মিষ্টি মূহুর্ত [৪র্থ পর্ব][১]

লেখক :— a-man & বিচিত্রবীর্য
Typist :— বিচিত্রবীর্য

চতুর্থ পর্বঃ হৃদমাঝারে 

(১)
দিদিমার হঠাৎ চলে যাওয়ার পর দুটো পরিবারেই শোকের ছায়া নেমে এলো । সবাই খুব শান্ত হয়ে গেল । কারোর মুখে হাসির রেখা দেখা দিল না কয়েক সপ্তাহ। পুজার ছুটি শেষ হওয়ার পর সুচি কিছুদিন স্কুলে গেলো না । সুচেতা দেবী অনেক বলে কয়েও তাকে স্কুলে পাঠাতে পারলেন না । এদিকে স্নেহা দেবী আকাশ কে একরকম জোর করেই স্কুলে পাঠালেন।
সুচি প্রায় এক সপ্তাহ স্কুল কামাই করার পর সুচেতা দেবী খুব বকা বকে জোর করে সুচিকে স্কুলে পাঠালেন। স্কুলে গিয়ে কারোর সাথেই তেমন কথা বললো না। ক্লাসের পড়ায় কিছুতেই মন বসাতে পারলো না। বারবার দিম্মার মুখ ভেসে আসছে । কতো কথা , কতো আদর , ভালোবাসা , গালে চুমু খাওয়া সব একের পর এক চোখের সামনে ভাসতে লাগলো সুচির । ক্লাসের কোলাহল তার এই শান্ত মনের ভিতর কিছুতেই প্রবেশ করতে পারলো না।
টিফিন ব্রেকে ক্লাস রুম থেকে বাইরে বার হলো না সুচি। বেঞ্চে বসে জানালা দিয়ে বাইরের গাছপালা , বিল্ডিং দেখতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলো স্কুল মাঠের দক্ষিণ কোনায় যে বড়ো বাবলা গাছটা আছে তার নিচে আকাশ কাদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে । একটু ভালো করে দেখে চমকে উঠলো সুচি। ‘ আরে ! এরা তো ক্লাস নাইন আর তারই ক্লাসের সেই ছেলে গুলো যারা ক্লাসের ম্যামদের শরীর নিয়ে বাজে বাজে কথা বলে । ‚
ছেলে গুলোকে চিনতে পেরেই সুচির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো ‘ কি কথা বলছে ও ওই নোংরা ছেলেগুলোর সাথে ? আর বন্ধুত্বই বা হলো কখন ? ‚ এইসব ভাবতে ভাবতেই ঢং ঢং আওয়াজ করে টিফিন ব্রেক শেষ হওয়ার ঘন্টা পড়ে গেল। বাবলা গাছের তলার আসর ভেঙে গিয়ে যখন ক্লাস টেনের ছাত্র গুলো ক্লাসরুমে ঢুকলো তখন সুচি তাদের দিকে রাগি দৃষ্টিতে কটমটিয়ে একভাবে তাকিয়ে রইলো। ছেলেগুলো সুচিকে দেখলে ভস্ম হয়ে যেত নিশ্চয়ই।
টিফিন ব্রেকের আগে সুচি ক্লাসের পড়ায় মন বসাতে পারছিল না দিম্মার স্মৃতির জন্য। টিফিন ব্রেকের পর সুচি ক্লাসের পড়ায় মন বসাতে পারলো আকাশের এই ফোরটয়েন্টি ছেলে গুলোর সাথে হেসে হেসে কথা বলার জন্য। মনে মনে ভাবতে লাগলো ‘ কি কথা বলছিল ও ? কবে থেকে বলছে ? আগে তো দেখিনি ! দিম্মার চলে যাওয়ার পর ! হ্যাঁ দিম্মার চলে যাওয়ার পরে এই প্রথম দেখছি। আগে তো দেখিনি ! তাহলে কি ও নিজেকে একা মনে করছে ! রাতে তো দিম্মার সাথে ঘুমাতো। এখন একা ঘুমায়। তাই হয়তো নিজেকে একা পাচ্ছে। ‚
চার মাস পরেই মাধ্যমিক পরিক্ষা বলে শেষ ক্লাসের ঘন্টা পড়ার পরেও ম্যাম প্রায় পনের মিনিট একস্ট্রা ক্লাস করালেন। ততক্ষণে অন্য ক্লাস রুম ফাকা হয়ে গেছে । সুচির চিন্তা হতে লাগলো , মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠলো ‘ আকাশ যদি বাড়ি চলে যায় তাহলে আর ধরা যাবে না। রাস্তাতেই ওকে ধরতে হবে। আরে ক্লাসটা কখন শেষ হবে ? ‚
ক্লাস শেষ হতেই সুচি সবাইকে ঠেলে স্কুলের বাইরে এসে ফুটপাত দিয়ে দৌড়ালো । শীতকাল পড়ে গেছে আর ঠান্ডা হাওয়াও বইছে । তাই ফুটপাত দিয়ে দৌড়াতে তেমন ধকল হচ্ছিল না সুচির। কিছুক্ষণ পরেই সুচি আকাশকে দেখতে পেল। আকাশের পাশে গিয়ে ওর সাথে হাটা শুরু করলো। সুচি পাশে আসতে আকাশ একবার সুচির দিকে তাকিয়ে আবার সামনের দিকে তাকিয়ে হাটা শুরু করলো। তিন চার পা হাটার পর একটু বড়ো দম নিয়ে সুচি জিজ্ঞাসা করলো “ স্কুল তো অনেকক্ষণ আগে ছুটি হয়েছে। এতক্ষণ কোথায় ছিলি ? „
“ ওই বন্ধুদের সাথে কথা বলছিলাম। „ সুচির দিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বললো আকাশ।
“ কোন বন্ধুদের সাথে ? „
আকাশ ক্লাস নাইনের ওইসব নোংরা ছেলেদের নাম নিতেই সুচি প্রায় গর্জিয়ে উঠলো “ বড়োদের সাথে এতো কিসের কথা তোর ? „
“ তোর জেনে কি হবে ? আর তুইও তো ওদের বয়সী ! „ সুচির রাগকে আকাশ ভয় করে না। সেও পাল্টা জবাব দিয়ে দিল।
আকাশের কাছ থেকে পাল্টা জবাব পেয়ে সুচি ধমকিয়ে ওঠে “ আমার মুখের উপর তর্ক করবি না। কাল থেকে যদি দেখেছি ওই নোংরা অসভ্য ছেলেগুলোর সাথে কথা বলছিস তাহলে কাকিকে বলে দেবো সব। তারপর মুখের উপর তর্ক করার ঠেলা বুঝবি । „
সুচির ধমক খেয়ে আকাশ চুপ মেরে গেল। মনে মনে ভাবলো ‘ মা যদি জানতে পারে যে ওদের সাথে কথা বলছিল তাহলে আস্ত রাখবে না । ‚ “ কি কথা বলছিলি ওদের সাথে ? „ আকাশকে চুপ করে থাকতে দেখে সুচি আবার জিজ্ঞাসা করলো ।
কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রেখে ফুটপাতে বিছানো ইটের দিকে তাকিয়ে আকাশ বললো “ ওই , আমার কোন নায়িকা কে দেখতে ভালো লাগে। ওদের কোন নায়িকা কে দেখতে ভালো লাগে। আমি কি কি সিনেমা দেখেছি ? সিগারেট খেয়েছি কি না ? „
“ সত্যি বলছিস ? „
“ তোর সাথে মিথ্যা বলবো কেন ? „
“ কবে থেকে কথা বলছিস ওদের সাথে ? „
“ কাল থেকে । „
‘ যাক ! বেশি দিন হয়নি তাহলে। আর নোংরা কথাও তেমন বলে নি । ‚ এতক্ষণ পর সুচির মনটা শান্ত হলো। “ কাল থেকে যেন ওদের সাথে মিশতে না দেখি। কাল থেকে আমার সাথে স্কুলে যাবি। „
কিছুক্ষণ একসাথে হাটার পর সুচি আবার জিজ্ঞাসা করলো “ দিম্মার কথা মনে পড়ছে ? „
আকাশ এবার পুরো চুপ করে গেল। সুচি আকাশের মুখ দেখেই বুঝতে পারলো ‘ তার সন্দেহ সঠিক। দিম্মার চলে যাওয়ার পর নিজেকে একা ভেবে বড়ো ক্লাসের ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করে দিম্মার অভাব দূর করতে চাইছে। ‚ কথাটা ভেবে আকাশের ডান হাত নিজের বাম হাতে নিয়ে সুচি বললো “ আমারও খুব মনে পড়ছে । „
তারপর দুজনে একসাথে বাড়ির দিকে হাটতে লাগলো। পরের দিন থেকে আকাশ সুচির সাথেই স্কুলে যেতে শুরু করলো । সুচি আকাশকে আর ওদের সাথে মিশতে দিল না।
কয়েক সপ্তাহ শাশুড়ি মায়ের ফোন না পেয়ে তিলোত্তমা নিজে ফোন করলো। আকাশের মা তখন রুটি করার জন্য আটায় জল দিয়ে আটা মাখছিলেন। তিলোত্তমার ফোন পেয়ে আকাশের মা ফোনটা স্পিকারে দিয়ে বললেন “ হ্যালো । „
“ ও দিদি বলছো ! মা আছে ? „
“ মা আর ……. কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না স্নেহা দেবী। কিছু একটা যেন গলায় বেধে গেল তার।
“ হ্যালো ! হ্যাঁ দিদি ! কিছু শুনতে পাচ্ছি না । „
“ মা নেই । „ কিছুক্ষণ চুপ থেকে মনটাকে শক্ত করে বলেই ফেললেন কথাটা।
“ কোথায় গেছে ? „ অপরপ্রান্ত থেকে তিলোত্তমা সকৌতুহলী প্রশ্ন করলো।
“ যেখানে আমার বাবা আছে সেখানে । „ কথাটা বলার সময় চোখের কোনায় এক ফোটা জল চিকচিক করে উঠলো স্নেহা দেবীর।
তিলোত্তমা বুঝতে পারলো যে দিদিমা মারা গেছেন। কিছুক্ষণ দুই প্রান্ত চুপ থাকার পর শান্তি ভঙ্গ করলো তিলোত্তমা “ আমাদের একবারও জানালে না দিদি ! „
“ জানাতাম যদি আপন হতে। মা তোমাদের এখানে আসতে বলেছিল পুজার সময়। তোমরা না এসে মাকে কতোটা কষ্ট দিয়েছিলে সেটা তোমরা জানো না। তোমরাই আমাদের সাথে পরের মতো আচরণ করেছো। তাই আর জানানোর প্রয়োজন বোধ করি নি। „ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে ফোনটা কেটে দিয়ে চোখের কোনায় লেগে থাকা জলের ফোটাটা হাতের পিঠ দিয়ে মুছে আবার আটা মাখতে শুরু করলেন স্নেহা দেবী।
এই ঘটনা আকাশ বা আকাশের বাবা জানতে পারলেন না। এরপর রোজ স্কুল টিউশন খেলাধুলা আর নাচের ক্লাসের মধ্যে দিয়ে ডিসেম্বর মাস শেষ হয়ে জানুয়ারি মাস পরে গেল। নতুন বছর শুরু হতে আকাশ অষ্টম শ্রেনীতে উঠে গেল। আর সুচির মাধ্যমিক পরীক্ষা চলে এলো।
দিম্মার কথা সুচি কখনও ভোলে নি। ভুলতে চায় ও না । দিম্মা তাকে মন দিয়ে পড়ে পরিক্ষা দিতে বলেছিল। ‘ বাবা মায়ের জন্য , নিজের জন্য , নিজের ভবিষ্যতের জন্য ভালো নাম্বারে পাস করা দরকার। ‚ এটা দিম্মা তাকে অনেক বার বলেছেন । তাই সুচি ডিসেম্বর থেকেই মন দিয়ে পড়তে লাগলো। সুমি তার বোনকে সবরকম ভাবেই সাহায্য করতে লাগলো।
মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর একদিন সন্ধ্যায় স্নেহা দেবী দেখলেন নুন শেষ। তিনি আকাশকে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে বললেন “ যা । নুন নিয়ে আয় । „
আকাশ টাকাটা নিয়ে নিচে নেমে সোসাইটির বাইরের দোকান থেকে একটা নুনের প্যাকেট আর একটা চিপসের প্যাকেট কিনলো। চিপসটা খেতে খেতে আসার সময় সে দেখলো প্যাকেটের ভিতর একটা ছোট প্লাস্টিকের ভিতর একটা বাঁশি আছে। বাঁশিটা হাতে নিয়েই একটা দুষ্টুমির হাসি খেলে গেল আকাশের পুরো মুখে ।
সন্ধ্যা হওয়ার পরেই সুচি টেবিলে বসে ভূগোল বই নিয়ে পড়তে শুরু করেছিল । এক দিন পরেই ভুগোল পরিক্ষা । আর সুমি খাটে বসে একটা মোটা কম্পিউটার এর বই খুলে দেখছিল কোন কোন অধ্যায় পড়া হওয়ার সাথে রিভিশনও হয়ে গেছে , আর কোনটা শুধু পড়া হয়েছে কিন্তু রিভিশন হয়নি। সুমি উচ্চমাধ্যমিক এর পর ইঞ্জিনিয়ারিং না করে BBA পড়েছে। এখন MBA পড়ছে। উদ্দেশ্যে বাংঙ্কে চাকরি করা। দুই বোন যখন নিজের পড়ায় ধ্যানমগ্ন ঠিক তখন আকাশ ঘরে ঢুকলো । হাতে তার সেই ছোট প্লাস্টিকের বাঁশি আর মুখে সেই দুষ্টুমিভরা হাসিটা এখনও আছে । বাঁশির মুখে প্লাস্টিক গুটিয়ে রাখা। বাঁশিতে ফু দিলে প্লাস্টিকটা খুলে লম্বা হয়ে যায়।
আকাশ ঘরে ঢোকা মাত্রই দুই বোন আকাশের দিকে তাকালো। তারপর আবার নিজের কাজে মন দিল। আকাশ সুমির পড়ার চেয়ার নিয়ে সুচির পাশে বসলো। সুচি ভুরু কুচকে কিছুক্ষণ আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। বোঝার চেষ্টা করলো আকাশ এখানে কি জন্য এসছে। কিন্তু কিছুই আন্দাজ করতে পারলো না। কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার পড়ায় মন দিল।
“ গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের বসবাসকারী মানুষের প্রধান জীবিকা হলো……..প্যাঁএএএএএএ । সুচির বাক্য শেষ হওয়ার আগেই আকাশ তার বাঁশি বাজালো। বাঁশি তে ফু দিতেই গুটিয়ে রাখা প্লাস্টিক খুলে গিয়ে সুচির নাকের সামনে চলে এলো। বাঁশির শব্দে আর ওই প্লাস্টিকটার জন্য সুচি একরাশ বিরক্তি মুখে ফুটিয়ে বললো “ কাল বাদে পরশু আমার পরীক্ষা। এরকম করিস না , মার খাবি বলে দিলাম ! „
আকাশ সুচির কথায় কান না দিয়ে , সুচির দিকে না তাকিয়ে টেবিলের উপর রাখা ভুগোল বইটার দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর সুচি আবার পড়া শুরু করলো “ গাঙ্গেয় সমভূমির মৃত্তিকা ধান চাষের জন্য ……. প্যাঁএএএএএএএএএ
এবার সুচি কিছু বললো না। ভুগোল বইটা তুলে আকাশের মুখের উপর সপাটে বসিয়ে দিল। আকাশ চেয়ার থেকে উঠে হাসতে হাসতে দৌড়ে ঘরের বাইরে যেতে লাগলো। সুচিও চেয়ার থেকে উঠে আকাশের পাছায় সপাটে একটা খালি পায়ের লাথি বসিয়ে দিল। সুচি আর আকাশের এই কান্ড দেখে সুমি হো হো হো করে হাসতে হাসতে খাটের উপর গড়াগড়ি খেতে লাগলো। আকাশ ঘর থেকে চলে গেলে সুচি দিদিকে বললো “ ও কি এখনও বাচ্চা ! „
সুমি হাসতে হাসতে বললো “ এটা তো সবথেকে ভালো তুই জানিস । „
সুচি দিদির কথার মানে বুঝতে পারলো না। সে আবার চেয়ারে বসে পড়তে লাগলো। “ গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের প্রধান জীবিকা হলো কৃষিকাজ ও মৎস্যচাষ। গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের মৃত্তিকা ধান চাষের জন্য খুব উর্বর। „
সুচির মাধ্যমিক পরিক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে রেজাল্ট বার হলো । সুচি স্টার মার্কস পেয়ে পাস করলো। সুচির মা বাবা যারপরনাই খুব খুশি হলেন। মেয়ে এতো ভালো রেজাল্ট করবে সেটা তারা ভাবতে পারেন নি। ভালো রেজাল্ট করার জন্য সমরেশ বাবু ছোট মেয়েকে একটা নোকিয়া ফোন কিনে দিলেন। তাতে শুধু কথা বলা আর রেডিও শোনা ছাড়া কিছু হয় না। সুচি ফোন পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি সুরে আবদার করলো “ মা একটা স্ক্রিনটাচ ফোন কিনে দাও না ! „
“ না । তোর বাবা বকবে। আগে উচ্চমাধ্যমিক পাস কর । উচ্চমাধ্যমিক পাস করলে তারপর স্ক্রিনটাচ ফোন কিনে দেবে বলেছে। „
“ ধ্যাৎ ! ভাল লাগে না এইসব । আমার সব বন্ধুদের কাছে তো আছে স্মার্টফোন। জয়শ্রী তো আমার থেকেও কম নাম্বার পেয়েছে। ওকে তো কাকা পনের হাজার টাকার স্মার্টফোন কিনে দিয়েছে।
সুচেতা দেবী বললেন “ বললাম তো আগে উচ্চমাধ্যমিক পাস কর । তারপর স্মার্টফোন পাবি । সুমির পড়াশোনার জন্য কত খরচা হচ্ছে সেটা ভাব । „ মায়ের কথা শুনে সুচি চুপ করে গেল।
রেজাল্ট বার হওয়ার পর প্রথম দুই দিন নাচের ক্লাসে গিয়ে সুচি রাজ কে দেখতে পেলো না। তৃতীয় দিনে সুচি রাজের বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করতে সে বললো “ ও তো উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে JNU তে চলে গেছে । „
কথাটা বলে রাজের বন্ধু অভি একটা পুরানো কথা ভাবলো। কয়েক দিন আগে যখন রাজ অভিকে কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেছিল তখন অভি জিজ্ঞাসা করেছিল “ তুই সেদিন সুচির নাচ দেখে বলেছিলি ওকে গার্লফ্রেন্ড বানাবি । আব কা হুয়া ? „
রাজ একটু হেসে বলেছিল “ ওর সাথে বন্ধুত্ব করে কয়েকদিন কথা বলে বুঝেছিলাম যে ও টিপিক্যাল বাঙালি মহিলাদের মতো আর খুব পজেসিভ। মানে ওর সাথে যে রিলেশনে যাবে তাকে রাস্তায় বার হতে গেলে চোখে কাল কাপড় পড়ে বার হতে হবে। কোন মেয়ের দিকে তাকানো যাবে না। ভাব একবার ! „ তারপর কিছুক্ষণ হাসতে হাসতে রাজ বলেছিল “ Backdated মেয়ে । „
রাজের বলা কথা গুলো অভি আর সুচিকে বললো না। সুচির দুঃখ হলো না। রাজ সুচিকে অন্য চোখে দেখলেও সুচির কাছে সে একজন ভালো বন্ধু অপেক্ষা আর কিছু ছিল না। শুধু মনে মনে ভাবলো “ আমাকে না বলে চলে গেল ! „
নাচের ক্লাস থেকে বাড়ি ফিরে উপরে উঠতেই আকাশের ফ্ল্যাটের বাইরে থেকেই খুব জোরে টিভির আওয়াজ শুনতে পেল । উকি মেরে দেখলো আকাশ একটা সিনেমা দেখছে। সুচি নিজের ঘরে না গিয়ে আকাশের পাশে বসে সিনেমা দেখতে শুরু করলো। সেই সিনেমাটা পছন্দ না হতে টিভির রিমোট টা নিয়ে অন্য চ্যানেল লাগিয়ে দিল।
চ্যানেল ঘোরাতেই আকাশ ভুরু কুচকে জিজ্ঞাসা করলো “ চ্যানেল ঘোরালি কেন ? „
“ ওটা আমরা ভালো লাগছিল না তাই । „
“ আমি তো দেখছিলাম । „
“ এখন এটা দেখ । „
সুচির সাথে কথায় না পেরে উঠে আকাশ একবার সুচির দিকে তাকিয়ে রিমোট কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। সুচি রিমোট টা দিল না। রিমোট না দিয়েই সোফার উপর রাখা কুশন দিয়ে আকাশের মুখের উপর মারলো। আকাশ রিমোট এক হাতে ধরে আর এক হাতে কুশনটা সরানোর চেষ্টা করতে লাগলো। সুচি কুশনটা দিয়েই আরও কয়েকবার আকাশকে মারলো। তারপর দুজনের হুটোপুটি শুরু হয়ে গেল। সুচি ভুলেই গেল যে ‘ রাজ তাকে না বলে দিল্লি চলে গেছে । ‚
দুজনের হুটোপুটি দেখে স্নেহা দেবী এসে বললেন “ তোদের কাউকেই দেখতে হবে না। „ বলে রিমোট টা নিয়ে বাংলা ঘরোয়া ধারাবাহিক এর চ্যানেল চালিয়ে দিলেন। অগত্যা দুজনকে চুপচাপ বসে ওই ধারাবাহিক দেখতে লাগলো । সমরেশ বাবু অফিস থেকে ফিরতেই সুচি নিজের ঘরে চলে গেল।
মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করার জন্য সুচি কমার্স নিয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি হলো । স্কুল শুরু হতে এখনও দুই সপ্তাহ মতো বাকি। রোজ জয়শ্রীর সাথে পার্কে আড্ডা দেওয়া আর জয়শ্রীর নতুন ফোনের বিভিন্ন কেরামতি দেখতে দেখতে ছুটির দিন গুলো কেটে যাচ্ছিল। একদিন বিকালে পার্কে বসে সুচি কে জয়শ্রী দেখাচ্ছিল কিভাবে পুরানো যুগের গান ডাউনলোড করা যায়। ঠিক এমন সময় তলপেটে তীব্র ব্যাথা শুরু হতে সুচি উঠে ঘরে চলে গেল।
আকাশ তখন ক্রিকেট খেলছিল। ক্রিকেট খেলার সময় একবার আকাশ দেখেছিল সুচিকে ছোটদের দোলনায় বসে জয়শ্রীর সাথে গল্প করতে। কিছুক্ষণ পর সুচিকে পেটে হাত দিয়ে চলে যেতেও দেখেছিল কিন্তু তখন খেলার উৎসাহে সেইভাবে খেয়াল করতে পরেনি সে। ক্রিকেট ম্যাচ খেলে হাত পা ধুয়ে পড়তে বসার দুই মিনিট পরেই সুচির ওই পেটে হাত দিয়ে পার্ক থেকে চলে যাওয়ার কথা মনে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে বই গুছিয়ে মায়ের চোখের আড়ালে সে সুচির ফ্ল্যাটে চলে গেল। জেঠিমা তখন আর সব বাঙালী গৃহিনীর মতোই বাংলা ধারাবাহিক দেখছেন। ফ্ল্যাটে ঢুকে জেঠিমা কে জিজ্ঞাসা করলো “ জেঠিমা, সুচি কোথায় ? „
আকাশ যে চুপিচুপি ঘরে এসে ঢুকেছে সেটা সুচির মা খেয়াল করেন নি। আকাশের আওয়াজে মুখ ঘুরিয়ে বললেন “ ঘরে আছে। „
জেঠিমার কথা শুনেই আকাশ সুচির ঘরের দিকে পা বাড়ালো। আকাশকে থামানোর জন্য জেঠিমা বললেন “ যাস না , ও অসুস্থ। „
‘ সুচি অসুস্থ। ‚ কথাটা শুনেই আকাশের কপালে ভাঁজ পড়লো। জেঠিমা বারন করলেও , জেঠিমার বারন উপেক্ষা করে আকাশ সুচির ঘরের দিকে পা বাড়ালো ।
আকাশ সুচির ঘরে ঢুকে দেখলো সুমি টেবিলে বসে মোটা একটা বই নিয়ে পড়ছে । সামনে তার একটা ল্যাপটপ খোলা। একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ল্যাপটপ সমরেশ বাবু মেয়েকে কিনে দিয়েছিলেন। এটা সেই ল্যাপটপ । আর যে বইটা খোলা আছে সেই বইটার আকার দেখে আকাশের মনে হলো ‘ এই বইটা দিয়ে যদি একবার কাউকে মারা হয় তাহলে দ্বিতীয় বার আর প্রহার করার দরকার পড়বে না। দ্বিতীয় বার মারার আগেই সে ইহজগত ত্যাগ করবে । ‚ আর সুচি খাটের উপর একটা পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। মুখে তার তীব্র ব্যাথার ছাপ স্পষ্ট ।
আকাশ ঘরে ঢুকতেই দুই বোন আকাশের দিকে তাকালো কিন্তু কেউ কিছু বললো না। আকাশ সুচির পাশে গিয়ে বসলো “ কি হয়েছে? শরীর খারাপ ? „
সুচি কিছুক্ষণ আকাশের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে বললো “ মাসিক হয়েছে । „
আগস্ট মাসে কলকাতায় বরফ পরলে মানুষের মুখ বিস্ময়ে যেমন হয়ে যাবে ঠিক তেমনি ভুরু কপালে তুলে, চোখ বড়ো বড়ো করে মুখে সেই বিস্ময় নিয়ে আকাশ জিজ্ঞাসা করলো “ তুই মেয়ে ? „
সুচির মাথাটা রাগে দপ করে জ্বলে উঠলো । এটা একটা জঘন্য ইয়ার্কি । অন্যদিন হলে হয়তো সুচি সহ্য করে নিত কিন্তু আজকে এই কিছুক্ষণ আগে শুরু হওয়া মাসিকের জন্য তলপেটটা ব্যাথায় যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। এই ব্যাথার জন্য আকাশের ইয়ার্কি সহ্য করতে পারলো না সুচি। ঠাসসসসসস করে ডান হাতের চড় আকাশের বাঁ গালে বসিয়ে দিল। সুচির চড়ের শব্দে সুমি চেয়ারে বসেই নড়ে উঠলো। সুচেতা দেবী লিভিংরুম থেকেই শব্দটা শুনে চমকে উঠলেন ।
আরও একটা মারার আগেই আকাশ খাট থেকে উঠে গেল । গালে হাত বোলাতে বোলাতে ঘরের বাইরে চলে এলো। আকাশ ঘর থেকে বাইরে বার হওয়ার সময় আকাশের পিঠের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সুচি বললো “ idiot „
আকাশ সুচির বলা কথাটা শুনতে পেল না। আকাশ ঘরের বাইরে আসার পর লিভিংরুমের সোফায় বসে থাকা সুচেতা দেবী আকাশকে গালে বোলাতে দেখে বললেন “ বারন করেছিলাম। শুনলি না তো !
জেঠিমার কথার উত্তর না দিয়ে আকাশ ফ্ল্যাটের বাইরে চলে এলো। সিড়ি দিয়ে বিল্ডিং এর নিচে নামার সময় মনে মনে অনুশোচনা হলো ‘ ইয়ার্কিটা মারা উচিত হয়নি। ওর যে নিয়মিত মাসিক হয় সেটা জানতাম না তো ! বলতে গেলে তো সবসময় আমি ওর আশে পাশেই থাকি। তাহলে এতদিন জানতে পারিনি কেন ? এক মিনিট ! সুচির যেমন নিয়মিত মাসিক হয় তেমনি তো মা সুমি জেঠিমার ও হয়। আর সেটা আমি জানি না !!! ‚ কথাটা মাথাতে আসতেই আকাশ সিড়িতে দাড়িয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ একভাবে সিড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে সে আবার সিড়ি ভেঙে বিল্ডিং এর বাইরে চলে গেল ।
প্রায় দশ পনেরো মিনিট পর আকাশ আবার সুচির ফ্ল্যাটে এলো। এবার তার হাতে একটা প্লাস্টিক। সুচেতা দেবী বুঝতে পারলেন না প্লাস্টিক এর ভিতরে কি আছে “ তুই আবার এসছিস । ও কিন্তু রেগে আছে খুব। ওর কাছে যাস না । „
আকাশ ঠোটের কোনায় হাসি নিয়ে সুচির ঘরে ঢুকে খেল। সুমি আকাশকে দেখে ভাবলো ‘ এইতো কিছুক্ষণ আগে চড় খেল। এখন আবার এসছে। ‚
আকাশ এসে ফের সুচির পাশে বসলো। হাতের প্লাস্টিক টা সুচির হাতের কাছে রাখলো। সুচি দেখলো প্লাস্টিক এর ভিতরে দুটো ডেইরিমিল্ক একটা কিটক্যাট আর কয়েকটা ক্যাটবেরি লজেন্স আছে।
আকাশ প্লাস্টিকটা দিয়ে , সুচির হাতের উপর হাত রেখে প্রায় এক দুই মিনিট মতো বসে রইলো। তারপর উঠে ঘরের বাইরে চলে যেতে লাগলো । আকাশ ঘরের বাইরে চলে যাওয়ার সময় সুচি আকাশের পিঠের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোনায় একটু হাসি নিয়ে বললো “ Idiot । „

(২)
আজ সুচির অন্য স্কুলে প্রথম দিন । দিদির পরামর্শে কমার্স স্ট্রিম নিয়ে ভর্তি হয়েছে সে । সোসাইটির গেট পর্যন্ত আকাশ আর সুচি একসাথে গিয়ে , সুচি একটা অটো ধরলো আর আকাশ হেটে স্কুলের রাস্তা ধরলো। যাওয়ার আগে অবশ্য সুচি আকাশকে সাবধান করতে ভুলে গেল না “ ওইসব ছেলেদের সাথে মিশবি না কিন্তু ! „
আকাশ একটু হেসে কোন জবাব না দিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাটতে শুরু করলো। ওইসব ছেলেদের সাথে মেশার কোন ইচ্ছাই ছিল না আকাশের। কিন্তু সেদিন বিপ্লব বিচ্ছু চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে বলেছিলো “ ওদের মোবাইলে অনেক ভিডিও আছে । „
“ কিসের ভিডিও ? „ আকাশ খুব অবাক হয়েছিল বিপ্লবের কথাটা শুনে।
“ ওই বড়রা নিজেদের মধ্যে যা করে । „
“ কি করে ? „ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করেছিল আকাশ।
“ ও দেখলেই বুঝবি। খুব মজার জিনিস । „ কথাটা বিপ্লব এমনভাবে বলেছিল যে আকাশের ইচ্ছা হয়েছিল সেইসব ভিডিও দেখতে। তাই বিপ্লব নিয়ে গিয়েছিল ক্লাস নাইনের দাদার কাছে। সেই দাদা হেসে বলেছিল “ শনিবার তো হাফডে হয়। স্কুলের পর দেখাবো। „
শনিবারে ভিডিও দেখার আগেই সুচি এমন ভাবে বকলো যে আর ওদের আশেপাশে যায়নি আকাশ—- ‘ কিন্তু এখন আবার দেখতে ইচ্ছা করছে কি এমন আছে ওই ভিডিও তে। কিন্তু এতদিন পর হঠাৎ আবার দেখতে চাইলে কি দেখাবে ! ‚ এই সঙ্কোচে আকাশ আর ওই দাদাদের কাছে গেল না ।
স্কুলে গিয়ে , ক্লাসরুমে বসে এই প্রথম মেয়েদের সংখ্যা গুনতে শুরু করলো । মোট বিয়াল্লিশ জন ছাত্রছাত্রী আছে ওর ক্লাসে। আর তার মধ্যে সতেরো জন মেয়ে। একজনকেও তেমন সুন্দর দেখতে লাগলো না আকাশের। মেয়েদের সংখ্যা গুনতে গুনতে কয়েকজনের মুখ প্রথম দেখলো সে ‘ আরে ! একে তো আগে কখনো দেখিনি ! আমাদের সাথেই পড়তো ? ‚
পাশে বসে থাকা বিপ্লব অনেকক্ষণ ধরে আকাশ কে দেখছিল। কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে আকাশের কপালের ভ্রুকুটি দেখে প্রশ্নটা করেই ফেললো সে “ কি দেখছিস বলতো তখন থেকে ? „
“ ওই মেয়েটাকে আগে তো কখনো দেখিনি । „ আঙুল তুলে একটা মেয়ের দিকে দেখালো আকাশ।
বিপ্লব আকাশের আঙুল সোজা তাকিয়ে মেয়েটাকে দেখে বললো “এরমধ্যে ভুলে গেলি ! ওই মেয়েটাই তো আগের সপ্তাহ বুধবার সিড়িতে তোর সাথে ধাক্কা খেলো। „ কথাটা শুনে আকাশ বিপ্লবের দিকে তাকালো —‘ সত্যি তো এই মেয়েটাই তো মনে হচ্ছে। এতক্ষণ চিনতে পারছিলাম না কেন ? ‚
কিন্তু আজকেই কেন সে মেয়েদের দিকে তাকাচ্ছে সেটা বুঝলো না। হয়তো সুচির কড়া নজরদারি আর নেই তাই । হঠাৎ মুক্তির হাওয়া গায় লাগলো তাই। কিংবা বিগত কয়েক মাসের ঘটনা তাকে কিশোর থেকে যুবকে পরিনত হতে সাহায্য করছে তাই।
স্কুল থেকে ফেরার সময় একা একা ফুটপাত দিয়ে হাটার সময় নিজেকে খুব মুক্ত লাগতে শুরু করলো । আগে এই ধরনের কোন অনুভূতি হয়নি। এখন খাটে শুয়ে সিলিংয়ে ঝুলতে থাকা পাখার দিকে তাকিয়ে নিজের ভূত-ভবিষ্যৎ ভাবতে ইচ্ছা করে। আগে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরে খুব শীঘ্র ঘুম চলে আসতো। আর ঘুমটাও হতো খুব সুন্দর আর মিষ্টি ।
সুচি স্কুল থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে জয়শ্রীর সাথে সোসাইটির পার্কের বেঞ্চে এসে বসলো । কিছুক্ষণ পর আকাশ এসে যোগ দিলে সুচি বললো “ আজ ক্রিকেট খেলবি না ? „
“ প্লেয়ার কম তাই খেলছে না। সৈকত দা গেছে সৈকত দেখতে। „
আকাশের কথায় সুচি আর জয়শ্রী দুজনেই হেসে উঠলো। তারপর সুচি বললো “ ওদের সাথে মিশিশ নি তো ! „
মাথা নিচু করে মাটিতে গজিয়ে ওঠা সবুজ ঘাস দেখতে দেখতে বেশ শান্ত স্বরে আকাশ বললো “না । „ আকাশের কথায় সুচির ঠোটের কোনায় একটা বিজয়ের হাসির রেখা দিল।
রাতে খাটে শুয়ে স্নেহা দেবী আকাশের বাবাকে বললেন “ মা চলে যাওয়ার পর থেকে ওকে একটু বেশি চুপচাপ দেখছি । আগের থেকে অনেক শান্ত হয়ে গেছে । খুব চিন্তা হচ্ছে আমার…….
স্ত্রী কথা শেষ হওয়ার আগে আকাশের বাবা বললেন “ মায়ের মৃত্যু ওকে একা করেছে এটা ঠিক। কিন্তু এই বয়সটাই তো মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার বয়স। চরিত্র গঠন হওয়ার সময়…..
এবার আকাশের মা স্বামী কথার মাঝে বলে উঠলেন “ যদি খারাপ কিছু……
“ অযথা চিন্তা করো না। আমাদের ছেলে এরকম কোন কিছু করবে না। এখন ও কোনটা ভুল কোনটা ঠিক সেটা বুঝছে । ভালো খারাপ নিয়েই জীবন। চিন্তা করো না। ওকে একটু সময় দাও। আমি তো সারাদিন বাড়িতে থাকি না। ওর খোঁজ খবরও নিতে পারি না। তুমি ওর একটু আশেপাশে থাকো…..
স্বামীর কথায় স্নেহা দেবী তেমন আশ্বস্ত হতে পারলেন না। তাই ছেলেকে একটু বেশি খেয়াল রাখার চিন্তা করতে লাগলেন।
মা যে তার জন্য চিন্তিত সেটা আকাশ খুব ভালো ভাবে অনুভব করতে পারলো। কিন্তু প্রথমে সুচি তারপর মায়ের এই হঠাৎ এতো নজরে রাখার কারন সে বুঝতে পারলো না। তাই পরের কয়েকটা মাস আকাশ একা স্কুল , টিউশন গিয়ে আর পড়াশোনার মধ্যে দিয়েই কাটাতে লাগলো। রাতে শুয়ে ভবিষ্যতে কি করবে ভাবতে লাগলো। কয়েকবার ভাবলো —- ‘ বাবার ব্যাবসাকে আরও বড়ো করে দেশবিদেশে ছড়িয়ে দেবে আর পাশাপাশি সিনেমা বানাবে। তারপর একটা পছন্দ মতো নায়িকাকে বিয়ে করবে। ‚ এই চিন্তা বাদ দিতে হলো কারন ‘ নায়িকাদের অনেক অ্যাফেয়ার্স থাকে আর তাড়াতাড়ি ডিভোর্স ও হয়ে যায়। ‚
কয়েকদিন ভাবলো—- ‘ প্রেম করতে হবে। আমাদের ক্লাসে তো কোন মেয়ে নেই প্রেম করার মতো । কলেজে উঠে প্রেম করতে হবে। প্রেম করা দরকার। কিন্তু কলেজ তো এখনও পাঁচ ছয় বছর পরে। ‚ পরমুহুর্তেই আবার ভাবলো—– ‘ প্রেম আর বিয়ের দেরী আছে। আগে ব্যাবসা করতে হবে। নিজের একটা প্রাইভেট এরোপ্লেন কিংবা জেট থাকলে কেমন হয় ! কি সুন্দর সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়াবো । ‚
এইভাবেই দিবাস্বপ্ন দেখতে দেখতে শারদীয়া চলে এলো। মহালয়া হয়ে গেছে। আজ পঞ্চমী। কলের কলকাতা নববধূ রুপে সেজে উঠেছে। স্কুল টিউশন ছুটি হয়ে গেছে এক সপ্তাহ আগে। সবার নতুন জামা কাপড়ও কেনা হয়ে গেছে। ষষ্ঠীর আর একদিন বাকি। ষষ্ঠীর সকালেই তো মা আসবে সোসাইটিতে । সোসাইটির কমিউনিটি হল , প্যান্ডেল সব প্রায় তৈরি , শুধু মায়ের অপেক্ষা।
বিকাল পাঁচটার দিকে আকাশদের ফ্ল্যাটে কলিংবেল বেজে উঠতে স্নেহা দেবী গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। দরজা খুলে তিনি একমুহূর্ত স্থির হয়ে গেলেন। দরজার ওপারে তিলোত্তমা দাঁড়িয়ে আছে দেড় বছরের অজয়কে কোলে নিয়ে। আগের থেকে একটু বেশিই মুটিয়ে গেছে যেন ।
ননদ কে চুপচাপ থাকতে দেখে আকাশের মামী হেসে বলে উঠলেন “ ভিতরে আসতে বলবে না !
স্নেহা দেবীর তখনও কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা কাটেনি। তিনি চুপচাপ চৌকাঠ থেকে সরে দাঁড়ালেন। আকাশের মা দরজা থেকে সরে দাঁড়াতে তিলোত্তমা লিভিংরুমে ঢুকে পড়লো। তারপর লিভিংরুমের চারিদিকে দেখতে দেখতে বললো “ এই প্রথম এলাম তোমাদের বাড়িতে। কলকাতাতে এসেছিলাম প্রায় পনের বছর আগে……
আকাশের মামীর কথা শেষ হওয়ার আগেই আকাশের মামা দুটো সুটকেস হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। মুখে তার সংকোচ এবং কিছুটা অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। এবার স্নেহা দেবী ভাইকে দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন । প্রায় গর্জিয়ে উঠলেন “ তুই এখানে এসছিস কেন ? তোর কেউ নেই এখানে । „
“ দিদি প্লিজ ওকে ক্ষমা করে দাও । এই নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক অশান্তি হয়েছে । „ স্বামীর হয়ে তিলোত্তমাই ক্ষমা চেয়ে নিল ।
“ তোমাদের মধ্যে কি হয়েছে তা জানার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই। „ ভাইয়ের বউকে বেশ রাগী স্বরে কথাটা বলে নিজের ভাইয়ের দিকে ফিরে আকাশের মা বললেন “ চলে যা এখান থেকে । আমি তোর মুখ দেখতে চাই না। তোর জন্য মা কতো কষ্ট পেয়েছিল সেটা ভেবেই আমার বুক কেঁপে উঠছে। তোর এখানে কেউ নেই , যে ছিল সে এখন বেঁচে নেই …….
ননদের রাগ কমছে না দেখে তিলোত্তমা একটা ফন্দি বার করলো “ কিন্তু অজয়ের তো আছে । „ বলে অজয়কে ননদের কোলে তুলে দিলেন।
নারী হৃদয় এক শিশুকে তার কোলে পেলে তার হৃদয় আরও বেশি কোমল হয়ে ওঠে। তিলোত্তমা অজয়কে ননদের কোলে দিতেই দুটো ঘটনা ঘটলো । এতক্ষণ ধরে অজয় আকাশের মাকে রেগে রেগে কথা বলতে শুনছিল তাই যখনই তিলোত্তমা তাকে আকাশের মায়ের কোলে দিয়ে দিল তখনই সে ভ্যা করে “ মা „ বলে কেঁদে ফেললো । এদিকে নিজের একমাত্র ভাইপোকে কাঁদতে দেখে আকাশের মায়ের রাগ গলে জল হয়ে গেল “ ওলে বাবালে কাঁদে না , কাঁদে না , কিছু হয়নি ! এইতো মা । দেখো দাড়িয়ে আছে । „ বলে অজয়কে তিলোত্তমার কোলে তুলে দিতে গেলেন।
অজয় কাঁদলেও এবং স্নেহা দেবী অজয় কে তিলোত্তমার কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও অজয়কে কোলে নেওয়ার বিন্দুমাত্র উৎসাহ তিলোত্তমার মধ্যে দেখা গেল না। সে আকাশের মামার দিকে বড়ো বড়ো চোখ বার করে কিছু একটা ইশারা করলো। স্ত্রীর চোখের ইশারা বুঝতে পেরে আকাশের মামা মাথা নিচু করেই বললো “ আমায় ক্ষমা করে দে দিদি । মা আমায় ডেকে ছিল আমি জানি। আমাদের এখানে আসা নিশ্চিত ছিল। কিন্তু পুজার আগেই দিল্লিতে একটা কাজ পরে গেল তাই বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিল . …….
আকাশের মা ভাইয়ের অজুহাতে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই আকাশ ঘরে ঢুকলো । আকাশ নিচে প্যান্ডেলের সাজগোজ দেখছিল । এখন ঘরে ফিরেই এই নতুন মুখ দেখে দাড়িয়ে পড়লো। এদিকে আকাশের মামা মামিও এই 5’4 ইঞ্চির ছেলেটাকে চিনতে পারলো না। কিন্তু তিলোত্তমা আন্দাজ করে আকাশকে চিনতে পারলো “ এ মা ! কতো বড়ো হয়ে গেছো তুমি । মুম্বাইতে যখন তোমাকে দেখেছিলাম তখন তুমি এইটুকু ছিলে। কেমন আছো ? চিনতে পেরেছো আমাদের ? „
মুম্বাইয়ের কথা আসতে আকাশ আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলো। মামার বিয়ের সময় মুম্বাইতে সে গিয়েছিল । তার মানে এরা দুজন মামা মামি। আর ওই তো মায়ের কোলে অজয়। বাবার ফোনে একবার এর ফটো দেখেছিলাম। দিদিমা একবার এর ফটো দেখিয়ে বলেছিলেন “ তোর মামাতো ভাই । „ আজকে চিনতে পারার পর আকাশ হেসে জবাব দিল “ মামা মামি । আমি ভালো আছি আর তুমি ? „
“ আমিও ভালো আছি। এখন কোন ক্লাসে পড়ো তুমি ? „
“ এখন ক্লাস এইট। „ বলে আরও একটু হেসে ব্যাস্ত হওয়ার ভান করে আকাশ বললো “ তোমরা বসো না ! দাঁড়িয়ে আছো কেন ? „
এই প্রথম কেউ অভ্যর্থনা করলো এবং বসতেও বললো । আকাশের কথায় মামা আর মামি সোফায় বসে পড়লো। এদিকে অজয় পিসির আদরে কান্না থামিয়ে দিয়েছে। স্নেহা দেবী অজয়ের সাথে খেলতে খেলতেই অজয়ের মা বাবার উদ্দেশ্যে বললেন “ তোরা এতদূর থেকে এসছিস আগে ফ্রেশ হয়ে নে। তারপর কথা বলবি। „
কিছুক্ষন পর সন্ধ্যা পড়লেই আকাশের বাবা অফিস থেকে ফিরে এলেন। স্নেহা দেবী আগেই ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই অতিথিদের জন্য তিনি পাঠার মাংস কিনে নিয়ে এলেন। আকাশের বাবা ফ্ল্যাটে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলেন “ কেমন আছো তোমরা ? „
স্নেহাংশু বললো “ আমরা ভালো আছি জামাইবাবু। আপনি কেমন আছেন ? „
“ আমি তো ভালোই আছি। শেষমেশ তোমরা এলে ভালো লাগলো। কিন্তু আসতে একটু বেশি দেরি করে ফেললে। „ বলে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন আকাশের বাবা।
কথাটা কি জন্য বলা হয়েছে সেটা আকাশের মামা মামি দুজনেই বুঝতে পারলো। কিন্তু কিছু বলতে পারলো না। কি আর বলবেন ! একজন মৃত্যুর আগে তার নাতি আর ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন। সেই আশাটা পূরন করতে পারে নি এরা। এরপর আর কি বলার থাকতে পারে।
রাতে মাংস ভাত খাওয়ার সময় শুভাশীষ বাবু বললেন “ তা তোমার প্ল্যান কি ? মানে কলকাতায় এসছো ঘুরবে টুরবে তো নাকি ? „
“ অবশ্যই। কলকাতায় এসে ঠাকুর দেখবো না তা কি হয় ! ভাবছি কবে যাবো ! „ মুখের গ্রাসটা শেষ করে বললো তিলোত্তমা
“ আজ এসছো। কাল রেস্ট নিয়ে সপ্তমীর দিন যেও । „
“ তোমাদেরকেও যেতে হবে কিন্তু । „ মিষ্টি স্বরে আবদারটা করেই ফেললো তিলোত্তমা
“ না , না । আমার এখানে কাজ আছে আর স্নেহাও কাল থেকে পুজার কাজে ব্যাস্ত হয়ে যাবে। তুমি আকাশকে নিয়ে যাও। „
“ আমি । „ অপ্রস্তুত হয়ে উঠলো আকাশ। মামা মামি হলেও এরা অচেনা মানুষ। ঠিক ভাবে কখনো কথাই হয়নি। আর এদের সাথে ঠাকুর দেখতে বার হলে একটা অস্বাচ্ছন্দ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হবে।
“ হ্যাঁ তুমি। কেন ? মামা মামির সাথে যেতে অসুবিধা আছে ! „ ঠোঁটে হাসি নিয়ে বললো তিলোত্তমা
“ না , তা ঠিক নয়। আমি আসলে সুচি আর সুমিদি দের সাথে পুজায় ঘুরি । „
“ সুচি সুমি ! „ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো তিলোত্তমা।
“ ওই আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকে । „
“ তাহলে ওদেরকেও নিয়ে নাও । „
পরের দিন সকাল হতেই আকাশ সুচি-সুমির ঘরে উপস্থিত হলো। ঘরে ঢুকেই সে ঘোষণা করলো “ কালকে মামা মামির সাথে ঠাকুর দেখতে যাবো। তোকেও যেতে হবে । „
“ তুই তোর মামা মামির সাথে যাবি। আমি যাবো কেন ? „
“ দেখ , তোর পায় পড়ি। আমাকে বাঁচা। ওদের সাথে গেলে আমার একা একা লাগবে । „ এরপর আর সুচি কিছু বললো না। নিরবতা সম্মতির লক্ষন মেনে নিয়ে আকাশ সুমির দিকে ফিরে বললো “ তোমাকেও যেতে হবে কিন্তু । „
“ আমাকে কেন টানছিস এরমধ্যে ! „ বলে উঠলো সুমি।
আকাশ নাক কুঁচকে কোন শব্দ না করে ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে বললো প্লিজ প্লিজ প্লিজ। আকাশের এইরকম আচরণ দেখে সুমি হা হা করে হেসে উঠলো।
বেলার দিকে সোসাইটিতে মা আসার সময় তিলোত্তমা সুচি আর সুমির সাথে পরিচয় করলো। নানা ধরনের প্রশ্নের উত্তরের আদানপ্রদান চলতে লাগলো। পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার পর তিলোত্তমা বললো “ কালকে আমরা ঠাকুর দেখতে যাচ্ছি। তোমাদেরও যেতে হবে কিন্তু । „
অজয়কে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে সুচি দুই গালে টোল ফেলে একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে হ্যাঁ বলে দিল ।
সপ্তমীর দিন বিকাল পড়তেই আকাশ আর আকাশের মামা পাঞ্জাবী পড়ে আকাশের বাবার জাগুয়ারের পাশে অপেক্ষা করতে লাগলো। প্রায় আধঘণ্টা পর আকাশের মামি তারপর সুচি আর সুমি নিচে নেমে এলো। আকাশের মামি একটা হলুদ রঙের গাউন পড়েছে , সুমি পড়েছে সবুজ রঙের শাড়ি আর সুচি পড়েছে আকাশি রঙের একটা শাড়ি। সুচির সাজগোজ দেখে তিলোত্তমা বললো “ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে । তোমার ফিগারটাও একদম নায়িকাদের মতো । খুব মানিয়েছে শাড়িটা । „
নায়িকাদের মতো শুনেই আকাশ ফিক করে হেসে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললো “ নায়িকা ! „
আকাশের ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দেখে সুচি আকাশের দিকে কটমটিয়ে তাকালো। আকাশ বুঝলো এখন যদি রেগে গিয়ে সুচি যেতে রাজি না হয় তাহলে তো এখন মাঝ গঙ্গায় হাবুডুবু খাবে ! তাই সুচির রাগ কমানোর জন্য বললো “ ও কিন্তু খুব ভালো নাচে। কালকে আমাদের এখানে প্রতিযোগিতায় হবে তখন দেখো ওর নাচ। „
আকাশের মুখে প্রশংসা শুনে সুচি শান্ত হলো। তারপর পাঁচ জন আর পুচকে অজয় মিলে কলকাতা শহরে ঠাকুর দেখতে বার হলো। রাস্তায় যেতে যেতে তিলোত্তমা সুচিকে বললো “ তুমি কোন ডায়েট করো ? „
সুচি মাথা নেড়ে না বলে দিল। ডায়েটের কথা শুনে আকাশ মুচকি হাসি হাসতে হাসতে ভাবলো —- ‘ ডায়েট ! এর খাওয়া দেখলে কুম্ভকর্ণ ও লজ্জা পেয়ে যাবে ! আর এ করবে ডায়েট। ‚ আকাশের হাসি সুচি দেখতে পেল না। কারন পিছনের সিটে আকাশ আর সুচির মাঝখানে সুমি বসেছে ।
এদিকে তিলোত্তমা আরও বলে চললো “ আমাদের সোসাইটির বাইরেই একটা Gym আছে। ওখানে প্রোফেসনাল ট্রেনার ট্রেনিং করায়। বিভিন্ন হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকারা আসে। ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রেনিং করে শুধু তোমার মতো ফিগার পাওয়ার জন্য। „
বাচ্চা নিয়ে ঘোরা যায় না। চার পাঁচটা প্যান্ডেলে ঘুরে কিছু খেয়ে অজয়ের কান্নার জন্য তাদের ফিরে আসতে হলো।
পরের দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিলোত্তমা সুচির নাচ দেখে খুব প্রশংসা করলো। বিজয়া দশমীতে তিলোত্তমা আকাশের মা আর সুচির মায়ের সাথে সিঁদুর খেলে বিদায় নিল। যাওয়ার আগে সবাইকে বলে গেল “ এবার থেকে নিয়মিত আসবো কিন্তু। „ সুচি – আকাশ, আকাশের মা সোসাইটির গেট পর্যন্ত এসে তাদের ট্যাক্সিতে তুলে বিদায় দিলেন।
ট্যাক্সিতে যেতে যেতে এতদিনে মনের ভিতর চেপে রাখা কথাটা বলেই ফেললো তিলোত্তমা “ আকাশের বাবাকে দেখে বোঝাই যায় না উনি কোটি টাকা কামান। দেখে তো মনে হয় কোন বেসরকারি কোম্পানির সামান্য কর্মচারী। সত্যিই কি কোটি টাকা আয় হয় ওনার !
স্ত্রীর কথায় হো হো করে হেসে আকাশের মামা বললো “ ঠিক এই কারনেই বাবা আর মা জামাইবাবুকে এতোটা পছন্দ করতো। শুধু ওই জাগুয়ার গাড়িটা দেখে মনে হয় উনি ধনী। তাছাড়া কোন জাকজমক নেই , শখ আহ্লাদ নেই , আমোদ নেই , বিলাসিতা নেই। একদম সাদামাটা আর খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন জামাইবাবু। „
পুজার ছুটি শেষ হওয়ার পর সুচি একটু ভয় ভয়ে কোচিং গেলো কারন সে ছুটির আগে বেশ কিছুদিন টিউশন ছুটি করেছিল। টিউশনে গিয়ে স্যারকে বেশ খোশমেজাজে দেখলো সুচি । স্যার বললেন “ যারা যারা পুজার ছুটির আগে কামাই করেছো তারা গৌরবের কাছ থেকে নোটস নিয়ে নাও। „

ক্লাস টুয়েলভে ওঠার পর সুচির সতেরো বছর বয়স হতেই , সে এতদিনে মনের ভিতর পুষে রাখা ইচ্ছাটাকে বাইরে বার করলো। মাকে কথাটা বলতেই তিনি বললেন “ আমি কিছু জানি না বাপু । আগে তোর বাবা আসুক । তারপর „
সমরেশ বাবু অফিস থেকে ফিরতেই সুচি আবদার করলো “ বাবা আমি স্কুটি চালানো শিখবো । „
“ স্কুটি চালানো শিখবি , সে তো ভালো কথা। কিন্তু তোকে শেখাবে কে ? „
“ কেন ! দিদি শেখাবে ! „
“ ওর কলেজ কোচিং আছে। ও কিভাবে শেখাবে ? „
“ শনি-রবিবার দিদির ছুটি থাকে , তখনই শেখাবে । „ খুব উৎসাহের সাথে কথাটা বললো সুচি। সুচির কথায় সমরেশ শুধু মাথাটা উপর নিচ করলেন ।
রবিবার সকাল হতেই সুচি দিদিকে নিয়ে বিল্ডিং কম্পাউন্ডে এলো স্কুটি চালানো শেখার জন্য । কিছুক্ষণ পর আকাশ এলো সুচির স্কুটি শেখা দেখতে। স্কুটির খুটিনাটি সুচি আগে থেকেই জানতো। তাই স্কুটি স্টার্ট দিয়ে আসতে আসতে চালাতে শুরু করলো। বলাবাহুল্য যে সুমি স্কুটির পিছনে বসে সুচির সাহায্য করছিল। কিছুক্ষণ পর সুচি বললো “ এবার তুই নাম আমি একা চালাবো । „
“ পারবি তো ? „
“ হ্যাঁ পারবো । „
এতক্ষণ পর সুচির কথায় আকাশ মুখ খুললো “ পারবি না তুই। ফেলে দিবি। মনে আছে ছোটবেলায় সাইকেল চালানো শিখতে গিয়ে কি করেছিলি। কেটে রক্ত বার হচ্ছিল । প্রথম দিন সুমিদি কে সাথে রাখ ……..
আকাশের কথায় সুচি রেগে গিলো । সুচির মনে হলো আকাশ তাকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাই সুচি রেগে গিয়ে একা চালানোরই জেদ ধরলো। সুমিকে জোর করে স্কুটি থেকে নামিয়ে দিয়ে , স্কুটি স্টার্ট দিয়েই আকাশের উপর রাগের বশে সে পিকআপ বাড়িয়ে দিল। হঠাৎ করে স্কুটির গতি বেড়ে যেতে সুচি স্কুটির স্টিয়ারিং সামলাতে পারলো না। সোজা গিয়ে গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল ।
“ এই ! এই ! সামলে ! „ বলে সুমি আর আকাশ দৌড়ে এলো। মুখে তাদের ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। সুমি এসে স্কুটি তুলে দাঁড় করালো । আর আকাশ সুচিকে তুলে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “ লাগেনি তো কোথাও ? „
“ পায়ে লেগেছে । „ মুখ ব্যাথায় বিকৃত করে ডান পায়ের গোড়ালি দেখিয়ে দিল সুচি ।
আকাশ আর সুমি সুচির গোড়ালির দিকে তাকালো। কেটে যায়নি। শুধু ফুলেছে। সুমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললো “ আজ আর শিখতে হবে না চল । বাড়ি চল । „ বলে কথাটা সুমি স্কুটিটাকে ঠেলতে শুরু করলো।
এদিকে আকাশ সুচিকে ধরে সাবধানে বিল্ডিং এর সামনে আনলো । তারপর সুমি সুচির বাম হাত নিজের কাঁধে নিল আর আকাশ সুচির ডান কাঁধ নিজের কাঁধে নিয়ে সিড়িতে উঠার সময় সুচি ব্যাথায় চিল্লিয়ে উঠলো “ লাগছে খুব। „
“ একটু ব্যাথা সহ্য কর । তিন তলা তো। „ কথাটা বলে আকাশ সুচিকে নিয়ে একটা সিড়ি ভাঙলো।
দুটো সিড়ি ভাঙার পরেই সুচি বললো “ না , খুব ব্যাথা । লাগছে খুব……
সুচির কথাটা শেষ হতেই আকাশ সুচিকে দুই হাতে তুলে কোলে নিয়ে নিয়ে সিড়ি ভেঙে উপরে উঠতে শুরু করলো।
সুচিকে আকাশ কোলে তুলে নিতেই সুমি মুখ হা করে দাড়িয়ে পড়লো। সুচিকে কোলে নিতেই সুচির গাল , কান লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। ব্যাথা আর অনুভব করতে পারছে না সুচি । শুধু নিজের হৃৎপিন্ডের হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া ধ্বনি শুনতে লাগলো। আকাশ তখন বলে চলেছে “ বলেছিলাম , প্রথম দিনেই একা চালাস না । এবার ঠেলা বোঝ . …….
আকাশের কথা সুচির কানেই যাচ্ছে না। কি হচ্ছে সেটাই সুচি বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে যেন বোধ বুদ্ধি লোপ পেয়েছে তার । একভাবে সে আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশ ক্লান্তিহীনভাবে একের পর এক সিড়ি ভেঙে যাচ্ছে । কিছুক্ষণ পর আকাশের কথায় সুচির হুশ ফিরলো “ নে পৌঁছে গেছি। নাম এবার । „
“ ইসসসস পৌঁছে গেলাম। „ কথাটা নিজের মনে বলে দরজা ঠেলে খুঁড়িয়ে ভিতরে ঢুকে সোফায় বসে পড়লো।
সুচেতা দেবী হন্তদন্ত হয়ে বললেন “ কি হয়েছে ? কোথায় লেগেছে ? এইজন্য আমি বারন করছিলাম । „
কিছুক্ষণ পর হতভম্ব অবস্থা কাটলে সুমিও উপরে উঠে এলো । এসে মায়ের কথার জবাব দিল “ ও কিছু না । পড়ে গিয়ে ফুলেছে । শিখতে গেলে এরকম ঘটনা হয় তুমি চিন্তা করো না। কিছু হয়নি ওর । „
কথাটা বলে ফ্রিজ থেকে বরফ বার করে মুচকি হাসতে হাসতে সুচির গোড়ালির ফুলে যাওয়া অংশে লাগাতে শুরু করলো। সুচি একবার দিদির মুখে তাকিয়ে দ্বিতীয় বার আর লজ্জায় তাকাতে পারলো না। রাতে ঘুমের মধ্যে আজকে সিড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাই সুচি স্বপ্নে দেখলো । স্বপ্ন দেখতে দেখতেই লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো। দুপুরে সিড়ি কখন শেষ হয়ে গেছিল সেটা সুচি বুঝতেই পারেনি কিন্তু স্বপ্নে সিড়ি শেষ হচ্ছে না । আকাশ সুচিকে কোলে নিয়ে সিড়ি ভেঙেই যাচ্ছে আর সুচি একভাবে আকাশের চওড়া মুখের দিকে তাকিয়ে আছে । ঘুমের মধ্যেই স্বপ্নের জন্য ঠোটের কোনায় হাসি দেখা দিল সুচির।
কথায় আছে যারা সাইকেল চালাতে পারে তারা খুব সহজেই বাইক কিংবা স্কুটি চালানো শিখে নিতে পারে। দুই দিন পর পায়ের ব্যাথা এবং ফোলা কমে গেলে আবার স্কুটি চালানো শিখতে শুরু করলো সুচি। চার পাঁচ দিন বিকাল বেলা চালিয়ে খুব ভালো স্কুটি চালানো শিখে গেল সে।
স্কুটি চালানো শেখার পর যে স্কুটিটা রোদে পুড়ে জলে ভিজে অবহেলায় বিল্ডিং কম্পাউন্ডে দাড়িয়ে থাকতো , যে স্কুটিটার দিকে সুচি ফিরেও কখনো তাকাতো না , সেই স্কুটিটাই এখন সুচির চোখের মণি হয়ে উঠেছে। পাঁচ ছয় বছর বয়স হলেও এখনও ভালো সার্ভিস দিচ্ছে সুমির স্কুটি । সুচি এখন স্কুটিটার উপর একটুও ধুলো পরতে দেয় না। পরম যত্নে রাখে , সন্ধ্যা হলেই বড়ো প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে দেয় সুচি। নিয়মিত জল সাবান দিয়ে ভালো করে স্কুটিটাকে পরিষ্কার করে ধুয়ে দেয় ।
তেমনই একদিন রবিবার দুপুর বেলা স্নান করার আগে সোসাইটি কম্পাউন্ডে সুচি স্কুটিটাকে ধুয়ে দিচ্ছিল। আর আকাশ একটা ইটের উপর বসে সুচির স্কুটি পরিষ্কার করা দেখছে। কি যত্নে স্কুটিটার প্রতি কোনায় জল দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছে সুচি। কিছুক্ষণ সুচির স্কুটি ধোওয়া দেখে সুচির সাথে ইয়ার্কি করার জন্য আকাশ বললো “ স্কুটিটাকে যেভাবে স্নান করাচ্ছিস সেইভাবে একদিন নিজেও স্নান কর। গা থেকে তো শুয়োর মরা গন্ধ বার হয়। গন্ধে তোর আশেপাশে থাকা যায় না। „
সুচি আকাশের কথা শুনলো কিন্তু মুখে কোন অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো না। কিছুই হয়নি এমন ভাবে করে যে কাপড়টা দিয়ে স্কুটিটাকে পরিষ্কার করছিল সেটা বালতির জলে একবার ডুবিয়ে স্কুটির হেডলাইট মুছতে শুরু করলো। প্রায় এক দুই মিনিট পর কাপড়টা আবার বালতির জলে ডুবিয়ে দিল। তারপর বালতিটা তুলে বালতির মধ্যে থাকা নোংরা জল আকাশের গায়ে ছুড়ে দিল “ তোর গা থেকে যে ইদুর পঁচা গন্ধ বার হয় সেটা পরিষ্কার করে আয় । আর একটু ভালো পারফিউম মাখ । গন্ধে তো পাড়ার লোকের ঘুম হয় না। „
আকাশ সুচির কাপড় দিয়ে স্কুটিটার হেডলাইট পরিষ্কার করা দেখে ভেবেছিল সুচি কিছু মাইন্ড করে নি। আর তার জন্য সে অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল। সুচি এই সুযোগটা নিয়েই আধবালতি নোংরা জল দিয়ে আকাশকে স্নান করিয়ে দিল । আচমকা মুখে গায় নোংরা জল পড়ায় আকাশ খুব রেগে গেল। ইট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো “ আমার গা থেকে ইদুর পঁচা গন্ধ বার হয় ! „
“ হ্যাঁ বার হয়। কাকা কাকি থাকে কি করে তোর সাথে ! „
“ কি বললি !!! „
ঠিক চার থেকে পাঁচ মিনিট পর জয়শ্রী এসে দুই তিনবার আকাশের ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজালো । ঘরের ভিতর থেকে স্নেহা দেবী বললেন “ আসছিরে বাবা এতো বার বেল বাজানোর কি আছে ! „
স্নেহা দেবী দরজা খুলতেই জয়শ্রী বলে উঠলো “ শীঘ্রি নিচে চলো মাসি । আকাশ আর সুচি মারপিট করছে । „
কথাটা শুনেই স্নেহা দেবীর মুখ রাগে পাথর হয়ে উঠলো । দরজা খোলা রেখেই তিনি সিড়ি ভেঙে নিচে নামতে শুরু করলেন । আকাশের মাকে বলা হয়ে গেলে জয়শ্রী এবার সুচির ঘরের কলিংবেল বাজালো। সুচেতা দেবী বাইরে এসে বললেন “ কি হয়েছে ? এতো বার বেল বাজাচ্ছিস কেন ? „
“ সুচি আর আকাশ মারপিট করছে । „
“ এই মেয়েটার জ্বালায় একদিনও শান্তিতে কাটলো না আমার। যতো জ্বালা সব আমার । „ বলে তিনি নিজে নামতে শুরু করলেন
সুচেতা দেবী নিজে নেমে দেখলেন অনেক লোক জড়ো হয়ে দাড়িয়ে আছে। আর , সাপ-নেউল লড়াই করার সময় যেভাবে নিজেদের জড়িয়ে ধরে সুচি আর আকাশ সেইভাবে জড়িয়ে ধরে সোসাইটি কম্পাউন্ডে গড়াগড়ি খাচ্ছে । জড়িয়ে ধরে আছে বললে ভুল হবে ! সুচি এক হাতে প্লাস্টিক এর বালতি নিয়ে আকাশকে মারছে। আকাশ এক হাত দিয়ে সুচির চুল ধরে টেনে ছিড়ে ফেলার চেষ্টা করছে আর অন্য হাতে বালতিটাকে নিজের শরীরে আঘাত করা থেকে থামাচ্ছে । আর দুজনেই একে অপরকে নানা কথা শোনাচ্ছে।
সুচি — আমার গা থেকে যদি এতোই দুর্গন্ধ বার হয় তাহলে থাকিস কেন আমরা সাথে ?
আকাশ— জন্মের দিন থেকে তুই আমার সাথে আছিস আর আমাকে জ্বালিয়ে মারছিস ।
সুচি —- আমি তোকে জ্বালাই ! না তুই আমাকে জ্বালাস ! তোর দোষের জন্য বারবার আমি বাবার কাছে বকা খাই।
আর শুনতে পারলেন না সুচেতা দেবী আর স্নেহা দেবী। দুজনেই তাদের সন্তানকে টেনে আলাদা করলেন। তারপর দুজনেই একটা করে চড় বসিয়ে দুজনকে শান্ত করলেন। সুচেতা দেবী বললেন “ বয়স কত হয়েছে তোর ! এইভাবে গায়ে গা জড়িয়ে মারপিট করছিস । „
“ ওই তো প্রথম শুরু করলো। „ বলে রেগে গিয়ে হাতের বালতি ফেলে দিয়ে সুচি উপরে উঠে গেল।
এদিকে মায়ের হাতে এতদিন পর চড় খেয়ে আকাশ শান্ত হলো। স্নেহা দেবী বললেন “ তুই কি এখনও বাচ্চা যে ওর সাথে এইভাবে মারপিট করছিস। বোধ বুদ্ধি কবে হবে তোর ? „
মায়ের কথার জবাব না দিয়ে আকাশও উপরে উঠে গেল। এতগুলো লোকের সামনে মায়ের হাতে চড় খাওয়া দুজনেই সহ্য করতে পারে নি।
তখনও অন্ধকার হয়নি। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়তে এখনও দেরি আছে । দুপুরে সুচির হাতে উদোম মার খেয়ে আর মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে এখন আর খেলতে যেতে ইচ্ছা করছে না। তাই সোফায় বসে উদাস মনে টিভি দেখছে। আর স্নেহা দেবী ছাদ থেকে শুকিয়ে যাওয়া জামা কাপড় এনে আকাশের পাশে সোফায় রেখে গুটিয়ে রাখছিলেন ।
ঠিক এমন সময় সুচি একটা ভালো সুন্দর মেরুন রঙের কুর্তি আর একটা জিন্স পড়ে ঘরে উঁকি মেরে দেখলো আকাশ টিভি দেখছে। তারপর ঘরে ঢুকে সোফার পাশে দাঁড়িয়ে বললো “ কি করছিস ? „
“ অন্ধ হয়ে গেছিস নাকি ! দেখতেই পারছিস সিনেমা দেখছি। „ এখনও রাগ কমেনি আকাশের।
সুচি একবার টিভির দিকে তাকিয়ে দেখলো অমিতাভ বচ্চনের সুরিয়াবানশি হচ্ছে “ এতো অনেকবার দেখেছিস । এখন আর দেখতে হবে না। চল আমার সাথে। „
“ কোথায় ? „
“ রাসের মেলায় । „
“ আমি যাবো না । „
আকাশের কথা যেন সুচি শুনতেই পায়নি এমন ভাবে সুচি আকাশের হাত ধরে টেনে সোফা থেকে তুলে বললো “ যেতে তো তোকে হবেই । „
“ আরে ! আমি হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডোগ্যাঞ্জি পড়ে আছি । এইসব পড়ে কি করে যাবো ! „
“ যা । ভালো জামা কাপড় পড়ে আয় । „ বলে সুচি আকাশের হাত ছেড়ে দিল।
সুচি হাত ছেড়ে দিলে আকাশ নিজের ঘরে গেল। কিছুক্ষণ পর একটা সবুজ আর কালো রঙ মেশানো জামা আর একটা জিন্স পড়ে বাইরে এলো । তারপর দুজনেই নিচে নেমে গেল।
এতক্ষণ স্নেহা দেবী দেখছিলেন আর অবাক হচ্ছিলেন আর মনে মনে বলছিলেন —- ‘ কিছুক্ষণ আগেই এরা যেভাবে ধস্তাধস্তি করছিল যেন একে অপরের প্রান না নিয়ে ছাড়বে না। আর এখন এদের ব্যাবহার দেখে মনে হচ্ছে এরা জন্ম জন্মান্তর ধরে একে অপরকে চিমটি পর্যন্ত কাটেনি , কাটতে পারে না। ‚
সোসাইটি থেকে নেমে পনের কুড়ি মিনিট হেটে সুচি আর আকাশ মেলার মাঠে পৌঁছে গেল। খুব বড়ো না হলেও ছোট বলা যায় না। মেলায় যাবতীয় যেসব থাকে তার সবই এখানে আছে । এদিক সেদিক কিছুক্ষণ ঘোরার পর নাগরদোলার সামনে এসে আকাশের মাথায় প্রতিশোধ নেওয়ার ফন্দিটা এলো। ছোটবেলায় একবার সুমির সাথে নাগরদোলায় উঠে ভয় পেয়ে সুচি কেঁদে ফেলেছিল। কথাটা মাথাতে আসতে আকাশ মনে মনে বললো ‘ আজকাল খুব হাত চলছে তোর ! এবার দেখ ‚ তারপর সুচিকে উদ্দেশ্যে করে বললো “ নাগরদোলা চড়বি ? „
“ না । „ সোজা মানা করে দিল সুচি
“ আরে আয় না । কিছু হবে না। „ বলে সুচির ডান হাত ধরে টানতে শুরু করলো ।
“ না , না , প্লিজ আমার ভয় লাগে খুব । „
“ আরে আমি তো আছি। চল না। „ বলে সুচিকে টেনে আনলো টিকিট কাউন্টারে তারপর ত্রিশ টাকা করে দুটো টিকিট কাটলো আকাশ ।
সুচি প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলো আকাশের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর । সুচির হাত ছাড়ানো দেখে আকাশ বললো “ খুব মজা হবে । আমি তো আছি । „ আকাশের কথায় সুচি একটা ঢোক গিলে চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো।
কয়েক মিনিট পর নাগরদোলা থেমে গেলে সুচি এবার আকাশের হাত ধরলো। আকাশ দেখলো ভয়তে সুচির হাত কাঁপছে “ ভয় পাচ্ছিস কেন ? দেখ কতো লোক চড়ছে । „ চল বলে একটা খালি দোলনায় উঠে পড়লো।
সুচি আরও একটা ঢোক গিলে আকাশের সামনে না বসে আকাশের পাশেই বসলো। নাগরদোলা আস্তে করে চলতে শুরু করলেই সুচি ভয়তে চোখ বন্ধ করে আকাশের ডান হাতটা দুই হাতে ধরে ফেললো “ আমার খুব ভয় করছে । „
‘ বেশ হয়েছে। আমাকে মারা ! এখন বোঝ ঠেলা। এখন হিসাব কর কত ধানে কত চাল হচ্ছে ? ‚ মনে মনে সুচিকে চাল আর ধানের হিসাব করতে বলে মুখে বললো “ কিছু হবে না , আমি তো আছি। দেখ ! ওই দুজন কে দেখ ! কিভাবে পায়ের উপর পা দিয়ে বসে আছে। „
“ আমি দেখতে চাই না। আমার ভীষন ভয় করছে। ওবাবাগো…… সুচির কথা শেষ হওয়ার আগেই নাগর দোলা একটু স্পিড বাড়িয়ে ঘুরতে শুরু করলো । আর সেই সাথে সুচি আকাশকে জড়িয়ে ধরলো ।
তারপর নাগরদোলা একটু স্পিড বাড়াতেই সুচি আরও জোড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে আকাশকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা এবং ভীত গলায় বলতে শুরু করলো “ এ এরকম কাঁপছে কেন? পড়ে যাবো আমি ! শেষ হবে কখন ? কত পাক হয়েছে ? „
আকাশ এটা ভাবেনি। একদম ভাবিনি যে সুচি এইভাবে তাকে জড়িয়ে ধরবে। সুচি আকাশকে জড়িয়ে ধরায় সুচির চুলের মিষ্টি গন্ধ আকাশকে একটা ঘোরের মধ্যে পাঠিয়ে দিল। সুচির ভয়কে আরও বাড়ানোর জন্য খুব উৎসাহে আকাশ বললো “ তিন পাক হয়েছে। এখনও সাত পাক বাকি ? „
সাত পাক শুনেই সুচি আকাশকে আরো জোরে কষে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। এতক্ষণ আকাশ সুচির চুলের মিষ্টি ঘ্রাণ নিচ্ছিল। এবার সুচির জন্য তার দমবন্ধ হতে শুরু করলো। “ ছাড় তুই আমায় । আমার কষ্ট হচ্ছে , দম নিতে পারছি না আমি….ছাআআআআআআড় আমায় …….
আকাশ যতো সুচিকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো সুচি আরও জোড়ে চেপে ধরে লাগলো । সুচি গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে আকাশকে চেপে ধরে কাঁপা গলায় বললো “ আমি পড়ে যাবো। আমার ভয় হচ্ছে। মা বাচাও আমায় । আমার মাথা ঘুরতে শুরু করেছে। বমি হবে …..
আকাশ ভাবতেই পারেনি যে নিজের ছোড়া তীর ঘুরে এসে নিজের পিছনেই লাগবে “ না , একদম না। বমি না । আমার উপর না। আরে আর কতো ঘুরবে থামাও ! মা গো সবে পাঁচ পাক হয়েছে …..
“ এখনও পাচ পাক বাকি ! বমি বমি পাচ্ছে । „
“ নাআআআআআ । এ আমি কোথায় ফেঁসে গেলাম । „ আকাশের পুরো কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা হয়ে গেল
পরবর্তী পাঁচ পাক আকাশ কিভাবে মুখ দিয়ে বড়ো বড়ো নিশ্বাস নিয়ে বেঁচে ছিল সেটা শুধু আকাশ জানে। সুচি কিভাবে বমি না করেও আকাশকে দমবন্ধ করিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল সেটা শুধু সুচি জানে । নাগরদোলা থামার পর আকাশ সুচিকে ছাড়িয়ে দোলনা থেকে নেমে ঘাসের উপর বসে পড়লো আর বড়ো বড়ো নিশ্বাস নিতে শুরু করলো। সুচিও আকাশের পাশে বসে কয়েকবার ওয়্যাক ওয়্যাক করে বমি করার চেষ্টা করলো কিন্তু হলো না। আকাশ উঠে পাশের দোকান থেকে একটা এক লিটারের জল কিনে ঢকঢক করে খেয়ে সুচির দিকে বাড়িয়ে দিল। সুচি প্রথমে ভালো করে মুখে ঘাড়ে জল দিল। তারপর কয়েক ঢোক জল খেয়ে নিল “ আর একবারও যদি আমায় নাগরদোলায় চাপতে বলেছিস ! তবে তোর একদিন কি আমার একদিন ! „
“ কেউ যদি আমায় দশ কোটি টাকা দিয়ে বলে তোকে নিয়ে নাগরদোলা উঠতে , তাহলেও না। আর একটু হলে আমি মরে যেতাম। দমবন্ধ হয়ে এসছিল আমায়। আমি তো একটা মানুষ। কেউ কাউকে এইভাবে মারার চিন্তা করে ! „ রাগী মুখ করে রাগী স্বরে বললো আকাশ।
“ বাজে বকবি না একদম । তুই আমায় নিয়ে গেছিলি । আমি যেতে চাই নি। আমি বলেছিলাম আমর ভয় করে । তুই তো শুনিস নি , এখন সব দোষ আমার ? „ সুচি ও রেগে আকাশের কথার জবাব দিল।
আকাশ সুচির কথার জবাব দিল না। সত্যি ওকে শায়েস্তা করতে গিয়ে যে নিজে এইভাবে ফেঁসে যাবে ভাবিনি । কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে আকাশ বললো “ ফুচকা খাবি ? „
“ চল । „ বলে দুজন ফুচকা খেলো। তারপর পাপড়ি চাট খেলো। বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য জিলিপি , বাদাম , গজা, কটকটি কিনলো। তারপর বিভিন্ন দোকানের কানের দুল, নাকের নথ , আংটি দেখতে লাগলো। একটা বড়ো দোকানে থেমে একটা আংটি পছন্দ করে সুচি বললো “ এটা কতো ? „
দোকানদার বললো “ 85 । „
“ দুটো নেবো । একশো পঞ্চাশ দেবো । „
দোকানদার তার আংটির বাক্স এগিয়ে দিতে সুচি আকাশকে একটা A লেখা আংটি পছন্দ করে দিলে আকাশ বললো “ আমি পড়িনা এসব। „
“ এখন থেকে পড়বি। „ কথাটা বলে সুচি নিজের জন্য S লেখা আংটি পছন্দ করতে লাগলো। অনেক গুলো দেখার পর তিনটে আংটি ফাইনাল করে সে আকাশকে জিজ্ঞাসা করলো “ কোনটা ভালো দেখাবে বলতো ? „
“ এটা নে তোর আঙুলে এটা মানাবে। বেশি মোটা মানাবে না। এটা শেপ ও ভালো। „ কথাটা বলে একটা ডিম্বাকৃতি আংটি দেখিয়ে দিল।
“ দিন এই দুটো । „
দোকানদার দুটো আংটি একটা প্যাকেটে দিলে দুজনে দুটো আংটি নিয়ে আঙুলে পড়ে বাড়ির রাস্তা ধরলো। কিছুদূর যাওয়ার পর আকাশ রাতের অন্ধকার আকাশে তারা দেখতে দেখতে দেখতে বললো “ শোন । দুপুরে যা বলেছি ওসব রাগের বশে ……..
“ ছাড় ওসব। আমিও রাগে অনেক খারাপ কথা বলেছি। „
পরের বছর আকাশ ক্লাস টেনে ওঠার কয়েক মাস পর সুচি মাধ্যমিক এর থেকেও বেশি পরিশ্রম করে, মন দিয়ে পড়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিল। ঠিক সেই সময় সুমিও একটা সরকারি ব্যাঙ্কের উচ্চপদের চাকরির জন্য পরীক্ষা দিল। সুচির উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট আসার আগে সুমির রেজাল্ট চলে এলো। টপ টেনে নাম উঠেছে তার। ইন্টারভিউ দেওয়ার পর এই রাজ্যের IBS ব্যাঙ্কের হেড অফিসের ম্যানেজারের সেক্রেটারি পদের চাকরিটা খুব সহজেই পেয়ে গেল সুমি ।
কিছুদিন পরে সুচির উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বার হলো। সবাই যতোটা আশা করেছিল তার থেকেও ভালো হলো সুচির রেজাল্ট । সবাই বলাবলি করতে লাগলো —— ‘ বাড়িতে যদি সুমির মতো দিদি থাকে তাহলে এতো ভালো রেজাল্ট যে কেউ করতে পারবে । ‚
রেজাল্ট বার হওয়ার পর সুচি কোন কলেজে ভর্তি হবে সেটা নিয়েই খাওয়ার টেবিলে আলোচনা হচ্ছে। সুমি বললো “ কিংটন কিংবা টেগনো তে ভর্তি হয়ে যা। B. Com খুব ভালো পড়ায় ওখানে। „
কলেজের নাম শুনেই সমরেশ বাবু চিন্তায় পড়ে গেলেন। এখন বয়স হয়েছে তার। মাথায় টাক পড়তে শুরু করেছে। চোখের দুই কোনায় মুরগির পায়ের ছাপের মতো চামড়ার ভাজ পড়ে বয়স হওয়ার চিহ্ন এঁকে দিয়েছে । তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন —- ‘ সুমি না হয় উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে সরকারি বেসরকারি নানা ধরনের স্কলারশিপ পেয়েছিল , তাই ওর উচ্চশিক্ষার পড়াশোনার জন্য তেমন অর্থকষ্ট পোহাতে হয়নি। কিন্তু সুচির কলেজের জন্য এতো টাকা কোথা থেকে পাবো। ‚
বাবার মুখ দেখেই সুমি বুঝতে পারলো তার বাবা কি ভাবছে। তাই সে বললো “ বোনের পড়াশোনার সব খরচ আমি নেবো „
বড়ো মেয়ের কথা শুনে সমরেশ বাবুর মনটা হালকা হয়ে উঠলো —- ‘ কখন যে মেয়ে দুটো বড়ো হয়ে গেল বুঝলাম না। এই তো সেদিন হাত ধরে হাটতো । ‚ মুখে কিছু না বললেও মেয়েকে মন থেকে শত সহস্র আশীর্বাদ করতে করতে রাতের খাবার খেতে লাগলেন। রাতে খাটে শুয়ে সুচির মাকে সমরেশ বাবু বললেন “ কে বলেছে মেয়েরা পরের ঘরের ধন হয় ? ছেলেরাই একমাত্র বুড়ো বয়সে বাপ মায়ের খেয়াল রাখে ? „ কথাটা বলতে গিয়ে সুচির বাবার চোখে এক ফোটা জল দেখা দিল ।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 5 / 5. মোট ভোটঃ 1

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment