মধ্যরাত্রে সূর্যোদয়ঃ ২য় অধ্যায়

Written By pinuram

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ তপ্ত বালুচর

পরীর আত্মসমর্পণ (#01)

উড়তে মানা আকাশের তোর, বসতে মানা ডালে,
বাসা বাঁধিতও মানা, কি আছে কপালে,
বলি ঝরে হারাতে ত মানা নাই।
ওরে মন পাখি, কেন ডাকাডাকি, তুই থাক না গোপনে,
উড়তে আছে মানারে বন্ধু এই খোলা আসমানে,
তুই থাক না গোপনে।

রাজকন্যে ফিরে আসে তাঁর সোনার খাঁচায়, তাঁর যে আর মাথা গোঁজার জায়গা নেই। ভগ্ন হৃদয়, আশার সব আলো নিভে গেছে। দিগন্তের বুকে সেই ছোটো জাহাজের মাস্তুল ধিরে ধিরে বাঁকা দিগন্তের তলায় তলিয়ে গেল। সেই সাদা ঘোড়া আর ফিরে এল না, পরীর কাঁধ ছুঁয়ে আদর করল না, পরী ওর ডাকের জন্য অপেক্ষা করে থাকে কিন্তু শূন্য সে বুক। চারপাশে শুধু অন্ধকারে ঢাকা।
আগস্টে আমি আঠাশ বছরে পা দিলাম। আমি নিজেকে শামুকের খোলে মধ্যে গুটিয়ে নেই, আমার ঘর থেকে খুব বের হতাম। কলেজ শেষ, রান্না ঘর আর আমার ঘর আমার সব কিছু ছিল। বাইরের জগতের সাথে একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ছোটমা বাবু আমার চেহারা দেখে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। মা চলে যাওয়ার পরে আমি যেন কোন কিছুতে আর খুশি খুঁজে পাইনা। সেই সাদা ঘোড়া আর কোনদিন আমার কাছে ফিরে আসবে না, সেটা আমি ভালো ভাবে বুঝতে পেরে গেছিলাম। মায়ের চিতার আগুনে আমার সব আশা, সব আখাঙ্খা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। আমার মা ছোটমাকে জানাতে পারলেন না তাঁর মনের অভিপ্রায়। সাদা ঘোড়া চিরতরে হারিয়ে গেল। মায়ের সাথে সাথে সেই “অপ্টিক্স নোটবুক” বইয়ের তাকে ঢুকে পরে, সেই ডায়রির লেখার কোন মানে নেই আর।
ছোটমা একদিন আমার ঘরে এসে আমাকে বললেন, “সোনা মা, আমি তোর মায়ের মতন।”
আমি করুন চোখে ছোটমায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি, হ্যাঁ সত্যি তুমি আমার মায়ের মতন কিন্তু আমার মা নও। আমি ছোটমাকে ম্লান হেসে জিজ্ঞেস করি, “আর কি চাও আমার কাছ থেকে, ছোটমা?”
ছোটমা, “ওই রকম ভাবে আমার সাথে কথা বলছিস কেন? এক মা তাঁর মেয়ের কাছে কি আর চাইবে, তাঁর ভালোই চাইবে।”
আমি তোমার মেয়ে হতে চাইনি ছোটমা, আমি তোমার বাড়ির বউমা হতে চেয়েছিলাম। পূরণ করতে পারবে আমার মনের আশা? আমি ছোটমাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি আমার জন্য ছেলে খুঁজছও?”
ছোটমা মাথা দুলিয়ে বলে, “হ্যাঁ রে, পরী, আমি আর তোর বাবু, তোর জন্য ছেলে খুঁজছি।”
আমি ছোটমায়ের কথা শুনে একটু রেগে যাই, বলি, “আমি স্কুল টিচার হতে চেয়েছিলাম, তাঁর কি হবে? তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে যে।”
ছোটমা আমার পাশে বসে আমার গালে হাত রেখে আদর করে বলেন, “সোনা মা, আমি তোর জন্য সেই রকম ছেলেই খুঁজব যে তোকে চাকরি করতে দেবে, তোকে পড়াশুনা করতে দেবে। বিশ্বাস কর।”
আমি ফুঁপিয়ে উঠি, “যত তাড়াতাড়ি পারো তুমি আমাকে বাড়ি থেকে তারাতে চাও, তাই না?”
ছোটমা মৃদু বকুনি দিলেন আমাকে, “কি সব উল্টপাল্টা বলছিস তুই, আমি কেন তোকে তাড়াতে চাইব।”
আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, চোখের সামনে সব আলো নিভে গেছে। হারানোর মতন আমার কাছে আর কিছু নেই। মনের মধ্যে সব সাহস সঞ্চয় করে ছোটমাকে বলি, “আমার যাওয়ার কোথাও আর জায়গা নেই তাই কি তুমি আমার জীবন নিয়ে খেলা করছ? আমি এখন বিয়ে করব না, আমি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাবো, সেখানেই থাকব।”
ছোটমা গম্ভির সুরে বলেন, “তুই ফিরে যেতে পারিস না, আমি তোকে যেতে দেব না। কে তোকে দেখবে? তোর দাদারা? না, ওদের নিজেদের সংসার আছে, ওরাও তোকে বিয়ে দিতে চেষ্টা করবে। তুই ভালো করে ইন্দ্রানি আর শশাঙ্কর অভিপ্রায় জানিস।”
আমি ছোটমায়ের দিকে আশাহত হয়ে তাকিয়ে থাকি, সত্যি আমার আর কেউ নেই দেখার। আমি ছোটমাকে জানাই যে আমার কিছু সময় চাই ভেবে দেখার জন্য। ছোটমা আমাকে জানান যে কোলকাতার পেপারে আমার বিয়ের জন্য ইস্তেহার দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই কথা শুনে আমার মনে হল যেন কেউ গরম তেল আমার মাথার ওপরে ঢেলে দিয়েছে।
আমি জোর গলায় ছোটমাকে বলি, “আমাকে জিজ্ঞেস করার কথা একবারের জন্যেও তোমার মনে হল না?”
খুব ধীর শীতল গলায় উত্তর দিলেন ছোটমা, “আমরা যা কিছু করছি সেটা তোর ভালোর জন্যেই করছি। তোর কিসে ভালো কিসে মন্দ আমরা ভালো করে জানি।”
ছোটমা চলে যাওয়ার পরে আমি চুপ করে বিছানায় বসে থাকি। বাইরের আকাশের মতন মন ভারাক্রান্ত। বর্ষাকাল শেষ, কিন্তু আকাশ একটু মেঘলা। ওর কাছ থেকে কোন যোগাযোগ নেই, আমি আশাহত।
প্রতিদিন বিকেলে দেখতাম আমার বিয়ের জন্য অনেক ফোন আসে। বাবু সেই ফোন ধরে সব কিছু লিখে নিতেন। আমি কিছু বলতাম ওদের। মাঝে মাঝে ছোটমা আমাকে জিজ্ঞেস করত যে কি ধরনের ছেলে আমার পছন্দ, তাঁর উত্তর আমি দিতাম না।
একদিন আমি ছোটমাকে বলি, “ছোটমা, আমি তোমার সব ঋণ শোধ করে দেব। আমি তোমার রক্ত মাংসের মেয়ে নই, তা সত্তেও তুমি আমার জন্য অনেক কিছু করেছ। কিন্তু…”
ছোটমা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “কিন্তু, কি পরী?”
আমি বুক ভরে এক শ্বাস নেই, কিছুক্ষণ বাবু আর ছোটমার দিকে তাকিয়ে তারপরে বলি, “একবার, শুধু একবারের জন্য আমাকে উপরের ঘরে যেতে দেবে।”
কথা বলতে গিয়ে আমার গলা ধরে এসেছিল।
ছোটমা বাবু আমার মুখে ওই কথা শুনে অবাক হয়ে যান। পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করেন। বাবু গম্ভির গলায় আমাকে বলেন, “না তুমি ওই ঘরে যেতে পারবে না। ওর ঘর তালা বন্ধ।”
আমি ওদের দিকে রেগে তাকিয়ে বলি, “ঠিক আছে, তোমরা এতই যখন আমার বিয়ে নিয়ে ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে পরেছ, তাহলে এত খুঁজছ কেন? যাকে খুশি ধরে নিয়ে আস, আমি তাঁর সাথে বিয়ে করে নেব।”
আমি ওদের মুখের সামনে দরজা বন্ধ করে দেই। বুকের মাঝে আগুন জ্বলে ওঠে, বেদনার তীব্র আগুনে আমার পাঁজর, আমার রক্ত ফুটতে থাকে। চুপ করে বিছানায় বসে থাকি। শেষ পর্যন্ত আমার সাথে প্রতারনা করল, আমার ভালোবাসা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে চলে গেল, একবারের জন্য ফিরে তাকাল না, এত বার বলেও একবারের জন্য যোগাযোগ করার চেষ্টা করল না। সারা রাত আমি ঘুমাতে পারিনা, জেগে বসে থাকি আমার অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতকে দেখার জন্য। বুক ফাঁকা, বুক চেপে কান্না দিয়ে ভরিয়ে দিতে চেষ্টা করি, কিন্তু বুকের আগুন হাথের ছোঁয়ায় আরও ধিকধিক করে জ্বলে ওঠে।
মাঝ রাতে দরজায় আওয়াজ শুনে আমি উঠে দরজা খুলি। দরজায় ছোটমাকে দেখে আমি একটু থমকে যাই। ছোটমা আমার হাথে ওর ঘরের চাবি দিয়ে করুন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
ছোটমায়ের দুচোখে জল, আমি হাথ থেকে চাবি নিয়ে ছোটমায়ের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে থাকি। ওই চাবি যেন আমার কাছে সব কিছু।
ছোটমা চোখের জল মুছে আমাকে নিচু গলায় বলেন, “সোনা মা, যা। কিন্তু সকালে আমি যেন সঠিক উত্তর পাই।”
আমি ধিরে ধিরে সিঁড়ি চড়ে ওর ঘরের সামনে এসে দাড়াই। বুকের মাঝে এক উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পরে। শ্বাস বন্ধ করে নেই, তালা খোলার আগে। নিচের ঠোঁট চেপে ধরে থাকি, মনে হয় যেই আমি তালা খুলে ভেতরে ঢুকব, সেই খনে আমাকে এসে জড়িয়ে ধরবে। আমি শেষ পর্যন্ত তালা খুলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ি। গত দু’বছর এই ঘর বন্ধ ছিল, কারুর পায়ের চিহ্ণ নেই গরের ধুল মলিন মেঝের ওপরে। বন্ধ থাকার জন্য ঘরের হাওয়া গুমোট বেঁধে থাকে। সেই গুমোট গন্ধে আমার বুক কেঁপে ওঠে, ঠিক যেন একটা ছোটো দিপের শিখা ঝড়ো হাওয়ায় দুলে ওঠে। টেবিলের নিচে এক কোনায় একটা ইদুর মরে পরে আছে। ওর পড়ার টেবিল, চেয়ার ধুলোতে ঢাকা। বিছানার চাদর গত দু’বছরে বদলানো হয়নি। টিকটিকির মল আর ইঁদুরের মল ছড়িয়ে আছে বিছানার চাদরের ওপরে। খাটের দুপাশে মাকড়সার জালে ভর্তি।
আমি জানালা খুলে দিয়ে নতুন বাতাসকে আহবান জানাই সেই বদ্ধ ঘরের ভেতরে। চেয়ারের ধুলো ঝেরে জানালার পাশে চেয়ার টেনে বসে পরি। চোখের কোনে জল চলে আসে, বুক কেঁপে ওঠে ওর কথা মনে করে। না কিছুতেই কাঁদব না, কার জন্য কাঁদব আমি, যে কিনা আমাকে ভুলে গেছে? ঠিক চলে যাওয়ার আগের দিনে আমি ঠিক সেইখানে বসে ছিলাম, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার ছবি আঁকছিল। আমি সেইদিকে তাকিয়ে থাকি, হয়ত বাঁ এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আমার চোখে শুধু অন্ধকার দেখে, না ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই, সব আমার মনের ভ্রম। আমি টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেখি একটা ছোটো কাঠের বাক্সে কত গুলো কাঁচের গুলি রাখা। আমি আবার সেই বাক্স যথাস্থানে রেখে দিলাম।
শেষ বারের মতন ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলাম। জানালা বন্ধ করে দিলাম। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি, চোখের পাতা ভিজে আসে। শেষ পর্যন্ত তালা বন্ধ করে দিলাম দরজায়, সেই তালার পেছনে আমার সব আশা সব ভালোবাসা বন্ধ করে দিয়ে নিচে নেমে চলে এলাম। ছোটমা বসার ঘরে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
আমি ছোটমায়ের হাথে চাবি ধরিয়ে দিয়ে বলি, “আমার আর কোন পথ নেই, যেখানে ভাগ্যবিধাতা আমাকে নিয়ে যাবে, আমি চুপ করে সেখানে যাবো।”
সেইরাতে শেষ বারের জন্য আমি ওর “অপ্টিক্স নোটবুক” তাক থেকে বের করি। ডায়রি আর ওর দেওয়া সেই বুদ্ধের মূর্তি একটা কাগজে মুড়ে একটা বাক্স বন্দি করে দেই। সেই বাক্স আমি মোম দিয়ে এটে দেই।
একদিন আমি ছোটমাকে বলি যে আমি কল্যাণীর সাথে দেখা করতে যাবো। ছোটমা মানা করেন নি। আমি কল্যাণীর বাড়ি যাই, ওর হাথে সেই বাক্স তুলে দিয়ে বলি, “আমার জীবন শেষ।”
কল্যাণী বাক্স হাথে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে তাঁর মানে।
আমি বলি, “এই বাক্সে কিছু অকেজো জিনিস আছে। আর আমার কাজে লাগবে না ওর ডায়রি। আমার এত শক্তি নেই যে আমি ওর ডায়রি জ্বালিয়ে দেই, তাই তোর কাছে নিয়ে এলাম আমি। তুই আমার হয়ে এই টুকূ কাজ করে দে, পারলে এই জিনিস গুলো ধ্বংস করে দিস। ছোটমা বাবু আমার জন্য ছেলে খুঁজছে, কিছুদিনের মধ্যে আমার বিয়ে হয়ে যাবে।”
কল্যাণী আমার কথা শুনে আঁতকে ওঠে, “কি বলছিস তুই? ও যদি ফিরে আসে?”
আমি ম্লান হেসে ওকে বলি, “দু বছর, দু বছর আমি ওর জন্য অপেক্ষা করে করে হাঁপিয়ে গেছি। একবারের জন্যেও আমার সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত করল না। ভুলে গেছে আমাকে, ভুলে গেছে ও কাউকে ভালবাসত। ভালোবাসা ওর জন্য নয়, ও এক কাপুরুষ, হৃদয় হীন মানুষ। নিজের বাবা মায়ের কথাও ভুলে গেছে।”
আমার চোখে সেদিন জল ছিলনা, কিন্তু আমার কথা শুনে কল্যাণীর চোখে জল চলে আসে। আমার ফাঁকা বুক, সেই চোখের জল ভরিয়ে দেইতে পারেনা। বেদনায় আর রাগে আমার হাত পা কেঁপে ওঠে। আমি ওর কান্না দেখে ওকে বলি, “কেন এক অভাগিনী মেয়ের জন্য চোখের জল ফেলছিস তুই? কেঁদে লাভ নেই রে।”
আমি ওর গালে হাত দিয়ে বলি, “তুই সুখী থাক, খুব ভালো মা হবি তুই।”
কল্যাণী আমার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে, “পরী…”
সেই নাম শুনে আমার কান্না গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে। আমি ধরা গলায় ওকে বলি, “কল্যাণী, পরী অনেক দিন আগেই মরে গেছেরে। তোর সামনে এক অন্য মেয়ে দাঁড়িয়ে, মিতা, জানিনা এই মিতার ভবিষ্যতে ভাগ্যবিধাতা কি লিখে গেছে।”
কল্যাণী আমার কাছে এসে আমার কাঁধে হাত রাখে। ওর হাতের স্নেহের স্পর্শে আমার মন গলে যায়, আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠি। কল্যাণী আমার পিঠে হাত বুলিয়ে আমাকে সান্তনা দেয়। আমি ওকে বলি, “কল্যাণী রে, যেদিন ছোটমা ওকে বের করে দেয় সেইদিন পরী মরে গেছে। যেদিন আমার মা মারা যান সেদিন পরী মারা যায় আবার। আমার বুকে বেশি প্রাণ বেঁচে নেইরে কল্যাণী, বারেবারে আমি মরতে পারিনা রে। আমি আমার ভাগ্যের কবলে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছি রে।”
সেইদিন আমি আর গ্রামের বাড়িতে গেলাম না, আমি সারাদিন কল্যাণীর সাথেই ছিলাম। বিকেলে আবার বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। বাড়ি ফেরার আগে কল্যাণীকে আগাম নিমন্ত্রন জানিয়ে আসি আমার বিয়েতে আসার জন্য। কল্যাণী ওর গর্ভের ওপরে হাত বুলিয়ে আমার দিকে হেসে বলে, “লাথি মারছে রে। জানিনা তোর বিয়ে কবে, জানিনা যেতে পারবো কিনা, তবে কথা দিচ্ছি যে দীপঙ্কর যাবে।”

পরীর আত্মসমর্পণ (#02)
আমি ফিরে আসি আমার খাঁচায়, হাসতে ভুলে, কাঁদতে ভুলে এক পাথরের মূর্তির মতন দিন গুনতে আরম্ভ করি আসন্ন অন্ধকার দিগন্তের জন্য। কয়েকদিন পরে ছোটমা আমাকে জানায় যে তাদের সাথে আমাকে একটা বিয়ে বাড়ি যেতে হবে। আমি অনুধাবন করেছিলাম যে, বিয়ে বাড়ির নেমন্তন্ন উপলক্ষ মাত্র, আসল উদ্দেশ্য মেয়েকে দেখানোর। ছোটমা আমাকে সুন্দর করে সাজতে বলেন আর বলে সেই তুঁতে রঙের শাড়ি পড়তে। আমি কোন বাঁধা দেই না ওদের। মন ভাসিয়ে দেই মরা গাঙ্গে।
অনেকদিন পরে সেদিন আমার যেন সাজতে ইচ্ছে হয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলি, কেঁদে লাভ নেই পরী, দুঃখ করেও লাভ নেই, দুহাথে বরন কর নতুন জীবন। ওকে উত্যক্ত করার জন্য যেন আমি সেদিন বেশি করে সাজি। তুঁতে রঙের শাড়ি, রুপলি সুতোর ভারী কাজ করা আঁচল, তাঁর সাথে মিলিয়ে ছোটো হাথার ব্লাউস গায়ে। কপালে গাড় নীল আর আকাশী রঙের টিপ, চোখের কোনে কাজল। মাথার চুল সাপের মতন বেনুনি করে বাঁধা, পিঠের ওপরে ঝুলে থাকে। কানে সোনার ঝুমকো, গলার ছোটমায়ের দেওয়া সেই মোটা সোনার হার। বাম কব্জিতে টাইটানের সোনার ঘড়ি আর অন্য হাথে কয়েক গাছি তুঁতে আর সাদা রঙের চুড়ি। নিজেকে দেখে নিজের বেশ ভালো লাগে।
আয়নায় দেখে নিজেকে বলি, “শুচিস্মিতা, তোকে আজ দারুন দেখতে লাগছে।”
সেদিন আমার কাঁধ কেউ ছোঁয় না, কেউ আমার কানেকানে এসে বলেনা যে আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। আমি তার অপেক্ষাও করিনা।
ছোটমা আমাকে দেখে খুব খুশি হয়ে বলেন, “সোনা মাকে আজ দারুন দেখতে লাগছে।”
আমি ওদের দিকে হেসে বলি, “চলো। আমি ভালো করে জানি আমাকে কেন বিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছ। আমার আঠাশ বছর বয়স হয়ে গেছে, আমার মাথায় কিছু ত বুদ্ধি আছে, ছোটমা।”
ছোটমা আমার দিকে হেসে বলেন, “পরী আমরা যা করছি তোর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে করছি।”
পরী অনেক দিন আগেই মারা গেছে, ছোটমা, যেদিন তুমি ওকে ঘর থেকে বের করে দিলে, তাঁর সাথে সাথে সেই পরী চলে গেছে এই দেহ ছেড়ে। না আমি সেই কথা মুখে আনিনি, শুধু একটু হেসে ছোটমায়ের সাথে বিয়েবাড়ির দিকে রওনা হয়ে যাই।
বিয়েবাড়িতে কাউকেই আমি চিনতাম না, বাবুর এক আত্মীয়র বিয়ে ছিল। আমার চারপাশে লোকের ভিড়, আমি একা। পুরুষের নজর আমার দিকে, সবাই যেন আমার একটু হাসির জন্য উন্মুখ। আমি মনেমনে ওদের ভাবব্যাক্তি দেখে হেসে ফেলি। খুব একা মনে হয় এই পৃথিবীতে। আমি একটা চেয়ার নিয়ে বিয়ে বাড়ির বারান্দায় বসে আকাশের তারা গুনতে শুরু করে দেই। সামনে দুর্গা পুজো, আকাশে বাতাসে আবার আগমনীর সুর ভেসে আসে। আকাশে পোজা পোজা সাদা তুলোর মতন মেঘের ভেলা চড়ে বেড়ায়। তারা গুনতে গুনতে আমি হারিয়ে যাই ওই খোলা গাড় নীল আকাশে।
একজনের গলা খাঁকাড়ি দেয়ার আওয়াজে আমার চিন্তার তার ভেঙ্গে যায়। আমি ঘুরে তাকিয়ে দেখি এক সুদর্শন যুবক আমার দিকে তাকিয়ে। বেশ লম্বা ছেলেটা, বয়স আমার কাছাকাছি হবে। শক্ত চোয়াল, সুঠাম দেহ। গাড় বাদামি সুটে বেশ সুন্দর দেখায় ছেলেটাকে। আমাকে দেখে হাত জোর করে অভিবাদন জানায়। আমি দাঁড়িয়ে উঠে প্রতি প্রনাম জানাই হাত জোর করে। একটু বিরক্ত বোধ করেছিলাম ওর অযাচিত ব্যাবহারে।
বেশ গভীর গলায় হাসি মুখে আমাকে বলে, “আমি নিলাদ্রি কর্মকার।”
আমি একটু দনামনা করার পরে উত্তর দেই, “শুচিস্মিতা।”
মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, আপনার নাম জানি, আপনার মা বলেছেন।”
“আমার মা?”
আমি প্রশ্ন করাতে ভদ্রলোক আমার ছোটমায়ের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায়। আমি লক্ষ্য করলাম যে ছোটমা একজন বয়স্ক ভদ্রলোকের সাথে একটু দুরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।
নিলাদ্রি, “আমার দাদা ঝামাডোবা কোলিয়ারির ম্যানেজার, আমরা ধানবাদে থাকি। আপনি ধানবাদের নাম শুনেছেন?”
আমি, “হ্যাঁ ধানবাদের নাম শুনেছি।”
নিলাদ্রি সেই ভদ্রলোকের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে, “আমার বাবা, কমলেশ কর্মকার, ধানবাদের খুব বড় কয়লার কন্ট্রাক্টার। আমার দাদার নাম হিমাদ্রি কর্মকার, এইএসএম ধানবাদ থেকে মাইনিং নিয়ে পাস করেছে। এইএসএম জানেন?”
আমি, “হ্যাঁ নাম শুনেছি।”
নিলাদ্রি বলে, “আমি শুনেছি আপনি ফিসিক্সে এমএসসি করেছেন? আমার দাদা পড়াশুনায় খুব ভালো। দাদা মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার, উনিশশো-পঁচানব্বইয়ে পাশ করেছেন।”
আমি ওর দাদার বয়স মনে মনে যোগ করে দেখলাম এই বত্রিশের মতন হবে। কিন্তু আমার মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, ছেলেটা বারবার ওর দাদার ব্যাপারে কেন বলছে, নিজের ব্যাপারে কেন কিছু বলছে না। আমাকে চেয়ারে বসতে বলে একটা সিগারেট জ্বালায়।
একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলে, “আমার বাবা দাদার জন্য পাত্রী খুঁজছেন।”
আমি ওর কথা শুনে হেসে ফেলি। আমার হাসি দেখে নিলাদ্রি বুঝতে পারে যে আমি এতক্ষণ ওর কথা ভাবছিলাম। নিলাদ্রি আমার চেহারার লাজুক হাসি দেখে বলে, “না না আমি নই, আমার বয়স আপনার মতন হবে এই আঠাস।”
আমি লজ্জায় অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে হেসে ফেলি। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নিলাদ্রি। আমাকে মজা করে বলে, “আপনাকে কি নামে ডাকা যায় বলুনত? শুচিস্মিতা বৌদি অনেক বড় নাম, দাঁত খুলে হাতে চলে আসবে।”
আমি ওর কথা শুনে হেসে ফেলি, “এমি এখনো আপনার বৌদি হইনি, কিন্তু।”
নিলাদ্রি ছোটমা আর ওর বাবার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে, “যে ভাবে আপনার মা আর আমার বাবা কথা বলছেন, মনে হয় দাদা থাকলে আপনাদের এই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিত।”
অনেকদিন পরে মনের মধ্যে হালকা হাসির ছোঁয়া পাই আমি, ওর কথাবার্তা খুব মিশুকে, আমার খুব ভালো লাগছিল ওর সাথে কথা বলতে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, “আপনার দাদা কোথায়?”
নিলাদ্রি হেসে কপাল চাপড়ে বলে, “কাজ আর অফিস। সত্যি দাদাকে আসা উচিত ছিল, আপনাকে একবার দেখলে দাদা কাজ ভুলে যাবে।”
আমার মুখ লাল হয়ে যায় লজ্জায়। নিচের ঠোঁট কামড়ে বড় বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। মুখ নিচু করে আমার কানের কাছে এসে বলে, “দাদা সত্যি আপনাকে দেখলে থাকতে পারবে না।”
ওর কথাবার্তা মাঝে মাঝে অতি বিরক্তিকর বলে মনে হচ্ছিল।
আমি পেছন ফিরে ছোটমাকে খুঁজতে চেষ্টা করি। ঘুরে দেখি ছোটমা আর নিলাদ্রির বাবা আমাদের পেছনে দাঁড়িয়ে। ছোটমা আমাকে ইঙ্গিত করেন ভদ্রলোকের পা ছুঁয়ে প্রনাম করতে। আমি ঝুঁকে ভদ্রলোকের পা ছুঁয়ে প্রনাম করি। ভদ্রলোক আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেন, “অনেকদিন ধরে ছেলের জন্য একটা লক্ষ্মী ঠাকুর খুজছিলাম, তোমাকে দেখে মনে হল শেষ পর্যন্ত পেয়ে গেছি আমার লক্ষ্মী।”
আমি আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে চোখের কোনে ছলকে আসা ব্যাথা লুকিয়ে নেই। শেষ পর্যন্ত আমার ভবিতব্য আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে, আমার বিবাহ আসন্ন। এক নতুন দিগন্ত, এক নতুন জীবন আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
নিলাদ্রির বাবা ছোটমাকে বললেন, “হিমাদ্রির এখানে আসা উচিত ছিল, তাহলে একেবারে শুচিস্মিতাকে দেখে যাওয়া যত। আমাদের আবার আসতে হবে, মা লক্ষ্মীকে দেখতে।”
ছোটমা, “এবারে কিন্তু বৌদিকে নিয়ে আসবেন।”
এমন সময়ে বাবু এসে নিলাদ্রি আর নিলাদ্রির বাবাকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।
ছোটমা আমার চিবুক ছুঁয়ে বললেন, “খুব আময়িক ভদ্রলোক। হিমাদ্রি মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার।”
আমি ছোটমায়ের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসি, ছোটমা শেষ পর্যন্ত আমাকে তাড়াবার একটা উপায় তুমি খুঁজে পেয়ে গেলে।
বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে আসার আগে নিলাদ্রি আমার কাছে এসে বলে, “পরের রবিবার আপনাদের বাড়িতে আসছি। আমি একদম পাক্কা যে আপনি আমার বৌদি হবেন।”
আমি ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলি। সেই হাসিতে খুশির আমেজ ছিলনা, আমার চারপাশে সব যেন মেকি। আমার হাসি মেকি, আমার খুশি মেকি।
বাড়ি ফেরার পরে বাবু জানালেন যে পরের রবিবার আমাকে দেখতে আসবে, বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে যাবে। আমি মৃদু মাথা দুলিয়ে বাবুকে বলি, “সত্যি কি আমাকে দেখার কোন দরকার আছে?”
বাবু, “হ্যাঁ নিশ্চয় আছে।”
আমি তোমাদের গলগ্রহ, আমি বাবুকে বললাম, “তোমাদের পছন্দ হলেই হল, আমার জেনে দরকার কি যে আমি কার সাথে বিয়ে করছি? শুধু আমাকে বলে দিও এইদিনে আমাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে আমি বসে যাব, কাঠের পুতুলের মতন।”
ছোটমা আমাকে করুন সুরে বললেন, “পরী, দয়া করে রবিবার যেন এইরকম ভাবে ব্যবহার করিস না মা।”
আমি চোয়াল শক্ত করে ছোটমাকে বলি, “আমাকে একটু একা থাকতে দিতে পারো?”
আমি ওদের মুখের সামনে দরজা বন্ধ করে দেই।
অবশেষে সেই রবিবার আসে। প্রত্যেক দিনের মতন সেদিন আমি সকালে উঠে স্নান সেরে নিয়েছিলাম। পরনে ছিল একটা অতি সাধারন নীল রঙের চুড়িদার কামিজ। সকাল পড়ায় দশটা বাজে, আমি রান্না ঘরে দুপুরের খাওয়া রান্না করছিলাম। অতিথিরা, যারা আমাকে দেখতে আসবে তারা দুপুরের খাওয়া খেয়ে যাবে। তাই সেদিন অনেক প্রকারের ব্যাঞ্জন রান্না হয়েছিল, গলদা চিংড়ি, ফ্রাইড রাইস, ইলিশ মাছ আরও অনেক। ছোটমা আমাকে রান্না করতে সাহায্য করছিলেন। রান্না করতে করতে আমার মনে ওর চিন্তা এসে ভর করে। কত সাধারন ছিল ওর খাওয়া দাওয়া, একটু ডাল ভাত আলুসেদ্ধ হলে হয়ে যায়।
কলিং বেল বেজে ওঠে। বাবু নিচে দরজা খুলতে যান। ছোটমা রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে অতিথিদের আদর আপ্পায়ন করতে চলে যান, ছোটমা যাওয়ার আগে আমাকে শাড়ি পড়তে বলে যান।
আমি ছোটমাকে বলি, “আমি কি খেলার পুতুলের নাকি যে সেজে গুঁজে বসে থাকতে হবে? আমাকে যদি পছন্দ করতে হয় তাহলে এই পোশাকেই পছন্দ করবে।”
ছোটমা গম্ভীর সুরে আমাকে বকে দিলেন, “পরী ঘরে গিয়ে শাড়ি পরে নে।”
আমি রাগে দাঁতে দাঁত পিষে নিজের ঘরে ঢুকে পরি। ঢুকতে যাব, সেইসময়ে খাওয়ার ঘরে এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলাকে দেখি।
সেই ভদ্রমহিলা আমাকে দেখে বললেন, “না মা, তোমাকে কাপড় পাল্টাতে হবে না। তুমি যা পরে আছো তাতেই আমরা খুশি।”
ছোটমা আমাকে ইঙ্গিতে বলেন সেই ভদ্রমহিলার পা ছুঁয়ে প্রনাম করতে, আমি তাঁর পা ছুঁয়ে প্রনাম করি। ভদ্রমহিলা আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেন, “ঠিক যে রকমের লক্ষ্মী চেয়েছিলাম সেরকম পেয়ে গেছি।”
ভদ্রমহিলা আমাকে বসার ঘরে আসতে বলে চলে গেলেন।
আমি ছোটমাকে বললাম যে আমার একটু সময় চাই। ছোটমা আমার দিকে একটু বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বললেন, “বেশি দেরি করিস না”
আমি বাথরুমে ঢুকে গেলাম চোখে মুখে জল দিতে। মনের আঙ্গিনায় এক অজানা ভিতি ভর করে এসেছে।
ছোটমা আমার কানেকানে বলেন, “পরী দয়া করে সব কিছু ভেস্তে দিস না, মা।”
আমি মাথা নাড়িয়ে ইশারায় জানিয়ে দেই যে আমি কিছুই করব না, তাদের চিন্তা করতে বারন করে দিলাম। বাথরুমের আয়নায় নিজের প্রতিফলনের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার প্রতিফলন আমাকে বলে, “শুচিস্মিতা অবশেষে তোমার ভবিতব্য তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রানখুলে হাসি মুখে বরন করে নাও তোমার আসন্ন ভবিষ্যৎ।”
আমি সেই প্রতিফলনকে বলি, “আমি প্রাণহীন এক শ্বেত পাথরের মূর্তি, আমি আমার ঋণ শোধ করতে যাচ্ছি!”

পরীর আত্মসমর্পণ (#03)
আমি বসার ঘরে ঢুকে আড় চোখে হিমাদ্রির দিকে তাকাই। সেদিন নিলাদ্রি আসেনি। হিমাদ্রি আর তাঁর বাবা মা এসেছিলেন। আমি হিমাদ্রির দিকে দেখে ভদ্রতার জন্য হাত জোর করে প্রনাম করি। হিমাদ্রি দাঁড়িয়ে প্রত্যুত্তরে আমাকে দেখে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানায়। সেই ক্ষণিকের মধ্যে আমি ওকে দেখে বুঝে নেই যে আমার চেয়ে বেশি লম্বা নয় হিমাদ্রি, ওর পাশে দাঁড়ালে হয়ত আমাকে বেশি লম্বা লাগবে ওর থেকে। বিগত কয়েক মাসে আমি অনেক রোগা হয়ে গেছিলাম।
হিমাদ্রির গায়ের রঙ একটু বেশি শ্যামবর্ণের, হয়ত কাজের জন্য গায়ের রঙ পুড়ে গেছে। মাথার সামনের দিকে চুল নেই, একটু টাক। নাকের নিচে পুরু গোঁফ, কালো ঠোঁট, থ্যাবড়া নাক। একটু ভুরি আছে, তাও আবার সুটের ভেতর থেকে অল্প বেড়িয়ে গেছে।
আমি ওর উলটো দিকের সোফার ওপরে বসে যাই। হিমাদ্রির বাবা আমাকে আমার পড়াশুনার ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন, চুপচাপ নিচু স্বরে তাঁর উত্তর দিলাম। এ যেন এক পরীক্ষার মতন মনে হল আমার।
হিমাদ্রির বাবা ছোটমাকে বললেন, “আমরা এক গৃহবধূ চাইছি।”
আমি একবার হিমাদ্রির দিকে তারপরে ছোটমায়ের দিকে তাকালাম। আমার হারানোর কিছু ছিলনা, আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকনাও। হৃদয়ের অন্তিম সাহসের কনা সঞ্চয় করে বললাম, “আমি স্কুলের টিচার হতে চাই।”
হিমাদ্রি এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছিল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে ভদ্রতার খাতিরে একটু হাসি। বাবু বাকিদের বলেন যে আমাদের দুজনকে একটু একা কথা বলতে দিতে, বাকিদের নিয়ে ঘর থেকে চলে গেলেন।
আমার বুক খুব জোরে জোরে ধুকপুক করতে শুরু করে দেয়। মনে হল যেন বুকের পাঁজর ভেঙ্গে হৃদপিণ্ডটা এই মাটিতে পরে গড়াগড়ি খাবে। আমার সামনে এক সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যাক্তি বসে, আমি তাঁর সামনে একটা পাথরের পুতুলের মতন বসে থাকি। সবাই বেড়িয়ে যাওয়ার পরে, অনেকক্ষণ আমাদের দুজনের মুখে কোন কথা ছিলান। নিস্তব্ধ ঘরের মধ্যে আমি আমার বুকের ধুকপুক শব্ধ যেন শুনতে পাই।
হিমাদ্রি কিছু পরে গলা খাকরে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি এই বছর প্রেসিডেন্সি থেকে পাস করেছ?”
আমি মাথা নাড়িয়ে জবাব দেই, হ্যাঁ।
হিমাদ্রি, “বেশ নাম করা কলেজ।”
আমি আবার মাথা নাড়িয়ে জবাব দেই, হ্যাঁ।
কোলের ওপরে আমার হাত জড় করে রাখা, আমি ছোটো টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকি। সেই টেবিলের কাঁচের প্রতিফলনে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি ওর দৃষ্টি আমার চেহারার ওপরে নিবদ্ধ।
হিমাদ্রি, “শুচিস্মিতা অনেক বিশাল নাম। তোমাকে ছোটো করে কি বলে ডাকা যায় বলতো?”
সেই প্রশ্ন শুনে মনে হল, আবার এক নতুন পরিচয়। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে মন করল না আমার। আমি চুপ করে থাকি।
হিমাদ্রির পরের কথা আমাকে হাসিয়ে দিল, “আচ্ছা, চুপচাপ থাকা ছাড়া আর কি কি করা হয় তোমার?”
আমি নিচের ঠোঁট কামড়ে লজ্জা ঢেকে নেই। হাসি হাসি মুখ করে ওর দিকে চোখ তুলে তাকাই। সেই প্রথম বার আমাদের চার চোখ এক হয়। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে হিমাদ্রি।
হিমাদ্রি বলে, “বাবার কথা অত মাথায় রেখ না। আমি কথা দিচ্ছি যে তুমি চাকরি করতে পারবে, আমি তাতে বাঁধা দেব না। আমি ধানবাদে অনেক স্কুল জানি, যেখানে তুমি খুব সহজে ফিসিক্স টিচারের চাকরি পেয়ে যাবে।”
ওর কথা শুনে আমার বুকে জল আসে, আমার বুক হালকা হয়ে যায়। আমি মাথা ঝুকিয়ে ওকে ধন্যবাদ জানাই।
হিমাদ্রি আমাকে বলে, “এত চুপচাপ কেন, তোমার সম্বন্ধে কিছু বলো? নিলাদ্রি নিশ্চয় আমার সম্বন্ধে কিছু বলেছে, তাও তোমার যদি কিছু প্রশ্ন থাকে তুমি জিজ্ঞেস করতে পারো।”
আমি নিচের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেই, “আমার কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। তোমার যদি কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে তাহলে তুমি জিজ্ঞেস করতে পারো, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে।”
বুক ভরে এক শ্বাস নেই আমি, মাথার ভেতরে কোন প্রশ্ন জাগেনা, বুকের ভেতরে কোন অনুভুতি জাগেনা। চারপাশের ছন্দ আমাকে দুলিয়ে দিতে চেষ্টা করে কিন্তু আমি অনড়, নিশ্চল। হিমাদ্রি আমার শান্ত চেহারার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ঘরের মধ্যে আবার এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছেয়ে যায়।
সেই নিস্তব্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমি শেষে ওকে বলি, “দুপুরে নিশ্চয় খেয়ে যাবে?”
সামনের দিকে ঝুঁকে আমার মুখের কাছে মুখ এনে হিমাদ্রি আমাকে বলে, “তুমি রান্নাও জানো?”
আমি আলতো মাথা নাড়াই, হ্যাঁ।
হিমাদ্রি হেসে বলে, “তাহলে ত খেয়ে যেতেই হচ্ছে।”
দুপুরে খাওয়ার সময়ে সবাই খেতে বসে আমার রান্নার খুব তারিফ করল। আমি সর্বক্ষণ ঠোঁটে এক মেকি হাসি মাখিয়ে ওদের পরিবেশন করে গেলাম।
ওরা চলে যাওয়ার পরে আমি নিজের ঘরে ঢুকে চুপচাপ বিছানার ওপরে বসে পরি। জানালার বাইরের একভাবে তাকিয়ে থাকি। চোখের সামনে এক তপ্ত বিস্তীর্ণ ফাঁকা মরুভুমি দেখতে পাই। সেই মরুভুমির ওপর দিয়ে এবারে আমাকে হেঁটে যেতে হবে। আমি জানিনা, সেই মরুভুমির মাঝে আমি কোন মরুদ্যান খুঁজে পাবো কি না, আমি শুধু এই টুকু জানি যে সেদিন থেকে আমার বুক এক শূন্য মরুভুমিতে পরিনত হয়ে গেছিল।
ছোটমা আমার ঘরে ঢুকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “হিমাদ্রি কে দেখে কেমন লাগল?”
আমি ছোটমায়ের প্রশ্ন শুনে খুব বিচলিত হয়ে উঠি। ছোটমা আমার মনের কথা জানেন, তাও আমাকে কেন এই প্রশ্ন করা। তিনি ভালো করে জানেন আমার কাকে ভালো লাগে। আমি ছোটমায়ের দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে উত্তর দেই, “তোমরা আগে থেকেই আমার জীবনের সবকিছু ঠিক করে ফেলেছ, তারপরে আমার আর কি বলার আছে।”
ছোটমা আমার পাশে বসে আমাকে বললেন, “পরী, হিমাদ্রির বাবা ধানবাদের নামি ব্যাক্তি, ওরা খুব বড়লোক। হিমাদ্রি ইঞ্জিনিয়ার, ভালো ছেলে। তোর জন্য অনেক সম্বন্ধ এসেছিল, আইএএস, আইপিএস, কিন্তু সেসব বাইরের। আমি তোকে বেশি দুরে পাঠাতে চাইনা রে মা। ধানবাদ কোলকাতা থেকে বেশি দুরে নয়, ট্রেনে শুধু মাত্র ছয় ঘন্টা লাগে, তুই আমার সাথে দেখা করতে যেকোনো সময় আসতে পারিস, আমি যেকোনো সময়ে তোর কাছে যেতে পারব।”
আমি মাথা দুলিয়ে বলি, ঠিক আছে।
ছোটমা আমার মাথায় গালে হাত বুলিয়ে মুখে হাসি ফুটাতে বলেন, আমি অনেক কষ্টে ছোটমার চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসি। কথায় কথায় জানতে পারি যে, হিমাদ্রির বাড়ি ধানবাদের হিরাপুর নামে এক জায়গায়। বাবা মায়ের সাথে একত্র পরিবার। ছোটো ভাই নিলাদ্রি, তাঁর বাবার কন্ট্রাক্টারির কাজে সাহায্য করে, হিমাদ্রির বাবা ধানবাদের নাম করা কয়লার কন্ট্রাক্টর। হিমাদ্রির মায়ের নাম রজনী কর্মকার, একজন গৃহবধূ।
সেই বছরের মাঝামাঝি আমার বিবাহের দিন ঠিক করা হয়। ছোটমা মৈথিলী আর মেঘনা বৌদিকে ফোন করে সব জানিয়ে দেন।
একদিন রাতে আমি কল্যাণীকে ফোন করে আমার বিয়ের কথা জানাই। কল্যাণী আমার মুখে সেই সংবাদ শুনে মর্মাহত হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপরে কল্যাণী আহত সুরে বলে, “আমি তোর বেদনাপ্লুত চেহারার সামনে যেতে পারবোনা রে পরী। আমার হয়ে দীপঙ্কর যাবে তোর বিয়েতে।”
আমি কপালে করাঘাত করে ধরা গলায় ওকে বললাম, “মেয়ে হয়ে জন্মেছিরে, ভাগ্যের পরিহাসের সামনে কি করে রুখে দাঁড়াব বল? এই সমাজ আমাদের বলিদান চায় পদেপদে, আমাদের জন্ম শুধু বলিদান দেওয়ার জন্য, রে কল্যাণী।”
কল্যাণী আর কোন কথা না বলে ফোন রেখে দেয়। সেইরাতে আমি আর ঘুমাতে পারি না। নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকার চিড়ে আমার কানে বেজে ওঠে আমার বলিদানের সানাইয়ের করুন সুর। সেই কান্নার সুরেও আমার চোখে জল আসেনা, জল শুকিয়ে গেছে।
পরের দিন সকাল বেলা উঠে মৈথিলীকে দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। অত ভোরে মৈথিলী আমাদের বাড়ি পৌঁছে যায়। বসার ঘরে বসে ছোটমায়ের সাথে কথা বলছিল মৈথিলী। আমাকে দেখতে পেয়ে, বসার ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে আমাকে আমার ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় ঠেলে।
ভুরু কুঁচকে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “একি করছ পরী?”
আমি প্রথমে ওর প্রশ্ন ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। আমি ওর মনের ভাবাবেগ তখন ঠিক ভাবে বুঝে উঠতে না পেরে ওকে প্রশ্ন করি, “কেন কি হয়েছে?”
আমার হাত ধরে বিছানার ওপরে বসিয়ে দিয়ে বলে, “তুমি বিয়ে করছ? কি ব্যাপার, তোমার ভালোবাসার কি হবে?”
আমি ফাঁকা বুক নিয়ে বিছানার ওপরে নখ খুঁটতে খুঁটতে বলি, “আমি আর কি করতে পারি, চুরনি?”
মৈথিলী আমার ব্যাথিত মুখখানি নিজের দিকে তুলে ধরে। ওর সমবেদনার স্পর্শে আমার চোখের পাতা ভিজে ওঠে। আমার মাথা নিজের বুকের ওপরে চেপে ধরে বলে, “কোথায় আছে ও, বলো। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব, তুমি চলে যাও। এখানে যা হবে সব আমি সামলে নেব, আমি তোমাকে এই ভাবে পুড়তে দেখতে পারব না।”
আমি ওর বুকে মাথা গুঁজে কেঁদে ফেলি, “আমার আর যাওয়ার কোন জায়গা নেই চুরনি। আমার ভালোবাসা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, আমার সাথে একবারও যোগাযোগ করেনি।”
আমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে আমাকে শান্ত করে বলে, “পরী একদম বলবে না যে তোমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। আমি সারা জীবন তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকব। যা কিছু হোক। কিন্তু তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে যে আমিও বড় নিরুপায়। বাড়ির সবাই এই ভাবে যে তোমার ছোটমা তোমার জন্য যা করছে তাই তোমার জন্য ঠিক।”
সেই প্রথম বার আমি ওর চোখে আমার দুখের জন্য জল দেখি। আমার ব্যাথায় ব্যাথিত হয়ে কাঁদে ওর হৃদয়। আমি ওর কোমর জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলি, “আমার মা নেই, ও আর আমার সাথে যোগাযোগ করলনা। আমি জানি না, ও কোথায় আছে, কেমন আছে। আমার আর কোন জায়গা নেই যাওয়ার চুরনি। আমি আমার ভালোবাসা হেরে গেছে চুরনি। ওর ভালোবাসার পরী এই সমাজের নিয়মাবলীর সামনে আত্মসমর্পণ করে দিয়েছে।”

সপ্তপদীর বহ্নিশিখা (#01)
নভেম্বরের শুরু থেকেই বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। বাড়ি ধিরে ধিরে মুখর হয়ে ওঠে, সেজে ওঠে আমাকে বিদায় জানাবার জন্য। আমি দিন গুনি, সোনার খাঁচা থেকে মুক্তির দিন, কিন্তু মনে এক অজানা আশঙ্কা ভর করে, ডানা মেলে উড়ে যাব, কিন্তু সামনের আকাশ ত আজানা অচেনা। কি আছে এই নব দিগন্তে সেই চিন্তায় মাঝে মাঝে রাতে ঘুম হয় না।
একদিন রাতে হিমাদ্রি আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে, “কেমন আছো শুচি? ঘুমিয়ে পরেছ নাকি?”
এক নতুন নাম পেলাম, শুচি। আমি উত্তর দিলাম, “না তবে ঘুমাতে যাবো। কি ব্যাপার, ফোন করেছ?”
হিমাদ্রি একটু ইতস্তত হওয়ার পরে জিজ্ঞেস করে, “এই রবিবারে দেখা করতে পারি?”
আমি, “তুমি ধানবাদ থেকে এখানে আসবে আমার সাথে দেখা করতে?”
আমি অবাক ওর প্রশ্ন শুনে।
হিমাদ্রি হেসে বলে, “হ্যাঁ, নিশ্চয়, কেন নয়। আমার কিছু প্রশ্ন আছে, সেগুলোর একটু উত্তর চাই, আর দুজনে পরস্পরকে একটু জেনে নেওয়া ভালো। তাই নয় কি, শুচি? একদিনের দেখায় কি আর মানুষ চেনা যায়।”
আমি, “বাড়িতে চলে আসো। ছোটমা বাবু তোমাকে দেখে খুব আনন্দিত হবেন।”
হিমাদ্রি, “কেন আমার সাথে একা বের হতে ভয় করছে?”
ওর হাসি মজার কোন ভাবাবেগ আমার হৃদয়কে নাড়াতে পারেনা। আমি শান্ত গলায় উত্তর দেই, “না, তবে ছোটমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।”
হিমাদ্রি, “না না, তাঁর দরকার পড়বে না। আমি তোমার ছোটমাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি, তিনি অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন। আমি তোমার বাড়িতে এসে তোমাকে নিয়ে কোথাও বেড়িয়ে পড়বো।”
আমি একটু রেগে যাই ওর উত্তর শুনে, “তুমি আমাকে একবারের জন্য জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করলে না? তুমি যখন নিজেই সব ঠিক করে নিয়েছ তাহলে আবার আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?”
আমি উত্তরটা বেশ কড়া সুরে দিয়েছিলাম। উত্তর দেওয়ার পরে আমার মনে হল একটু বেশি বলে ফেললাম হয়ত। ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম, “দুঃখিত, তোমাকে আঘাত করেছি বলে।”
হিমাদ্রি আমার কথা গায়ে মাখেনি, হেসে বলে, “ঠিক আছে শুচি, এত হতেই থাকে।”
পরের রবিবারে সকালে বেলা হিমাদ্রি আমাদের বাড়িতে আসে। ছোটমা ওকে দেখে খুব খুশি হন। আমি বেশি সাজিনি সেদিন। হিমাদ্রি আমাকে নিয়ে পিয়ারলেস ইনের, আহেলি রেস্টুরেন্টে গেছিলাম।
হিমাদ্রি আমাকে জিজ্ঞেস করে, “ছোটমা তোমার দূর সম্পর্কের দিদি, তাই না?”
আমি মাথা নাড়িয়ে জানাই, হ্যাঁ।
হিমাদ্রি, “তাহলে দিদিকে ছোটমা কেন ডাকো?”
আমি, “আমার মায়ের মতন তাই ডাকি।”
হিমাদ্রি, “আচ্ছা, বুঝলাম। আমার কিছু বলার আছে।”
আমি ভাবি, হটাত কি বলার থাকতে পারে এই সময়ে। আমি ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। হিমাদ্রি আমার মুখের ভাব দেখে মনের প্রশ্ন বুঝে ফেলে। হেসে বলে, “না না, সেই রকম কিছু না। তবে আমি একটু ড্রিঙ্ক করি আর সিগারেট খাই।”
আমি মৃদু হেসে মাথা দুলিয়ে বলি, “ওকে। তোমার কাজের চাপে তুমি খেতেই পার।”
হেসে বলে আমাকে, “তুমি খুব তাড়াতাড়ি সব কিছু বুঝে মেনে নাও দেখছি।”
আমি শুধু একটু হাসি, উত্তর দেই না।
হিমাদ্রি কিছু পরে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “বিয়ের পরে কোথায় ঘুরতে যেতে চাও? আমি শুনেছি তুমি পাহাড় খুব ভালোবাসো। কোথায় যাওয়া যেতে পারে, তুমি বল?”
পাহাড়ের নাম শুনে বুক কেঁদে ওঠে। আমি নিচু গলায় বলি, “না আমার পাহাড় বিশেষ ভালো লাগেনা। ওই পাহাড় চরতে গেলে রাস্তায় আমার মাথা প্রচন্ড ঘোরে।”
মিথ্যে কথা বলি আমি, পাহাড়ের নাম শুনলেই আমার সেই সুদর্শন তস্করের কথা মনে পরে যায়, আমাকে চুরি করে নিয়ে গেছিল সুদুর পাহাড়ে, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। বুক বেঁধে সেই জল পান করি আমি।
হিমাদ্রি, “আন্দামান কেমন হবে? আমি অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম আন্দামান যাওয়ার।”
কিছু পরে হিমাদ্রি আমাকে একটা প্রশ্ন করে। সেই প্রশ্ন আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়, পাঁজর কাঁপিয়ে দেয় ওর কথা। হিমাদ্রি, “তোমার ছোটমায়ের এক ছেলে আছেন, তাই না? তোমার বিয়েতে আসবে ত?”
আমার সারা শরীর সেই প্রশ্নের বাণে কেঁপে ওঠে। টেবলের নিচে প্রানপন শক্তি দিয়ে হাত মুঠি করে নিজেকে সামলে নেওয়ার প্রবল চেষ্টা করি। আমি ওর দিকে মাথা তুলে তাকাতে পারিনা। টেবিলের ওপরে তাকিয়ে কোনরকম মাথা নাড়িয়ে জানাই যে ও আসবে কি না, সেটা আমার জানা নেই।
হিমাদ্রি, “আচ্ছা শুচি, তোমার গাড়ির কোন রঙ পছন্দ?”
হিমাদ্রির সেই প্রশ্নে আমি আরও অবাক হয়ে যাই। হিমাদ্রি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে সেই প্রশ্ন।
আমি ওকে পালটা প্রশ্ন করি, “তুমি গাড়ি কিনছো?”
হিমাদ্রি হেসে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, মারুতি বালেনো।”
আমি হিমাদ্রির ঠোঁটের হাসি দেখে বুঝতে পারি যে বিয়ের যৌতুক হিসাবে বাবু ওকে গাড়ি দিচ্ছে, আমার নিরাপত্তার জামানত। রাগে দুঃখে কান লাল হয়ে আসে আমার। মনে মনে বলি, আর কত ঋণের বোঝা আমার এই ছোটো হৃদয়ে চাপিয়ে দেবে। আমি হিমাদ্রিকে জানাই যে আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাই, আমার শরীর ভালো লাগছিলনা, মাথা ব্যাথা করছিল ওর কথা শুনে। আমার কথা মেনে আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয় হিমাদ্রি।
হিমাদ্রি চলে যাওয়ার পরে, বাবু ছোটমা আমাকে তাদের ঘরে ডাকেন। আমি ঘরে ঢুকে দেখি, বাবুর সামনে একটা ফাইল খোলা। বাবু আমাকে কিছু কাগজ দেখিয়ে বলেন, “এই কিছু কাগজ পত্র তোমার জন্য রাখা।”
একটা ব্যাঙ্কের খাতা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, “তোমার মায়ের জমান কিছু ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স আছে তোমার নামে। তোমার বাড়ির অংশের টাকা তোমার নামে ফিস্কড ডিপসিট করে দেওয়া হয়েছে। তা প্রায় সাত লাখের মতন আর আমি এই তিন লাখের মতন আরও দিয়ে সেটা দশ লাখ করে দিয়েছি।”
আমি বিছানায় বসে কাগজ হাতে নিয়ে ছোটমাকে জিজ্ঞেস করি, “তোমরা গাড়ি দিচ্ছ সেটা একবার আমাকে জানাও নি ত?”
ছোটমা, “তোকে কে বলল?”
আমি জোর গলায় বললাম, “আমার প্রশ্নের উত্তর দাও ছোটমা। তুমি যৌতুকে গাড়ি দিচ্ছ কি না? গাড়ি কি আমার নিরাপত্তার দাম হিসাবে দেওয়া হচ্ছে?”
বাবু প্রত্যয়ের স্বরে আমাকে বলেন, “সোনা মা, গাড়ি যৌতুকে দিচ্ছিনা রে। তুমি আমাদের মেয়ের মতন, আমাদের কিছু ত একটা দিতে হত, তাই গাড়ি দিচ্ছি। আর গাড়ির অর্ধেক টাকা হিমাদ্রি অফিস থেকে লোন নেবে।”
আমি ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দেই, “আর কত ঋণের বোঝা আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে?”
ছোটমা আমার গালে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেন। সেই স্নেহের স্পর্শ আমার কাছে আগুনের তাপের চেয়েও উত্তপ্ত মনে হয়। আমি জোর গলায় তাদের বলি, “আমাকে ছেড়ে দাও। তোমাদের যা মনে আসে তাই করো, আমাকে জিজ্ঞেস করতে যেওনা, আমি একটু একা থাকতে চাই।”
কিছুদিন পরে হিমাদ্রি আর নিলাদ্রি আমাদের বাড়ি আসে। বাবু, ছোটমা সবাই আমরা পার্ক স্ট্রিটে মারুতির শোরুমে যাই, গাড়ি দেখার জন্য। হিমাদ্রি আমাকে গাড়ির রঙের কথা জিজ্ঞেস করে, আমার গাড়ির প্রতি সেইরকম কোন আগ্রহ ছিলনা, মনের মধ্যে এক চিন্তা, গাড়ি আমার নিরাপত্তার যৌতুক। আমি ওদের জানাই যে গাড়ি যেকোনো রঙের নিলে চলবে, কোন এক নির্দিষ্ট রঙের প্রতি আমার পছন্দ ছিলনা। নিলাদ্রি সাদা রঙের গাড়ির কথা বলে, বলে যে আমার যে রঙ পছন্দ সেটা কেনা উচিত। কিন্তু হিমাদ্রির কালো রঙ পছন্দ ছিল। হিমাদ্রি আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে যেন আমি কালোই পছন্দ করি। শেষ পর্যন্ত ওর মন রাখার জন্য কালো রঙের মারুতি বালেনো পছন্দ করা হয়।
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মৈথিলী আমাদের বাড়িতে চলে আসে। সারাক্ষণ মৈথিলী আমাকে আগলে রাখে, আমার পাশে পাশে থাকে, যতক্ষণ না আমি সপ্তপদীর বহ্নিশিখার সামনে বসে, “মিসেস. শুচিস্মিতা কর্মকার” এ পরিনত না হয়ে যাই।
কেনাকাটা জোর কদমে শুরু হয়ে যায়। আমি কোনদিন ছোটমায়ের সাথে বাজারে কেনাকাটা করতে যাইনা। বিয়ের সব কেনাকাটা মৈথিলী আর ছোটমা করেন। আমি শুধু একদিন ছোটমায়ের সাথে কলেজস্ট্রীট গিয়েছিলাম, যেদিন আমার জন্য লাল বেনারসি শাড়ি কেনা হয়। আমি সারাদিন নিজের ঘরে বই পরে বা রান্না ঘরে কাটিয়ে দিতাম। আমার চারপাশের কোলাহল আমাকে কোন ভাবে নাড়াতে পারেনা। হৃদয়ের মাঝে সর্বক্ষণ একটা অনন্ত শূন্যতা ভর করে থাকে।
একদিন তিস্তা আর দেলিসা কে ফোন করে জানাই আমার বিয়ের কথা। সেই সংবাদ শুনে ওরা খুব খুশি হয়। দেবব্রত তিস্তাকে নিয়ে একদিন আমার বাড়িতে আমার সাথে দেখা করতে আসে।
তিস্তা আমাকে জিজ্ঞেস করে, “শেষ পর্যন্ত মিতা তার মনের মানুষ খুঁজে পেল।”
অব্যাক্ত বেদনায় হ্রদয় মোচর দিয়ে উঠলো। মৈথিলী কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, তিস্তাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমরা ওর বন্ধু?”
তিস্তা মৈথিলীর প্রশ্নের গুড় উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়, হ্যাঁ। মৈথিলী ওদের দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলে, “না এমনি জিজ্ঞেস করছি।”
আমি মৈথিলীর আসল বেদনা বুঝতে পারি, কত নিরুপায়, শত চেষ্টা করেও এই পাখিকে উড়াতে পারল না।
একদিন সন্ধ্যের পরে ছোটমা আমাকে তাদের ঘরের মধ্যে ডেকে বসতে বলেন। ছোটমা আমাকে বলেন, “পরী, আমরা তোর ভালোর জন্যেই এইসব করছি। খুব শীঘ্র তুই নতুন জীবনে পা দিবি, তাঁর আগে তোকে কিছু বলতে চাই।”
আমি জিজ্ঞেস করি, কি? ছোটমা বলেন, “কয়েক দিনের দেখায় একটা মানুষকে সম্পূর্ণ চেনা যায়না। আমরাও ঠিক করে চিনতে পারিনা সামনের মানুষ কে। জানিনা তোর নতুন বাড়ি কেমন হবে। সবাই নিজের নিজের চেহারায় এক মুখোশ এটে থাকে। জীবন চলার পথে, মানুষের সাথে থাকতে থাকতে সেই মুখোশের আড়ালের মানুষ টাকে আমরা দেখতে পাই।”
আমি ছোটমায়ের কথার উদ্দেশ্য ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা, ছোটমাকে আমি জিজ্ঞেস করি, “তুমি কি বলতে চাও আমাকে? আমি জানি যে আমার সামনে এক নতুন জীবন, আমি জানিনা আমার ভবিষ্যতে কি লেখা আছে। তবে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব আমার নতুন জীবনে সবাইকে খুশি রেখে চলতে।”
ছোটমা আমার গালে আদর করে বলেন, “দেখ মা, হিমাদ্রি কয়লার খনিতে চাকরি করে আর তার বাবা মায়ের সাথে থাকে। ওর বাবা কয়লার কন্ট্রাক্টর। সেই কারনে জানাচ্ছি যে ওদের মানসিকতা কি রকমের হবে সেটা এখন ঠিক পরিষ্কার নয়। তোর নামে আমরা বেশ কিছু টাকা রেখে দিয়েছি যাতে কোনোরকমের কষ্ট তোকে ছুঁতে না পারে। প্রথমেই সেই সব টাকা পয়সার কথা খোলসা করে ওদের বলতে যাস না, ধিরে ধিরে ওদের মানসিকতা বুঝে নিজে বুঝে পদক্ষেপ নিস।”
ছোটমায়ের কথা শুনে রাগে দুঃখে চোখের পাতা ভিজে যায় আমার, “আমার বিয়ে কিছু দিন পরে আর আজ তুমি আমাকে বলছ যে যার সাথে আমি বিয়ে করতে চলেছি তাদের তুমি ভালো করে জানো না?”
চোখের কোল থেকে জল গড়িয়ে পরে, “আমাকে কি করতে বলছ তাহলে?”
ছোটমা, “কাঁদিস না, মা। তোর বিয়ের পরে, শুধু হিমাদ্রিকে বলসি কোলকাতার হেড অফিসে ট্রান্সফার নিয়ে চলে আসতে। তুই সবসময়ের জন্য আমার সামনে থাকবি তাহলে।”
ছোটমায়ের কথা শুনে মন বিরক্তিতে ভরে গেল, চোয়াল শক্ত করে ছোটমাকে বললাম, “ছোটমা, তুমি একি বলছ আমাকে? তুমি নিজের ছেলের কাছ থেকে আজ বিচ্ছুত, তোমার বুক কাঁদে তাঁর জন্য আর তুমি কিনা এক মা হয়ে এক ছেলেকে তাঁর মায়ের কাছ থেকে দুরে সরে যেতে বলছ?”
ছোটমা বুঝতে পারল আমার কথা, “পরী, আমি যা কিছু বলছি তোর ভালোর জন্য বলছিরে।”
আমি থাকতে না পেরে ডুকরে কেঁদে বলি, “ছোটমা, আমার কিসে ভালো কিসে মন্দ সেটা তুমি ভালো করে জানো। আর কেন আমাকে বারেবারে কষ্ট দিচ্ছ বলত।”
বাবু ঘর থেকে বেড়িয়ে চলে যান।
ছোটমায়ের চোখে জল, আমার মুখখানি দুহাতে আঁজলা করে তুলে ধরে বলে, “সোনা মা, তুই যা চাইছিস তা আমি তোকে দিতে পারিনা। পরী একটু বুঝতে চেষ্টা কর মা, সবার সামনে আমাদের মাথা নত হয়ে যাবে, সমাজ আমাদের কলঙ্কিত বলবে।”
আমি কেঁদে ফেলি ছোটমার কথা শুনে। বুকের মাঝে প্রচন্ড ব্যাথা শুরু হয়ে যায়, “ছোটমা আমাকে একটু একা থাকতে দাও।”
সেদিনের পর থেকে আমি নিজেকে যেন আরও গুটিয়ে নেই। এঁকে এঁকে বাড়িতে অতিথিরা আসতে শুরু করে। ইন্দ্রানিদি, চন্দ্রানিদি সপরিবারে বাড়িতে এসে পড়েন। শশাঙ্কদা, মেঘনা বৌদি দুষ্টুকে সাথে নিয়ে বাড়িতে আসেন। আমি দুষ্টুর সামনে যেতে পারিনা। ওর মুখ দেখে আমার বড় কষ্ট হয়, ও যেন আমার মনের আসল কথা বুঝে ফেলেছে।
একবার দুষ্টু আমাকে জিজ্ঞেস করে, “অভি কাকু আসবে না?”
আমি বহু কষ্টে ঠোঁটে হাসি মাখিয়ে ওকে বলি, “না রে আসবে না।”

সপ্তপদীর বহ্নিশিখা (#02)
অবশেষে সেইদিন আসে। আমার বিবাহ, ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের সোমবার। বাড়ি ভর্তি লোকজন, চারদিকে হইহই রইরই ব্যাপার। বিয়ে উপলক্ষে একটা বাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল, বরযাত্রী থাকার জন্য একটা হোটেল ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সকাল থেকে বাড়িতে সানাই বাজতে শুরু করে। সকাল বেলায় আমাকে এক রকম টেনে ঘুম থেকে তুলে দেওয়া হল। অনেক রাতে ঘুমিয়েছিলাম তাই চোখে তখন ঘুম মাখা ছিল। ছোটমা আর কয়েকজন মিলে দধিমঙ্গল করে আমাকে দই চিড়ে খাইয়ে দিল। বড়রা বলল যে আমাকে সারাদিন কিছু খেতে দেওয়া হবে না। মৈথিলী আমার দিকে চোখ টিপে ইশার করে যে খাওয়ার জন্য কোন চিন্তা নেই, ও ঠিক আমার জন্য খাবার নিয়ে আসবে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে ফেলি।
সকালে গড়িয়ে এলে নিলাদ্রি আমার জন্য গায়ে হলুদের হলুদ নিয়ে আসে। মৈথিলী সবার আগ আমাকে গায়ে হলুদ লাগিয়ে দেয়, আমি স্থানুর মতন দাঁড়িয়ে থাকি। মৈথিলী আমার চোখের দিকে তাকিয়ে গালে হলুদ লাগিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। তারপরে একে একে বাড়ির এয়োস্ত্রীরা আমাকে হলুদ লাগিয়ে দেয়। ছোটমা আমাকে স্নান সেরে নিতে বলেন। আমি স্নান সেরে বেড়িয়ে একটা কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি পরি। ছোটমার চোখে জল, কিছু কষ্টে কিছু আনন্দে। আমার হাথে একটা লোহার বালা পড়িয়ে দেন ছোটমা। আমি নিজের ঘরে ঢুকে যাই। তিস্তা দেলিসা বাড়ি পৌঁছে গেছে। আমার বিয়ে উপলক্ষে ওরা বেশ খুশি।
আমি একটু পরে বসার ঘরে যাই, বসার ঘরে পা দিতেই আমার পা মেঝেতে আটকে যায়। বসার ঘরের দেয়ালে একটা বিশাল পেন্টিং ঝুলছে, পেন্টিং টা সক্রেটিসের। সেই পেন্টিঙ্গের এক কোনায় সই করা “অভিমন্যু, 1991.” ছোটমা সেই পেন্টিঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে একমনে সেই দিকে তাকিয়ে থাকেন। সবার চোখ আড়াল করে চোখ মুছে নেন ছোটমা। বুঝতে কষ্ট হয়না যে মায়ের মন তাঁর পুত্রের জন্য কেঁদে উঠেছে। আমি চুপচাপ সরে এলাম সেখান থেকে।
ধিরে ধিরে বিকেল গড়িয়ে এল। আমাকে সাজাতে এক মহিলাকে ডাকা হয়েছিল। প্রথমে কপালে চন্দনের ফোঁটা, ভুরুর মাঝে সুন্দর একটা লাল টিপ, কপালে সুন্দর আঁকিবুঁকি। চোখের কোনে কাজল, এঁকে এঁকে রঙ মাখানো হয় আমার মুখে। প্রাণহীনাকে জীবন্ত করে তুলতে সবার যেন এক মরিয়া প্রচেষ্টা। লাল বেনারসি, লাল ব্লাউস আর লাল চেলিতে ঢেকে দেওয়া হয় আমার দেহ। আমি রক্তাত এক নারী, অতি সুন্দর করে সাজান।
মৈথিলী আমার সামনে বসে আমাকে এক এক করে সোনার গয়না পড়িয়ে দিতে শুরু করে। কানে বড় বড় দুটি ঝুমকো। গলায় একটার পর একটা সোনার হার। হাতে সোনার চুরি, চুড়, বালা ইত্যাদি। সারাক্ষণ আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, আমাকে সাজিয়ে তোলে মন ভরে। কারুর মুখে কোন কথা নেই। আমার বুক কেঁপে ওঠে ওর ভেজা চোখের পাতা দেখে, আমি কেঁপে উঠি, মৈথিলী জোর করে চেপে ধরে আমার হাত, শেষ চুড়ি পড়িয়ে দেয় আমার হাতে। সাজানোর পরে আমার মুখের দিকে তাকায় মৈথিলী, চোখের পাতা কেঁপে ওঠে ওর। আমার বুক কেঁপে ওঠে, আমার ঠোঁট কেঁপে ওঠে, আমি যেন এবারে ভেঙ্গে পড়বো। আমি ঠোঁট কামড়ে ধরি নিজেকে সামলানোর জন্য। মৈথিলী আমার মাথায় আঁচল টেনে দেয়। আমার গাল ছুঁয়ে সস্নহে আদর করে আর চোখের কোল মছে বারেবারে। এই পৃথিবীতে একমাত্র মৈথিলী জানে আমি কত নিরুপায়, আমার ব্যাথা দেখে মৈথিলী নিজের বুকের ভাষা হারিয়ে ফেলে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে আয়নায় দেখি। আয়নার প্রতিফলন এক নির্জীব প্রাণহীন নারীর, ঠোঁটে মেকি হাসি নিয়ে অতি সুন্দর সেজে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাড়ির সবাই আমার বিয়ে উপলক্ষে খুশি, একমাত্র আমি যার বিয়ে সে যেন এক নিস্তব্ধ প্রাণহীন মূর্তি।
দরজায় কেউ টোকা দেয়। মৈথিলী দরজা খুলে দেখে যে আমার বড়দা দরজায় দাঁড়িয়ে। সুমন্তদা ঘরে ঢুকে আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখেন। সস্নেহে আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলেন, “আমি তোর অভাগা দাদা রে, পরী। তোকে দেওয়ার মতন আমার কাছে কিছু নেই।”
আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেন, “এই পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই রে, তাই আমি আমার সম্পত্তি সব বিক্রি করে তোর নামে কিছু টাকা ফিক্সড করে দিয়েছি।”
আমি নিজেকে আর সামলাতে পারিনা। আমি বেদনায় প্রায় আঁতকে উঠি, “না, আমি এটা নিতে পারব না দাদা। তোমার কি হবে, তুমি কোথায় যাবে এর পরে।”
দাদা আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, পকেট থেকে একটা ছোটো বাক্স বের করে আমার হাতে দিলেন, আমি খুলে দেখলাম তাঁর মধ্য একটা হীরের আংটি আছে। দাদা আমাকে বললেন, “তোর বউদির সব গয়না আমি বিক্রি করে দিয়ে এই আংটি কিনেছি। তোর বৌদি নেই, এখানে থাকার আর কোন মানে নেই। আমি এবারে হরিদ্বার না হয় হৃষীকেশ চলে যাব।”
আমি বারেবারে মাথা নাড়িয়ে কেঁদে বলি, “তুমি শেষ পর্যন্ত আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? না, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারো না। না।”
আমার দু’চোখে অশ্রু বয়নি সেদিন, সেদিন দুচোখ দিয়ে বুকের রক্ত নেমে এসেছিল। মৈথিলী আমার মাথা কোলের মাঝে জড়িয়ে ধরে আমাকে শান্ত করার জন্য, বুক ফেটে চৌচির হয়ে যায় আমার। সেই শেষ বারের মতন আমি সুমন্তদাকে দেখি। ফিরে তাকালেন না দাদা, দরজা দিয়ে বেড়িয়ে চলে গেলেন চোখের জল মুছতে মুছতে।
আমি মৈথিলীকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠি, “আমাকে ছেড়ে যেওনা দাদা, আমি বড় অভাগী।”
আমার কান্না শুনে অনেকেই আসে ঘরের মধ্যে। মৈথিলী কাউকে ঢুকতে দেয়না। ওর চোখেও সেদিন আষাঢ়ের বারিধারা নেমে আসে। ধরা গলায় আমার চোখের জল মুছিয়ে, আবার সাজিয়ে তুলে বলে, “পরী সময় হয়ে এসেছে।”
দরজার বাইরে থেকে ছোটমা আমাকে ডাক দিলেন, “পরী আর কতক্ষণ, দেরি হয়ে যাবে যে। বরযাত্রী কিছু পরেই চলে আসবে। তাড়াতাড়ি কর।”
মৈথিলী উত্তর দিল, “একটু সময় দাও আমাদের, আমি ওকে নিয়ে আসছি।” আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হাসি টেনে আমার চোখের জল মুছিয়ে বলে, “এবারে যেতে হবে, পরী।”
আমি ধিরে ধিরে উঠে দাড়াই, আমার ঘরের চার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখি। বইয়ের তাক ছুঁয়ে তাকে বিদায় জানাই, আমার বিছানা ছুঁয়ে তাকে বিদায় জানাই। শেষ বারের মতন আমার পড়ার টেবিল ছুঁয়ে তাকে বিদায় জানাই।
ছোটমা কিছু পরে আমার ঘরে ঢুকে আমাকে দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলেন, গালে হাত দিয়ে ধরা গলায় বলেন, “সোনা মা, তোকে খুব সুন্দর লাগছে দেখতে।”
আমি ছোটমায়ের স্নেহের পরশে গলে যাই, গলা জড়িয়ে কেঁদে ফেলি, “মা আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
আমাকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন, “সোনা মা, বিয়ের আগুনে তোকে তোর অতীত জ্বালিয়ে দিয়ে এক নতুন জীবন শুরু করতে হবে।”
আমি মাথা নাড়াই, হ্যাঁ। তিস্তা আর মৈথিলীর সাথে আমি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাই।
বিয়েতে আমার সব বন্ধু বান্ধবীরা এসেছিল। একে একে আত্মীয় সজ্জনেরা এসে আমাকে অভিবাদন জানিয়ে গেল। দেবব্রত আর তিস্তা কে দেখলাম। তিস্তা বিয়ের সময়ে একটা সুন্দর শাড়ি পড়েছিল। ওর সব থেকে ভালো বান্ধবীর বিয়ে, খুব আনন্দিত। আমি ওকে দেখে হেসে জিজ্ঞেস করি, “কিরে তোদের কি খবর, সব ভালো?”
আমার কথা শুনে দেবব্রতর দিকে তাকিয়ে লাজুক হেসে বলে, “বড় শয়তান ছেলে।”
ওর লাজুক হাসি দেখে আমার খুব ভালো লাগে। দেবব্রত আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরে, পেছনে তিস্তা। আমি ওকে দেখে একটু ঘাবড়ে যাই, কি করতে চলেছে ছেলেটা। দেবব্রত আমার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কাঁপা গলায় বলে, “মিতা, আমাদের ভুলে যাবে না ত? আমি আমার ভালোবাসা শুধু তোমার জন্য ফিরে পেয়েছি, আমাদের সব কিছু তোমার দেওয়া।”
তিস্তা কেঁদে ফেলে, “আমি খুব খারাপ মেয়ে ছিলাম। সেদিন গ্লোবে যদি তুমি আমাকে পথ না দেখাতে তাহলে হয়ত আমি বয়ে চলে যেতাম।”
তিস্তা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে, “আমাদের ভুলে যেওনা।”
আমি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করে বলি, “এই পাগলি মেয়ে, এই রকম করে কেউ কাঁদে নাকি? আমি তোদের কি করে ভুলে যাই বলত? আমি তোদের বিয়েতে নিশ্চয় আসব, কথা দিচ্ছি।”
দেলিসা আর দানিস কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। দানিস আমার কথা শুনে চেঁচিয়ে বলে, “আপা আপা, আমার কথা ভুলে গেলে। আমার বিয়েতে আসবে না?”
আমি দানিসকে কাছে ডেকে বলি, “ওরে ছেলে, আমি তেপান্তরের মাঠে যাচ্ছি নারে, আমি ধানবাদ যাচ্ছি। আমি যেখানেই থাকি না কেন, তোদের বিয়েতে নিশ্চয় আসবো।”
এমন সময় ইন্দ্রানিদি আমার কাছে এসে বলেন, “তুই কোনদিন আমাদের বম্বের বাড়িতে যাস নি। এবারে বর কে নিয়ে একবার যাস।”
আমি উত্তরে মৃদু মাথা নাড়িয়ে বলি, ঠিক আছে নিয়ে যাব। সবার প্রশ্ন, সবার আব্দার, সবার খুশি, আমি চেহারায় এক নকল আনন্দ মাখিয়ে সবার আব্দার রাখি।
নিলাদ্রি এক সময়ে আমার কানে এসে ফিসফিস করে বলে যায়, “বৌদি তোমাকে দারুন দেখতে লাগছে।”
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলি।
সেই আনন্দের ক্ষণে আমার চোখ আমার বড়দা সুমন্তদা কে বারেবারে খুঁজে বেড়ায়। মৈথিলী সর্বদা আমাকে আগলে রাখে, আমি ওকে বড়দার কথা জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দেয় যে বড়দার ট্রেন রাতে, তাই বড়দা চলে গেছেন। বড়দা হয়ত বুঝতে পেরেছিল তাঁর ছোটো বোনের মনের কষ্ট, তাই হয়ত আমার চোখের জল আড়াল করে নিজেকে এই বিশাল পৃথিবীর বুকে হারিয়ে দিয়েছেন।
দীপঙ্কর কে দেখে আমি খুব আনন্দিত হয়ে উঠি, আমার প্রানের বান্ধবী কল্যাণী অচিরে মা হতে চলেছে। আমি দিপঙ্করকে জিজ্ঞেস করি কল্যাণীর কথা। দীপঙ্কর আমাকে ফোন ধরিয়ে দিয়ে কল্যাণীর সাথে কথা বলতে বলে।
আমি ফোন ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি, গলার কাছে এক অব্যক্ত ব্যাথা দলা পাকিয়ে ওঠে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, “কেমন আছিস তুই?”
কল্যাণী ওপর পাস থেকে ফুঁপিয়ে ওঠে, “আমি তোর সাথে কোনদিন কথা বলব না, তুই ফোন রেখে দে।”
আমি কানের ওপরে চেপে ধরি ফোন, যদি ওর নিস্বাসের আওয়াজ শোনা যায়। আমি চোখের জল মুছে দিপঙ্করের হাতে ফোন ধরিয়ে দেই।
আমি নিরুপায়, সেই সময় কে আমি থামিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হায় এই প্রকৃতির নিয়ম, সময় কারুর জন্য অপেক্ষা করে থাকেনা। রাত বাড়তে শুরু করে, বিয়ের লগ্ন আসন্ন।
ছোটমা আমার কাছে এসে বলেন, “সোনা মা, সময় হয়ে এসেছে।”
এ যেন বলির জন্য ডাক!
শশাঙ্কদা, সুব্রত, দেবব্রত, দানিস চারজন মিলে আমাকে পিঁড়িতে বসিয়ে বিয়ের মন্ডপের দিকে নিয়ে যায়। বিয়ের মন্ডপে রইরই হইহই শুরু হয়ে যায় কনে দেখে। সবার চেহারায় আনন্দের হাসি, আমি সাজান এক মূর্তির মতন নকল হাসি নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে থাকি।
ওর সামনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত আমাদের মালা বদল হয়ে গেল। আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। ওর চোখে কেমন একটা হাসি, যেন অবশেষে একটা যুদ্ধ জিতে নিয়েছে। আমি ওর চোখের হাসি দেখে লজ্জা পেয়ে গেলাম, শেষ পর্যন্ত আমার মনে এক লাজুক ভাব ফুটে উঠল সেই নকল খুশির মাঝে।
বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়লাম দুজনে। বাবু আমার কন্যাদান করবেন, হোমের স্থানে বসে আছেন বাবু। সেই সকালে বৃদ্ধির সময়ে বাবুর সাথে দেখা হয়েছিল, সারাদিনে বাবু আমার সামনে আসেন নি। বাবুর মুখ বড় গম্ভির, একটু বেদনা মাখানো।
পিতলের কলসের দুপাশে বসিয়ে দেওয়া হল আমাকে আর হিমাদ্রিকে। হিমাদ্রির হাতে আমার হাত তুলে দেওয়ার সময়ে বাবু চোখের কোল মোছেন। ব্রাহ্মনের মন্ত্র, প্রদীপের উত্তাপ, ধুপকাঠির ধোঁয়া, সব মিলিয়ে এক অধভুত অনুভুতি আমার শরীরে ভর করে। বিয়ের মন্ত্র শুরু হয়। মৈথিলী আমার বেনারসির লাল আঁচল হিমাদ্রির সাদা জোড়ের কোনে বেঁধে দিল। আমার জীবন অবশেষে এক অচেনা অজানা ব্যাক্তির ভাগ্যের সাথে বাঁধা পরে গেল। হোমের আগুন জ্বলে ওঠে। সপ্তপদীর ডাক আসে, সেই বহ্নিশিখাকে সাক্ষী করে নিতে হবে জীবনের একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞা। এই কি আমি চেয়েছিলাম? আমি চোখ বন্ধ করে নেই কিছুক্ষণের জন্য। চোখ খুলে ছোটমা আর মৈথিলীর দিকে তাকাই। মৈথিলীর চোখে জল, ঠোঁটে হাসি, ছোটমা মৃদু মাথা নাড়িয়ে আমাকে আশীর্বাদ জানায়। এক এক পাঁকে আমি আমার অতীত সেই সপ্তপদির বহ্নিশিখায় পুড়িয়ে ছারখার করে দিলাম। বুক আর জ্বলে ওঠেনি সেই অতীত জ্বালিয়ে দেওয়ার সময়।
সিঁদুর পরানোর সময় এসে গেল। হিমাদ্রি আঙটি সিদুরে ডুবিয়ে আমার সিঁথিতে ছুঁইয়ে দিয়ে পেছন দিকে টেনে দিল। প্রথমে সেই আংটি আমার কপাল ছুঁয়ে যায়, ঠিক যেখানে ওর ঠোঁটের পরশ লেগে। আমি চোখ বন্ধ করে নেই, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, যে, যেখানে ওর ঠোঁটের পরশ লেগে, সেখান সেদিন অন্য একজন সিঁদুর পড়িয়ে নিজের করে নেবে। বুক একটু কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু থামিয়ে দিলাম সেই কম্পন, অনেক আগে চলে এসেছি আমি। পিছনে ফেরার আর পথ নেই আমার। সিঁদুর পরানো শেষ কিন্তু আমার নাকের ওপরে এক ফোঁটাও সিন্দুর পরে না। সবাই চেঁচিয়ে ওঠে, নাকে যে সিঁদুর পরেনি, সবার একটা অন্ধবিশ্বাস যে কনের নাকের ওপরে সিঁদুর পড়লে সেই বর কোনে কে খুব ভালবাসে। মৈথিলী আলতো করে আমার মাথা সামনের দিকে ঠেলে দেয় কিন্তু তা সত্তেও একফোঁটা সিঁদুর আমার নাকের ওপরে পরে না। আমি ওদের কান্ড দেখে হেসে মনে মনে ফেলি, কিন্তু কেউ তাতে ক্ষান্ত নয়।
মৈথিলী সবার উদ্দেশ্যে জোর গলায় বলে, “ও একটা গরু নয় যে বারেবারে মাথা নাড়াবে।”
ওখানে দাঁড়ান সবাই ভাবে যে মৈথিলী আমাকে আগলে রাখছে কারন আমি সারা দিনের উপসে আর বিয়ের হট্টগলে হয়ত ক্লান্ত, কিন্তু আমি জানতাম ওর মনের আসল অভিপ্রায়। মৈথিলী প্রানপন চেষ্টা করে যায় আমাকে সব বিপদের থেকে আগলে রাখতে কিন্তু ভবিতব্যের সামনে সবাইকে হার মানতে হয়, অগত্যা মৈথিলী তার সাধের ননদিনিকে বাচাতে সক্ষম হয় না শেষ পর্যন্ত।
আমার চোখের পাতা ভিজে ওঠে, চোখের কোন থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে, সেই অশ্রু তে অনেক কিছু মেশানো ছিল সেদিন। আমার দুঃখ আমার কষ্ট, আমার বেদনা, আমার রাগ, আমার ভালোবাসা, অজানার ডাক, অনন্ত শূন্যতা অনন্ত অন্ধকার। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, সত্যি কি আমি খুশি? আমি জানিনা। আমি ত ছোটমা আর বাবুর ঋণ শোধ করেছিলাম, নিজের জীবনের দাম দিয়ে। হৃদয়ের এক এক পাঁজর দিয়ে বানানো একটা বাক্সে আমি আমার অতীত, আমার ভালোবাসা, আমার স্বপ্ন তালা বন্ধ করে সেই পাঁজরের বাক্স ছুঁড়ে ফেলে দিলাম অতল সমুদ্রের গহিনে।
দু’নয়ন ভাবলেশ হীন, ঠোঁটে নকল হাসি টেনে ঝাপসা দৃষ্টি হোমের আগুনে নিবদ্ধ। আমার সামনে সপ্তপদীর লেলিহান শিখায় “পরী” জ্বলছে, “মিতা” আমার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল, বিয়ের পিঁড়িতে বসে এক নতুন “শুচি”, শুচিস্মিতা কর্মকার!
অসমাপ্ত

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment