মিষ্টি মূহুর্ত [৩য় পর্ব]

লেখক :— a-man & বিচিত্রবীর্য
Typist :— বিচিত্রবীর্য

তৃতীয় পর্বঃ স্মৃতির পাতায় নামলিখন
(১)
বাবার বলা কথাগুলো যতদ্রুত সুচির মাথায় ঢুকেছিল তার থেকেও বেশি দ্রুত কথা গুলো সুচির মাথা থেকে বার হয়ে গেল । বিকালে যখন আকাশ তাকে ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপা বলে ক্ষ্যাপাতে লাগলো তখন বাবার বলা কথা গুলো পুরোপুরি ভুলে গেল।
সকালে স্কুলে বিনা কারণে হাত কামড়ানোর জন্য আকাশ খুব রেগেছিল। রাগের বশে সুচিকে মারতে ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু দিদিমা বলেছে “ মেয়েদের গায়ে হাত তুলতে নেই দাদু ভাই। „ এই কথার জন্য সুচিকে মারার প্ল্যান বাতিল করতে হলো।
কিন্তু যখন বিকালে পার্কের মধ্যে সুচি বাদশাকে নিয়ে খেলা করতে শুরু করলো তখন আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। দূর থেকেই আকাশ সুচিকে উদ্দেশ্যে করে ছড়া কাটতে লাগলো—

ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপেছে
হাত কামড়েছে
ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপেছে
হাত কামড়েছে

আকাশের ছড়া শুনে সুচির কান লাল হয়ে উঠলো। রেগে পুরো বোম হয়ে উঠলো । কিন্তু আকাশকে মারতে পারলো না। কারন আকাশ ছড়া কেটেই হাতের নাগালের বাইরে চলে যেতে লাগলো। আকাশের ছড়া শুনে দিদিমা বললেন “ না দাদুভাই। ওইভাবে বলতে নেই। „ দিদিমার কথা শুনে আকাশ চুপ করলো। কিন্তু সুচির ধারেকাছে এলো না।
শুধু ক্ষ্যাপিয়েই শান্ত হলো না আকাশ। বড়ো কিছু একটা করার চিন্তা ভাবনা মাঝে মাঝেই করতে লাগলো সে। সেই বড়ো কিছু একটা করার সুযোগ কিছুদিন পর দুর্গা পূজার সময় সে পেয়ে গেল।
এই বছরের শুরুতে অঙ্কিতা সুচিকে বলেছিল “ এবছর পুজার সময় যে প্রতিযোগিতা হবে তাতে তুই নাচবি । „
কথাটা শোনার পর সুচির আনন্দ দেখে কে ? সুচির এই আনন্দ টাকে আরও বাড়ানোর জন্য সুচির মা তার জন্য একটা নতুন নিল সবুজ শাড়ি কিনে দিলেন। অষ্টমীর দিন সকাল থেকেই সুচি মাকে বারবার বলতে লাগলো “ মা শাড়িটা বার করো না। একটু দেখবো। „
“ এখন না। সন্ধ্যা হোক। তখন বার করে দেবো । „ এখন বার করে দিলে নির্ঘাত নোংরা করবে তাই সুচির মা রাজি হলেন না।
কিন্তু সুচির আবদারের কাছে সুচেতা দেবী পরাস্ত হলেন । আলমারি থেকে নতুন শাড়িটা বার করে সুচির হাতে দিয়ে বললেন “ নোংরা করিস না যেন আবার। „
সুচি শাড়িটা নিয়ে নিজের গায়ে চাপিয়ে আলমারির দরজায় লাগানো আয়নায় একবার নিজেকে দেখে নিল। এই শাড়িটা পড়েই আজ সে নাঁচবে। কথাটা মাথাতে আসতেই পুরো মুখে হাঁসি ছড়িয়ে পড়লো সুচির । হাঁসির সাথে চোখে সহস্র হিরের উজ্জ্বলতা , যেন মিস ইউনিভার্স । সুচির হাঁসি দেখে সুচেতা দেবীও একটু হাঁসলেন। আয়নায় নিজেকে দেখে নিয়ে যে ঘরে সে আর দিদি ঘুমায় সেই ঘরের পড়ার টেবিলের উপর শাড়িটা প্লাস্টিকে মুড়ে রেখে দিল।
তারপর মাঝে মাঝেই হাতের বিভিন্ন মুদ্রার ভঙ্গি করে সে নেচে নিতে লাগলো । সবকিছুই ঠিকভাবে চলছিল কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধলো বিকালে। সন্ধ্যায় প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে তাই সুচি তাড়াতাড়ি নাঁচের শাড়ি পড়ার জন্য মাকে তাড়া দিতে শুরু করলো। মেয়ের উৎসাহ সামলাতে সুচেতা দেবী বললেন “ যা শাড়িটা আন । „
সুচি দৌড়ে নিজেদের ঘরে গেল । গিয়ে টেবিলের উপর চোখ ফেলতেই দেখলো শাড়িটা যেখানে সে রেখেছিল সেখানে এখন শাড়িটা নেই। টেবিলের উপর শাড়ি নেই দেখে মুহুর্তে সব উৎসাহ উবে গেল। বুক ভরা দুঃশ্চিন্তা নিয়ে সুচি টেবিলের নিচে , খাটের তলায় , পুরো ঘরে খোঁজা শুরু করলো কিন্তু পেলো না। এদিকে সুচির বিলম্ব দেখে সুচির মা সুচির ঘরে এসে দেখলেন তার মেয়ে সারা ঘরে হন্যে হয়ে কিছু একটা খুঁজছে । সেটা দেখে সুচেতা দেবী বললেন “ কি খুঁজছিস এই সময় ? শাড়িটা আন ! পড়িয়ে দিই । „
“ শাড়িটাই তো খুঁজছি । পাচ্ছি না তো ! „
“ কোথায় রেখেছিলি ? „
“ টেবিলের উপর । „
তারপর মা মেয়ে মিলে শাড়িটা খুঁজতে লাগলো কিন্তু পেলো না। কিছুক্ষণ পরেই সুচি দুঃখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। চোখে কয়েক ফটো জল ও দেখা দিল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সারা ঘর লন্ডভন্ড করে আবার খোঁজা শুরু হলো । সুচির মা মেয়ের কান্না থামানোর জন্য বললেন “ এখানেই কোথাও আছে দেখ। শাড়ির তো আর ডানা গজায়নি যে উড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে । „
কিন্তু সুচির কান্না থামে না। শাড়ি না পেলে সে নাচবে কি করে ? এতদিন ধরে মঞ্চে নাঁচার জন্য অপেক্ষা করেছে সে । আর আজ শাড়িটাই উধাও হয়ে গেল। শাড়ি খোঁজার জন্য যখন পুরো ঘরটাই একটা আস্তাকুড়ে পরিনত হয়েছে তখন আকাশ বাদশাকে নিয়ে সুচির ঘরের দরজায় এসে ঠোঁট দুটো পুরো গালে ছড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “ কি হয়েছে ? কি খুঁজছিস ? „
“ আমার শাড়িটা খুঁজছি। এখানেই রেখেছিলাম কিন্তু এখন পাচ্ছি না । „ কথাটা বলার পরেই সুচি খেয়াল করলো আকাশ হাঁসছে ।
আকাশের হাঁসি দেখে সুচির বুঝতে বাকি রইলো না যে এই ছেলেটাই শাড়িটা সরিয়েছে। হ্যাঁ মনে পড়েছে ! আকাশ কিছুক্ষণ আগে ওদের ঘরে এসছিল। আকাশের হাঁসি আর ঘরে কিছুক্ষণ আগে তার প্রবেশ , দুটোই আকাশের দিকেই ইঙ্গিত করছে । সন্দেহটা মাথায় ধাক্কা দিতেই , আকাশের দিকে ডান হাতের তর্জনী তুলে সুচি রেগে দাঁতে দাঁত পিষে বললো “ তুই লুকিয়ে রেখেছিস । „
সুচির মা কিছু বলার আগেই আকাশ বাদশাকে নিয়ে ঘরের বাইরে দৌড় দিয়েছে আর সুচি তাকে ধাওয়া করেছে। দুজনের দৌড় দেখে সুচির মার মনে হলো যেন দুটো ঝড় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।
আকাশ দৌড়ে সুচির ফ্ল্যাট থেকে বার হয়ে নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে , নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। সুচি গিয়ে দরজা আর চৌকাঠের মধ্যে পা দিয়ে দিল। তারপর ধাক্কা দিতে শুরু করলো “ তুই আমার শাড়ি ফিরিয়ে দে । „
আকাশের মা নিচে আজকের অনুষ্ঠানের তদারকি করছেন। এই বছর স্নেহা দেবীকে মহিলা সদস্যদের প্রধান বানানো হয়েছে। আর দিদিমা তখন আলমারি থেকে কয়েকটা শাড়ি বার করে দেখছিলেন কোনটা পড়া যায়। সব নতুন পুরানো মেশানো সুন্দর দেখতে। মেয়ে জামাইয়ের সাথে কেনা কাটা করতে গিয়ে মেয়ে এতগুলো শাড়ি কিনে দিয়েছে। সেই শাড়ি গুলোর মধ্যে একটা বেছে নিচ্ছিলেন তিনি। আর মনে মনে ভাবছিলেন — “ বুড়ো বয়সে প্রতিদিন নতুন শাড়ি পড়বো ! পুরানো পড়লে আবার মেয়ে রাগ করবে। „ এই সব চিন্তা ভাবনার সময়েই আকাশ দৌড়ে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করতে গেল। আকাশের এই কর্মকান্ডের মানে বোঝার আগেই বাইরে থেকে সুচির হুমকি শুনতে পেলেন “ একবার ঘরে ঢুকি আমি , তারপর তোর কি অবস্থা করি দেখ ! „
সুচির হুমকি শুনে দিদিমা বুঝলেন আকাশ সুচির শাড়ি লুকিয়ে রেখেছে তাই আকাশের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন “ দাদুভাই , সুচির শাড়ি ওকে ফিরিয়ে দাও। „
দিদিমার কথা শুনে আকাশ দরজা থেকে সরে এলো। আকাশ দরজা থেকে সরে আসার জন্য আর সুচির ধাক্কার জন্য দরজাটা দড়াম শব্দ করে দেওয়ালে গিয়ে লাগলো। তারপর সুচি ঘরে ঢুকেই আকাশকে মারতে গেল কিন্তু তার আগেই আকাশ শাড়িটা বালিশের তলা থেকে বার করে সুচির হাতে দিয়ে দিল। শাড়ি হাতে পেয়ে সুচি কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু আকাশের উপর থেকে রাগ এখনো গেল না। তাই যে বালিশের তলায় শাড়ি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সেই বালিশ দিয়েই আকাশকে এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করলো। আর বাদশা তার বিশাল শরীর নিয়ে লাফাতে লাফাতে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে লাগলো । তার বুদ্ধিতে এটা একটা খেলা চলছে ।
আকাশ সুচির হাত থেকে বাঁচার জন্য খাটে উঠে গেল তবুও শেষ রক্ষা হলো না , সুচি খাটে উঠে মারতে শুরু করলো। এবার আকাশ সুচির হাত থেকে হ্যাঁচকা টান মেরে বালিশ কেড়ে নিয়ে সুচিকে মারতে শুরু করলো কিন্তু সুচি হার মানার পাত্রী না , সে আর একটা বালিশ নিয়ে মারতে শুরু করলো। সুচির হাত থেকে কেড়ে নেওয়া বালিশ এখন আকাশ ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করলো।
দিদিমা আলমারি থেকে শাড়ি গুলো বার করে খাটের উপরেই রেখে ছিলেন তিনি সেগুলো বাঁচানোর জন্য বললেন “ এই তোরা বাইরে যা । এখানে খাটের উপর লাফালাফি করিস না। „
সুচি কিংবা আকাশকে থামানোর ব্যার্থ প্রয়াস দিদিমা করলেন না। কারন তিনি জানেন এদের থামাতে গেলে তার বুড়ো শরীরে কষ্ট হবে। ঠিক সেই সময়ে ঘরে ঢুকলেন সুচির মা । তিনি মুখে বিরক্তি নিয়ে বললেন “ এখন তোর শাড়ি পড়তে ইচ্ছা হচ্ছে না। „ তিনিও সুচি আর আকাশের মারপিট থামানোর ব্যার্থ প্রয়াস করলেন না। কারন তার কাছে এটা এখন খাওয়া আর ঘুমানোর মতোই নিত্যদিনের ব্যাপার।
মায়ের কথাতে সুচি খাট থেকে নেমে , শাড়িটা হাতে নিয়ে আকাশের দিকে ভষ্ম করে দেওয়ার দৃষ্টি হানতে হানতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আকাশ সেই রাগি দৃষ্টিকে আর ভয় পায় না। সে সুচির ওই রাগি দৃষ্টির উত্তরে জিভ বার করে ভেঙচি কটলো ।
তারপর সুচির মা সুচিকে শাড়ি পড়িয়ে দিলেন । সুচি নিচে নেমে যখন অঙ্কিতার কাছে গেল তখন অঙ্কিতা আর একবার ভালো করে শাড়ি পড়িয়ে দিল। কারন সুচির মা যেভাবে শাড়ি পড়িয়েছিলেন সেই ভাবে আর যাইহোক ক্ল্যাসিক্যাল গানে নাঁচা যাবে না। তারপর পায়ে ঘুঙুর , চুলে ফুল , হাতে বালা পড়িল দিল । তারপর সুচির কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো “ একদম ঘাবড়াবি না। তুই পারবি। শুধু মাথা ঠান্ডা রেখে গানের ছন্দের তালে তালে নেঁচে যাবি। „
কথাটা বলে অঙ্কিতা খেয়াল করলো সুচির চোখ জ্বলছে। চোখ দুটোতে যেন কহিনুর বসানো। সেখান থেকেই আলো ঠিকরে বার হচ্ছে। সুচির আত্মবিশ্বাস দেখে সে নিজের সাজ সাজতে চলে গেল। এটাই হয়তো তার এই সোসাইটিতে শেষ বছর। পরের বছর বিয়ে হয়ে যেতে পারে অঙ্কিতার ।
অঙ্কিতার কাছে সুচির সাজ শেষ হলে সুচিকে মনে হচ্ছিল ছোট্ট একটা রাজকন্যা । তারপর স্টেজের বাইরে তার আগের সব প্রতিযোগিতা দের নাচ দেখতে লাগলো। কেউই তেমন ভালো নাচতে পারে না। কয়েকজনের নাঁচের পর সুচির নাঁচ শুরু হলো । স্টেজে উঠে সবাইকে নমস্কার করে পরপর দুটো গানে সে নাঁচতে শুরু করলো।
প্রথম গান —-

বাজলো তোমার আলোর বেণু,
মাতলো রে ভুবন।
বাজলো তোমার আলোর বেণু
আজ প্রভাতে
সে সুর শুনে, খুলে দিনু মন ।
বাজলো, বাজলো,
বাজলো তোমার আলোর বেণু

দ্বিতীয় গান —

শিশিরে শিশিরে শারদ
আকাশে ভোরের আগমনী শিউলি ঝরানো দিন
আনে সে শিউলি ঝরানো দিন
আনে সে চিরদিনের বাণী, ভোরের আগমনী…

নাঁচের মাঝে সুচি একবার নিচে বসে থাকা দর্শকদের দিকে তাকিয়েছিল। তাকানোর পরমুহুর্তেই আবার নিজের নাঁচের দিকে মন দিতে বাধ্য হলো। কারন পুরো প্রথম সারির একেবারে মাঝখানে বসে আকাশ বিভিন্ন মুখভঙ্গি করে চোখ , ভুরু , মুখ বেকিয়ে তাকে ভেঙচি কাটছে। আকাশের ভেঙচি কাটা দেখে মনে মনে বললো — একবার নাঁচ শেষ হোক। তারপর এই ছেলেটার পিঠের চামড়া সে গুটিয়ে নেবে।
নিচে দর্শকদের মধ্যে আর একটু খেয়াল করলে সে দেখতে পেত আকাশের পাশে বসে তার মা কাঁদছে।
সুচির নাঁচ শেষ হতেই মঞ্চ হাততালিতে ফেটে পড়লো। সুচি মঞ্চ থেকে নামতেই তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে তার মুখে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিলেন। মায়ের এই ভালোবাসায় সুচি আকাশকে মারার কথা ভুলে গেল। প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর প্রথম স্থান দখল করলো অঙ্কিতা আর সুচি দ্বিতীয় স্থান দখল করলো।
এখানে দ্বিতীয় স্থান দখল করলেও স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নৃত্য প্রতিযোগিতায় সে প্রথম স্থান দখল করলো। পরের বছর অঙ্কিতার বিয়ে যাওয়ার জন্য সোসাইটির প্রতিযোগিতায়ও সে প্রথম স্থান দখল করলো।
সেই বছরেই সুমি মাধ্যমিকে পুরো রাজ্যে দ্বাদশ স্থান দখল করলো। খবরটা পাওয়ার পর পুরো পরিবারের চোখে জল চলে এলো। দিদিমা, আকাশের মা মন ভরে আশীর্বাদ করলেন সুমি কে। সুচির বাবার কাছে এমন এমন আত্মীয়ের ফোন আসতে লাগলো যাদের নামটাই আর মনে নেই। শুধু পরিবার নয় , পুরো সোসাইটি আনন্দ করতে লাগলো। কারন অঙ্কিতার পর এই সুমি দ্বিতীয় ব্যাক্তি যে টিভিতে এসছে।
টিভিতে যখন খবরটা দেখানো হচ্ছিল তখন হলুদ রঙের রাজনৈতিক পার্টি অফিসে আরামদায়ক গদি মোড়াচেয়ারে বসে খবরটা দেখলো জনদরদী নেতা পঙ্কজ সহায়। খবরটা দেখার পর তার কুট মাথায় আইডিয়াটা খেলে গেল। মনে মনে ভাবলো “ এটাকেই কাজে লাগিয়ে খবরে আসতে হবে। „
হলুদ পার্টি থেকে এখনও বিধায়কের টিকিট পায়নি পঙ্কজ সহায়। খুবই বিচক্ষণ এবং ধুরন্ধর পঙ্কজ সহায় তাই খবরের শিরোনামে আসার কোন সুযোগই হাত ছাড়া করে না। সুমির এই ভালো রেজাল্ট করার সুযোগটাও হাতছাড়া করলো না । পরিকল্পনা মতো কাজ শুরু করে দিল। একটা বড়ো ফুলের তোড়া , দামী একটা ফোন আর কয়েকজন রিপোর্টার কে ফোন করে পঙ্কজ সহায় সুচির বাড়িতে উপস্থিত হলো। তারপর সুমির সাথে বেশ খানিকক্ষণ কথা বললো। সুমির ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কি ? আরও পড়তে চায় কি না এইসব। খবরের কাগজের জন্য বেশ ভালো কয়েকটা ফটো তুললো। তারপর চলে গেল।
ভালো রেজাল্ট করলেও সুমি খুশি হতে পারে নি। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল দশের মধ্যে স্থান দখল করবে কিন্তু সেই স্থান দখল করতে পারে নি। তাই এই আকাঙ্ক্ষা কে সফল করতে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখা নিয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে , রাত দিন এক করে , কঠোর পরিশ্রম করে , খুব ভালো ভাবে পড়াশোনা করে সে পরিক্ষা দিল। সাধারণত মাধ্যমিকে যারা ভালো ফল করে তাদের উচ্চমাধ্যমিকে আর দেখা যায় না। কিন্তু সুমির ক্ষেত্রে উল্টো হলো। উচ্চমাধ্যমিকে সুমি ষষ্ঠ স্থান দখল করলো। সুমির মা বাবা যারপরনাই খুব খুশি হলেন।
মাধ্যমিকে খুব ছোট করে কাজ সারলেও সুমি যখন উচ্চমাধ্যমিকে পুরো রাজ্যের মধ্যে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করলো তখন সুমির জন্য রিতিমত বড়ো করে একটা অভ্যর্থনা সভার আয়োজন করলো পঙ্কজ সহায়। সুমিকে সম্মান দেওয়ার সময় একটা গোলাপি রঙের Honda activa scooty উপহার দিল। লোকাল চ্যানেলে পুরোটাই কভারেজ করা হলো। বলা বাহুল্য পঙ্কজ সহায় এই কাজের জন্য আমজনতার মধ্যে খুব বিখ্যাত হয়ে উঠলো। লোকে বলাবলি শুরু করলো — মানুষটা মানুষের জন্য কিছু করছে।
সুমির কলেজে ওঠার সাথে সাথেই আকাশ পঞ্চম শ্রেণীতে উঠে গেল। আকাশের উচ্চতা এখনই 4’7 । আকাশের উচ্চতা দেখে তার বাবা বলেছিলেন “ আমার মতোই লম্বা হবে। „ এটা বলার আর একটা কারন আছে। কারনটা হলো আকাশের মুখ তার বাবার মতোই চওড়া হতে শুরু করেছে। সুচি পড়ে অষ্টম শ্রেণীতে । এখন সুচির শরীরে নবযৌবনের ছাপ ফুটে উঠতে শুরু করেছে । উচ্চতা 5’6 আর স্লিম ফিগারের অধিকারিণী। সুচির মা বাবার সাথে সুচিরও ধারনা সে আর উচ্চতায় বাড়বে না।
আকাশ দিনের বেলা স্কুল যাওয়া শুরু করতেই বায়না ধরলো “ মা আমি এবার থেকে একা স্কুলে যাবো। „
স্নেহা দেবী ছেলের জেদের কথা জানেন। যদি না বলেন তাহলে খাওয়া দাওয়া মাথায় তুলবে। তাই সুচিকে আকাশের মা দায়িত্ব দিলেন আকাশকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার “ তোর ভরসায় ওকে আমি ছাড়ছি । চোখে চোখে রাখবি আর সাবধানে নিয়ে আসবি ওকে । „
বলা বাহুল্য সুচি সেই দায়িত্ব খুব ভালো ভাবে পূরন করে। আকাশের হাত ধরে স্কুলে যায় আবার হাত ধরেই স্কুল থেকে আসে। আকাশের মোটেও ভালো লাগে না। সে এখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। বড়ো হয়ে গেছে সে। এইভাবে বাচ্চাদের মতো হাত ধরে যাওয়া আসা করতে একদম ভালো লাগে না। একদিন গলায় বিরক্তি ঝরিয়ে আকাশ জিজ্ঞাসা করলো “ আমার হাত ধরেছিস কেন ? আমি আর বাচ্চা নই । আমি একা একা বাড়ি যেতে পারবো। „
সুচি মুখ ভেংচিয়ে জবাব দিল “ আমি আর বাচ্চা নই। চুপচাপ চল। কাকি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে তোকে সাবধানে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার। বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু কাকি কে বলে দেব। „
অগত্যা সুচির হুমকি শুনে আকাশ চুপ করে। সুচিকে বলেও কিছু হবেনা । তাই মান-সম্মানের মাথা খেয়ে বাচ্চাদের মতো সুচির হাত ধরেই স্কুলে যাতায়াত করতে শুরু করলো ।
একদিন দুজন একসাথে স্কুল থেকে ফেরার সময় দেখলো ফুটপাতের উপর একটা দোকানে বিভিন্ন ধরনের সিনেমার সিডি আছে। সুচি দাঁড়িয়ে সেগুলো দেখতে লাগলো। সিডির থেকেও সুচিকে যে জিনিসটা বেশি টানলো সেটা হলো দোকানের ভিতরে বসে থাকা বৃদ্ধ । বৃদ্ধকে দেখে সুচির মন হু হু করে উঠলো। কারন বৃদ্ধকে অবিকল তার দাদুর মতো দেখতে। তার দাদুরও এতো বড়ো দাড়ি ছিল। দোকানের ভিতর বসে থাকা বৃদ্ধের উদ্দেশ্যে সুচি বললো “ তোমার কাছে কি কি সিডি আছে ? „
খুব বিষন্ন মনে সেই বৃদ্ধ উত্তর দিল “ আমার কাছে সব ধরনের সিনেমার সিডি আছে। বাংলা , হিন্দি , ইংরেজি। ভুতের , মারপিটের , প্রেমের, গোয়েন্দার । নতুন পুরানো সবকিছুর। „
“ কতো করে বিক্রি করো তুমি ? „
“ কিনলে ত্রিশ টাকা আর ভাড়া নিলে পাঁচ টাকা। „
“ আচ্ছা । কালকে এসে একটা পছন্দ করে নিয়ে যাবো । „
বাড়ি ফেরার সময় সুচি আকাশকে জিজ্ঞাসা করলো “ তোর বাড়িতে ডিভিডি প্লেয়ার আছে না ? „
পুরো দিনের মধ্যে সবথেকে বাজে সময় এইটা। বাজে না বলে এটাকে লজ্জাজনক বলা ভালো। স্কুলে যাওয়ার সময় তবুও ঠিক আছে কারন তখন ক্লাসের বন্ধুরা দেখে না। কিন্তু ফেরার সময় সবার সামনে সুচি তার হাত ধরে নিয়ে যায়। মা তো ওকে নিয়ে আসা যাওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে। হাত ধরে নিয়ে আসা যাওয়ার কথা তো বলেনি রে বাবা। তবুও হাত ছাড়া যাবে না। একবার যদি সুচি মাকে বলে দেয় তাহলে একটাও মার বাইরে পড়বে না। তাই সুচির প্রশ্নের উত্তরে মাথা নিচু করে শুধু “ হু „ বললো ।
বৃদ্ধ জানতেন সুচি এই কথাই বলবে। সবাই এসে দরদাম করে নেড়েচেড়ে দেখে চলে যায়। কেউ কেনে না। কিন্তু পরের দিন আবার যখন সুচি আকাশের হাত ধরে দোকানের সামনে হাজির হলো তখন তিনি ভাবলেন হয়তো কিছু কিনবে। তাই বেশ উৎসাহের সাথে ভালো ভালো কয়েকটা সিডি দেখাতে শুরু করলেন । সুচি তার মধ্যে থেকে একটা হিন্দি ভাষায় Dubbed করা ইংরেজি ভুতের সিনেমা সিডি পাঁচ টাকা দিয়ে ভাড়া করলো।
সন্ধ্যায় পড়াশোনার বাদ দিয়ে দিদিমাকে নিয়ে সুচি আর আকাশ বসলো ভুতের সিনেমা দেখতে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। তাই হাল্কা ঠান্ডা আছে। ঠান্ডার জন্য সুচি আর আকাশ একটা চাদর মুড়ি দিয়ে সোফায় বসে ডিভিডি প্লেয়ারে সিডি দিয়ে সিনেমা চালু করলো। সিনেমা চালু হতেই আকাশের বাবা জিজ্ঞাসা করলেন “ কিসের সিনেমা ? „
আকাশ বড়ো বড়ো চোখ করে বাবাকেই যেন ভয় পাইয়ে দেবে এমন ভাবে বললো “ ভূতের । „
“ না , একদম না । তোমরা এখন অনেক ছোট । ছোটদের এইধরনের সিনেমা দেখা উচিত নয় । „ গম্ভীর গলায় বললেন আকাশের বাবা।
আকাশের বাবার কথা শুনে সুচি আর আকাশ দিদিমার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকালো। নাতির আর সুচির এইরকম মায়া ভরা দৃষ্টি দেখে দিদিমা তার জামাইকে বললেন “ দেখুক না। খুব শখ করে এনেছে দুজনে একসাথে দেখবে বলে। „
শাশুড়ির কথা শুনে আকাশের বাবা রাজি হলেন। তারপর সিনেমা শুরু হওয়ার সময় আকাশের বাবা কিছুক্ষণ সিনেমাটা দেখলেনন এটা দেখার জন্য যে সিনেমাটাতে কোন বড়োদের জিনিস কিংবা বেশি ভয়ের জিনিস দেখাচ্ছে কি না। যখন তিনি বুঝলেন যে সিনেমাটা বাচ্চারা দেখতে পারবে আর বেশি ভয়ের ভৌতিক দৃশ্য নেই তখন তিনি খাওয়ার জন্য উঠে পড়লেন।
সিনেমায় এমন দৃশ্য দেখাচ্ছিল যার জন্য বাদশা আগেই সোফার পিছনে লুকিয়ে পড়েছিল। দিদিমা দেখছিলেন কিভাবে সুচি আর আকাশ একটাই চাদরের ভিতরে বসে বড়ো বড়ো চোখ বার করে সিনেমা দেখছে। দেখার থেকে গিলছে বলা ভালো। চোখের পাতা যেন পড়ছেই না দুজনের ।
আকাশের বাবা ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়া শুরু করেছেন। রাতে তিনি রুটিই খান। একটা রুটি ছিঁড়ে সেই টুকরোটা তরকারিতে মিশিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মুখের ভিতর পুরেদিলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে খাওয়ার জন্য অসাবধনে বাম হাতের কনুই লেগে জলের গ্লাসটা মেঝেতে পরে ঠং আওয়াজ করলো।
সিনেমায় সেই সময় শেষের দৃশ্য চলছে। ভুত সবে বার হয়ে চার হাত পায়ে ভর করে নায়িকার দিকে এগিয়ে আসছে । ঠিক তখনই আকাশের বাবার হাতে লেগে জলের গ্লাসটা পরে গেল। এরকম কাকতালীয় ঘটনায় সুচি আর আকাশ ভয় পেয়ে তারস্বরে পাড়া কাঁপিয়ে আআআআআআআআআ বলে চিল্লিয়ে উঠলো।
আকাশের বাবা তখন গ্লাস তোলার জন্য নিচে ঝুঁকতে যাচ্ছিলেন। সুচি আর আকাশের চিৎকারে তিনি বকবেন নাকি হাঁসবেন ভেবে পেলেন না। কিছু ভেবে না পাওয়ার জন্য তার ঠোঁটের কোনায় একটা হাঁসির রেখা দিল।
স্নেহা দেবী তার স্বামীকে খুব কম হাঁসতে দেখেছেন। আজ এইভাবে আকাশের বাবার মুখে হাঁসি ফুটে উঠতে দেখে তিনিও আঁচল চেপে হাঁসলেন। সিনেমা শেষ হলে যে যার ঘরে চলে গেল। আকাশ দিদিমার সাথে ঘুমাতে চলে গেল আর আকাশের বাবা মা আর একটা ঘরে। রাত দুটোর দিকে কর্কশ আওয়াজ করে ফোনটা বেজে উঠে আকাশের বাবার ঘুমটা নষ্ট করে দিল।

(২)
ফোনটা কর্কশ আওয়াজ করতেই আকাশের বাবার ঘুমটা ভেঙে গেল। পাশে তাকিয়ে দেখলেন তার স্ত্রীর ঘুম না ভাঙলেও ফোনের আওয়াজে তিনি নড়ে উঠছেন। তাই তিনি ফোনটা রিসিভ করে ঘরের বাইরে চলে এলেন। অফিসেই সারাদিন থাকার পর রাতে বাড়িতেও অফিসের কাজ ডেকে আনলে আকাশের মা একদম সহ্য করতে পারেন না। তাই বাড়ি ফেরার পর ফোন করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ । এটাই আকাশের বাবা তার সমস্ত কর্মচারীকে আদেশ দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এই আদেশের উলঙ্ঘন হওয়ায় তিনি ঘরের বাইরে এসে বেশ রেগে গিয়ে বিরক্তি নিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন “ উপেন তোমাকে বলা আছে না বাড়িতে ফোন না করতে ? তাও আবার এতো রাতে ? „
উপেন হলো আকাশের বাবার কোম্পানির ম্যানেজার। পুরো নাম উপেন্দ্রকিশোর। মাঝারি উচ্চতার হালকা শ্যাম বর্ণের সৎ এবং বিশ্বাসী চরিত্র । বয়স ত্রিশ হতে চললো কিন্তু এখনও বিয়ে করে নি। থাকে বিধবা মায়ের সাথে। আকাশের বাবাকে উপেন বড়ো দাদার চোখে দেখে। আকাশের বাবার কন্ঠে রাগ শুনে উপেন ঘাবড়ে গিয়ে বললো “ স্যার খুব আর্জেন্ট তাই ফোন করেছি। ফোন না করলে ক্ষতি হয়ে যেত । „
“ কিসের আর্জেন্ট ? কি হয়েছে ? „ ক্ষতির কথা শুনে আকাশের বাবার বিচলিত হয়ে পড়লেন ।
“ স্যার আজ রাতে যে অর্ডারটা ছিল সেই কথা মত পাঁচটা ট্রাক বেড়িয়ে গেছিল। কিন্তু মাঝরাস্তায় আসিফের ট্রাকটা বিকল হয়ে গেছে । আমাদের নতুন ট্রাক পৌঁছতে তো সকাল হয়ে যাবে , আর আপনি তো জানেন ভোরের আগেই মাল পৌঁছে না গেলে ডিলটাই ক্যান্সেল করে দিতে পারে । „ এক নিশ্বাসে কথা গুলো বললো উপেন।
নদীয়ায় একটা প্রাইভেট নার্সিংহোম কোম্পানি একটা নার্সিংহোম বানাচ্ছে। সেই নার্সিংহোমের জন্যেই প্রতিদিন সকাল সাতটার আগে বিল্ডিং বানানোর ইস্পাতের মোটা রড গন্তব্য স্থানে পৌঁছে দেওয়াই আকাশের বাবার কাজ। খুব বড়ো একটা ডিল হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে ভেবে আকাশের বাবা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে পড়লেন। “ আশে পাশে কোন গ্যারাজ নেই ? „
“ না স্যার , কোন গ্যারাজ নেই ? কিন্তু একটা ব্যাবস্থা হয়েছে । তার জন্যেই আপনাকে ফোন করেছি । „
“ কি ব্যাবস্থা ? „ আকাশের বাবা যেন আশার আলো দেখতে পেয়েছেন ।
“ আমাদের সাথে যে আর একটা কোম্পানির ডিল আছে তাদের একটা ট্রাক ফিরছে। আমরা আমাদের মাল যদি ওদের ট্রাকে তুলে দিই তাহলে আজকের মত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে । „
“ তাই করো। „ আর কোন রাস্তা নেই দেখে আকাশের বাবা বাধ্য হয়েই কথাটা বললেন। “ আমি ওই কোম্পানির সাথে কথা বলে নিচ্ছি । „
দুই দিন পর অফিসের দরজায় টোকা দিয়ে উপেন বললো “ স্যার সঞ্জয় বাবু এসছেন । „
“ হ্যাঁ ওনাকে ভেতরে নিয়ে এসো। „ ফাইল থেকে মুখ তুলে বললেন শুভাশীষ বাবু।
“ ওকে স্যার „ বলে উপেন চলে গেল।
কয়েক মিনিট পর আকাশের বাবার অফিসের দরজা ঠেলে যে ব্যাক্তি ঢুকলো তার বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ। লম্বা বলা যায় না আবার বেঁটে ও তিনি নন। গোঁফ দাড়ি কামানো ফর্সা মুখ। তবে নাক থোবড়ানো আর মুখে একটু পাহাড়ের ছাপ আছে দেখে বোঝা যায়। গায়ে আছে কালো কোর্ট প্যান্ট । ভদ্রলোক দরজা ঠেলতেই আকাশের বাবা ফাইল থেকে চোখ তুলে দাঁড়িয়ে বললেন “ আসুন আসুন । বসুন । „ বলে সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন
ভদ্রলোক একটু হেঁসে কোর্টের কলার ধরে ঠিক করে আরামদায়ক চেয়ারে বসতেই আকাশের বাবা বলে উঠলেন “ আপনি সেদিন যেভাবে বাঁচালেন । না হলে তো পুরো ডিলটাই বাতিল হয়ে যেত । „
ভদ্রলোক খুব বিনয়ের সাথে বললেন “ ধন্যবাদ দেবেন না ! আপনার কাজে আসতে পেরেছি এই অনেক । „
“ দেখেছেন ! আপনাকে কিছু অফার করা হলো না । কি নেবেন বলুন ? „
“ না , না , ব্যাস্ত হবেন না আমি এখন কিছু নেবো না । „
“ একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারি ? „
“ করুন না । „
“ আমি শুনেছি আপনি থাকেন সল্টলেকে আর আপনার পদবী বিশ্বাস কিন্তু আপনার মুখের আদল পাহাড়িদের মত …..
“ সবাই এখানেই বোকা বনে যায়। „ আকাশের বাবার কথার মাঝখানেই সঞ্জয় বলে উঠলো । “ আসলে আমি পাহাড়ের ছেলে । বাবা কলকাতার। কাজের সূত্রে শিলিগুড়ি যান। ওখানেই বিয়ে। আমি কলেজের পড়াশোনার জন্য কলকাতায় আসি তারপর এখানেই বিয়ে আর এখানেই সংসার । „
“ আপনার উত্তরবঙ্গের পারমিট পেতে অসুবিধা হয় না ? „ সঞ্জয়ের কথার মধ্যেই আকাশের বাবা ব্যাবসার লাভের একটা সুযোগ টের পেলেন।
“ খুব বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ ব্যাক্তি আপনি। হ্যাঁ আমার উত্তরবঙ্গের পারমিট পেতে কোন অসুবিধাই হয় না । „
“ আমি আর আপনি যদি একসাথে কাজ করি তাহলে পুরো বাংলায় আমাদের একছত্র অধিপত্য থাকবে। যদি আপনি রাজি হন তাহলে ! „ আকাশের বাবা বুঝলেন যে এই ব্যাক্তির সাথে হাত মেলালে তার লাভ হবে। এতদিন ধরে উত্তরবঙ্গের পারমিট নিয়ে অনেক কষ্ট তাকে করতে হয়েছে। এখন এই কষ্টের সমাধানের রাস্তা তার সামনে খুলে গেল।
“ আপনি আমার মনের কথাই বললেন মি. মিত্র। আমি এটাই বলবো বলবো করছিলাম কিন্তু বলতে পারছিলাম না । „ এক গাল হাসি নিয়ে বললো সঞ্জয়।
আকাশের বাবা সঞ্জয়ের কথা শুনে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সঞ্জয় আকাশের বাবার হাত ধরে করমর্দন করলো।
কয়েক দিনের মধ্যেই আকাশের বাবা বুঝলেন লোকটা বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ কিন্তু মাঝে মাঝে উপস্থিত বুদ্ধি কোথাও যেন হারিয়ে যায়। কিন্তু তার স্বভাব উপর থেকে কিছুই বোঝা যায় না। তাই আকাশের বাবা একটু সতর্ক থাকেন সব সময়।
80%–20% এর শেয়ারে দুটো কোম্পানি একসাথে হতেই সঞ্জয়ের জন্য নতুন অফিস ঘর বানানো হলো। দীর্ঘ এক মাস কাজ করার পর যখন হিসাবের কাগজ পত্র সঞ্জয়ের টেবিলে এলো তখন সে দেখলো কর্মচারীদের বেতন দেওয়া আর কর দেওয়ার পর অর্ধেকের বেশি টাকা কয়েকটা অনাথ আশ্রম আর বৃদ্ধাশ্রমে যায়। সঞ্জয় সেটা দেখে খুশি হলো এবং ম্যানেজার উপেনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো এটার ব্যাপারে। উপেন খুব গর্ব করে বুক ফুলিয়ে উত্তর দিল “ আমাদের স্যারের মনটা তার শরীরের থেকেও বড়ো । „
“ মানে ? „ একটু হেঁসে জিজ্ঞেস করলো সঞ্জয় ।
“ ছয় সাত বছর আগে যখন প্রথম এই কোম্পানিতে আসি তখন স্যার দুটো অনাথ আশ্রম আর একটা বৃদ্ধাশ্রমে টাকা পাঠিয়ে সাহায্য করতেন। এখন বর্তমানে সেটা দাঁড়িয়েছে পাঁচটা অনাথ আশ্রম আর তিনটে বৃদ্ধাশ্রমে। „ এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে থামলো উপেন। এবার একটু গর্বের সাথে বললো “ কর্মচারীদের সব সময় পাশে থাকেন। যতোটা সম্ভব সাহায্য করার তিনি করেন। দুই বছর আগে আমার মায়ের কিডনির পাথরের অপরেশন হয়েছিল। পুরো খরচটাই স্যার দিয়েছিলেন। „
সঞ্জয় খুব খুশি হলো এইধরনের কর্মকাণ্ডে। মনে মনে ভাবলো “ এই ধরনের মানুষের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক নয় আত্মীয়ের সম্পর্ক করা উচিত। „
কথাটা সঞ্জয় নিজের মনের আপন খেয়ালে বলেছিল । কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর সেই মনের খেয়ালকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা তার সামনে আসবে সেটা সে ভাবে নি।
কয়েক সপ্তাহ পর ছিল বিশ্বকর্মা পূজা। আকাশের পুরো পরিবার এই দিন অফিসে এসে একটা বড়ো করে পুজা করে । প্রতিবারের ন্যায় এবারেও আকাশের মা আর দিদিমা পূজা করতে এসছেন। আকাশ রোজ রোজ বাবার অফিসে আসে না। আসতে দেওয়া হয় না। তাই যখনই সে আসে তখন পুরো অফিস, সমস্ত গাড়ি, সব কর্মচারীদের দেখে তাদের সাথে কথা বলে। এবারেও সে পুরো অফিস ঘুরে দেখছিল। আকাশের মা সন্তোষকে বলেছেন “ দেখো যেন এদিক ওদিক না যায় ! খুব বদমাশ হয়েছে আজকাল। কারোর কথা শোনে না। „
উপেন তাই আকাশ কে পুরো অফিস ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল। পূজা প্রায় শেষের সময় সঞ্জয় এসে ঢুকলো । ঢুকেই আকাশ আর উপেনের সাথে দেখা। সঞ্জয় আকাশকে চিনতে পারেনি , তাই সে ম্যানেজার কে জিজ্ঞাসা করলো “ এই খোকাটা কে ? „
উপেন একটু হেঁসে বললো “ এ হলো আমাদের ছোট স্যার। শুভাশীষ স্যারের ছেলে। „
সঞ্জয় এবার আকাশকে জিজ্ঞাসা করলো “ তোমার নাম কি ? কোন ক্লাসে পড়ো তুমি ? „
“ আমার নাম আকাশ। আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। „ আকাশের আজ খুব তাড়া । তাই সে উত্তরটা দিয়েই দৌড়ালো বাকি সব অফিস ঘর আর গাড়ি দেখার জন্য।
আকাশের উৎসাহ দেখে সঞ্জয় আর উপেন দুজনেই একটু হেসে বিদায় নিল । কিছুদূর যাওয়ার পরেই আইডিয়া টা তার মাথায় এলো “ — আমার মেয়ের সাথে আকাশের বিয়ে দিলে কেমন হয় ! এতে দুটো কাজ হবে । এক মি. মিত্রের সাথে আত্মীয়তা আর দুই তিনিই হবেন এই কোম্পানির ভবিষ্যৎ মালিক । নিজের মর্জি মতো কোম্পানিকে চালাতে পারবে তখন। সঞ্জয় নিপাট সাদাসিধে মানুষ। কিন্তু কখন কার মনে কোন রিপু জেগে ওঠে সেটা বলা যায় না। সঞ্জয়ের মনে এখন যে রিপু জেগে উঠলো সেটা হলো লোভ।
নিজের মেয়ের কথা মাথাতে আসতেই সঞ্জয়ের মনে পড়লো কয়েক দিন পর তো তার মেয়ের জন্মদিন। কথাটা মাথাতে আসতেই সঞ্জয় চলে গেল আকাশের পরিবারকে জন্মদিনে আমন্ত্রণ করতে। আকাশের বাবা সঞ্জয়কে দেখতে পেয়ে তার পরিবারের সাথে সঞ্জয়ের পরিচয় করে দিলেন। নিজের স্ত্রীর দিকে হাত দেখিয়ে আকাশের বাবা বললেন “ আমার স্ত্রী স্নেহা মিত্র। „
আকাশের মা দুই হাত জোড় করে নমস্কার করলেন। সঞ্জয়ও নমস্কার করলো। তারপর আকাশের বাবা দিদিমার দিকে হাত দেখিয়ে বললেন “ আমার মা বীণাপাণি দেবী । „
সঞ্জয় দিদিমাকেও একটা নমস্কার করে বললো “ আমি মি. মিত্রের নতুন বিজনেস পার্টনার। নাম সঞ্জয় বিশ্বাস । আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে খুব খুশী হলাম । „
স্নেহা দেবী হেসে বললেন “ আপনাকে দেখে তো….
“ আমাকে দেখে পাহাড়ি মনে হয়। তাইতো ! „ আকাশের মায়ের কথার মাঝখানেই বলে উঠলো সঞ্জয়। তারপর একটু হেসে বললো “ সে অনেক কথা। একদিন সাময় করে বলবো। „ তারপর হঠাৎ চোখ বড়ো বড়ো বললো “ সামনের শনিবার তো আমার মেয়ের জন্মদিন। আপনারা আসুন না। তখন কথা হবে। আপনাদের সবাইকে আসতে হবে কিন্তু। „
আকাশের মা হেসে বললেন “ অবশ্যই আসবো। আপনার মেয়ের নাম কি ? „
ততক্ষণে আকাশকে নিয়ে উপেন চলে এসছে । আকাশ এসেই মায়ের বাম হাত ধরে মায়ের পাশে দাঁড়ালো। “ আমার মেয়ের নাম গোধূলি। সেও খুব দুষ্টু। „ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো শেষ কথাটা। তারপর বললো “ জন্মদিনেই আমার মেয়ে আর স্ত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। „
সুচি আর আকাশের সিডি কিনে এনে সিনেমা দেখা একটা নেশায় পরিনত হয়েছে। টানা কয়েকদিন চলার পর আকাশের মা বলেছিলেন “ এবার থেকে শুধু শনিবার আর রবিবার তোরা সিনেমা দেখবি। পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। „
মায়ের কথা মতো আকাশ আর সুচি শুধু শনিবার আর রবিবার সিনেমা দেখে। শনিবার হাফডে স্কুল করে আসার পর আকাশের মা আকাশকে বললেন “ আজ সিনেমা দেখতে হবে না। „
“ কেন মা ? „
“ আজ আমরা সবাই মিলে তোর বাবার বন্ধুর মেয়ের জন্মদিনে যাবো। „
সেই কথা মতো বিকাল বেলায় সপরিবারে সল্টলেকে সঞ্জয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সুচির বাড়িতে বাদশাকে রেখে দিল। অন্যের বাড়িতে কুকুর নিয়ে যাওয়া ঠিক না। অনেকে পছন্দ করে না।
অঙ্কিতার বিয়ে হয়ে গেছে বলে সুচি এখন অন্য একটা জায়গায় নাঁচ শেখে। সেখানে ক্ল্যাসিক্যাল এর সাথে মডার্ন নাঁচ ও শেখায়। সন্ধ্যায় নাঁচের ক্লাস থেকে ফিরে এসে দেখলো আকাশদের দরজায় তালা দেওয়া । নিজের ঘরে আসতেই বাদশা সুচির গায়ে ঝাপিয়ে পড়লো বলা যায়। বাদশার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে মাকে জিজ্ঞাসা করলো “ আকাশদের ঘরে তালা দেওয়া। কোথাও গেছে ? „
সুচির মা বললো “ কার একটা জন্মদিনে গেছে। নামটা মনে নেই । „
অফিস থেকে সবাই বাড়ি ফিরছে তাই রাস্তায় জ্যাম একটু বেশিই। জ্যাম কাটিয়ে গোধূলিদের বাড়ি পৌঁছতে সাতটা বেজে গেল । বিশাল দু তলা বাড়ির সামনে গাড়িটা থামতেই দারোয়ান গেট খুলে দিল। তারপর সামনের গ্যারাজ দেখিয়ে দিল। গ্যারাজে গাড়ি রাখতে রাখতে আকাশের বাবা তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন “ তুমি চাইলেই এরকম একটা বাড়িতে আমরা থাকতাম। একটা বাড়ি শুধু আমাদের। „
“ একজনের বাড়িতে এসছি। এখানে আবার শুরু হয়ে যেও না। „ আকাশের মা তার স্বামীকে চুপ করিয়ে দিলেন।
তারপর ঘরে ঢুকতেই সঞ্জয় বিনয়ের সাথে বললো “ আসুন আসুন। আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। „
কথাটা বলার পর সঞ্জয় আকাশের পরিবারকে লিভিং রুমে নিয়ে গেল লিভিং রুমে বেলুন দিয়ে ভর্তি। আর মাঝখানে একটা টেবিলে বড়ো ভ্যানিলা কেক আছে। ঘরে আরও অনেক লোকজন আছে। কয়েকজন আত্মীয় আর কয়েকজন প্রতিবেশী। ভিতরে নিয়ে গিয়ে একজন সুন্দরী মহিলার সামনে গিয়ে সঞ্জয় বললো “ ইনি হলেন আমার স্ত্রী চারুলতা আর ওটা আমার মেয়ে গোধূলি। „
চারুলতা কলকাতার মেয়ে। উচ্চতা সঞ্জয়ের মতোই মাঝারি। স্বামী স্ত্রীর উচ্চতা সমান। কিন্তু তাদের মেয়ে গোধূলিকে দেখে পাহাড়ী বলেই মনে হয়। গায়ে আছে লাল ফ্রগ। গায়ের রং এতোটাই ফর্সা যে আঙুল দিয়ে স্পর্শ করলেই লাল হয়ে যাবে। গাল দুটো লাল। আর নাকটা বাবার মতোই বসা। চুলে বাচ্চাদের মতো বিনুনি করা।
সঞ্জয়ের নিজের পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর আকাশের বাবাও নিজের স্ত্রী শাশুড়ি আর ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরিচয় পেয়ে চারুলতা বললো “ নমস্কার । আপনাদের কথা সঞ্জয়ের মুখে অনেক শুনেছি। আপনারা এসছেন দেখে খুশি হলাম। চলুন কেক কেটে নিই। „
কেক কাটার পর যে যার সাথে গল্প করতে শুরু করলো। অতিথিদের জন্য বিভিন্ন পদের খাবার আছে। কাটলেট , ফিস ফ্রাই , পকোড়া , ভেজিটেবল চপ এমনকি সুপ পর্যন্ত । যে যার পছন্দ মতো খাবার নিয়ে খেতে শুরু করলো। চারুলতা জোড় করে দুটো কাটলেটের প্লেট আকাশের মা আর দিদিমার হাতে ধরিয়ে দিল।
আকাশ দিদার সাথেই ঘুরছিল। সঞ্জয় তার মেয়ের হাতে একটা কেকের প্লেট দিয়ে বললো “ যাও এটা ওকে দাও আর ওর সাথে গল্প করো। নতুন বন্ধু তোমার। „
গোধূলি বাবার কথা মতো আকাশের কাছে গিয়ে আকাশের দিকে কেকের প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে বললো “ তোমার নাম কি ? „
“ আমার নাম আকাশ। „ কথাটা বলে আকাশ মনে মনে ভাবলো — কি বোকা মেয়ে। কিছুক্ষণ আগেই তো বাবা আমার নাম বললো। “ তুমি কোন ক্লাসে পড়ো । „
“ আমি সেন্ট চার্লসে ক্লাস থ্রিতে পড়ি। আর তুমি ? „
“ আমি বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠে ক্লাস ফাইভে পড়ি । „ আকাশ ফের মনে মনে ভাবলো — কি সুন্দর তুমি তুমি করে কথা বলছে। সুচিতো তুই ছাড়া কথাই বলে না। আবার মারে।
আকাশের কথা শুনতে পেয়ে সঞ্জয় আকাশের বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো “ সরকারি স্কুলে কেন পড়াচ্ছেন ? এখন তো সবাই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে। „
আকাশের বাবা ঠোঁটের কোনায় হাসি নিয়ে বললেন “ ওর এক বন্ধু ওই স্কুলেই পড়ে। তাই জেদ ধরেছিল একসাথে একই স্কুলে পড়বে। তাই ওখানে ভর্তি করিয়েছি। „
আকাশের বাবার কথা শুনে সঞ্জয় উপর নীচ মাথা নাড়লো । যেন তিনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন। তারপর আরও অনেক কথা বলে হাসিঠাট্টা করে আকাশরা বিদায় নিলো । বিদায় নেওয়ার সময় সঞ্জয় তার মেয়েকে বললো “ টাটা করে দাও সবাইকে। „
গোধূলি সবাইকে হাত নেড়ে টাটা করে দিল। আকাশও প্রতিউত্তরে টাটা করলো। সঞ্জয়ের স্ত্রী চারুলতা বললো “ আবার আসবেন সময় করে। „
তারপর সবাই গাড়িতে উঠে পড়লো। রাস্তায় এতো জ্যাম ছিল যে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। এত দেড়িতে আকাশ কখনো জেগে থাকে না। তাই রাস্তায় গাড়িতেই দিদিমার কোলে আকাশ ঘুমিয়ে পড়লো। মাঝ রাস্তায় আকাশের বাবা আপন মনেই বললেন “ একটা নতুন গাড়ি কিনতে হবে। „
পরের দিন সকালে আকাশের বাবা স্নান করতে গেছেন। মা রান্না করতে ব্যাস্ত আর দিদিমা বাদশাকে নিয়ে ছাদে গেছেন তার আচারের বয়াম গুলো রোদে শুকানোর জন্য। আকাশ সকাল সকাল টিভি খুলে বসে গেছে কার্টুন দেখবে বলে। দুটো কার্টুন একসাথে দেখছে। একটা হলো Ben 10 আর একটা হলো doremon. যখন Ben 10 এ বিঞ্জাপন শুরু হচ্ছে তখন চ্যানেল ঘুরিয়ে ডোরেমন দেখছে। সকাল সকাল টিভির সামনে বসে পড়ার জন্য স্নেহা দেবী রেগে গিয়ে বললেন “ রবিবার বলে কি তোর পড়াশোনা নেই ? সকাল সকাল টিভির সামনে বসে গেলি ! „
“ এই এটা দেখেনি তারপর পড়তে বসবো। „ কথাটা বলার পর আকাশ খেয়াল করলো সুচি দিদিমার খোলা রাখা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। আকাশ সুচিকে দেখে বললো “ এই দেখ Ben 10 এর নতুন এলিয়েন বেরিয়েছে। „
সুচি আকাশের পাশে সোফায় বসে বললো “ কাল কোথায় গেছিলি ? „
“ কালকে তো গোধূলির বাড়িতে গেছিলাম। ওর জন্মদিন ছিল। „
“ গোধূলি কে ? „ ভুরু কুঁচকে সুচি জিজ্ঞাসা করলো।
“ বাবার বন্ধুর মেয়ে। আমাকে কেক খেতে দিল। জানিস ওর গাল দুটো টকটকে লাল , পুরো আপেলের মতো । আমাকে কি সুন্দর তুমি তুমি করে কথা বলছিল। তুই তো তুই তুই করে বলিস…….ঠাসসসসস
আর সহ্য করতে পারলো না সুচি। একজন মেয়ে আর একজন মেয়ের প্রশংসা কতক্ষণ শুনতে পারে ! একের পর এক গোধূলির প্রশংসা শুনতে এমনিই ভালো লাগছিল না সুচির। তার উপর তার সাথে ওই মেয়েটার তুলনা একদম বরদাস্ত করতে পারলো না সুচি। তাই রেগে গিয়ে চড়টা বসিয়ে দিল আকাশের গালে।
চড় খেয়ে আকাশের মনে হচ্ছিল ডিগবাজী খেয়ে সোফার উল্টো দিকে গিয়ে পড়ে। চড়ের আওয়াজ শুনে বাথরুমে আকাশের বাবা শাওয়ার বন্ধ করে কান খাড়া করে রইলেন কিছুক্ষণ , আওয়াজটা আরও একবার শোনার আশায় । তিনি আওয়াজ শুনতে পেলেও কিসের আওয়াজ সেটা বুঝতে পারেন নি। আকাশের মা রান্নাঘর থেকেই বলে উঠলেন “ তোরা সকাল সকাল আবার শুরু করলি ? „
“ মারলি কেন ? „ আকাশ রেগে গিয়ে গালে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞাসা করলো।
“ তুই আর যাবি না ওই মেয়েটার বাড়ি। „ সুচিও রেগে গিয়ে বললো।
“ তুই মারলি কেন ? „
“ আগে বল তুই আর ওই মেয়টার বাড়ি যাবি না । „
“ কেন ? যাবো না কেন ? „
“ তুই আর যাবি না। „ সুচি কিভাবে বলবে যে গোধূলি কে তার একদম পছন্দ হয়নি ? তাই কথা ঘোরানোর জন্য সুচি বললো “ কালকে আমাদের সিনেমা দেখার কথার ছিল না ! আমাকে না বলে চলে গেলি । „
“ ওওও , তুই সিনেমা দেখতে পারিস নি বলে মারলি। „
আকাশ হয়তো আরও কিছু বলতো কিন্তু বলার আগেই বাদশা আর দিদিমা ঘরে ঢুকলেন। বাদশা এসেই সুচির পায়ের কাছে এসে লেজ নাড়তে লাগলো। সুচি কিছুক্ষণ আদর করে নিজের ঘরে চলে গেল।
একটা সিনেমা দেখতে না পাওয়ার জন্য সুচি ওকে চড় মেরেছিল সেটা আকাশ এখনও ভোলে নি। চড়ের স্মৃতি মাথায় নিয়েই রোজ সুচির সাথেই স্কুলে যেতে হয়, মাঝে মাঝে তো সুচি হাত ধরে নিয়ে যায় । একদিন স্কুলে টিফিন ব্রেকে ডিমটোস্ট খেয়ে টিফিন করার পর আকাশ নিজের ঘরে ঢুকে গেছে । বিপ্লব বিচ্ছু গেছে টয়লেটে । টিফিন ব্রেক শেষ হতে আর পাঁচ ছয় মিনিট বাকি । এইসময় টয়লেটে খুব ভীড় হয় তাই আকাশ ভিড় হওয়ার আগেই বাথরুম করে নেয় ।
টয়লেট করার পর বিপ্লব ক্লাস রুমের দিকেই আসছিল ঠিক তখন দশম শ্রেনীর ছাত্র নকুল বিপ্লবকে ডাকলো “ এই শোন। „
আকাশের সাথে একই ক্লাসে বিপ্লব পড়ে । এই স্কুলে অষ্টম থেকে দশম শ্রেনীর ছাত্ররা ফুল প্যান্ট পড়ে । তাই ছেলেটাকে লাল রঙের ফুল প্যান্ট পড়ে থাকতে দেখে বিপ্লব ঘাবড়ে গেল। বিপ্লব দেখলো দাদাটা একাই আছে তাই সাহস সঞ্চয় করে দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গেল কিন্তু কিছু বলার সাহস পেল না। বিপ্লব সামনে আসতে নকুল জিজ্ঞাসা করলো “ ওই মেয়েটা তোদের সোসাইটিতে থাকে না ? „
বিপ্লব দেখলো নকুল দূরে চার জন মেয়ের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। কিন্তু ওই চারজনের মধ্যে কাকে দেখাচ্ছে বুঝলো না। তাই জিজ্ঞাসা করলো “ ওদের মধ্যে কার কথা বলছো ? ওখানে তো চারজন দাঁড়িয়ে আছে ! „
“ ওদের মধ্যে সবথেকে লম্বা । সুচিত্রা নাম ওর। „
“ হ্যাঁ ও আমাদের সোসাইটিতেই থাকে । „
বিপ্লবের চিনতে পারার সঙ্গে সঙ্গে নকুল পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে বিপ্লবের হাতে দিল। বিপ্লব দেখলো এটা একটা প্রেমের গ্রিটিংস কার্ড । বিপ্লব কার্ডটা হাতে নিতেই নকুল বললো “ এই কার্ডটা ওকে দিয়ে আয়। „

(৩)
সুচির স্বভাব , আচার-আচরন সব ভালো করেই চেনে বিপ্লব । একসাথে বড়ো হয়েছে তারা। বলা ভালো সুচির চড় খেয়েই বড়ো হয়েছে বিপ্লব বিচ্ছু। সুচির চড় খেয়ে একদিন গালে ব্যাথা থাকে আর দুদিন গালে আঙুলের দাগ থাকে । আর সেই সুচিকেই প্রেমপত্র দিতে বলছে এই দাদা। দুরুদুরু বুকে কার্ডটা নিল বিপ্লব। কার্ড হাতে ধরতেই নকুল বললো “ দিয়ে আয় যা। „
উঁচু ক্লাসের দাদার কথা অমান্য করা যায় না। অমান্য করার সাহস নিচু ক্লাসের ছাত্রদের নেই। তার উপর লাস্টের ‘ দিয়ে আয় যা । ‚ কথাটা যেন আদেশ করলো মনে হলো বিপ্লবের। আদেশকে তোয়াক্কা করা যাবে না । বেশি কিছু হলে সুচি একটা চড় মারবে এটা ভেবেই বিপ্লব কার্ডটা নিয়ে এগিয়ে গেলো সুচি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। সুচির কাছে যেতেই সুচি বিপ্লবকে জিজ্ঞাসা করলো “ এখানে কি করছিস ? তোর ক্লাস এইদিকে নাকি ! „
সুচি প্রশ্নটা করতেই বাকি তিনজন বিপ্লবের দিকে ফিরে তাকালো। এতক্ষণ বাকি তিনজন সুচির দিকে মুখ করে ছিল। আর সুচি বিপ্লবের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল। বাকি তিনজন বিপ্লবের দিকে ফিরে তাকাতেই বিপ্লব দেখলো তাদের মধ্যে একজন জয়শ্রী দাঁড়িয়ে আছে। বিপ্লবের হাতে গ্রিটিংস কার্ড দেখে সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিল জয়শ্রী । তারপর সেটা খুলে দেখলো , তাতে বড়ো করে সুচিত্রার নাম লেখা আছে। সুচিত্রার নাম পড়ে জয়শ্রী বললো “ পড়াশোনা না করে এইসব করছিস ? আজ কাকিমাকে বলছি তুই এইসব করে বেড়াচ্ছিস স্কুলে। „
একেই হৃৎপিন্ড একটু বেশিই দ্রুত চলছিল বিপ্লবের । এখন মায়ের কাছে বলে দেবে শুনে বুকটা যেন ড্রাম বাজাতে শুরু করলো “ আমি কি করলাম ? ওই দাদাটাই তো আমাকে এই কার্ডটা দিয়ে বললো সুচিকে দিয়ে আসতে । „ বলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নকুলের দিকে দেখিয়ে দিল ।
বিপ্লবের মুখে নিজের ডাকনাম শুনে সুচি রেগে গেল। ঠাসসসস করে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বললো “ বড়োদের নাম ধরে ডাকছিস আবার ! তোর সাহস তো কম না। আজ বাড়ি চল কাকি তোর কি অবস্থা করে দেখ। „ বলে জয়শ্রীর হাত থেকে কার্ডটা নিল সুচি।
কিছুক্ষণ মন দিয়ে কার্ডটা পড়লো সুচি । এই সুযোগে বিপ্লব দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল । কার্ডে লেখা আছে —– অনেকদিন ধরে তোমাকে কথাটা বলবো বলবো করছি কিন্তু বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। আজ সাহস করে বলছি ‘ তোমাকে যেদিন দেখেছি সেদিন থেকেই এই বুকে তুমি বাস করছো । তোমার গালে টোল পড়া হাঁসি দেখার জন্য আমি প্রতিদিন স্কুলে আসি। তোমার নাচ দেখার জন্য আমি সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি ………..
আরও অনেক কিছুই লেখা ছিল কার্ডে। সেগুলো পড়ার আর ইচ্ছা হলো না সুচির। যতোটা পড়লো তাতেই সুচির কান লাল হয়ে উঠলো রাগে । কার্ডটা নিয়ে সোজা নকুলের সামনে গিয়ে ঠাসসসস করে একটা চড় বসিয়ে দিল “ এতোই যখন নাঁচ দেখার শখ তখন নিজের দিদিকে নাঁচ শিখিয়ে তার নাঁচ দেখ। „ দাঁতে দাঁত ঘসে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাটা বলে গ্রিটিংস কার্ডটা নকুলের দিকে ছুড়ে দিল সুচি।
সুচির ওই সরু সরু আঙুলের হাতের চড়ে আওয়াজ হয় খুব। নকুলকে মারা চড়ের আওয়াজ এতোটাই তীব্র ছিল যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় সবাই হকচকিয়ে গেল। কোলাহল করা স্কুলের বারান্দা এখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু নিচু ক্লাসের সবাই নকুলের দিকে তাকালো। নকুল তখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই ক্লাস শুরু হওয়ার ঘন্টা বেজে গেল। সুচি হয়তো আরও কিছু বলতো কিন্তু টিফিন শেষের ঘন্টা শুনে নিজের ক্লাসের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
এরপর নকুল একমাস আর স্কুলে আসেনি। আসলেই তো ঠাট্টা টিটকিরির মুখোমুখি হতে হবে। তাই যতদিন না ঘটনাটা সবার স্মৃতি তে আবছা হয়ে যায় ততদিন সে এলো না। স্কুলে ক্লাস টিচার কে একটা অসুস্থতার চিঠি দিয়ে দিল।
নকুল চড়ের জন্য স্কুলে আসলো না। কিন্তু সেদিন নকুল ছাড়া আরও একজন চড় খেয়েছিল। যে চড় খেয়েছিল সে কিন্তু ভোলার পাত্র নয়। বিপ্লব সুচির চড় খেয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলো — খুব দিদি হওয়ার শখ। যখন তখন শাসন করবে। চড় মারবে। কিছু একটা করতে হবে। দিদি হওয়ার শখ বার করতে হবে।
কয়েকদিনের মধ্যে বিপ্লব সুচির চড়ের কথা ভুলে গেল। কিন্তু দোল পূর্ণিমার হাওয়া গায়ে মাখতেই আবার পুরানো স্মৃতি সব নতুন হয়ে জেগে উঠলো। আশে পাশের কয়েকটা দোকানে খোঁজ করে পাঁচ টাকার দুটো বাঁদুড়ে রঙ কিনে আনলো। কিনে তো আনলো কিন্তু সুচিকে মাখানোর সাহস হলো না। কি করা যায় ভেবে আকাশকে ডেকে বললো “ এটা পাকা রঙ। একবার মাখলে একমাস উঠবে না….
বিপ্লবের কথা মাঝপথেই থামিয়ে উৎসাহে আকাশ বলে উঠলো “ একটা দে , সুচিকে মাখাবো । „ বিপ্লব এটাই চাইছিল কিন্তু আকাশকে বলতে পারছিল না। আকাশ নিজে থেকেই সুচিকে মাখানোর কথা বলতে দুটো শিশির মধ্যে একটা আকাশকে দিয়ে দিল।
দোলের দিন সকালে সুচি একটা পুরানো টপ আর একটা ফুল প্যান্ট পড়লো। প্রথমে দিদিমাকে একটা প্রনাম করলো তারপর বাড়ির সবার পায়ে আবির দিয়ে প্রনাম করে নিচে নামলো। নিচে নেমে দাদুর সেই ঘরের দিকে দৃষ্টি পড়তেই মনটা ভারি হয়ে উঠলো সুচির। দাদুর ঘরটা এখন স্টোররূমে পরিনত হয়েছে। সোসাইটির সব পুরানো আসবাবপত্র এখন দাদুর ঘরে স্থান পায়। প্রতিবার দাদুর পায়ে আবির দিয়ে প্রনাম করতো সুচি। দাদু সবার জন্য রসগোল্লা কিনে রাখতো। সবাইকে দেওয়া হয়ে গেলে বাকি বেচে থাকা রসগোল্লা একা সুচিকে দিয়ে দিত দাদু। এইসব পুরানো কথা মনে পড়তেই মনটা আরও ভারী হয়ে উঠলো সুচির।
কিন্তু আজ মন ভারী করার দিন না। বাবার এনে দেওয়া আবির দিয়ে দোল খেলতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পরে একে একে জয়শ্রী, সুমি সবাই এলো। শুধু বাদশাকে নিচে নামতেই দেওয়া হলো না । আকাশ দিদিমার কাছে বাদশাকে গচ্ছিত রেখে নিচে এসে সবাইকে আবির মাখালো। কেউ কেউ পিচকারি দিয়ে আবির গুলে গায়ে ছুঁড়তে লাগলো। দেখতে দেখতে সোসাইটির খেলার মাঠ আর সবার মুখ আবিরে সেজে উঠলো।
দোল খেলার পর যে যার বাড়ি চলে গেল। সোসাইটির খেলার মাঠটা এখন বিভিন্ন রঙের আবিরে রামধনুর মতো সেজে আছে। সুচি নিজের ঘরে গিয়ে তোয়ালে , একটা টপ আর একটা হাফপ্যান্ট নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল স্নান করতে। প্রথমে বালতি থেকে মগে করে জল তুলে মুখটা ধুলো। সমস্ত আবির উঠে গেল কিন্তু আকাশের মাখানো পাকা রঙ উঠলো না। কোন এক সুযোগে আকাশ এই পাকা রঙ মাখিয়ে চলে গেছে।
মুখ ধোওয়ার পর বাবার দাড়ি গোঁফ কামানোর জন্য টাঙিয়ে রাখা বড়ো আয়নায় নিজের মুখ দেখেই ভুরু কুঁচকে গেল সুচির। পুরো মুখে হালকা কালচে রঙ। পাকা বাদুড়ে রঙ। মুখের আসল রঙ বোঝাই যাচ্ছে না এই পাকা রঙের জন্য।
পাকা রঙ দেখে ভালো করে সাবান দিয়ে মুখ ধুলো সুচি । তিন চারবার ধোওয়ার পরেও উঠলো না। কিছুক্ষণ আয়নায় নিজের মুখ দেখে ভাবলো—- ‘ কে করতে পারে এইরকম বদমাইশি ? একমাত্র বিপ্লব করে এই ধরনের শয়তানি। কিন্তু বিপ্লব তো আজ ওর কাছে একবারও আসেনি । তাহলে কে হতে পারে ? ‚ তারপরেই মনে পড়লো ‘ আকাশের হাতে এই পাকা রঙ দেখেছিল কিন্তু তখন খেয়াল করেনি। অন্যমনষ্কতার সুযোগে কোন এক সময় আকাশ এই কাজ করেছে । ‚ এই সিদ্ধান্তে আসতে বেশি সময় লাগলো না সুচির।
আকাশের কথা মাথায় আসতেই দাঁত দাঁত ঘসে নিয়ে বাথরুমের বাইরে এসে সোজা আকাশের ঘরে চলে এলো। দিদিমা তখন বাদশাকে স্নান করানোর জন্য একটা বড়ো গামলায় জল ভরছেন আর আকাশ টিভি দেখছে। সুচিকে ওইরকম তেড়েফুড়ে ঘরে ঢুকতে দেখে আকাশ তড়াং করে সোফা থেকে উঠো পড়লো।
“ তুই করেছিস না এটা ? „ বলো আকাশকে মারতে যাচ্ছিল। কিন্তু আকাশ হাসতে হাসতে সোফার চারিদিকে গোল হয়ে দৌড়াতে লাগলো।
আকাশকে হাসতে দেখে সুচি আরও রেগে গেল। মনে হচ্ছিল চড়ে গাল দুটো লাল করে দেয়। কিন্তু আকাশ হাতে আসছে না। তিন চারবার সোফার চারিদিকে দৌড়ে সুচি হাঁপিয়ে গেল। একটু শান্ত হয়ে বললো “ আচ্ছা তোকে মারবো না। শুধু বল কে তোকে এই রঙ দিয়েছে ? তোর এত সাহস নেই আমাকে পাকা রঙ মাখানোর। „
“ আমি ভীতু ! „ কোন ছেলেকে যদি বলা হয় তুই সাহসী না তাহলে সে খুব রেগে যাবে। সুচি আকাশকে সাহসী মনে না করায় সেও রেগে গেল। রেগে গিয়ে সোফার চারিদিকে গোল হয়ে দৌড়ানো বন্ধ করে দিল।
“ হ্যাঁ তুই ভীতু। ভীতুর ডিম তুই। এবার সত্যি সত্যি বল কে তোকে এই রঙ দিয়েছে ? না হলে কিন্তু মার খাবি । „ আকাশের পুরো সামনে এসে চোখ বড়ো বড়ো করে ধমকিয়ে বললো সুচি ।
আকাশ এখন পুরো সুচির হাতের নাগালে। চাইলেই একটা চড় বসিয়ে দিতে পারে আকাশের গালে। মার খাওয়ার ভয়ে আর সুচির বড়ো বড়ো চোখের ভয়ে আকাশ বলে ফেললো “ বিপ্লব এই রঙ দিয়েছিল তোকে মাখানোর জন্য। „
ঠাসসসসস আকাশের কথা শেষ হতেই সুচির ডান হাত সজোরে বসে গেল আকাশের গালে “ পরের কথায় খুব নাঁচা হচ্ছে । বিপ্লব তোকে ছাদ দিয়ে ঝাপ দিতে বললে তুই ঝাপ দিবি ? „
সুচির চড় খেয়ে আকাশ সোফায় পড়ে গেল “ বা রে আমি ঝাপ দিতে যাবো কেন ? „ গালে হাত বুলিয়ে বললো আকাশ। চড়ের জন্য প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থা তার ।
সুচির চড়ের আওয়াজ বাথরুমে দিম্মার কান অব্দি গিয়েছিল। চড়ের আওয়াজ শুনে তিনি বেরিয়ে এসে দেখলেন আকাশ সোফায় পড়ে আছে আর গালে হাত বুলাচ্ছে। সুচি তার সামনে কোমরে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে তার পাকা রঙ । পাকা রঙের জন্য এখন সুচিকে পুরো ভুতের মতো দেখাচ্ছে “ এখনও স্নান করিস নি তুই। আর এ কি অবস্থা তোর ! „
“ দেখো না তোমার আদরের দাদুভাই কি করেছে । পুরো মুখে পাকা বাদুরে রঙ মাখিয়ে দিয়েছে । কিছুতেই উঠছেনা ! „ বলে কাঁদো কাঁদো গলায় দিম্মা কে জড়িয়ে ধরলো সুচি।
সুচি এখন দিম্মার থেকে লম্বা। দিম্মাকে জড়িয়ে ধরার জন্য দিম্মার মাথা সুচির গলা পর্যন্ত এসে ঠেকছিল। সুচির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দিম্মা বললেন “ কেন করেছিস এরকম দাদুভাই। পাকা রঙ মাখলে ত্বকের অনেক রোগ হয় জানিস না তুই ? „
“ আর করবো না দিদিমা । „ মাথা নিচু করে কথাটা বললো আকাশ। নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে সে।
“ চল তোকে স্নান করিয়ে দিই। হলুদ লাগিয়ে দেবো , দেখবি মুখের সব রঙ উঠে যাবে । „ সুচিকে বললেন দিদিমা।
তারপর সুচিকে দিদিমা স্নান করিয়ে দিলেন। মুখে সাবান মাখিয়ে দিলেন। হলুদ ও মাখালেন কিন্তু রঙ তেমন একটা উঠলো না। রাগে প্রায় চোখে জল এনে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে সুচি দিদিমা কে বললো “ আজ রাতে তুমি ঘরের দরজা খোলা রাখবে। „
“ কেন কি করবি তুই ? „
“ তুমি দরজা খোলা রাখবে । আমিও আকাশকে পাকা রঙ মাখাবো । „
দিদিমাকে ভুরু উপরে তুলে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সুচি বললো “ তুমি শুধু আকাশকেই ভালোবাসো আমাকে একদম ভালোবাসো না । „
সুচির অভিমান দেখে তাকে বুকে টেনে নিয়ে দিদিমা বললেন “ তুই আমার দাদুভাইকে ক্ষতিকর রঙ মাখাবি আমি কি করে রাজি হই বলতো ! „
“ আর তোমার দাদুভাইযে আমার মুখে এই রঙ মাখালো তখন ! „
দিদিমা আর কিছু বলতে পারলো না। বিকালে সুচি বিপ্লব কে ধরে বললো “ তুই আকাশকে পাকা রঙ দিয়ে বলেছিলি আমাকে মাখাতে ? „
সুচির গম্ভীর গলা শুনে বিপ্লব আগে থেকেই নিজের দুই গালে হাত দিয়ে দিল। সুচি যাতে না মারতে পারে তাই এই ব্যবস্থা। বিপ্লবের অবস্থা দেখে সুচি বললো “ আচ্ছা আমি মারবো না যদি তুই আমার একটা কাজ করে দিস । „
“ কি কাজ ? „
“ ওই পাকা রঙ আমাকে এনে দিতে হবে । আছে তোর কাছে ?
“ আছে । „
“ যা আন । „
বিপ্লব দৌড়ে নিজের বাড়ি গিয়ে একটা কাচের শিশি এনে দিল। সুচির হাতে দিয়ে বললো “ একটু হাতে নিয়ে কয়েক ফোটা জল দিয়ে মাখিয়ে নিয়ে……
“ থাক আমাকে শেখাতে হবে না । „ বলে সুচি একটা অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে চলে গেল।
রাতে দিদিমা সুচির কথা মতো দরজা খুলে রেখেছিলেন। আকাশকে ওই পাকা রঙ মাখানোতে একদম মন ছিল না দিদিমার। কিন্তু সুচির অভিমান আবার ভয়ঙ্কর। সহজে ভাঙতে চায় না। তাই তিনি দরজা খোলা রাখলেন। রাত এগারোটার দিকে সুচি এলো। আকাশ তখন মড়ার মতো ঘুমাচ্ছে আর সেই ছোটবেলার অভ্যাসের জন্য ঠোঁট নাড়ছে। এমন ভাবে ঠোঁট নাড়ছে যেন কথা বলছে।
সুচি এসে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিল । ঘরে আলো জ্বললেও আকাশের ঘুম ভাঙলো না। সুচি একটু মুচকি হেসে শিশিতে যতোটা রঙ ছিল সব হাতে নিয়ে জল দিয়ে মেখে আকাশের পুরো মুখে মাখিয়ে দিল। সুচির দুষ্টুমি হাসি দেখে দিদিমাও হেসে ফেললেন।
সুচির কোমল হাত শুধুমাত্র চড় মারার সময়েই আকাশের গালে পড়েছে। এখন সেই কোমল হাতের আঙুল মুখের উপর ঘুরে বেড়াতে ঘুমের মধ্যেই আকাশ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। মুখে রঙ মাখানো হয়ে গেল সুচির মুখে একটা যুদ্ধ জয়ের হাসি দেখা দিল। আকাশের মুখে রঙ মাখিয়ে খাট থেকে নেমে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরে গালে একটা চুমু খেয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল । দিদিমা এই দুজনের দুষ্টুমি খুব উপভোগ করেন। আকাশের সাথে থাকলে যেন সুচি নিজের বয়স ভুলে গিয়ে বাচ্চা হয়ে যায়। এটা দিদিমা সবথেকে বেশি উপভোগ করেন।
সকালে আকাশ ঘুম থেকে উঠে হাত আকাশে তুলে উবাসি কাটিয়ে ঘরের বাইরে এলো। ঘরের বাইরে এসে বাথরুমে গিয়ে ব্রাশ করতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর মুখ ধুয়ে দাঁত দেখার জন্য আয়নায় দৃষ্টি ফেলতেই দেখতে পেলো মুখে পাকা রঙ। মুখে রঙ কি করে এলো সেটা ভাবতে ভাবতেই চোখ বড়ো হয়ে গেল বিস্ময়ে। কে মাখালো ? কখন মাখালো ? এইসব ভাবতে ভাবতে ভালো করে মুখ ধুলো। বৃথা চেষ্টা করলো রঙ তোলার ।
তারপর বাথরুমের বাইরে আসতেই দেখতে পেলো ফ্ল্যাটে ঢোকার দরজায় সুচি দাড়িয়ে আছে। মুখে তার এখনও যুদ্ধ জয়ের হাসি । সুচির হাসি দেখেই আকাশ বুঝলো এটা সুচি করেছে । আকাশের কাছে এখন সবথেকে বড়ো বিষ্ময়ের বিষয় হলো ‘ সুচি কখন তাকে রঙ মাখিয়েছে ‚ তাই সে সুচিকে জিজ্ঞাসা করলো “ তুই এই রঙ কখন মাখালি আমায় ? „
সুচি হাসতে হাসতে বললো “ কাল রাতে যখন মড়ার মতো ঘুমিয়েছিলি তখন । „ সকালে ঘুম থেকে উঠে খুব ভালো করে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়েছিল সুচি। রঙ কিন্তু ওঠেনি। সেটা মনে পড়তেই সুচি বললো “ একবারও ভেবেছিস তুই ! আমি কিভাবে এখন আমি স্কুলে যাবো ? „
“ তুই স্কুলে যেতে পারবি না বয়েই গেল আমার । „
“ তবে রে। „ বলে সুচি এগিয়ে গেল আকাশের দিকে। তারপর যথারীতি সকালের কুস্তি শুরু হয়ে গেল। আকাশ বিশেষ সুবিধা কখনোই করতে পারে না। সুচি আগেই আকাশের বড়ো বড়ো চুল ধরে তার মাথাটাকে কয়েক পাক ঘুরিয়ে নেয় তারপর চড় মারে। এখনও তার ব্যাতিক্রম হলো না। সুচি আকাশের চুল ধরার পরেই আকাশ দৌড়ে সরে গিয়ে হাসতে হাসতে বললো “ আবার মাখাবো । যখন এই রঙ উঠে যাবে তখন আবার মাখাবো। „
আকাশের কথা শুনে সুচি আরো রেগে গেল। দৌড়ে গিয়ে আকাশকে ধরতে গেল । আকাশকে ধরার আগেই আকাশের বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন । কাকাকে দেখে সুচি শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। সুচির দেখাদেখি আকাশও দাঁড়িয়ে পড়লো।
আকাশের বাবা ঘর থেকেই সুচি আর আকাশের জোরে জোরে কথার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন। তাই তিনি একরাশ বিরক্তি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন। বাইরে লিভিং রুমে এসে সুচি আর আকাশের দিকে তাকাতেই মুখ আপনাআপনি হা হয়ে গেল শুভাশীষ বাবুর। আকাশ আর সুচির মুখে যেন কেউ হাড়ির তলায় লেগে থাকা কালো কালি মাখিয়েছে কিংবা এক বালতি আলকাতরা যেন কেউ ভালোভাবে দুজনের মুখে মাখিয়ে দিয়েছে । বাবার বিষ্ময়ের কারন বুঝতে পেরে আকাশ সুচির দিকে আঙুল দিয়ে বললো “ এ মাখিয়েছে । „
সুচিও নিজেকে বাঁচানোর জন্য বললো “ তুই তো আগে মাখিয়েছিস। „
শুভাশীষ বাবু দুজনকেই বললেন “ এই ধরনের রঙ ক্যামিকেল দিয়ে তৈরি হয়। আর কখনো মাখাবে না কাউকে। এতে চামড়ার অনেক ক্ষতি হয় „ বলে তিনি বাথরুমে চলে গেলেন ব্রাশ করতে।
কিছুক্ষণ পর স্নেহা দেবী ঘর গুছিয়ে এসে দুজনকেই বকলেন। তারপর সুচিকে এই পাকা রঙ তোলার জন্য বিভিন্ন ধরনের উপদেশ দিলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ তিনি দুজনকে বকাঝকা করতে পারলেন না কারন ব্রেকফাস্ট বানাতে হবে তার স্বামীর জন্য।
রঙ মাখানোর পর এক সপ্তাহ সুচি স্কুলে যায় নি। বাড়িতে বিভিন্ন ফেসওয়াশ , আয়ুর্বেদ পাতা,হলুদ , লেবু , নিম পাতা মেখে যতদিন না মুখের রঙ ওঠে ততদিন স্কুলে গেল না । এই কয়েকদিন বাড়িতে বসে সুচি লক্ষ্য করলো বাদশা একটু ঝিমিয়ে আছে। আগের মতো আর লাফাচ্ছে না। রোজ বিকালে সবাই যখন খেলে তখন বাদশা দিদিমার পায়ের পাশে চুপচাপ বসে থাকে। সুচির মুখের রঙ পুরপুরি ওঠেনি তাই সে আলাদা হয়ে বাদশার সাথে খেলে কিন্তু বাদশার আগের মতো আর সেই উৎসাহ নেই। সুচির মনে হলো এটা সেই পাকা রঙের জন্যেই হয়েছে তাই একদিন বিকালে আকাশকে ঠাসসসস করে চড় মেরে বললো “ তোর ওই পাকা রঙের জন্যেই বাদশার শরীর খারাপ হয়েছে । „
“ তোর তো শুধু মারার বাহানা চাই। শুধু শুধু মারছিস , পাকা রঙ কেন ! আমি তো আবিরও মাখাইনি বাদশাকে। „
“ তাহলে বাদশার শরীর খারাপ হলো কি করে ? „
“আমি কি জানি । „
দিদিমা দুজনকেই থামিয়ে বললেন “ আর মারপিট করতে হবে না। কালকে বিকালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। এখন যা তোরা পড়তে বস । „
ডাক্তারের কথা শুনেই সুচির বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো “ ডাক্তার কেন ? কি হয়েছে বাদশার ? „
“ ডাক্তারের কাছে গেলেই তো বুঝবো কি হয়েছে । „
“ তাহলে এখনই চলো দিদিমা । „
সুচির কথা শুনে আকাশও জেদ ধরলো আজকেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য। আকাশের জেদের কাছে সবাই হার মেনে নেয়। এখন দিদিমাও হার স্বীকার করলেন। তিনজন মিলে বাদশাকে পাশের একটা পশু চিকিৎসক এর কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার কিছুক্ষণ পরিক্ষা নিরিক্ষা করে সবাইকে আস্বস্ত করার জন্য বললেন “ রোগ টোগ কিছুই হয় নি। বাদশার বয়স হয়েছে। তাই আগের মতো আর এনার্জি পাচ্ছে না। আপনারা এর খাবার বদলে দিন। „ তারপর প্রেসক্রিপশনে কিছু একটা লিখে বললেন “ কত বয়স হয়েছে বাদশার ? „
দিদিমা আকাশের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন “ এর অন্নপ্রাশনে আমার ছেলে উপহার দিয়েছিল। তা সে এগারো বছর হতে যায় । „
“ খুব ভালো কেয়ার করেছেন আপনারা। এই ওষুধ গুলো নিয়ে নিন বাইরে থেকে আর খাবার পাল্টে ফেলুন । „
চেম্বারের বাইরে কম্পাউন্ডার একটা ছোটখাটো দোকান নিয়ে বসে আছে। সেখান থেকেই ওষুধ আর ডগ ফুড কিনে চলে এলো সবাই। রাস্তায় সুচি গলায় একরাশ বিরক্তি নিয়ে আকাশকে বললো “ কিছু হয়নি তবুও ওষুধ দিল। „
আকাশ সবজান্তা হয়ে বললো “ না হলে দোকান চলবে কি করে ? দেখলি না বাইরেই তো নিজে দোকান দিয়েছে । „
কয়েক মাস ধরে বাদশা আর আগের মতো দৌড়ঝাঁপ করে না। বিকালে ফ্ল্যাটের নিচে এসে চুপচাপ বসে থাকে। তাই আকাশ আর সুচি আগের মতো একসাথে খেলতে পারে না। দুজনেরই মন খারাপ। সুচির মুখের রঙ এখন প্রায় উঠে এসছে। শুধু কানের নিচে আর নাকের দুই পাশে হালকা রঙ লেগে আছে। শুভাশীষ বাবু কয়েক দিন ধরেই একটা নতুন গাড়ি কিনবেন কিনবেন করছেন তাই তিনি একদিন শনিবার বিকালে ছেলেকে ডেকে বললেন “ চল গাড়ি কিনতে যাই । „
“ গাড়ি কিনবে ? কোন গাড়ি বাবা ? কি কোম্পানি ?…..
আকাশ আরও প্রশ্ন করতো। তাই আকাশের প্রশ্নবান থামিয়ে শুভাশীষ বাবু বললেন “ শোরুমে গেলেই তো দেখতে পাবি । „
দিদিমা আকাশকে বললেন “ সুচিকেও নিয়ে যা । „
সুচির কথা শুনে শুভাশীষ বাবু রাজি হয়ে গেলেন । সুচির সাথে থাকলে আকাশ ওখানে গিয়ে বেশি লাফালাফি করবে না।
সুচির কথা শুনে এক দৌড়ে আকাশ সুচির ফ্ল্যাটে চলে গেল । সুচি তখন নাচের ক্লাসে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে শুরু করেছে । আকাশ সুচির ঘরে গিয়ে সুচিকে দেখে বললো “ বাবা গাড়ি কিনতে যাবে । যাবি ? „
নতুন গাড়ি কিনতে যাবে এতে সুচি খুব খুশি। এমনিতেই আজকে নাচের ক্লাসে যাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছিল না তাই সে রাজি হয়ে গেল “ চল । „
দুজনে ঘরের বাইরে আসতেই সুচেতা দেবী প্রশ্ন করলেন “ কোন গাড়ি কিনবি রে ? „ তিনি বাইরে থেকেই আকাশের কথা শুনতে পেয়েছিলেন।
“ বাবা এখনও বলেনি । „ আকাশ কথাটা বলেই ঘরের বাইরে দৌড় দিল । সুচিও পিছন পিছন চললো। নাচের ক্লাসে যাওয়ার জন্য যে লাল রঙের জামা গায়ে চাপিয়ে ছিল সেটাই পড়ে কাকার সাথে একটা এসি ট্যাক্সি নিয়ে জাগুয়ার এর শোরুমে গেল।
আকাশের বাবার সন্দেহই ঠিক হলো । সুচি আসায় আকাশ বেশ শান্ত আছে। শোরুমে ঢুকতেই সেলসম্যান গোছের একজন এগিয়ে এলো। তারপর বিভিন্ন মডেলের গাড়ি দেখাতে শুরু করলো। গাড়ি দেখা শুরু করার আগেই শুভাশীষ বাবু লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলেন “ চেক পেমেন্ট চলবে তো ? „
“ অবশ্যই চলবে। শুধু আপনার আইডির এক কপি জেরক্স লাগবে । „
তারপর বিভিন্ন ধরনের আর নানা রঙের গাড়ি দেখা শুরু করলেন আকাশের বাবা । তিনি এখানে আসার আগেই জাগুয়ারের xe মডেল পছন্দ করে তার সম্পর্কে জেনে এসেছিলেন কিন্তু এখানে বিভিন্ন মডেল দেখে মত বদলাতে হলো । আকাশের বাবার একটা নীল রঙের জাগুয়ার পছন্দ হলো । সেটা সম্পর্কে জানার জন্যে লোকাটাকে জিজ্ঞাসা করতেই সে বিভিন্ন ফিচারস বলতে শুরু করলো। লোকটার কথার মাঝেই আকাশ বললো “ বাবা অন্য রঙের কেনো । নিল রঙ তো আগের গাড়িটার ছিল । „
আগের গাড়ি শুনে লোকটা জিজ্ঞাসা করলো “ কোন গাড়ি ব্যাবহার করতেন স্যার ? „ আসলে লোকটা পরখ করে নিচ্ছে আদেও আকাশের বাবার ক্ষমতা আছে কি না জাগুয়ার কেনার।
“ Auston Martin „ আকাশের বাবা লোকটার প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন না।
“ খুব সুন্দর গাড়ি। „ মনে মনে লোকটা ভাবলো — আকাশের বাবা ফাঁপা আওয়াজ করছে না। তারপর আকাশ এর দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলো “ কোন রঙের গাড়ি তোমার পছন্দ ? „
“ আমার কালো রঙ পছন্দ । „
তারপর সেলসম্যান একটা ক্যাটালগ থেকে কালো রঙের বিভিন্ন মডেল দেখাতে শুরু করলো। আকাশ তার মধ্যে থেকে জাগুয়ার এর XF মডেল পছন্দ করলে আকাশের বাবা চেকে পেমেন্ট করে দিলেন।
তিন দিনের মধ্যে গাড়ি পৌঁছে গেল আকাশদের ফ্ল্যাটের নিচে। দিদিমা নারকেল ফাটিয়ে পুজা করলেন। তারপর সুচি , বাদশা আর আকাশের সাথে গাড়িটার ছবি তুললেন।
দুই দিন পর ছবি গুলো প্রিন্ট হয়ে এলে সেগুলো এলবামে লাগানোর সময় সুচি দেখতে পেলো। এলবাম টা হাতে নিয়ে পাতা উল্টে দেখতে দেখতে সুচি জিজ্ঞাসা করলো “ এগুলো কখন তুললে তুমি ? এতে তো অনেক ফটো আছে আমাদের। „
“ হ্যাঁ অনেক ফটো আছে। তোর আর দাদুভাইয়ের প্রত্যেক জন্মদিনের ছবি। তোর প্রথম নাঁচের ছবি। প্রথম কেন ! সবকটা নাচের ছবিই আছে এখানে। „
“ কখন তুললে তুমি এইসব ? „
“ যখন তোরা মজা করিস তখন । „

(৪)
সঞ্জয়কে কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার বানানোর পর কোম্পানির লাভ হয়েছে খুব। এতে আকাশের বাবা খুব খুশি। এমনকি এতদিনে যে সঞ্জয়ের চরিত্রের কোন বদ গুন তিনি দেখতে পাননি তাতে আরো বেশি খুশি।
একদিন বিকালে অফিসে বসে লাভের হিসাব করার সময় লাভের অঙ্ক দেখে শুভাশীষ বাবুর মুড ভালো হয়ে গেল। সঞ্জয়কে একটা ট্রিট দেওয়ার ইচ্ছা হলো আকাশের বাবার । ঠিক তখনই মনে পড়লো কয়েকদিন পর আকাশের জন্মদিন “ সামনের সোমবার আকাশের জন্মদিন। সন্ধ্যায় আমরা খুব ছোট করে উদযাপন করছি । তোমার পুরো পরিবারকে আসতে হবে কিন্তু ! „ গোধূলির জন্মদিনে সঞ্জয় তাকে সপরিবারে নেমন্তন্ন করেছিল তাই তিনিও সঞ্জয়ের পুরো পরিবারকেই আমন্ত্রণ দিয়ে দিলেন ।
কথাটা শুনেই সঞ্জয়ের চোখ জ্বলে উঠলো । নিজের মেয়ের সাথে আকাশের সম্পর্ক গড়ার যে পরিকল্পনা সে করেছিল তা সফল হতে দেখতে পেলো সঞ্জয় “ অবশ্যই আসবো। আপনি বলছেন আর আমি আসবো না ! এটা কখনো হয় ! „
আকাশের বাবা সঞ্জয় কে তুমি করে বললেও সঞ্জয় এখনও শুভাশীষ বাবুকে আপনি করেই সম্বোধন করে। সঞ্জয় আমন্ত্রণ গ্রহণ করায় আকাশের বাবার ঠোঁটের হাসিটা আরও বড়ো হয়ে গেল।
সোমবার আকাশ স্কুল ছুটি করলো। দুপুর বেলা স্নান করে দিদিমা যে পায়েস বানিয়েছিলেন সেটা সুচি আর সুচির বাবা বাদে সবাই খাইয়ে আশীর্বাদ করলো। কারন সুচি গেছে স্কুলে আর সমরেশ বাবু গেছেন অফিসে। সুচি স্কুল থেকে ফিরলেই আকাশ , দিদিমা , আর সুচি আকাশদের ফ্ল্যাটের লিভিংরুম সাজাতে শুরু করলো। লাল নীল হলুদ রঙের তিনটে করে বেলুন দিয়ে সব জায়গায় বাঁধলো। সরু লম্বা রঙিন কাগজ টাঙালো । লিভিংরুমটাকে পুরো অনুষ্ঠান বাড়ির মতো সাজিয়ে তুললো।
সন্ধ্যা সাতটায় কেক কাটার আগেই সোসাইটির যাদের সাথে ভালো সম্পর্ক তারা চলে এলো । বিপ্লব আর জয়শ্রী ও এলো। বিপ্লব এসেই আকাশের সাথে কয়েকটা রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি নিয়ে খেলতে শুরু করে দিল।
সুচির মা তো স্নেহা দেবীকে সাহায্য করছিলেন। আর পুরো পরিবার আকাশদের ফ্ল্যাটে থাকায় সুচির বাবা অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে এখানেই চলে আসলেন।
কেক কাটার কয়েক মিনিট আগেই সঞ্জয় চলে এলো সপরিবারে। সুচি আকাশের সব আত্মীয়কেই চেনে। এক মামা ছাড়া তো আর কেউ নেই আকাশের। তাও আবার সেই মামা থাকে মুম্বাইতে। সঞ্জয়দের আগে কখনোই দেখেনি সুচি। তাই ভাবতে লাগলো ‘ এরা কারা ? ‚ গোধূলি এসেই দিদিমাকে প্রণাম করলো । দিদিমা গোধূলির কপালে একটা চুমু খেয়ে বললেন “ থাক মা বড়ো হও। „
দিদিমাকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়ে আকাশের মাকে প্রণাম করার পর আকাশের মা বললেন “ কি মিষ্টি মেয়ে ! „
সুচি প্রথম থেকেই এই মেয়েটাকে লক্ষ্য করে যাচ্ছিল। একদম পছন্দ হয়নি সুচির। মনে মনে বললো ‘ নাকটা কেমন একটা থ্যাবড়ানো আর গাল দুটো লাল। কেমন একটা দেখতে ! ‚ গোধূলি যখন আকাশের পুরো পরিবারকে প্রণাম করছে তখন সুচি ভাবলো ‘ লোক দেখানো প্রণাম করছে । ‚
সত্যি সত্যি গোধূলি লোক দেখানোই কাজ করছে। রাস্তায় আসতে আসতে সঞ্জয় মেয়েকে বলেছিল “ ওখানে গিয়ে সবাইকে প্রণাম করবে। কেমন আছো জিজ্ঞাসা করবে। „ গোধূলি বাবার কথা মতোই চলছিল।
স্নেহা দেবীকে প্রণাম করার পর আকাশের বাবাকে প্রণাম করে গোধূলি জিজ্ঞাসা করলো “ কেমন আছো আঙ্কেল ? „
“ আমি ভালো আছি । তুমি কেমন আছো ? „
“ আমি খুব ভালো আছি। „ তারপর আকাশের কাছে গিয়ে হাসিমুখে আকাশকে জিজ্ঞাসা করলো “ কেমন আছো তুমি ? „
“ আমি ভালো আছি। আর তুমি ? „
“ আমিও ভালো আছি। বাবা তোমার জন্য একটা রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি এনেছেন । „ বলে বাবার হাতে ধরে থাকা গিফ্টটা দিয়ে দিল ।
আকাশ বললো “ আমার কাছেও আছে রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি । খেলবে ? „
“ হ্যাঁ আমারও ভালো লাগে রিমোট কন্ট্রোল কার। „
গোধূলির বলা শেষ হতেই আকাশ আর বিপ্লব গোধূলিকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু স্নেহা দেবী বাধা দিয়ে বললেন “ না , এখন আর কোন খেলা নয়। আগে কেক কেটে নাও তারপর খেলো । „
মায়ের কথা মতো আকাশ টেবিলের উপর রাখা কেকের উপর বসানো তিনটে মোমবাতি ফু দিয়ে নিভিয়ে কেক কাটলো। সবাই টেবিলটাকে গোল করে ঘিরে দাড়িয়ে happy birthday to you সুর করে বলে উইশ করলো। কেক কাটার পর আকাশ প্রথম টুকরোটা মাকে খাওয়ালো। তারপর একে একে দিদিমা আর বাবাকে খাওয়ালো ।
কেক কাটার পর সবার হাতে রেস্টুরেন্ট থেকে আনা বিভিন্ন খাবারের প্লেট দেখা গেল। কেক খেয়ে গোধূলি বাদশার সাথে খেলা শুরু করলো। এটা সুচির একদম পছন্দ হলো না। হয়তো বাদশার ও পছন্দ হলো না তাই সে দিদিমা আর আকাশ যে ঘরে ঘুমায় সেই ঘরে ঢুকে নিজের মাথা দিয়ে ঠেলে দরজা ভেরিয়ে দিল ।
এই ফাঁকে সুচি আকাশকে একটা কোনায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “ ওই মেয়েটা কে রে ? „
“ ও তো গোধূলি। ওই যার জন্মদিনে আগের বছর গিয়েছিলাম। „ এবার সুচির মনে পড়লো ‘ এই সেই মেয়েটা যার প্রশংসা আকাশ করছিল। আর সেই জন্য আকাশকে চড় ও মেরেছিল সে। ‚
আকাশের সাথে কথা বলার মাঝেই দিদিমা এসে বললেন “ চল আজকে সবাইকে তোর একটা নাচ দেখা। „
“ এখন ? „
“ এখন নয় তো কখন আবার ? দেখ কতো লোক এসেছে। আর আকাশের আজকে জন্মদিন। একটা নাচ শুধু। „
দিদিমার অনুরোধ সুচি ফেলতে পারলো না। বাবার কিনে দেওয়া ipad চালিয়ে বাড়িতে মাঝে মাঝে নাচের অভ্যাস করে সুচি । সেই iPad নিজের ঘর থেকে এনে সেটা চালালো। সুচি পড়েছিল একটা হলুদ রঙের চুড়িদার আর আর লাল রঙের লেগিংস। সেই ড্রেস পড়েই সুচি নাচলো —

ফাগুনেরও মোহনায়
ফাগুনেরও মোহনায় মন মাতানো মহুয়ায়
রঙ্গীন এ বিহুর নেশা কোন আকাশে নিয়ে যায়
ফাগুনেরও মোহনায়
ফাগুনেরও মোহনায় মন মাতানো মহুয়ায়
রঙ্গীন এ বিহুর নেশা কোন আকাশে নিয়ে যায়
ফাগুনেরও মোহনায়

নাচ শেষ হতেই সবাই হাততালি দিয়ে খুব প্রশংসা করলো। গোধূলি হাততালি দিয়ে বলে উঠলো “ খুব সুন্দর নাচো তুমি। প্লিজ আর একটা গানে নাচো ! „
গোধূলি প্লিজ বললেও সুচি সেটা শুনতে পেলো না। সুচির মনে হলো সে যেন তাকে আদেশ করছে। গা জ্বলে উঠলো গোধূলির কথায়। একেই মেয়েটাকে সহ্য করতে পারছিল না। এখন আবার আদেশ করছে। সুচি কিছু বলার আগেই গোধূলির মা বলে উঠলেন “ আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে এসছে। কালকে তোমার স্কুল আছে না ! এবার বাড়ি চলো। „
স্নেহা দেবী সেটা শুনতে পেয়ে বললেন “ এ মা ! কি বলছেন ! আপনারা তো কিছুই খাননি ! „বলে একটা কবিরাজির প্লেট ধরিয়ে দিলেন হাতে।
গোধূলির মায়ের খাবার সময় সুচি ভাবলো ‘ একটু দুষ্টুমি করলে কেমন হয় ! কি করা যায় ? ‚ কি করা যায় ভাবতে ভাবতে মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। মাথায় বুদ্ধিটা আসতেই ঠোঁটে একটা দুষ্টুমির হাসি খেলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে সে নিচে নেমে গেল। নিচে নেমে সুচি দেখলো আকাশদের জাগুয়ারের পাশেই একটা সাদা BMW দাড়িয়ে আছে। তার দুটো চাকায় সুচি হাত স্পর্শ করলো ।
কিছুক্ষণ পর সঞ্জয়, গোধূলি আর গোধূলির মা চারুলতা নেমে এলো। সঞ্জয় এসে গাড়ির দরজা খোলার সময় দেখতে পেলো ডানদিকের সামনের চাকায় একদম হাওয়া নেই। খুব অবাক হলো সঞ্জয় “ একি ? „
চারুলতা জিজ্ঞাসা করলো “ কি হলো ? „
“ চাকায় হাওয়া নেই। মনে হচ্ছে পাংচার হয়ে গেছে। এখন এক্সট্রা চাকা বার করে লাগাতে হবে। „ তারপর সঞ্জয় গাড়ির ডিকি খুলে আরও একটা চাকা বার করার সময় দেখতে পেলো পিছনের বাম দিকের চাকায়ও একদম হাওয়া নেই । এবার সঞ্জয় বুঝলো এটা কেউ ইচ্ছা করে করেছে । সঞ্জয় এবার চারটে চাকাই চেক করলো। দুটো চাকার হাওয়া কেউ একজন খুলেছে সঙ্গে চেঁচামিচি শুরু করে দিল । প্রথমে আকাশের বাবাকে ফোন করে বললো “ এ কি ধরনের ইয়ার্কি বলুন তো ! „
“ কেন ? কি হয়েছে ? „
“ কি আবার হবে ? কেউ আমার দুটো চাকার ভাল্ব খুলে দিয়েছে । „ আকাশের বাবার সাথে গলার স্বর নিচে নামিয়েই কথা বললো সঞ্জয়। কিন্তু স্বরে ঝাঝ এখনও বর্তমান।
“ কি বলছো ? আমি আসছি । „
“ কি হলো ? „ আকাশের বাবা ফোনটা রাখতেই আকাশের মা জিজ্ঞাসা করলেন ।
“ কেউ একজন সঞ্জয়ের গাড়ির চাকার হাওয়া খুলে দিয়েছে । „ বলে নিচে নেমে এলেন আকাশের বাবা । আকাশের বাবার সাথেই আকাশ , আকাশের মা, , সুচি , সুচির মা ও বাবা , সুমি , জয়শ্রী সবাই নিচে নেমে এলো ।
“ কে এমন করেছে জানতে চাই আমি । এটা কি ভদ্রলোকের পাড়া ? এর শেষ দেখে ছাড়বো আমি। „ সঞ্জয়ের এইসব চেঁচামিচিতে এতক্ষণে আশেপাশের ফ্ল্যাটের সবাই জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে লাগলো। আকাশের বাবা নিচে নামতেই সঞ্জয় বললো “ দেখুন কি অবস্থা ! „
চারুলতা স্বামীকে বললো “ আহা একটু শান্ত হও। „
আকাশের বাবা গাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। সত্যি সামনের ডানদিকের আর পিছনের বামদিকের চাকার হাওয়া খোলা। এতক্ষনে সুচি দিদিমা আকাশ বাকি সবাই নিচে নেমে এসে জটলা পাকিয়েছে। সুচির মুখে এখনও দুষ্টুমির হাসি।
আকাশের বাবা গাড়ির চাকা দেখার পর কোমরে দুই হাত দিয়ে দাড়িয়ে পড়লেন। সঞ্জয় তো রেগে অগ্নিশর্মা “ আমি পুলিশ ডাকবো। কে এইরকম নিচ ইয়ার্কি মারলো সেটা আমি জানতে চাই । „
পুলিশ ডাকবে শুনেই ভয়ে সুচির বুক শুকিয়ে গেল। হৃদপিণ্ড টা আরও দ্রুত চলতে শুরু করলো। মুখের হাসি মিলিয়ে গেল নিমেষেই।
দিদিমার একটু সন্দেহ হয়েছিল এটা সুচি করেছে। এখন সুচির দিকে তাকিয়ে তার মুখে ভয়ের ছাপ দেখে তিনি শিওর হলেন সঞ্জয়ের গাড়ির চাকার হাওয়া সুচিই খুলেছে। তাই তিনি সুচিকে বাঁচানোর জন্য বললেন “ এই রাত দুপুরে পুলিশ আসলে সোসাইটির লোকের অসুবিধা হবে। যে করেছে তার হয়ে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি । „
দিদিমা সুচির জন্য ক্ষমা চাইছেন। শুধু তার এই দুষ্টুমিরর জন্য দিদিমার মাথা নিচু হলো। লজ্জায় ঘৃণায় চোখে জল চলে এলো সুচির । এতোটা কষ্ট কখনো হয়নি সুচির। মা বাবার বকুনিতে , স্কুলে টিচারের বকুনিতেও এতোটা কষ্ট হয়না যতোটা আজ হচ্ছে । নিজের উপর শুধু ঘৃণাই নয় সাথে রাগ হলো খুব। কেন করতে গেল এই কাজ ? এখন খুব অপমান বোধ ও হলো সুচির। মাথা নিচু হয়ে আছে , সেই মাথা আর তোলার ইচ্ছা হচ্ছে না ।
দিদিমার ক্ষমা চাওয়ায় সবাই একটু অবাক হলো। সুচির মা ভাবলেন ‘ সুচি কিছু করেনি তো ! ‚ তারপর চারিদিকে সুচিকে খুজলেন কিন্তু পেলেন না। কারন সুচি দিদিমার অন্যদিকে দাড়িয়ে আছে। তাই দিদিমা সুচিকে দেখতে পেলেও সুচেতা দেবী দেখতে পেলেন না। সুচিকে দেখতে না পেয়ে সুচেতা দেবী আবার ভাবলেন ‘ না, না, আমার মেয়ে এরকম করবে না। মাসিমা হয়তো প্রতিবেশীদের কাছে ছোট হওয়ার ভয়ে ক্ষমা চাইছেন। ‚
দিদিমার ক্ষমা চাওয়ায় সঞ্জয় এবার শান্ত হলো “ না , না , কোন এক ছ্যাঁচড়ার জন্য আপনি ক্ষমা চাইছেন কেন ? „
সঞ্জয়ের কথা শেষ হতেই আকাশের বাবা বললেন “ এতো রাতে কোন গ্যারেজ খোলা থাকবে না। আর আশেপাশে কোন গ্যারেজ নেইও। তুমি আমার গাড়িটা নিয়ে যাও । „
এছাড়া আর কোন উপায়ও নেই। আকাশের বাবা উপরে উঠে জাগুয়ারের চাবি নিয়ে এসে সঞ্জয় কে দিয়ে দিলেন। সঞ্জয় আর কোন রাস্তা নেই দেখে জাগুয়ারের চাবি নিয়ে নিল। চাবি দেওয়ার সময় আকাশের বাবা বললেন “ কালকে আমি তোমার গাড়ি অফিসে নিয়ে যাবো ওখান থেকেই নিয়ে নিও । „
এতক্ষণ আশেপাশে সবার মুখে একটাই কথা ছিল “ কে এমন করলো ? আগে তো কখনো এরকম হয়নি ! এ কি শুরু হলো রে বাবা ! „ নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ ফিসফিসিয়ে কথা বলার পর যে যার মতো বাড়ি চলে গেল। সুচি বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও ঘুম এলো না। মাথায় শুধু একটাই কথা যেটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে ‘ আজ তার এই দুষ্টুমির জন্য দিদিমাকে ক্ষমা চাইতে হলো। ‚ শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়লো সুচি। যখন উঠলো তখন মাথা ভারি।
স্কুলে গিয়ে পড়ায় মন বসলো না। নিজেকে এখনও ক্ষমা করতে পারেনি সে। বারবার তার মাথায় শুধু এটাই ঘুরছে যে ‘ তার জন্যেই দিদিমাকে ক্ষমা চাইতে হলো। ‚ সারাদিন গোমড়া মুখেই কাটালো সে।
স্কুল থেকে ফিরে নিজের ঘরে না গিয়ে স্কুল ড্রেস পড়া অবস্থাতেই সোজা দিদিমার ঘরে গিয়ে বসলো সুচি। দিদিমা ভাতঘুম দিয়েছিলেন। এই সবে উঠে বসেছেন । ঠিক তখনই সুচি এলো। সুচির মুখ দেখেই দিদিমা বুঝলেন সুচি কাল রাতের ঘটনার জন্য এখনও লজ্জিত। তাই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন “ সঞ্জয়ের গাড়ির চাকার হাওয়া…..
দিদিমাকে আর বলতে দিল না সুচি। কথা শেষ হওয়ার আগেই সুচি ফুপিয়ে কেঁদে উঠে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরলো “ কাল তুমি ক্ষমা চাইলে কেন ? „ সুচির চোখের জলে দিদিমার বুকের শাড়ি ভিজতে শুরু করে দিল ।
“ সঞ্জয় যে পুলিশ ডাকতো। তখন কি হতো বলতো ? „ সুচি কিছু বললো না। উত্তর না দিয়ে সুচি দিদিমাকে আরও ভালোভাবে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। “ তোর কিছু হতে দিতে পারি আমি বল ! তোকে আমি যে খুব ভালোবাসি । „
কিছুক্ষণ সুচির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন দিদিমা । তারপর সুচির কান্না কিছুটা কমলে দিদিমা বললেন “ আর কখনো এরকম কাজ করবি ? „
কান্নার জন্য দম বন্ধ হয়ে আসছিল সুচির। বড়ো বড়ো নিশ্বাস নিতে নিতে চোখের জল ফেলে বললো “ আর কখনো এরকম করবো না দিম্মা । এমন কিছুই করবো না যাতে তোমাকে ক্ষমা চাইতে হয় । তোমাদের মাথা নিচু হয় এরকম আর কোন কাজ করবো দিম্মা । „
“ আর কাউকে মারবি বল ? „
“ আর কাউকে মারবো না। কখনো না । „ ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো সুচি । সুচির চোখের জলে দিদিমার বুকের শাড়ি ভিজে গেছে ।
“ আমার সোনা মেয়ে। „ বলে সুচির মাথার ঘন চুলের উপরেই একটা চুমু খেয়ে মুখটা তুলে চোখের জল মুছিয়ে দিলেন “ বোকা মেয়ে কাঁদছে দেখো। আর কাঁদে না। একদম না। „ তারপর কিছুক্ষণ সুচির পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে সুচির মাথায় নিজের থুতনি রেখে দিদিমা আরও, বললেন “ বড়ো হয়েছিস তুই। এখন আর তুই আমার সেই ছোট্ট সুচি নেই। আর কোন দুষ্টুমি করিস না। দুষ্টুমি করার বয়স পেরিয়ে গেছে তোর। মা বাবার খেয়াল রাখ । নিজের যত্ন নে। এইসব দুষ্টুমি ছেড়ে এবার পড়াশোনায় মন দে। …….
দিদিমার কথায় সুচি কান্না থামালো । দিদিমাকে জড়িয়ে ধরেই মনে মনে প্রতিঙ্গা করলো ‘ আর কখনো এমন কাজ করবো না যার জন্য তোমাদের ক্ষমা চাইতে হয়। ‚
কয়েক দিন ধরেই সবাই লক্ষ্য করছে বাদশা আগের থেকেও বেশি শান্ত হয়ে গেছে। সারাদিন চুপচাপ একটা জায়গায় শুয়ে থাকে। আগের মতো খায় না আর। বাদশার অবস্থা দেখে সুচি নিজের মন শক্ত করতে শুরু করলো।
একদিন সকালবেলা উঠে যে যার নিত্যদিনের কাজ করতে লাগলো। স্নেহা দেবী সকালের ব্রেকফাস্ট বানাতে লেগে গেলেন। আকাশের বাবা স্নানে চলে গেছেন। আকাশ সকাল সকাল উঠে টিভি দেখতে বসে গেছে। দিদিমা বাসি বিছানা গুছিয়ে এসে আকাশকে বললেন “ সকাল সকাল তুই টিভি দেখতে বসে গেলি ? মা বকবে কিন্তু ! পড়তে বস গিয়ে। „
দিদিমার কথায় আকাশ পড়তে বসলো। কিছুক্ষণ পর রোদ প্রখর হয়ে উঠলে দিদিমা আকাশকে নিয়ে তার দুটো আচারের বয়াম গুলো ছাদে শুকোতে নিয়ে গেলেন। কাচের বয়াম গুলো অবশ্য আকাশ নিয়ে গেল। সুচি আচার খাওয়ার ওস্তাদ বলা যায়। নিমেষেই একটা বড়ো জামবাটি খালি করে দেয়। দিদিমা সুচির জন্যেই সারা বছরে কোন না কোন আচার বানান।
ছাদের একটা কোনায় বয়াম গুলো রাখার সময় আকাশের খেয়াল হলো — আজকে বাদশা তো উপরে এলো না।
বয়াম রাখার পর দিদিমা আর আকাশ নিচে নেমে গেল। নিজেদের ফ্ল্যাটে ঢুকে “ বাদশা বাদশা „ বলে ডাকতে ডাকতে লিভিংরুমে যেখানে বাদশা ঘুমায় সেখানে চলে গেল। আকাশ কিন্তু বাদশার কোন সাড়াশব্দ পেলো না ।
বাদশার জন্য একটা বড়ো বাস্কেটে একটা তোয়ালে বিছিয়ে রেখে ঘুমানোর উপযুক্ত বানানো হয়েছে। বাদশা সেখানেই ঘুমিয়ে আছে।
বাদশার কাছে গিয়ে আকাশ দেখলো বাদশার মুখ খোলা আর মুখের ভিতর কয়েকটা পিঁপড়ে। সঙ্গে সঙ্গে এক দৌড়ে দিদিমার কাছে গিয়ে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে দিল। স্নেহা দেবী ছেলের কান্না দেখে জিজ্ঞাসা করলেন “ কাঁদছিস কেন ? „
আকাশ কিছু বললো না কাঁদতে কাঁদতে শুধু আঙুল দিয়ে বাদশার দিকে দেখিয়ে দিল । স্নেহা দেবী সেখানে গিয়ে দেখলেন বাদশার শরীর পড়ে আছে। প্রান নেই সেই শরীরে। বাদশার মৃত দেহ দেখে স্নেহা দেবীর মনটা ভারী হয়ে এলো। কম করে হলেও এগারো বছর বাদশা এই পরিবারের এক সদস্য ছিল।
আকাশের বাবা বাথরুম থেকে বেরিয়ে তোয়ালে দিয়ে মাথার ভেজা চুল মুছতে মুছতে বাদশাকে দেখলেন। কিছুক্ষণ পর সুচি এলো। ঘরে ঢুকতেই বুঝলো কিছু একটা হয়েছে। মন কু ডাক ডাকলো। বাদশার কাছে গিয়ে দেখলো বাদশার মৃত শরীর । সুচি কাঁদলো না। এরকম হবে সেটা আন্দাজ করেছিল। তাই মন শক্ত করতে শুরু করে দিয়েছিল আগে থেকেই।
কিছুক্ষণ বাদশার সোনালী দেহটার দিকে তাকিয়ে থেকে মুখের ভিতর পিঁপড়ে গুলো সরিয়ে দিতে লাগলো। বাদশার শরীরে পিঁপড়ে দেখে তার ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল।
সুচির তখন চার বছর বয়স। তখনও সে তোতলায়। আকাশ সবে হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করেছে। সকালে আকাশের সাথে খেলা করার পর সুচি বাদশাকে নিয়ে নিচে পার্কে চলে যেত খেলতে। তেমনি একদিন সুচি আর জয়শ্রী মাটি দিয়ে বানানো বিভিন্ন বাসনপত্র নিয়ে রান্নাঘর খেলছিল পার্কের মধ্যে। বিভিন্ন পাতা কুচি কুচি করে শাকসব্জি বানিয়ে ছিল। বাদশার তার ছোট শরীর নিয়ে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে ডাকতে এদিক এদিক দৌড়োচ্ছিল ।
হঠাৎ একটা ফড়িং দেখতে পেয়ে সেটাকেই তাড়া করলো বাদশা । কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ফড়িং টাকে তাড়া করার পর বাদশার পা গিয়ে পড়লো পিঁপড়ের ঢিবির উপর । সঙ্গে সঙ্গে লাল পিঁপড়ে ছেকে ধরলো বাদশার পা। অজস্র কামড়ের জ্বালায় ঘেউ ঘেউ ডাক আরও বেড়ে গেল , আর স্বরটা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো ।
সুচি আর জয়শ্রী এগিয়ে এসে বাদশার পা থেকে পিঁপড়ে গুলো সরিয়ে ফেলে দিতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর সুচি বাদশাকে বললো “ লাল পিপলে দুষ্তু হয়। কালো পিপলে ভালো হয়। লাল পিপলেল কাছে যাবি না , ওলা সুধু কামলায় । „ সুচির কথা বাদশা বোঝে নি। কিন্তু পিঁপড়ের জ্বালা থেকে মুক্তি পেয়ে বাদশা সুচির ছোট সুন্দর কোমল মুখটা চেটে দিল।
এই ঘটনা মনে পড়তেই সুচির চোখ ঝাপসা হয়ে উঠলো। সাথে আরো অজস্র ঘটনা মনে পড়তেই কেঁদে ফেললো সুচি।
আকাশের বাবা অর্ধেক দিনের ছুটি নিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন বাদশাকে কোন একটা খালে গিয়ে ফেলে আসবেন কিন্তু সেটা করলে সুচি আকাশ দুজনেই দুঃখ পাবে। তাই তিনি বাচ্চাদের পার্কের একটা কোনায় বাদশাকে কবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
দুপুরে স্নান খাওয়ার আগে সুচি আকাশ আর আকাশের বাবা পার্কের একটা কোনায় বাদশাকে কবর দিয়ে দিল। সুচি আর আকাশ কবরের উপরে একটা গোলাপ চারা লাগিয়ে দিল। এই চারা একদিন বড়ো হয়ে গাছ হবে। সেই গাছে ফুটবে সুন্দর সুন্দর গোলাপ ফুল। ভালোবাসার প্রতীক এই গোলাপ ফুল।

(৫)
অফিস থেকে ফিরে , অফিস ব্যাগটা স্ত্রীর হাতে দিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেলেন সুচির বাবা । সুচির বাবাকে একটু বেশি গম্ভীর আর চিন্তিত মনে হলো সুচির মার । তিনি ভাবলেন ‘ কিছু একটা চিন্তা করছেন মনে হয়। ‚
বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতেই মাথায় আইডিয়া টা এলো। সিড়ি ভেঙে উপরে ওঠার সময় তিনি ভাব ছিলেন কি করা যায় ? এখন আইডিয়া টা মাথায় এলো । ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে খবরের চ্যানেল চালিয়ে দিলেন তিনি। রোজকার অভ্যাসের মতো সুচেতা দেবী এক কাপ গরম চা আর কয়েকটা বিস্কুট স্বামীর সামনে টেবিলে রাখলেন “ কি ভাবছো এতো ? „
“ তোমার আদরের ছোট মেয়ে আসুক। তারপর বলছি । „ খুব গম্ভীর কিন্তু শান্ত স্বরে বললেন সুচির বাবা।
সুচেতা দেবী স্বামীকে এতোটা গম্ভীর খুব কম দেখেছেন । তাই তিনি আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। কিন্তু সুচি কি করলো সেটাই তিনি ভাবতে শুরু করলেন — কই ! তেমন কিছুই তো হয়নি আজ। সকালে উঠে পড়তে বসে গিয়েছিল। তারপর খেয়েদেয়ে আকাশের সাথে স্কুলে গেল ‘ স্কুলে কিছু করলো না তা আবার ! ‚ কই স্কুল থেকে ফিরে সুচির মুখ দেখে তো তেমন কিছু মনে হয়নি। তাহলে কি করলো মেয়েটা ?
সুচির বাবার চা খাওয়া শেষ হওয়ার ঠিক বার মিনিট পর সুচি ঘরে ঢুকলো । “ কোথায় গিয়েছিলে ? „ ঘরে ঢুকতেই সুচির বাবা ভারী গলায় প্রশ্ন করলেন ।
বাবাকে এতোটা গম্ভীর খুব কম দেখেছে সুচি। তার উপর তুমি করে খুব কম ডাকেন বাবা। কোন বড়ো কিছু না হলে তুমি করে বলেন না। এ যেন আপন কে পর করে দেওয়ার একটা পন্থা। তাই একটু ভয় পেয়ে সে বললো “ আকাশের সাথে দোকানে গিয়েছিলাম। „
“ পড়াশোনার নাম নেই , সারাদিন শুধু এর ওর গায় হাত তোলো তুমি । „ ঝাঁঝিয়ে উঠলেন সুচির বাবা। তারপর একটু শান্ত হয়ে আবার বললেন “ ব্যাগ বইপত্র গুছিয়ে নাও। কালকে আমি সৌরভের সাথে কথা বলবো। তুমি হোস্টেল থেকেই মাধ্যমিক দেবে। „
সৌরভ হলো সুচির বাবার অফিস কলিগ। দুজনেই সমবয়সী বলা যায়। সৌরভের মেয়ে শিল্পী দার্জিলিংয়ের এক হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে । এই খবরটা সুচি জানে। বাবা মাকে ছেড়ে অতদূরে থেকে পড়াশোনা করে এই খবরটা সুচির বাবা একবার বলেছিলেন।
বাবা তাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেবে কথাটা শুনেই যেন সুচির পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। মাথা আর কাজ করছে না । মা বাবা দিদি দিম্মা আকাশ কে ছেড়ে দূরে থাকতে হবে ভেবেই ডুকরে কেঁদে উঠলো। চোখের জল যেন ঠিক বর্ষার বৃষ্টিতে প্লাবিত নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়া জলের মতো বেরিয়ে এলো । বাবার পায়ে হুমড়ি খেয়ে পরে বাবার পা জড়িয়ে ধরে বললো “ বাবা আমি পারবো না তোমাদের ছেড়ে , আমি অতদূরে তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারবো না । „ কথাগুলো বলতে বলতে দমবন্ধ হয়ে আসছে সুচির “ বাবা প্লিজ এমন করো না। আমাকে তোমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিও না। „
মেয়েকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেবে শুনে সুচেতা দেবীর বুকটাও যেন খালি হয়ে গেল। চোখের কোনায় জল এসে চিকচিক করে উঠলো “ ও কি এমন করলো যে তুমি ওকে হোস্টেল পাঠিয়ে দিচ্ছো ? „
সমরেশ বাবু স্ত্রী আর মেয়ের চোখের জল দেখতে পারলেন না। তার বুকটাও কেঁদে উঠলো। কিন্তু তিনি এই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে চান। তাই স্ত্রী আর মেয়ের কথার উত্তর না দিয়ে সোফা থেকে উঠে , নিজের পা সুচির হাত থেকে ছাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
সুচি আর একবার “ বাবা আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারবো না। „ বলে বাবার পা ধরার চেষ্টা করলো। কিন্তু পা ধরার আগেই সমরেশ বাবু ঘরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। ঘরে ঢোকার সময় আর একবার সুচিকে উদ্দেশ্যে করে বললেন “ ক্লাস টেন হোস্টেল থেকেই পড়বে তুমি। „
আজ অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় প্রতিদিনের মতোই বাস ধরেছিলেন সুচির বাবা । কিন্তু ভাগ্য ভালো থাকায় উইন্ডো সিট পেয়ে গেছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই তিনি বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আসছিলেন। বাস থেকে নামার কিছু আগে তিনি বাসের জানালা দিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন একটা মুদিখানার দোকানে তার ছোট মেয়ে আর আকাশ দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই তিনি দেখতে পেলেন সুচি আকাশকে একটা চড় মারলো।
এই ঘটনায় তিনি রেগে গেলেন এবং এর বিরুদ্ধে কি করা যায় সেটাই তিনি ভাবছিলেন । সুচি যে আকাশকে মারে এটা তিনি শুনেছেন। আজ স্বচক্ষে দেখলেন। আকাশ হলো শুভাশীষ বাবুর একমাত্র ছেলে। যদি কিছু উল্টো পাল্টা হয়ে যায় তখন কি জবাব দেবেন তিনি। তাই বাকি রাস্তা টুকু আসার সময় তিনি এটাই ভাবছিলেন যে কি করা যায় ?
বাবা ঘরে ঢুকে গেলে সুচি মায়ের বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরলো। ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বললো “ মা তুমি বাবাকে বলো না আমি থাকতে পারবো না। তোমাদের ছেড়ে কখনো থাকিনি। আমার খুব কষ্ট হবে মা। আমি পারবো না। „
“ বারবার বলেছি পড়াশোনায় মন দে। আর দুষ্টুমি করিস না। নে এখন হলো তো ! „ বেশ রাগী স্বরে বললেন সুচেতা দেবী।
“ মা প্লিজ তুমি বাবাকে বলো আমি তোমাদের ছেড়ে একা থাকতে পারবো না । „ সুচির দুই গাল বেয়ে এখনও চোখের জল ঝরে পড়ছে।
সুচেতা দেবী এবার একটু শান্ত হয়ে সুচির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন “ চিন্তা করিস না । তোকে কোথাও যেতে দেবো না আমি । „
কিছুক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার পর সুচেতা দেবী চলে গেলেন রাতের খাবার গরম করতে। মা চলে যেতে সুচি সোফায় এসে বসলো । সুচির বাবা খবর দেখছিলেন। সুচির সামনে টিভিতে এখন খবরের চ্যানেল চলছে। কোন এক নাম না জানা মহিলা খবর বলছে কিন্তু টিভির পর্দায় তার মন নেই। হঠাৎ আসা এই দুঃখ এখন অনেকটা সয়ে এসছে। চোখের জল এখন শুকিয়ে এসছে। মনে মনে সে বললো ‘ না সে যাবে না। কখনোই যাবে না মা , দিদি , বাবা , আকাশ দিম্মাকে ছেড়ে। ‚
দিম্মার কথা মাথায় আসতেই রিমোটের বোতাম টিপে টিভি বন্ধ করে দিয়ে সে সোজা চলে এলো আকাশের ফ্ল্যাটে। আকাশের বাবা এখনও অফিস থেকে ফেরেন নি।
ফ্ল্যাটে ঢুকে সুচি দেখলো দিম্মা আর আকাশের মা সোফায় বসে টিভিতে বাংলা ঘরোয়া ধারাবাহিক দেখছেন। আকাশ তখন নিজের ঘরে পড়ছে। সুচি গিয়ে দিদিমার পাশে গিয়ে বসে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরলো। দিদিমা ধারাবাহিক দেখার মাঝেই সুচিকে পরম আদরে নিজের কাছে টেনে নিলেন।
প্রায় তিন চার মিনিট পর দিদিমা খেয়াল করলেন সুচির চোখ দিয়ে জল পড়ে যাচ্ছে “ এমা তুই কাঁদছিস ? „ মায়ের কথায় স্নেহা দেবী সুচির মুখ দেখলেন। সত্যি সুচি চুপচাপ কেঁদে যাচ্ছে। কোন শব্দ হচ্ছে না।
“ বাবাকে আমাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিচ্ছে । „
“ কেন ? কি হলো হঠাৎ ? „ মা মেয়ে যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তাই দুজনেই একসাথে প্রশ্নটা করলেন।
“ আমি জানি না। আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারবো না দিম্মা । „ বলতে বলতে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো সুচি।
“ কাঁদিস না । „ বলে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললেন “ কি এমন করেছিস তুই যার জন্য তোকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিচ্ছে ? „
“ আমি জানি না দিম্মা । তুমি বাবাকে বলো না। তোমার কথা নিশ্চয়ই শুনবে। আমি তোমাদের ছেড়ে একা থাকতে পারবো না । „
“ ঠিক আছে আমি বলবোখন । এখন তোর বাবা অফিস থেকে ফিরেছে। নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত। কাল সকালে বলবো। „ বলে সুচিকে আরো কাছে টেনে নিলেন।
রাতে সুচি খেতে এলো না। চুপচাপ খাটে শুয়ে রইলো। রাতের খাওয়া খেয়ে সুমি ঘরে এসে মশারি টাঙিয়ে সুচির পাশে এসে শুলো। কিছুক্ষণ পর সুমি বললো “ খেলি না কেন ? খাবারের উপর রাগ করতে আছে ! „
চোখের জল শুকিয়ে এসছে সুচির। দুঃখটাও অনেক সয়ে এসছে। সুচির বিশ্বাস দিম্মা নিশ্চয়ই পারবে বাবাকে রাজি করাতে । মা বাবাকে রাজি করাতে পারবে না মনে হয় ! “ দি তুই বল না বাবাকে। আমি তোদের ছেড়ে কি করে থাকবো বল ! „ বলে সুমিকে জড়িয়ে ধরলো ।
“ আচ্ছা আমি বাবাকে বলবোকন। খাওয়ার সময় দেখলাম বাবা রেগে আছে। সময় হলে বলবো । „
ওদিকে খাটে শুয়ে সুচেতা দেবী বললেন “ ও পারবে না । হোস্টেলে শুনেছি সবকিছু নিজেকেই করে নিতে হয়। কখনো রান্না ঘরে ঢোকেনি ও। কিভাবে থাকবে একা ! „
“ পনেরো বছর বয়স হয়ে গেছে। নাইনে পড়ে। এখন না শিখলে কবে শিখবে ও। এখন আর ছোট নেই। এটাতো ওকেও বুঝতে হবে। এই নিয়ে আর কোন কথা বলতে চাই না । „ কথাটা বলে পাশ ফিরে শুলেন সুচির বাবা।
সুচি মনে করছে সে পড়াশোনা মন দিয়ে করে না তাই বাবা তাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কিছুদিন শান্ত হয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করলে বাবান মন বদলাতে পারে। তাই সে সকালবেলা উঠে সাড়ে ছটার মধ্যে সকালের টিউশনে চলে গেল। সাতটা থেকে নটা টিউশন তারপর স্কুল।
সুমি আর সুচি আর প্রাইমারি স্কুলে পড়ে না। তাই ভোরবেলা উঠে স্কুলে দিয়ে আসার চিন্তা নেই। এখন সুচির বাবা সাতটার দিকে ঘুম থেকে উঠে , ব্রেকফাস্ট করে , স্নান করে সাড়ে নটার মধ্যে অফিস যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়েন।
ঠিক আটটার সময় এলেন দিদিমা। সমরেশ বাবু তখন স্নান সেরে অফিসের জামা কাপড় পড়ে ব্রেকফাস্টের জন্য টেবিলে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। দিদিমা ঘরে ঢুকে বললেন “ আসতে পারি ? „
“ আরে মাসিমা আপনি অনুমতি চাইছেন কেন। এটা তো আপনাদেরই ঘর। „ সুচির বাবা টেবিল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন কথাটা।
মাসিমাকে দেখে সুচির মা বুঝতে পারলেন ‘ সুচিই মাসিমাকে এখানে এসে কথা বলতে বলেছে । ‚ মনে মনে মেয়েকে প্রশংসা করলেন তিনি ‘ আমাদের কথা না শুনলেও মাসিমার কথা নিশ্চয়ই শুনবে। ‚
দিদিমা একটু হেসে সুচির বাবার সামনের টেবিলে বসলেন “ কাল রাতে সুচি কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে এসছিল । „
সুচি কাঁদছিল শুনে সমরেশ বাবু খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে তাকালেন। সুচির বাবা বুঝলেন দিদিমা কেন এই সাতসকালে এখানে এসছেন । সুচির বাবাকে চুপ থাকতে দেখে দিদিমা আরও বললেন “ সুচি শুধু বারবার একটাই কথা বলছিল ‘ ও আমাদের ছেড়ে থাকতে পারবে না। ‚ কথাটা বলে একটু থেমে দিদিমা আরও বললেন “ হ্যাঁ মানছি সুচি সুমির মতো পড়াশোনায় ভালো না…..
“ পড়াশোনার জন্য নয় মাসিমা। আমি জানি সবাই এক হয় না। এক বুদ্ধি নিয়ে জন্মায় না। আর আমি চাইও না সুচি সুমির মতোই ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করুক ….
“ তাহলে তুমি ওকে হোস্টেলে পাঠাচ্ছো কেন ? „ সুচির বাবার কথার মাঝখানেই জিজ্ঞাসা করলেন দিদিমা।
“ ও এর ওর গায় হাত তোলে…..
“ কই ! এখন তো আর কাউকে মারে না ! „ আবার সুচির বাবাকে কথা শেষ করতে দেওয়ার আগেই বলে উঠলেন দিদিমা।
“ কালকেই আমি আকাশের গায় হাত তুলতে দেখেছি । যদি উল্টো পাল্টা কিছু একটা হয়ে যায় তখন……
“ দেখো আকাশ সুচির থেকে ছোট । তাই একটু শাসন করে। তুমি এই ছোট একটা বিষয় নিয়ে ওকে দূরে পাঠিয়ে দিও না। মায়ের কোল খালি কোরো না। „ শেষ কথাটা বলতে গিয়ে দিদিমার গলার স্বর কেঁপে উঠল। কোল খালি হয়ে যাবে শুনে রান্নাঘরে থাকা সুচেতা দেবীর চোখেও জল চলে এলো। তিনি এতক্ষণ চুপচাপ তার স্বামী আর মাসিমার কথা শুনছিলেন।
সুচির বাবা চুপ করে রইলেন। কি বলবেন তিনি ? একা কতক্ষণ বলা যায় ! তার স্ত্রী , বড়ো মেয়ে তো আগেই বারন করছিল এখন মাসিমাও এদের দলে যোগ দিলেন। সুচির বাবাকে চুপ থাকতে দেখে দিদিমা বললেন “ সুচি বড়ো হচ্ছে। এখনও মনটা কোমল আছে। এখন যদি তুমি ওকে দূরে পাঠিয়ে দাও তাহলে তোমাদের বিরুদ্ধে ওর মন ঘুরে যেতে পারে। ওকে দূরে পাঠিয়ো না। আগের মতো সুচি এখন কাউকে মারেও না। একটু একটু করে বুঝতে শিখছে। ওকে সময় দাও । ও ঠিক বুঝবে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল….
দিদিমা আরও কিছু কথা বলে সুচির মায়ের হাতে এক কাপ গরম চা খেয়ে চলে গেলেন। আজকে সমরেশ বাবু একটু বেশি তাড়াতাড়ি অফিস চলে গেলেন। সুচেতা দেবী ভাবলেন হয়তো সুচির বাবা রেগে আছেন ।
সুচি টিউশন থেকে ফিরে নিজের ঘরে না গিয়ে সোজা দিদিমার কাছে চলে গেল। কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়েই দিদিমাকে জড়িয়ে ধরলো। দিদিমা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন “ তোর বাবাকে বলেছি। আর পাঠাবে না। এখন স্কুলে যা । আর শোন কিছুদিন শান্ত মেয়ে হয়ে থাকে। „ সুচি দিদিমার গালে একটা চুমু খেয়ে চলে গেল। সকালের খাওয়া খেয়ে আকাশের সাথে স্কুলে চলে গেল।
পরের বছর আকাশ উঠলো সপ্তম শ্রেণীতে আর সুচি উঠলো দশম শ্রেনীতে। সুচির উচ্চতা আর না বাড়লেও আকাশের বেড়েছে। আকাশ এখন 5’2 ফুটের। আর এখনই ওর মুখ বাবার মতোই চওড়া হতে শুরু করেছে।
প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান হয় । শনিবার আর রবিবার দুই দিন ধরে হবে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেইমতো স্কুলের খেলার মাঠে বানানো হলো মঞ্চ। শনিবার হাফডে ক্লাস হওয়ার পর সবাই চলে গেল অনুষ্ঠানে। বড়ো ক্লাস মানে অষ্টম থেকে দশম শ্রেনীর ছাত্র ছাত্রীরা পিছনের দিকে বসেছে। আর বাচ্চারা সামনে। আকাশ সপ্তম শ্রেনীতে পড়ে তাই সে সামনের দিকে বসতে যাচ্ছিল। বসার আগেই আকাশ শুনলো কেউ একজন ‘ আকাশ। এই আকাশ ‚ বলে পিছন দিক থেকে ডাকছে। পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো সুচি হাত নেড়ে ওকেই ডাকছে। আকাশ পিছনের সারিতে যেতে সুচি পাশের খালি চেয়ারটা দেখিয়ে বললো “ এখানে বস । „
আকাশ সুচির পাশে বসলো। আশেপাশে সব উঁচু ক্লাসের দিদি দাদারা বসে আছে। তাদের মাঝে একা আকাশ। কিছুক্ষণ পর শুরু হলো হেডমাস্টার জগদীশ ঘোষের উদ্বোধন বক্তৃতা। পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই সবার মাথা যন্ত্রনা শুরু হয়ে গেল । আকাশ সুচির মুখের দিকে তাকালো। দুজনেরই একই অবস্থা।
দশ মিনিটে সবাই চেয়ারে বসেই নড়েচড়ে উঠতে লাগলো। কুড়ি মিনিট অতিক্রম করতেই সবার মনে হলো দুই ঘন্টা ধরে স্যার বলছেন। আর সেইসাথে সবার চোখে ঘুম চলে এলো । নিদ্রা দেবী যেন পৃথিবীর সব নিদ্রা এই স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের চোখে দিয়ে দিয়েছেন।
স্কুলের ছাত্রছাত্রী শুধু নয় সাথে স্যার ম্যামদের মুখেও বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। আকাশ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো কয়েকজন ঘুমিয়ে পড়েছে। আর সুচি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো উপর ক্লাসের কয়েকজন ছাত্র আসতে আসতে কেটে পড়ছে। সেটা দেখে সুচি আকাশের কাঁধে ঠেলা দিয়ে বললো “ চল কেটে পড়ি। „
আকাশ ঘুমিয়ে পড়ার আগের অবস্থায় পৌঁছে গেছিল। সুচির ধাক্কায় আকাশের ঘোর কেটে গেল “ তোর নাচ আছে না ! „
“ আমার নাচ কালকে আছে । এখন চল । „
“ হ্যাঁ চল। „ আকাশ বললো “ একবার যদি ঘুমাই তাহলে কয় বছর ঘুম ভাঙবে জানিনা । „
সুচি আকাশের কথা শুনে ফিক করে হেসে উঠলো। তারপর দুজনেই স্কুল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাটা দিল। রাস্তায় আসতে আসতে আকাশ বললো “ যদি জেঠিমা জিজ্ঞাসা করে তাহলে কি বলবি ? „
“ বলবো আজকে তো কিছু হবে না। স্যার ম্যাম শুধু বক্তৃতা দেবে আর বাচ্চারা আবৃত্তি করবে, তাই চলে এসছি। কাকি জিজ্ঞাসা করলে তুইও এটাই বলবি। „
কিছুক্ষণ পর আকাশ বললো “ সবাই তো স্কুলে ! এখন বাড়ি গিয়ে কি করবো ? „
সুচি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো “ সিনেমা দেখতে যাবি ?
“ সিনেমা ! „ অনেক দিন হলো আকাশ সিনেমা হলে যাইনি। তাই সিনেমা দেখতে যাবে শুনেই চোখটা খুশিতে বড়ো হয়ে উঠলো।
“ হ্যাঁ। শোন। তুই বাড়ি গিয়ে ব্যাগটা রেখে একটা জামা গায় চাপিয়ে চলে আসবি। „
“ আর টাকা ? „
“ দিদিমার কাছ থেকে নিবি । „
সুচির কথা মতো চুপিচুপি নিজের ঘরে ঢুকে জামা পাল্টে দিদিমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিল। টাকা নেওয়ার সময় দিদিমা জিজ্ঞাসা করলেন “ কি করবি এতো টাকা ? „
“ সিনেমা দেখতে যাবো। „ দিদিমাকে সত্য বললে কোন ভয় নেই। তাই সে সত্যিটাই বলে দিল।
“ সিনেমা ? কার সাথে দেখতে যাবি ? „
“ সুচির সাথে । „
সুচির নাম শুনে দিদিমা টাকা দিয়ে দিলেন। সিনেমা দেখে সুচি আর আকাশ যখন ফিরলো তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসছে। তাই কেউ বুঝতে পারলো না এরা কোথায় গেছিল।
পরের দিন স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে সুচি নাচলো। হাততালির ঝড় উঠলো দর্শকদের মধ্যে । দর্শকদের মধ্যে দুজন ছেলে দাড়িয়ে সুচির নাচ দেখছিল। দুজনের বয়স সতেরো আঠারো হবে। ওই দুজনের মধ্যে একজন পাশেরজনের উদ্দেশ্যে বললো “ খুব ভালো নাচে। আমাদের ওখানেই শেখে। „
পাশেরজন বললো “ খুব সুন্দর দেখতে । একদম নায়িকাদের মতো ফিগার । „
সেদিন রাতেই আকাশের মামি ফোন করলো । এই দুই তিন বছর হলো আকাশের মামি তিলোত্তমা নিয়মিত ফোন করে খোঁজখবর নেয়। আকাশের মামা তেমন একটা ফোন করেন না। কাজে খুব ব্যাস্ত। তিলোত্তমা যে প্রেগন্যান্ট এটা দিদিমা জানতেন। এবং সুখবরের জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। আজকে আকাশের মামি ফোন করে বললো “ ছেলে হয়েছে । অজয় নাম রেখেছি। „
কথাটা শুনে দিদিমার চোখে জল চলে এলো “ বা্ঃ খুব সুন্দর নাম। বলছি , এখানে আয় না তোরা একদিন । „
“ আমি তো বারবার বলি ‘ চলো না ওখানে । কতদিন দেখিনি সবাইকে । সেই বিয়ের সময় দেখেছিলাম। ‚ ও বলে ‘ কাজে খুব ব্যাস্ত। একটু খালি হলেই যাবো। ‚ নাও ওর সাথেই কথা বলো। „ বলে আকাশের মামার কাছে ফোনটা দিয়ে দিলো তিলোত্তমা ।
“ হ্যালো । „
“ হ্যালো। এখানে আয় না তোরা। তোদের খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। „ কথাটায় কতোটা আবেগ ভালোবাসা মিশে ছিল সেটা ফোনের ও প্রান্তে থাকা আকাশের মামা বুঝতে পারলো না।
“ আচ্ছা ঠিক আছে। এবার পূজার সময় যাবো। এখন রাখছি । „ বলে ফোনটা কেটে দিল । কিছুক্ষণ পর আকাশের বাবার স্ক্রিনটাচ ফোনে আকাশের মামা বেবির একটা ফটো পাঠিয়ে দিল। ফটোটা দেখে দিদিমার চোখে জল আর মুখে হাসি দেখা দিল “ একদম স্নেহুর মতো হয়েছে । „
দুই দিন পর বিকালে ভাত ঘুম থেকে উঠে দিদিমা ছাদে এলেন। এখন আর আগের মতো তিনটে সিড়ি ভেঙে নিচে নেমে হাওয়া খাওয়া যায় না। তার জায়গায় একটা সিড়ি ভেঙে উপরে ছাদে এসেই হাওয়া খান দিদিমা। বুড়ো বয়সে যা সমস্যা হয় তাই আর কি। বাতের সমস্যা তো আছেই। সুগারটাও ওঠানামা করছে। ডাক্তার হাঁটতে বলেছেন। কিন্তু হাঁটতে গেলেই তো বাতের ব্যাথা চাগান দেয়।
ছাদে এসে দিদিমা দেখলেন ছাদের রেলিং ধরে , পিঠে লম্বা চুল ছড়িয়ে সুচি দাঁড়িয়ে আছে। সুচির চুল আর একটু হলে কোমর স্পর্শ করবে। দিদিমা সুচির চুল দেখতে দেখতে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। সুচিকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তিনি দেখলেন যে সুচি তার অস্তিত্ব এখনও খেয়ালই করেনি। সুচি একমনে নিচে মাঠে তাকিয়ে আছে। দিদিমা দেখলেন সোসাইটির মাঠে বারো তেরো বছরের ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে , সুচি একমনে তাদের খেলাই দেখছে । আর সুচি তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশ এখন ফিল্ডিং করছে।
তিনি আর কিছু বললেন না। চুপচাপ সুচিকে দেখতে লাগলেন। তিনি দেখলেন সুচির মুখের হাবভাব খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
দিদিমা এবার আরও ভালো করে খেয়াল করলেন। খেলার মাঠে যে ব্যাট করছে সে একটা শট মারলো । বলটা একবার ড্রপ খেয়ে সোজা আকাশের হাতের তালুতে এসে বন্দী হলো। আর সেই সাথে সুচির ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক মিষ্টি আনন্দের রেখা। সুচি হাসছে। সুচির হাসি দেখে দিদিমার মুখেও হাসি ফুটে উঠলো।
পরের বলটা আকাশের দশ হাত দুর থেকে বাউন্ডারির দিকে চলে যাচ্ছিল । আকাশ কিছুটা দৌড়ে ঝাপিয়ে পড়লো বলটা উপর। কিন্তু ততক্ষণে বলটা বাউন্ডারি ক্রশ করে ব্যাটসম্যান কে চার রান দিয়ে দিল। আর দিদিমা দেখলেন সুচির দিকে তাকিয়ে দেখলেন সুচির ভুরু আর নাক কুচকে গেল। মুখে চরম বিরক্তি ফুটে উঠেছে । পরের দুটো বল ব্যাটসম্যান অন্য ফিল্ডারদের কাছে পাঠালো। একটাতে সে দৌড়ে দুই রান নিল আর একটাতে সে চার রান করলো। কিন্তু সুচির মুখে কিছুই ফুটে উঠলো না।
ওভারের আর একটাই বল বাকি। এই ব্যাটসম্যান অনেক রান করেছে। আটকাতে হবে। বলার একটা ফুলটস বল দিল। ব্যাটসম্যান দুই পা এগিয়ে এসে একটা ছয় হাকালো। কিন্তু একি ! বল বাউন্ডারির বাইরে না গিয়ে অনন্ত আকাশে উঠে গেল । আর আমাদের বারো বছরের ক্লাস সেভেনের আকাশ দুই হাতের তালু দিয়ে আকাশ থেকে নেমে আসা বলটাকে তালুবন্দী করে ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে মাঠে সবাই আকাশকে ঘিরে ধরলো। আর এদিকে সুচি খুশিতে জোড়ে yes বলে চিল্লিয়ে উঠলো। আর সেই সাথে সুচি খেয়াল করলো তার পাশে দিদিমা দাঁড়িয়ে আছে “ তুমি কখন এলে ? „
“ আমি এইতো এলাম। „ তারপর পুরো মুখে হাসি আর দুষ্টুমি ছড়িয়ে দিদিমা জিজ্ঞাসা করলেন “ খেলা দেখছিস ? „
“ হ্যাঁ । „
“ নাড়ু খাবি ? „
“ নাড়ু ! „ নাড়ুর কথা শুনে সুচির চোখ বড়ো হয়ে গেল। দিদিমার হাতের নাড়ু , আচার , এমনকি বিভিন্ন পার্বনে বানানো মিষ্টি আর হরেকরকমের পিঠের সে একনিষ্ঠ খাদক। খুব তৃপ্তি করে খায় দিদিমার হাতে বানানো খাবার।
“ চল। „ সুচির এই খুশি দেখে নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে যায় দিদিমার।
তারপর দুজনেই নিচে নেমে গেল। দিদিমা ঘরে গিয়ে নাড়ুর কৌটো বার করলেন । আকাশের চোখ বাঁচিয়ে সুচির জন্য লুকিয়ে নাড়ু রেখে দিতে হয়। না হলে আকাশ সব খেয়ে নেয়। নাড়ুর কৌটো খুলতে খুলতে দিদিমা বললেন “ একটা কথা বলবো। রাখবি ? „
“ কি কথা ? „
“ আগে বল রাখবি । „
“ অবশ্যই রাখবো। কি কথা ? সেটা তো বলো ! „
“ তুই আমার দাদুভাইয়ের খেয়াল রাখবি। কথা দে ওকে আগলে রাখবি সবসময় । রাখবি তো ! „ কথাটা বলতে বলতে দিদিমার চোখ জ্বলে উঠলো যেন।
দিম্মার চোখ সুচির একটাই কথা মনে হলো ‘ এই চোখ শুধুমাত্র হ্যাঁ শুনতে চাইছে। চোখ আবার শোনে নাকি ! চোখ দিয়ে তো দেখে। কিন্তু এই চোখ জানতে চাইছে। শুধুমাত্র হ্যাঁ শুনতে চাইছে ‚ । দিম্মার ওই চোখ দেখে সুচি “ হ্যাঁ রাখবো । „ বলে দিল
“ এই নে । „ বলে কৌটোর ভিতরে পরে থাকা শেষ চারটে নারকেল নাড়ু সুচিকে দিয়ে দিলেন “ তোর চুল এরকম কেন ? আজ চিরুনি করিস নি ? „
“ স্কুল থেকে ফিরে আর আজ ইচ্ছা হয়নি । „
“ চল আমি করে দিচ্ছি। „
“ দাড়াও । „ বলে সুচি নিজের ঘর থেকে একটা তেল আনলো। তারপর দিদিমা আর সুচি একটা বিছানা নিয়ে উপরে উঠে গেলেন । দিনে একবার ছাদে ওঠাই কষ্টের। আজকে দুইবার উঠে একটু বেশি ব্যাথা পেলেন হাটুতে।
ছাদে বিছানা পেতে সুচি বসলো তার লম্বা চুল পিঠে ছড়িয়ে । দিদিমা সুচির পিছনে বসে দুই হাতের তালুতে তেল নিয়ে সুচির চুলে মাখাতে মাখাতে বললেন “ সামনে তোর মাধ্যমিক না ! „
“ হ্যাঁ । পরের বছর ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মাধ্যমিক শুরু হবে । „
“ মন দিয়ে পড়বি। আর দুষ্টুমি করিস না। „
“ সেদিনের পর তো করিনি। „
“ শনিবার স্কুল কামাই করে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলি। „ সুচিকে চুপ করে থাকতে দেখে দিদিমা আরও বললেন “ সিনেমা দেখার সময় অনেক পাবি। বড়ো হয়েছিস আর আকাশও বড়ো হচ্ছে । ওর খেয়াল রাখ। রাখবি তো ! „
এতক্ষণ ধরে মনে জেগে ওঠা ভয়টা এবার যেন বেড়ে গেল। দিদিমার কথা শুনে সুচির মনে হচ্ছিল যেন দিদিমা কোথাও চলে যাবে “ তুমি এমন ভাবে বলছো কেন ? …..
দিদিমা সুচির কথার মানে স্পষ্ট বুঝতে পারলেন। তাই সুচিকে আর বেশি কিছু বলতে না দিয়ে তিনি বললেন “ আকাশ তো এখন বেশিরভাগ সময় তোর সাথেই থাকে। বাড়িতে আর কোথায় থাকে ! তুই বড়ো। তাই তাকে দায়িত্ব নিতে ওর খেয়াল রাখার। „
“ ও যা বদমাশ হয়েছে দেখলেই তো মারতে ইচ্ছা করে । „ দিদিমার কথায় সুচির মনটা শান্ত হলো।
“ ওই একটু আধটু শাসন করবি আর আগলে রাখবি। „ বলে সুচির গালে একটা চুমু খেলেন ।
“ তুমি আমাকেই সবসময় চুমু খাও কেন বলোতো ? „
এতক্ষণ চুলে তেল লাগানোর পর এবার চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়িয়ে দিতে দিতে দিদিমা জিজ্ঞাসা করলেন “ এমা ! তাহলে কাকে আদর করবো ? „
“ কেন ! তোমার মেয়ে । আকাশের মা । „
“ বোকা মেয়ে একটা। স্নেহার কি আর আমার আদর খাওয়ার বয়স আছে ! ওর তো এখন……. বাকি কথা বলতে গিয়ে দিদিমা খুব লজ্জা পেলেন। লজ্জার কারনে আর কথাটা মুখ দিয়ে বার হলো না।
আসলে দিদিমা বলতে যাচ্ছিলেন ‘ ওর তো এখন আকাশের বাবার আদর খাওয়ার বয়স।‚ এই কথাটা মাথাতে আসতেই লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠলো ‘ ইসসসস কি ভাবছি আমি এইসব। ‚
পরের শনিবার সুচি যখন নাচ শিখতে নাচের ক্লাসে গেল তখন সেইদিন বার্ষিক অনুষ্ঠানের ছেলেটা এগিয়ে এসে বললো “ হায়। „
“ হায়। „
“ আমার নাম রাজ। আমি এখানে নতুন এসছি। রবিবার তোমার নাচ দেখলাম। খুব সুন্দর নাচো তুমি । „
“ Thanks. আমার নাম সুচিত্রা। ওই একটু আধটু পারি । „
“ কি বলছো তুমি ! একটু আধটু না খুব ভালো নাচো । তুমি যদি ভালো ভাবে মডার্ন ডান্স শিখতে পারো তাহলে খুব উঁচু জায়গায় পৌছে যাবে…..
তারপর দুজনে একসাথে নাচ শিখে বাড়ি চলে এলো। খুব শীঘ্রই সুচি আর রাজ খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠলো। তারপর আকাশের সাথে স্কুল যাওয়া , টিউশন করা , পড়াশোনা করা আর ওই নাচের ক্লাসের মধ্যে দিয়ে সময় কখন কেটে গেল কেউ বুঝতেই পারলো না। এবছর পূজার সময় পঞ্চমীর দিন রাতে দিদিমা তিলোত্তমা কে ফোন করলেন “ কেমন আছো তোমরা ? „
“ আমরা ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছো ? „
“ আমি ভালো আছি। স্নেহু আছে ? „
“ ও তো নেই। ব্যাবসার জন্য দিল্লিতে গেছে। দুই সপ্তাহ পর আসবে। „
দিদিমা চোখের জল মুছে বললেন “ অজয় কেমন আছে ? „
“ ও খুব ভালো আছে। খুব দুষ্টু হয়েছে জানো …..
আরও কিছুক্ষণ কথা বলে দিদিমা ফোনটা রেখে দিলেন। এবার পুজার সময় আকাশের মামা আসবে বলেছিল। সেই আশায় এতগুলো দিন কাটিয়েছেন দিদিমা। তিলোত্তমার কথা শুনে দিদিমা বুঝলেন আকাশের মামা এখানে আসার কথা ভুলে গেছে। দিদিমা নিরবে কিছুক্ষণ চোখের জল ফেললেন। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে স্নেহা দেবী মায়ের কথা শুনছিলেন। মায়ের কান্না দেখে স্নেহা দেবীর চোখেও জল চলে এলো। আকাশের মা যে তাকে দেখে কাঁদছে সেটা দিদিমা জানতে পারলেন না।
অষ্টমীর দিন সুচি রাজকে তাদের সোসাইটি তে ডেকেছিল নাচ দেখার জন্য। সুচির নাচ দেখার পর রাজ খুব প্রশংসা করলো। দিদিমা নিচে নামতেই পারলেন না। খুব ইচ্ছা ছিল সুচির নাচ দেখার। সেটাও পূর্ণ্য হলো না।
পুজা শুরু হলে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া চলে আসে। বিজয়া দশমীর দুই দিন পর রাতে একটা চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমাতে খুব আরাম হচ্ছিল আকাশের। ভোর বেলার দিকে আকাশের ঘুম ভেঙে গেল দিদিমার কাশিতে। আকাশ উঠে দিদিমাকে জল দিল। দিদিমা উঠে বসে জল খেয়ে আকাশের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
আকাশ ঘুম থেকে উঠে দেখলো দিদিমা ঘুমাচ্ছে। সে চুপচাপ উঠে চলে গেল। আধ ঘন্টা পর ব্রাশ করে এসে দেখলো তখনও দিদিমা ঘুমাচ্ছে। আকাশের বুকটা কেমন একটা করে উঠলো। সে মাকে ডেকে আনলো। স্নেহা দেবী এসে দিদিমার মাথায় হাত দিয়ে দেখলেন ‘ না জ্বর নেই। ‚ তারপর জিজ্ঞাসা করলেন “ তোমার অসুবিধা হচ্ছে? ডাক্তার ডাকবো। „
দিদিমা চোখের পাতা হাল্কা খুলে মাথাটা দুই দিকে নাড়ালেন । মা বারন করলেও স্নেহা দেবী ফোন করে ডাক্তার ডাকলেন। আধঘণ্টা পর ডাক্তার এলো। এই পুরো সময় আকাশের মাথায় দিদিমা হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। তখন স্নেহা দেবী এসে বললেন “ মাকে আর জ্বালাতন করিস না। পড়তে বস গিয়ে । „ মায়ের কথায় আকাশ বইপত্র নিয়ে সোফায় চলে গেল।
ডাক্তার আসলে আকাশ , আকাশের মা বাবা সবাই ঘরে এসে উপস্থিত হলেন। ডাক্তার দিদিমার পাশে খাটে বসে দিদিমার নাড়ি দেখে দুই দিকে মাথা নেড়ে একটা বড়ো নিশ্বাস ছেড়ে বললেন “ বেঁচে নেই । „
খবরটা শুনেই আকাশের মায়ের মাথা কাজ করা বন্ধ করেদিল । বুকটা ধড়াস করে উঠলো সবার । গলায় কিছু একটা দলা পাকিয়ে এলো আকাশের মার “ এইতো আকাশের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল । „
“ এই পাঁচ সাত মিনিট আগেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন । „ কথাটা বলে ডাক্তার তার ব্রিফকেস থেকে একটা ডেথ সার্টিফিকেট বার করে তাতে দিদিমার নাম লিখে নিচে একটা সই করে দিলেন ।
কথাটা শুনেই আকাশের মা ডুকরে চিল্লিয়ে কেঁদে উঠলেন “ ও মা কথা বলছো না কেন ? কোথায় চলে গেলে তুমি আমাদের ছেড়ে ? আমরা কাকে নিয়ে থাকবো ? „
ডাক্তারের কথা শুনে আকাশের বাবারও কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছিল। মাথার উপর শেষ হাতটাও উঠে গেল। কিন্তু এটা চোখের জল ফেলে নিজেকে দুর্বল করার সময় নয়। এইসময় তাকেই সবাইকে সামলাতে হবে। তাই তিনি স্ত্রী কে বললেন “ শান্ত হও একটু। তুমি ভেঙে পড়লে আকাশ কি করবে ? ভাবো একটু । „
কিন্তু আকাশের মাকে তিনি থামাতে পারলেন না। স্নেহা দেবী তখনও চিল্লিয়ে কেঁদে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ কাঁদার পর তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন । স্নেহা দেবীর কান্না শুনে পাশের ফ্ল্যাটের সুচি , সুচির মা আর বাবা দৌড়ে এলেন। এসেই বুঝতে পারলেন কি হয়েছে। সুচিকে তুই আকাশকে অন্য কোথাও নিয়ে যা বলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া স্নেহা দেবীকে সামলাতে গেলেন ।
সুচিকে আকাশের দায়িত্ব দিলেও হলো কিন্তু উল্টো। দিদিমার কথা শুনে সুচিও অজ্ঞান হয়ে গেল । আকাশ তখন থেকে খাটের পাশেই চুপচাপ দাড়িয়ে ছিল। সুচিকে টলতে দেখে আকাশ সুচিকে ওই অজ্ঞান অবস্থায় ধরে এনে সোফায় বসানো । টেবিলে থাকা জলের বোতল থেকে জল নিয়ে সুচির চোখে ঝাপটা দিলো। সুচি চোখ খুলে কিছুক্ষণ পর দিম্মা বলে ডুকরে চিল্লিয়ে দিদিমার ঘরে যেতে গেল। কিন্তু আকাশ যেতে দিল না। সুচির হাত ধরে টেনে এনে আবার সোফায় বসিয়ে দিল “ যাসনা ওখানে দিম্মা কষ্ট পাবে। „ আকাশ এতক্ষণ চোখের জল ফেলেনি তার কারন এটাই। সে বড়ো হয়ে গেছে আর তার উপর আকাশকে কাঁদতে দেখলে দিদিমা কষ্ট পাবে। তাই কাঁদতে ইচ্ছা হলেও আকাশ মন শক্ত করে নিজেকে সামলে রেখেছে।
আকাশের কথায় সোফায় বসেই আকাশকে জড়িয়ে ধরলো সুচি। সুচির চোখ থেকে পড়ছে বড়ো বড়ো অশ্রু বিন্দু। সেই জলে আকাশের পিঠের জামা ভিজে যেতে লাগলো। এবার আকাশও নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলো না। সুচিকে জড়িয়ে ধরে সেও কাঁদতে শুরু করলো। তার চোখ থেকেও ঝরে পড়ছে অজস্র অশ্রুবিন্দু।
ওদিকে সুচেতা দেবীও আকাশের মার চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে জ্ঞান ফেরালেন। আকাশের মা চোখ খুলে সুচির মাকে জড়িয়ে ধরে “ এ আমার কি হলো বলো ! মা আমায় ছেড়ে চলে গেল । „ বলতে বলতে তিনি আবার অজ্ঞান হয়ে গেলেন ।
সুচেতা দেবী আবার চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে স্নেহা দেবীর জ্ঞান ফেরালেন। এবার জ্ঞান ফেরার পর আকাশের মা আর কাঁদলেন না। চুপচাপ দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে রইলেন। সেই সময় আকাশের বাবা স্নেহা দেবীর সামনে গিয়ে বললেন “ স্নেহাংশুকে একবার ফোন করো। „
আকাশের মায়ের মাথাটা দপ করে জ্বলে উঠলো। বড়ো বড়ো চোখ করে “ না । „ বলে উঠলেন। আকাশের বাবা ওই রাগী মুখ দেখে আর রাগী স্বরে “ না । „ শুনে আকাশের মামাকে আর ফোন করলেন না।
কিছুক্ষণ পর সুচি আর আকাশ শান্ত হয়ে দিদিমার পাশে এসে বসলো। দিদিমার পাশে বসে চুপচাপ দিদিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। দুই গালে এখনও চোখের জলের দাগ ফুটে আছে। কিছুক্ষণ দিদিমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে দিদিমার বুকে মাথা রেখে শুলো সুচি। দিদিমার বুকে মাথা রাখতেই কতো পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে গেল তার। সেই ছয় বছর বয়স থেকে দিম্মার ভালোবাসা আদর পেয়ে এসছে সে। সেই আদর ভালোবাসা হাসি ঠাট্টা , সঞ্জয়ের গাড়ির চাকার হাওয়া খুলে দেওয়া থেকে বাঁচানো , সুচিকে হোস্টেলে না পাঠানোর জন্য বাবাকে মানানো সব মনে পড়তে লাগলো। একটা একটা স্মৃতি সুচির চোখে জলের বান ডেকে আনলো। দিদিমার বুকে মাথা চুপচাপ কেঁদে চললো। আর মনে মনে বললো “ আমাকে এবার আচার কে খাওয়াবে দিম্মা ? আকাশের কাছ থেকে নাড়ু বাঁচিয়ে আমার জন্য কে রেখে দিম্মা ? „
এতক্ষনে আশেপাশের সব প্রতবেশী এসে উপস্থিত হয়ে গেছিল। আর বিভিন্ন কথা বলে আকাশের বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ করে পরিবারের উপর ছেয়ে যাওয়া শোকের ছায়া সামলাতে দুপুর হয়ে গেল। আকাশের মা সেই যে মুখ বন্ধ করেছিলেন তারপর আর মুখ খোলেন নি। পড়নের শাড়ির যবুথবু অবস্থা। বিকালের দিকে যখন আকাশের বাবা , সুচির বাবা আর প্রতিবশীদের কয়েকজন দিদিমাকে দাহ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মায়ের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে খুব কাঁদলেন তিনি।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment