মিষ্টি মূহুর্ত [২য় পর্ব] [২]

লেখক :— a-man & বিচিত্রবীর্য
Typist :— বিচিত্রবীর্য

দ্বিতীয় পর্ব — আসা যাওয়ার মাঝে

(৫)
চৈত্র মাস । সকাল থেকেই কাঠ ফাটা রোদ । তার উপর দুপুর বেলা । কুকুরের সাথে মানুষেরও জিভ বেরিয়ে আসার উপক্রম । বীণাপাণি দেবী সকাল বেলা ছাদে একটা গামলার মতো ছোট পরিত্যক্ত পাত্রে জল রেখে এসছিলেন। সেই জল এখন এক জোড়া শালিক খাচ্ছে। তখন ঘরে ঘরে ফ্রিজ , এসি , টিভি আসেনি। সমাজে যারা একটু বেশিই বড়ো লোক বলে পরিগণিত , শুধু তারাই এইসব অত্যাধুনিক মেশিনের সুবিধা নিতে সক্ষম হতো । আর সেইসব বড়ো লোকদের মধ্যে আকাশের বাবার নামটাও উচ্চারিত হয় । তাই তিনি গরম পড়তেই একটা 180 লিটারের one door ফ্রিজ কিনে নিলেন ।
দুপুরের খাওয়ার পর সুচেতা দেবী তার ছোট মেয়েকে নিয়ে ভাত ঘুম দিয়েছিলেন কিন্তু সুচির কোন ভাবেই ঘুম আসেনি। সে জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল।
সোসাইটির বাইরের রাস্তার ফুটপাতে যে শিমুল গাছ আছে সেটার দিকে দৃষ্টি পড়তেই তার মনে পড়লো — সেটা তে আজ সকালে একটা ইয়া বড়ো লাল ঝুটি সাদা কাকাতুয়া পাখি এসে বসেছিল । গলায় সোনালি কালারের লকেট দেখে বোঝা যাচ্ছিল ওটা কারোর পোষা । ওই বিপ্লব বিচ্ছু একটা ঢিল ছুঁড়ে উড়িয়ে দিল । ঘটনাটা মনে পড়তেই বাইরে যাওয়ার জন্য মন আনচান করে উঠলো । মায়ের হাতটা আস্তে করে নিজের পেটের উপর থেকে সরিয়ে , খাট থেকে নেমে , ছোট ছোট পা ফেলে ঘরের বাইরে চলে এলো ।
তারপর ফ্ল্যাটের বাইরে এসে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যেতেই পিছন থেকে দিম্মার আওয়াজ পেল “ কোথায় যাচ্ছিস এই ভরদুপুরে ? „
দিম্মার কন্ঠ পেতেই সুচি পিছন ঘুরে তাকালো । দেখলো আকাশদের ফ্ল্যাটের দরজার ওইপাড়ে দিম্মা দাঁড়িয়ে আছে । সুচি পিছন ফিরতেই দিম্মা আবার বললেন “ এই ভরদুপুরে আর খেলতে হবে না । ভেতরে এসে বস। „
সুচি দিম্মার কড়া কন্ঠের আদেশ শুনে মাথা নিচু করে লিভিং রুমে এসে সোফায় বসলো । সুচির এই ভরদুপুরে বাইরে খেলতে যেতে দেখে বীণাপাণি দেবীর নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল । তার মেয়েও গ্রীষ্মের দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুকুরে গিয়ে ঝাপ দিত । তখন বারাসাত গ্রাম ছিল বলা যায় ।
স্নেহা দেবীও তার ছেলেকে নিয়ে ভাত ঘুম দিয়েছিলেন। কিন্তু আকাশ ঘুমাতে পারেনি। সে তাদের নতুন কেনা ফ্রিজের দরজা খুলে তার ঠান্ডা বাতাস নিজের শরীরে মাখার জন্য খাট থেকে উঠে লিভিং রুমে এসে উপস্থিত হলো। এসে দেখলো দিদিমা আর সুচি আগে থেকে সোফায় বসে গল্প করছে। আর সোফার নীচে মেঝেতে বাদশা বসে আছে। আকাশে কে দেখেই বাদশা ঘেউ ঘেউ শব্দ করে ডেকে উঠলো।
“ চুপ , মা জেগে যাবে। „ আকাশ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বাদশাকে চুপ করিয়ে দিল।
বাদশা ঘেউ ঘেউ বন্ধ করে লেজ গুটিয়ে আবার সুচির পায়ের কাছে গুটিয়ে বসে পড়লো । আকাশ তাদের নতুন কেনা ফ্রিজটার দরজা খুলে তার সামনে চোখ বন্ধ করে , মুখ হা করে দাঁড়িয়ে পড়লো।
“ দাদুভাই তুই না সকালেই এইজন্য বকা খেয়েছিস মায়ের কাছে । এখন আবার করছিস ! „ আকাশকে ফ্রিজ খুলে ফ্রিজের হাওয়া খেতে দেখে দিদিমা সকালের ঘটনা টেনে আনলেন। দিদিমার কথা শুনে আকাশের মনে পড়লো। হ্যাঁ সকালেই ওর মা ওকে কান মলে দিয়ে আচ্ছা করে বকেছে । দিদিমার সাবধান বাণী শুনে সে ফ্রিজ থেকে একটা ঠান্ডা বরফ জমে যাওয়া জলের বোতল বার করে সেটা খুলে জল খেতে যাচ্ছিল। দিদিমা আবার বারন করলেন “ না। বরফ জল খেতে নেই। এই গরমে সর্দি গর্মি হবে। „
পরপর দুবার দিদিমার বারন শুনে আকাশ এসে দিদিমার পাশে বসে পড়লো।
“ আইস্ক্রিম খাবি ? „ জিজ্ঞেস করলেন দিদিমা । আকাশের অবস্থা দেখে দিদিমার মায়া হলো। সত্যি খুব গরম পড়ছে আজকাল। আগে এতো পড়তো না।
আইস্ক্রিম এর নাম শুনতেই আকাশের মনটা খুশিতে নেচে উঠলো । খুব খেতে ইচ্ছা করে কিন্তু মা দেয়না খেতে । দিদিমাকে ভালো করে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো “ আমি পেপসি খাবো । „
বীণাপাণি দেবী আঁচলের গিট খুলে সুচিকে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে বললেন “ যা রাস্তায় অনেক আইসক্রিম বিক্রি হয় । গিয়ে দেখ আছে কি না । থাকলে তোদের দুজনের পছন্দ মতো নিয়ে আসবি। „
সুচি টাকা নিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে , লাফিয়ে লাফিয়ে সিড়ি ভেঙে , বিল্ডিং এর নীচে গিয়ে , পাথর বিছানো রাস্তা দিয়ে দৌড়ে সোজা সোসাইটির বড়ো দরজার সামনে গিয়ে থামলো । লোহার গেটটার ফাঁক দিয়ে দেখলো রাস্তায় কোন আইসক্রিম এর ঠেলা গাড়ি আছে কি না । না বাইরে কাক পক্ষী ও নেই ।
উত্তেজনার বসে সুচি লক্ষ্যই করেনি যে গেটটার পাশে যে দেবদারু গাছ আছে তার ছায়ায় বৃদ্ধ রহমত চাচা একটা প্লাস্টিক এর চেয়ারে বসে আছেন। সুচিকে এইভাবে দৌড়ে এসে দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে দেখে ভুরু নাচিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন “ কিরে ? এই ভরদুপুরে কোথায় যাবি ? „
সুচি হকচকিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখলো রহমত চাচা বসে আছে তার ডিউটির নিল জামা আর কালো ফুল প্যান্ট পড়ে “ কোথাও যাবো না দাদু । আইস্ক্রিম কিনবো । কিন্তু আইস্ক্রিম কাকু তো নেই ! „
“ তুই ঘরে যা। এই রোদে থাকিস না । আইস্ক্রিম এলে আমি নিয়ে যাবো। যা ঘরে যা। আর দৌড়াদৌড়ি করিস না । „
“ আকাশের জন্য পেপসি…..
“ আর তোর জন্য কুলফি তাইতো ? „ সুচিকে কথা শেষ করতে দেওয়ার আগেই রহমত চাচা সুচির অসমাপ্ত কথা বলে দিলেন।
“ তুমি জানলে কি করে ? „
“ তোর দাদু তোর প্রিয় আইস্ক্রিম জানবে না ? যা , এই রোদে থাকিস না। „ শ্যাম বর্ণ কোঁচকানো চামড়ার মুখে বড়ো বড়ো সাদা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন রহমত চাচা। দাদুর কথা শুনে সুচি উপরে চলে এলো। এবার দৌড়োয় নি। হেঁটেই এসছে ।
সুচি যখন উপরে এসে আবার দিম্মার পাশে বসলো তখন দিম্মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন “ চলে এলি ? আইস্ক্রিম কোথায় ? „
“ রাস্তায় তো কেউ নেই ! তাই দাদু বললো চলে যেতে । আর আইস্ক্রিম কাকু এলে দাদু কিনে নিয়ে আসবে । „ সোফায় বসে বাদশার দিকে তাকিয়ে বললো সুচি।
কিছুক্ষণ পর রহমত চাচা হাতে একটা কালো পেপসি আর কুলফি নিয়ে উপরে এলেন। দরজা খোলাই ছিল তাই তিনি সোজা ভিতরে ঢুকে এলেন। দাদুর হাতে পেপেসি দেখে আকাশ সোফা থেকে উঠে দৌড়ে দাদুর হাত থেকে পেপসিটা প্রায় ছিনিয়ে নিল বলা যায়। আকাশকে পেপসি দিয়ে সুচিকে তার কুলফি দিয়ে দিলেন । আকাশকে এইভাবে পেপসি নিতে দেখে সুচি বিরক্তির দৃষ্টিতে ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকালো কিন্তু আকাশ তখন পেপসির মাথায় এক কোনার প্ল্যাস্টিক দাঁত দিয়ে ছিড়ে পেপসি খেতে শুরু করেছে।
“ আপনি আবার এত কষ্ট করে আনতে গেলেন কেন ? „ বলে টাকা দিতে যাচ্ছিলেন দিদিমা।
“ এদের জন্য কিছু করলে কষ্ট হয়না। মনটা শান্তি পায় । টাকা লাগবে না । „ আকাশের দিদিমা রহমত চাচার কথার কিছুই বুঝলেন না তাই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন । সেটা দেখে রহমত চাচা বললেন “ এদের দেখলে যে আমার নিজের নাতনির কথা মনে পড়ে যায়। „
রহমত চাচার কথাটা সাত বছরের সুচি আর তিন বছরের আকাশ বোঝেনি। কারন তাদের বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু বীণাপাণি দেবী বুঝলেন। এখানে এসছেন এক বছর হয়ে গেল। এই সময়ে তিনি এই বৃদ্ধ দারোয়ান এর সম্পর্কে বেশি কিছু শোনেননি। যা শুনেছিলেন তা হলো — এনার কেউ নেই। এখানেই থাকে । রান্না করে খায়। আজ আকাশের দিদিমা আবিষ্কার করলেন এই বৃদ্ধের পরিবার ছিল।
তাই যখন বিকাল বেলা সোসাইটির সব গৃহিণী তাদের সন্তানদের নিয়ে পার্কে গেলেন হাওয়া খেতে। তখন দুর থেকে এই বৃদ্ধ কে দেখে বীণাপাণি দেবী এগিয়ে গেলেন আরো জানার জন্য ।
রহমত চাচার বয়স হয়েছে। কিন্তু কত বয়স হয়েছে সেটা কেউ জানে না। বয়সের জন্য কাঁধ বেঁকে গেছে। শ্যাম বর্ণ মুখে সাদা দাড়ির অস্তিত্ব দূর থেকেই বোঝা যায় কিন্তু মুখে গোঁফ নেই । রহমত চাচা তখন একটা চেয়ারে বসে বাইরে রাস্তার গাড়ি ঘোড়া দেখতে ব্যাস্ত। বীণাপাণি দেবী এগিয়ে গিয়ে তার কাছে যেতেই তিনি তার নিজের ভালো চেয়ারটা ছেড়ে দিলেন “ বসুন , বসুন । „
“ আরে না , না ! আপনি নিজের চেয়ার ছেড়ে দিচ্ছেন কেন ? „
“ আমি ভিতর থেকে আর একটা আনছি । „ বলে তিনি নিজের ছোট ঘুবচির মতো ঘরে গিয়ে আর একটা চেয়ার এনে বসলেন । বসতেই তাদের মধ্যে এদিক ওদিকের কথা শুরু হলো। কিছুক্ষণ এদিক সেদিকের কথা বলার পর বীণাপাণি দেবী প্রশ্ন করলেন “ আপনি আগাগোড়া এই শহরেই আছেন ? „
“ না , আমার আদি বাড়ি বর্ধমানে। সেখানেই থাকতাম। „
“ আর ওখানে যান না ? „
“ কেউ তো নেই ওখানে। কার জন্য যাবো ? „ মাথা নিচু করে ভারাক্রান্ত মনে বললেন রহমত চাচা।
“ এখন ওখানে কেউ নেই ?
“ সবাই জান্নাতে আছে । „ একটা গভির নিশ্বাস ফেলে কথাটা বললেন রহমত চাচা
“ কেউ বেঁচে নেই ? „
“ না কেউ নেই। এই বৃদ্ধ এখন অনাথ । „
“ কে কে ছিল আপনার পরিবারে ? সবাই মারা গেল কীভাবে ? অনাথ কথাটা শুনে আকাশের দিদিমার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো ।
অনেক দিন পর কেউ তার জীবনের কথা জানতে চাইছে । তাই কিছুক্ষণ রহমত চাচা বীণাপাণি দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন “ তাহলে তো পুরোটা বলতে হয় ! „
“ বলুন না ! আমি শুনবো । „
বীণাপাণি দেবীর কথায় রহমত চাচা তার জীবনের অতীতের কথা বলতে শুরু করলেন — আমি থাকতাম বর্ধমানে দামোদর নদীর পাড়ে। এখানে এসে জেনেছিলাম ওটা নদী না । ওটা নদ । মরশুমে দামোদরে মাছ ধরে আর ধান চাষ করে ভালোই দিন কাটছিল। আমার বিবি তো অনেক আগেই চলে গেছিল। একদিন রাতে বানের জলে আমার ছেলে বৌমা আর একমাত্র নাতনিও চলে গেল। এখনও মনে আছে সেদিনের রাতের কথা । কেত্তিক আর আমি রাতে মাছ ধরেছিলাম। বোয়াল মাছ হয়েছিল প্রচুর। নদীর জল দেখে কেত্তিক বলেছিল “ সুবিধের ঠেকছে না । „ এখানে এসে পরে জেনেছিলাম ওর নাম ছিল কার্তিক। এতদূর বলে একটু থামলেন রহমত চাচা। তারপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে আবার শুরু করলেন।
“ মাঝরাতের দিকে দামোদরে বান এলো । সব ডুবিয়ে নিয়ে গেল। আমার ছেলে , বৌমা , নাতনি কাউকে ছাড়ে নি। „ বলতে বলতে গলা বসে আসছে এই বৃদ্ধোর। “ আমি কোনভাবে একটা গাছের ডাল ধরে ভেসে রইলাম। যখন জল কমলো তখন কার কোথায় বাড়ি ছিল সেটাই বোঝা যাচ্ছিল না। সেই রাতে আমি আমার সবকিছু হারালাম „ মাথা নিচু করে কথা গুলো বলছিলেন রহমত চাচা। মাটিতে টপটপ করে চোখের জল পড়ছিল সেটা বীণাপাণি দেবীর চোখ এড়ালো না । বীণাপাণি দেবীও আচল দিয়ে চোখের কোনায় লেগে থাকা জল মুছে নিলেন। “ সরকার সাহায্য করেছিল কিন্তু সেই সাহায্য নিই নি। কলকাতায় চলে এসছিলাম আঠারো উনিশ বছর আগে । ওখানে থাকলে যে আমার নুসরত এর কথা মনে পড়বে। সেই ভয়ে আর ওখানে থাকিনি। সেই থেকে আর আল্লার ইবাদত করিনি। সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল তো। আল্লার সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। শেষ বয়সে আমার মাথা নিচু করেদিল আমার নাতনিকে ফিরিয়ে দিয়ে……..
“ আপনি সুচির কথা বলছেন ? „ রহমত চাচার কথার মাঝেই জিজ্ঞেস করলেন আকাশের দিদিমা।
“ হ্যাঁ সুচিত্রার কথাই বলছি। সুচি ফর্সা আমার নুসরত ছিল আমার মতোই কালো। তবে মিল একটা ছিল সুচির সাথে। সেটা হলো , গালে টোল পড়া। কথা বলার সময় ঠিক সুচির মতোই আমার নুসরতের গালে গর্ত হয়ে যেত । „ কথাটা বলতে গিয়ে রহমত চাচার ঠোঁটের কোনায় হাঁসি দেখা দিল। হয়ত তার নাতনির হাঁসি মাখা মুখ মনে পড়েছে তাই এই হাঁসি। “ শেষ জীবনে এসে আমাকে আমার হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরিয়ে দিল । যেদিন দেখলাম সুচি আমাকে দাদু বলছে। আর তার দুই গালে গর্ত হচ্ছে তখন থেকে আবার ইবাদত করি । „ কথাগুলো বলতে বলতে হেঁসে দিলেন রহমত চাচা। এই হাঁসি যেন মরেও বেঁচে থাকার হাঁসি। “ কেউ তো আছে আমার যে আমাকে দাদু বলে ডাকে। „
“ কে বলেছে আপনার শুধু সুচি আছে ? আর আপনি নিজেকে কখনো অনাথ বলবেন না। আমি আপনার বোনও তো আছি। তুমি আজ থেকে আমার দাদা। আর আমি তোমার বোন। „ ঠোঁটের কোণায় হাঁসি নিয়ে বললেন আকাশের দিদিমা। আকাশের দিদিমা হঠাৎ করে রহমত চাচাকে আপনি থেকে তুমি সম্বোধন করলেন। বীণাপাণি দেবীর কথা শুনে রহমত চাচা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এই ঘটনার পর থেকে বাড়িতে নতুন কিছু বা ভালো কিছু রান্না হলেই বীণাপাণি দেবী এই বৃদ্ধ মানুষটার জন্য আলাদা করে তুলে রাখতেন । রহমত চাচাও বীণাপাণি দেবীকে নিজের ছোট বোন ভেবে সেগুলো পরম যত্নে খেতেন। প্রথম প্রথম সোসাইটির কয়েকজন আড়চোখে তাকালেও যখন দেখলো বীণাপাণি দেবী রহমত চাচাকে দাদা বলে ডাকছেন ! তখন সবার চোখ আবার নিজের জায়গায় ফিরে এলো।
এইভাবেই সুখে দুঃখে আরও একটা বছর কেটে গেল। আকাশ এখন চার বছরের। আকাশের দাদু মারা যাওয়ার পর স্নেহাঃশু বাবু আর কলকাতা আসেন নি। মাঝে মাঝে ফোন করে খবরাখবর দিতেন। বেশিরভাগ সময় বীণাপাণি দেবী নিজেই ফোন করে তার ছেলের খবর নিতেন। স্নেহাঃশু বাবু তেমন ফোন করতেন না। তেমনি একদিন সন্ধ্যায় আকাশের মামা তার মাকে ফোন করে কথা বলছিলেন। বীণাপাণি দেবী অবাক হয়েছিলেন ছেলের এই নিজে থেকে ফোন করায়। কিন্তু তিনি ভাবলেন হয়তো নাড়ীর টান।
“ হ্যাঁ , মা ! „
“ বল খোকা । „
“ কেমন আছো ? „
“ আমার মেয়ে জামাই আমাকে সুখেই রেখেছে। „ নিজের মেয়ের শশুর বাড়িতে থাকতে মোটেও খারাপ লাগছে না আকাশের দিদিমার। কিন্তু সব পিতা মাতার আশা থাকে বুড়ো বয়সে তাদের ছেলে তাদের দেখবে। কিন্তু আকাশের মামা এইভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় একটু বেশিই কষ্ট পেয়েছিলেন বীণাপাণি দেবী।
কথাটা শুনে তেমন কোন রাগ হলো না আকাশের মামার। তিনি চুপচাপ মায়ের কথা শুনলেন। মা আরো বললেন “ বুড়ো বয়সে ছেলের দায়িত্বে মা বাবা থাকে। আর আমার এই পোড়া কপালে সেটা জোটেনি। „
মাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আকাশের মামা বললেন “ বলছি , এখানে চলে আসো তাহলে ! „
“ এখানে মানে কোথায় ? আমার বাড়ি বারাসাতে থাকার কথা বলছিস ? „ একটা আশার আলো দেখতে পেলেন আকাশের দিদিমা।
“ না । আমি মুম্বাই এর কথা বলছি । যখন ছেলের কাছে থাকার ইচ্ছা তখন এখানে চলে আসো । পরশু চলে আসো । আমি ঠিকানা মেসেজ করে দিচ্ছি। „ বলে ফোন কেটে দিলেন আকাশের মামা ।
রাতে যখন সবাই একসাথে খেতে বসলো তখন বীণাপাণি দেবী সুখের কথাটা বললেন “ স্নেহু ফোন করেছিল। আমাকে ওর কাছে থাকার জন্য ঢেকেছে । „
আকাশের মা তখন সবে রুটি ছিঁড়ে মাংসের বাটিতে সেই টুকরো টা ডুবিয়েছেন। ওখানেই থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “ মানে ? „
মেয়ের প্রশ্নে আকাশের দিদিমা বিশদে সব খুলে বললেন। সবকিছু শুনে আকাশের মা আকাশ কে খাইয়ে দিয়ে , নিজে খেয়ে তারপর তার ভাইকে ফোন করলেন “ তুই মাকে ডেকেছিস ? „
“ হ্যাঁ। কেন অসুবিধা আছে ? „
“ না অসুবিধা নেই। তবে আমরাও আসছি মাকে ছাড়তে । „ আকাশের মা এতোটা বলতেই অপর প্রান্ত থেকে ফোন কেটে গেল।
“ দিদিমা তুমি চলে যাবে ? „ রাতে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো আকাশ।
“ ধুর বোকা । আমি কোথায় যাবো ? আমি আসবো তো মাঝে মাঝে । এখন ঘুমা । অনেক রাত হয়েছে । „ আকাশকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেন দিদিমা। কিন্তু আকাশের চোখে জল না এলেও তার মন কিন্তু কাঁদছে। দুই বছর ধরে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। দিদিমার গায়ের গন্ধ শুঁকে তাড়াতাড়ি ঘুম চলে আসে। দুইদিন পর থেকে এইসব কিছুই সে আর পাবে না।
সকালে যখন সুচি বাদশার সাথে খেলতে এলো তখন আকাশ তাকে বললো “ জানিস ? দিদিমা চলে যাবে ? „
কথাটা শুনতেই সুচির চোখে জল চলে এলো “ দিম্মা তুমি চলে যাবে ? „
“ বোকা মেয়ে কাঁদছে দেখো। কাঁদিস না , আমি মাঝে মাঝে এসে তোর সাথে দেখা করে যাবো । „ বলে সুচির চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে কপালে একটা চুমু খেলেন দিম্মা ।
দুই দিন পর সকালে সুচেতা দেবীকে বাদশা , বাদশার ডগ ফুড আর ঘরের চাবি দিয়ে পুরো পরিবার কয়েক দিনের জামাকাপড় নিয়ে একটা ট্যাক্সি করে এয়ারপোর্ট চলে এলো । আসার আগে বীণাপাণি দেবী রহমত চাচার সাথে শেষ কথা বলে এলেন । রহমত চাচা কাঁদলেন না। তিনি তার সব আপনজনকে হারিয়েছেন। এখন আপনজন কে হারানো যেন অভ্যাস হয়ে গেছে। এয়ারপোর্টে এসে তারা মুম্বাইগামী প্লেনে চেপে বসলো। আকাশ এই প্রথম প্লেনে উঠলো তাই তার উৎসাহ দেখার মতো। এক জায়গায় স্থির থাকছিল না। মায়ের বকুনি খেয়ে চুপচাপ প্লেনের জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলো । পরপর তিনজন পাশাপাশি বসেছিলেন। জানলাতে আকাশ। তারপাশে তার মা আর মায়ের পাশে দিদিমা। জানলা দিয়ে তাকিয়ে আকাশ মেঘ দেখলো। মেঘের উপর দিয়ে চলেছে তারা। নিচের পাহাড় কতো ছোট ছোট দেখাচ্ছে। আর নদী গুলো যেন সুতোর মতো সরু। এইসব দেখতে দেখতেই সে পৌছে গেল মুম্বাই। এয়ারপোর্টে নেমে তারা আকাশের মামার দেওয়া ঠিকানা বলে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলো ।
আকাশের মামার দেওয়া ঠিকানায় যখন তারা পৌছুলো তখন বেশ বিকাল হয়ে এসছে । ট্যাক্সি থেকে নেমে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করতে ট্যাক্সি ড্রাইভার সামনের বহুতল বিল্ডিংটা দেখিয়ে দিয়ে বললো “ এহি হে আপকা পাতা হ্যা। „
তারপর সবাই মিলে সেই বহুতল বিল্ডিংটায় ঢুকতেই আকাশের মামা এগিয়ে এলেন। তিনি যেন হাওয়ার মধ্যে থেকে হঠাৎ ভেসে এলেন। সাথে একটা মেয়েও এগিয়ে এলো । মেয়েটা সুন্দরী। ফর্সা, লম্বা চুল। স্লিম ফিগার। বয়স খুব জোড় 25-26 হবে।
মেয়েটা এগিয়ে এসে সবাইকে একটা প্রণাম করলো তারপর চার বছরের আকাশকে কোলে তুলে নিয়ে মেয়েটা আদুরে গলায় বললো “ আপনারা এখন এলেন ? আমরা কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি আপনাদের জন্য। „ মেয়েটার কথা শুনে তো সবাই রীতিমতো বাকরুদ্ধ। মেয়েটা আরো বললো “ আসুন ভিতরে আসুন বাবা মা অপেক্ষা করছে আপনাদের জন্য। „
সবাই বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো । মেয়েটা এমন ভাবে কথা বলছে যেন কতদিনের চেনা। কিন্তু আকাশের পরিবার মেয়েটার নামটাও জানে না। আকাশের বাবা মা দিদিমা যে ইশারায় স্নেহাংশু বাবু কে কিছু জিজ্ঞাসা করবেন তারও উপায় নেই। কারন আকাশের মামা মাথা নিচু করে আছেন । কারোর দিকেই তাকাচ্ছেন না। তারপর তারা বিল্ডিং টায় ঢুকে এলিভেটরে উঠে , নয় তলায় থামলো। বিল্ডিংটা বেশ বড়ো জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের আন্দাজে বারো থেকে তেরো তলা তো হবেই। তারপর এলিভেটরের বাইরে এসে মেয়েটা একটা দরজার কলিং বেল বাজালো । সঙ্গে সঙ্গে এক বয়স্কা মহিলা দরজা খুললেন “ আসুন , আসুন। „
তারপর সবাই ভিতরে ঢুকলো । ফ্ল্যাট টা কতো বড়ো সেটা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু মেঝেতে মার্বেল বসানো। দেওয়ালে প্লাস্টার করা আর দিনের বেলায়ও লাইট জ্বালায়ি রাখা। ওই বয়স্কা মহিলা লিভিং রুমে নিয়ে গিয়ে একটা সোফা দেখিয়ে বললেন “ বসুন বসুন। „
আকাশের মা বাবা দিদিমা সবাই লক্ষ্য করলো একটা সোফাতে আগে থেকেই এক বয়স্ক ভদ্রলোক আগে থেকেই বসে আছেন । সোফাতে বসতেই তিনি বললেন “ বসুন , বসুন। আপনারা এতো দেরি করে এলেন । তবুও সময়ের আগে আসতে পেরেছেন এই অনেক। „
লোকটা বলে কি ? সবাই আগে থেকে বাকরুদ্ধ তো ছিলেনই। এখন যেন বোবা হয়ে গেলেন । সময়ের আগে আসতে পেরেছেন মানে কিছুই বুঝতে পারছেন না কেউ ।
ওই ভদ্রলোক আরো বললেন “ আপনারা যে ঘরজামাই এর কথাটা মেনে নেবেন সেটা ভাবতেই পারি নি। বুঝতেই পারছেন ! একটাই মেয়ে তাই কোল ছাড়া করতে বুক ফাটে । „
এবার আকাশ বাদে কারোরই বুঝতে বাকি রইলো না যে এখানে কি হচ্ছে ! আকাশের মামা আদেও বীণাপাণি দেবীকে এখানে রাখার জন্য ডাকেনি। ডেকেছে নিজের বিয়ের জন্য। যে মেয়েটা প্রণাম করলো সে হলো পাত্রী আর এই বয়স্কা বৃদ্ধ বৃদ্ধা হলো পাত্রীর মা বাবা । ব্যাপারটা বুঝতেই সবার চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। আকাশের মা আকাশের বাবার দিকে তাকালেন। সবাই সবার মুখের দিকে তাকালেন । তারপর আকাশের মা বাবা আর দিদিমা আকাশের মামার দিকে তাকালেন। আকাশের মামা তখনও মাথা নিচু করে বসে আছেন।
ঠিক সেই সময়ে পরিস্থিতি বুঝে আকাশের মামা বললেন “ আঙ্কেল ! মা , দিদি অনেক দূর থেকে এসছে …..
স্নেহাংশু বাবুর কথা শেষ হওয়ার আগেই পাত্রীর বাবা বললেন “ হ্যাঁ হ্যাঁ আপনারা রেস্ট নিন। অনেক সময় আছে কথা বলার। „
তারপর আকাশের মামা সবাইকে একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরটায় একটা বড়ো কিং সাইজের খাট আর বসার জন্য দুটো সোফা আছে । আকাশের বাবা আর মাম সোফা দুটোয় বসলেন আর আকাশের মা দিদা খাটে বসলেন। সেই ঘরে পাত্রীও এসছিল। আকাশের মামা তাকে কিছু জল খাবার আনার জন্য অন্য জায়গায় চলে যেতে বললো । পাত্রী যেতেই আকাশের মামা আকাশের দিদিমার কোলে পড়ে বলতে শুরু করলেন “ মা প্লিজ তুমি কোন বাধা দিও না। আমি নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি। পাত্রী ভালো। „
আকাশের মামার এতদূর কথা শেষ হতেই আকাশের মা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন “ জানোয়ার । নিজের বিয়ের কথা নিজেই বললি। আবার বানিয়ে বানিয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা না করেই আমার সম্মতি ও দিয়ে দিলি। তুই এখানে মাকে ডেকেছিস বিয়ে করবি বলে ? আর মা স্বপ্ন দেখছে তার ছেলে তার কাছে রাখবে। „ কথা গুলো বলে ভাইকে মারতে যাচ্ছিলেন । কিন্তু আকাশের বাবা ধরে ফেললেন “ থাক এখানে আর এইসব করো না। „
আকাশের মামা স্নেহাংশু বাবু এবার দিদির দিকে তাকিয়ে বললেন “ আমার বয়স উনত্রিশ হয়ে গেছে। কখনো খেয়াল করেছিস আমার কি চাই , কি চাই না। সব সময় মেরেছিস। শাসন করেছিস। কখনও আদর করেছিস ? আমি নিজের বিয়ে করছি। এখানে আর বাঁধা দিস না। „
আকাশের মামা কখনো তার দিদির সাথে এই ভাবে কথা বলেন নি। তাই যখন ভাইয়ের মুখে এই কথা শুনলেন তখন তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে তার ভাই তার বাবার মৃত্যুর দিনের চড়ের কথা গুলোই বলছে।
তারপর সবাই শান্ত হলে আকাশের বাবা জিজ্ঞেস করলেন “ মেয়েটা কে ? „
“ মেয়েটার নাম তিলোত্তমা বসু । „
“ কবে থেকে চলছে এইসব ? „
“ কলেজে দেখা হয়েছিল। তখন থেকেই পরিচয় তারপর প্রেম। একই কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিই। পরিবার ভালো। বাঙালী পরিবার পনের বছর ধরে এখানে আছে। আমার খুব যত্ন করে। „
এবার আকাশের মা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন “ কলেজ থেকে প্রেম করছিস আর আমাদের একবারও বলিস নি ? „
“ থাক বকিস না ওকে । „ আকাশের দিদিমা তার মেয়েকে থামিয়ে দিলেন । তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন “ তুই আমাকে এখানে তোর বিয়ের জন্য ডেকেছিস ঠিক আছে। কিন্তু তারপর আর একদিনও থাকবো না। বিয়ের পর আমি তোর মুখ দেখবো না কখনো „ তারপর আকাশের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন “ তুমি ফেরার টিকিট কাটো। „ তার চোখে জল স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। একজন মা কতোটা দুঃখে কথাটা বলতে পারে সেটা আকাশের মা খুব ভালো করে বুঝলেন। তাই তার চোখেও জল দেখা দিল।
রাতে আকাশের বাবা মা একটা ঘরে আর দিদিমা আর আকাশ আর একটা ঘরে ঘুমালো। রোজ রাতে গল্প শুনে ঘুমায় আকাশ। কিন্তু আজ দিদিমা কোন গল্প শোনাচ্ছে না। তাই তার ঘুমও আসছে না। খাটের শোওয়ার কিছুক্ষণ পর সে শুনতে পেল দিদিমা কাঁদছে। সে জিজ্ঞেস করলো “ দিদিমা তুমি কাঁদছো কেন ? „
“ কই , আমি তো কাঁদছি না। বোকা কোথাকার । „ বলে নিজের চোখের জল মুছে নিলেন। আকাশ তাকে আরো ভালো ভাবে জড়িয়ে ধরলো।
ওদিকে স্বামিকে জড়িয়ে ধরে আকাশের মা নিজের মনেই অনেক কিছু ভাবছিলেন। ভাইয়ের ব্যবহার, তাদের ছোটবেলা। বাবার মৃত্যুর দিন সবার সামনে চড় মারা। এইসব মনে হতে কিছুটা অনুশোচনা হলো আকাশের মায়ের।
পর দিন সকাল থেকেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু হলো। অনেক কাজ আগে থেকেই করা ছিল। যেমন সবাইকে নেমন্তন্ন করা। এই বিল্ডিং এর নিজস্ব কমিউনিটি হলে বিয়ের সাজ সরঞ্জাম করা। খাওয়া দাওয়া ডেকরেটার্স সবকিছুরই বন্দোবস্ত আগে থেকেই করা ছিল। শুধু স্নেহাংশু বাবুর পরিবার আসার অপেক্ষা ছিল। কারন গোপন কথা হলো পাত্রীর বাবা শর্ত দিয়েছিলেন পাত্রের পরিবারের উপস্থিতি চাই। এই শর্তের জন্যেই তিনি মাকে ডাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। না হলে তার চিন্তা ছিল একা একাই বিয়েটা করার।
চারদিন পর বিয়ে। তাই সাজো সাজো রব। আকাশের বাবা পাত্রের পক্ষ থেকে যতটা করা যায় তার বেশিই করলেন ।
এখানে আসার পর থেকে আকাশ দিদিমার আর মায়ের কোল ছাড়া হয়নি। দুই দিন এর মধ্যেই তার প্রাণ হাঁপিয়ে উঠতে লাগলো। যে ছেলে সারাদিন সোসাইটির আনাচেকানাচে ঘুরে ঘুরে সুচি, বাদশা, জয়শ্রী, বিপ্লব বিচ্ছুর সাথে খেলা করতো সে এই দুই দিন একবারও খেলে নি। এখানে যে তার সমবয়সী বাংলা ভাষী কেউ নেই। প্রতিবেশী একজন আছে কিন্তু সে হিন্দি ছাড়া কিছু বলতে পারে না আর আকাশ বাংলা ছাড়া কিছু বলতে, পারে না। তাই তাদের ভাব হয়নি। মাঝে মাঝে তার হবু মামী তিলোত্তমা ওর সাথে খেলেছে কিন্তু তার সাথেও তেমন জমেনি । তাই তার সুচি , বাদশার কথা খুব মনে পড়তে লাগলো।
এদিকে তিন দিন যেতে না যতেই সুচির খেলাধুলায় মন নেই। চার বছরে মাত্র একটা রাত বাদে কখনোই সুচি আকাশের থেকে এতোটা দূরে থাকে নি। এখানে তো তিন দিনের বিরহ হয়ে গেল একটানা। সুচি খেলছে না দেখে জয়শ্রীও খেলছে না। আকাশ নেই বলে বিপ্লব বিচ্ছুর ও খেলায় মন নেই। ডমিনো এফেক্টে পুরো সোসাইটি নিঝুম। সুচিত্রার খেলার সাথে নাচেও মন নেই। সপ্তাহে দুই দিন নাচ শেখে। শনিবার আর রবিবার। শনিবার বিকালে যখন অঙ্কিতার কাছে যখন নাচ শিখছিল তখন বিভিন্ন মুদ্রা ভুল করছিল। সব জানা মুদ্রা । সেটা দেখে অঙ্কিতা তো বলেই বসলো “ সব জানা মুদ্রা। অনেকবার অভ্যাস করেছিস। এখন কেন ভুল করছিস ? তোর partner in crime এখানে নেই বলে ? „
কথাটা সুচি একটুও বোঝেনি । তাই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। সেটা দেখে অঙ্কিতা বললো “ নে , অভ্যাস কর মন দিয়ে। দশ বছর হলেই কিন্তু তোকে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে ! মনে রাখিস ! „
রাতে যখন সুচির বাবা ফিরলেন তখন সুচি তার কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে মায়ের দেওয়া নাম্বার নিয়ে সে আকাশকে ফোন করলো । কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর অপর প্রান্তে আকাশের বাবা বললেন “ হ্যালো । „
“ হ্যা কাকু , আমি সুচি বলছি। আকাশ আছে ?
“ আকাশ তো এখন ওর মায়ের সাথে। ও আসলে আমি ওকে দিচ্ছি ঠিক আছে ! „
“ হ্যাঁ কাকু । „ বলে ফোনটা রেখে দিল সুচি। রাত পোহালেই বিয়ে। তাই কিছুক্ষণ পর বিয়ের চাপে শুভাশীষ বাবু ভুলে গেলেন যে সুচি ফোন করেছিল।
পরের দিন বিয়ে হয়ে স্নেহাংশু বাবু আর তিলোত্তমা বসু সাত পাকে বাধা পড়ার পর। আকাশ তার দিদিমার কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে সুচির বাবার নাম্বারে ফোন করলো। বাড়িতে দুটো ফোন। একটা বাবার কাছে থাকে আর একটা মায়ের কাছে থাকে। খুব কম সময়ের জন্যেই আকাশের মায়ের ফোনটা দিদিমার কাছে আসতেই সে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ভালো না। সুচির বাবার ফোন ধরে বললেন “ হ্যালো । „
“ হ্যালো জ্যাঠু আমি আকাশ। সুচি আছে ? „
“ সুচি তো ওর মায়ের সাথে বাইরে দোকানে গেছে। আসলে ওকে বলছি। ঠিক আছে ! „
“ আচ্ছা জেঠু । „
আকাশ ফোন রাখতেই সমরেশ বাবুর এক অফিস কলিগ ফোন করলেন। সেই ফোনের কথাবার্তা চললো দশ মিনিট পর্যন্ত। তাতে তিনি আকাশের ফোন করার কথা ভুলে গেলেন।
বিয়ের পর আর একদিন থেকে তারা সবাই কলকাতা চলে এলেন। বৈশিষ্ট্য বাবু বলেছিলেন থেকে যেতে আর কয়েকদিন। তার উত্তরে আকাশের বাবা বললেন “ ওদিকে অনেক কাজ আছে বুঝতেই পারছেন। কাজ ছেড়ে এসছি। „
এয়ারপোর্ট থেকে যখন তাদের ট্যাক্সি সোসাইটির সামনে দাঁড়ালো তখন বেশ বেলা হয়ে এসছে। রহমত চাচা সবে নিজের দিনের ডিউটি শুরু করেছেন। ট্যাক্সিটা সোসাইটির বড়ো লোহার গেটের সামনে দাঁড়াতে তিনি গেট খুলে দিলেন। যখন দেখলেন আকাশের মা বাবার সাথে তার দিদিমাও ফিরে এসছেন তখন তিনি বেশ খুশিই হলেন।
বাড়ি ফিরে সবাই রেস্ট নিলেন। সুচি স্কুল থেকে ফিরতেই দেখতে পেলো আকাশদের দরজায় তালা নেই। ঘরে ঢুকে দেখলো বাদশা নেই। তারপর জামা কাপড় বদলে সে আকাশদের ঘরে চলে এলো এসেই দিদিমাকে জড়িয়ে ধরলো “ তুমি চলে এসছো । „
“ হ্যাঁ রে বোকা মেয়ে । তোকে ছাড়া কি থাকতে পারি ? তোর জন্যেই চলে এলাম। „ তারপর সুচি দিম্মার সাথে অনেক কথা বললো কিন্তু আকাশের সাথে কথাই বললো না। আকাশ কথা বলতে এলেই মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল সুচি। চার বছরের আকাশ এর কারন বুঝলো না । সুচির রাগ হয়েছে সেটা দিদিমা বুঝলেন কিন্তু কেন রাগ হয়েছে সেটা বুঝলেন না।
সেই দিন রাতে জয়শ্রীর বাবা জয়শ্রীর জন্য একটা সাইকেল কিনে আনলেন। ব্যালেন্স এর জন্য যে চাকা লাগানো থাকে সেটা নেই। কারন জয়শ্রী সাইকেল চালাতে জানে। সকালে যখন সে তার সাইকেল টা নিয়ে সোসাইটির রাস্তায় চালাচ্ছিল তখন সুচি দেখে বললো “ দে চালাই । „
“ তুই পারবি না । পড়ে যাবি । „ জয়শ্রী সুচিকে সাবধান করে দিল।
“ তুই দে না । „ জোড় করেই সুচি নিয়ে নিল সাইকেল টা । তারপর তাতে উঠে প্যাডেল চালাতে শুরু করলো। পিছনে জয়শ্রী ধরে রইলো। কয়েক মিটার গিয়ে জয়শ্রীকে হাত ছেড়ে দিত বললো সুচি “ তুই ছেড়ে দে। আমি পারবো। „
সুচির কথায় জয়শ্রী হাত ছাড়তেই সুচি ব্যালেন্স সামলাতে না পেরে পরে গেল। আর ডান পায়ের হাঁটুতে বেশ বড়ো ছড়ে গিয়ে রক্ত বার হলো আর সঙ্গে সঙ্গে জ্বালায় কেঁদে উঠলো। আকাশ , বিপ্লব বিচ্ছু আরো কয়েকজন ক্রিকেট খেলছিল। সুচিকে পরে যেতে দেখে বাদশা আর আকাশ দৌড়ে এলো সাথে রহমত চাচাও এলেন। রহমত চাচা এসে সুচিকে তুলে দাঁড় করালেন। আকাশ এসে বললো “ চল , দিদিমার কাছে। ডেটল আছে লাগিয়ে দেবে। „
“ হ্যাঁ ওটাই ভালো হবে। আমার কাছে ডেটল নেই। থাকলে আমিই লাগিয়ে দিতাম। „ বললেন রহমত চাচা।
তারপর আকাশ আর জয়শ্রী মিলে সুচিকে উপরে নিয়ে গেল। রহমত চাচা পিছন থেকে দেখতে লাগলেন কতোটা যত্ন করে আকাশ সুচিকে উপরে নিজেদের ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। ঘরে ঢুকে দেখলো মা রান্নার কাজে ব্যাস্ত। সে দিদিমা ডেকে চুপিচুপি বললো “ সুচির কেটে গেছে । „
“ কোথায় ? কীভাবে ? „ আকাশের মতোই তিনিও নীচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন ।
সুচি নিজের ফ্রগ তুলে দেখালো ডান পায়ে হাঁটুতে বেশ কিছুটা ছড়ে গেছে “ সাইকেল চালাতে গিয়ে পড়ে গেছি দিম্মা। „ ছড়ে যাওয়ার জ্বালায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদতে কাদতে বললো সুচি।
সেটা দেখে দিদিমা বললেন “ আয় এদিকে। কাঁদিস না। তুই না বড়ো হয়ে গেছিস। „ তারপর বাথরুম থেকে ডেটলটা নিয়ে এসে একটা তুলো নিয়ে ক্ষতস্থানে রক্ত মুছে দিলেন । ডেটল লাগাতেই জ্বালা হওয়ায় সুচি বললো “ মা বকবে । „
“ তুই কেটে যাওয়ার জন্য কাঁদছিস ? নাকি মা বকবে বলে ? „ জিজ্ঞেস করলেন দিদিমা।
ক্ষতস্থান পরিচর্যা করার পর আরো কয়েক ঘন্টা সুচি দিদিমার ঘরেই ছিল। সেই সুযোগে আকাশ তার মুম্বাইয়ের সব অভিজ্ঞতা বলতে শুরু করলো। ওখানে ও টিভি দেখেছে। এরোপ্লেন চেপেছে আমাদের থেকেও বড়ো বড়ো বাড়ি আছে ওখানে। কিন্তু খেলার জন্য কোন মাঠ নেই। বন্ধু নেই। এইসব কথাবার্তায় তাদের আবার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আর পায়ের ক্ষতের জ্বালায় সুচি পাঁচ দিনের বিরহ এবং আকাশের একবারও ফোন না করার কথা সে ভুলে গেল।
সেদিন বিকালে যখন আকাশ সুচি বাদশা আরো সবাই খেলছিল তখন রহমত চাচা পাশের দোকান থেকে কয়েকটা ক্যাটবেরি কিনে এনে তাদের কে দিলেন। সবাই চকলেট পেয়ে দৌড় দিল কিন্তু সুচি আর আকাশ গেল না। রহমত চাচা তখন তাদেরকে খুব শান্ত মিষ্টি মাখা গলায় বললেন “ আজ যেমন সুচির কেটে গেছিল তুমি যত্ন করে নিয়ে গেলে। ঠিক তেমনি সবসময় তোমরা একে অপরের যত্ন নেবে। „

(৬)
সময়টা শরৎকাল । আগমণীর সুর বেজে উঠেছে পুরো শহরে। নীল আকাশে সাদা তুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। সব সময় একটা হিমেল হাওয়া শরীর স্পর্শ করে মন জুড়িয়ে দিচ্ছে। শহরের বাইরে কাশফুল ফুটে আছে। অবশ্য সেই ফুল দেখার সৌভাগ্য সুচি আর আকাশের কারোরই হয়নি।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে সুচি আর আকাশের দুটি চারিত্রিক গুণ সবাই লক্ষ্য করেছে। সেগুলোকে অবশ্য গুণ না বলে বদ গুণ বলাই শ্রেয় । কারন সেগুলো হলো সুচির রাগ আর আকাশের জেদ ।
সুচি একবার রেগে গেলে সবকিছু ভুলে যায় । যার উপর রেগে যায় সে যদি তার থেকে বয়সে ছোট হয় তাহলে সে সুচির হাতের চড় খাবেই খাবে। এইতো সেদিন বিপ্লব বিচ্ছু বাদশার দিকে একটা ঢিল ছুঁড়েছিল । পশু পাখি দেখলে যেন হাত নিশপিশ করে । ঢিল ছোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুচির ডান হাত ঠাসসস আওয়াজ করে বিপ্লব বিচ্ছুর বাঁ গালে বসে গেল । এমন ভাবে বসলো যে চারটে আঙুলের দাগ পড়ে রইলো দু দিন। এতে অবশ্য বিপ্লব বিচ্ছু আর সুচি দুজনেই বকা খেল তাদের মা বাবার কাছে। বিপ্লব বিচ্ছু বকা খেল বাদশার গায় ঢিল ছোঁড়ার জন্য আর সুচি বকা খেল বিপ্লব কে মারার জন্য।
আর আকাশের জেদের কথা যদি বলি তাহলে মামার বিয়ে বাড়ি থেকে এসে জেদ ধরে বসলো যে তার টিভি চাই । যথারীতি নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিল। দুই দিনের মধ্যে আকাশের বাবা একটা টমসন কোম্পানির নতুন বোকা বাক্স কিনে আনতে বাধ্য হলেন। অঙ্কিতা বলেছে “ টিভিতে অনেক নৃত্য অনুষ্ঠান হয়। সেই সব দেখবি । তাহলে অনেক কিছু শিখতে পারবি। „ অঙ্কিতার কথা মতো সে দিদিমার সাথে বসে বিভিন্ন রাজ্যের ক্লাসিক্যাল নৃত্য অনুষ্ঠান দেখে। দিদিমাও খুব উপভোগ করেন এই নৃত্য অনুষ্ঠান গুলো।
মহালয়ার সকাল। সুচির বাবা তার বাবার সময়ের একটা পুরানো রেডিও চালু করে মহালয়া শুনছেন । সরকারি অফিস ছুটি । তাই তিনি নিশ্চিত মনে মহালয়া শুনতে শুনতে এই পূজায় কোথায় কোথায় যাওয়া যায় সেটাই ভাবছেন । সুচি বাবার সাথে ছোটবেলা থেকেই মহালয়া শুনেছে তাই সে এবার নতুন অভিজ্ঞতার জন্য আকাশ আর দিদিমার সাথে টিভিতে মহালয়া পাঠ দেখছে ।
আকাশের মা ঘুম থেকে উঠে রাতের কাপড় বদলে সকালের ব্রেকফাস্ট বানানোর জন্য রান্না ঘরে এলেন । তার স্বামী এখন সবে বাথরুমে গেছেন । পূজার ছুটিতে সমস্ত কর্মচারীদের বেতনের সাথে বোনাস দিয়ে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে । কিন্তু কোম্পানির মালিক ছুটি নেন নি। তাই আকাশের মা একটু রেগে আছেন।
রান্না ঘরে এসে তিনি জানালাটা খুলে দিলেন। আগেই বলেছি রান্নাঘর থেকে খেলার মাঠ দেখা যায়। আর সেই খেলার মাঠ সংলগ্ন রহমত চাচার ঘুবচি ঘরটা আছে। তিনি জানলা দিয়ে দেখতে পেলেন কয়েকজন ওই ঘরের আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি সেটা দেখে অতো খেয়াল করলেন না । মহালয়ার সকাল ! হয়তো কেনাকাটা কিংবা আড্ডা দিচ্ছে। দশ মিনিট যেতে না যেতেই তিনি দেখলেন সংখ্যাটা দুই তিন জন থেকে এখন দশ বারো জন হয়ে গেছে আর একটু শোরগোল ও হচ্ছে । এবার তার মনে হলো নিশ্চয়ই কিছু গোলযোগ হয়েছে “ শুনছো ? নিচে চাচার ঘরের সামনে এতো লোকের ভিড় কেন ? একটু দেখে এসো না ! „
আকাশের বাবা তখন ব্রাশ করা শেষ করেছেন। বাইরে এসে বললেন “ কই ? „
“ এই দেখো। „ বলে আকাশের মা রান্নাঘরের জানালা দেখিয়ে দিলেন।
ততক্ষনে সুচি আকাশ দিদিমা সবাই রান্নাঘরে এসে হাজির। আকাশের বাবা জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে বললেন “ সত্যি তো । এতো লোকের ভীড় কেন ? „ বলে তিনি হন্তদন্ত হয়ে নিচে চলে গেলেন।
পিছন পিছন দিদিমা সুচি আর আকাশ ও এলো। নিচে পৌঁছে আকাশের বাবা দেখলেন সংখ্যাটা এখন কুড়ি ছাড়িয়ে গেছে। আকাশের বাবা নিচে নেমে একজনকে জিজ্ঞাসা করতে সে বললো “ চাচা মারা গেছেন । „
কথাটা শুনে আকাশের বাবার মনটা ভারী হয়ে উঠলো। স্কুল জীবন থেকে তিনি এই বৃদ্ধকে দেখে আসছেন। ঠিক সেই সময় তিনি দেখলেন তার শাশুড়ি আকাশ আর সুচি কে নিয়ে এদিকেই আসছেন। তিনি প্রায় দৌড়েই বীণাপাণি দেবীর কাছে গিয়ে সুচি আকাশ শুনতে না পায় এমন নীচু স্বরে বললেন “ মা তুমি এদেরকে এখান থেকে নিয়ে যাও । এদের এখানে থাকা ঠিক না । „
“ কেন কি হয়েছে ? „ দিদিমার কৌতুহলি প্রশ্ন।
“ চাচা মারা গেছেন । „
কথাটা শুনেই আকাশের বাবার মতোই আকাশের দিদিমার মনটাও কেঁদে উঠলো। বুকটা মুচড়ে উঠলো। চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো। কিন্তু পরিস্থিতি বুঝে নিজেকে সংযত করলেন । তিনি সঙ্গে সঙ্গে সুচি আর আকাশকে বললেন “ চল এখান থেকে । „
“ কি হয়েছে দিম্মা ? „ সুচি আর কৌতূহল সামলাতে পারে না।
“ উপরে চল তারপর বলছি। „ দিদিমা দুজনকেই ঘরে নিয়ে চলে এলেন। ঘরে এসে সুচি আবার জিজ্ঞেস করলো “ কি হয়েছে দিম্মা ? „
“ অতো জেনে কাজ নেই। এখানেই থাকবি । নিচে নামবি না। „ সুচিকে একটু ধমকে বললেন যাতে সে নিচে না নামে।
এই প্রথম সুচি দিম্মার কাছে ধমক খেলো। সুচি অবাক তো হলোই সাথে ধমকের জন্য দিম্মার কথার অমান্য না করার সাহসটাও পেলো না। তাই সুচি মুখটা বেজার করে সোফায় বসে রইলো। সুচিকে চুপ মেরে যেতে দেখে আকাশও শান্ত হয়ে রইলো।
সুচিকে ধমকিয়ে নিজের মেয়ের কাছে গিয়ে বললেন “ ওদের দেখবি যাতে নিচে না যায় । „
“ কেন কি হয়েছে সেটা বলবে তো ! „
“ দাদা মারা গেছেন । „ কথাটা বলতে গিয়ে বীণাপাণি দেবীর গলা বসে এলো।
কথাটা শুনে আকাশের মায়েরও মনটা খারাপ হয়ে গেল। কতো ভালোবাসতো লোকটা আকাশ আর সুচিকে। এইসব ভাবতে ভাবতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠলো। চোখ মুছে তিনি দেখলেন তার মা ঘরের বাইরে যেতে শুরু করেছেন ।
সিঁড়ি দিয়ে নিচের নামার সময় তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো। এই কান্না ডুকরে কিংবা ফুঁপিয়ে কান্না নয়। এটা হৃদয়ের কান্না। এতে মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ হয় না। শুধু দুই গাল বেয়ে বয়ে চলে অজস্র অশ্রুধারা।
নিচে নেমে তিনি লোকের মুখে যেটা শুনলেন সেটা হলো — রোজ ভারের দিকেই রহমত চাচা উঠে পড়েন । কিন্তু আজ ওঠেন নি। তাই রাতে যে লোকটা পাহারা দেয় তার মনে সন্দেহ হলো। যে লোকটা রোজ ভোরে উঠে পড়ে সে আজ উঠলো না কেন ? তারপর সে এসে দরজা ধাক্কা দেয়। কিন্তু ভিতর থেকে কোন সাড়া শব্দ পায় না। তখন সে লোকজন ডেকে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখে , খাটে রহমত চাচার মৃতদেহ পরে আছে । ডাক্তার কিছুক্ষণ আগে এসে দেখে চলে গেছেন। ডাক্তারের কথায় চাচা মহালয়া শুরু হওয়ার পর দুচোখ এক করেছেন।
সব শুনে দিদিমা একবার দেখে এলেন মৃত মানুষটাকে। চোখ বুজে শুয়ে আছে। মুখে অতৃপ্তির কোন আভাস নেই। মুখটা দেখে দিদিমা ভাবলেন — হারানো পরিবারকে পেয়ে গেছেন ।
তারপর দুপুরের দিকে আশেপাশের কয়েকজন মুসলিম এসে নিজেদের কাজ করে চাচাকে স্নান করিয়ে কবর দিয়ে দিলেন । কবরস্থানে এই সোসাইটির বেশিরভাগ সদস্য গেলেন । কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় চার কাঁধের মধ্যে সুচি আর আকাশের বাবার কাঁধ ও ছিল।
দুপুরে সোসাইটি তে এতো মুসলিমদের ভিড় দেখে আর বিকালে সোসাইটির গেটের পাশে দাদুকে চেয়ারে বসে থাকতে না দেখে সুচি ঠিক বুঝলো যে দাদু মারা গেছে। তাই সে আর দিম্মাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করলো না। দাদুর মৃত্যুর দুঃখ নয় বছরের সুচি ঠিক ভাবে অনুভব করতে পারলো না। অনুভব করতে পারলে হয়তো সে কাঁদতো । আর তার কান্নার জন্য রহমত চাচার আত্মা কষ্ট পেত। তাই হয়তো বিধাতা সুচিকে প্রিয়জন হারানোর দুঃখ বোঝার ক্ষমতা এখনও দেয়নি।
চাচার মৃত্যুতে মহালয়ার পর থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত সোসাইটি তে শোকের ছায়া রইলো। যারা রহমত চাচার আমলে বড়ো হয়েছিলেন তাদের মুখটা কালো হয়ে রইলো। কিন্তু সোসাইটির বাচ্চাদের আনন্দ আর খুশীতে কিছুটা হলেও মুখে হাঁসি দেখা দিল ।
বিজয়ার পর চাচার ঘর বন্ধ করার সময় ঘরের ভিতর থেকে একটা ভাঙা টিনের বাক্স , কয়েকটা জামা কাপড় , একটা স্টোভ আর দুটো চেয়ার পাওয়া গেল। সেইসব বিক্রি করে দেওয়া হলো। যেটা বিক্রি করা গেল না সেটা হলো রহমত চাচার এতদিনের জমানো টাকা। প্রায় সাত থেকে আট হাজার টাকা তিনি রেখে গেছেন। আর তার কোন উত্তরাধিকারী নেই। তাই কমিউনিটি হলে সন্ধ্যার সময় সমস্ত কমিটি মেম্বার আর কয়েকজন কে নিয়ে একটা মিটিং বসলো। সেখানে কয়েকজন বললো—- টাকাটা সোসাইটির উন্নতির কাজে আসুক। কয়েকজন চাইলেন একটা—- শোকসভা করা হোক । ( যাতে পুরো টাকাটাই তাদের পেটে যেতে পারে।)
বীণাপাণি দেবী এই ধরনের প্রস্তাব শুনে আর থাকতে না পেরে বললেন “ আমি জানি ওই টাকা দাদা কার জন্য রেখে গেছেন। আমি জানি ওই টাকার উত্তরাধিকারীর নাম। „
একজন ব্যঙ্গ করে বললো “ সেই উত্তরাধিকারী নিশ্চয়ই আপনি। „
দিদিমা না রেগে শান্ত কন্ঠে বললেন “ দাদা ওই টাকা রেখে গেছেন সুচির জন্য। এটা উনি নিজে একবার আমাকে বলেছিলেন। সুচির বিশেষ দিনের জন্য উনি টাকা জমাচ্ছেন। „
কথাটা শুনে সুচির বাবার মুখ হাঁ হয়ে গেল । তিনি কি বলবেন সেটাই ভেবে পেলেন না।
সুচির বাবার মতোই আর সবাইও কিছু বলতে পারলো না। কারন সোসাইটির সবাই জানে রহমত চাচা সুচিকে কতোটা ভালবাসতেন। একটা লোভী মুখ কিছু বলার জন্য উঠছিল কিন্তু যখন সে দেখলো বীণাপাণি দেবীর কথায় তার জামাই সম্মতি সূচক মাথা নাড়ছেন তখন আর কিছু বলতে পারলো না। সোসাইটির সবাই এই রাশভারী , অহংকারী , গম্ভীর স্বভাবের লোকটাকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। কারন মানুষটার স্বভাব আগে থেকে কিছুই আঁচ করা যায় না। কখন কি করে বসে কেউ জানে না।
ফলস্বরূপ বীণাপাণি দেবীর কথামতো রহমত চাচার পুরো টাকাটাই চলে গেল সমরেশ বাবুর ব্যাঙ্কে FD হয়ে।
দুর্গাপূজা শেষ হয়ে কালীপূজা চলে এলো , সাথে সুচির বাড়িতে অতিথি হয়ে তার বড়ো মামার পরিবারও এলো। সবকিছু ঠিক ছিল কিন্তু বড়ো মামার ছোট মেয়েটার জন্য সুচি আর ওই বাড়িতে থাকতে পারছে না। মেয়েটার বয়স পাঁচ আর নাম পৌলমী। একটু মোটা। প্রথমেই সে এসে সুচির পুতুল গুলোর দিকে নজর দিল। পুতুল গুলো একটা বড়ো গামছার মতো কাপড়ের উপর শোয়ানো ছিল । পৌলমী এসে তার মধ্যে থেকে একটা পুতুল তুলে নিল। যেন সে দোকানে রাখা হরেকরকম পুতুলের মধ্যে থেকে একটা বেছে নিয়েছে ।
সুমি পড়ে নবম শ্রেণীতে । সে বুদ্ধিমান মেয়ে , সে ঠিক বুঝলো এই পুতুল গুলোর জন্য পৌলমী বায়না করবেই। তাই সে বোনকে ডেকে চুপিচুপি বললো “ পুতুল গুলো কোথাও একটা লুকিয়ে রাখ। পৌলমী নিয়ে নেবে। „
দিদির কথায় সুচি ভয় পেয়ে গেল। তাই পৌলমী যখন একটু অন্যমনস্ক হয়ে মামীর কাছে গেল তখন সে সমস্ত পুতুল এবং আর খেলনার জিনিস পত্র সব চুপিচুপি দিদিমা আর আকাশের ঘরের খাটের নিচে রেখে দিল । দিদিমা সুচিকে এইভাবে কিছু একটা লুকিয়ে রাখতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন “ কি লুকিয়ে রাখছিস রে ? আবার কোন বদমাইশি করছিস নিশ্চয়ই ! „
নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে দিম্মাকে থামিয়ে দিয়ে সুচি বললো “ চুপ , ও শুনতে পাবে। তখন সব পুতুল নিয়ে নেবে। „
“ কে শুনতে পাবে ? আর কে পুতুল নিয়ে নেবে ? „ দিম্মার কৌতুহলী প্রশ্ন।
“ পৌলমী নিয়ে নেবে । „ বলে সে পাশের ফ্ল্যাটে চলে গেল ।
কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না । কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌলমী বুঝতে পারলো তার পছন্দ করা পুতুল নেই। সে তার মায়ের কাছে বায়না ধরলো “ মা আবার পুতুল চাই । „
“ বাড়ি চলো কিনে দেবো । „ বললেন বড়ো মামী।
“ না আমার সুচিদির কাছে যে পুতুল আছে , সেটা চাই । „ বলে কেঁদে বাড়ি মাথায় তুললো ।
“ কি হয়েছে বৌদি ও কাঁদছে কেন ? „ ভাইঝির কান্না দেখে সুচির জিজ্ঞাসা করলেন।
“ দেখো না ! বলছে সুচির পুতুল চাই । „
“ কোন পুতুলটা রে ? „
পৌলমী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উত্তর দিল “ সুচিদির কাছে আছে । „
সুচির মা সুচিকে জিজ্ঞাসা করলেন “ তোর সব পুতুল গুলো কোথায় রে ? „
সুচি এই কথার কোন উত্তর দেয় না। মুখটা গোমরা করে দাঁড়িয়ে থাকে। সুচিকে চুপ করে থাকতে দেখে তার মা আরও বললেন “ যা আন । তোর কাছে তো অনেক আছে । „ বলে চোখ বড়ো বড়ো করে একটা রাগি দৃষ্টি দিয়ে শাসন করলেন ।
ফলস্বরূপ সুচি দিম্মার খাটের তলা থেকে তার সব পুতুল আনতে বাধ্য হলো। এবং তার মধ্যে থেকে আগে থেকে পছন্দ করা পুতুলটা পৌলমী নিয়ে বাড়ি চলে গেল। সুচির রাগ হলো খুব। কিন্তু সে মায়ের জন্য কিছুই করতে পারলো না। ইচ্ছা করছিল পৌলমীর গালে দুটো চড় বসিয়ে সম্ভ্রম শেখায় কিন্তু মায়ের জন্য সেই শিক্ষকতা করার সুযোগ সুবিধা কোনটাই সে পেল না।
দেখতে দেখতে আকাশের স্কুল যাওয়া বয়স হয়ে এলো । সাথে বিপ্লব বিচ্ছুর ও। কারন আকাশ আর বিপ্লব সমবয়সী। বিপ্লব সুচির স্কুলেই ভর্তি হবে। কিন্তু আকাশের বাবা আকাশের জন্য মহানগরীর সেরা স্কুলের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছেন । একদিন রাতে আকাশের বাবা অফিস থেকে আসার পর স্নেহা দেবীর সাথে এই নিয়ে আলোচনা করছেন “ দুটো ভালো স্কুল পেয়েছি। যোগাযোগ করেছি। একটু দূরে এই যা ! „
“ হোক দূরে । একটা মাত্র ছেলে আমার । „ বললেন আকাশের মা।
আকাশ তার বাবা আর মায়ের এই আলোচনার কিছু অংশ শুনতে পেলো । তাই সে রাতে ঘুমানোর সময় দিদিমা কে জিজ্ঞেস করলো “ দিদিমা আমি স্কুলে যাবো ? „
“ হ্যাঁ যাবি তো। পরের বছর থেকেই তো স্কুলে যাবি। কেন ! খুশি না তুই ? „ আকাশকে কাছে টেনে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন দিদিমা।
“ খুব আনন্দ হবে তাই না ! „ বলে দিদিমাকে আরো ভালো করে জড়িয়ে ধরলো আকাশ ।
“ খুব আনন্দ হয় স্কুলে। সাথে পড়াশোনাও করতে হয়। „
পরের দিন যথারীতি আকাশ সুচিকে খবর টা দিল “ আমি তোর থেকেও ভালো স্কুলে ভর্তি হবো । „ ভুরু নাঁচিয়ে বললো আকাশ।
সুচির খুব ইচ্ছা ছিল সে তার দিদির সাথে স্কুলে যাবে। কিন্তু সেই ইচ্ছা কখনোই পূরন হয় নি। আকাশ তার সাথে স্কুলে যাবে না শুনে মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল । আকাশ যাতে ওর সাথে স্কুলে যায় তার জন্য কিছু একটা করতে হবে। কি করতে হবে সেটা সে ভেবে নিল। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে সে বললো “ যা । কিন্তু ওখানে আমাকে পাবি না বাঁচানোর জন্য । „
“ মানে ? „ বাঁচা মরার কথা শুনে আকাশের মুখ হাঁ হয়ে গেল। পাঁচ বছরের আকাশ সুচির কথায় ভয় পেয়ে গেল।
গলাটা যতোটা সম্ভব তীক্ষ্ণ করা যায় ততোটা তীক্ষ্ণ করে ভয় দেখিয়ে বললো “ মানে স্কুলে কি হয় জানিস তুই ? „
আকাশকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকতে দেখে নয় বছরের সুচি চোখ বড়ো বড়ো করে আরো বললো “ জানিস , স্কুলে বড়ো দাদারা বাচ্চাদের ধরে ধরে মারে। তাদের খাবার কেরে খেয়ে নেয় । কোন বন্ধু হয় না । „
এইসব শুনে আকাশের চোখ আরও বড়ো হয়ে গেল। বুকটা ঢিবঢিব করতে শুরু করলো । আকাশকে ওই ভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুচি দুই গালে দুটো গর্ত করে আর ঠোঁটের কোনায় একটা হাঁসি নিয়ে বললো “ তাই বলছি আমার স্কুলে ভর্তি হ। বিপ্লব ও তো ওখানেই ভর্তি হচ্ছে । একসাথে পড়বি। আর আমি তো আছি। „
আকাশ কে তবুও ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো “ যা দিম্মা কে গিয়ে বল আমার স্কুলেই ভর্তি হবি। „
সঙ্গে সঙ্গে প্রায় দৌড়ে আকাশ নিজের ঘরে গিয়ে দিদিমা কে বললো “ আমি সুচির স্কুলে ভর্তি হবো । „
“ হঠাৎ এই কথা। সুচি বলেছে বুঝি। „
আকাশ কোন উত্তর নি দিয়ে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরলো। এটা দেখে দিদিমা ঠোঁটের কোণায় একটা হাঁসি নিয়ে বললেন “ বুঝেছি। আজ রাতে তোর বাবা আসুক । „
মেয়েকে তিনি আগেই রাজী করিয়ে নিয়ে ছিলেন। শুধু জামাইকে মানানো বাকি। তাই রাতে শুভাশীষ বাবু এসে ফ্রেশ হয়ে নিলে বীণাপাণি দেবী কথাটা পাড়লেন “ আকাশের ইচ্ছা ও সুচির সাথে স্কুলে যাবে। একমাত্র দাদুভাই আমার । ওকে তুমি সুচির স্কুলেই দাও। „
আকাশের বাবা শুধু বললেন “ ঠিক আছে। ওকে সুচিত্রার স্কুলেই ভর্তি করাবো । „ আকাশের বাবা মাঝে মাঝে আকাশের এই ইচ্ছা পূরণের অদ্ভুত উপায় দেখে খুব খুশি হন। ওনার কাছে যদি এরকম একজন দিদিমা থাকতো। তাহলে হয়তো কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ থাকতো না।
সেই কথা মতো আকাশের বাবা আকাশকে সুচির স্কুলেই ভর্তি করালেন। সুচি এই বছর উঠলো চতুর্থ শ্রেণীতে। সুমি পদন্নোতি করলো দশম শ্রেণীতে। আকাশ আর বিপ্লব বিচ্ছু kg অর্থাৎ kindergarten এ। স্কুলের প্রথম দিনে স্নেহা দেবী আকাশকে স্নান করিয়ে মাথায় তেল মাখিয়ে চুল বাঁ দিকে সিঁথি কেটে তৈরি করে দিলেন। স্কুলের জামা কাপড়ের রং সুচির মতোই। শুধু সুচির লাল স্কার্টের জায়গায় আকাশের লাল প্যান্ট। স্কুলে যাওয়ার আগে স্নেহা দেবী তার ছেলের কপালে কাজল দিয়ে একটা কালো টিপ পড়িয়ে দিলেন । আকাশের বাবা ঘুমিয়ে থাকার জন্য তিনি আর সুচেতা দেবী মিলে সুচি আর আকাশকে স্কুলে দিয়ে এলেন। রাস্তায় সুচি আর আকাশ হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে গেল।
স্কুল শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আকাশ বুঝলো স্কুল অতোটাও খারাপ যায়গা না । তাই অনেক বন্ধু বানালো সে। আর আগের বন্ধু বিপ্লব বিচ্ছু তো ছিলোই। স্কুল থেকে এসে রোজ দিদিমা কে সেদিনের স্কুলে ঘটা ঘটনা শোনায়।
এইভাবে কয়েক সপ্তাহ যাওয়া পর একদিন টিফিন ব্রেকে সুচি নিচে নামলো। সুচির ক্লাস ঘর দু তলায় আর আকাশের নিচে। যেটাকে গ্রাউন্ড ফ্লোর বলে সেখানেই। সুচি নিচে নেমে কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলো ক্লাসের বাইরে আকাশ আর একটা মেয়ে , বাইরে রাখা একটা পরিত্যক্ত স্কুলের টেবিলে বসে টিফিন খাচ্ছে। মেয়েটার নাম মৌ। মৌ নিজে খেতে পারছে না কারন তার ডান হাত ভাঙা। তাই আকাশ তার নিজের টিফিন থেকে রুটি আলুভাজা নিয়ে পরম তৃপ্তি করে নিজের হাতে মৌ কে খাইয়ে দিচ্ছে।
আকাশ সুচিকে দেখলো। কিন্তু এটা টিফিন ব্রেক । টিফিন খেতে হবে। কথা বলার সময় সারাদিন আছে। তাই আকাশ সুচিকে একবার দেখে মৌ কে আবার খাইয়ে দিতে লাগলো।
এটা দেখে সুচি রেগে গেল। ঠিক পৌলমী ওর পুতুল নিয়ে নেওয়ার সময় যেমন রাগ হয়েছিল ঠিক তেমন রাগ। রেগে গিয়ে তার দুই চোখের ভুরু কুঁচকে গেল। পৌলমী যখন পুতুল নিচ্ছিল তখন তার মা সামনে ছিলেন , তাই সে কিছুই পারে নি। কিন্তু এখন আশেপাশে আকাশের ক্লাসের বাচ্চা ছাড়া বড়ো কেউ নেই। সুচি রেগে গেলে সবকিছু ভুলে যায়। কি করবে সেটাও মাথায় আসে না। এখনও এলো না। কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে যেই আকাশ একটা রুটি ছিঁড়ে মৌ এর মুখে রুটির টুকরো দিতে গেছে অমনি সুচি আকাশের হাতে কামড় বসিয়ে দিল।
কব্জির কিছুটা উপরে সুচির দাঁতের দাগ বসে গেল । প্রচন্ড ব্যাথা আর জ্বালায় আকাশ ডুকরে চিল্লিয়ে কেঁদে উঠলো। আকাশকে কাঁদতে দেখে সুচি হাতটা ছেড়ে দিল।
যথারীতি ক্লাসের দিদিমনি দুজনকেই প্রিন্সিপাল অফিস নিয়ে গেলেন। সেখানে আকাশের পরিচর্যা করা হলো। ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হলো এবং দুজনেরই বাড়িতে ফোন করা হলো। সুচির বাড়িতে সুচির বাবা তখন অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। আর আকাশের বাবা অফিস বেরিয়ে গেছেন। তাই প্রিন্সিপাল এর ফোন এবং সব শুনে সুচি আর আকাশের মা স্কুলে এলেন। স্কুলে এসে প্রিন্সিপাল এর অফিসে এসে বসতেই সুচির মাকে উদ্দেশ্য করে প্রিন্সিপাল ম্যাম বললেন “ আমি প্রায় দশ বারোবার জিজ্ঞাসা করেছি ওকে। কিন্তু কোন উত্তর পাইনি। আপনিই দেখুন। „
সুচির দিকে তাকিয়ে সুচেতা দেবী জিজ্ঞাসা করলেন “ কামড়ালি কেন ওকে ? „ কিন্তু সুচি কোন উত্তর দেয় না । সে কিভাবে বলবে যে আকাশ মৌ কে খাইয়ে দিচ্ছিল বলে সে রেগে গেছিল। কিছু বলতে না পেরে সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো ।
স্নেহা দেবীর সুচির ওই করুন মুখটা দেখে মায়া হলো । তিনি বললেন “ ছাড়ো। বাচ্চা মেয়ে । বেশি কিছু তো হয়নি। „ হ্যাঁ সত্যি বেশি কিছু হয়নি। শুধু আকাশের হাতের ব্যান্ডেজের তলায় আটটা দাঁতের দাগ ছাড়া। যেটা আকাশের মা দেখতে পারছেন না ব্যান্ডেজের জন্য।
সুচির কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সুচেতা দেবী গম্ভীর হয়ে গেলেন। গালে দুটো চড় বসিয়ে দিতে ইচ্ছা করছিল কিন্তু পারলেন না। কারন তিনি এখন প্রিন্সিপাল এর অফিসে। বাড়ি ফেরার সময় তিনি সুচিকে বললেন “ আজ তোর বাবা আসুক। সব বাঁদরামি ঘুচিয়ে দেবো। „
স্নেহা দেবী ছেলেকে নিয়ে ফেরার সময় সব শুনলেন। কিন্তু তিনি আকাশ পাতাল ভেবে কিছুই কূলকিনারা পেলেন না।
বাড়ি ফিরে আকাশের দিদিমা আকাশকে জিজ্ঞাসা করলেন “ কি হয়েছিল বলতো দাদু ভাই ? সুচি তোর হাত কাঁমড়ালো কেন? নিশ্চয়ই তুই কিছু করেছিলি। „
“ আমি কিছু করিনি দিদিমা । ওই ক্ষ্যাপা খেপে গিয়ে হাত কামড়ে ধরলো । „
“ ক্ষ্যাপাটা কে ? „ বীণাপাণি দেবী যেন আকাশ থেকে পড়লেন ।
“ ওই যে আমাদের ফ্ল্যাটের পাশেই থাকে আর কথা বলার সময় গালে গর্ত হয়ে যায় । „ বলে দুই হাতের তর্জনী দিয়ে দুই গালের মাঝখানে ঢুকিয়ে গালে গর্ত করে দেখালো ।
দিদিমা তো হেঁসেই খুন “ বুঝেছি , তুই সুচিকে ক্ষ্যাপা বলছিস। এবার বলতো কি হয়েছিল ? সব বলবি। „
আকাশ বেশ উৎসাহের সাথে সবকিছু বললো — মৌ এর হাত ভেঙে গিয়েছিল । তাই সে ওকে খাইয়ে দিচ্ছিল তারপর সুচি এসে হাত কাঁমড়ে ধরলো। ঘটনাটা দিদিমা দুবার শুনলেন। সুচির মা ও আকাশের মা বুঝতে না পারলেও দিদিমা ঠিক বুঝলেন সুচি কেন আকাশের হাত কাঁমড়ে ছিল। সেই মুহুর্ত থেকে ধীরে ধীরে বীণাপাণি দেবী সুচি আর আকাশের সম্পর্ক কে অন্য ভাবে দেখতে শুরু করলেন। এবং যতদিন গেল তার এই অন্য দৃষ্টি যে সঠিক সেটা প্রমাণিত হলো।
রাতে সুচির বাবা বাড়ি ফিরলে সুচির মা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন “ সামলাও তোমার মেয়েকে। তোমার আশকারা পেয়েই এমন জানোয়ার তৈরি হচ্ছে। ওই টুকু ছেলের হাত কাঁমড়িয়ে দিয়েছে। „
সবকিছু শুনে সমরেশ বাবু মেয়েকে কোলে বসিয়ে শান্ত নরম সুরে বললেন “ আকাশরা বড়লোক। ওদের অনেক টাকা আছে , গাড়ি আছে । অনেক ক্ষমতা আছে। ওদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব হয় না। কিন্তু আমরা পাশাপাশি থাকি , তাইতো ! তাই তুমি আকাশের সাথে খেলো কিন্তু কখনো ওর গায় হাত তুলো না । তাহলে কিন্তু আমি আকাশের বাবার সামনে কখনো মুখ দেখাতে পারবো না। মনে থাকবে ?
সুচি তার বাবার কথা একটুও বোঝে নি। ধনী গরিবের পার্থক্য সে বুঝলেও আকাশ আর তার মধ্যে এই ধনী গরিবের পার্থক্য কোথা থেকে এলো সেটা সে কিছুতেই বুঝলো না । কিন্তু বাবার কথায় সব সময় হ্যাঁ বলতে হয় তাই সে একটা সম্মতি সূচক মাথা নাড়লো । সেটা দেখে সুচির বাবা সুচির কপালে একটা চুমু খেলেন।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment