মিষ্টি মূহুর্ত [২য় পর্ব] [১]

লেখক :— a-man & বিচিত্রবীর্য
Typist :— বিচিত্রবীর্য

দ্বিতীয় পর্ব — আসা যাওয়ার মাঝে
(১)
আকাশ জন্মানোর আগে পর্যন্ত সুচির একটাই বন্ধু ছিল। সেই বন্ধু হলো তার দিদি সুমি। সুমি যখন সকালে স্কুলে যেত তখন সুচি তার পুতুলের সাথে খেলতো। এখন সে আর একটা পুতুল পেয়েছে খেলার জন্য । পুতুলটা জীবিত। আর সেই পুতুলের নাম আকাশ। সুমি স্কুলে গেলেই সুচি তার পুতুল গুলো নিয়ে আকাশের কাছে চলে আসে খেলতে। আর এই পুরো সকালটা সুচি খাটে বসে আকাশের সাথে পুতুল খেলে। খেলাটা অবশ্য শুধু সুচি নিজেই খেলে আর আকাশ হাত পা ছুঁড়ে ফোকলা দাঁতে হাঁসতে হাঁসতে সুচির খেলা দেখে। বলা বাহুল্য আকাশ সুচির সঙ্গ খুব উপভোগ করে।
এই সুযোগে আকাশকে সুচির কাছে রেখে দিয়ে স্নেহা দেবী বাড়ির কাজ করেন। শুভাশীষ বাবু স্নান করে খেয়ে দেয়ে আটটা নটার দিকে অফিসে চলে যান। অফিসের তিনি একাই মালিক। তাই কোন তাড়াহুড়ো করেন না। কিন্তু দেবাশীষ বাবু তার ছেলেকে শিখিয়েছিলেন — প্রথমে কর্ম তারপর সংসার। ফলস্বরূপ আকাশ নিজের মায়ের পর যার মুখ সবথেকে বেশি দেখতে লাগলো সে হলো আমাদের তিন বছরের সুচিত্রার ।
প্রতিদিন সকালে সুচি তার চার পাঁচটা পুতুল নিয়ে আকাশের কাছে চলে আসে । এই সুযোগে তার মা একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। সুচির পুতুলের মধ্যে তিনটে বিভিন্ন ধরনের মেয়ে পুতুল আছে যাদের সে রাজকুমারী বলে । আর আছে তিনটে ছেলে পুতুল মানে রাজকুমারের পুতুল। তাদের সে স্নান করায়, নতুন নতুন ড্রেস পড়ায়, খাওয়ায়, ঘুম পাড়ায় এবং কয়েকবার বিয়ে দিয়ে দেয়। সুচির মা পুতুল গুলোর জন্য ছোট ছোট কাপড় রেখে দেন।
আকাশ জন্মানোর দুই তিন দিনের মাথায় স্নেহা দেবীর মা বাবা এলেন । স্নেহা দেবীর বাবার নাম সুধাংশু আর মায়ের নাম বীণাপাণি দেবী। দুজনেই ষাটোর্ধ্ব গুরুজন। দুজনেরই মাথায় কাঁচা পাকা চুল । স্নেহা দেবীরা তিন ভাই বোন। বড়ো এক দাদা ছিল । স্নেহা দেবীর যখন পাঁচ ছয় বছর বয়স তখন তার দাদা মারা গেছিল। সুধাংশু বাবু আর বীণাপাণি দেবী রাতে এসছিলেন। সকালে বীণাপাণি দেবী দেখলেন একটা ছোট মিষ্টি মেয়ে তার পুতুলের বাক্স নিয়ে আকাশের সাথে খেলতে এসছে। বীণাপাণি দেবী মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন “ মেয়েটা কে রে ? খুব মিষ্টি দেখতে তো ! „
“ এ আমাদের পাশের ফ্লাটের সুচেতাদির ছোট মেয়ে । „ বললেন স্নেহা দেবী। বীণাপাণি দেবী সুচির দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই আর একবার বললেন —ভারী মিষ্টি দেখতে তো।
তারপর তারা আরও দুই দিন থেকে আকাশ এবং সুচিকে অনেক ভালোবাসা এবং আদর দিয়ে নিজের বাড়ি চলে গেলেন।
আকাশের সাথে খেলতে খেলতেই কয়েক মাস কেটে গেল সাথে সুচির জন্মদিন চলে এলো। সুমি উচ্চতায় না বাড়লেও আকাশ বেড়েছে । গালের লালচে রঙটা আর নেই। বড়ো বড়ো গোল দুটো চোখ, গোল মুখ আর ফোকলা দাঁত ( এখনও একটাও দাঁত ওঠেনি ) নিয়ে সারাদিন হাঁসতে থাকে আর ক্ষিদে পেলেই কাঁন্না শুরু। এখন আকাশ খাটের এদিক ওদিক গড়াগড়ি খায়। খাট থেকে যাতে পড়ে না যায় তার জন্য স্নেহা দেবী আকাশের চারিদিকে বড়ো বড়ো বালিশের দূর্গ বানিয়ে দেন। দোলনায় আকাশ থাকতে চায় না। দোলনায় শোয়ালেই কাঁদতে শুরু করে তখন আবার খাটে রাখতে হয়। স্নেহা দেবী এর কারন বুঝতে পারেন নি।
সুচির জন্মদিনে সুমি স্কুল গেল না । সাতটার দিকে সুচেতা দেবী সুচিকে স্নান করিয়ে একটা নতুন লাল টুকটুকে ছোট ছোট কালো রঙের টেডি বিয়ার আঁকা ফ্রগ পরিয়ে দিলেন । তারপর সুচির বাবা সুচির কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে মাথায় ধান আর দুব্বো ঘাস দিয়ে “ বড়ো হও মা । „ বলে আশীর্বাদ করলেন। আজ অফিস ডে তার উপর সরকারি অফিসের কেরানি। তাই তিনি আশির্বাদ করেই অফিস চলে গেলেন। তারপর সুচেতা দেবী আর স্নেহা দেবীও আশীর্বাদ করলেন সাথে সুমিও । স্নেহা দেবী সুচিকে উপহার দিলেন একটা সোনার গলার চেন। তারপর নিজের ঘরে চলে গেলেন । ষাটোর্ধ্ব রহমত চাচা তার দিনের কাজ শুরু হওয়ার আগে সুচিকে একটা পুতুল উপহার দিয়ে আশীর্বাদ করে গেলেন। বলা বাহুল্য পুতুল পেয়ে সুচি খুব খুশি হলো।
সুচেতা দেবী পায়েস বানালেন । সেই পায়েস সবাই খেল । সুচি তিন চার মিনিট নিজের মনে মনে হিসাব করলো — বাবা খেয়েছে, মা খেয়েছে , দিদি খেয়েছে , কাকি খেয়েছে , দাদু খেয়েছে ( রহমত চাচা ) । তারপর কিছুক্ষণ পর মনে পড়লো আকাশ খাইনি !
কথাটা মনে পড়তেই পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে আকাশের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে খোলা দরজার দিকে ছোট ছোট পায় হাঁটতে শুরু করলো সুচি । সুচিকে পায়েসের বাটি হাতে ঘরের বাইরে যেতে দেখে সুচেতা দেবী জিজ্ঞাসা করলেন “ এই মেয়ে ! কোথায় চললি ? „
“ আকাস তো পায়েস খাইনি ! „ মায়ের দিকে ঘুরে বললো সুচি ।
সুচেতা দেবী দৌড়ে এসে সুচির হাত থেকে পায়েসের বাটি নিয়ে নিলেন “ বোকা মেয়ে ! আকাশের এখন এইসব খেতে নেই । „
সুচি তখন সবে ঠোঁট ফোলাতে শুরু করেছে । এইভাবে হঠাৎ হাত থেকে পায়েসের বাটি কেড়ে নেওয়ার জন্য বেশ দুঃখ পেল সুচি। সুচির ঠোঁট ওল্টানো দেখে মেয়েকে শান্ত করার জন্য সুচেতা দেবী বললেন “ আকাশের এখনও খাওয়ার বয়স হয়নি যে ! „
সুচি মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তার মা বলে চলে “ আর কয়েক মাস পর আকাশের অন্নপ্রাশন হবে। তারপর ও সবকিছু খেতে পারবে। „
সেইদিন থেকে সুচি অপেক্ষা করতে লাগলো কবে আকাশের অন্নপ্রাশন হবে। কিন্তু দুই তিন দিন যেতে না যেতেই সে সবকিছু ভুলে গেল।
দেখতে দেখতে আকাশের বয়স সাত মাস হয়ে গেল। আকাশ এখন বসতে পারে আর গড়াগড়ি খেতে পারে । অন্নপ্রাশনের জন্য ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করলেন স্নেহা দেবী। সমস্ত টেবিল আলমারি খাটের তলা পরিষ্কার করলেন। কোনায় কোনায় লেগে থাকা মাকড়সার বোনা জাল পরিষ্কার করলেন। মেঝে মুছলেন । একদম চকচকে করে তুললেন নিজেদের ফ্ল্যাটটাকে।
খাটের তলা পরিষ্কার করার সময় পিছনের অন্ধকার কোনায় একটা বাক্স পেলেন। টিনের মাঝারি আকারের বাক্স । তাতে মরচে পড়ে গেছে। তাতে তালা দেওয়া ছিল না । সেটা খুলে তিনি অনেক কিছু পেলেন। সবই তার স্বামীর ছোটবেলার জিনিস ও খেলনা। কিন্তু যেটা তাকে সবথেকে বেশি অবাক করলো সেটা হলো একটা দাবার বোর্ড। অবাক হওয়ার কারনটা হলো বিয়ে করে তিনি এসছেন দেড় দুই বছর হতে চললো কিন্তু তিনি স্বামীকে কখনোই দাবা খেলতে দেখেননি। খেলা তো দূরে থাক দাবার নাম করতেও কখনো শোনেননি স্নেহা দেবী। তাই তিনি রাতে শুভাশীষ বাবু বাড়ি ফিরলে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন “ তুমি দাবা খেলো ? „
“ খেলি না । খেলতাম এককালে। কেন বলোতো ? „ অফিস ফেরত কোর্ট খুলতে খুলতে বললেন আকাশের বাবা।
“ খাটের নীচে পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা বাক্স পেলাম তাতে এই দাবার বোর্ড ছিল । „ বলে ড্রেসিং টেবিলে রাখা দাবার বোর্ডটা হাতে তুলে দেখালেন স্নেহা দেবী ।
আকাশের বাবা দাবার বোর্ড টা দেখতেই তার ছোটবেলার কতো স্মৃতি মনে পড়ে গেল। কি সুন্দর ছিল দিনগুলো । কোথায় গেল সেইসব দিন ? কে ছিনিয়ে নিল সেই স্মৃতি মধুর ছোটবেলাটা ? স্ত্রীয়ের হাতে ধরা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে একটা গভির নিশ্বাস ছাড়লেন। তারপর বললেন “ খেলতাম এককালে । এখন খেলার সময় আর খেলার লোক দুটোই আমার কাছে নেই। রেখে দাও ওটা। ছোটবেলার স্মৃতি। „ বলে তিনি হাত মুখ ধুতে চলে গেলেন।
অন্নপ্রাশনের কিছু দিন আগে শুভাশীষ বাবু একটা canon এর ক্যামেরা কিনে আনলেন। অন্নপ্রাশনের আগের দিন এলেন স্নেহা দেবীর মা বাবা । সাথে আরো একজন এলেন । নাম স্নেহাংশু। সম্পর্কে ইনি স্নেহা দেবীর ছোট ভাই হন । স্নেহাংশু বাবুর বয়স পচিঁশ। মাঝারি উচ্চতার। দেখতে সুন্দর , কালো ঘন চুল , পুরুষালী চেহারা কিন্তু একটু কালো । দিদির মতোই গায়ের রং ছিল একসময়। কিন্তু একটা প্রাইভেট কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার হওয়ার জন্য মাসের আঠাশ দিন তাকে রাজ্যের বাইরে থাকতে হয়। এই এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির জন্যেই তার গায়ের রং একটু চেপে গেছে। স্নেহা দেবীর বাবা এটা একদম পছন্দ করেন না। তিনি তাই চাইছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একমাত্র ছেলের বিয়ে দিয়ে দিতে।
আকাশ জন্মানোর পর এই অন্নপ্রাশনের সময় ভাই এসছে বলে স্নেহা দেবী প্রথম খুব অভিমান করলেন তারপর রাগ করে বেশ তিন চারটে কথা শুনিয়ে দিলেন ভাইকে । স্নেহাংশু বাবু চুপচাপ মাথা নিচু করে দিদির সব কথা শুনলেন বা হজম করলেন । ছোটবেলা থেকেই বড়ো দিদিকে একটু ভয় পান স্নেহাংশু বাবু।
পশু প্রেমী স্নেহাংশু বাবু এসেই আকাশের কাছে উপহার দিলেন একটা Golden ratriver এর ছোট বাচ্চা। আকাশ সেটা পেয়ে খুব খুশি হলো। স্নেহা দেবী এই কুকুরের নাম রাখলেন বাদশা। বাদশাও আকাশকে পেয়ে খুব খুশি হলো। দেখে বলা যাবে না বাদশা বেশি খুশি নাকি আকাশ !
দিনটা রবিবার। পরিষ্কার আকাশ। ছুটির দিন তাই কেউ অফিস গেলেন না। কেউ স্কুলেও গেল না। ভোরে পাখির কিচিরমিচির শুনতেই মা মেয়ে স্নেহা দেবী আর বীণাপাণি দেবী মিলে রান্না শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর সুচেতা দেবীও এলেন সাহায্য করতে । রান্না করার ফাঁকে তিনজন মিলে খুব গল্প করলেন মাঝে বীণাপাণি দেবী সুচেতা দেবীকে জিজ্ঞেস করলেন “ তোমরা কয় ভাইবোন ? „
“ মাসিমা , আমরা চার ভাইবোন । „ বয়সে বীণাপাণি দেবী সুচেতা দেবীর মায়ের থেকে কিছুটা বড়ো। তাই মাসিমা ডাকাই সমীচীন মনে করলেন সুচির মা।
“ তারা থাকেন কোথায় ? „
“ আমার বাপের বাড়ির হাওড়াতে । আমি একমাত্র বোন। বাকি দাদাদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ হয়ে গেছে। বাবা মা বড়দার কাছেই থাকেন। „ বললেন সুচেতা দেবী। স্নেহা দেবী এইসব তত্ত্ব আগে থেকেই জানেন তাই তিনি আগ্রহ প্রকাশ করলেন না।
বড়ো দেওয়াল ঘড়িতে ডং ডং করে দশটা বাজতেই একজন পুরোহিত ঠাকুর এলেন। নাম রাধানাথ ব্যানার্জী। মাঝারি উচ্চতার একটু বেশিই শ্যাম বর্ণ। পড়নে আছে একটা সাদা ধুতি আর লাল রঙের হরি নামাঙ্কিত গেরুয়া পাঞ্জাবি। মাথায় বেশি চুল নেই । চল্লিশ পয়ঁতাল্লিশ বয়স হলেও মুখের চামড়া এখনও গুটিয়ে যাইনি। সব জায়গায় হেঁটেই যাতায়াত করেন তাই পেট বাইরে বার হতে পারেনি। তিনিই সমস্ত আয়োজন করলেন।
পুরুষরা নতুন পাঞ্জাবি পাজামা আর মহিলারা নতুন শাড়ি পড়ে তৈরি হয়ে নিলেন। বেশ বেলার দিকে আকাশকে স্নান করিয়ে একটা হলুদ রঙের ছোট পাঞ্জাবি পড়িয়ে দেওয়া হলো। আকাশকে মনে হচ্ছিল ছোট্ট গোপাল শুধু মাথায় ময়ূরের পালক আর হাতে বাঁশিটা অনুপস্থিত। বাচ্চা বাদশা কে আগেই অন্য ঘরে বন্ধ করে দেওয়া হলো তারপর লিভিং রুমের সোফা গুলো দেওয়ালের দিকে সরিয়ে মেঝে পরিষ্কার করে সাজানো হলো রাজভোগ। ভাত, ডাল, চিকেন আর মটন দুই ধরনের কষা মাংস , তিন চার রকমের মাছ , আর একটা বড়ো চিতল মাছের মাথা , পালং শাক , লাল শাক , ঢেকি শাক , সাথে আছে সন্দেশ , রসগোল্লা আরো হরেকরকম মিষ্টি কাঁচাগোল্লা , রসমালাই , চমচম , কালোজাম , রাজভোগ , পায়েস । সাথে কলা , লেবু , আপেল , আতা, পেয়ারা , বেদানা , নাশপাতি আরো কতকি ধরনের ফল।
অন্নপ্রাশনের খাওয়া বাবা মায়ের দেখতে নেই তাই আকাশের মা বাবা অন্য ঘরে চলে গেলে প্রথমে রাধানাথ ঠাকুর আকাশকে কোলে বসিয়ে মন্ত্র পড়ে কিছু সেদ্ধ ভাত আকাশের মুখে দিলেন। আকাশ তার থেকে দু তিনটে ভাত খেল । আর পাশে বসে থাকা স্নেহাংশু বাবু আকাশের বাবার কেনা canon এর ক্যামেরা দিয়ে ফটো তুলতে লাগলেন। আর সুচি , সুমি , স্নেহা দেবীর মা বাবা , সুচেতা দেবী , সমরেশ বাবু সবাই দেখতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর সুচি একটা লেবুর টুকরো তুলে আকাশের মুখের সামনে ধরে বললো “ এতা খা । „ সুচির দুষ্টুমি বুঝতে পেরে বিণাপানী দেবী আর সুধাংশু বাবু আর ঘরের বাকি সবাই মিচকি হাঁসতে লাগলেন ।
আকাশ লেবুর টুকরোতে জিভ ঠেকিয়ে চাটলো । তারপর জীবনে প্রথম টক খাওয়ার জন্য তার চোখ মুখ বন্ধ হয়ে মুখ কুঁচকে গেল।
আকাশের অবস্থা দেখে সুচি খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো , সাথে গালে দুটো টোল পড়লো । আকাশ চোখ খুলে সুচিকে হাসতে দেখে সেও ফোকলা দাঁতে হেঁসে ফেললো। আকাশ আর সুচির হাঁসি দেখে সবার মন প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। আর এইসব সুবর্ণ মুহূর্ত হাঁসতে হাঁসতে ক্যামেরা বন্দী করলেন আকাশের মামা।
তারপর সবাই উপহার এর ডালি খুলে বসলেন। রহমত চাচা কিছুক্ষনের জন্য গেট ছেড়ে এসে আকাশকে আশীর্বাদ করে একটা জামা দিয়ে গেলেন। সুচির বাবা একটা রুপোর পদক উপহার দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। আকাশের মা বাবা ততক্ষণে ঘর থেকে চলে এসেছেন। একজন বৃদ্ধ মুসলমানকে অন্নপ্রাশনে এসে উপহার দিতে দেখে স্নেহা দেবীর মা বাবা খুব অবাক হলেন কিন্তু আকাশের প্রতি রহমত চাচার ভালবাসা দেখে দুজনেরই মনটা খুশিতে ভরে উঠলো ।
অন্নপ্রাশন শেষ হলে পুরোহিত ঠাকুর স্নেহা দেবীর কাছ থেকে আকাশের জন্মের তারিখ , সময় জেনে নিয়ে ঝোলা থেকে একটা পঞ্জিকা বার করে সোফায় বসে কুষ্টি বিচার করতে লাগলেন । পুরোহিত ঠাকুর কে কুষ্টি বিচার করতে দেখে সুধাংশু বাবু মেয়ে জামাইকে উদ্দেশ্যে করে বললেন “ এটা ঠিক করেছো তোমরা। কুষ্টি বিচার করা দরকার। „ কথাটা শুনে বীণাপাণি দেবী হ্যাঁ সুচক মাথা দোলালেন।
প্রায় ত্রিশ চল্লিশ মিনিট ধরে নিজের মনে কড় গুনে একটা কাগজে আঁকিবুকি কেটে নিখুঁত হিসাব করলেন । ততক্ষণ ঘরের সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন আর সাথে আকাশকে অল্প অল্প করে সবকিছুই মুখে তুলে দিচ্ছেলেন। ঠাকুরমশাই কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হলে সেগুলো আকাশের মা আর বাবা এবং ঘরের বাকি সবাই কে বললেন — এই ছেলে দীর্ঘায়ু সম্পন্ন। এর প্রেম বিয়ের যোগ আছে। তবে এর বিয়ে তেইশ বছর বয়সে দিতে হবে। যদি তেইশ বছরে এর বিবাহ না করান তাহলে এই ছেলে জীবনেও সুখী হবে না।
“ তেইশ বছরে বিয়ে ! এতো কাঁচা বয়স । „ ঘরের সবার মুখে এক কথা। সবাই কথাটা শুনে বেশ অবাক হয়েছেন বোঝা যাচ্ছে।
“দেখো মা সবই ভবিতব্য। কিছু জিনিস বিধাতার হাতে থাকে । সেগুলো খন্ডাবে কে ? তুমি চাইলে তেইশের পরেও বিয়ে দিতে পারো তবে এ ছেলে সুখী হবে না । „ বেশ শান্ত নরম কন্ঠে স্নেহা দেবীর উদ্দেশ্যে কথা গুলো বললেন ঠাকুরমশাই রাধানাথ ব্যানার্জী।
জীবনে কখনো সুখী হবে না কথাটা শুনেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো স্নেহা দেবীর , ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেল । কোন মা চায় না তার ছেলে জীবনে সুখী হোক ? “ তাই দেবো ঠাকুরমশাই। আকাশের বিয়ে তেইশেই দেবো । „
“ What rubbish ! তেইশে বিয়ে ! হয় নাকি ? „ আকাশ কে কোলে নিয়ে মুখে চরমভাবে বিরক্তি ফুটিয়ে তুলে বললেন স্নেহাংশু বাবু ।
“ তুই চুপ করে। ছেলে আমার। আমি সিদ্ধান্ত নেবো কখন আমি আমার ছেলেকে বিয়ে দেবো । ত্রিশ বত্রিশে বিয়ে দিয়ে কি লাভ যদি ছেলে কখনো সুখি না হতে পারে ? „ বেশ দৃঢ় কন্ঠে ভাইকে কথা গুলো বললেন আকাশের মা স্নেহা দেবী।
মেয়ের এই কথা শুনে সুধাংশু বাবু আর বীণাপাণি দেবী মুখটা এমন করলেন যেন তারা মেয়ের কথায় সন্তুষ্ট। স্বামীকে জিজ্ঞাসা না করেই স্নেহা দেবী এতো বড়ো একটা সিদ্ধান্ত নিলেন এতে আকাশের বাবা তেমন অবাক হলেন না , কারন তার সাথে এটা ছোটবেলা থেকেই হয়ে আসছে।
স্ত্রীর এরকম দৃঢ়কন্ঠে ছেলের বিয়ের তারিখ ঘোষনা করার পর আর সেই তারিখ শোনার পর নিজের শশুর শাশুড়ির মুখের অভিব্যক্তি দেখে শুভাশীষ বাবু বেশ গম্ভীর মুখ করে আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশ তখন মামার কোলে বসে একটা রসগোল্লা খাচ্ছে আর সুচির সাথে হাঁসছে।

(২)
সুধাংশু বাবু স্বর্গীয় দেবাশীষ বাবুর সমবয়সী । পুরো নাম সুধাংশু মৈত্র । যৌবনে লোহা এদিক ওদিক করে বেশ টাকা করেছিলেন। পরবর্তী কালে সেই টাকা দিয়েই ঘর বাড়ি বানানোর রডের কোম্পানি খুলেছিলেন। সেই কোম্পানি এখন অবশ্য পুরোপুরি এক মারোয়াড়ী ভদ্রলোকের অধীনে। আর এরজন্য দায়ী সুধাংশু বাবুর ছোট ছেলে স্নেহাংশু বাবু।
সুধাংশু বাবু সেই রড রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেবাশীষ বাবুর Import & Export কোম্পানির সাহায্য নেন । সেখান থেকেই তাদের পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব টাকে সম্পর্কে বাঁধতে বিশেষ দেরি করেন নি দেবাশীষ বাবু। ছেলের বয়স আঠাশ কি উনত্রিশ হতেই সুধাংশু বাবুর একমাত্র মেয়ের সাথে তিনি বিয়ের কথা বলেছিলেন । বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে সুধাংশু বাবু খুব খুশি হয়েছিলেন ।
অফিসে সেদিন যখন পিওন এসে বললো বড়ো বাবু ডাকছেন তখন শুভাশীষ বাবু ভেবেছিলেন অফিসের কোন কাজে হয়তো ডেকেছে । তাই তিনি রোজকার মতোই তার বাবা দেবাশীষ বাবুর অফিসের কেবিনের দরজা ঢেলে জিজ্ঞেস করেছিলেন “ আমায় ডেকেছো বাবা ? „
“ হ্যাঁ ডেকেছি। বসো । „ বলে টেবিলের অপর প্রান্তের আরামদায়ক esey চেয়ারটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন দেবাশীষ বাবু ।
শুভাশীষ বাবু চেয়ারটাতে বসলে দেবাশীষ বাবু বলেছিলেন “ তোমার বিয়ে ঠিক করেছি । পাত্রী আমার পছন্দ হয়েছে । পাত্রী একবার তোমাকে দেখতে চেয়েছে। পরশু দিন যেতে হবে । তুমি এখন আসতে পারো । „ আদেশের সুরেই শেষ কথাটা বলেছিলেন আকাশের দাদু।
বাবার কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন শুভাশীষ বাবু। এত বড়ো সিদ্ধান্ত তিনি ছেলেকে না জিজ্ঞেস করেই নিয়ে নিলেন ? তাও আবার বিয়ের মতো একটা বড়ো সিদ্ধান্ত। ছোটবেলা থেকেই শুভাশীষ বাবুর জীবনের সব সিদ্ধান্ত দেবাশীষ বাবুই নিতেন। তাই শুভাশীষ বাবুর শুধু একটা “ হ্যাঁ „ বলে বেরিয়ে আসা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।
বাবার সিদ্ধান্তের উপর কথা বলা কিংবা বাবাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস শুভাশীষ বাবুর কোন কালেই ছিল না। তাই তিনি পরের দুই দিন জিজ্ঞাসা করতে পারেন নি যে — মেয়ের নাম কি ? মেয়ের বাবার নাম কি ? মেয়ে কতদূর পড়াশোনা করেছে ? মেয়ে দেখতে কেমন ? এমনকি লজ্জার জন্য মা সুনীতা দেবী কেও জিজ্ঞাসা করতে পারেননি কিছুই।
শুভাশীষ বাবু দুই দিন পর যখন সপরিবারে পাত্রী দেখতে বেরিয়েছিলেন তখনও জানতেন না পাত্রীর নাম কি ? যখন পাত্রীর বাড়ি পৌছে বাড়িতে ঢুকেছিলেন তখন তিনি দেখলেন সুধাংশু আঙ্কেল তাদের অভ্যর্থনা করে ভিতরে নিয়ে বসালেন। সুধাংশু আঙ্কেল কে দেখেই তিনি চিনতে পেরেছিলেন। তাদেরই কোম্পানির এক ক্লায়েন্ট । এই সুধাংশু আঙ্কেল এর সাথে কাজের জন্য অনেকবার দেখা হয়েছে কিন্তু তার বাড়িতে কখনো আসা হয়নি। কিছুক্ষণ পর যখন মাঝারি উচ্চতার সুন্দরী স্নেহা দেবী চা বিস্কুট পকোড়ার ট্রে নিয়ে এসেছিলেন তখন স্নেহা দেবীকে পছন্দ করে ফেলেছিলেন শুভাশীষ বাবু। বলা বাহুল্য স্নেহা দেবীও শুভাশীষ বাবুকে প্রথম দেখায় পছন্দ করেছিলেন ।
সুধাংশু আঙ্কেল কে কাজের জন্য শুভাশীষ বাবু আগে দেখেছেন কথা বলেছিলেন। তখন থেকেই সুধাংশু আঙ্কেল কে সম্ভ্রম করতেন শুভাশীষ বাবু। কারন সুধাংশু আঙ্কেল আর তার নিজের বাবার চরিত্রের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য পাননি শুভাশীষ বাবু। তাই সুধাংশু আঙ্কেল কে বাবার মতোই সমঝে চলতেন শুভাশীষ বাবু।
তাই যখন আকাশের অন্নপ্রাশনের পরের দিনেই আকাশের দাদু বাড়ি চলে যেতে চাইলেন তখন আকাশের বাবার তেমন বাঁধা দেওয়ার কিংবা আরো কিছু দিন থেকে যাওয়ার কথা ছাড়া বেশি জোড়া জুড়ি করতে পারেন নি শুভাশীষ বাবু ।
জামাইয়ের অনুরোধে আকাশের দাদু বলেছিলেন “ না শুভ, ওদিকে অনেক কাজ আছে। বেশিদিন এখানে থাকা যাবে না। „
———-
প্রতি বছরেই সোসাইটির নিজস্ব দূর্গা পুজা হয়। খুব ধুমধাম করে আয়োজন করে কমিটি মেম্বাররা। সোসাইটির ভিতরে একটা কমিউনিটি হল আছে। সেখানেই অষ্টমীর দিন একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সেখানে নাচ , অঙ্কন আর আবৃত্তির প্রতিযোগিতা হয় ।
প্রতি বছরের ন্যায় এবছরেও পূজা হলো। মা এলো। পুরো সোসাইটি বিভিন্ন রঙের আলোয় রানির মতো সাজলো । ধুমধাম করে পঞ্চমী ষষ্ঠী সপ্তমীর পূজা হলো। অষ্টমীর দিন বিকালে প্রতিযোগিতা হওয়ার সময় সুচেতা দেবী তার ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে দ্বিতীয় সারির একদম পাশের দিকে একটা চেয়ারে বসলেন কিছু সময় পর স্নেহা দেবীও আকাশকে নিয়ে এসে সুচেতা দেবীর পাশে এসে বসলেন। স্নেহা দেবীর সাথে ছোট্ট লাল রঙের বাদশাও এলো জিভ বার করে লেজ নাড়াতে নাড়াতে ।
“অঙ্কিতার নাচ হয়ে গেছে ? „ চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলেন স্নেহা দেবী।
“না , এখনও হয়নি । ওটাই তো স্পেশাল , তাই লাস্টের জন্য রেখে দিয়েছে । „ বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন সুচির মা।
অঙ্কিতা হলো এই রাজ্যের সেরা ক্ল্যাসিক্যাল নৃত্য শিল্পীদের একজন । বয়স মাত্র উনিশ। তাই নামটাও একটু বেশি বড়ো। রাজ্যের বাইরে বিভিন্ন নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। বেশিরভাগ প্রতিযোগিতায় প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় স্থান দখল করতে পারে । থাকে এই সোসাইটিতেই।
পাঁচ ছয় জন সদস্যের নৃত্য প্রদর্শিত হওয়ার পর মাইকে ঘোষনা হলো “ এবার আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়ে নৃত্য পরিবেশন করতে চলেছে আমাদের গর্ব এই রাজ্যের গর্ব অঙ্কিতা। „
তারপরেই মঞ্চে অঙ্কিতা প্রবেশ করলো। মাঝারি উচ্চতার হালকা শ্যাম বর্ণ। মাথার চুল খোপা করা আর টগর ফুলের মালা দেওয়া। কাজল টানা চোখ , আর ঠোঁটে হাল্কা লাল রঙের লিপস্টিক । দুই হাতে একটা করে মোটা বালা। মাথায় টিকলি , কানে দুল , গলায় হার , আর নাকে নথ তো আছেই। লাল পাড় নীল শাড়ি কোমড় থেকে এমন ভাবে নিচে নেমে গেছে যেন ওটা শাড়ি নয় ওটা ধুতি। আর নীল ব্লাউজ। পায়ের পাতায় আলতা মাখা আর মোটা ঘুঙুর পড়া । সবাইকে নমস্কার করে সে নাচ শুরু করলো। অন্যান্য মেয়েরা একটাই নাঁচলো কিন্তু অঙ্কিতা পরপর তিনটে গানে নাঁচলো। অসাধারণ সব মুদ্রা দিয়ে ভরিয়ে তুললো তার নাঁচকে।

প্রথম নাচ
মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।
তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে
তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ॥

দ্বিতীয় নাচ
মায়বন বিহারিনী হরিণী
গহন স্বপন সঞ্চারিনী
কেন তারে ধরিবারে করি পন
অকারণ
মায়াবন বিহারিনী

তৃতীয় নাচ
তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি,
ডুবতে রাজি আছি, আমি ডুবতে রাজি আছি॥
সকাল আমার গেল মিছে, বিকেল যে যায় তারি পিছে গো,
রেখো না আর, বেঁধো না আর কূলের কাছাকাছি॥

নাচ শেষ হতেই সবাই দাঁড়িয়ে হাততালি দিলো মঞ্চ হাততালির আওয়াজে ফেটে পড়লো । সেই নাচ দেখে নয় দশ মাসের আকাশ হাঁসতে হাঁসতে হাততালি দিতে লাগলো । আকাশের হাত তালি দেওয়ার জন্য কি অঙ্কিতা দির নাচ দেখে নিজের ভালো লাগার জন্য সুচি বললো “ মা , আমি নাচ সিকবো । „
“ঠিক আছে । আমি অঙ্কিতার সাথে কথা বলছি । „ বলে সুচির মাথায় একটা চুমু খেলেন। আসলে সুচেতা দেবীর ইচ্ছা ছিল সুমি নাচ শিখুক। কিন্তু সে শিখতে চাই নি। তাই যখন সুচি নাচ শেখার কথা বললো তখন একবারেই রাজি হয়ে গেলেন সুচেতা দেবী।
অঙ্কিতার নাচ শেষ হওয়ার পর সুচেতা দেবী ম্যাকআপ রুমে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন “ তুমি সুচিকে শেখাবে ? „
সে বললো “ হ্যাঁ শেখাবো কাকিমা । কিন্তু সুচির বয়স পাঁচ বছর হলে । „
তারপর তারা হাঁসি মুখে চলে এলো কারন সুচির বয়স পাঁচ হতে আর এক বছর বাকি। দশমীর দিন মায়ের বিদায় নেওয়ার সাথে সাথে সুচি নাচ শেখার কথা ভুলে গেলেও সুচেতা দেবী ভুললেন না।
তার কয়েক সপ্তাহ পরের কথা । একদিন সকালে সুচি তার পুতুল গুলোর চুল আঁচড়িয়ে দিচ্ছিল। আর আকাশ তার সামনে বালিশের দূর্গের মধ্যে বসে হাঁসতে হাঁসতে হাত পা নাড়ছিল । আর মেঝেতে বাদশা ঘুমাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর সুচি তার পুতুল গুলো রেখে আকাশকে উদ্দেশ্য করে বললো “ একানে চুপতি কলে বসবি , আমি হিসু করে আসছি। „
সুচি গেল হিসু করতে। হিসু করে এসে যখন ঘরে ঢুকলো তখন খাটের উপরের দৃশ্য দেখে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো । কাঁদতে কাঁদতে গাল লাল হয়ে উঠলো সুঁচির । সেই কান্নার আওয়াজ শুনে স্নেহা দেবী দৌড়ে এসে ঘরে ঢুকে যা দেখলেন তা হলো— আকাশ লাথি মেরে তার সামনের কোল বালিশ সরিয়ে দিয়ে সুচি যে পুতুল টার চুল ঠিক করছিল সেই পুতুল টার চুল ধরে পুতুল টাকে বিছানায় আছাড় মারছে। আর বাদশা ঘেউ ঘেউ করে লেজ নাড়ছে আর লাফাচ্ছে।
আকাশের মা দ্রুত গিয়ে আকাশের হাত থেকে পুতুল টা নিয়ে তার চুল ঠিক করে দিল। তারপর সুচির হাতে দিয়ে দিল। সুচি পুতুল টা নিয়ে বললো “ ও খুব দুষ্তু বদমাস। „ কথাটা বলে স্নেহা দেবীকে কিছু বলতে দেওয়ার আগেই তার সমস্ত পুতুল নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেল । স্নেহা দেবী জানতেন সুচি খুব রাগী মেয়ে । অল্পতে রেগে যায় ।
সুচি যখন কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে পৌছালো তখন সুচেতা দেবী ঘর ঝাট দিচ্ছিলেন। সুচিকে কাঁদতে দেখে ঝাড়ু ফেলে এগিয়ে এসে তাকে কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “ কাঁদছিস কেন ? কি হয়েছে ? „
“আকাস আমাল পুতুলকে মেলেছে । ও খুব দুষ্তু , বদমাস । „ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নাক টানতে টানতে বললো সুচি
সুচেতা দেবী মেয়েকে চুপ করার জন্য বললো “ ও বাচ্চা ছেলে না বুঝে করেছে । তুই তো বড়ো হয়ে গেছিস। বড়োরা কাঁদে এই ভাবে ? „
এই বড়ো হওয়ার কথা শুনে সুচি কান্না থামিয়ে চুপ করলো। সত্যি ও বড়ো হয়ে গেছে। চার বছর বয়স হয়ে গেছে ওর। আকাশতো এখনও বাচ্চা। এইসব ভাবতে লাগলো সুচি ।
পরের দিন সকালে সুচি সবকিছু ভুলে গিয়ে আবার তার পুতুল গুলো নিয়ে খেলার জন্য হাজির হলো।
পরের বছর সরস্বতী পূজার সময় রাধানাথ ঠাকুর এসে আকাশের হাতেখড়ি করে দিয়ে গেলেন। তারপর আকাশের প্রথম হামাগুড়ি, প্রথম হাঁটা, প্রথমত মা ডাক , প্রথম জন্মদিন সব মিষ্টি মুহুর্তের মধ্যে দিয়ে কখন আকাশ দুই বছরের হয়ে গেল সেটা স্নেহা দেবী বুঝতেই পারলেন না। আর এইসব মিষ্টি মুহুর্ত ক্যামেরায় ফ্রেম বন্দী করে রেখে দিলেন স্নেহা দেবী। সব ফটো তুললেন সুমি আর স্নেহা দেবী মিলে। বলা বাহুল্য বেশির ভাগ ফটোতেই আকাশ আর ওর মায়ের সাথে আছে সুচির ফটোও।
দুই বছর পর একদিন সকালে স্নেহা দেবী বাপের বাড়ি থেকে ফোনে খবর পেলেন যে সুধাংশু বাবু মারা গেছেন।

(৩)
প্রতিদিনের মতোই আজও সকালে ঘুম থেকে উঠে আকাশের মা রাতের ম্যাক্সি ছেড়ে একটা নীল রঙের ম্যাচিং শাড়ি পড়ে বিছানা গুছিয়ে রাখছিলেন। আকাশের তখনও রাতের ঘুম শেষ হয়নি । আর আকাশের বাবা তখন সবে ব্রাশ করে বালতিতে জল ভর্তি করে স্নান করার তোড়জোড় শুরু করছেন। জামা কাপড় এখনও খোলা হয়নি তার।
ঠিক তখনই ড্রেসিং টেবিলে রাখা নোকিয়া ফোনটা বেজে উঠলো । স্নেহা দেবী ফোনটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্তে কেউ একজন ভীত সন্ত্রস্ত গলায় উদ্বেগ ঝড়িয়ে কাঁপা কন্ঠে বললো “ হ্যালো দিদি ! „
কন্ঠ চিনতে কোন অসুবিধাই হলোনা আকাশের মায়ের। কন্ঠটা হলো সৌরভের। সৌরভ হলো আকাশের মামা স্নেহাংশু বাবুর সমবয়সী বন্ধু এবং সহপাঠী। পাশাপাশি বাড়ি। সৌরভের কাঁপা কন্ঠস্বর শুনে আকাশের মা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন “ কি হয়েছে ? তোর গলা কাঁপছে কেন ? সব ঠিক আছে তো ? „
কাঁপা কন্ঠেই সৌরভ বললো “ দিদি , জ্যেঠা আর নেই ! „
আকাশের দাদুকে সৌরভ ছোট থেকেই জ্যেঠা বলে ডাকে। সৌরভের নিজস্ব কোন কাকা জ্যেঠা নেই। তাই যখন সৌরভ জ্যেঠা বললো তখন স্নেহা দেবীর বুঝতে পারলেন যে সৌরভ তারই বাবা অর্থাৎ সুধাংশু বাবুর কথা বলছে। কথাটা শুনেই স্নেহা দেবীর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। সৌরভ কাঁপা কন্ঠে আরো বললো “ আমি স্নেহাংশু কে ফোন করেছি। ও পরের ফ্লাইট থেকেই আসছে। তুমি যতো শীঘ্র পারো চলে এসো। জ্যেঠিমা পুরো ভেঙে পড়েছে। „
অপর প্রান্তে সৌরভ আরও কিছু বললো কিন্তু সেগুলো আকাশের মায়ের কানে গেল না। আধগোছানো বিছানায় ধপাস করে বসে পড়লেন তারপর ডুকরে কেঁদে উঠলেন। সেই কান্না শুনে শুভাশীষ বাবু বাথরুম থেকে দৌড়ে বেডরুমে চলে এলেন “ কি হয়েছে ? কাঁদছো কেন ? „ স্নেহা দেবীর পুরো সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
স্নেহা দেবী তার স্বামীর পেটের কাছের জামা চেপে ধরে তাতে মুখ লাগিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন “ এ আমার কি হলো গো ? বাবা আমাদের ছেরে চলে গেল । „
“ কি বলছো ! বাবা তো সুস্থ সবল মানুষ। তার কি হবে ? „ আকাশের বাবার গলায় বিস্ময় ঝরে পড়ে।
“ সৌরভ ফোন করেছিল। ওই বললো। „ কাঁদতে কাঁদতে বললেন স্নেহা দেবী
মাথার উপর থেকে আরও একটা আশ্রয়ের হাত উঠে গেল । এটা ভাবতেই শুভাশীষ বাবুর চোখ ঝাপসা হয়ে পড়লো। স্নেহা দেবী কে শান্ত করার জন্য আকাশের বাবা বললেন “ শান্ত হও একটু। আকাশ ঘুমাচ্ছে। জেগে যাবে। „ আকাশের কথা শুনে স্নেহা দেবী আওয়াজ বন্ধ করলেন কিন্তু কান্না থামাতে পারলেন না।
তারপর ফোন তুলে দেখলেন সৌরভ তখনও লাইনে আছে। তারপর সৌরভের সাথে কথা বলে কনফার্ম হলেন ঘটনাটা সত্যি। আজ ভোরেই আকাশের দাদু দেহ রেখেছেন। আকাশের বাবা সৌরভ কে বললেন “ হ্যাঁ আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি। তুমি মাকে ( বীণাপাণি দেবী ) কে দেখো। আমরা খুব শীঘ্রই আসছি। „
তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন “ চলো যেতে হবে তো। „ আকাশের বাবা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন অফিস যাওয়ার কিন্তু সেখানে আর যাওয়া হলো না। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই তারা নিজেদের গাড়ি Austin Maestro করে সুধাংশু বাবুর বাড়ির দিকে রওনা হলো। আকাশ তখনও ঘুমাচ্ছে। মৃত বাড়িতে কুকুর নিয়ে যাওয়া যায় না তাই বাদশাকে সুচেতা দেবীকে বলে সেখানেই রেখে তারা রওনা হয়েছেন।
রাস্তায় গাড়ির হর্নের আওয়াজ শুনে আকাশ ঘুম থেকে উঠে পড়লো । মাকে কাঁদতে দেখে সে জিজ্ঞেস করলো “ মা তুমি কাদচো কেন ? „
“ কিছু না সোনা । „
আকাশ মায়ের চোখ মুছিয়া দিল। তারপর জিজ্ঞেস করলো “ আমলা কোথায় যাচ্ছি । „ আকাশ কথা বলতে শিখে গেলেও এখনও তোতলায়।
“আমরা তোমার দাদুর বাড়ি যাচ্ছি সোনা। „ আকাশ দুঃখ পাবে ভেবে তিনি খুব সংযত হয়ে কান্না থামালেন। কিন্তু বুকটা মুচড়ে উঠতে লাগলো বারবার।
সকালে যানজট তেমন নেই তাই প্রায় দেড় ঘন্টার মধ্যে নটা বাজার কিছুক্ষণ আগে তারা বারাসাত পৌঁছে গেলেন । বারাসাতেই স্নেহা দেবীর বাপের বাড়ি। যখন বড়ো পুরানো দু তলা বাড়ির সামনে গাড়ি থামলো তখন তারা দেখলো বাড়ির সামনে বেশ জটলা আছে। লোক জনের ভীড়। রাস্তার ধারে গাড়িটা রেখে তারা ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন। বাড়ির মেন গেট দিয়ে ঢুকলেই লিভিং রুম পড়ে । সেখানেই সোফা চেয়ার টেবিল সরিয়ে মৃতদেহ রাখা হয়েছে।
লিভিং রুমে আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশীতে ভর্তি। সৌরভের মা বীণাপাণি দেবীর পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন আর বীণাপাণি দেবীর ঠিক সামনে একটা সাদা চাদরে মোড়া সুধাংশু বাবুর মৃত দেহ রাখা হয়েছে। বাবার প্রাণহীন মড়া মুখ দেখেই স্নেহা দেবীর চোখে আবার জল চলে এলো। যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীতে হঠাৎ করে বান চলে এলো। সুধাংশু বাবুর বুকের উপর মাথা রেখে স্নেহা দেবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন “ বাবা তুমি আমাদের ছেড়ে গেলে ? কে দেখবে এখন আমায় ? আমি কাকে বাবা বলে ডাকবো ? কি করে হলো এইসব ? „
ভোর থেকেই বীণাপাণি দেবী কান্নাকাটি করে এখন একটু ধাতস্থ ছিলেন। খোলা চুল শুকিয়ে যাওয়া আর বয়সের জন্য গুটিয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে সৌরভের মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বসে ছিলেন তিনি। মেয়েকে এইভাবে কাঁদতে দেখে তার চোখ থেকেও অশ্রুর বর্ষা হতে লাগলো। “ ভোরবেলায় দেখি ঘুমের ভিতরেই গোঁ গোঁ আওয়াজ করছে । আমি ডাকলাম কিন্তু চোখ খুলছিল না। গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে করতে বললো জল জল। আমি টেবিল থেকে জল নিয়ে খাইয়ে দিলাম। তারপর থেকেই কথা বলছে না। „ মেয়ের থেকেও তিনি আরো বেশি কাঁদতে কাঁদতে বললেন কথা গুলো। বলার সময় তার গলা বুজে আসছিল। খুব কষ্ট করে তিনি বললেন।
আকাশ তখন বাবার কোলে ছিল। মাকে আর দিদাকে এইভাবে কাঁদতে দেখে সে বাবাকে জিজ্ঞেস করলো “ বাবা মা কাদছে কেন ? „
“ কেউ হারিয়ে গেছে তো। তাই কষ্টে কাঁদছে । „
“ হালিয়ে গেলে বুঝি কষ্ত পায় । „
“ খুব কষ্ত হয় সোনা। „ কথাটা তিনি বললেন বটে মুখ দিয়ে। কিন্তু কথাটা বলতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনে যতগুলো মানুষকে হারিয়েছেন সবার মুখ চোখের সামনে ভেঁসে উঠলো। আর সেই সব মুখ চোখের সামনে ভাঁসতেই আকাশের বাবার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
আকাশকে এই পরিস্থিতিতে রাখা ঠিক নয়। তাই তিনি আকাশকে নিয়ে দু তলায় চলে গেলেন। সেখানে তেমন কেউ নেই।
দুপুরের দিকে সবাই মোটামুটি ধাতস্থ হলেন । দুঃখটা অনেক সয়ে এসছে। তাই আকাশের বাবা আকাশকে নিয়ে নিচে নেমে এসছেন। ঠিক সেই সময়ে এলেন আকাশের মামা। এসে ঘরে ঢুকতেই স্নেহা দেবী ঝাপিয়ে পড়লেন ভাইয়ের উপর। কষে দুটো চড় মারলেন ঠাসসস ঠাসসস করে । সেই চড়ের আওয়াজ করে সারা ঘরে প্রতিধ্বনি হতে লাগলো।
চড় মারতে মারতেই বললেন “ আমি শশুর বাড়ি যাওয়ার সময় তোকে বলে গিয়েছিলাম বাবা মা কে দেখিস আর তুই দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবে বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছিস । কি এমন কাজ যা পরিবারের থেকেও বড়ো ? „
কথা গুলো স্নেহা দেবী নিজের ভাইকে বলছিলেন কিন্তু সেই কথা গুলোই আকাশের বাবার গায়ে চাবুকের মতো আছড়ে পড়তে লাগলো। যেন কথা গুলো তার জন্যেই বলা হচ্ছে। শালাকে বাঁচানোর জন্য আকাশের বাবা স্নেহা দেবীকে টেনে সরিয়ে আনলেন। এইভাবে সবার সামনে মারা উচিত না , খারাপ দেখায়। দিদির কথায় স্নেহাংশু বাবু চুপ থাকাই সমীচীন মনে করলেন। তারপর তিনিও বাবার মৃতদেহ আঁকড়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন।
বিকালের দিকে আকাশের বাবা মামা সৌরভ আরো কয়েকজন মিলে দাহ সৎকারের জন্য চলে গেলেন পাশেরই সোদপুর শ্মশানে । তারপর সন্ধ্যার দিকে দাহ করে তারা ফিরলেন। এদিকে সকাল থেকে মা মেয়ে কিছুই খাই নি তাই আকাশের বাবা জোড় করে সৌরভের মায়ের রান্না করা ভাত আর তরকারি খাইয়ে দিলেন। রাত গভীর হলেও মা মেয়ে শান্ত হতে পারে না। তারা তখনও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে চুপচাপ বসে আছেন। আর খাটে বাকি সবাই বসে আছে । পাড়া প্রতিবেশী অনেক আগেই চলে গেছে।
স্নেহা দেবী কিছুক্ষন চুপচাপ থাকার পর খাটে বসে থাকা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো “ আমি মাকে নিয়ে যাবো । তোর হাতে ছাড়তে পারবো না আর। „
বীণাপাণি বললেন “ না মা , আমাকে এখানেই থাকতে দে । এখানে যে আমার স্মৃতি আছে অনেক। „
“ স্মৃতির মাঝে বাঁচা যায় কিন্তু একা স্মৃতির মাঝে বেঁচে থাকা যায় না। „
“ আমি এখানেই থাকবো। একা থাকলে একাই থাকবো। „ দৃঢ় কিন্তু শান্ত কন্ঠে বললেন বীণাপাণি দেবী।
আকাশের বাবা তখন আকাশকে বললেন “ দিদিমা কে বলো আমাদের সঙ্গে যেতে। „ বাচ্চাদের কথা বয়স্ক মহিলারা অনেক সময় ফেলতে পারেন না। তার উপর বীণাপাণি দেবী হলেন আকাশের নিজের দিদিমা। আকাশের কথায় হয়তো বীণাপাণি দেবী যেতে রাজি হবেন।
আকাশকে শুভাশীষ বাবু খাট থেকে নিচে নামিয়ে দিলেন। আকাশ ছোট ছোট পায়ে বীণাপাণি দেবীর কাছে গিয়ে তার কোলে বসে বললো “ দিদা চলো না আমাদেল সাথে „ বলে দিদার গলা জড়িয়ে ধরলো ।
এই একটা কথাতেই কাজ হলো। বীণাপাণি দেবী আবার কাঁদতে শুরু করলেন। আর আকাশের মাথায় একটা চুমু খেলেন।
কিছুক্ষণ পর আকাশের মা গোছগাছ শুরু করলেন। বীণাপাণি দেবীর সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে বিভিন্ন ব্যাগে ভরতে লাগলেন। বীণাপাণি দেবী চুপচাপ ঘরের দেওয়াল গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন , আর এইসব আকাশের মামা খাটে বসে দেখছিলেন। আসলে তিনিও চাইছিলেন মাকে দিদি নিয়ে যাক। এখানে মায়ের সাথে একা থাকার কোন ইচ্ছাই তার ছিল না বা নেই।
রাতে কিছু একটা খেয়ে সবাই শুয়ে পড়লো। কিন্তু আকাশ আর আকাশের মামা বাদে কারোরই ঘুম এলো না। সকাল বেলা সৌরভের মা বাবা আর সৌরভকে এই বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে তারা রওনা হলেন অর্জুন ভবনের উদ্দেশ্যে। আর বীণাপাণি দেবী গাড়ির ভিতর থেকেই সেই দুতলা বাড়িটা দেখলেন যতক্ষণ দেখা যায়। নিজের বৈবাহিক সম্পর্কের পুরোটাই এই বাড়িতে কাটিয়েছেন তিনি। সব স্মৃতি মনে পড়তেই চোখ ঝাপসা হয়ে পড়লো।
বাড়িতে এসে বীণাপাণি দেবী আকাশকে নিয়ে গেস্টরুমে বসলেন। আকাশের বাবা তড়িঘড়ি স্নানে করতে চলে গেলেন । আর স্নেহা দেবী স্বামীর জন্য সকালের ব্রেকফাস্ট বানাতে চলে গেলেন । কিছুক্ষণ পরেই একটা রোগা ফর্সা মেয়ে বাদশা কে নিয়ে আর একটা পুতুল হাতে নিয়ে ঘরে উপস্থিত হলো। ঘরে ঢুকেই বাদশা ঘেউ ঘেউ করতে করতে লেজ নাড়তে নাড়তে খাটে উঠে আকাশের পাশে বসলো।
সুচিকে দেখে বীণাপাণি দেবী চিনতে পারলেন। সুচির মুখে দেখেই তার চোখে মুখে খুশি ফুটে উঠলো “ এই , এদিকে আয় । কতো বড়ো হয়ে গেছিস তুই। „ আসলে বিভিন্ন কাজের চাপে অন্নপ্রাশনের পর বীণাপাণি দেবীর আর এই বাড়িতে আসা হয়ে ওঠেনি। আর এই দুই বছরে সুচির উচ্চতা বেড়ে হয়েছে প্রায় চার ফুট। “ কি করিস এখন ? „
“ আমি নাচ শিখি । „ সুচি তখন খাটে উঠে বীণাপাণি দেবীর পাশে বসে পড়েছে।
“ আর স্কুল ! „
“ পরের বছর থেকে যাবো । এখনও ছয় বছর তো হয়নি । তাই স্কুল ভর্তি নেইনি । „
আর এইসব কথাবার্তা আকাশ চুপচাপ শুনছিল । সে তার দিদা কে আরো জোড়ে জড়িয়ে ধরলো। সেটা সুচি দেখলো । সে আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বীণাপাণি দেবীকে জিজ্ঞেস করলো “ তুমি এখানেই থাকবে ? „
“ হ্যাঁ মা, আমি এখানেই থাকবো । „
“ আমি মা নই । „ রেগে গিয়ে মুখ ফুলিয়ে বললো সুচি।
রাগলে যখন সুচি গাল ফুলিয়ে কথা বলে তখন খুব মিষ্টি দেখায় তাকে। তাই বীণাপাণি দেবী সুচির মিষ্টি মুখ আর মিষ্টি রাগ দেখে ঠোঁটের কোনায় হাঁসি নিয়ে বললেন “ তাহলে ? „
“ আমি সুচিত্রা সবাই সুচি বলে ডাকে। শুধু বাবাই মা বলে ডাকে। „ তখনও রাখ কমেনি সুচির।
“ আচ্ছা , তাহলে আমি তোকে সুচি বলেই ডাকবো । „ বলে সুচির কপালে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা বীণাপাণি দেবী একটা চুমু খেলেন
“ আমি তোমায় কি নাম ডাকবো । „ সুচির রাগ কমেছে।
“ আমায় তুই দিম্মা বলে ডাকিস । „ বললেন দিম্মা। ডাকটা খুব পছন্দ হয়েছে সুচির। সেটা তার চোখ মুখ দেখেই বোঝা গেল।
আকাশের কিন্তু একদম পছন্দ হলো না সে বললো “ না , তুমি সুদু আমাল দিদিমা । „
“ উহুহু শখ কতো ! শুধু আমাল দিদিমা । „ সুচি মুখ ভেঙিয়ে বললো আকাশকে । আসলে কয়েকদিন ধরে আকাশ আর সুচির মধ্যে ঝামেলা চলছে। কারন হলো বাদশা। আকাশ বিকালে নিচে নামতে পারে না। যখন মা নামিয়ে দেয় তখনই নামে । তাই বেশিরভাগ সময় বাদশাকে বিকালে ঘোরাতে নিয়ে যায় সুচি। সেখান থেকেই সুচির প্রতি বাদশা একটু বেশিই নেওঠা হয়ে পড়েছে। আর এটা আকাশ সহ্য করতে পারছে না। ওর মনে হচ্ছে বাদশাকে সুচি ওর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে । অবশ্য এইসব মনের কথা আকাশ ছাড়া কেউ জানে না। তাই যখন বীণাপাণি দেবী সুচিকে অনুমতি দিলেন দিম্মা ডাক ডাকার তখন আকাশের মনে হলো সুচি তার দিদাকেও নিয়ে নেবে।
সুচিকে এইভাবে ভেংচি কাটতে দেখে বীণাপাণি দেবী হেঁসে উঠলেন। তারপর আরো অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন। কিছুক্ষণের জন্য স্নেহা দেবী ঘরে এসে দেখে গেলেন যে সুচির সাথে কথা বলার জন্য মায়ের মন কিছুটা অন্য দিকে ঘুরে আছে।
সেদিন রাতে ঘুমানোর সময় আকাশ জেদ ধরলো সে তার দিদার সাথেই ঘুমাবে। কারন সুচিকে কোনভাবেই দিদাকে নিতে দেবে না । “ মা আমি দিদাল সাথে ঘুমাবো । „
আকাশ এখনও স্নেহা দেবীর বুকের খায়। ছেলের কথা শুনে তিনি ভাবলেন এই সুযোগে হয়তো দুধ খাওয়া টা বন্ধ করবে আর মাও একা থাকবে না। “ আচ্ছা, ঘুমাও । „
তাই করা হলো। বীণাপাণি দেবী আর আকাশ একসাথেই ঘুমালো। এই প্রথম আকাশ মাকে ছেড়ে ঘুমাচ্ছে। তাই ঘুম আসছিল না। দিদাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমালেও তার দুই চোখ এক হচ্ছিল না। তখন বীণাপাণি দেবী বললেন “ গল্পো শুনবি রাজকুমার আর রাজকুমারীর গল্পো । „
আকাশ কখনো গল্পো শোনেনি। আকাশ একটা হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়লো
তারপর বীণাপাণি দেবী শুরু করলেন — এক দেশে এক বিরাট রাজা ছিলেন। তার মেয়ে ছিল এক রাজকুমারী। সে একদিন পুকুরে স্নান করতে গেল । রাজকুমারী যেই জলে নেমেছে ওমনি পুকুরের ভিতরের রাক্ষস তার পা ধরে টেনে জলের তলায় রাজ্যে নিয়ে গেল। এদিকে রাজ্যে শোরগোল পড়ে গেল। রাজ্যের সমস্ত সৈন্য জলে যায় কিন্তু সেই রাক্ষস সবাইকে জলের তলার রাজ্যে নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রাখে। শেষে রাজা ঘোষনা করলো যে রাজকুমারী কে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করতে পারবে তাকে এই রাজ্য দিয়ে দেবো। ঠিক তখন এক রাজকুমার এলো সাদা ঘোড়ায় চড়ে। কোমরে তার তরবারি। সে বললো আমি করবো মুক্ত। এতোটা হতেই বীণাপাণি দেবী দেখলেন আকাশ ঘুমিয়ে পড়েছে।
সকালে যখন সুচির সাথে আকাশের দেখা হলো তখন আকাশ বললো “ জানিস দিদা আমায় গলপো শুনিয়েছে । রাজকুমার আর রাজকুমারীর গলপো। „
সেদিন রাতে সুচিও বায়না ধরলো সে দিদার কাছেই ঘুমাবে। সুচেতা দেবী সুচিকে বীণাপাণি দেবীর কাছে এনে বললেন “ দেখো না , বলছে তোমার কাছেই ঘুমাবে। „
“ ঘুমাক না। কোন অসুবিধা নেই। „ হাঁসি মুখে বললেন বীণাপাণি দেবী।
সমরেশ বাবু এটা মেনে নিতে পারলেন না। সকাল বিকালে খেলাধুলা ঠিক আছে , কিন্তু রাতে একসাথে ঘুমানো একটু বাড়াবাড়ি । সমরেশ বাবুর এই ঘটনা ভালো না লাগার কারন দেবাশীষ বাবু দুই পরিবারের এত ঘনিষ্টতা পছন্দ করতেন না। সুচির বীণাপাণি দেবীর সাথে ঘুমানো নিয়ে তিনি আপত্তি করেছিলেন কিন্তু সুচির জেদের কাছে তিনি হেরে গেলেন।
রাতে বীণাপাণি দেবী দুজনকেই গল্প শোনালেন
বীণাপাণি দেবী দুই পাশে দুইজন কে নিয়ে শুয়ে একটা অন্য গল্পো শুরু করলেন । সেটা শুনে সুচি বললো “ না দিম্মা , কালকে যেটা শুনিয়েছো সেটাই শুনবো। „ বীণাপাণি দেবী গতকালের বলা গল্পটা আবার প্রথম থেকেই শুরু করলেন । এতে আকাশ বেশ রুষ্ট হলো।সেটা অবশ্য কেউ দেখতে পেলো না। —- তারপর রাজকুমার সেই পুকুর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালো। তখন পুকুর পাড়ের এক নাম না জানা গাছের মাথা থেকে একটা তোতা বলে উঠলো রাককস মরবে না। রাককস মরবে না । রাজকুমার জিজ্ঞেস করলো তাহলে কিভাবে মরবে ?
এতোটা শোনার পর বীণাপাণি দেখলেন দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার কিছুক্ষণ পর সুচেতা দেবী এসে তার ছোট মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন।

(৪)
সুচিত্রার দুরন্তপনার জন্য মা বাবার কাছে বকা খাওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন সেই স্বাভাবিক ঘটনা আর তেমন ঘটেনা । কারন সুচিকে বকলেই বীণাপাণি দেবী তাকে আড়াল করেন বা তার পক্ষ্য নেন।
এইতো এইবারের বর্ষার ঘটনা । সকাল সকাল বাদশা , সুচি আর আকাশ মিলে লুকোচুরি খেলছে । দুটো ফ্ল্যাট হয়েছে এদের লুকানোর জায়গা। সবাই লুকিয়েছে আর সুচি হয়েছে চোর। ঠিক সকাল আটটা বেজে চোদ্দো মিনিট নাগাদ আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো । জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখেই সুচির চোখ খুশীতে জ্বলজ্বল করে উঠলো। আকাশ নিজেদের ঘরের দরজার পর্দার পিছনে লুকিয়ে ছিল। সেখান থেকে সুচি আকাশকে খুঁজে আস্তে আস্তে বললো “ বৃষ্টিতে খেলবি ? „ তার চোখে মুখে উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট ।
আকাশ কখনো বৃষ্টিতে ভেজেনি। তাই সে “ হ্যাঁ „ বলে দিল। দিম্মা আর আকাশের মায়ের চোখের অলক্ষ্যে সে চুপিচুপি বাদশা আর আকাশকে নিয়ে বিল্ডিং এর নিচে নেমে গেল । তারপর ক্রিকেট খেলার জন্য বাচ্চাদের পার্কের পাশে যে ছোট মাঠটা আছে সেখানে জল কাদায় তিনজন মিলে লাফালাফি শুরু করলো । বেশ কিছুদিন ধরেই বৃষ্টি হওয়ার জন্য মাঠে কাদা তখনও শুকিয়ে যাই নি। আকাশ এই প্রথম বৃষ্টিতে ভিজছে তাই চোখে মুখে বাচ্চা সুলভ খুশীর উচ্ছাস স্পষ্ট । বাদশা ঘেউ ঘেউ করতে করতে জল কাদায় গড়াগড়ি খেয়ে সারা শরীরে কাদা মাখতে লাগলে। তিনজনের শরীর জলে ভিজে , জামায় কাদা লেগে ভুতের মতো অবস্থা। ঠিক সেই সময় বৃষ্টির ফোটা আরো বড়ো আর ঘন হয়ে গেল । এদের এই উচ্ছাস দেখে যেন ইন্দ্রদেব জোর বর্ষার আদেশ দিয়েছে।
বৃষ্টি হচ্ছিল বলে রহমত চাচা গেট ছেড়ে নিজের ঘরে গেছিলেন ছাতা আনতে । ছাতা এনে দেখলেন তিনজন কাদায় হুটোপুটি শুরু করেছে । আকাশের লাফানোর জন্য জল কাদা সুচির গায়ে ছিটকে পড়ছে আর সুচির লাফানোর জন্য আকাশের গায়ে কাদায় মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। আর বাদশা তো নিজেই নিজের গায়ে কাদা মাখছে ঘেউ ঘেউ করে। তার সোনালী লোম এখন কাদায় কালো। রহমত চাচা তার বড়ো কালো ছাতা মাথায় দিয়ে এগিয়ে এসে বললেন “ তোরা ভিজিস না , ঠান্ডা লেগে সর্দি করবে ! „
“ দাদু , তুমিও খেলো । „ কে শোনে কার কথা । সুচি রহমত চাচাকেও নিজেদের দলে টানতে চাইলো।
সুচেতা দেবী আর স্নেহা দেবী দুজনেই রান্নাঘর থেকে সুচি আকাশের বৃষ্টির মধ্যে লাফালাফি দেখতে পেলেন । আসলে বিল্ডিং টা এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে প্রত্যেকটা ফ্ল্যাটের রান্নাঘর থেকে খেলার মাঠ দেখা যায়।
দেখা মাত্রই সুচির মা রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। একটা ছাতা নিয়ে প্রায় দৌড়েই সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামলেন। নিচে নেমে তিনি দেখলেন তার মেয়ের জাম কাপড়ে কাদা ভর্তি। কিন্তু সুচির মুখে খুশী তিনি দেখলেন না। দেখলে হয়তো তার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যেত। তিনিও তো বৃষ্টিতে কতো ভিজেছেন। তার ছোট মেয়ে যে তারই সব গুন পেয়েছে । সুচেতা দেবী বৃষ্টির মধ্যে সুচির কান ধরে তার গালে একটা চড় বসিয়ে দিলেন “ বদমাস মেয়ে , হতচ্ছাড়া , ছন্নছাড়া মেয়ে কোথা থেকে এসে জুটেছে আমার কপালে , হাড়মাস জ্বালিয়ে দিল ! সুমি তো এরকম ছিল না ! „
জ্যেঠিমার সুচিকে বকতে দেখে বৃষ্টির মধ্যেই আকাশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো আর বাদশা লেজ গুটিয়ে কাচুমাচু মুখ করে চুপ করে বসে রইলো। সুচি রাগি মুখ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। রাগের কারন অবশ্য বকা খাওয়া নয়। দিদির সাথে তুলনা করার জন্য। সবসময় তাকে শুনতে হয় — দিদি কতো শান্ত । কতো ভালো।
সুচেতা দেবী আরো কিছু কথা শোনাতেন কিন্তু ততক্ষণে দিম্মা আর আকাশের মাও নিচে নেমে এসছেন “ বৌমা , মেরো না । বাচ্চা মেয়ে ! „
“ এই বাচ্চা মেয়ে আমাকে শান্তিতে থাকতে দিলে হয় ! এখন কে এই কাদা মাখা জামা পরিষ্কার করবে ? „ বীণাপাণি দেবীর সামনে আর নিজের মেয়ে কে মারতে পারলেন না সুচেতা দেবী। রাগে কিছুক্ষণ বকলেন। তারপর টানতে টানতে নিয়ে গেলেন স্নান ঘরে।
স্নেহা দেবী আকাশকে মারতে বকতে পারলেন না। সেখানেও সুচির দিম্মা বাঁধা দিল। শুধু “ মা তোমার জন্য আমার ছেলেটা বাঁদর তৈরি হচ্ছে „ বলা ছাড়া আকাশের মা কিছুই বলতে পারলেন না। আরা আকাশের দিদিমা মেয়ের কথা শুনে বললেন “ এমন ভাবে বলছিস যেন তুই ছোটবেলায় খুব শান্ত ছিলি ! „
মায়ের এই কথায় স্নেহা দেবী আর কিছু বলতে পারলেন না । তারপর বীণাপাণি দেবী আকাশ আর বাদশাকে নিয়ে স্নানঘরে নিয়ে গিয়ে ভালো করে স্নান করিয়ে দিলেন।
মায়ের হাজার বকুনি সত্ত্বেও সুচির খেলাধুলা বন্ধ হয় না। সে কারোর কথা শুনে চলার মেয়ে তো নয়। সে তো my life my rules এর নিয়মে চলার মেয়ে। তো এইভাবেই দিম্মার আদরে সুচিত্রা আর আকাশ দিন দিন লেজহীন বাঁদর হয়ে উঠতে লাগলো ।
এদের খেলাধুলার মধ্যে দিয়েই সুচির স্কুলে ভর্তি হওয়ার দিন চলে এলো । নতুন বই , খাতা , পেন সব কেনা হলো আর নতুন স্কুল ড্রেস একটাই কেনা হলো কারন সুমির আগের একটা ভালো স্কুল ড্রেস এখনও আছে ।
কিন্তু সুচি মোটেও খুশি নয় আর এই অখুশির কারনটাও সবার অজানা নয়। সুচি ভেবেছিল দিদির সাথে একসাথে স্কুলে যাবে , কতো মজা হবে । কিন্তু সেই বছরেই সুমি বড়োদের স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল। সে এখন পড়ে ক্লাস ফাইভে । ক্লাস ফোরে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে সে। তাই স্কুল থেকে একটা মেডেল পেয়েছে সে। সাথে বাবা মার কাছ থেকে একটা +0.01 পাওয়ার এর চশামাও।
স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনে নতুন জামা পড়ে সুচি তৈরি। গলায় একটা লাল টাই ,সাদা জামা আর লাল স্কার্ট সাথে আছে সাদা মোজা আর কালো সু। মাথায় লাল ফিতে দিয়ে একটা বিনুনি বানানো । যখন সুচি তার বাবার হাত ধরে ঘরের বাইরে এলো তখন দিম্মা সুচির কপালে একটা চুমু খেয়ে বাঁ কপালে একটা কাজলের টিপ পড়িয়ে দিলেন “ বড়ো হও । খুব পড়াশোনা করো । মানুষের মত মানুষ হও। „
সুচিকে স্কুলে যেতে দেখে আকাশেরও স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা জাগলো। সেটা বীণাপাণি দেবী বুঝতে পেরে বললেন “ কি রে দাদুভাই ! তুই স্কুলে যাবি ? „
আকাশ উপর নীচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল। সেটা দেখে দাদুভাইকে কোলে তুলে নিয়ে দিদিমা বললেন “ আরো একটু বড়ো হও । তখন দুজনে একসাথে স্কুলে যাবে। „
এখানে আসার কিছুদিনের মধ্যেই বীণাপাণি দেবী লক্ষ্য করেছিলেন যে সুমি আর সুচি দুই বোনেরই কান , নাক ফোঁড়ানো নেই। কিন্তু তখন কিছু বলে উঠতে পারেন নি। সম্পর্ক নতুন । হয়তো খারাপ ভেবে বসবে । তাই আর বীণাপাণি দেবী সাহস দেখাতে পারেন নি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা। সুচির মা বীণাপাণি দেবীকে মাসিমা বলে ডাকে এবং খুব স্নেহ করেন। এই স্নেহ আর ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন হওয়ার পরেই একদিন বীণাপাণি দেবী সুচিদের ঘরে গিয়ে সুচির মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে কথাটা পাড়লেন “ বৌমা তোমার মেয়েদের তো কান নাক কিছুই ফোঁড়ানো নেই ! „
“ আসলে মাসিমা , আমার যখন ফোঁড়ানো হয়েছিল তখন খুব ব্যাথা করেছিল তাই আর মেয়েদের জোড় করিনি । „ সুচির মা নিজের কানে যে জায়গাটায় দুল আছে সেখানে আঙুল বুলিয়ে বললেন। মুখের অভিব্যক্তি এমন যে তিনি সেই ছোটবেলার ব্যাথা এখনও অনুভব করতে পারছেন।
“ কিন্তু করাতে তো হবেই মা। বয়স বাড়লে যে আরো কষ্ট পাবে। একসাথে দুজনেরই করিয়ে দাও । „
“ কিন্তু এখানে কে করায় ? সেটাই তো জানি না ! „
“ আমি আছি তো। আমি বারাসাতে কতো করিয়েছি। „ বীণাপাণি দেবী অভয় দিলেন।
“ তাহলে তুমিই করিয়ে দাও । „ সুচেতা দেবী জানতেন একদিন না একদিন করাতেই হবে। তাই মাসিমার অভয়বাণী শুনে একটু আশ্বস্ত হলেন।
সেই কথা মতো একদিন সুমি বিকালে স্কুল থেকে ফিরলে সুচেতা দেবী দুই মেয়েকে নিয়ে হাজির । বীণাপাণি দেবী সুমি কে নিয়ে লাল গদিমোড়া সোফায় বসে তার কানে কানে বললেন “ তুই বড়ো । তোর প্রথমে করছি। চুপচাপ থাকবি । „
“ কি করাবে দিম্মা ? „ সুমির কন্ঠে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট ।
“ তোর কান আর নাক ফুঁটো করবো । „
“ লাগবে তো। „ সুমি বেশ ভয়েস সাথেই বললো কথাটা। তার কারন , ক্লাসে যখন তার বন্ধুরা নাক কান ফুঁটো করে আসতো তখন সুমি তাদের জিজ্ঞাসা করায় তারা বলেছিল— খুব ব্যাথা হয় !
“ একদম লাগবে না। চুপচাপ বসে থাকবি। আর তুই কাঁদলে কিন্তু তোর বোনও কাঁদবে। তখন তোকে সবাই ভিতু বলবে । „ বীণাপাণি দেবী জানেন বাচ্চাদের মন কিভাবে বুঝতে হয় আর শক্ত করতে হয়।
ভিতু হতে একদম রাজি নয় সুমি। সুমির বয়স এগারো। বুদ্ধিমান মেয়ে । সে বুঝলো যে — আমি যদি কান্নাকাটি করি তাহলে সুচিও কাঁদবে । তাই সুচির দিম্মা যখন একটা মোটা সূচ দিয়ে দুটো কান আর নাকে ফুঁটো করে সুতো পড়িয়ে দিচ্ছিলেন তখন প্রচন্ড ব্যাথা যন্ত্রনায় মুখটা কুঁকড়ে গেলেও এক ফোঁটা চোখের জল বার করলো না সুমি।
আর সুচি সামনে দাঁড়িয়ে সব দেখলো। এবং বুঝলো যে এবার তার পালা । সেইভাবে সেও প্রস্তুতি নিল। সে মনে মনে বলছে — দিদি কাঁদে নি। আমি যদি কাঁদি তাহলে আমায় সবাই কাঁদুনে বলবে। কিন্তু বুকটা তার ধুকপুক করছে অনেকক্ষণ থেকেই। ওই মোটা সুচ ফুটলে লাগবেই লাগবে। এটাই বারবার মনে হচ্ছে তার।
সুমিকে করে দেওয়ার পর বীণাপাণি দেবী বললেন “ কানে , নাকে হাত দিবি না। এইভাবেই থাক। „ তারপর সুচির দিকে ফিরে বললেন “ তুই আয় এবার। „
সুচি একটা ঢোক গিলে দিম্মার পাশে গিয়ে বসলো দিম্মা তার কানের লতিতে সূচ দিয়ে ফুটো করা শুরু করলেন তখন কান্না না করলেও মুখটা ব্যাথায় কুঁচকে গেল। ডান কান ফুটো করার পর যখন সুচি চোখ খুললো তখন দেখলো সামনে তিন বছরের আকাশ সব দাঁত বার করে শয়তানি হাঁসি হাঁসছে । এটা দেখে সুচি রেগে গিয়ে ওকে মারতে যাচ্ছিল কিন্তু বীণাপাণি দেবী তাকে ধরে আবার বসিয়ে দিলেন “ একদম নড়বি না । নড়লে কিন্তু লাগবে। „
“ দিম্মা ও হাঁসছে । „ আকাশের দিকে আঙুল দিয়ে বললো সুচি।
“ দাদুভাই হাঁসতে নেই , তুমি যাও এখান থেকে। „ নিজের দাদুভাইকে আকাশ করলেন দিদিমা।
আকাশ দিদিমার কথা শুনে চলে যেতে যেতে মনে মনে বলছিল — বেশ হয়েছে। সব সময় দাদাগিলি। উত্তেজনার বশে নিজের মনে মনে কথা বলার সময়েও আকাশ তোতলালো।
আসলে হয়েছে কি , সোসাইটির সব গৃহিণী দিনের কাজ শেষ করে বিকালের দিকে নিজের বাচ্চাকাচ্ছা নিয়ে গল্পো করতে বসেন। পার্কের ভিতর বাচ্চারা খেলা করে আর সেখানের সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো বড়ো বড়ো বেঞ্চে মায়েরা বসে গল্পো করেন। রাস্তার ফুটপাতে যখন আলো জ্বলতে শুরু করে তার কিছুক্ষণ পর এই গল্পের আসর ভেঙে যে যার বাড়ি চলে যায়। সবার আলাদা আলাদা গ্রুপ আছে। যার সাথে যার বেশি ভাব তার সাথেই গল্পো গুজব হয়। এরকমই একটা গ্রুপ হলো সুচি আর আকাশের মায়ের গ্রুপ। এই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা পাঁচ । সুচির মা, আকাশের মা, আকাশের দিদিমা, বিপ্লবের মা দেবযানী ঘোষাল আর জয়শ্রীর মা শুভশ্রী কুন্ডু। জয়শ্রী হলো সুচির সমবয়সী আর বিপ্লব হলো আকাশের সমবয়সী।
তো কান ফোঁড়ানোর দুইদিন আগে বিকালে সব মায়েরা মিলে গল্প করছে আর বাচ্চারা খেলছে। তখন বিপ্লব আকাশকে ডেকে এনে বললো “ দোকানে যাবি ? „
আকাশ বিপ্লবের থেকে আড়াই মাসের ছোট। সে হ্যাঁ বলে দিল। তারপর তারা দুজন মিলে চুপিচুপি পার্ক থেকে বেরিয়ে সোসাইটির বড়ো গেটের দিকে যেতে লাগলো। কিছুদূর যাওয়ার পর আকাশ নিজের জামার কলারে একটা টান অনুভব করলো। ভয় পেয়ে পিছন ফিরে দেখলো সুচি তার জামার কলার ধরে টেনে ভুরু কুঁচকে তারই দিকে তাকিয়ে আছে ।
“ কোথায় যাচ্ছিস ? „ আকাশ পিছন ঘুরতেই সুচি প্রশ্ন করলো।
“ দোকানে । লজেন্স কিনতে। „ বলে দিল আকাশ।
“ যেতে হবে না। এক্সিডেন্ট হতে পারে । আর বড়দের কাউকে কিছু না বলে কখনো কোথাও যাবি না। বুঝলি ? „ বলে আকাশকে একটা ধমক দিয়ে তার হাত ধরে টেনে আনতে আনলো সুচি। ভাবটা এমন যেন ও কতো বড়ো।
এই ভাবটাই আকাশের পছন্দ হয়নি। সেদিন বিপ্লবের সামনে তিন বছরের আকাশের মান-সম্মান বলে আর কিছু থাকলো না । কিন্তু সুচিকেও কিছু বলতে পারলো না কারন মা জানলে বকবে ।
কান নাক ফোড়ানো হওয়ার সময় সুচি আকাশের হাঁসি ভুলে গেল। প্রচন্ড জ্বালায় তার ফর্সা মুখ লাল হয়ে রইলো। মুখে তার জ্বালার ছাপ স্পষ্ট। সেটা দেখে দিম্মা তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললেন “ কতো বড়ো হয়ে গেছিস তুই। ব্যাথা লাগেনি তো ? „
হ্যাঁ সুচি বড়ো হয়ে গেছে। তাই সে মাথা দুই দিকে ঘুরিয়ে না বলে দিল।
এর কিছুদিন পর একদিন সকালে সুচেতা দেবী দেখলেন যে রান্নার নুন নেই। তাই তিনি কিছু টাকা নিয়ে সুমিকে স্কুলে দিয়ে আসতে গেলেন। ফেরার সময় একটা নুনের প্যাকেট কিনবেন। সুমিকে স্কুলে দিয়ে যখন সুচি কে নিয়ে ফিরছিলেন তখন সুচি রাস্তায় একটা ভ্যানের মতো গাড়িতে আচার বিক্রি হতে দেখলো। সেটা দেখেই সুচি বায়না ধরলো “ মা , আচার খাবো । „
আচার সুচেতা দেবীরও খুব প্রিয় । তাই তিনি তার মেয়েকে ভ্যানরিক্সার সামনে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “ কি নিবি ? „
বড়ো বড়ো ডিসের মতো পাত্রে বিভিন্নধরনের আচার রাখা ছিল। কুলের আচার, চালতার আচার, আমের আচার , কাঠালের আচার, কামরাঙার আচার, তেঁতুলের আচার , আমলকীর আচার। আর সেগুলো বিক্রি করছিল এক মধ্যবয়সী রোগা পাতলা লোক । এতকিছু দেখে শুধু সুচির না ! সাথে সুচির মায়েরও জিভে জল চলে এলো
সুচি চালতার আচার দেখিয়ে বললো “ কাকু , এটা দাও। „ চালতার আচার সুচেতা দেবীরও খুব প্রিয় । তাই তিনি দুজনের জন্যেই কিনলেন। আচার কাকু দুটো ছোট প্লাস্টিক এর ঠোঙাতে বড়ো হাতার একটা হাতা করে দিয়ে দিলেন। তারপর সেটা তারা ব্যাগে ভর্তি করে নিলেন। এদিকে সুচির মা ভুলে গেলেন নুন কেনার কথা।
আকাশের মা রান্নার জন্য কিছু মশলা কিনতে নিচে গিয়েছিলেন আর দিদিমা সোফায় বসে একটা খবরের কাগজ পড়ছিলেন। তিনি মাঝে মাঝেই পড়েন খবরের কাগজ। আর আকাশ বাদশার সাথে একটা প্লাস্টিক এর গাড়ি নিয়ে খেলছিল। ঠিক তখনই আকাশ সিড়িতে সুচির স্কুলের জুতোর আওয়াজ শুনতে পেল । দরজা খোলাই ছিল। তাই আকাশ মাথা তুলে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর সুচি এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার স্কুল ব্যাগ থেকে তার ভাগের আচার বার করে আকাশের দিকে দিয়ে বললো “ তুই খা আমি আসছি। „
সুচেতা দেবী তখন ঘরের তালা খুলতে ব্যাস্ত। তাই তিনি মেয়ের দিকে বিশেষ খেয়াল দিতে পারলেন না।
আকাশ প্লাস্টিক এর ঠোঙাটা নিল। আর সুচি চলে গেল স্কুল ড্রেস বদলাতে। সুচি যখন তার সবথেকে পছন্দের লাল ফ্রগটা পড়ে ফিরলো তখন দেখলো আকাশ সব আচার খেয়ে নিয়েছে । সেটা দেখে রাগে দুঃখে সুচির চোখে জল চলে এলো। হঠাৎ তার সেদিনের কান ফোঁড়ানোর সময়ে আকাশের হাসি মনে পড়ে গেল। সেটা মনে পড়তেই চোখের জল নিমেষে উধাও হয়ে গেল আর রাগে চোখ বড়ো বড়ো করে ভুরু কপালে তুলে ফেললো আকাশের চুলের মুঠি ধরে ঘোরাতে ঘোরাতে বললো “ তোকে সব খেতে কে বলেছিল ? „
আকাশ ও ছাড়ার পাত্র নয়। সে সুচির দাদাগিলি আর সহ্য করবে না। অনেক হয়েছে এর দাদাগিলি। সেও সুচির চুল আর জামা ধরে টানতে লাগলো “ তুই তো দিলি আমায় ! „
বীণাপাণি দেবী সোফা থেকে উঠে এগিয়ে এসে দুজনকেই থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বললেন “ থাম তোরা , আমি বানিয়ে দেবো তোদের আচার। তখন যতো পারিস খাস । „ কিন্তু থামাতে পারলেন না। তিনি বৃদ্ধা মানুষ। একা দুইজনকে সামলানোর ক্ষমতা তাঁর আর নেই।
এটা শুনে সুচি বললো “ না দিম্মা , আমার এখনই চাই। „ তখনও কিন্তু তারা একে অপরের গায়ে উঠে চুল , জামা টানছে আর পা দিয়ে একে অপরের পেটে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সুচি আকারে বয়সে বড়ো তাই আকাশ বিশেষ সুবিধা করতে পারছে না।
ঠিক সেই সময় সুচির মায়ের রান্নাঘরে মনে পড়লো তিনি নুন কিনে আনেন নি। মনে মনে ভাবলেন — এখন কে যাবে নুন আনতে। তার চেয়ে স্নেহার কাছ থেকে নিয়ে আসি। তাই তিনি একটা বাটি নিয়ে আকাশদের ফ্ল্যাটে এলেন। এসে দেখলেন তার ছোট মেয়ে আর আকাশ মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দুজনেই দুজনের চুল আর জামা ধরে টানছে। আর মাসিমা তাদের ছাড়াতে ব্যাস্ত। মেয়েকে মারপিট করতে দেখে তিনি রেখে গেলেন। দৌড়ে এসে মেয়েকে ছাড়িয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন । তারপর ধমক দিলেন “ মারপিট করছিস কেন ? „
হয়তো মেয়েকে তিনি মারতেন । কিন্তু মাসিমার সামনে মারা যায় না। তাই তিনি শুধু ধমকেই কাজ সারলেন।
“ ও আমার সব আচার খেয়ে নিয়েছে। „ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো সুচি। ফর্সা গাল তখন লাল টকটকে রং ধারন করেছে ধস্তাধস্তির জন্য। শুধু সুচি না সাথে আকাশের নাক ফুলে গেছে রাগে। গাল লাল হয়ে গেছে। বড়ো বড়ো নিশ্বাস ছাড়ছে “ তুই তো দিলি আমায় এটা খা বলে ! „
“ তোর ব্যাগে তো আমার আচার আছে। ওটা নিয়ে নে যা । আর কখনো মারপিট করবি না বলে দিলাম। „ শেষের কথাটা তিনি ধমকই দিলেন বলা যায়।
সুচির মনে পড়লো হ্যাঁ সত্যি তো মা দু প্যাকেট আচার কিনেছিল। সেটা মনে পড়তেই সুচি সেটা খাওয়ার জন্য চলে গেলো। যাওয়ার আগে অবশ্য আকাশের দিকে ভষ্ম করে দেওয়ার একটা দৃষ্টি হানলো। সেই দৃষ্টি দেখে বীণাপাণি দেবী একটু হেঁসে মনে মনে বললেন — কি মেয়েরে বাবা !
তিনি তার জীবনে অনেক মেয়ে দেখেছেন। কিন্তু বিশেষ একজনের সামনেই কোন মেয়েকে এইধরনের আচরণ করতে কখনো দেখেননি। তাই তিনি বুঝলেনও না যে এই ঘটনা তো সবে শুরু। আসল কুরুক্ষেত্র এখনও বাকি।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment