিয়েছি। অাম্মুকিছুক্ষন মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো।অামি বললাম, খেয়ে দেখো। মুখে নিয়ে বললো খুব ভালো হয়েছে। তখনঅামি বললাম, নাও এই সবগুলো চিকেন ফ্রাই তোমার। মসলার স্মেল অামার হাতেও লেগে অাছে । এই দেখো হাতে হলুদের দাগ ভরে গেছে। কিন্তু অামি তোমার মতো নাক ছিটকাচ্ছি না। অার কখনো তোমাকে বলবো না অামাকে কিছু বানিয়ে খাওয়াও । এখন থেকে নিজেরটা নিজেই বানিয়ে খাবো। তোমার কিছু খেতে ইচ্ছে হলে অামাকে বলো। অামি তোমাকে বানিয়ে দিবো। এরপরদিনই যেয়ে রান্নার বই কিনে এনেছিলাম। প্রতিদিন কিছু না কিছু এক্সপেরিমেন্ট করতাম। কতবার যে হাত পুড়েছি তার কোনো হিসাব নেই।”
-” একদিন রেঁধে খাওয়ালে কি হতো? একদিনে কি অার চামড়া নষ্ট হয়?”
-” উহুম। অামার মা এক সেকেন্ডও চুলার পাশে যেতে রাজি না। সে খুব চামড়া সচেতন মানুষ। প্রতিমাসে কত হাজার টাকা যে পার্লারে খরচ করে অাল্লাহ ভালো জানে। সেই হিসাব বোধহয় অাম্মুর নিজেরও জানা নেই। অাচ্ছা তোমার কি মাথা ব্যাথা করছে?”
-” কিছুটা। অাপনি জানলেন কিভাবে?”
-” তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে। তুমি যাও গিয়ে ঘুমাও।
-” না একটু গল্প করি না প্লিজ। ”
-” মাথাব্যাথা নিয়ে গল্প করার দরকার নেই। মাথাব্যাথা অারও বাড়বে।”
-” অামার ভালো লাগছে অাপনার সাথে গল্প করতে।”
-” অাচ্ছা তাহলে রুমে চলো। শুয়ে গল্প করবে”
মায়ার রুমে বিছানায়বসে অাছে সোহান। পাশে শুয়ে অাছে মায়া। সোহানের হাত ধরে রেখেছে সে। সোহান গল্প বলছে। অার খুব মন দিয়ে সেই গল্প মায়া শুনছে ।

পর্ব-০৮
———————————–
খুব ভোরে ঘুম ভেঙেছে মায়ার। চোখ মেলে দেখে সোহানের পায়ের উপর ওমাথা রেখে শুয়ে অাছে। অার সোহান হেলান দিয়ে বসে ঘুমুচ্ছে। ঘুম ভাঙার পরও সেখান থেকে সরছিলো না মায়া। ভালো লাগছে এভাবে ওর পায়ের উপর মাথা রেখেশুয়ে থাকতে। গতরাতে গল্প করতে করতে কখন ও ঘুমিয়ে পড়েছে সেটা ওর নিজের জানা নেই। হয়তোবা সোহানও কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সোহানের মুখের দিকে তাকিয়ে অাছে মায়া। মানুষটা দেখতে সুন্দর। বিশেষ করে মাথার চুলগুলো। একদম সোজা চুল। একটুও কোঁকড়া না। মাথার চুলগুলো ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে মায়ার। ধরাটা কি উচিত হবে? সোহান গতকাল বলেছিলো হুট করে কারো গায়ে হাত দেয়াটা তার অপছন্দ। তাহলে নিশ্চয়ই এভাবে চুলে হাত দেয়াটাও সে পছন্দ করবে না। অার ও যে এভাবে শুয়ে অাছে এটা কি ঠিক হচ্ছে? বোধহয় না। সোহান ঘুম থেকে উঠে যদি দেখে মায়া এভাবে ওর পায়ের উপর শুয়ে অাছে তাহলে নিশ্চয়ই খারাপ ভাববে। নাহ এভাবে শুয়ে থাকাটা ঠিক হবে না। উঠে যাওয়াটাই ভালো হবে।
ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে দেখে সোহান রুমে নেই। বোধহয় ঘুম থেকে উঠে চলে গেছে নিজের রুমে। ফুলগাছগুলোর কাছে গেলো মায়া। সাদা গোলাপের গাছটায় একটা নতুন কলি এসেছে। দু তিন দিন বাদেই বোধহয় ফুটবে কলিটা। গত পরশু থেকে একটা কথা মাথায় বারবার ঘুরছে। সেটা হচ্ছে সংসার। সংসার শুরু করতে হবে মায়াকে। অাচ্ছা সংসার কি?সংসার কেমন হয়? এ ব্যাপারে কিছুই জানে না মায়া। তবে নতুন এক অনুভুতির সাথে পরিচিত হচ্ছে সে। সংসার নামক অনুভূতি। গত পরশু থেকে অনুভূতিটা পাচ্ছে ও। অনুভূতিটা বড্ড অদ্ভুদ। ভয় এবং ভালোবাসার সংমিশ্রনে তৈরি অনুভূতি। তবে ভয়ের চেয়ে ভালোলাগার অনুভূতিটাই বেশি। অায়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মায়া। সংসারি মেয়ে মানে গৃহিনীদের দেখতে কেমন দেখা যায়? গৃহিনীদের দেখলে চট করে লোকে বলে দিতে পারে মেয়েটা একজন গৃহিনী। নাকটা ফুটো করা নেই ।মায়ার হাতে চিকন একজোড়া চুড়িও নেই। গৃহিনী হতে গেলে তো নাকে ফুল অার হাত একজোড়া চুড়ি থাকতে হবে। লোকটা বলেছিলো অাজ থেকে যা কিছু প্রয়োজন সব ওর কাছে চাইতে। সোহানকে কি বলবে কিনে দিতে? বলাটা কি উচিত হবে? নাহ। সেসব বলা যাবে না। সোহান ওকে লোভি ভাবতে পারে।
-” অায়নায় নিজেকে খুঁটে খুঁটে কি দেখছো?”
পিছনে ফিরে তাকালো মায়া। দুহাতে দুটো মগ হাতে ঘরে ঢুকছে সোহান।
-” নাও তোমার লাল চা।”
হাত বাড়িয়ে মগটা নিতে নিতে খাটে বসলো মায়া। পাশেই পা ঝুলিয়ে বসেছে সোহান।
-” বললে না তো অায়নায় ওভাবে কি দেখছিলে?”
-” নাহ তেমন কিছু না।”
-” তোমাকে তো দেখলাম গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু ভাবছিলে অায়নায় তাকিয়ে? কিছু হয়েছে?”
-” না কিছু না।”
-” কিছু বলতে চাও অামাকে?
-” না না। কিছু না।”
-” বলতে চাচ্ছো না। ঠিকাছে। জোর করবো না। চা ভালো হয়েছে?”
-” হুম।”
-” কাল থেকে তুমি অামার জন্য কফি বানাবে। অার অাস্তে অাস্তে অামার সমস্ত ব্যাপারগুলো খেয়াল দেয়া শুরু করো। অামি অফিস যাওয়ার অাগে অামার কাপড় তুমি সিলেক্ট করবে। সারাদিনে কয়েকবার অামাকে ফোন দিয়ে অামার খোঁজ নিবে। ঘরের বাজার থেকে শুরু করে কারেন্ট বিল পর্যন্ত সমস্ত হিসাব তুমি দেখবে। ঘরে কখন কি রান্না হবে সেগুলো তোমার ফরমায়েশ অনুযায়ী হবে। ঘরে যদি নতুন কোনো ফার্নিচার প্রয়োজন মনে করো তাহলে অামাকে বলো অামি কিনে দিবো।”
-” অাচ্ছা।”
-” অাজকে অফিস যাবো না। তোমাকে নিয়ে স্কুলে যাবো তোমার এডমিশনের ব্যাপারে কথা বলতে। কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলে তুমি?”
-” এইট পর্যন্ত। নাইনে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু ক্লাস অার করতে পারিনি।
-” ঠিকাছে। ইংলিশে কেমন ছিলে তুমি?”
-” হুম ভা…….”
কথাটা শেষ করার অাগেই ফোন বেজে উঠলো মায়ার। ফোনটা রিসিভ করলো মায়া। ওপাশ থেকে ফুপিয়ে কাঁদার শব্দ পাচ্ছে ও।
-” কাঁদো কেনো অাম্মা?”
-” কাজলের একটা মাইয়্যা হইছিলো গতকাল রাইতে। বড় হয়া ওরেও বেশ্যাগিরি করতে হইবো এর লাইগা
কাজল ওরে মাইরা ফালাইছে।জানোস মায়া ঐটুক মাইয়্যাডার গলায় জল্লাদটা ব্লেড দিয়া কাটছে। বাচ্চাটা একটা চিৎকার দিয়া কতক্ষন ছটফট করছে এরপর মইরা গেলো। ”
দম বন্ধ হয়ে অাসছে মায়ার।দুচোখ বেয়ে অঝরে পানি ঝড়ছে। সোহান কফি খাওয়া বাদ দিয়ে মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে অাছে।
-” এখন অামার কি মনে হইতাছে জানোছ? তোরেও ছোট থাকতে মাইরা ফেলার দরকার ছিলো। তাইলে তোরে অাজকা বেশ্যা হইতে হইতো না। অামাগো জিন্দেগিটা অনেক খারাপ রে মায়া। এই জিন্দেগি করার চেয়ে মইরা যাওন ভালো। অামারও মইরা যাওয়াউচিত অাছিলো। কিন্তু সাহস করতে পারি নাই। মরতে গেলে অনেক সাহস লাগে।”
-” বাচ্চাটা কি মাটি দিয়ে দিছে?”
-” হ ভোরে মাটি দিছে।”
অার কথা বাড়ালো না মায়া ফোনটা কেটে দিলো। মায়ার মাথায় হাত রেখে সোহান বললো,
-” কি হয়েছে মায়া? কেউ কি মারা গেছে?”
মায়া কাঁদছে। কোনো উত্তর দিচ্ছে না। সে বুঝতে পারছে এখন ওকে কাঁদতে দেয়া উচিত। খানিকক্ষন বাদে না হয় ওকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা যাবে। সোহান লক্ষ্য করলো মায়া ওর হাত চেপে ধরে কাঁদছে। মায়াকে জড়িয়ে ধরলো সোহান। ওর মাথায় খুব অাস্তে করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষন বাদে মায়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো সোহানের বাহুডোর থেকে। কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে মায়া।
-” অামাকে কি বলা যায় কি হয়েছে?”
-” অামার পাড়াতে একটা অাপা ছিলো। কাজল অাপা। উনি প্রেগনেন্ট ছিলেন। গতরাতে উনার মেয়ে হয়েছিলো। উনি মেরে ফেলেছে মেয়েটাকে।”
-” কেনো মেরেছে জানো? কারন ও চায়নি ওর মেয়েটারও ওর মতো হাল হোক।”
-” অাপনি কিভাবে জানেন?”
-” এমন গল্প অামি অাগেও শুনেছি। এমন ঘটনা অারও দুজন ঘটিয়েছিলো।”
-” একদিকে ভালোই হয়েছে। অামাদের মতো বাচ্চাটাকে একটুএকটু করে শেষ হতে হবে না। মরার অাগেই নরকের শাস্তি ভোগ করতে হয় অামাদের। মাঝে মাঝে এমন কিছু কাস্টমার অাসে এদের অাচরন দেখলে মনেহয় অামরা মুরগি অথবা খাসীর রানের পিস। মনের খায়েশ মিটিয়ে শরীরের যেখানে সেখানে কামড়াতে থাকে। একবার তো এক কাস্টমারের কামড়ে অামার হাতে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছিলো। দাগ এখনও যায়নি। এমন জীবন কাটানোর চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। উচিত কাজ করেছে কাজল। ওর জায়গায় অামি হলে ঠিক এই কাজটাই করতাম।”
-” পানি খাবে?”
-” না।”
-” যা হয়ে গেছে তা তো বদলাতে পারবে না মায়া। সামনে দেখি তোমাদের মতো মানুষের জন্য কিছু করতে পারি কিনা।”
কথাটা বলেই সেখান থেকে সরে গেলো সোহান। সেখানে অার বসতে ইচ্ছে হচ্ছে না তার। কারো কষ্ট সহ্য করতে পারে না সে। তবে মনের কষ্ট মনে রাখতেই ভালোবাসে। লোকের সামনে প্রকাশ করাটা তার কাছে খুবই লজ্জাজনক মনে হয়। সবারসামনে ভাবখানা এমনদেখায় মনে হয় কিছুই হয়নি ।
অাজ দুপুরে মায়াকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে এসেছে সোহান। ওর জন্য দুটো টিচার রাখা হয়েছে। বিকালে একজন পড়িয়ে গেছে। এখন অারেকজন পড়াচ্ছে। কিছুক্ষন অাগে অফিসের একজন স্টাফ এসেছে সোহানের বাসায়। অার্জেন্ট কিছু ফাইল সিগনেচার করাতে এসেছেন তিনি। ড্রইং রুমে বসে সোহান ফাইল দেখছে অার স্টাফ সাঈদ মায়ার রুমে একনজরে তাকিয়ে অাছে। ব্যাপারটা চোখে পড়লো সোহানের।
-” ওদিকে কি দেখছেন সাঈদ সাহেব?”
-” স্যার এই মেয়েটা কি হয় অাপনার?”
-” অামার ওয়াইফ। কেনো?”
-” এটা ওয়াইফ?”
-” কোনো সমস্যা?”
-” স্যার অাপনি ভালো করে খোঁজ নিয়ে বিয়ে করেছেন তো?”
-” হ্যা করেছি।”
-” এটা কি করে হয়? স্যার অাপনাকে বোধহয় মিথ্যা ফলে বিয়ে করেছে এই মেয়ে।”
-” সমস্যাটা কি সেটা তো বলবেন।”
-” এ তো…. ইয়ে মানে…. এই মেয়েটা প্রস্টিটিউট স্যার।”
-‘ অাপনি জানেন কিভাবে?”
-” অামি ওদের ওখানে প্রায়ই যাই। ও ভালো না স্যার।”
-” অাপনি ভালো?”
-” জ্বি?”
-” জিজ্ঞেস করলাম অাপনি ভালো কি না? ভাব তো এমন দেখাচ্ছেন মনে হচ্ছে অাপনি পবিত্র পুরুষ। একটা মেয়ে প্রস্টিটিউট হয় কিভাবে জানেন? একটা পুরুষের সাথে টাকার বিনিময়ে এক বিছানায় শুয়ে। এক মেয়ে অারেক মেয়ের সাথে ঘেষাঘেষি করে তো অার প্রস্টিটিউট হয়নি। অাপনার মতো অতিমাত্রার পবিত্র পুরুষের সংস্পর্শে এসেই এরা প্রস্টিটিউট হয়। অার অামি নিজে ওকে ঐ পাড়া থেকে তুলে এনেছি। ঐ পাড়ায় তো ভালো লোক যায় না। যায় খারাপ লোকেরা। তারমানে অামিও খারাপ। ওর অার অামার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই সাঈদ সাহেব। তবে অাপনার ক্ষেত্রে উল্টোটা হয়েছে। অাপনার বউটা কিন্তু খুব ভালো। কিন্তু অাপনি?”
-” স্যার অাজ অামি অাসি। বাসায় যেয়ে বাকি কাজটা কমপ্লিট করতে হবে।”
কথাটা বলে সাঈদসাহেব ফাইল হাতে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে সোহান ডেকে বললো,
-” সাঈদ সাহেব, অাজকের কথাগুলো অাপনার অামার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেই খুশি হবো।”
-” জ্বি স্যার। কথা বাহিরে যাবে না।”
মায়ার রুমে যেয়ে ওর নতুন টিচারকে সোহান জিজ্ঞেস করলো,
-” স্টুডেন্ট কেমন মাহিন?”
-” বেশ শার্প। এত অাগের পড়া গ্রামারগুলো এখনও মুখস্ত রেখেছে। একবছর প্র্যাক্টিস না করলেই সাধারনত মনে থাকে না। কিন্তু ও দেখছি সবমনে রেখেছে।”
-” কি মনে হয়? মাস দুই তিনেকের মধ্যে দৌড়ে ইংলিশ বলতে পারবে তো?”
-” অাশা করছি হবে।”
-” পড়ানো শেষ?”
-” না অারো পনেরো বিশ মিনিট লাগবে।”
-” অাজকে ওকে ছুটি দিয়ে দাও। একটু বাহিরে যাবো।”
-” জ্বি ভাইয়া।”
-” মায়া, যাও গিয়ে রেডি হও। অামি ওর সাথে কথা বলি।”
-” ভাইয়া বিয়ে করলেন, অথচ কিছুই জানালেন না?”
-” রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হুট করে দেখলাম একটা সুন্দর পরী পৃথিবীর রাস্তায় হাটাহাটি করছে। অামি ভাবলাম ডানা ভেঙে পড়ে টরে গেলো কিনা। দৌড়ে গেলাম হেল্প করতে। যেয়ে বললাম, অাপনার ভাঙা ডানাটা কোথায় পড়েছে বলেন। অামি এনে জোড়া লাগিয়ে দিচ্ছি। মেয়ে তো অামার মুখের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে অাছে। চিন্তা করলাম পৃথিবীতে নতুন তাই হয়তো অামাকে উদ্ভট লাগছে। ফের বলতে লাগলাম, অাপনি তো পরী। ডানা ছাড়া বেশিক্ষন থাকলে ঝামেলা হতে পারে। জলদি বলুন ডানা কোথায়? কিছুক্ষন পর পরী মুখ খুলে বললো, সে নাকি পরী না। সে মানুষ। অামাকে অার পায় কে? পরদিনই ধরে বেঁধে ওকে বিয়ে করে ফেলেছি।”
-” হা হা হা। জানিনা কতটুক সত্যি বলেছেন। তবে গল্পটা মজার ছিলো।”
-” শোনো বিয়ের বয়স হয়েছে অামার। অার কত একা ঘুমাবো? অফিস থেকে ঘরে ফিরলে ঘরটা খালি লাগে। তাই মেয়ে পছন্দ হওয়ার সাথে সাথে বিয়েটা করে ফেললাম।”
দরজার অাড়াল থেকে কথাগুলো শুনেছে মায়া। কাপড় হাতে নিয়ে সোহানের রুমে যাচ্ছে অার ভাবছে, সোহান সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে ও সোহানের বউ। কাজটা কি ঠিক করছে সোহান?

পর্ব-০৯
———————————–
রেস্টুরেন্টে বসে অাছে মায়া অার সোহান। গরম ধোঁয়া উঠা স্যুপে একটু একটু করে চুমুক দিচ্ছে সোহান। অার মায়া চামচ দিয়ে স্যুপ নাড়াচাড়া করছে।
-” না খেয়ে কি ভাবছো? খাওয়া শেষ করে এরপর চিন্তা ভাবনা করো।”
-” অাপনি সবাইকে একথা কেনো বলছেন অামি অাপনার বউ?”
-” তোমাকে তো অামি প্রথমদিনই বলেছি তুমি অামার বউয়ের মতো অামার কাছে থাকবে।”
-” অামি বউয়ের মতো করে থাকবো কিন্তু বৌ না। বৌয়ের মতো অার বৌ তো এক ব্যাপার হলো না।”
-” তাহলে তুমি কি চাচ্ছো? তোমাকে বৌ হিসেবে পরিচয় না করাই?”
-” সেটা বলিনি। অামি বলছি যে অাজীবন তো অার অামাকে অাপনার কাছে রাখবেন না। কিছুদিন পর বিয়ে শাদী করবেন। সংসার হবে অাপনার। তখন তো অার অামার প্রয়োজন পড়বে না। তখন লোককে কি বলবেন? তাছাড়া লোকমুখে অাপনার সত্যিকারের বউ তো জেনেই যাবে অাপনি অাগে বিয়ে করেছিলেন।”
-” তোমাকে কে বললোষঅামি অন্য কাউকে বিয়ে করবো? সংসার করবো? সংসার করার জন্যই তো তোমাকে ধরে এনেছি। নতুন করে অাবার অন্য কাউকে ধরে অানার কি হলো?”
-” তবুও…….”
-” তোমাকে অামি অামার ওয়াইফ হিসেবে ইনট্রোডিউস করাচ্ছি এটা কি তোমার ভালো লাগছে না? না লাগলে বলো অার কখনো বলবো না”
-” সেটা বলিনি। বলছি যে লোকে কি বলবে?”
-” শোনো লোকের ধার অামি ধারি না। কে কি বললো না বললো সেসব নিয়ে অামি ভাবি না। তুমি কি চাও সেটা বলো? বউ হিসেবে পরিচিতি পেতে চাও নাকি মিসট্রেস হিসেবে?”
-” অাপনি যেভাবে ডাকতে চান সেভাবেই চলবে।”
-” ব্যস এটা নিয়ে অার কোনো তর্ক হবে না। চুপচাপ খাও।”
রাতে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে চুপচাপ শুয়ে অাছে মায়া । সোহানের মতিগতি মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে ওর। কি থেকে কি ঘটছে বুঝে উঠতে পারছেনা ও। এখন পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেনা সোহান। তাহলে ওকে এখানে এনেছে কেনো? সাজিয়ে রাখার জন্য? ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লো মায়া। খাটে এপাশ ওপাশ করছে সোহান। ঘুম অাসছে না ওর। কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে ভালো লাগতো। মায়া তো অাছে। ওকে ডাকলেই তো হয়। মায়ার রুমে এলো সোহান। ঘুমুচ্ছে মেয়েটা। কত্ত অারামের ঘুম। সোহান ছটফট করছে অার মায়া ঘুমাচ্ছে সেটা কি করে হয়? মায়াকেও জাগতে হবে। মায়ার কাঁধে অালতো করে ধাক্কা দিচ্ছে সোহান।
-” এই উঠো।”
-“………….”
-” মায়া…. এই মায়া উঠো।”
ঘুর থেকে লাফিয়ে উঠে বসলো মায়া।
-” হুম? জ্বি? কোনো সমস্যা?”
-” অারে ভয় পাচ্ছো কেনো? অামি এসেছি।”
-” হুম বুঝেছি তো।”
-” ঘুম অাসছে না। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও তো।”
মায়ার পায়ের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লো সোহান। সোহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মায়া।
-” মায়া…..”
-” হুম।”
-” অামাকে তোমার কেমন লাগে?”
-” খুব ভালো।”
-” জানো শুরুতে সবাই এই কথাই বলে। যখন অামার রাগটা দেখে তখন অামার সাথে অার কেউ মিশতে চায়না। যারা মিশে তারা প্রয়োজনে মিশে অামার সাথে। একদিন হয়তো রাগের মাথায় তোমাকেও গালি দিবো। এরপর তুমিও অামাকে খারাপ ভাববে।”
-” অামি গালি শুনে অভ্যস্ত।”
-” যারা তোমাকে গালি দিয়েছে তাদের তুমি অাগে থেকেই খারাপ জানতে। কিন্তু তুমি তো অামাকে ভালো মনে করো। পরে যখন অামার মুখে গালি শুনবে তখন তোমার ঠিকই খারাপ লাগবে।”
-” যখন গালি দিবেন তখন না হয় বুঝবো।”
–” একটা কথা বলি?”
-” হুম।”
-” তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাই?”
-” অাপনার ইচ্ছা।”
-” তোমার কোনো ইচ্ছে নেই?”
-” অামাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা নামের কিছু নেই।”
-” তোমাকে অামি অামার ওয়াইফ হিসেবে ট্রিট করছি মায়া। প্রস্টিটিউট হিসেবে না। সো তোমার ইচ্ছাটা অামার জন্য অনেক বড় কিছু ম্যাটার করে।”
-” যদি না করি?”
-” অামার রুমে চলে যাবো।”
-” অাপনি এখানেই ঘুমাবেন। অামার সাথে।”
-” তাহলে তুমি অামাকে পারমিশন দিচ্ছো?”
-” হুম দিচ্ছি।”
মায়ার পায়ের উপর থেকে সরে বালিশে এসে শুয়ে পড়লো সোহান। মায়াকে টেনে নিলে নিজের বুকে। সোহানের সবকিছু ভালো লাগে মায়ার। বিশেষ করে মায়ার প্রতি যে সম্মানটা দেখায় সেটা মায়ার খুব পছন্দ। প্রতিটা মানুষেরই কোনো না কোনো খারাপ দিক থাকে। সোহানেরও অাছে। রাগটা না হয় তার একটু বেশি রেগে গেলে মুখে লাগাম থাকে না। সে তো মানুষ। ফেরেশতা তো অার না। এমন লোকের সাথে চোখ বন্ধ করে সারাজীবন পাড়ি দেয়া যায়। তাহলে ঐ তিনটা মেয়ে কেনো ওকে ফেলে চলে গেলো। একটা বাজে দিকের জন্য কি মানুষটার বাকিসব ভালো গুনগুলো তাদের কাছে ধামাচাপা পড়ে গেলো? সম্মান….। মায়ার কাছে শব্দটা প্রচন্ড রকমে ভারী মনেহয়। সম্মান কখনো সে কারো কাছে পায়নি। তাই কথাটা তার কাছে খুব মূল্যবান। অাঠারো বছরের জীবনে প্রথম কোনো পুরুষ ওকে সম্মান দিচ্ছে। এতকাল যারা অসম্মান করতো তারাও পুরুষ ছিলো। অার এখন যে সম্মান দিচ্ছে সেও একজন পুরুষ। তার প্রগি ঘৃনা বা ক্ষোভ জন্মায় না। জন্মায় ভালোবাসা,শ্রদ্ধা। সোহানের প্রতিটা ব্যাপারের প্রতি প্রেমে পড়ে যাচ্ছে মায়া। নিজেকে কোনোভাবেই অাটকাতে পারছে না। সে ভালো করেই জানে প্রেম ভালোবাসার অধিকার তাদের নেই। তবু ভালোবাসাটা তৈরী হচ্ছে। হতে পারে ভালোবাসা প্রকাশ করার ক্ষমতা বা অধিকার কোনোটাই তার নেই। কিন্তু ভালোবাসাটা মনের ভিতর তো চেপে রাখা যেতেই পারে। মুখে না অানলেই হলো। এমন মানুষকে কি ভালো না বেসে অাদৌ থাকা সম্ভব? মানুষটার বুকের ধুক-ধুক শব্দ শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সোহানের হৃদস্পন্দেরও প্রেমে পড়ে যাচ্ছে সে। অাচ্ছা এই ভালোবাসার পরিনতি কি হতে পারে? ভালো পরিনতি হবে না সে ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত মায়া । সামনে খুব বড়সড় একটা ধাক্কা সে খাবে এই ভালোবাসার বিনিময়ে এটা তার খুব ভালো করেই জানা অাছে। তবু ভালোবাসাটা বেড়ে চলছে। হোক না খারাপ পরিনতি, তাতে কি? জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে এখানে অাসার অাগ পর্যন্ত তো খারাপের মাঝেই অাটকে ছিলো। নতুন করে নাহয় অাবার খারাপ কিছু হবে। এতে তার কিছু অাসে যায় না। একটা সময় হয়তোবা সোহান ওকে চলে যেতে বলবে। তখন হয়তোবা ওর প্রয়োজনটা অার সোহানের কাছে থাকবে না। তবু ওকে ভালোবাসবে মায়া। এখন কাছ থেকে ভালোবাসে তখন নাহয় দূর থেকে ভালোবাসবে। মায়া ভালোবাসতে জানে। যে ভালোবাসতে জানে , সে কাছে থেকেও ভালোবাসতে জানে দূর থেকেও ভালোবাসতে জানে।

পর্ব-১০
———————————–
মায়াকে এক হাতে পেঁচিয়ে অন্য হাতে ওর চুলের গোড়ায় অাঙুল চালাচ্ছে সোহান। অদ্ভুদ অনুভূতি হচ্ছে মায়ার। তবে অনুভূতিটা সুন্দর। একটু বেশিই সুন্দর। সোহানকে অারো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মায়া। হৃদস্পন্দনটা এখন অারেকটু জোরে শোনা যাচ্ছে । মায়াকে বুকের কাছ থেকে সরিয়ে টেনে খানিকটা উপরে তুলে অানলো সোহান। ঠোঁটে অালতো করে চুমু খেলো মায়ার।
-” তোমাকে যদি পুরোপুরিভাবে কাছে টানতে চাই তোমার কি অাপত্তি অাছে ?”
-” উহুম।”
-” অাজ রাতে?”
-” হুম।”
বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার পর্দাগুলো টেনে দিলো সোহান। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। সেই সাথে ঠান্ডা বাতাস। বাতাসের জন্য পর্দাগুলো স্থির থাকছে না। উড়ছে পর্দাগুলো। বাহিরে তুফান চলছে সেই সাথে মায়ার মনেও। বুকের ধুক পাকুর শব্দটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মনে হচ্ছে দশ হাত দূর থেকেই একজন মানুষ এই ধুক পাকুর শব্দ শুনতে পাবে। মনের গহীনে শীতল বাতাসের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে মায়া। শীতল বাতাসের কারনটা কি? হতে পারে সেটা ভালোবাসার মানুষের কাছে অাসার পূর্বাভাস। মায়ার পাশে বসে গালে হাত রাখলো সোহান।
-” রাত অনেক হয়েছে তুমি ঘুমাও।”
-” মানে?”
-” মানে তুমি ঘুমাও। অামি অামার রুমে যাচ্ছি।”
-” অাপনি না একটু বললেন অামাকে কাছে টানতে চান। পুরোপুরিভাবে।”
-‘ হুম বলেছিলাম। তোমাকে এতটা কাছে পেয়ে মাইন্ড খানিকটা ডিসট্র্যাক্ট হয়ে গিয়েছিলো। বুঝোই তো, দিনশেষে অামিও একজন পুরুষ। এখন মনে হচ্ছে তোমাকে এভাবে প্রস্তাবটা দেয়া উচিত হয়নি। শুরুতে তোমার ঘরে অাসলাম হেড ম্যাসাজ নেয়ার জন্য। এরপর অাবদার ধরলাম জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো। এরপর পারমিশন ছাড়াই কিস করলাম। এখন অাবার অাবদার ধরছি অারো গভীরে যাওয়ার জন্য। লোভী পুরুষের মতো অাচরন করছি। লোভ ব্যাপারটা ভালো না। সবকিছু ধীরে সুস্থে এগিয়ে নেয়াটা ভালো। সরি মায়া। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।”
সাধু হওয়ার একটা লিমিট থাকে। কিন্তু সোহান লিমিট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটা কোন কথা? বেশি লোভ করে ফেলেছি! মায়া হাসবে না কাঁদবে খুঁজে পাচ্ছে না।
-” তাহলে অামাকে কেনো এনেছেন? সাজিয়ে রাখার জন্য?”
-” সংসার করার জন্য। তোমার সাথে সংসার করে দেখতে চাই অাসলে সংসার কতটা তিতা।”
-” টেস্ট করতে চাচ্ছেন অামাকে দিয়ে? যদি টেস্টের রেজাল্ট মিষ্টি হয় তাহলে অন্য কাউকে বিয়ে করবেন। তিতা হলে বিয়ে করবেন না।”
-” ব্যাপারটা তেমন না।”
-” ব্যাপার যেমনই হোক, অাপনি অাজ কিছু করেনঅার না করেন অাপনি অামার সাথেই ঘুমুবেন।”
-” থাকতেই হবে?”
-” হুম। অাপনার গায়ের খুব সুন্দর একটা ঘ্রান অাছে। সকালে যখন জড়িয়ে ধরেছেন তখন ঘ্রানটা একটুখানি পেয়েছিলাম। এখন ঘ্রানটা ভালো মতো পেয়েছি। একদম নেশা ধরানো। অাপনাকে জড়িয়ে না ধরলে অামার ঘুমই অাসবে না। অাসেন এখানে। শুয়ে পড়েন।”
মুচকি হেসে মায়ার পাশে শুয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলো সোহান। সোহানের বুকে অালতো করে হাতাচ্ছে মায়া। ফের দুজনেরই নিঃশ্বাস গাড়ো হয়ে অাসছে। সোহানের গলায় চুমু খেলো মায়া। দুহাতে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরলো মায়াকে। ঘোরের মাঝে ডুবে যাচ্ছে সোহান। মায়ার পরোক্ষ ইশারা সোহানের অাবদারগুলোকে ভীষনভাবে অাস্কারা দিচ্ছে। নিজেকে অার অাটকে রাখার প্রয়োজন মনে করছেনা সোহান। অাটকে রাখার তিল পরিমান ইচ্ছাও তার নেই।
সকাল অাটটা। বাহিরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সারারাতের বৃষ্টিতে অাবহাওয়া পুরোপুরি ঠান্ডা। তবু ফুল স্পীডে ফ্যান ঘুরছে মাথার উপর। যত ঠান্ডাই পড়ুক ফ্যান ছাড়া ঘুম হয় না সোহানের। অার অন্যদিকে মায়ার শীত বেশি। তাই কাঁথার নিচে একদম গুটিসুটি হয়ে সোহানের সাথে ঘেষে শুয়ে অাছে। মায়ার গায়ের উপর হাত পা তুলে দিয়ে বেঘোর ঘুম ঘুমুচ্ছে সোহান। সোহানের ফোন বাজছে। জাহিদ ফোন করেছে। কোনোমতে চোখ মেলে দেখে জাহিদের নাম স্ক্রিনে ভাসছে। ঘুম জড়ানো কন্ঠে সোহান বললো,
-” হুম বলো।”
-” স্যার অাপনার বাবা ফোন করেছিলো। অাপনাকে নাকি খুঁজে পাচ্ছে না ফোনে।”
-” হুম ঐ ফোনটা বন্ধ করে রেখেছি।”
-” অাপনার এই নম্বর তো বড় স্যার জানে না। তাই অামাকে ফোন করে বললো অাপনাকে কল করতে।”
-” অার্জেন্ট কিছু?”
-” না স্যার অামাকে কিছু বলেনি।”
– অাচ্ছা অামি ফোন দিচ্ছি তুমি রাখো।”
ফোনটা রেখে উঠে বসলো সোহান। অাড়মোড়া দিয়ে ঘুমটা পুরোপুরি ভাবে চোখ থেকে সরাতে চাচ্ছে সে। মায়ার ঘুমও ততক্ষনে ভেঙে গেছে।
-” মায়া, জলদি উঠো। গোসল করো। ফ্রেশ হও। অামার জন্য কফি বানাও। অামার অালমারি থেকে অফিসে যাওয়ার কাপড় বের করে রাখো। কাপড়ের সাথে অামার মানিব্যাগ, ঘড়ি, মোবাইল, গাড়ির চাবি সব যেনো থাকে। অলরেডি সোয়া অাটটা বেজে গেছে। অফিসে মিটিং অাছে দশটায়। পৌনে দশটার মধ্যে অফিসে পৌঁছাতে হবে।”
-” জ্বি উঠছি।”
সোহানের তাড়া দেখে হুড়মুড়িয়ে বিছানা ছেড়ে কাপড় চোপড় নিয়ে ওয়াশরুমে গেলো মায়া। সোহানের ফরমায়েশ পূরন করতে হবে। এই প্রথম মানুষটা তাকে কোনো ফরমায়েশ করলো। সংসারের প্রথম ফরমায়েশ। কোনোভাবেই ত্রুটি রাখা যাবে না। বেঁধে দেয়া সময়ের মাঝে কাজ সারতে হবে।
চুলায় কফির দুধ গরমে বসিয়ে সোহানের রুমে এসেছে মায়া। সোহানের গোসল তখনও শেষ হয়নি। সোহানের জন্য অনেক বিচার বিবেচনার পর অালমারি থেকে কাপড় বের করে খাটের উপর রেখেছে মায়া। ওয়ালেট, মোবাইল গাড়ির চাবি সব রাখা অাছে কাপড়ের পাশেই। কিন্তু ঘড়ি খুঁজে পাচ্ছে না মায়া। সোহানের বেডরুম তন্নতন্ন করে খুঁজছে মায়া। ভাবছে সোহানকে কি একটাবার জিজ্ঞেস করবে? ওয়াশরুম থেকে শ্যাম্পুর স্মেল অাসছে। সোহান চুল শ্যাম্পু করছে । এখন যদি ডেকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করে তাহলে উত্তর দেয়ার সময় সোহানের মুখে শ্যাম্পুর ফেনাসহ পানি মুখের ভিতর ঢুকে যেতে পারে। তাই এই মূহূর্তে জিজ্ঞেস না করাটাই হয়তো ভালো হবে। রান্নাঘর থেকে কাজের লোক শামীমের কন্ঠ ভেসে অাসছে,
-‘ ভাবি, দুধ তো গরম হইয়া গেছে। কফি বানাইবেন না।”
চুলায় দুধ বসিয়ে এসেছে একদমই খেয়াল ছিলো না মায়ার। দৌড়ে কিচেনে যেয়ে দেখে শামিম চুলা থেকে দুধের পাতিল নামিয়ে রেখেছে।
-‘ অামি তো ভুলেই গিয়েছিলাম শামিম ভাই। ”
-” অামি নামায়া থুইছি ভাবি। চিন্তা নাই।”
-” এখন কি কি মিশাবো এটাতে?”
-” মগে দুধ ঢালেন। দুই চামচ কফি, এক চামচ হরলিক্স অার অাধা চামচ চিনি মিলাইবেন।”
-” শামিম ভাই, উনি ঘড়ি কোথায় রাখে জানেন?”
-“স্যারের তো ঘড়ি অাছে চাইর পাঁচটা। একটাও পাইতাছেন না?”
– ” না।”
-” গতকাল বাইরে থেইকা অাইসা ড্রইং রুমে টি-টেবিলের উপ্রে থুইছিলো দেখছিলাম। অার বাকিগুলা কই অাছে জানি না।”
ভিতর থেকে সোহানের গলার অাওয়াজ পেলো মায়া।
-” অামার ঘড়ি কোথায়? ঘড়ি বের করোনি কেনো?”
তাড়াহুড়ো করে ফের সোহানের রুমে গেলো মায়া।
-” ঘড়ি খুঁজছি। কিন্তু পাচ্ছিনা।”
-” ড্রইংরুমে দেখো। পাবে। অার অামার সব ঘড়ি অালমারির মাঝের দরজার সেকেন্ড ড্রয়ারে থাকে।”
-” অামি এনে দিচ্ছি। ”
দৌড়ে ড্রইংরুম থেকে ঘড়ি এনে খাটের উপর রাখলো মায়া। সোহান মাথার ভেজা চুল মুছছে।
-” কফি হয়েছে?”
-” না এক্ষুনি অানছি।”
ছুটে কিচেনে গেলো মায়া। খুব জলদি বাকি উপকরন মিশিয়ে কফি তৈরি করে সোহানের সামনে হাজির করলো।
-” তুমি তো অামার মোজা বের করে রাখোনি।”
-” এক্ষুনি বের করে দিচ্ছি।”
-” এই দাঁড়াও।”
-” জ্বি?”
-” এভাবে দৌড়াদৌড়ি করছো কেনো? ধীরে সুস্থে কাজ করো।”
-” অাসলে অামি একটু নার্ভাস। কখনো কাউকে সংসার করতে দেখিনি। কাজ কিভাবে গুছিয়ে করতে হয় অামি জানি না। এই প্রথম অাপনি কিছু করতে বলেছেন। অামি চাইনা কোনো ত্রুটি থাকুক।”
-” বসো এখানে।”
-” মোজাগুলো বের করে দেই।”
-” বসতে বলেছি, বসো।”
কফির মগে চুমুক দিচ্ছে সোহান। পাশে বসে অাছে মায়া।
-” কফিটা খুব ভালো হয়েছে।”
-” সত্যি?”
-” নাও, খেয়ে দেখো।”
-” না অাপনিই খান।”
-” শোনো, এতটাও নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই। অামি জানি তুমি কাজ পারো না। একদিনে কেউ সংসারের কাজে এক্সপার্ট হয় না। অাস্তে ধীরে সব ঠিক হবে। কাজ করতে করতে পুরোপুরি সংসারী হবে তুমি। ঘরের জিনিস ভাঙবে, তরকারি পুড়বে, হাত কাটবে এরপর পাক্কা হাউজওয়াইফ হতে পারবে। এছাড়া না। তুমি তোমার মতো অাস্তে ধীরে কাজ করো। দেরি হলে হবে। অসুবিধা নেই। বাসায় শামীম রতন অাছে। চাইলে অামি কাজ ওদের দিয়েও করাতে পারবো।”
এতক্ষনের মানসিক চাপটা মনে হয় কিছুটা কমেছে মায়ার। ভয়টা কিছুটা কেটেছে।
-” যাও নাস্তার টেবিলে খাবার সাজাও। অামি কাপড় পাল্টে অাসছি।”
সোহানের প্লেটে খাবার সাজিয়ে চেয়ারে বসে অাছে মায়া। সোহান চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো,
-” তোমার প্লেট কোথায়?”
-” অাপনার কাছ থেকে খাবো। তাই অামার অালাদা করে খাবারের প্লেট নেইনি।”
কথাটা বলে মায়ার মনে হলো অাবদারটা খুবই বাজে হয়েছে। কি মনে করে কথাটা ও বলেছে সেটা ও নিজেও জানে না। সোহান মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে অাছে। এবার মায়ার লজ্জা লাগছে নিজের এমন বুদ্ধিহীন অাবদারের জন্য। কোনো কথা না বলে নিজের জন্য প্লেট সাজাতে লাগলো মায়া।
-” এই, তুমি না বললে অামার হাতে খাবে?”
-” না, থাকুক। অামি অামার হাতেই খাবো।”
-” কেনো?”
-” অাসলে অামি কেনো যেনো এমন একটা অাবদার ধরে ফেলেছি।”
-” গতরাতে অামি চলে অাসতে চেয়েছিলাম। অামাকে জড়িয়ে ধরার অাবদারটা কিন্তু তুমি করেছিলে। তখন লজ্জা পাওনি, এখন এই সামান্য কথায় লজ্জা পাচ্ছো কেনো? অাজাইরা ঢং ছাড়ো। নাও হা করো।”
মায়ার মুখের সামনে খাবার ধরে রেখেছে সোহান।মায়া মুখের মধ্যে খাবার পুরে চুপচাপ চাবাচ্ছে।
-” মায়া।”
-” হুম?”
-” রাতটা সুন্দর ছিলো।”
মায়ার ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সোহানের দিকে তাকিয়ে মায়া উত্তর দিলো
-” অনুভূতিগুলো অারো বেশি সুন্দর ছিলো।”

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 4.4 / 5. মোট ভোটঃ 8

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment