মিষ্টি মূহুর্ত [৬ষ্ঠ পর্ব][৩]

লেখক :— a-man & বিচিত্রবীর্য
Typist :— বিচিত্রবীর্য

আকাশ আধ ঘন্টা ধরে কিভাবে প্রোপজ করা যায় সেটা কাগজে লিখছিল । এর মাঝে বারকয়েক আকাশের মা এসে আকাশকে স্নানে যেতে বলায় সে বাধ্য হয়ে স্নান করে এসে , খেয়ে দেয়ে , জামা প্যান্ট পড়ে আবার লিখতে বসলো। বেশি বড়ো না আবার ছোটও না। কয়েক লাইনে কবিতার মতো কিছু একটা বলে প্রোপজ করতে হবে। বেশি লম্বা হলে সেটা বোরিং হয়ে যাবে। আবার ছোট হলে দায় সারা দেখাবে। তাই ছয় সাত লাইনের মধ্যে যা বলার তা বলতে হবে। আর এটা লিখতেই যে তাকে এতো কষ্ট করতে হবে সেটা সে ভাবে নি।
সুচির ফোন আসতে তার ধ্যান ভঙ্গ হলো। ফোনটা ধরে সে বললো , “ বল । „
সুচি — কোথায় তুই ? অফিস চলে গেছিস নাকি ?
আকাশ — না কেন ?
সুচি — আজ তোর বাইকে যাবো তাই। বার হ তাড়াতাড়ি।
আকাশ — আমার হয়ে গেছে। তুই নিচে দাড়া। আমি আসছি এক্ষুনি।
সুচি — ঠিক আছে। বলে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে নিচে নেমে এলো।
আকাশও তড়িঘড়ি কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে নিচে নেমে এলো। সুচিকে দেখে বললো , “ আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে । „
“ ও। অন্য দিন খারাপ দেখতে লাগে বুঝি । „
“ অন্য দিনের কথা জানি না। কিন্তু আজ তুই আমার হবু বউ। তাই একটু বেশিই সুন্দর লাগছে তোকে । „
সুচি দাঁতে দাঁত পিষে নিজের হাসি সংবরণ করলো। সাথে লজ্জা পেল সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বললো , “ থাক । অনেক হয়েছে। প্রোপজ করার কথা মনে আছে তো ! „
“ হ্যাঁ । এইদেখ। „ বলে পকেট থেকে একটা ভাজ করা পৃষ্ঠা বার করে সুচিকে দেখালো।
সুচি বুঝতে পারলো যে সে লিখে এনেছে। তাই পৃষ্ঠাটা ছিড়ে ফেলার ইচ্ছা হলো। ‘ একবার প্রোপজ করবে আর হাবভাব যেন বাঘ শিকার করতে যাচ্ছে ! , কিন্তু নিজেকে সামলে পৃষ্ঠাটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে সে বললো , “ নিজে থেকে বলবি। কোন কাগজ দেখা চলবে না । „
আকাশ অবাক হয়ে রেগে গিয়ে বললো , “ ওটা আমিই লিখেছিলাম । „ এতো কষ্ট করে লেখা । এইভাবে জলে যাবে সবকিছু সেটা সে ভাবেনি।
“ হ্যাঁ , তুই নিজেই তো বলবি। যা মনে আছে তাই বলবি। কিন্তু ওখানে গিয়ে কোন কাগজ দেখা চলবে না। চল , চল , কথা বাড়াস না। দেরি হয়ে যাবে। „
আকাশ পরাজয় স্বীকার করে বাইকে উঠে , মাথায় হেলমেট গলিয়ে চাবি ঘুরিয়ে দিল। সুচি বাইকে উঠে আকাশকে জড়িয়ে ধরতেই আকাশ আস্তে করে ক্লাচ ছেড়ে দিল।
সুচির নতুন স্কুটি বোবা হয়ে দেখতে লাগলো কিভাবে তার মালকিন ওই ছেলেটার বাইকে উঠে , ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে , তাকে একা ফেলে দিয়ে চলে গেল।
কিছুদূর যাওয়ার আকাশ অফিস যাওয়ার রাস্তা না ধরে আর একটা রাস্তা ধরলো। সেটা দেখে সুচি জিজ্ঞাসা করলো , “ কোথায় যাচ্ছিস ? অফিস তো উল্টো দিকে। „
“ হ্যাঁ জানি। আগে একটা জায়গায় যাবো। „
“ কোথায় ? „
“ গেলেই বুঝবি । „
সুচি চুপ মেরে গেল। কিন্তু কৌতুহল আরও বেড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর একটা দোকানের সামনে থামতেই সুচি দেখলো যে সেটা একটা গয়নার দোকান। উপরে বড়ো বড়ো অক্ষরে বাংলায় লেখা “ গীতাঞ্জলি জুয়েলার্স। „ আকাশ রাস্তার এক ধারে বাইক পার্ক করতেই সুচি নেমে গেল। আকাশও চাবি খুলে বাইক থেকে নেমে গেল। আকাশ নামতেই সুচি জিজ্ঞাসা করলো , “ এখানে কি ? „
“ চল না। „ বলে দরজা ঢেলে ভিতরে ঢুকে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে একজন নমস্কার করে অভ্যর্থনা জানালো। তারপর একটা কাউন্টারে গিয়ে আকাশ এক শাড়ি পরিহিত মহিলাকে বললো , “ আংটি দেখান । „
তারপর মহিলা আকাশকে জিজ্ঞাসা করে তার পছন্দ জানতে চাইলে আকাশ সুচির দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলো , “ তোর কেমন পছন্দ ? „
সুচি অবাক হয়ে থতমত খেয়ে বললো , “ আমার । „
“ তোর জন্যেই তো কিনছি । আর হ্যাঁ ….. বলে পকেট থেকে সেই মেলায় কিনে দেওয়া আংটিটা বার করে , সুচির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো , “ একটা নতুন কিনে দিবি। এটা আর পড়া যায় না। ছোট হয়ে গেছে। „
আংটিটা দেখে এবং চিনতে পেরে সুচির চোখে জল চলে এলো। এটা সেই আংটি যেটা মেলায় সে আকাশকে পছন্দ করে দিয়েছিল। সেই আংটিটা এখনও আকাশ সামলে সযত্নে রেখে দিয়েছে দেখে সুচির একটা আলাদা ভালোলাগা পেয়ে বসলো। এরকম অনুভূতি কতো বছর ধরে হয়নি সেটা সুচি গোনেনি। আগে যখন আকাশ তার জন্মদিনে কিছু একটা কিনে দিতো তখন এইরকম অনুভূতি হতো। আর আজকে হচ্ছে। নতুন করে জীবনের মিষ্টি সৌন্দর্য উপভোগ করতে শুরু করলো সুচি।
মনে হচ্ছে যেন এখানেই আকাশকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে নিতে। কিন্তু আর না। নিজের অনুভূতি গুলো নিজেকেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এইসব অনুভূতি গুলোর অত্যাধিক বা বাঁধন ছাড়া বহিঃপ্রকাশ-ই তার জীবনের সর্বনাশের কারন হয়েছে এটা সুচির কাছে স্পষ্ট। তাই চোখের কোনায় লেগে থাকা জল মুছে নিয়ে আকাশের বাড়িয়ে দেওয়া আংটিটা নিয়ে নিল। তারপর মনে মনে বললো , ‘ হ্যাঁ। নিজের টাকায় তোকে এর থেকেও সুন্দর আসল সোনার আংটি কিনে দেবো। ‚ তারপর কাউন্টারের মহিলার উদ্দেশ্যে বললো , “ বেশি মোটা না। হাল্কা সরু। „ তারপর নিচের বাক্সের বিভিন্ন আংটির মধ্যে থেকে একটা আংটি দেখিয়ে বললো , “ এরকম । „
আকাশ জিজ্ঞাসা করলো , “ এটা তোর পছন্দ ? „
“ হ্যাঁ , এটা খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। „
আকাশ একবার আংটিটা দেখলো। সরু আর মাথায় একটা ছোট ফুলের মতো ডিজাইন। তাতে চারটে ফুলের পাপড়িও আছে। আংটি দেখে কাউন্টারের মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলো , “ কত দাম ? „
মহিলা বললো , “ এটার দাম স্যার আজকের মার্কেট অনুযায়ী বারো হাজার পাঁচশো নিরানব্বই । আজকে পঞ্চাশ টাকা কমে গেছে। তাই আপনারা খুব সস্তায় পেয়ে যাচ্ছেন . ….
মহিলার কথার মাঝে আকাশ বললো , “ ওকে। একবার এর আঙুলের সাইজে হচ্ছে কি না দেখে নিন । „
সুচি অশ্রুসিক্ত নয়নে আঙুল বাড়িয়ে দিলে মহিলা তার অনামিকাতে আংটি পড়াতে চেষ্টা করলো। প্রথম চেষ্টাতেই ঢুকে গেল। পুরো পার্ফেক্ট সাইজ।
আকাশ বললো , “ তাহলে দিয়ে দিন। „
আংটি কিনে চেক-এ পেমেন্ট করে দিল সে। তারপর বাইরে বার হয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ কাঁদছিলি কেন ? „
“ কিছু না । তুই বুঝবি না। „
আকাশ কিছুক্ষণ উদাসীন দৃষ্টিতে সুচির দিকে তাকিয়ে থেকে বাইকে উঠে পড়লো। এই মেয়েটার সাথে ছোটবেলা থেকে একসাথে আছে। তবুও এই মেয়েটার মন সে বুঝতে পারলো না। আর কখনো বুঝতে পারবে কি না সেটাই সন্দেহ।
মাথায় হেলমেট গলানোর আগে সুচির নরম কোমল ঠোঁটের স্পর্শ নিজের গালে অনুভব করলো। পিছনে ঘুরে তাকানোর আগে সুচি তাকে জড়িয়ে ধরে বললো , “ চল। অফিস যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। „
“ সে তো এমনিতেও হয়েছে। „ বলে হেসে নিয়ে বাইক চালিয়ে দিল। বাইক কেনার পর আজ প্রথম সুচি ওকে জড়িয়ে ধরে বসেছে। আর কোন বাধা নেই ওদের মধ্যে । এখন সুচি আকাশের। আকাশ সুচির। আকাশ নিজের পিঠে সুচির কোমল শরীরের ছোঁয়া নিয়ে বাইকের গতি বাড়িয়ে দিয়ে অফিসের দিকে চললো।
মাঝ রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে সুচি আকাশের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ তুই কাকার ছেলে । এটা কি তোর যোগ্যতা ? নাকি তোর কলেজের MBA ডিগ্রিটা তোর যোগ্যতা ? কোনটাকে তুই নিজের যোগ্যতা বলে মনে করিস ? „
Update 7
“ মানে ? „ সুচির হঠাৎ এইসময়ে এইধরনের প্রশ্নের কোন মানে আকাশ বুঝতে পারলো না
“ তখন তুই বললি না নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবি। সেটাই জিজ্ঞাসা করছি। তোর যোগ্যতা কোনটা ? „
আকাশ বুঝতে পারলো না সুচি কি বলতে চাইছে । একদিকে সারারাত না ঘুমানোর একটা ক্লান্তি আর এই এখনকার প্রশ্নের অর্থ বুঝতে না পেরে আকাশের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। এর ফলে আকাশ বাইক চালানোয় অমনোযোগী হয়ে পড়লো । সুচি দেখলো দুটো গাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাইকটা গাড়ি দুটোর গা ঘেসে বিপদজ্জনক ভাবে পাশ কাটালো। সেটা দেখে ভয় পেয়ে সুচি বললো , “ সাবধানে , দেখে চালা। অফিসে গিয়ে উত্তর দিস। „
সুচির কথায় আকাশ বেশি না ভেবে বাইক চালানোয় মনোযোগ দিল। অফিসে পৌছে পার্কিংয়ে বাইক পার্ক করতে সুচি বাইক থেকে নেমে , আশেপাশে কেউ নেই দেখে নিয়ে বললো , “ প্রোপজের কথা মনে আছে তো ? „
“ মনে থাকবে না আবার ! „ তারপর রিকোয়েস্ট করার ভঙ্গিতে আকাশ বললো , “ প্লিজ তুই অল্প কথায় রাজি হয়ে যাস। অফিসের সবার সামনে প্রোপজ করতে হবে ভেবে এমনিই লজ্জা পাচ্ছি। বেশিক্ষণ থাকলে কি অবস্থা হবে সেটা ভেবেই ভয় পাচ্ছি । „
কথাটা শুনে সুচির চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠলো , “ তুই কি পরিক্ষা দিতে যাচ্ছিস যে ভয় পাচ্ছিস ! „
আকাশ চোখ বড়ো বড়ো করে বললো , “ অবশ্যই পরিক্ষা। এর থেকে বড় পরিক্ষা কখনো দিই নি । তাই ভয় তো হবেই । „
মিচকি হাসি হেসে সুচি বললো , “ ঠিক আছে। ভেবে দেখবো। তবে যা করবি সব লাঞ্চের আগে । „ বলে সুচি লিফ্টের দিকে চলে গেল । লাঞ্চের আগে , কারন লাঞ্চের সময় বাবা আর কাকার পুরানো ঝগড়া শুনবে সে। তাই লাঞ্চের আগেই প্রোপজের শাস্তি সেরে ফেলতে চায়।
আকাশের হঠাৎ মনে পড়লো সেই যোগ্যতা নিয়ে কথাটা , “ তখন কি জিজ্ঞাসা করছিলি যোগ্যতা নিয়ে ? „
“ টিফিন ব্রেকে বলবো । „ বলে লিফ্টে উঠে ঢুকে গেল সুচি ।
স্বামী আর সন্তান অফিস চলে গেলে আকাশের মায়ের এই বড়ো ফ্ল্যাটটা হঠাৎ খালি খালি লাগতে শুরু করলো। আজকে কেন এরকম লাগছে সেটা তিনি বুঝতে পারলেন না। আগেও তো এই ফ্ল্যাটেই ঘন্টার পর ঘন্টা একা কাটিয়েছেন। তাহলে আজকে হঠাৎ এরকম মনে হচ্ছে কেন !
কিছুক্ষণ পর তিনি বুঝতে পারলেন যে এটা মনের ভুল। আসলে তার কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। যার সাথে এই দীর্ঘ চার পাঁচ বছর কথা বন্ধ ছিল , তার সাথেই কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। কারন আগে তো স্বামী অফিসে আর ছেলে স্কুল কলেজে চলে যাওয়ার পর তার সাথেই ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটতো।
বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর , দোটানা মন নিয়ে তিনি ঘরের বাইরে এসে পাশের ফ্ল্যাটে তাকিয়ে দেখলেন যে ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। আকাশের মায়ের মনে হলো যেন তার জন্যেই দরজাটা খুলে রাখা আছে। তিনি বুকে দ্বিধা নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখলেন সুচির মা ফ্লোর পরিষ্কার করছেন। যে জল দিয়ে ফ্লোর মুছছিলেন সেই জলে কিছু একটা মেশানোর জন্য একটা অচেনা ফুলের মিষ্টি গন্ধ নাকে আসছে।
আকাশের মাকে দেখে সুচির মা মৃদু হেসে সোফা দেখিয়ে , “ বসো „ বললেন। তারপর নোংরা জলের বালতিটা বাথরুমে রেখে , সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে এসে বললেন , “ তুমি বসো আমি চা করে আনছি । „
আকাশের মা কি বলে কথা শুরু করবেন সেটা তিনি বুঝতে পারলেন না। অথচ কাল রাতে এই মহিলার সাথেই নিজের ছেলের বিয়ে নিয়ে কথা বলেছিলেন। কিন্তু তখন কথা বলছিলেন ছোটবেলার দুই ভাই রুপি বন্ধু সমু আর শুভো। এই দুই মহিলা মূলত শ্রোতা হিসাবেই ছিলেন। বেশি কথা তারা বলেন নি।
কতদিন পর ! না দিন নয় , বছর , প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর পর এই ফ্ল্যাটে তিনি ঢুকলেন। চারিদিকে দেখতে দেখতে ঘরের রঙের উপর খেয়াল হলো । মনে হচ্ছে আগে আলাদা রঙ ছিল। হ্যাঁ আগে ছিল নিল এখন সবুজ হয়েছে। তারপর নিজের মনেই তিনি বললেন , ‘ ও হ্যাঁ , মনে পড়েছে। সুমির বিয়ের সময়েই রঙ করা হয়েছিল। , চার পা হাটলেই এই ফ্ল্যাটে আসা যায়। আগে আসা যাওয়া ছিল। হঠাৎ করে সব সম্পর্ক , যাওয়া আসা , একে অপরের খেয়াল নেওয়া , সব বন্ধ হয়ে গেছিল। কি কারণে বন্ধ হয়েছিল ? হ্যাঁ , সেই অষ্টমীর রাতে সুচি আর আকাশ ….
এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন সুচেতা দেবী চা নিয়ে এসে হাজির হয়েছেন সেটা তিনি খেয়াল করেননি। কিন্তু যেটা খেয়াল করলেন সেটা হলো পেয়ালা ভর্তি আদা চা। যেটা তিনি খেয়ে থাকেন এবং পছন্দ করেন। কিন্তু সুচির মা দুধ চিনি চা ছাড়া খান না সেটা তার তখনই মনে পড়লো। কথাটা মনে পড়তেই তিনি সুচির মায়ের কাপে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলেন সেখানেও আদা চা বা রঙ চা আছে। এতদিন পরেও যে সুচির মা তার এই ছোট্ট পছন্দের কথা মনে রেখেছে সেটা দেখে তার চোখে জল চলে এলো। মুখ থেকে আপনাআপনি একটা কথা বেরিয়ে এলো , “ আমি ভেবেছিলাম সুচি আমার ছেলেকে মেরেছে তাই তুমি কথা বন্ধ করে দিয়েছো । „
ওদিক থেকে যে কথাটা ভেসে এলো সেটা তাকে একেবারে কাঁদিয়ে দিল। সুচির মা বললেন , “ আমি ভেবেছিলাম আমার মেয়ে তোমার ছেলেকে মেরেছে বলে তুমি কথা বন্ধ করে দিয়েছো । „
কথাটা শুনে আকাশের মা মুখে হাত চেপে ফুপিয়ে কেদে উঠলেন। কথা দুটো যে একই। একজনের দৃষ্টিতে এটা রাগের বহিঃপ্রকাশ , আর একজনের দৃষ্টিতে কথাটা অনুশোচনার বহিঃপ্রকাশ। আকাশের মা ভেবেছিলেন সুচির মা সুচির এই ঘটনায় অনুতপ্ত হয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। আর সুচির মা ভেবেছিলেন আকাশের মা আকাশকে কে মারার জন্য রেগে গিয়ে কথা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে , দুজনেই নিজে থেকে কিছু ভুল ভাবনা ভেবে নিয়ে , নিজে থেকেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন।
সুচির মা উঠে আকাশের মাকে সান্ত্বনা দিতে গেলেন। কিন্তু সুচেতা দেবী আকাশের মায়ের পাশে গিয়ে বসতেই আকাশের মা দেখলেন যে সুচির মায়ের চোখেও জল টলটল করছে। আচলে চোখ মুছে নিজেকে শান্ত করে তিনি বললেন , “ আমার কম বয়সী ছেলের সাথে তোমার মেয়ের বিয়েতে কোন আপত্তি নেই তো ? কাল রাতে তো দাদা আর আকাশের বাবাই সিদ্ধান্ত নিল। তোমার কথা তো কেউ শুনলো না। „
সুচির মা গম্ভীর হয়ে বললেন , “ আমার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন আমার বয়স ছিল বাইশ আর সুচির বাবার পঁচিশ। না , আমার কোন আপত্তি বা অসুবিধা নেই। আকাশের সাথে বিয়ে না হলে আমার মেয়ে চোখের জল ফেলবে। তাতে আমার আপত্তি আছে বৈকি । „
এরপর আর কোন কথা হয় না। আকাশের মা চায়ের কাপ তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিলেন। এতবছর পর সুচির মায়ের হাতে চা খেয়ে তার প্রাণ জুড়িয়ে এলো। চা খুব ভালো বানান সুচির মা।
অফিস আওয়ার শুরু হয় দশটা থেকে। আকাশ সুচি পোঁছে ছিল সাড়ে এগারোটায়। তারপর দুজনেই দুটো ফ্লোরে নিজের নিজের জায়গায় বসে পড়েছিল। আকাশকে কেউ কিছু না বললেও সুচিকে সুচির বস দুটো কথা শুনিয়েছিল। সুচি কোন অজুহাত না দিয়ে , “ সরি „ বলেছিল।
মনে কোন অহংকার সে রাখে নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই কোম্পানির মালিকের ছেলে এসে তাকে সবার সামনে প্রোপোজ করবে আর তারপরেই সে হয়ে যাবে এই কোম্পানির ভবিষ্যতের মালকিন। এই অহংকার সে পোষণ করে না। আর তাই যখন তার বস তাকে অফিসে দেরি করে আসার জন্য কথা শোনাচ্ছিল তখন , “ সরি স্যার , শরীর খারাপ লাগছিল । „ ছাড়া আর কিছু সে বলেনি।
ঘড়ির কাঁটা বারোটা থেকে একটার ঘরের দিকে যতো এগিয়ে যেতে লাগলো সুচির মন তত বেশি উশখুশ করতে লাগলো। , ‘ কখন আকাশ এসে প্রোপজ করবে ? কখন ! , সময় কাটতে চাইছে না তার , কাজে মন নেই। হঠাৎ সুচি দেখলো যে আকাশ এই ফ্লোরে ঢুকছে। কিন্তু এ কি ! ও তো একটা ফাইল নিয়ে চলে গেলো ! মেসেজ করবে কি ! না করবে না। রাগ হলো সুচির। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবলো যে , এই রাগের বহিঃপ্রকাশ যেন না হয়। তাই সে শান্ত হয়ে কাজে মন দিল।
ঠিক দেড়টা বাজার সময়েই আকাশ ঢুকলো। সুচি সেটা খেয়াল করলো না। দরজা ঢেলে ভিতরে ঢোকার সময়েই তার মুখ দেখে বোঝা গেল যে সে ভীষণ নার্ভাস। কয়েক জন কম্পিউটার থেকে মুখ তুলে আকাশকে দেখে আবার স্ক্রিনে চোখ দিল। আকাশ এসে সুচির পাশে দাঁড়াতেই সুচির নজর আকাশের উপর পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে সুচির মুখে হাসি , চোখে লজ্জা দেখা দিল আর হৃৎপিন্ডের ধুকপুকানি অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেল।
সুচির পাশে বসা কাজ করা কয়েকজন এমপ্লয়ি আকাশের হাবভাব দেখে অবাক হলো। আকাশের মুখের নার্ভাসনেস তাদের চোখ এড়ালো না। হঠাৎ আকাশ একটা হুটু ভাজ করে মেঝেতে দাঁড়াতেই আশেপাশের সবার নজর কারলো । সবাই উঠে দাঁড়িয়ে দেখতো লাগলো যে কি হচ্ছে। সবাই আন্দাজ করতে পারলো কি হতে যাচ্ছে। তাই তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
আকাশ একটা হাটু ভাজ করে মেঝেতে রাখতেই সুচি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো । চোখের মনি কাঁপছে তার । মেঝেতে হাটু রাখতেই আকাশ পকেট থেকে অফিসে আসার সময় কেনা সেই আংটিটা বার করে সুচির চোখের সামনে মেলে ধরে মিষ্টি গলায় বললো …..
“ আমি জানতাম না তুই আমার জীবনের কতোটা জুড়ে আছিস। হঠাৎ করে কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমি বুঝতে পেরেছি আসলে তুই-ই আমার জীবন ছিলি। গত চার পাঁচ বছর আমি যা কষ্ট পেয়েছি আমার বিশ্বাস তুইও ততোটাই পেয়েছিস। ভবিষ্যতে এরকম অসহ্য কষ্ট আমি কিংবা তুই কেউই আর নিতে পারবো না। যাতে এই ধরনের কষ্ট আমাদের কে আর পেতে না হয় তাই তুই কি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবি ? তুই কি আমার সাথে সারাজীবন একসাথে থাকবি ? „
আকাশের কথা শেষ হতেই আশেপাশের সব এমপ্লয়ি মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত আওয়াজ বার করে সেলিব্রেট করলো। তারা আকাশের বলা কথার মানে একদম বুঝতে পারে নি। কিন্তু তাতে তাদের কিছু যাস আসে না। কোম্পানির মালিকের ছেলে একজন সাধারণ এমপ্লয়ি কে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে এটাই তাদের কাছে মুখ্য বিষয়।
সুচি একসাথে লজ্জা পেল আবার আকাশের উপর রেগেও গেল। সে ভেবেছিল আকাশ হয়তো তাকে ইংলিশে প্রোপজ করবে। যদি বাংলাতে প্রোপজ করে তাহলে অন্তত তুমি বলে তাকে সম্বোধন করবে। কিন্তু সেরকম কিছুই না হওয়ায় সুচি রেগে গেল। এদিকে এটা বিয়ে করার প্রোপজ বলে সে লজ্জাও পেল।
যতোই রাগ হোক ! সুচির জেদের জন্যেই তো আকাশ তাকে প্রোপজ করেছে। তাই সে , “ yes „ বলে মাথা উপর নিচ করে নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দিতেই আকাশ তার অনামিকাতে আংটিটা পড়িয়ে দিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আশেপাশের সব এমপ্লয়িদের হাততালি শুনে আস্তে আস্তে ওখান থেকে কেটে পড়লো। এতো লজ্জা কখনো সে পায়নি।
সুচি মুখে হাসি আর লজ্জা নিয়ে আবার চেয়ারে বসে পড়লো। তার মুখ পাকা টমেটোর মত লাল হয়ে উঠেছে । পাশের এক মহিলা এসে পিঠে হাত দিয়ে অভিন্দন জানালো। তারপর পরপর প্রায় সবাই এসে অভিনন্দন জানিয়ে গেল। লজ্জায় কারোর দিকে তাকাতে পারছে না সে। কম্পিউটারে খুটখুট করতে করতে সে ভাবলো , ‘ এই তুই নিয়ে কিছু একটা করতে হবে। তুই-তোকারি বন্ধ করতেই হবে। ,
আকাশ এসে আবার নিজের চেয়ারে বসে পড়লো। আজকে গোধূলি আসেনি কিন্তু সঞ্জয় এসছে । গোধূলি সেই নিজের মাসতুতো দিদির সাথে দেখা করতে গেছে। সুচিকে আকাশ প্রোপজ করেছে এটা সঞ্জয় দেখেনি । কিন্তু কোন খবর এ দেশ থেকে ও দেশে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগে না। তাই সুচির ফ্লোর থেকে আকাশের ফ্লোরের এমপ্লয়িদের কাছে খবরটা পৌঁছাতেও বেশি সময় লাগলো না। তাদের কাছে এটাই এখন সবথেকে জনপ্রিয় মুখরোচক খবর।
তখন টিফিন ব্রেক সবে শুরু হয়েছে। সুচি আকাশকে মেসেজ করে নিচের ধাবাতে আসতে বললো । বাবা আর কাকার কি নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল সেটা শোনার কৌতূহল সে আর চেপে রাখতে পারছে না। সুচির মেসেজ পেয়ে আকাশ বাবাকে “ নিচে যাচ্ছি। „ বলে নিচের রাস্তার পাশে ধাবাতে চলে এলো।
এদিকে এমপ্লয়িদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে হঠাৎ আকাশ সুচিকে কেন প্রোপজ করলো ? সুচি তো আকাশের থেকে প্রায় সাড়ে তিন বছরের বড়ো। এবং সুচি আর আকাশ একই সোসাইটি তে থাকে । যেভাবে তুই তুই করে কথা বলছিল তার থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে এরা পূর্ব পরিচিত। এই নিয়েই অফিস সরগরম যাকে বলে। আর মেয়েটাও একটা বড়ো দাও মারলো। একেবারে মালিকের ছেলের সাথে।
এই আলোচনা সঞ্জয়ের কানে যেতেই তার ভুরু কুঁচকে গেল। সে জিজ্ঞাসা করলে একজন এমপ্লয়ি বিস্তারিত সব বললো । সব শুনে সে রাগে ফেটে পড়লো । মাথার ঠিক রইলো না আর। সঙ্গে সঙ্গে আকাশের বাবার কেবিনের দরজা ঢেলে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলো , “ আপনার ছেলে নিচের ফ্লোরের কি নাম ! সুচিত্রা না কে ! ওকে বিয়ের জন্য প্রোপজ করেছে ? এটা সত্যি ? „
আকাশের বাবা সবে টিফিন কৌটো খুলে তার ভিতরের খাবার দেখছিলেন। হঠাৎ সঞ্জয়ের এইভাবে তেড়েফুড়ে কেবিনে ঢুকতে দেখে তিনি থতমত খেয়ে গেলেন। সঞ্জয়ের চিবিয়ে চিবিয়ে বলা কথা গুলো শোনার পর তিনি মনে মনে বললেন , ‘ এর মধ্যে প্রোপজ ও করা হয়ে গেল ! , নিজের মনে কথা গুলো বলে সঞ্জয়ের উদ্দেশ্যে বললেন , “ এটা আমি শুনিনি। সত্যি কি না জানি না। তবে যদি সত্যি হয়-ও তাহলে অসুবিধা কোথায় ? „
ভুরু কুঁচকে ক্রুদ্ধ স্বরে সঞ্জয় বললো , “ অসুবিধা ! আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে আপনার ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেবেন । সে কথা আপনি ভুলে গেলেন ? „
সঞ্জয়ের রাগকে অগ্রাহ্য করে শান্ত কন্ঠে আকাশের বাবা বললেন , “ না ভুলিনি। আমার এখনও মনে আছে। কিন্তু আমার ছেলে যদি অন্য কাউকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চায় তাহলে আমি কি করতে পারি বলো ! „
ততোধিক রাগী স্বরে সঞ্জয় বললো , “ আপনি কি করতে পারেন মানে ! আপনি আমায় কথা দিয়েছিলেন। আপনার কথার কি কোন দাম নেই ? „
ততোধিক শান্ত স্বরে নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে আকাশের বাবা বললেন , “ আছে সঞ্জয়। আমার কথার দাম আছে। কিন্তু আমার ছেলের সুখ যে আমার কথার থেকে অনেক দামি। আমি কিভাবে একটা প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আমার ছেলের সুখ কেড়ে নেবো …..
হয়তো আকাশের বাবা আরও কিছু বলতেন। হয়তো বলতেন না। কিন্তু আকাশের বাবার পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই সঞ্জয় কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর রেগে অফিস থেকেই চলে গেল। সঞ্জয় রেগে আছে বটে তবে তার মাথা ঠিক কাজ করছে। অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার মাথায় সেই গোধূলির দেওয়া গোলাপ আর আকাশের বলা ‘ ধন্যবাদ , কথাটা ঘুরছে।
বহুদিন পর সুচি ধাবাতে বসে দুটো মাশালা ধোসা অর্ডার করলো । আকাশ এসে বসলে সুচি জিজ্ঞাসা করলো , “ বল এবার , বাবা আর কাকার মধ্যে কি নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল ? „
আকাশ কাঠের বেঞ্চে বসতে বসতে বললো , “ আগে খাবারটা তো অর্ডার কর ! নাকি…
আকাশের কথার মাঝে সুচি বলে উঠলো , “ আমি অর্ডার করে দিয়েছি। তুই বল । „
আকাশ সবকিছু আগাগোড়া বলতে শুরু করলো। গতকাল রাতে জেঠুর আসা। তারপর তার হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করা। তারপর একে একে বাবা আর জেঠুর ছোটবেলার কথা। ঠাকুর্দার কথা। জেঠাকে করা ঠাকুর্দার অপমান। সেখান থেকে কথা বন্ধ। ঠাকুমার কষ্ট পাওয়া। বাবার রেগে যাওয়া। নিজের ভুল বুঝতে পেরে জেঠুর কেঁদে ফেলা।
আকাশের কথার মাঝে সুচির অর্ডার করা ধোসা চলে এসছিল। কিন্তু কেউই খাওয়া শুরু করে নি। সব শোনার পর সুচির চোখের কোনায় জল দেখা দিল। বিশেষ করে ঠাকুমার কথা শোনার সময়েই চোখে জল এসছিল। চোখ মুছতে মুছতে সে বললো , “ আমি দেখেছি ঠাকুমাকে। তখন আমি খুব ছোট। আড়াই কি তিন বছর হবে আমার। মুখটা মনে নেই। আমাকে সবসময় কোলে নিয়ে আদর করতো। একটা কথা বলতো আমাকে । এখনও মনে আছে। বলতো , ‘ আমার নায়িকা সুচিত্রা সেন। , সেই প্রথম আমি শুনি যে আমার নাম একজন নায়িকার নামে রাখা। „
আকাশ একটু রেগে গিয়েই বললো , “ সবাই দেখেছে আমার ঠাকুমাকে। সবাই । শুধু আমি ছাড়া। „
আকাশের রাগের কারন সুচি বুঝতে পারলো। তাই সে বললো , “ ধোসা ঠান্ডা হয়ে গেছে । খেয়ে নে । „
আকাশ একটাই প্লেট দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ আমার প্লেট কোথায় ? „
সুচি হেসে বললো , “ প্লেট একটাই। ধোসা দুজনের । „ বলে সুচি খেতে শুরু করলো। সুচির দেখাদেখি আকাশও টুকরো টুকরো ছিড়ে সাম্বারে ডুবিয়ে খেতে শুরু করলো।
খাওয়া হয়ে গেলে আকাশ আর সুচি আবার অফিসের দিকে আসতে শুরু করলো। হঠাৎ আকাশের মনে পড়লো সেই ‘ যোগ্যতা , নিয়ে কথাটা। মনে পড়তেই সে সুচিকে জিজ্ঞাসা করলো , “ তখন তুই বাইকে কি বলছিলি ? আমি কোনটাকে যোগ্যতা মনে করি না কি যেন ! ….
“ তুই সকালে আমাকে বললি না যে , তুই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবি । তারপর কাকিকে তোর দলে নিয়ে কাকাকে রাজি করাবি । সেটাই জিজ্ঞাসা করছিলাম। কোন যোগ্যতা প্রমাণ করার কথা বলিছিল ? „
কিছুক্ষণ চুপ থেকে পায়ের নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাটতে হাটতে আকাশ বললো , “ এই যে আমি বড়ো হয়েছি। নিজের পায়ে দাড়াতে শিখে গেছি। একজনের দায়িত্ব নিতে পারবো এইসব । „
“ বড়ো হয়ে গেছিস কি হোসনি সেটা আলাদা প্রশ্ন। নিজের পায়ে কখন দাঁড়ালি তুই !? „
সুচির প্রশ্নে আকাশ অবাক হলো , “ মানে ! এই যে আমি চাকরি করছি। এটা কি ? „ বলে লিফ্টের জন্য বোতাম টিপে দিল।
“ এই চাকরিটা কি নিজের যোগ্যতা দেখিয়ে পেয়েছিস ! আমি যতদূর জানি তুই কাকার ছেলে বলে এই চাকরি পেয়েছিস। নিজের যোগ্যতা কখন প্রমাণ করলি তুই ? এই যে কলেজে পাঁচ বছর পড়ে MBA ডিগ্রি অর্জন করলি। ওটার কি দরকার ছিল ? কাকার ছেলে বলে আগেই তো অফিসে কাজ করতে পারতিস ! „
“ আমাকে কি কলেজের ডিগ্রি দেখিয়ে আমার কোম্পানিতেই ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি করার বলছিস ! „ বলতে বলতে দুজনেই লিফ্টে ঢুকে গেল।
“ এটাকেই যোগ্যতা বলে। কাকা একজন ব্যাবসায়ী মানুষ। সে কেন এমন একজনের হাতে তার কোম্পানি তুলে দেবে যে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেনি । আর তোর কোম্পানি হলে তুই মালিকের আসনে বসে থাকতিস। কিন্তু তুই বসে আছিস পিওনের চেয়ারে। কোম্পানিটা তোর বাবার। তোর না। কাকা চায় তার ছেলে খেটে কোম্পানি কে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে , মালিকের চেয়ারে বসার যোগ্যতা অর্জন করুক। কিন্তু সেরকম কোন চেষ্টা তুই কখনোই করিস নি ….
আকাশ খেয়াল-ও করলো না কখন সুচির ফ্লোর চলে এলো। সুচি নিজের ফ্লোরে ঢুকে গেলে আকাশও উপরে উঠে গেল। কিন্তু তার মাথার মধ্যে সুচির বলা শেষ কথাগুলো ঘুরতে লাগলো ।
সুচি আর আকাশ আধঘন্টা দেরিতে অফিসে ঢুকলো। সকালে দেরি করার জন্য সুচির বস তাকে বকলেও এখন কিছুই বললো না। এটা সুচি লক্ষ্য করলো। অন্যদিন হলে , এইরকম দেরি হলে তো আস্ত রাখতো না।
সঞ্জয় অফিস থেকে চলে যাওয়ার পর আর আসেনি। বাড়ি ফিরে সে এদিক ওদিক পায়চারি করতে লাগলো আর দুই বার গোধূলি কে ফোন করে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলে রাগে ফুসতে লাগলো। মাথা কাজ করছে না তার। গোধূলি গেছে দিদির বাড়িতে। মেয়ের আসার অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই এখন। তাই সে মেয়ের বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করতে লাগলো । গোধূলির মা একবার জিজ্ঞাসা করেছিল। কিন্তু সঞ্জয়ের রাগ দেখে আর কথা বাড়ায়নি ।
অফিস আওয়ার শেষ হওয়ার প্রায় এক ঘন্টা আগে আকাশ দেখলো যে বাবা বেরিয়ে যাচ্ছে । তাই সে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো , “ এখন চলে যাচ্ছো কেন ? „
ছেলের কেনোর উত্তর না দিয়ে তিনি বললেন , “ হ্যাঁ। তুই বাইকেই আসিস । „ বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে যাওয়ার পর অফিস আওয়ার শেষ হল । আকাশ একবার পুরো অফিস ঘুরে দেখে নিয়ে নিচে নেমে পার্কিংয়ে সুচির অপেক্ষা করতে লাগলো। বাকি সব এমপ্লয়ি কেউ স্কুটি , কেউ বাইক , কেউ গাড়ি বার করে চলে যেতে লাগলো। সুচি আসার পর আকাশ বাইকের চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিয়ে দিলে সুচি আকাশের পিছনে উঠে পড়লো। নিজেদের কোম্পানির এমপ্লয়ি এমনকি অন্য কোম্পানির এমপ্লয়িরাও দেখতে লাগলো এই দৃশ্য।
রাস্তায় নেমে কিছুদূর যাওয়ার পর আকাশ লক্ষ্য করলো সুচি বাইকের পিছনের হাত রেখে বসে আছে। আকাশ রেগে গিয়ে মনে মনে বললো , ‘ কোথায় একটু জড়িয়ে বসবে , তা না ! উনি বসেছেন কাকিমাদের মতো। , তারপরেই মনে পড়লো সকালে অফিস আসার সময়েও সুচি এইভাবেই এসছিল। ওকে একবারও জড়িয়ে ধরেনি।
এখন কথাটা মনে পড়তেই আকাশ ইচ্ছা করে ব্রেক চাপলো । হঠাৎ ব্রেক মাথায় সুচি আকাশের পিঠের উপর এসে পড়লো। বিরক্ত হয়ে সুচি বললো , “ দেখে চালা। „
আকাশ মিচকি হেসে কয়েক মিটার যাওয়ার পর আবার ব্রেক মারলো। এবার সুচি রেখে গিয়ে বললো , “ কি অসভ্যতামি হচ্ছে এসব ? আমি বুঝতে পারছি তুই ইচ্ছা করে করছিস এসব । „
“ অসভ্যতামি কোথায় ? আমি তোর হবু বর । কোথায় জড়িয়ে ধরে বসবি । তা না ! উনি বসেছেন কাকিমাদের মতো করে । „
“ আমি পারবো না। „
“ তাহলে আমিও ইচ্ছা করে ব্রেক মারবো । „ বলে একবার ব্রেক মারলো ।
আবার আকাশের পিঠের উপর পড়ে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে সুচি রাগী স্বরে বললো , “ পড়ে যাবো তো । „
“ আমাকে ধরে বসলে পড়বি না তো ! „
“ কাল থেকে আর তোর বাইকে বসবো না। আমার স্কুটি আছে । ওতেই আসবো । „
“ সে আসিস। কিন্তু আজকে আমাকে ধরেই বসতে হবে । না হলে পুরো রাস্তা আমি এইভাবেই ব্রেক মারবো। „ বলে আরও একবার আকাশ ব্রেক মারলো।
“ অসভ্যের ধারী একটা । লজ্জাশরম কিচ্ছু নেই। „
আরও দুই বার ব্রেক চাপার পর একরকম বাধ্য হয়েই সুচি আকাশকে জড়িয়ে ধরলো । লজ্জার কারনে সে চোখ বন্ধ করে ফেললো। আকাশকে জড়িয়ে ধরে বাইকে যেতে মোটেও খারাপ লাগছিল না তার। কিন্তু লজ্জা তো লাগবেই। তাই সে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল।
চোখ খোলা থাকলে সে দেখতে পেত যে , সোসাইটির বড়ো লোহার গেটের পাশের ফুটপাতে , লেম্পপোস্টের নিচে দাড়িয়ে , এক জোড়া ভুরুর শয়তান , তার দিকেই অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রাগে ফুসতে ফুসতে যে গালে সুচি চড় মেরেছিল সেই গালে একবার হাত বুলিয়ে নিল। আর প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলতে লাগলো তার মনে । মনে মনে সেই জোড়া ভুরুর শয়তান বললো , ‘ আমার গালে চড় মেরেছিলি তুই। ,
বিল্ডিংয়ের নিচে এসে আকাশ বাইক থামাতেই সুচি বাইক থেক নেমে উপরে উঠে গেল। আকাশও বাইকে থেকে চাবি খুলে নিয়ে উপরে এসে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে দেখলো সুচি আগে থেকেই তাদের ফ্ল্যাটের ভিতর ঢুকে চুপচাপ দাড়িয়ে আছে। আকাশ সুচিকে ওইভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো। সে তড়িঘড়ি নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখলো সুচি একভাবে সোফার দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশ সেখানে তাকিয়ে দেখলো জেঠু আর বাবা সামনাসামনি বসে আছে। আর তাদের মাঝের টেবিলে আছে একটা পুরানো আমলের কাঠের কারুকার্য করা সুন্দর দাবার বোর্ড। তাতে গুটি সাজানো। অর্থাৎ দুজনেই দাবা খেলছে।
এতক্ষণ পর আকাশ বুজতে পারলো কেন বাবা অফিস থেকে এক ঘন্টা আগে চলে এসছিল । আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সুচির মতো মা আর জেঠিমা-ও ওই দুজন দাবাড়ুর দিকেই তাকিয়ে আছে। সুচি আর আকাশকে দেখতে পেয়ে সুচেতা দেবী সুচির উদ্দেশ্যে বললেন , “ আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরেছিল। আমি বুঝতে পারি নি। হাত মুখ ধুয়ে চা খেয়ে এখানে এসে সেই যে বসলো , আধ ঘন্টা হয়ে গেছে কেউ কথা বলছে না । আমরা কথা বললে বিরক্ত হচ্ছে। সসসস বলে থামিয়ে দিচ্ছে। „
আরও কিছুক্ষণ থাকার পর সুচেতা দেবী সুচিকে নিয়ে চলে গেলেন। আকাশও হাত মুখ ধুতে চলে গেল।
সুচি ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ভাবলো বাবা আর কাকার দাবা খেলা দেখবে । এই সুযোগে দাবা খেলাটাও সে শিখে নিতে পারবে । বাবা যে দাবা খেলতে পারে এটা তো এতদিন জানতোই না সে। তাই সিড়ি দিয়ে উঠে আকাশদের ফ্ল্যাটের ভিতর মাকে দেখে কৌতূহলবশত সে ফ্ল্যাটের ভিতর ঢুকেছিল। তারপর বাবা আর কাকাকে ওইভাবে মগ্ন থাকতে দেখে খুব অবাক হয়েছিল। মুখ থেকে কথা সরছিল না তার।
ফ্রেশ হয়ে , নিজের খাটের উপর শুয়ে , ফোন ঘাটতেই তার দিদিকে ফোন করার ইচ্ছা হলো । দিদিকে ফোন করার পর বাবা কাকার দাবা খেলা দেখা যাবে ভেবে সে দিদিকে ফোন করলো। ফোন করার পর ওইপার থেকেই প্রথম গলার আওয়াজ এলো , “ হ্যাঁ বল । „
সুচি — কি করছিস ?
সুমি — আমি এই চা বানাচ্ছি। তোর জামাইবাবু এই এলো। তা হঠাৎ আমার কথা মনে পড়লো । কি ব্যাপার !
সুচি — মানে
সুমি — টানা দুদিন ফোন করিস নি। তাই জিজ্ঞাসা করছি ।
সুচি — ওই সময় হয়নি।
সুমি — সময় হয়নি নাকি আকাশের সাথে গল্প করছিলি।
সুচি — ওর সাথে আবার কি গল্প করবো !
সুমি — ন্যাকামি মারিস না। মা আমাকে সব বলেছে। আমি জানি সব। এমনকি আজকে রাতে পুরোহিত এসে তোদের বিয়ের তারিখ ঠিক করবে , সেটাও আমি জানি।
সুচি — এতোই যখন জানিস সবকিছু ! তখন এলি না কেন আজ ।
সুমি — যাওয়ার ইচ্ছা ছিল খুব। কিন্তু সময় পাচ্ছি না। এই রবিবার যাবো সবাই।
সুচির হঠাৎ প্রজ্ঞার কথা মনে পড়তে সে বললো , “ প্রজ্ঞা কোথায় রে ? „
“ এই নে । „ বলে সুমি একবার ‘ প্রজ্ঞা , বলে ডাকলো। সুচি সেটা ফোন কানে রেখেই শুনতে পেল। সুমি বললো , “ প্রজ্ঞা তোর মাসি ফোন করেছে। এই নে কথা বল। „
কিছুক্ষণ পরেই একটা মিষ্টি বাচ্চা মেয়ের গলা ভেসে এলো , “ মাসি ! তুমি কেমন আছো ? „
সুচি — আমি ভালোই ! তুই কেমন আছিস ?
প্রজ্ঞা — আমিও ভালো আছি। আমি কিন্তু লাগ করেছি তোমার উপর । কথা বলবো না তোমার সাথে।
প্রজ্ঞার বয়স তিন হতে যায়। এখনও তোতলায় । তবে খুব কম। প্রজ্ঞার মিষ্টি রাগ দেখে সুচি মজা পেল , “ কেন ! আমি কি করলাম ? „
প্রজ্ঞা — তুমি এই রবিবার আসো নি কেন ?
সুচি — আমার কাজ ছিল রে। সামনের রবিবার তো দিদি তোকে এখানে আনছে আমার কাছে। এবার রাগ কমলো তো !
প্রজ্ঞা — সত্যি !
সুচি — হ্যাঁ সত্যি। মাকে জিজ্ঞাসা কর না !
আরও প্রায় এক ঘন্টা পর দুজনের খেলা শেষ হলো। জিতলেন সুচির বাবা। চেক মেট বলার পরে তিনি বললেন , “ এখনও বাচ্চাদের মতো ভুল করলি তুই। আমি যখন মন্ত্রীকে স্যাক্রিফাইস করলাম তখনই তোর বোঝা উচিত ছিল। „ বলে হাসতে লাগলেন
আকাশের বাবা অজুহাত দেওয়ার জন্য বললেন , “ এত বছর পর খেলছি। এটা ফ্রি প্রাকটিস ম্যাচ ছিল । এখন আর একটা খেল । দেখবি তখন ! „
“ আমি চললুম খবর দেখতে। „বলে সুচির বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলেন। ঠিক তখনই রাধানাথ ঠাকুর এসে ঘরে ঢুকলেন আর সুচির বাবার মুখোমুখি হয়ে গেলেন। পুরোহিত কে দেখে খুশী হয়ে সুচির বাবা বললেন , “ আসুন আসুন। „ বলে ভিতরে নিয়ে এলেন।
আকাশের বাবা পুরোহিতকে দেখেই উঠে দাড়িয়ে পড়েছিলেন। এখন তার জন্য সোফাটা ছেড়ে দিয়ে বললেন , “ আপনি বসুন । „ তারপর আকাশের মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন , “ স্নেহা চা নিয়ে এসো। „
আকাশের বাবার কথায় পুরোহিত সোফায় বসলে সুচির বাবা বললেন , “ আপনি বসুন আমি সবাইকে ডাকছি। „
আকাশের মা ঘরেই ছিলেন। বেরিয়ে এসে দেখলেন পুরোহিত এসছে। তাই তিনি চা বানাতে চলে গেলেন। সুচির বাবাও তার স্ত্রী আর মেয়েকে ডাকতে চলে গেলেন । সোফায় বসে একটু জিরিয়ে নিয়ে রাধানাথ ঠাকুর বললেন , “ অনেক দিন পর এখানে এলাম । „
সত্যি বলতে কি আকাশের বাবাও অনেক দিন পর এই লোকটাকে দেখছেন। গায়ের রঙ আগের থেকে ফ্যাকাশে হয়েছে। ধবধবে সাদা চুল। মুখের চামড়া কোঁচকানো । চোখে একটা হাই পাওয়ারের চশমা। পরনে আছে একটা ধুতি আর গায়ে একটা হরে কৃষ্ণ নাম লেখা গেরুয়া চাদর জড়ানো। নয় নয় করেও ষাট সত্তর বছরের বেশি বয়স হয়ে গেল লোকটার।
স্নেহা দেবী চা করে নিয়ে এসে রাখলেন। রাধানাথ ঠাকুর আকাশের মাকে জিজ্ঞাসা করলেন , “ তোমার মেয়ের-ই তো বিয়ে ! „
স্নেহা দেবী হেসে বললেন , “ মেয়ের না। ছেলের । আমার ছেলের বিয়ে। „
পুরোহিত অবাক হয়ে বললেন , “ কিন্তু আমাকে তো মেয়ের কুষ্ঠি দেখতে ডাকলো। আমি কি ভুল বাড়ি ঢুকে পড়লাম। „
আকাশের বাবা হেসে বললেন , “ না আপনি ঠিক বাড়িতেই এসছেন । যার কুষ্ঠি দেখতে এসছেন। তার সাথেই আমার ছেলের বিয়ে । „
রাধানাথ ঠাকুর এখনও বুঝতে পারেননি। কিন্তু তিনি বিচক্ষণ লোক। তাই বুঝতে পারলেন যে ধীরে ধীরে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং সব বুঝতেও পারবেন। এইসব ভেবেই তিনি আকাশের মায়ের হাতের বানানো চায়ে চুমুক দিলেন।
সুচির বাবা সুচির মাকে নিয়ে এলেন। হাতে তার সুচির কুষ্ঠি আর একটা পঞ্জিকা আছে। সুচিকে একবার তিনি ডেকেছিলেন । তার উত্তরে সুচি লজ্জা পেয়ে বলেছে , “ তোমরা যাও আমার ভালো লাগছে না। „
সুচির বাবা ঘরে এসে রাধানাথ ঠাকুরের সামনে কুষ্ঠি আর পঞ্জিকা ধরে বললেন , “ এই নিন । „
রাধানাথ ঠাকুর পঞ্জিকা নিয়ে দিন দেখতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞাসা করলেন , “ তোমরা কোন মাসে তারিখ চাইছো ? „
আকাশের মা বললেন , “ দুই তিন মাস পর হলে আমাদের সুবিধা। সবকিছু আয়োজন করতে একটু সুবিধা হবে। „
আর একবার পঞ্জিকা দেখে পুরোহিত বললেন তাহলে মে মাসের নয় থেকে বারো সবকটা দিন ভালো আছে। সেই দিন গুলোর মধ্যে একটা বেছে নাও বলে সুচির কুষ্ঠি তুলে নিলেন আর বললেন , “ পাত্রের কুষ্ঠি কোথায় ? „
আকাশের মা , “ আনছি। „ বলে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন । আলমারি খুলে ছেলের কুষ্ঠি বার করে এনে দিলেন। রাধানাথ ঠাকুর দুটো কুষ্ঠি মিলিয়ে বললেন , “ পাত্রীর রাশি সিংহ আর পাত্রের মেষ। সব ঠিক আছে। কিন্তু মেয়ের বয়স বেশি , আর ছেলের কম দেখাচ্ছে তো ! „
আকাশের মা বললেন , “ হ্যাঁ আমার ছেলের বয়স তেইশ। আপনি ওর অন্নপ্রাশনের দিন কুষ্ঠি দেখে বলেছিলেন ওকে তেইশ বছরে বিয়ে দিতে। তাই । „
“ ও .. কি বলেছিলাম তা মনে নেই। তবে এখন কুষ্ঠি দেখেও সেটাই বলছি। এ ছেলের বিয়ে এই তেইশেই দিলে ভালো। সারাজীবন সুখে ঘর করতে পারবে। „ তারপর একটু ইতস্তত করে বললেন , “ পাত্রীর কুষ্ঠীতে একটা বিপদ দেখতে পাচ্ছি। মোটেও ভালো লাগছে না । „
সুচেতা দেবীর বুক কেঁপে উঠলো , মুখটা নিমেষের মধ্যে রক্তশূন্য হয়ে উঠলো , “ কি বিপদ দাদা ? „
“ পাত্রীর বিয়ের আগে একটা ফাঁড়া আছে । „
“ কিরকম ফাঁড়া ? „
“ একটা ক্ষতি। কিরকম ক্ষতি সেটা বুঝতে পারছি না। সব যদি এইভাবে বোঝা যেত তাহলে তো … „ বলে চুপ করে গেলেন ।
ঘরের মধ্যে সবারই এখন বুক শুকিয়ে গেছে। সুচেতা দেবী কাঁপা গলায় বললেন , “ কিছু তো বলুন । এর থেকে কিভাবে আমার মেয়েকে বাঁচাবো সেটা বলুন । „
“ আমি বুঝতে পারছি না । ও নিজেই উপায় বার করবে। আর কিছু বলতে পারছি না । „
আরও কিছুক্ষণ থেকে সুচির বাবার কাছ থেকে প্রণামী নিয়ে রাধানাথ ঠাকুর চলে গেলেন। তেইশ বছর আগে তিনি একটা বোম মেরে চলে গেছিলেন। এখন তার থেকেও বড়ো বোম মেরে চলে গেলেন। ঘরে শ্মশানের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে , কারোর মুখে আর একটাও কথা নেই। সবাই থম মেরে গেছে। কি বিপদ ? সেটাই সবার মাথায় ঘুরছে। আকাশের বাবা এটাকে অবিশ্বাস করার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু বিপদ শব্দটাই বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সুচেতা দেবী সেই যে চুপচাপ হয়ে গেলেন আর কথা বললেন না ।
রাত প্রায় আটটার সময়ে গোধূলি বাড়ি ফিরলো। বাড়ি ঢুকতেই গোধূলির মা এসে বললো , “ দেখ না কি হয়েছে ! সেই যে অফিস থেকে ফিরলো , তখন থেকেই এরকম আচরণ করছে তোর বাবা । „
ফোনেই বাবার গলা শুনি গোধূলি বুঝতে পেরেছিল যে কিছু একটা হয়েছে। এখন মায়ের মুখে বাবার আচরণ শুনে সে গম্ভীর হয়ে গেল , “ দাড়াও , আমি জিজ্ঞাসা করছি। „
তারপর বাবার ঘরে গিয়ে দেখলো তার বাবা এক জায়গায় স্থির নেই। সারাঘর পায়চারি করছে। ওইভাবে পায়চারি করতে দেখে গোধূলি জিজ্ঞাসা করলো , “ কি হয়েছে বাপি ? এরকম করছো কেন ? „
গোধূলি কে দেখেই সঞ্জয় ফেটে পড়লো , “ কি হয়েছে ! আকাশ আর একটা মেয়েকে প্রোপজ করেছে। আর তুই জিজ্ঞাসা করছিস কি হয়েছে ! „
গোধূলি বাবার কথা শুনে বুঝতে পারলো যে আকাশ নিশ্চয়ই সুচিত্রা কে প্রোপজ করেছে। তাই সে বললো , “ হ্যাঁ প্রোপজ করেছে। তাতে অসুবিধা কোথায় ? „
সঞ্জয়ের মাথা ঠিক নেই। চোখ লাল হয়ে উঠেছে , “ অসুবিধা ! আমার এতদিনের অপেক্ষা , এতদিনের প্ল্যান সব জলে ডুবে গেল আর তুই ….
বাবার কথার কোন মানেই গোধূলি বুঝতে পারলো না। তাই তার ভুরু কুঁচকে গেল , “ কিসের অপেক্ষা ? কিসের প্ল্যান ? বাপি আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ! „
“ তোর সাথে আকাশের বিয়ের প্ল্যান। এটার জন্যেই তো আমি এত বছর অপেক্ষা করেছি …
গোধূলি অবাক হয়ে বললো , “ বাপি তুমি , আমার আর আকাশের বিয়ের জন্যে এতদিন অপেক্ষা করেছিলে ! „
“ তুই তো ওকে গোলাপ দিয়েছিলি। ও সেটা নিয়ে thank you ও বলেছিল। তাহলে হঠাৎ ও সুচিত্রা কে কেন প্রোপজ করলো ? তুই জানিস কিছু ? „
“ হ্যাঁ ও সুচিত্রাকে ভালোবাসে। তাই প্রোপজ করেছে। আকাশ আমাকে বলেছিল ও সুচিত্রা কে ভালোবাসে। „
সঞ্জয় প্রায় পাগল হয়ে গেল , “ না , না , না , আমার স্বপ্ন ! আমার এতদিনের সবকিছু এইভাবে তছনছ হতে পারে না ! „
গোধূলি বাবার কথায় আরও অবাক হলো , “ কি বলছো কি তুমি বাপি ? কি তছনছ হয়েছে ? কোন স্বপ্নের কথা বলছো ? „
নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না সে। বদ্ধ উন্মাদের মত সব সত্যি বলে দিল সঞ্জয় , “ আমি চেয়েছিলাম তোর সাথে আকাশের বিয়ে হবে। তারপর ওই সম্পত্তি সব শুধু আমি ভোগ করবো। শুধু আমি । „
বাবা যে পাগল হয়ে গেছে সেটা বুঝতে পেরে এবং বাবার কথার মানে বুঝতে পেরে গোধূলি কেঁদে ফেললো। দুই গালে চোখের জলের রেখা দেখা দিল । কাঁদতে কাঁদতে সে বললো “ তুমি আমাকে একটা পন্য হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছো বাপি ! আমি শুধু তোমার কাছে সম্পত্তি পাওয়ার চাবিকাঠি ছিলাম এতদিন ! তুমি আমাকে ভালোবাসোনি কখনো। আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার সুখের জন্য আমাকে আকাশের সাথে সম্পর্কে যেতে বলছো। এখন দেখছি সেটাও তোমার এক জঘন্য প্ল্যান ছিল। i hate you বাপি। i hate you… বলে দৌড়ে উপরের তলায় নিজের ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে দিল। বিছানায় এসে উপুড় হয়ে শুয়ে চোখের জলে বালিশ ভেজাতে লাগলো।
এদিকে সঞ্জয় মেয়ের কথায় এতক্ষণ পর নিজের হুশ ফিরে এলো। গোধূলির বলা কথা গুলো তার মাথায় ঘুরতে লাগলো। “ পণ্য , হ্যাঁ , পণ্য হিসাবেই তো ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম নিজের মেয়েকে । „ বিড়বিড় করে কথা গুলো বলে , ঘরের মধ্যে রাখা সোফার উপর ধপ করে বসে পড়লো ।
Update 8
প্রায় দু ঘন্টা দিদি আর একমাত্র বোনঝির সাথে কথা ফোন রাখলো সুচি। ফোন রাখার পর থেকে দিদির বলা কথাটাই মাথাতে ঘুরছে । কথাটা সে নিজে ভাবেনি এমন নয়। তবে এখন দিদির বলাতে সেটা আরও ভাবিয়ে তুলেছে।
কথাটা হলো পলাশের ব্যাপারে আকাশকে জানানো । এতো বড়ো একটা ঘটনা ঘটে গেছে , সেটা ওকে জানানো উচিত এটা আগেও ভেবেছিল সুচি । এখন দিদির বলাতে কথাটা আকাশকে জানাতেই হবে এই সিদ্ধান্তে এলো সুচি। কিন্তু কিভাবে বলবে সে ? কিভাবে ওই ঘটনার বর্ণনা করবে সেটাই চিন্তা ফেলছে সুচিকে । এইসব ভাবতে ভাবতে সে বাবা আর মায়ের ফিরে আসার আওয়াজ শুনতে পেল।
সঙ্গে সঙ্গে সুচির মনটা এক অজানা আনন্দে নেচে উঠলো। না অজানা আনন্দ নয় , জানা আনন্দ। বিয়ের তারিখ পাকা হওয়ার আনন্দ। তারিখ কবে সেটা জানার খুব ইচ্ছা হলো সুচির । কিন্তু মাকে জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা পেল। তাই সে ঘরের বাইরে গিয়ে , লিভিংরুমে রাখা তাদের একমাত্র টিভিটা চালিয়ে সোফায় বসলো , যদি বাবা মায়ের কিছু কথা শোনা যায় এই আশায়। কিন্তু সদ্য রাধানাথ ঠাকুরের বলা কথা বা ভবিষ্যৎবাণীর ফলে সুচির বাবা মা থম মেরে গেছেন। কি বলবেন সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না তারা। বাথরুমে গিয়ে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে এসে মেয়ের পাশে বসে সিনেমা দেখতে লাগলেন।
তিনি আকাশের বাবার মতোই এটাকে অবিশ্বাস করার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু বিপদ শব্দটাই একজন মানুষকে কাবু করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। মেয়ের কিরকম বিপদ হবে সেটা ভাবতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল। সুচি সোফায় বসে টিভি দেখতে দেখতে একবার আনমনে বাবার দিকে তাকালো। সুচি দেখলো যে তার বাবার মুখে একটা দুঃশ্চিন্তার ছাপ। পিছন ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে মায়ের মুখ দেখার চেষ্টা করলো সে। সুচেতা দেবী রাতের খাবার গরম করতে ব্যাস্ত , তাই সুচি মায়ের মুখ দেখতে পেল না ।
বাবা মায়ের নিস্তব্ধতা দেখে সুচির ভুরু কুঁচকে গেল , ‘ হঠাৎ কি এমন হলো যে বাবা এইভাবে বসে আছে ! আর মা বাবা হঠাৎ চুপ মেরে গেল কেন ? কিছুক্ষণ আগে তো খুব খুশি ছিল আমার বিয়ে নিয়ে। নিশ্চয়ই ওই ঘরে কিছু হয়েছে। , কিন্তু বাবাকে জিজ্ঞাসা করবে তারও উপায় নেই। তাই আবার ভাবলো , ‘ কাকে জিজ্ঞাসা করা যায় ! আকাশ। ,
আকাশের কথা মাথাতে আসতেই সুচি টিভির সামনে থেকে উঠে , নিজের ঘরে চলে এলো। খাট থেকে ফোনটা তুলে আকাশকে ফোন করলো। রিং হচ্ছে কিন্তু ফোন তুলছে না । বারকয়েক ফোন করার পরেও যখন আকাশ ফোন রিসিভ করলো না তখন সুচি রেগে গেল।
আকাশ ফোন তুলছে না কারন সে ডিনার করতে বসে গেছে । এদিকে সুচির মা সুচিকে ডিনার করতে ডাকলে সেও মাথা ভর্তি রাগ আর বুক ভর্তি দুঃশ্চিন্তা নিয়ে রাতের খাবার খেতে চলে গেছে।
আধ ঘন্টা পর আকাশ ডিনার করে এসে ফোনটা হাতে তুলে নিল। তারপর ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই সুচির চারটে মিসকল দেখে খুব অবাক হলো। সঙ্গে সঙ্গে সে সুচিকে ফোন করলো। দুবার ফোন করার পর সুচি ফোনটা ধরলো। এতক্ষণ পর আকাশের কলব্যাক দেখে রাগে গর্জে উঠে সুচি বললো , “ এতক্ষণ কি করছিলি তুই ? চার বার ফোন করেছি। চুরি করতে গেছিলি বুঝি ! „
সুচির রাগ দেখে আকাশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে খেল , “ চুরি করতে যাবো কেন ? ডিনার করছিলাম । বল কি বলবি ? „
“ তোদের ঘর থেকে আসার পর থেকে মা বাবা চুপ করে আছে । কি হয়েছে ওখানে ? সত্যি করে বলবি। „
আকাশ বুঝতে পারলো নিশ্চয়ই পুরোহিতের কথাতেই জেঠু আর জেঠিমা এরকম আচরণ করছে। কিন্তু পুরোহিতের কথা সুচিকে বলবে কি করে সেটাই আকাশ ভেবে পেল না। তাই সে আমতা আমতা করে বললো , “ তেমন কিছু তো হয়নি । ওই তোর আর আমার কুষ্ঠি দেখলো । তারপর পঞ্জিকা দেখে বিয়ের তারিখ বললো । „
আকাশকে আমতা আমতা করতে দেখে সুচি বুঝতে পারলো যে সে নিশ্চয়ই কিছু লুকাচ্ছে , “ তুই কিছু লুকাচ্ছিস । সত্যি করে বল ওখানে কি হয়েছে ? „
নিরুপায় হয়ে মিইয়ে যাওয়া গলায় আকাশ সব বলে দিল। সব শুনে সুচি হাসতে হাসতে বিছানায় লুটোপুটি খেতে লাগলো। হাসির জন্য পেটে ব্যাথা করতে শুরু করলো। হাসির চোটে চোখ দিয়ে এক ফোটা জলও বেরিয়ে এলো। হাসি যখন সয়ে এলো তখন সুচি বললো , “ তুই এইসব কুসংস্কার বিশ্বাস করিস না কি ! „
আকাশ এতক্ষণ চুপচাপ সুচির হাসি শুনছিল। যে কথাটা নিয়ে মা বাবা জেঠু জেঠিমা সবাই দুঃশ্চিন্তা করছে , সুচি সেই কথাটাকেই হাসির কথা বানিয়ে ফেলেছে। তাই সে রেগে গিয়ে বললো , “ এই কুসংস্কারের জন্যেই কিন্তু আমার আর তোর বিয়ে হচ্ছে। „
আকাশের রাগ দেখে সুচি শান্ত হলো। খাটের উপর রাখা পাশ বালিশটা জড়িয়ে ধরে সুচি বললো , “ আচ্ছা ঠিক আছে। বিয়ের তারিখ কবে ঠিক হলো সেটা বল ? „
আকাশ এবার লজ্জা পেতে শুরু করলো , “ মে মাসের নয় থেকে এগারোর মধ্যে যেকোন একটা দিন বেছে নিতে বলেছে। „
কোলবালিশটাকে আরও ভালো করে জড়িয়ে ধরে তার নিশ্বাস বন্ধ করে দিয়ে সুচি বললো , “ ও , মানে এখানও প্রায় আড়াই মাস। „ তারপর গম্ভীর হয়ে বললো , “ ও হ্যাঁ , তোর সাথে একটা জরুরি বিষয়ে কথা ছিল । „
কি এমন জরুরি বিষয় থাকতে পারে সেটা ভেবে আকাশের ভুরু কুঁচকে গেল , “ কি বিষয়ে ? „
“ এই যে আমি আর তুই , তুই তোকারি করে কথা বলি। ওটা আর চলবে না। বন্ধ করতে হবে। „
সুচির কথা শুনে আকাশের ভুরু চোখের উপর চলে এলো , “ মানে ! তাহলে কি বলে ডাকবো ? „
“ কেন ! তুমি করে বলবি । „
“ আমি পারবো না । এইভাবে বললে হয় নাকি ! ছোটবেলা থেকে তুই তুই করে বলে এসছি । কতো মারপিট করেছি একসাথে। এখন হঠাৎ লাতুপুতু হয়ে তুমি করে বলবো। ধুর ভাবতেই কেমন একটা গা গুলিয়ে উঠছে। „
“ বলতে তো তোকে হবেই। এমনিতেও আমি তোর থেকে সাড়ে তিন বছরের বড়ো। তাই উচিত তোর উচিত আমাকে তুমি করে বলা। „
“ আমি পারবো না। আমার ঘুম পাচ্ছে। কালকে ঘুমাইনি। রাখছি । „ বলে সুচির মুখের উপর ফোনটা কেটে দিয়ে , ঘরের লাইট নিভিয়ে , মশারি না টাঙিয়েই শুয়ে পড়লো। আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়েও পড়লো।
আকাশ মুখের উপর ফোন কেটে দেওয়ায় সুচি রেগে গেল না। সত্যি আকাশ গতকাল ঘুমায়নি। আজ মাঝে মাঝে আকাশকে হাই তুলতে দেখছিল সুচি । ‘ তুমি করে তো ওকে বলতেই হবে। হ্যাঁ , প্রথম প্রথম একটু কেমন একটা লাতুপুতু মতো লাগবে। এত বছরের অভ্যাস রাতারাতি তো বদলানো যায় না। , এইসব ভাবতে ভাবতেই সুচিও ঘুমিয়ে পড়লো।
এদিকে সুচেতা দেবী বিয়ের খবর জানানোর জন্য তার ভাইদের অর্থাৎ সুচির মামাদের ফোন করলেন। আজ দিনের বেলায় ফোন করার কথা ছিল। কিন্তু আকাশের মায়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে আর ফোন করা হয়নি। তাই এখন সময় পেয়ে তিনি ফোন করলেন। প্রথম ফোনটা করলেন বড়দাকে। ও প্রান্তে বৌদি অর্থাৎ সুচির বড় মামি ফোনটা ধরে বললো , “ হ্যাঁ , বলো । „
সুচির মা — বৌদি , দাদা কোথায় ?
বড়ো মামি — আমাকে বললে হবে না !
বৌদির খোটা দেওয়া কথা গায়ে না মেখে সুচির মা বললেন , “ আজকে সুচির জন্য পাত্র ঠিক করলাম। সেটা বলতেই ফোন করেছি । „
বড়ো মামি — ও এতো খুবই সুখবর । পাত্র কি করে ।
সুচির মা — তোমরা কালকে এসো না সবাই মিলে। তখন সব শুনবে। এমনিতেও অনেক দিন আসোনি তোমরা।
বড়ো মামি — ঠিক আছে । আমি বলছি তোমার দাদাকে ।
সুচির মা — কাল মনে করে এসো কিন্তু তোমরা। মেজদা আর ছোটদাকেও খবরটা জানাতে হবে। রাখছি।
বড়ো মামি — ঠিক আছে রাখো
পরের দিন সকালে আকাশকে কিছু না বলে নিজের স্কুটি নিয়ে সুচি অফিস চলে গেল। ‘ আগের দিন রাস্তায় যেভাবে অসভ্যের মতো প্রেক্ষিতে মারছিল ইসসস। আর ওর বাইকে চড়া যাবে না। , ঠিক এই কথাটা নিজের মনে বলে সুচি স্কুটি স্টার্ট দিয়েছিল ।

সুচি অফিস চলে গেলেও সুচির বাবা গেলেন না। বাড়িতে আত্মীয় আসবে এটা জেনেও উনি অফিস কিভাবে যাবেন । ঠিক এগারোটার দিকে সুচির বড়ো মামা মামী , তাদের একমাত্র ছেলে আর মেজ মামা এলো।
সুচির মা চা করে বিস্কুট আর গরম গরম সিঙাড়া সহযোগে , ট্রেতে সাজিয়ে আত্মীয়ের সামনে আনলেন।
সুচির বড়ো মামার বয়স প্রায় পঁচাত্তর হতে যায়। চেহারা দেখলেই বয়সের আন্দাজ পাওয়া যায়। তিনি একটা কাপ তুলে নিয়ে সুচির বাবাকে জিজ্ঞাসা করলেন , “ ছেলের নাম কি ? „
সুচির বাবা বললেন , “ আকাশ। এইতো পাশের ফ্ল্যাটে থাকে । „
সুচির বড়ো মামা অবাক হয়ে বললো , “ পাশের ফ্ল্যাটে ! আর কোথাও ছেলে পেলি না ? পুরো পাশের বাড়ি ! „
সুচির বাবা চোখ নামিয়ে বললেন , “ সুচির ওকেই পছন্দ। „
“ পছন্দ মানে ভালোবেসে বিয়ে ! „
সুচির বাবা একটা সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়ে বললেন , “ হ্যাঁ । ছোটবেলা থেকে দেখে এসছি। ভালো ছেলে । কোন বাজে অভ্যাস নেই। „
“ আজকালকার ছেলে মেয়ে সব। ছেলে কি করে ? „
সুচির বাবা তার বড়ো শ্যালককে একটু সমীহ করেন। সরকারি অফিসের খুব বড়ো কর্মচারী ছিল তার এই শ্যালক। সেখান থেকেই এই অতিরিক্ত সম্মান। তাই এই ধরনের জিজ্ঞাসাবাদে বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ না করে তিনি বললেন , “ আকাশের বাবার বিজনেস আছে। ওখানেই বাবাকে সাহায্য করে। „
আরও কিছুক্ষণ এদিক ওদিকের কথা বলে সুচির মেজ মামা জিজ্ঞাসা করলেন , “ আকাশের বয়স কতো ? মানে চার পাঁচ বছরের পার্থক্য এখন থাকা ভালো। না হলে বিয়েটা ইমমেচিউর হয়ে যায়। টেকে না । „
সুচির বাবা কিছুটা সংকোচ করে বললেন , “ আকাশের বয়স তেইশ । „
“ তেইশ ! „ সুচির বড়ো মামি যেন লাফিয়ে উঠল । এতক্ষণ পর একটা খুদ চোখে পড়ায় সেটা তিনি হাতছাড়া করতে রাজি হলো না , “ আমাদের সুচির বয়স তো ছাব্বিশ সাতাশ মতো হবে। „
সুচির বাবা এবার একটু বেশি বিরক্ত হলেন “ হ্যাঁ , পাঁচ মাস পর সুচি সাতাশে পড়বে । „
সুচির বড়ো মামা বললো , “ আক্কেলটা কবে হবে শুনি ! একটা বাচ্চার সাথে বিয়ে দিচ্ছিস। যদি মেয়ে বিয়ে দেওয়ার এতোই তাড়া থাকে , তাহলে আমাকে বল । আমি ছেলে দেখে দিচ্ছি। আমাদের ওখানে অনেক অনেক ভালো ভালো ছেলে আছে । „
এতোক্ষণ পর সুচির মা মুখ খুললেন , “ তুমিই তো আমার বাইশ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছিলে । তখন তোমার আক্কেল কোথায় ছিল ! হ্যাঁ সুচি আর আকাশ একে অপরকে ভালোবাসে। এই গত কয়েক বছর ওদের মধ্যে কথা বন্ধ ছিল। তখন আমি দেখেছি আমার মেয়ের মুখ । আর আমি সেই মুখ দেখতে চাই না। মে মাসের দশ তারিখ বিয়ে। সময় হলে এসো। এমনিতেও তো আমি মরে গেছি কি বেঁচে আছি সে খবর নাও না। „ সুচির মা একটানা এতো গুলো কথা বলে গরম নিশ্বাস ছাড়তে লাগলেন ।
সুচির বড়ো মামি ব্যাঙ্গ করে বললো , “ বিয়ের তারিখ পর্যন্ত যখন ঠিক করে ফেলেছো ! তখন আমাদের ডাকলে কেন ? বিয়েটাও তো দিয়ে দিতে পারতে । „
“ আমি তোমার মতো সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিতে পারি নি। তাই তোমাদের ডেকেছি। ….
ঠিক আড়াই কি তিন বছর আগে , সুচেতা দেবীর বাপের বাড়ির জমি ভাগাভাগি নিয়ে একটা ঝামেলা হয়েছিল। তিন ভাই নিজের নিজের সুবিধা মতো ভাগ করে নিয়ে , একমাত্র বোনের জন্য যা রেখেছিল তা খুবই সামান্য। তখন মায়ের হয়ে সুমি প্রতিবাদ করে । তখন সুমিকে অনেক ছোট বড়ো কথা শোনায় সুমির এই বড়ো মামি। পরে সুমি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললে একরকম বাধ্য হয়ে সুচির বড়ো মামাকে নিজের ভাগ থেকে কিছুটা অংশ দিয়ে দিতে হয়। তখন থেকেই এই ননদ বৌদির মধ্যে একটা ঝামেলা লেগেই আছে।
এখন আবার সেইসব পুরানো কথা শুরু হচ্ছে দেখে শান্তশিষ্ট সুচির বাবা দুজনকে থামাতে গেলেন। সুচির মাকে বললেন , “ তুমি একটু শান্ত হও। অতিথিদের সাথে এইরকম করো না। „
কোনওরকমে সবাইকে শান্ত করিয়ে , তাদেরকে খালি মুখে নেমন্তন্ন করে এবং , “ তোমরা না আসলে বিয়ে সম্পূর্ণ হবে না । „ এই ধরনের কথা বলে সবাইকে বিদায় জানালেন সুচির বাবা।
এদিকে আকাশের মাও তার একমাত্র ভাইকে বিয়ের খবর জানালেন। আকাশের মামার কাজ থাকায় তিনি বিয়ের সময়েই যেতে পারবেন বলে দিলেন। এতে আকাশের মা তার ভাইয়ের উপর রেগে গেলেন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এদিকে সারাদিনে সুচি আকাশকে একটাও মেসেজ করে নি। যেমন একা একা নিজের স্কুটিতে অফিস চলে গেছিল তেমন একা একাই চলেও এসছিল। সুচির এরকম আচরণের কোন অর্থ আকাশ ভেবে পেল না। তাই অফিস থেকে ফিরে , ফ্রেশ হয়ে , সুচির ঘরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সেই মত আকাশ সুচির ফ্ল্যাটে ঢুকেও পড়লো। সুচির ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখলো সুচির মা বাংলা সিরিয়াল দেখছে। আকাশ জিজ্ঞাসা করলো , “ জেঠিমা , সুচি কোথায় ? „
সুচির মা আনমনে জবাব দিলেন , “ সুচি নিজের ঘরে আছে। „
আকাশ সুচির ঘরের দিকে পা বাড়াতেই , সুচির মা হঠাৎ তেড়েফুড়ে সোফা থেকে উঠে এসে , আকাশকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন “ কোথায় যাচ্ছিস ? „
আকাশ জেঠিমার এমন ব্যাবহারে খুব অবাক হলো , “ সুচির কাছে । একটা দরকারী কথা বলবো । „
“ সব বুঝি তোদের দরকারী কথা। এসব দরকারী কথা বিয়ের পর বলবি । যা , নিজের ঘরে যা । „ বলে আকাশকে একরকম খেদিয়ে দিলেন।
আকাশ লজ্জা পেয়ে নিজের ঘরে চলে এলো। কি বলতে গেছিল ! আর জেঠিমা কি ভেবে তাকে তাড়িয়ে দিল। নিজের ঘরে এসে সোজা সুচিকে ফোন করলো । সুচি ফোনটা ধরে বললো , “ কি হয়েছে ? মায়ের সাথে কি নিয়ে কথা বলছিলি ? „
“ কি হয়েছে সেটা তো তুই বলবি। সকালে একা অফিস চলে গেলি …
আকাশের কথার মাঝে সুচি বলে উঠলো , “ যতক্ষণ না তুই আমাকে তুমি করে বলছিস , ততক্ষণ তোর সাথে আমার কোন কথা নেই । „ রাখ ফোন। „ বলে ফোনটা কাটতে গেল। তখনই আবার সেই কথাটা মনে পড়তেই সে বললো , “ ছাদে আয় কথা আছে। „
“ কি কথা ? „
সুচি অধৈর্য হয়ে বললো , “ আয় না ছাদে। সব জানতে পারবি । „
“ আসছি । „ বলে ফোনটা কেটে দিয়ে আকাশ ছাদে চলে এলো।
সুচিও কয়েক মিনিটের মধ্যে ছাদে এসে দেখলো অন্ধকারে আকাশ দাঁড়িয়ে আছে। তার পায়ের আওয়াজ শুনে আকাশ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো , “ বল কি বলবি ? „
সুচি , অন্ধকার কালো আকাশে তাকিয়ে , উজ্জ্বল নক্ষত্রদের আলোর ঝিকিমিকি খেলা দেখতে দেখতে বললো , “ আমি জানি না তুই কিভাবে রিয়েক্ট করবি ! কিন্তু তোকে কথাটা বলাটা দরকার । „
আকাশের ভুরু কুঁচকে গেল , “ কি কথা ? „
সুচি আবার রাতের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটাকে শক্ত করে বললো , “ কয়েক মাস আগে আমার পলাশের সাথে দেখা হয়েছিল । „
সুচির কথার মাঝখানে আকাশ জিজ্ঞাসা করলো , “ কে পলাশ ? „
“ বলছি সব । „ বলে সব বলতে শুরু করলো। কলেজ ফাংশনে পলাশের সাথে দেখা। পলাশের যেচে এসে আলাপ করা। ওর বারবার মেসেজ করা। আকাশের সাথে গোধূলিকে দেখে পলাশের সাথে ডেটে যাওয়া । একসাথে খাবার খাওয়ার পর কিস করা ….
এতোটা চুপচাপ শোনার পরেই আকাশের মনটা বিষিয়ে উঠলো। মুখটা ঘৃণায় কুঁচকে গেল । পলাশের সাথে ঘটা পরের ঘটনা শোনার আগেই আকাশ বললো , “ এতো কিছু করার পর আমাকে না বললেই পারতিস । „
কথাটা বলে আকাশ নিচে নিজের ঘরে চলে এলো। পিছন ঘুরে যদি একবার সুচির মুখের দিকে তাকাতো তাহলে সেই মুখে চোখের জল দেখতে পেত। সুচি জানে , আকাশ এখনও জীবনের এইসব বিষয়ে কিছু বোঝেনা। এখন আকাশের বলা কথায় সুচির মনে ভয় ঢুকে গেল। যদি আকাশ বিয়েটাই ভেঙে দেয়।
আকাশ নিজের ঘরে এসে , ডান কনুই দিয়ে চোখ ঢেকে , বিছানার উপর শুয়ে পড়লো। আর মনে মনে ভাবতে লাগলো ‘ ছি্ আমার অনুপস্থিতিতে একজন অচেনা মানুষের সাথে এইসব ছি্ … এটা কিভাবে করলো ও ! ,
হঠাৎ একটা যান্ত্রিক কর্কশ আওয়াজে আকাশের ধ্যান ভাঙলো। চোখ খুলে দেখলো সুচি ফোন করেছে। ধরতে ইচ্ছা হলো না। এদিকে চোখে জল নিয়ে সুচি বারবার ফোন করে যেতে লাগলো। সুচি বারবার ফোন করায় আকাশ ফোন সাইলেন্ট করে দিল। একসময় ক্লান্ত হয়ে সুচি ফোন করা বন্ধ করে দিল।
দুই তিন ঘন্টা পর ডিনার করার জন্য মায়ের ডাক কানে আসলে , সে উঠে বাথরুমে গিয়ে চোখে জলের ঝাপটা দিল। বারবার চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে বসলো। কিছুক্ষণ খাওয়ার পর তার মাথাতে এলো , ‘ আজ যদি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতো ! তাহলে এই দিন দেখতে হতো না। সুচিকে অনেক আগেই নিজের করে নিতে পারতো। অপবিত্র হতে হতো না। , কথাটা ভাবতেই সে বাবাকে বললো , “ আমার জন্য একটা অন্য পোস্ট দেখো। আমি এই কাজ আর করবো না । „
হঠাৎ ছেলের মুখে এইসব শুনে আকাশের বাবা একটু বেশিই অবাক হলেন। তার ছেলে প্রতিবাদী নয়। কিন্তু আজ প্রতিবাদ করছে। তাই অবাক হয়ে মাছের কাঁটাটা মুখ থেকে বার করে বললেন , “ হঠাৎ এই কথা ! „
“ আমি ওই কাজ করতে পারবো না। আমার অসুবিধা হচ্ছে । „
“ আমার কিন্তু সুবিধা হচ্ছে । „
আকাশ বুঝতে না পেরে এক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। ছেলের দৃষ্টির অর্থ অনুধাবন করতে পেরে তিনি বললেন , “ তোর অফিসে আসার আগেই আমাদের একটা ডিল হাতছাড়া হয়েছিল। সিঙ্গাপুরে তখন একটা হোটেল লিজে নেওয়ার কথা চলছিল। কি করে খবরটা লিক হয়ে গেছিল জানি না । মাত্র দশ লাখ অর্থাৎ সিঙ্গাপুরের ডলারের হিসাবে পনের না সতেরো হাজার ডলারের জন্য আমাদের কাছ থেকে হোটেলটা হাত ছাড়া হয়ে যায়। খুব সুন্দর ফাইভ স্টার হোটেল ছিল। আমাদের বলিউডের নায়ক নায়িকাদের পছন্দের তালিকায় ছিল হোটেলটা। „ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন , “ সেই আফসোস এখনও আছে। তোর আসার পর আর কোন খবর লিক হয়নি। „
আকাশ বাবার কথায় হতভম্ব হয়ে গেল , “ মানে তুমি নিজের লাভের জন্য আমাকে দিয়ে ওই কাজ করাচ্ছো ! „
“ আমার লাভ ! আমি কোম্পানির লাভের কথা বলছি। যার ভবিষ্যতের মালিক তুই। তার জন্য এতোটা তো কন্ট্রিবিউট করতেই পারিস । „
আকাশ কখনোই বাবার সাথে কথায় পেড়ে উঠবে না সেটা সে জানে। তাই হার মেনে বললো , “ তুমি অন্য একজন বিশ্বস্ত কাউকে নাও। আমাকে অন্য একটা পোস্টে দাও । „
“ কোন পোস্ট ? কোন পোস্ট খালি নেই । „
“ তাহলে নতুন একটা বিভাগ খোলা। „
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে আকাশের বাবা বললেন , “ এই কিছুদিন আগেই একটা নতুন সেকশন খোলা হয়েছে….
বাবার কথার মাঝখানে আকাশ উৎসাহে প্রায় লাফিয়ে উঠে বললো , “ কোন বিভাগ? „
“ সুইজারল্যান্ড …..
ফের বাবার কথা শেষ হওয়ার আগেই বললো , “ আমাকে নাও , আমাকে নাও , প্লিজ ! „
“ ওটা এখনও খোলা হয়নি। শুধু কথা হয়েছে। আর সঞ্জয় আগে থেকেই ওই সেকশনের হেড নিজের মেয়েকে করে দিয়েছে। তাই আমি আর কিছু করতে পারবো না। গোধূলির সাথে কথা বল । „
আকাশের মা এতক্ষণ চুপচাপ স্বামী আর ছেলের কথা শুনছিলেন। এখন হঠাৎ এদের দুজনের কথার মাঝে ঠোঁট বেকিয়ে ভুরু নাচিয়ে বলে উঠলেন , “ সুইজারল্যান্ড ! সিঙ্গাপুর ! আমাকে তো একবারও নিয়ে গেলে না কোথাও ! „
এই কথার উত্তর আকাশের বাবার কাছে নেই। কারন তিনি একবার মাত্র সিঙ্গাপুর গেছেন। তাই আজ গিয়ে কাল চলে এসছিলেন। সুইজারল্যান্ড এখনও যাননি। আগে ইয়াং বয়সে ঘোরার শখ থাকলেও এখন ঘরকুনো হয়ে গেছেন। তাই চুপচাপ বাকি খাবার খাওয়া শেষ করতে লাগলেন।
ডিনার করে আকাশের বাবা ঘুমাতে চলে গেলেন। আকাশ প্রায় রাতে এঁটো বাসন ধুতে , মায়ের সাহায্য করে। আজকেও করছিল আর মাথার মধ্যে সুচিকে অন্য একজনের সাথে কিস করার কথাটা ভাবছিল। ঘৃণা যে হচ্ছিল সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। হঠাৎ একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আকাশের মা বললেন , “ মাঝে মাঝে ভাবি আমি ভুল করছি। তোর বিয়ে এখন এই বয়সে দেওয়া উচিত হচ্ছে না। আবার পরক্ষণেই যখন ভাবি যে এই বয়সে তোর বিয়ে না দিলে তুই সুখী হবি না , তখন বুকটা কেঁপে ওঠে। মায়ের মন ! …..
মা হঠাৎ এইসব কি বলছে ! কেন বলছে ? এইসব ভাবতে ভাবতে আকাশ মায়ের কথা শুনতে লাগলো। আকাশের মা বলে চলেছেন “ তোর বয়স তেইশ। এখনও দুনিয়া দেখিস নি। দুনিয়ার নিয়ম কানুন শিখিস নি। এই বয়সে একজনের দায়িত্ব নেওয়া সহজ না। আবার যখন সন্তান নিবি তখনও সহজ হবে না। এতো বড়ো দায়িত্ব তুই পারবি কি না জানি না। তবে সুচি বয়সে। ও সামলাতে পারবে বলে মনে হয়। „
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করলেন , ” জীবনে অনেক চাপানউতোর আসবে। সবসময় একে অপরের পাশে থাকবি। যেকোনো পরিস্থিতিতে ওর পাশে হাঁটবি । মনোমালিন্য হলে , ভুল বোঝাবুঝি হলে , কথা বলে মিটিয়ে নিবি কিন্তু চুপচাপ থাকবি না। „ তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন , “ আমাকে ভুল প্রমাণ করবি না কখনো। তোর মাকে যেন রাস্তায় শুনতে না হয় ‘ কম বয়সে ছেলের বিয়ে দিয়ে ভুল করেছি । ,
এবার আকাশের চোখে জল চলে এলো। কতো কথা মাথায় ঘুরতে লাগলো। আপাতত সে মাকে জড়িয়ে ধরে বললো , “ কখনো তোমার মাথা নিচু হতে দেবো না মা। „
আরও কিছুক্ষণ মায়ের সাহায্য করার পর , মায়ের চুমু কপালে নিয়ে খাটে এসে শুলো । ‘ একি ভুল করতে যাচ্ছিলাম আমি। কি ভাবছিলাম এসব ? সিনেমায় , সিরিয়ালে এসব কথা অনেকবার শুনেছি। কিন্তু নিজের সাথে যখন ঘটলো তখন ভিলেনের মতো আচরণ কেন করছি ? সুচি তো কোন খাবার নয় যে কেউ ওকে খেয়ে এঁটো করে গেছে। কিন্তু আমি তো ওকে খাবারই ভাবছিলাম এতক্ষণ । আমার সুচি সবসময় পবিত্র ছিল আজও আছে। বিয়ের আগে কথাগুলো বলে ও ভালো করলো আর উল্টে আমিই ওকে খারাপ … এমনকি এক মূহুর্তের জন্য নষ্টা … ইসসস নিজের উপরেই ঘৃণা হচ্ছে ! „ নিজের মনে এইসব ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়লো।
পরের দিন সে আর সুচিকে মেসেজ করলো না। সুচিও সারাদিন আকাশকে কোন মেসেজ করলো না । অফিসে গিয়ে আকাশ গোধূলির অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু গোধূলি এলো না। সারাদিন অফিসে কাজ করে আকাশ বাড়ি ফিরে এলো। হাতমুখ ধুয়ে মায়ের বানানো টিফিন খেলো । তারপর একটু অন্ধকার হয়ে এলে সুচিকে ফোন করলো। সুচি ফোন ধরলেই আকাশ বললো , “ ছাদে আয় কথা আছে । „
একপ্রকার আদেশ দিয়েই আকাশ ফোনটা রেখে ছাদে চলে এলো। সুচি প্রায় দশ মিনিট পর ছাদে এলো। অন্ধকার হয়ে গেছে। আগের দিনের মতোই আজও আকাশে তারাদের আলোর ঝিকিমিকি খেলা চলছে। কিন্তু আজ মনে হয় পূর্ণিমা।
গোল চাঁদের জোৎস্নায় সুচিকে চিনতে অসুবিধা হলো না আকাশের। সুচি এসে দাঁড়াতেই কোন কিছু না বলে সুচিকে টেনে কাছে নিয়ে নিল। সুচিকে কিছু বলতে দেওয়ার আগেই তার কোমরে বাঁ হাত দিয়ে তাকে চাগিয়ে , নিজের ঠোঁটাটা সুচির ঠোঁটের ভিতর দিয়ে দিল। মুখের ভিতর তার প্রেয়সীর কোমল সরু ঠোঁটের স্পর্শ পেতেই নিজের ডান হাতটা দিয়ে সুচির মাথার পিছনে দিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। সেই প্রথমবারের মতোই এবারও মনে হলো যেন প্রেয়সীর কোমল ঠোঁটটা মাখনের মতো তার মুখের ভিতর গলে যাবে।
এবার সুচিও আকাশের মাথা দুই হাত দিয়ে ধরে আকাশের গরম পুরু শুস্ক ওষ্ঠ্য নিয়ে নিজের মুখের ভিতর খেলতে লাগলো। আকাশের ঘন কালো চুলের ভিতর সুচির সরু আঙুল বিচরণ করতে লাগলো।
ভরা পূর্ণিমার চাঁদের জোৎস্নায় সুচি নিজের হবু বরের গরম নিশ্বাস মুখের উপর পেতে লাগলো। একজনের গায়ের গন্ধ অপর জনের কাছে কোন সুগন্ধি সৌরভের মতো নেশা জাগিয়ে দিতে লাগলো। আকাশ সুচিকে চাগিয়ে তুলে রাখায় তার পা ছাদের উপর নেই। হাওয়ায় ভাসছে। এক সুখের সাগরে ভাসছে সুচি । চোখ বন্ধ করে মুখের ভিতর আকাশের পুরু ঠোঁট চুষছে ।
আকাশ সুচির ঠোঁটের উপর নিজের অধিকার ফলানোর জন্য এই চুম্বন করছে না। এমনকি অপবিত্র ওষ্ঠ্যদ্বয় কে পবিত্র করার জন্যেও সে এই চুম্বন করছে না। কাল রাতে নিজের করা ভুলের জন্য , ভুল ভাবনার জন্য , সুচিকে ভুল ভাবার জন্য , এক শাস্তি হিসেবে বা নিজেকে সমর্পণ করার জন্য সে এই চুম্বন করছে।
দুজনেই হাফিয়ে গেলে একে অপরকে ছেড়ে দিল। সুচি হবু বরের ঠোঁটটা নিজের মুখ থেকে বার করে , এক দৃষ্টিতে চোখের পলক না ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। আকাশ দেখলো সুচির চোখের পাতা কাঁপছে। আর চোখের মনি দুটো এই জোৎস্নার আলোয় স্নান করে চকচক করছে।
আফসোসের ভঙ্গিতে আকাশ বললো , “ আমায় ক্ষমা করে দে। কাল তোর সাথে ওইভাবে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। „ সুচির পা তখনও মাটিতে নেই। আকাশ তাকে চাগিয়ে রেখেছে।
“ ও , নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিস তাহলে। আমি তো ভাবছিলাম তুই এখনও বাচ্চা রয়ে গেলি। হয়তো বিয়েটাই ভেঙে দিবি এটাও ভাবছিলাম । „
“ আমায় ক্ষমা করে দে। „
“ সে করলাম। এখন আমায় ছাড় । আর এইভাবে হঠাৎ করে ….
“ এটা আমার ক্ষমা চাওয়ার স্টাইল ছিল। বিয়ের পর যখনই কোন ভুল করবো তখন এইভাবে ক্ষমা চাইবো। ঠিক আছে ! „
“ মানে তুই ইচ্ছা করে আরও ভুল করবি । „
“ হ্যাঁ করবো । এই যেমন এখন করছি । „ বলে আবার সুচির উপরের ঠোঁট নিজের মুখের ভিতর নিয়ে নিল। সুচির পা তখনও ছাদ থেকে প্রায় 15-20 CM উপরে। সুচি আবার চোখ বন্ধ করে সুখের সাগরে ভাসতে লাগলো।
এরপর হুহু করে দিন কাটতে লাগলো। মাঝে মধ্যেই সুচি আর আকাশকে ছাদের এক কোনায় দেখা যেতে লাগলো। বলা বাহুল্য দুজনের বাবা মা এটা জানেন না।
প্রায় দুই সপ্তাহ পরে গোধূলি অফিসে এলো। আকাশ লক্ষ্য করলো সে তার বাবার সাথে কথা বলছে না। তাতে আকাশের কিছু যায় আসে না। গোধূলি আসতেই সে তার সুইজারল্যান্ডের বিভাগে তাকে জয়েন করানোর জন্য রিকোয়েস্ট করলো। গোধূলি বললো , “ এতে রিকোয়েস্ট করছো কেন ? আমি এমনিতেও পুরো সেকশনটা একা চালাতে পারবো না। তার সাহায্য পার্টনারস চাই। তুমি হবে আমার পার্টনার ? „
আকাশ একবার হাসি দেওয়া ছাড়া কিছু বললো না। পরের দিন থেকেই কাজ শুরু হয়ে গেল । সুইজারল্যান্ডে মোট কটা হোটেল আছে। কোন হোটেল লিজে নেওয়ার জন্য সবথেকে ভালো। কার কেমন পরিসেবা। কোন কোন এয়ারলাইন্স ওই দেশে যায়। কার কতো টিকিট। ওই দেশে কি কি দর্শনীয় স্থান আছে। কোন মরসুমে সবথেকে বেশি পর্যটক হয়। আপাতত এইসব দেখে একটা নির্দিষ্ট বাজেটের প্যাকেজ বানানো হলো কাজ।
আর এইসব কাজের জন্য একজনকে ওই দেশে যেতে হবে। যেহেতু আকাশের বিয়ে হবে তাই গোধূলি আর আরও দুজন ওই দেশে যাবে। আর আকাশ এখানে থেকে সামলাবে।
এর চার পাঁচ দিনের মধ্যেই বিয়ের কার্ড তৈরী হয়ে চলে এলো। দুজনের ফটো দিয়ে বিয়ের কার্ড বানানো হয়েছে। সোসাইটির সবাইকে বিয়ের নেমন্তন্নো দিতে গেলেন সুচির মা আর আকাশের মা। যথারীতি প্রথমে সবাই বিশ্বাস করতে চাইলো না। তারপর বিয়ের কার্ড দেখে কিছুটা বিশ্বাস করলো সবাই। যেহেতু পাশাপাশি বিয়ে হচ্ছে তাই সবকিছুই ঘেটে ঘ। কোনটা বৌভাত আর কোনটা বিয়ে এটা বলা মুশকিল। তাই বৌভাত-টা কেই রিসেপশন বলে দেওয়া হলো।
বিয়ের কার্ড সবার বাড়িতে পৌছানোর পর সবথেকে বেশি অবাক হলো দুজন। একজন হলো বিপ্লব বিচ্ছু আর একজন হলো জয়শ্রী। মায়ের কাছে সব শুনে বিপ্লব সোজা আকাশের ঘরে চলে এলো। সে এখন একটা ডিলিভারি কোম্পানিতে কাজ করে। এমনিতে সপ্তাহন্তে একবার কি দুবার কথা হয় আকাশ আর বিপ্লবের মধ্যে। দুজনেই চাকরি প্রাপ্ত মানুষ। তাই আর আগের মতো কথা হয়না।
ঘরে ঢুকে আকাশের গলা টিপে বিপ্লব বললো , “ শালা এতো কিছু হয়ে গেল আর তুই আমাকে কিছুই জানাস নি। ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে ! „
“ ছাড় দম নিতে পারছি না। আরে হঠাৎ করে হয়ে গেল সবকিছু ! „
“ আমাকে আর টুপি পড়াতে হবে না। শেষমেশ সুচিদিকে বিয়ে ! ছি্ এ কি করলি তুই ! „
“ দিদি হবে তোর জন্য , ও আমার হবু বউ। আমাকে জামাইবাবু বলে ডাক । মুসলমানরা কি বলে ? হ্যাঁ , দুলাভাই বলে ডাক। „
“ তবে রে শালা । „ বলে আকাশের পেটে একটা নকল ঘুষি মারলো বিপ্লব।
স্নেহা দেবী লিভাংরুম থেকেই আকাশের ঘরের ধুপধাপ আওয়াজ শুনতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন , “ কি করছিস রে তোরা। এতো আওয়াজ হচ্ছে কেন ? মারপিট করছিস নাকি ? „
আকাশ ঘর থেকে জোরে বললো , “ না মা। কিছু না । „
কাকিমার আওয়াজ শুনে বিপ্লব বিচ্ছু শান্ত হয়ে এলো। কিন্তু আকাশের সাথে ইয়ার্কি মেরে কথা বলা থামালো না।
সবাইকে বিয়ের নেমন্তন্ন করা হয়ে গেল। বাকি আছে ডেকরেশন , জামাকাপড় , গয়না কেনা। ডেকরেশন এর দায়িত্ব সুচির বাবা আর আকাশের বাবা নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন। এবার পাত্র পাত্রীর জন্য গয়না কিনতে হবে। তাই শেয়ার মার্কেট দেখে সুচি , আকাশ , সুচির মা , আকাশের মা , সুমি মিলে গেলেন গীতাঞ্জলি জুয়েলার্সে ।
সুচি নিজের কথা মতো আকাশকে নিজের টাকা দিয়ে একটা পনের হাজার টাকার আংটি কিনে দিল। সুচির বৌভাত আর বিয়ে মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকার গয়না কিনলেন আকাশের মা। সুচির মা বাঁধা দিতে গেলে তিনি বললেন , “ তুমি থামতো। একবার গয়না কিনতে এসছি। কিনতে দাও। আর তোমার জন্য কিনছি না আমি। আমি কিনছি আমার বৌমার জন্য। „
শুধু সুচির জন্য না। সাথে আকাশের মা সুচির মা আর সুমিও নিজের জন্য কিনলো। সব শেষে দেখে গেল প্রায় সত্তর লাখ টাকা হয়ে গেছে। এটা আকাশের মায়ের কাছে কিছুই না। কিন্তু সুচির মা বিল দেখে শুধু বিষম খাওয়াটাই বাকি রাখলেন।
সুচির বাবা রাতে অফিস থেকে এসে গয়নার বিল দেখলেন , শুধু গয়নার পিছনেই সব খরচা হয়ে যাওয়ায় তিনি মুষড়ে পড়লেন। আর টাকা কোথায় পাবেন তিনি ! সেটাই ভাবতে বসলেন। যদিও গয়নার বেশিরভাগ টাকাটাই আকাশের বাবা দিয়েছেন তবুও তার যতোটা খরচা হয়েছে তাই অনেক । জামাকাপড় কিনবেন কি দিয়ে সেটাই তিনি ভাবতে লাগলেন।
‘ এই সময়ে কোন লোন তো নেওয়া যাবে না। শুভ শুনলে আস্তো রাখবে না। কারোর কাছে চাইবো ! না। এমন কেউ নেই যে এখন ধার দিতে রাজি হবে। , এইসব ভাবতে ভাবতেই তার হঠাৎ মনে পড়লো ফিক্সড ডিপোজিট এর কথা। দুই মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি দুটো আলাদা ফিক্সড ডিপোজিট করে ছিলেন। একটা তো সুমির বিয়ের সময় ভাঙা হয়েছিল। আর একটা ভাঙার সময় হয়ে এসছে।
তৎক্ষণাৎ তার মনে পড়লো আরও একটা ফিক্সড ডিপোজিট এর কথা। রহমত চাচার টাকা দিয়ে যে ফিক্সড ডিপোজিট করেছিলেন সেটা পাঁচ বছর অন্তর রিনিউ করা হয়। শেষ তিন বছর আগে করিয়েছিলেন। তাই মনে ছিল না। এখন মনে পড়াতে তিনি হাঁফ ছেড়ে বাচলেন ।
পরের দিন সকালেই তিনি ব্যাঙ্কে গিয়ে ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়ে নিলেন। বাড়ি ফিরে পুরো টাকাটা স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বললেন , “ এটা রাখো । „
“ এতোগুলো টাকা কোথায় পেলে ? „
“ তোমার মনে নেই ! রহমত চাচার টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছিলাম। „
“ উনি তো সুচিকে দিয়ে গেছিলেন। „
“ সুচির জন্যেই তো খরচা হচ্ছে। ওর বিশেষ দিনের উপহার কিনবেন বলে রেখে গেছিলেন। এখন সুচির বিয়ের থেকে আর বড়ো বিশেষ দিন কি হতে পারে ! „
এরপর আর কোন কথা হয়না।
এই সব আনন্দের মধ্যেই কলকাতা শহরের মধ্যে এক রাতে , বিখ্যাত পাবে চার জন বসে মদ খেয়ে নেশা করছিল। আজ একটু বেশিই নেশা হয়ে গেছে সবার। চার বোতল rum হয়ে গেছে এর মধ্যে। তাদের বিভিন্ন কথাবার্তার হচ্ছিল । কে কতো ভিতু এই নিয়ে। এর মাঝে একজন বললো , “ এ শালা তো শরীর গরম করতে গিয়ে মেয়ের হাতে চড় খেয়ে এসছে। সেটা বল ! „
আর একজন গম্ভীর হয়ে সিগারেটের ছাই এসট্রে তে ফেলে বললো , “ বাবা এখনও জানে না। জানতে পারলে কি হবে ভেবেছিস ! „
বড়দার কথাটা গায়ে লাগলো পলাশের।
পরের দিন ছিল রবিবার। দুপুর দুপুর সেই পুরানো দলবল নিয়ে যাওয়া হলো জামাকাপড় কিনতে। এবার সাথে সুচির বাবাও গেলেন। আকাশের বাবাকে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছিল কিন্তু তিনি যেতে রাজি হননি। তাই আকাশকে গাড়ি দিয়ে তিনি একটা ক্যাব বুক করে অফিস চলে গেলেন। আকাশ গাড়ি চালাতে পারে। তাই সে নিচে চালিয়েই মা , সুচি আর জেঠু জেঠিমা কে নিয়ে যেতে লাগলো শপিং মলে। ওখানেই সুমি দেখা করবে।
গাড়ির চালকের সিটে আকাশ । পাশের সিটে তার মা। আর পিছনের সুচি আর সুচির মা বাবা বসলেন। গাড়ি রাস্তাতে নামতেই সুচি বুঝতে পারলো যে আকাশ ব্যাকভিউ মিররে পিছনের গাড়ি দেখার ভান করে তাকেই দেখে চলছে। সুচি মনে মনে বললো , ‘ কি অসভ্যতামি শুরু করেছে। পাশে বাবা মা বসে আছে সেটাও দেখছে না। ,
এর পরেই যখন আকাশ সুচিকে দেখতে গেল তখন সুচি চোখ গোল গোল করে , রাগি মুখ করে , পাশে বাবা মা বসে আছে সেটা বলে দিল। , আকাশ নিরুপায় হয়ে গাড়ি চালানোয় মন দিল।
প্রায় দুপুর দুটোর দিকে সবাই পৌঁছালো শপিং মলে। যাওয়ার কথা ছিল রাতে। কিন্তু তখন সুমির হবে না। তাই দিনের বেলাতেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
শপিং মলে পৌছে গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে মলে ঢুকতেই সুমি আর প্রজ্ঞাকে দেখতে পেল সবাই। সুমিকে দেখে সুমির বাবা খুশি হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন , “ কেমন আছিস ? কৌশিকের এলো না ! „
“ আমরা সবাই ভালো আছি। ওকে অফিসের কাজে শিলিগুড়ি যেতে হলো। তাই আমি আর প্রজ্ঞা এসছি। আজ তোমাদের ওখানেই থাকবো। „
“ খুব ভালো করেছিস। „
এদিকে সুচির মা প্রজ্ঞাকে কোলে নিয়ে একটা চুমু খেলেন , “ কেমন আছিস তুই ? „
“ আমি ভালো আছি । তুমি কেমন আছো দিম্মা ? „ সুমির মেয়ের বয়স বেশি না। এই বয়সে সবার তোতলানোর কথা। কিন্তু সে খুব ভালো মিষ্টি কথা বলতে পারে।
“ উম্ , আমি ভালো নেই। „
“ কেন ? কি হয়েছে তোমার ? „
“ তুই তো আর আমার কাছে আসিস না। তাই আমি ভালো নেই । „
“ মা বলেছে আজকে মাসির বাড়িতে থাকবো। বাবা অফিসের কাজে অন্য জায়গায় গেছে তো , তাই। „
আরও একটা চুমু খেয়ে সুচির মা বললেন , “ চল , তোকে একটা ভালো জামা কিনে দিই। কি পছন্দ তোর ? „
“ আমার ফ্রগ পছন্দ । „
“ তাহলে তোকে দুটো ফ্রগ কিনে দেবো। „
“ সত্যি ! „
“ সত্যি , সত্যি , সত্যি । „
দিম্মা আর নাতনির কথাবার্তাতে তারা সবাই এক বিখ্যাত ব্রান্ডের দোকানের সামনে চলে এলো। এরা মূলত বিয়ের কাপড়ের জন্যেই বিখ্যাত । দোকানে ঢুকে সবাই প্রথমে সুচির জন্য পছন্দ করতে লাগলো। সুচির জন্য প্রথমে সবাই একটা লাল রঙের উপরে সোনালী সুতো দিয়ে কারুকার্য করা একটা সুন্দর বেনারসি পছন্দ করলো । তারপর আকাশের জন্য অনেক কটা পাঞ্জাবি দেখে তাদের মধ্যে একটা সাদার উপর সোনালী রঙের ফুল আঁকা আর একটা হলুদ পাঞ্জাবী কেনা হলো। লাল ধুতি কিনতে গেলে আকাশ বললো , “ আমি ধুতি পড়বো না। এখন ধুতি কেউ পড়ে নাকি ! „
আকাশের মা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন , “ পড়ে না মানে ! সবাই পড়ে। তুইও পড়বি । „
মায়ের কথায় আকাশ চুপচাপ হয়ে গেল। পাত্র পাত্রীর জন্য কেনা কাটা হয়ে গেলে সবাই নিজের জন্য পছন্দ করতে শুরু করলো। এই সুযোগে আকাশ আর সুচি আলাদা হয়ে অন্যান্য জামা কাপড় দেখতে লাগলো। আকাশ একটা ম্যানিকুইন এর গায়ে পড়ানো মেরুন রঙের গাউন দেখিয়ে বললো , “ এটা তোকে মানাবে ভালো। একবার ট্রায়াল দে না । „
সুচি রাগি চোখে তাকিয়ে থেকে বললো, “ আবার তুই করে বলছিস ! „
আকাশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। এতদিনের অভ্যাস একদিনে তো যাবে না। আকাশকে চুপচাপ থাকতে দেখে সুচি কিছুক্ষণ উদাস হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করলো , “ তুই পছন্দ করে দিচ্ছিস ? „
“ হ্যাঁ আমার তো ভালো লাগছে । চাইলে কিনেও দিতে পারি। „
সুচি একজন সেল্স গার্লকএ ডেকে জিজ্ঞাসা করলো , “ এটা ট্রায়াল দেওয়া যাবে ? „
“ হ্যাঁ ম্যাম , আপনি এদিকে আসুন। আমাদের কাছে এর আরও স্টক আছে। „
সুচির সাথে আকাশও সেই মহিলার পিছন পিছন গেল। একটা থাকে আরও এরকম কয়েকটা গাউন আছে। সেল্স গার্ল সেখান থেকে একটা কোমর 26 সাইজের গাউন বার করে সুচিকে দিল। সুচি “ থ্যাঙ্ক ইউ বলে । „ ট্রায়াল রুমে চলে গেল। আকাশ বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর যখন সুচি বার হলো তখন আকাশ আর সুচির উপর থেকে চোখ সরাতে পারলো না। একভাবে চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে রইলো।
আকাশের মুখ হা দেখে সুচি বললো , “ কি দেখছিস ? „
“ তোকে খুউব সুন্দর দেখাচ্ছে। „
সুচি রাগী চোখে তাকাতেই আকাশ বললো , “ তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে । „ তারপর একটু ব্যাঙ্গ করে আকাশ বললো , “ তুমি আমাকে দিয়ে তুমি বলাচ্ছো , কিন্তু তুমি নিজে আমাকে তুই করে বলো , তখন ! „
“ আমার কথা আলাদা। এটা আমার কোন অভ্যাস না। আমি চাইলেই তোকে এখন তুমি বলতে পারি। কিন্তু তোর এই অভ্যাসটা আগে ছাড়াতে হবে। „
আকাশ সুচির লজিকে চুপ করে গেল। আজ যেন তার চুপ করে যাওয়ার দিন। মুখটা বাংলার পাঁচ করে সে বললো , “ তোমাকে এই গাউনে ভালো মানাচ্ছে। „
সুচি হেসে বললো , “ তুই যখন পছন্দ করছিস তখন এটা আমি বৌভাতে পড়বো। আর নিজের টাকায় কিনবো …
সুচির কথা শেষ হতে না হতেই সুচির মায়ের ডাক পড়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে আবার ট্রায়াল রুমে ঢুকে , গাউন খুলে , আগের জিন্স আর চুড়িদার পড়ে বেরিয়ে এলো।
সবার পছন্দের মতো কেনাকাটা করার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে সবাই গাড়িতে চেপে বসলো । সুমি স্কুটি করে এসছিল। তাই সে গাড়িতে না উঠে নিজের স্কুটি করেই বাপের বাড়ি যেতে লাগলো।
আকাশের মা কিনেছেন তিনটে দামী শাড়ি । সুচির মা কিনেছেন দুটো। সুমি নিজের জন্য কিনেছে দুটো আর প্রজ্ঞাকে একটা জামা প্যান্ট। আর সুচির মা প্রজ্ঞাকে তার কথা মতো কিনে দিয়েছেন দুটো ফ্রগ। আর সুচির জন্য তিনটে এক্সট্রা শাড়ি। আকাশের জন্য আরও দুটো পাজামা পাঞ্জাবি। আর সুচির বাবা কিনেছেন দুটো পাজামা পাঞ্জাবি আর এক সেট জামা প্যান্ট।
আগের মতো আকাশই ড্রাইভ করছে। আকাশের পাশে বসছেন আকাশের মা। সুচি আর সুচির মা বাবা পিছনের সিটে। আকাশের মা আর সুচির মা মিলে ফেলে আসা দোকানের কোন শাড়ির রঙ কেমন ছিল। কোনটার দাম বেশি। কোনটার দাম কম। ওটা কিনলে আরও ভালো হতো। এইসব আলোচনা করছিলেন । আর আকাশ আসার সময়ের মতো রেয়ারভিউ মিরর দিয়ে মাঝেমাঝে সুচিকে দেখতে লাগলো। সুচিও দেখলো আকাশ আবার তাকেই দেখছে। তাই একবার চোখ রাঙিয়ে আকাশকে শাসন করে মায়ের কথা শুনতে লাগলো।
এইসব কথা বলতে বলতে কখন তারা সোসাইটিতে চলে এলো সেটা খেয়াল করলো না। প্রায় অন্ধকার হয়ে এসছে। সোসাইটিতে সবে লাইট জ্বালানো শুরু হচ্ছে। তবে এখনও কয়েকটা বিল্ডিংয়ে জ্বালানো হয়নি। নিজেদের বিল্ডিংয়ের সামনে গাড়ি থামতেই সবার হুশ ফিরলো। সবথেকে ধারে বসার জন্য সুচি প্রথমেই নিজের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এলো।
তাদের গাড়ির ঠিক কিছুদূরে , এক জোড়া ভুরুর লোক দাঁড়িয়ে দেখছিল যে গাড়িটা ঢুকছে। তার হাতে একটা কাঁচের বোতল ধারা আছে। গাড়ির মধ্যে থেকে সুচি বেরিয়ে আসতেই সে সুচির দিকে এগিয়ে গেল।
গাড়ি থেকে বার হতেই সুচির কেন জানি খুব অস্বস্তি হলো। তার সিক্সথ সেন্স তাকে সাবধান করে দিতে লাগলো । গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে তাকাতেই সুচি দেখলো পলাশ তার দিকে এগিয়ে আসছে। সুচি বুঝতে পারলো না পলাশ এখানে কি করছে !
পলাশ যখন প্রায় সুচির কাছে পৌছে গেছে ঠিক তখনই সামনের সিটে বসে থাকা আকাশের মা বেরিয়ে এলেন। পলাশ একবার নিজের গালে হাত বুলিয়ে নিল। কাল রাতে যা ঘটেছে তারপরে এই মেয়েকে একটা উচিত শিক্ষা দিতেই হবে। গত রাতের ঘটনা ভাবতেই রাগ আরও বেড়ে গেল। সুচির পুরো কাছে এসে হাতে ধরা কাঁচের বোতলটা সুচির মুখে ছুঁড়তে গেল। কিন্তু হঠাৎ আকাশের মা গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসায় পলাশের হাত কেঁপে গিয়ে দিক ভ্রষ্ট হলো ।
সুচি আগেই তার হাতে ধরা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগটা নিজের মুখ গার্ড করে নিল। পলাশের ছোঁড়া বোতল এসে লাগলো সেই প্লাস্টিকের উপর। তার মধ্যে থাকা কয়েক ফোঁটা তরল পদার্থ ছিটকে গিয়ে লাগলো সুচির বাম হাতে কনুইয়ের নিচে। আর বোতলটা নিচে পড়ে গিয়ে ইটে লেগে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে অসহ্য জ্বালা নিয়ে নিজের হাত ধরে ওখানেই বসে পড়লো সুচি। এদিকে অবস্থা বেগতিক দেখে আর নিজের কাজ সফল হলো না দেখে , পলাশ সোসাইটির গেটের দিকে দৌড় দিল । সেখানে আগে থেকেই একটা বাইক দাঁড়িয়ে ছিল। পলাশকে দৌড়ে আসতে দেখে বাইকের উপরে বসে থাকা লোকটা বাইক স্টার্ট দিয়ে দিল। পলাশ দৌড়ে চলন্ত বাইকের উপর উঠতেই বাইকটা হুশ করে বেরিয়ে গেল।
কি হয়েছে সেটা বুঝতে সবার বিন্দুমাত্র সময় লাগলো না। আকাশ এসে গাড়ির ভিতর থেকে জলের বোতলটা বার করে সুচির হাতে ঢালতে লাগলো। সুচি মেঝেতে বসে নিজের বাঁ হাত ধরে অসহ্য জ্বালায় কেঁদে ফেললো। সুচির মা আর আকাশের মা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন । আর অনর্গল প্রলাপ বকতে লাগলেন।
পলাশকে কেউ না চিনলেও সুমি চিনতো। সুচি তাকে পলাশের ফটো দেখিয়ে ছিল। পলাশ যখন দৌড়ে সোসাইটির গেট দিয়ে বার হচ্ছিল তখন সুমি স্কুটি চালিয়ে ঢুকছিল । পলাশকে ওইভাবে দৌড়ে যেতে দেখে সুমি খুব অবাক হয়েছিল। ভিতরে এসে ঢুকে পরিস্থিতি দেখে সে বুঝতে পারলো কি হয়েছে।
সুমি এসেই সুচির ক্ষত দেখে বললো , “ নার্সিংহোমে নিয়ে চলো । „ সুমির কথা শেষ হতেই সুচির বাবা আর আকাশ মিলে সুচিকে তুলে পাশের নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে গেলেন।
এতক্ষণে সোসাইটির সবাই জড়ো হয়ে গেছে আর বলাবলি শুরু করেছে , আমাদের সোসাইটি তে এইসব ! কে করলো ? কেউ দেখেছো ? কি হলো সমাজটার ? দিন দুপুরে এইসব ? এখন মানুষ কোথাও নিরাপদ নয়।
এদিকে সুমি নিজে কেঁদে ফেললো। সে ভাবতে লাগলো এইসব তার জন্যেই হয়েছে। তার জন্যেই সুচি ওই পশুটার সাথে রিলেশনে গেছিল। তাই সে কাঁদতে কাঁদতে বললো , “ এসব আমার জন্য হয়েছে। শুধু আমার জন্য। আমি না বললে বোনের সাথে এরকম হতো না। „
মাকে কাঁদতে দেখে প্রজ্ঞাও কেঁদে ফেললো , “ মা , কি হয়েছে মা? তুমি কাঁদছো কেন ? „
কিছুক্ষণ কান্নাকাটি আর প্রলাপ বকার পর আকাশের মা তার স্বামীকে ফোন করলেন। স্বামী ফোন ধরলেই তিনি চোখের জল মুছে বললেন , “ তুমি কি হ্যাঁ ! এদিকে বাড়ির একজনের মুখে এ্যাসিড ছুঁড়ছে আর তুমি ছুটির দিনেও অফিসে গেছো ! „
আকাশের বাবা একবার অফিস পরিদর্শনে গেছিলেন। আর মহিলাদের কেনাকাটায় তিনি থাকতে চান নি। তাই বাহানা বানিয়ে অফিসে গেছিলেন। এখন স্ত্রীর মুখে এতোটা শুনেই তিনি কেঁপে উঠলেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তিনি মাথা ঠান্ডা রাখা সমীচীন মনে করলেন। সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে ট্যাক্সি ধরলেন।
গাড়িতে বাবার কোলে মাথা রেখে সুচি কেঁদে চলেছে। চোখ লাল হয়ে গেছে তার , “ বাবা , খুব জ্বালা করছে বাবা। পারছি না আমি ! পুড়ে যাচ্ছে হাতটা। „
সুচির বাঁ হাতের কনুইয়ের নিচে প্রায় দুই ইঞ্চি মতো চামড়া পুড়ে গেছে। সেই ক্ষত দেখে সুচির বাবা চোখের জল মুছে বললেন , “ আমরা চলে এসছি , এইতো । „
আকাশ গাড়ি চালাতে চালাতেই সামনে ঝাপসা দেখলো। বারবার চোখের জল মুছে গাড়ি যতো জোরে চালানো যায় ততো জোরে চালাতে লাগলো। কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। কিন্তু এখন সুচিকে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া বেশি জরুরি। তাকে শক্ত হতে হবে। এখন তাকেই শক্ত হতে হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা নার্সিংহোম পৌঁছে গেলে সুচিকে ভর্তি করে দেওয়া হলো। ডাক্তারকে সব বললে ডাক্তার বললো , “ Fir করাতে হবে। আপনারা fir করুন আমি দেখছি । „বলে চেম্বারে ঢুকে গেলেন।
এদিকে আকাশের বাবা অফিস থেকে ফিরে সুমির মুখে সব শুনলেন। সুমি যে পলাশকে চেনে সেটা শুনলেন। আর স্ত্রীর মুখে ‘ পাষাণ , দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ , এইসবও শুনলেন।
তিনি আবার সুমিকে নিয়ে এবং প্রজ্ঞাকে তার দিম্মার কাছে রেখে নার্সিংহোমের দিকে রওনা হলেন। এতক্ষনে সোসাইটির কয়েকজন সুচির মাকে শান্তনা দিচ্ছিল ‘ বেশি কিছু হয়নি। খুব বাঁচা বেচে গেছে সুচি। বড়ো কিছু হতে পারতো । , এইসব কথায় সুচির মা শান্ত হয়ে এসছেন।
আসার সময় বারবার আকাশকে ফোন করছিলেন আকাশের বাবা কিন্তু আকাশ ফোন ধরছিল না। এখন আবার ফোন করাতে আকাশ ফোন ধরলো । আকাশের বাবা জিজ্ঞাসা করলেন , “ কোথায় তুই ? „
আকাশ কান্না জড়ানো গলায় বললো , “ আমি এই নার্সিংহোমে। ডাক্তার দেখছে সুচিকে। „
“ আমি আসছি । „ বলে ফোন কেটে দিলেন আকাশের বাবা।
আরও প্রায় পনের মিনিট পর নার্সিংহোমে পৌছে ছেলে আর সমুর মুখ দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি । সুচির বাবা এতক্ষণ পর কাউকে পেলেন দুঃখ ভাগ করার জন্য। আকাশের বাবা আসতেই তিনি বললেন , “ এ আমার মেয়ের সাথে কি হলো শুভো ! „
“ তুই শান্ত হ , ভেঙে পড়িস না আমি দেখছি । „ বলে জিজ্ঞাসা করলেন , “ ডাক্তার কি বললো ? „
আকাশ চোখ মুছে বললো , “ ডাক্তার fir করতে বলেছে। „
আকাশকে কাঁদতে দেখে সুমি এগিয়ে গেল। আকাশের কাঁধে হাত রেখে তাকে শান্তনা দিতে লাগলো। তারপরেই ডাক্তার বেরিয়ে আসতে সবাই ছেঁকে ধরলো , “ কি হয়েছে ও কেমন আছে ? …
ডাক্তার বললো , “ বেশি ইনজুরি হয়নি। ক্ষত গভীর নয়। আমি ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিয়েছি। তবে পেশেন্ট মেন্টালি শক পেয়েছে। আপনারা গিয়ে দেখতে পারেন । „
ডাক্তারের কথা শেষ হওয়ার আগেই সবাই ভিতরে ঢুকলো। সুচি বেডে শুয়ে আছে। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এসে দুই গাল ভাসিয়ে দিচ্ছে। সুচির বাবা গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন , “ ঈশ্বর বাঁচিয়ে দিয়েছে তোকে। „
সুচি অশ্রুসিক্ত চোখে একবার আকাশকে দেখলো। আকাশের চোখ লাল হয়ে আছে। দুজনের মধ্যে চোখে চোখে কি কথা হলো সেটা বাকি কেউ বুঝতে চাইলো না।
কিছুক্ষণ পর মহল চুপচাপ হতে এবং বাড়িতে ফোন করে ‘ কিছু হয়নি। সুচি ঠিক আছে। , বলার পর আকাশের বাবা সুমিকে একদিকে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন , “ চল থানায়। „
সুমি এটারই অপেক্ষা করছিল । এখন আকাশের বাবার কথায় সুমি চুপচাপ মুখটা বজ্রের মতো শক্ত করে থানায় চললো। লোকাল থানায় গিয়ে সবকিছু খুলে বলতেই পুলিশ বললো , “ আপনারা ঠিক বলছেন ? বিধায়কের ছোট ছেলেই ছিল ! আপনাদের কাছে কোন প্রমাণ আছে ? „
সুমি দৃঢ় কন্ঠে বললো , “ প্রমাণ নেই। সাক্ষী আছে। আমি নিজে দেখেছি পলাশকে। „
এরপর আর পুলিশ কিছু বললো না। কিছুক্ষণ সুমির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সে fir লিখে নিল আর বললো , “ ঠিক আছে । ইন্সপেকশনে একজনকে পাঠিয়ে দেবো। আপনারা যান। „
সুমি আর আকাশের বাবা নার্সিংহোম হয়ে আকাশ আর সুচির বাবাকে নিয়ে বাড়ি চলে এলেন। সুচিকে কাল সকালে ছেড়ে দেওয়া হবে।
বাড়ি তো এলেন সবাই কিন্তু কারোর মুখে কোন কথা নেই। সবাই বোবা হয়ে গেছে। আকাশদের লিভিংরুমে পাথর হয়ে বসে আছে সবাই। সুচির আর আকাশের মা থেকে থেকেই আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। আকাশের বাবা মাঝে একবার বললেন , “ আমি ওকে ছেড়ে দেবো না সমু । „
তবুও একমাত্র প্রজ্ঞা ছাড়া বড়ো কারোর মুখে কথা নেই। প্রজ্ঞা মায়ের কোলে বসে মাঝেমাঝে জিজ্ঞাসা করছে , “ কি হয়েছে মা ? „
কিন্তু সুমির মুখে কোন জবাব নেই। প্রাণহীন মুখ সবার। গালে শুকিয়ে যাওয়া চোখের জলের দাগ স্পষ্ট।
এইসব ভাগাভাগি দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে কারোর সময়ের হুশ ছিল না। ঠিক রাত দশটা বাজতেই আকাশের বাবার ফোন নাম্বারে একটা ফোন এলো। অচেনা নাম্বার দেখে অবাক হয়ে ফোনটা ধরে প্রাণহীন কন্ঠে ‘ হ্যালো , বলতেই অপর প্রান্ত থেকে এক মখমলের মতো গলায় একটা আওয়াজ ভেসে এলো , “ আপনি কি মি. মিত্র বলছেন ? „
আকাশের বাবা — হ্যাঁ বলছি। আপনি কে ? চিনিলাম না তো
ফোনের ভিতরের মানুষ — ওই যার বিরুদ্ধে , কিছুক্ষণ আগে fir করলেন না আপনি ! তার বাবা বলছি ।
আকাশের বাবা ভাবলেন , ‘ এই লোকটা তার নাম্বার কোথা থেকে পেল ! নিশ্চয়ই থানা থেকে। ওখানে নিজের নাম্বার দিয়ে এসছেন তো। , এটা ভেবেই তিনি ফোনটা স্পিকারে দিয়ে দিলেন আর বললেন , “ পঙ্কজ সহায়। „
পঙ্কজ সহায় — “ হ্যাঁ আমার নামই পঙ্কজ । পরিচয় পর্ব তো হলো। এবার কাজের কথায় আসি। আপনি যে fir টা করেছেন ওটা ফিরিয়ে নিন । „
আকাশের বাবা রেগে গিয়ে বললেন , “ কি বলছেন আপনি ! আপনার ছেলে আমার মেয়ের এতো বড়ো একটা ক্ষতি করলো ….
আকাশের বাবার কথা শেষ হওয়ার আগেই বিধায়ক বললো , “ আমার ছোট ছেলে এখনও বাচ্চা রয়ে গেল। সিনেমা দেখে ওইসব শিখেছে। . ….
এবার বিধায়কের কথার মাঝে আকাশের বাবা বলে উঠলেন , “ আপনার ছোট ছেলে আর যাই হোক বাচ্চা নয় ! „
পঙ্কজ সহায় —“ বাচ্চা তো আপনিও নন মি. মিত্র। আপনার মেয়ের শুধু হাত পুড়েছে। মুখটা এখনও আগের মতোই আছে। আপনি কি চান ! ওটাও পুড়ুক ! „
আকাশের বাবা — “ আপনি মানুষ নন। আপনি পশু। আমি আপনাদের কাউকে ছাড়বো না। কাউকে না। „
পঙ্কজ সহায় — ওসব প্রতিশোধ প্রতিশোধ খেলার থাকলে এই বিধানসভার পরে খেলবেন। শুনুন কান খুলে। এবারের বিধানসভায় আমি CM candidate হয়ে দাড়াচ্ছি। যদি আপনার বা আপনার মেয়ের জন্য আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় তাহলে সবাইকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবো। এখন যা বলছি শুনুন। বাইরে একজন দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটা খুলুন আর সে যে কাগজ গুলো দিচ্ছে তাতে সই করুন । আর আমার ছেলে আপনাদের কখনো ডিস্টার্ব করবে না। „ বলেই ফোনটা কেটে গেল।
ফোনটা হাতে নিয়ে রাগে ফুসতে লাগলেন আকাশের বাবা। ফোন স্পিকারে দেওয়ায় ঘরের সবাই বিধায়ক আর তার কথা শুনছিল। এতক্ষণ সবার চোখের জল শুকিয়ে গেছিল। এখন আবার বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। আচলে মুখ চাপা দিয়ে সুচির মা আর আকাশের মা কাঁদতে শুরু করলেন। সব শুনে সুচির বাবা ধপ করে সোফায় বসে বললেন , “ এই পশুটাকে আমরাই ভোট দিয়েছিলাম। „
সুমি ভাবলো , “ এই লোকটাই উচ্চমাধ্যমিকে তাকে স্কুটি গিফ্ট দিয়েছিল। সেই স্কুটি দুই বোন মিলে চালাতাম । „
ঠিক তখনই এদের চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে ডোরবেল বেজে উঠলো। আকাশের বাবা বজ্র কঠিন মুখ করে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন । দেখলেন একজন ত্রিশ পয়ত্রিশ বছরের ছেলে হাতে কিছু কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের বাবার দরজা খোলার পর সে বললো , “ স্যার এতে আপনাদের তিনজনের সই দিতে বলেছেন। „ বলে হাতে ধরা কাগজটা এগিয়ে দিল ।
আকাশের বাবা কাগজটা নিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে গেলেন। কিন্তু কি একটা ভেবে সেই চিন্তা বাদ দিলেন । কাগজ গুলো হাতে নিয়ে পড়া শুরু করতেই সুচির বাবা আর বাকি সবাই এসে পড়লো। সব পড়ে আকাশের বাবা নিচে সই করে দিলেন।
বাবার সই করা দেখে আকাশ পাথর হয়ে গেল। বাবা কি ভয় পেয়েছে ! এতো ভিতু বাবা। এ কি করলো বাবা !
আকাশের বাবা সই করার পর সুচির বাবার দিকে এগিয়ে দিলেন। সুচির বাবা কিছুক্ষণ হা করে শুভোর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর তিনিও সই করলেন আর কাগজটা একমাত্র সাক্ষী সুমির দিকে এগিয়ে দিলেন। সুমি বাবার দিকে তাকাতেই তার বাবা একটা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন । বাবার ইশারা দেখে সুমিও সই করে দিল।
তিনজনের সই করার পর ছেলেটা চলে গেল । রাতে প্রজ্ঞা বাদে কেউ খেলো না। সবাই না খেয়েই ঘুমালো। বলাবাহুল্য ঘুম কারোর চোখে এলো না। আকাশ বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলো তার বাবা এতোটা কাপুরুষ ! মেরুদণ্ডহীন ভিতু। একজনের ভয় দেখানোতে ভয় পেয়ে সই করে দিল।
ওদিকে নার্সিংহোমে সুচির ও ঘুম এলো না। শেষ রাতের দিকে একবার চোখ জুড়িয়ে এসছিল। সেই সময়েই দেখলো দুঃস্বপ্নটা।
সুচি দেখলো পলাশ তার দিকে এগিয়ে আসছে। এগিয়ে এসে বোতলের সব তরল পদার্থ তার মুখে ছুঁড়ে মারলো। মুখ পুড়ে যাচ্ছে তার। অসহ্য জ্বালায় সে ছটফট করছে …. একটা চিৎকার করে সুচির ঘুম ভাঙতে সে উঠে বসলো। দেখলো নার্সিংহোমে শুয়ে আছে। মুখের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। আর শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত চলছে।
সুচির চিৎকারে একজন নার্স ছুটে এলো। এসেই পাশের টেবিলে রাখা জল খেতে দিল। জল খাইয়ে নার্স নিজে সুচিকে জড়িয়ে ধরে বললো , “ এরকমই হয় বোন। মেয়েদের সাথে আজীবন এরকমই হয়ে আসছে। তোমার তো তাও কিছুই হয় নি। এরকম আরো পেশেন্ট দেখেছি। তাদের মুখের কোনটা নাক , কোনটা ঠোঁট বোঝা যায় না। ঈশ্বর তোমায় বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তুমি ঘুমাও। আমি এখানেই আছি। „
নার্সের কথায় সুচি ঘুমানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ঘুমাতে পারলো না। এক অজানা ভয়ে বারবার কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো।
সকাল হতেই আকাশ চুপিচুপি নার্সিংহোমে চলে এলো। গার্ড বললো , “ এখনও ভিজিটিং আওয়ার শুরু হয়নি আপনি ঢুকতে পারবেন না। „
গার্ডের বাঁধা দেওয়ায় আকাশ ওয়েটিং রুমেই বসে রইলো। কাল রাতে সুচির ফোন নিয়ে তাকে চলে আসতে হয়েছিল । না হলে রাতে কথা বলতো । ‘ না জানি কিভাবে আছে মেয়েটা। , এখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই। দশটা বাজলেই আকাশ সুচির ওয়ার্ডে ঢুকে পড়লো। সেখানে পর্দা দিয়ে ঘেরা আরো তিন জন পেশেন্ট আছে।
আকাশ ঘরে ঢুকতেই সুচি কেঁদে ফেললো । সুচির পাশে বসতেই সুচি তাকে জড়িয়ে ধরলো , “ কোথায় ছিলি তুই ! রাতে ঘুমাসনি ! „
“ তুইও তো ঘুমাসনি । „ বলতেই সুচি আকাশকে ছেড়ে বসলো। আশেপাশের সবাই দেখতে শুরু করেছে যে।
সুচির ডান হাতের উল্টো পিঠে একটা চুমু খেয়ে আকাশ কাল রাতের সব ঘটনা বলতে শুরু করলো। বিশেষ করে বাবার কাপুরুষতার কথাটা। কিভাবে নিজে সই করে জেঠু আর সুমিদিকে সই করাতে বাধ্য করলো সেই কথাটা। এতোটা বলতেই আকাশের বাবা এসে ঢুকলেন।
তিনি সকালে উঠে স্ত্রীর মুখে শুনলেন যে ছেলে ঘরে নেই। আকাশের মাকে শান্ত করার জন্য বললেন , “ নিশ্চয়ই নার্সিংহোমে গেছে। তুমি টেনশন করো না। আমি আনছি সবাইকে। „ বলে এখানে চলে আসলেন।
ঘরে ঢুকেই তিনি সুচিকে বললেন , “ তোকে তো এবার ছেড়ে দেবে। তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন , “ গিয়ে পেপারওয়ার্ক গুলো কর। আমার সুচির সাথে কথা আছে। „
আকাশ আর বাবার সাথে কথা বলতে চায় না। ইচ্ছা নেই তার এই মেরুদণ্ডহীন মানুষটার সাথে কথা বলতে। তাই সে উঠে রিসেপশনে চলে গেল।
এদিকে কিছুক্ষণ সুচির সাথে কথা বলতেই সুচি আকাশের বাবাকে জড়িয়ে ধরলো , “ সব আমার দোষের জন্য হয়েছে কাকা। সব আমার জন্য । „
আকাশের বাবা বললেন , “ নিজেকে দোষ দিস না সুচি। তুই কোন দোষ করিস নি। „
আকাশের পেপারওয়ার্ক আর পেমেন্ট করা হয়ে গেলে আকাশের বাবা সুচি আর আকাশকে নিয়ে বাড়ি চলে এলেন।
এরপর দিন যায় , কালের নিয়মে সুচির হাতের ক্ষত সেরে উঠতে লাগলো কিন্তু মনের ক্ষত মিটলো না। আগের থেকে অনেক বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে সে। একা চুপচাপ বসে থাকে। অফিস যায় না। আকাশও অনিয়মিত অফিস যায়। সবসময় সুচির পাশে থাকার চেষ্টা করে সে।
এদিকে আকাশ বাবার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল। শুভাশীষ বাবু বুঝতে পারলেন কেন তার ছেলে তার সাথে কথা বন্ধ করে দিয়েছে।
সুমি , সুমির মা আর আকাশের মা মাঝেমাঝেই চোখের জল ফেলেন । কৌশিক শিলিগুড়ি থেকে এসে সব শুনে পাথর হয়ে গেলো। আর সুচির বাবা চুপচাপ বসে থাকেন। আর সেদিনের কেনা জামা কাপড় যেমন দোকান থেকে এসছিল তেমনি ঘরের এক কোনায় পড়ে রইলো।
মে মাস পড়ে গেল আর আকাশের মামা মামি আর তাদের একমাত্র ছেলে অজয় কলকাতায় চলে এলো । দিদির মুখে সব শুনেই সে এসছে। এখানে এসে আকাশের মামা মামি দেখলো কারোর দেহে প্রাণ নেই। কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে হু হ্যাঁ বলে চুপচাপ হয়ে যায় । কথা বলার ইচ্ছা নেই কারোর। সবাই একটা মানসিক আঘাত পেয়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এইভাবে তো জীবন চলে না।
রাতে খেয়ে দেয়ে সবাই ঘুমালো। অজয় আকাশের সাথে ঘুমালো। আর একটা ঘরে তার মামা মামি। বিছানায় শুয়ে আকাশের মামি জিজ্ঞাসা করলেন , “ কি ভাবছো ! যা দেখছি তাতে মনে হয় না বিয়ে তো হবে । „
আকাশের মামা কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন , “ যখন আকাশের কুষ্ঠী দেখা হয় তখন আমি এখানেই ছিলাম। যখন পুরোহিত নিজের গাঁজাখুরি বিদ্যা দেখিয়ে বললো , ‘ এই ছেলের বিয়ে তেইশ বছর বয়সে দিতে হবে। , তখন আমি বাঁধা দিয়েছিলাম। তারপর দিদির কথায় চুপ করে যাই। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এ বিয়ে আমি হতে দেবো না। „
তারপর কিছুক্ষণ থেমে দুটো বড়ো গভীর নিশ্বাস ছেড়ে আকাশের মামা বললেন , “ কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্য। এখন বিয়েটা হওয়া দরকার। খুব দরকার। একটা মানসিক আঘাত পেয়েছে এরা সবাই। তার থেকে একমাত্র একটা বড়ো আনন্দই এদের বার করতে পারে। „
“ কি করবে তুমি ? „
“ জানি না। কাল দেখা যাবে। ঘুমাও। ঘুম পেয়েছে। „
পরের দিন থেকেই যেন আকাশের মামা একটা মিশনে বার হলেন। প্রথমে আকাশের বাবাকে বললেন , “ আমি তো এখানে আমার একমাত্র ভাগ্নের বিয়ের জন্য এসছিলাম। বিয়ে তো হচ্ছে না। চলে যাবো তাহলে ! ওদিকে অনেক কাজ আছে আমার । „
“ কে বলেছে বিয়ে হচ্ছে না। „
“ যা পরিস্থিতি। তাই দেখে বললাম। „
আকাশের বাবা চুপ করে থেকে বুঝতে চেষ্টা করতে লাগলেন যে সামনের মানুষটা অর্থাৎ তার শ্যালক কি বলতে চাইছে। শেষের কথাটায় কিছুটা আন্দাজ করে বললেন , “ তোমার দিদিকে বলো। বলো পাশের ফ্ল্যাটে তত্ত্ব পাঠাতে হবে। „
কথাটা শুনে আকাশের মামার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে দিদিকে বললো , “ কি ভাবলি ? „
মুখ না তুলে আকাশের মা জিজ্ঞাসা করলেন , “ কি নিয়ে ? „
“ বিয়ে নিয়ে। আবার কি নিয়ে ! „
“ আমি কিছু ভাবিনি। „
“ তাহলে ভাব। বোঝার চেষ্টা কর । এখন বিয়েটা দরকার। আমি তিতলি কে বলছি তত্ত্ব তৈরি করতে। „
আকাশের মার মুখ হা হয়ে গেল। আকাশের মামা সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন , “ ওই , তত্ত্ব রেডি করো। „
“ এখনও তত্ত্ব পাঠানোর সময় হয়নি। তুমি গিয়ে ডেকরশন দেখো। ওটা আগে দরকার। „
এরপর দিন আরও তাড়াতাড়ি কাটতে লাগলো। আকাশের মামার কথাতে সবাই বুঝলো যে বিয়েটা হলে একটা সুখ আসবে। ডেকরশন , খাওয়া দাওয়া এইসব আয়োজন করতে করতে দিন কাটতে লাগলো।
ঠিক বিয়ের চার দিন আগের বিকাল বেলায় ছাদের একটা কোণায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আকাশ বসেছিল। আর সুচি আকাশের গায়ের উপর পিঠ ঠেকিয়ে বসে ছিল। দুজনেই চুপচাপ , কারোর মুখে কথা নেই। এখন আর কথা বলার দরকার হয় না। চুপচাপ বসে থেকে একে অপরের সঙ্গটাকেই উপভোগ করে দুজনে।
সুচি এখন সবসময় একটা নিরাপদ স্থান খোঁজে। মা যখন রাতে সোফায় বসে সিরিয়াল দেখে তখন মায়ের কোলে মাথা রাখলে একটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়। বাবা অফিস থেকে ফিরে খবরের চ্যানেল খুলে বসলে সেও বাবাকে জড়িয়ে ধরে খবর দেখে। বাবাকে জড়িয়ে ধরলে তখন নিজেকে খুব নিরাপদ মনে হয়। এখন যেমন আকাশের বুকে পিঠ ঠেকিয়ে রেখে বসে নিজেকে নিরাপদ মনে হচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরেই আকাশের মামি ছাদে উঠে আসায় দুজনেই উঠে বসলো। তিলোত্তমা এসে আকাশকে বললো , “ নিচে যা । আমার সুচির সাথে কথা আছে। „
আকাশ গোমড়ামুখ করে নিচে চলে গেল। তিলোত্তমা বললো , “ আজ বাদে কাল তোর বিয়ে। এইভাবে বসে থাকলে হবে ! জানি , যা হয়েছে সেটা আমি বুঝবো না। তুই কিসের মধ্যে থেকে গেছিস সেটা আমি অনুভব করতে পারি না। কিন্তু এটা জানি যে , যারা খারাপ করে তাদের সাথেও খারাপ হয়। একদিন ওই পলাশ ঠিক নিজের শাস্তি পাবে। দেখে নিস …
এই কথাগুলো সুচি এখন অনেকের মুখে শোনে। তাই শুনতে শুনতে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এরপর আকাশের মামি যেটা বললো সেটা আর কেউ বলেনি। আকাশের মামি বললেন , “ পুরনো স্মৃতির দুঃখ বর্তমানকে খারাপ করতে হতে দিস না। নতুন জীবন এঞ্জয় কর। বিয়ে হবে। ঘর সংসার করবি। আর যদি আকাশ কিছু বলে তাহলে আমাকে বলবি। আমি বকে দেবো। „
কথাটা বলতেই দুজনেই হেসে উঠলো। তিলোত্তমা মনে মনে বললো , ‘ যাক। এতদিন পর মেয়েটার মুখে হাসি ফোটাতে পারলাম। ,
সোসাইটির গেট থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে। লাল কার্পেটে মোড়া রাস্তা। শুড়িপথের মতো রাস্তাটা। মাথায় কাপড়ের ছাদ আছে। সেই রাস্তা কিছুদূর গিয়ে একটা ভাগ হয়ে কমিউনিটি হলের দিকে চলে গেছে । আর একটা এসে সোজা অর্জুন ভবনের এর সামনে এসে থামেছে। সোসাইটির গেটে বড়ো করে নাম লেখা হলো সুচিত্রা আর আকাশের। আগে বিভিন্ন উৎসব পার্বনে এই সোসাইটি সেজে উঠেছে কিন্তু এরকম সাজ কখনো হয়নি। চোখ ধাঁধানো সাজসজ্জা।
নির্দিষ্ট দিনে তত্ত্ব পৌঁছে গেল। সুমি , সুমির মা আর সুমির মামা বাড়ির মহিলারা মিলে সুচির গায়ে হলুদ মাখিয়ে স্নান করালো। এদিকে আকাশকেও তার মামি আর মা , সাথে সোসাইটির আরও কয়েকজন মিলে হলুদ মাখিয়ে স্নান করিয়ে দিল।
নির্দিষ্ট সময়ে আশীর্বাদ শেষ হলো। বলা বাহুল্য আশীর্বাদ করার সময় আকাশ তার বাবার দিকে তাকাতে পারছিল না।
পাঞ্জাবী পড়ে টোপর মাথায় দিয়ে ছাদনাতলায় আকাশ উপস্থিত হলো। পাশে দাঁড়িয়ে বিপ্লব আর কৌশিক ইয়ার্কি মারতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর যখন কণের পিড়ে ধরার জন্য এই দুজনেই আগে দৌড়াল তখন আকাশ হাফ ছেড়ে বাঁচলো ।
চারিদিকে সানাইয়ের আওয়াজ , মাইকে পুরানো বাংলা সিনেমার গানের আওয়াজে কান পাতা দায়। এই কয়েকদিনের আনন্দে সুচি আকাশের পরিবার সেই জঘন্য স্মৃতির কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পেরেছে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সুচি সেই লাল বেনারসি পড়ে , মুখে পান পাতা ঢেকে , আকাশের সামনে এলো। পান পাতা সরাতেই সুচির মুখের থেকে আকাশ চোখ সরাতে পারলো না। লাল বেনারসি , গলায় বিশাল বড়ো একটা হার , সাথে আরো দুটো ছোট ছোট আছে। কপালে টিকলি , নাকে নথ , কানে দুল , হাতে চুড়ি। আর দুই হাতের কনুই পর্যন্ত মেহেন্দী। সুচিকে এত সুন্দর আগে কখনো লাগে নি। সুচিকে মনে হচ্ছে কোন বিখ্যাত গয়নার কোম্পানির মেডল ।
সারা শরিরে গয়না ভর্তি। মুখে বেশি মেকআপ করা নেই সেটা দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু চোখে হালকা করে কাজল টানা। কৃষ্ণসার হরিণ চোখ। এই চোখেই আকাশের দৃষ্টি আটকে গেল। সুচিকে দেখে আকাশ না বলে থাকতে পারলো না , “ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে। „
সুচিও বললো , “ তোকেও ভালো দেখাচ্ছে। „
এই দুজনের কথায় সবাই হাসি ঠাট্টা করতে শুরু করলো। আকাশকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কৌশিক বললো , “ এবার চোখটা সরালে ধন্য হই। বিয়ের আরও আচার অনুষ্ঠান বাকি আছে যে ! „
তারপর সবকিছু পালন করে ছাদনাতলায় বসলো দুজনে। সাত পাক ঘুরে , মঙ্গল সূত্র পড়িয়ে যখন আকাশ সুচির সিথিতে সিঁদুর পড়ালো তখন সুচিও আকাশের সিথিতে সিদুর পড়িয়ে দিল। এতে সবাই হেসে ফেললো। সুচির মা বললেন , “ এ কি করলি তুই ? „
“ কেন ! দুজনেই দুজনার দায়িত্ব নিচ্ছি। „
রাধানাথ ঠাকুর হেসে বললেন , “ কোন অসুবিধা নেই। „
এইসব যখন হচ্ছে তখন পাশ থেকে নব বরবধূর উদ্দেশ্যে ফুল ছুঁড়তে থাকা এক মেয়ে বললো , “ দেখেছো বাবা। এটাকে বলে unconditional love । „
সঞ্জয় মেয়ের কথা শুনে কি বলবে ভেবে পেলো না।
বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর কেউ কাঁদলো না। কেঁদে হবেটা কি ! পাশের ফ্ল্যাটেই তো যাচ্ছে। তবুও মাকে , “ তোমার সব ঋণ শোধ করে দিলাম । „ বলার সময় সুচি কেঁদে ফেললো। নব বর বধূকে আশীর্বাদ করে সবাই চলে গেল। আকাশ এবং সুচিত্রা মিত্র সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এলো।
সুচিকে আকাশের ঘরে বসিয়ে তার হাতে একটা হলুদ গোলা দুধের গ্লাস ধরিয়ে আকাশের মা চলে গেলেন। বিপ্লব , আকাশের মামা আর কৌশিকের ইয়ার্কি শেষ হলে তারা আকাশকে ছেড়ে দিল। আকাশ ঘরে ঢুকতে তার চোখ ঘুরে গেল। ফুল দিয়ে সাজানো ঘর। বিছানায় গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। দড়িতে ফুল বেধে দেওয়ালে ঝোলানো। আজ যেন ঘরটাকে একটু বেশিই উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। কিন্তু এসব ছাড়াও আকাশকে যেটা সবথেকে বেশি অবাক করলো সেটা হলো সুচি খাটের কিনারায় বসে পা দুলিয়ে ফোন ঘাটছে।
আকাশ ঢুকতেই সুচি নড়ে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে সুচির শরিরের গয়নার একটা ঝনঝন আওয়াজ হলো । সুচি বললো , “ দিদিকে ফোনটা দিয়েছিলাম ভালো ভালো ফটো তুলে দিতে । দেখ ! কেমন সব বিচ্ছিরি ফটো তুলে দিয়েছে। ও হ্যাঁ , কাকি তোর জন্য দুধ রেখে গেছে। „
আকাশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর দুধের গ্লাসটা তুলে এক নিশ্বাসে সব খেয়ে ফেললো। বড্ড খিদে পেয়েছিল তার। সারাদিন বেশি কিছু পেটে পড়েনি তার। ওদিকে সুচি বললো , “ দিদিকে বললাম। দিদি বললো ওর কাছে সব ফটো আছে। পরে দেবে। „
সুচির কথা শুনে আকাশ গিয়ে পড়ার টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা চাবির গোছা বার করলো। তারপর সেই চাবির গোছা থেকে একটা চাবি নিয়ে আলমারি খুললো। আলমারি থেকে বার করলো একটা অ্যালবাম। আকাশ অ্যালবামটা নিয়ে সুচির পাশে এসে বসলো। তারপর অ্যালবামের ভিতর ফটো দেখতে লাগলো । সুচিও দেখে বললো , “ এটা দিম্মার না ! „
“ হ্যাঁ , এতে দিম্মা তোর আমার আর বাদশার ফটো রাখতো। „ বলতেই সুচি কেড়ে নিল অ্যালবামটা। তারপর খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে ফটো গুলো দেখতে লাগলো। আকাশও এসে সুচির পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে ফটো দেখতে লাগলো।
প্রথম পৃষ্ঠায় আকাশের অন্নপ্রাশনের ফটো। সেখানে সুচি আর বাদশা আছে। তারপর আকাশের হামাগুড়ি দেওয়ার ফটো। সুচি বাদশা আর আকাশের খেলনাবাটি খেলার ফটো। সুচির সাথে আকাশ আর বাদশার খেলার ফটো। তারপর সুচির প্রথম স্কুল যাওয়ার ফটো। তাতে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তারপর আকাশ , বাদশা আর সুচির কাদা মাখা ফটো। তারপর আছে সুচির প্রথম নাচের ফটো। প্রাইজ নেওয়ার ফটো। আকাশের প্রথম স্কুল যাওয়ার ফটো। তারপর আছে আকাশের হাতে ব্যান্ডেজ এর ফটো। সুচি আকাশের হাত কাঁমড়ে দিয়েছিল। তারপরেই আছে আকাশ আর সুচির পাকা রঙ মেখে ভুত হওয়ার ফটো। দুজন দাঁড়িয়ে হাসছে। ফটো দেখে আকাশ সুচি দুজনেই হেসে উঠলো। নিজেদের ফটো দেখতে দেখতে যেমন তারা হেসে উঠছিল তেমন দিম্মার ফটো দেখে উদাস হয়ে উঠছিল।
তারপরেই আছে জাগুয়ার গাড়ির সাথে দুজনের ফটো। আকাশের প্রথম পরিক্ষার রেজাল্টের ফটো। একসাথে আচার খাওয়ার ফটো। স্কুলে সুচির নাচের ফটো। তারপরেই সব খালি। আর ফটো নেই। একসাথে ফটো দেখে আর হাসি ঠাট্টা করতে করতে কখন যে দেড় ঘন্টা সময় পার হয়ে গেলো সেটা সুচি আর আকাশ বুঝতে পারলো না। অ্যালবাম দেখা শেষ হওয়ার পর যখন মুখ তুলে তাকালো তখন সাড়ে বারোটা বাজে। সুচি বললো , “ কি হলো ! আর ফটো নেই ? „
“ আছে , অন্য একটা অ্যালবামে। এরপর মা সব ফটো তুলে দিয়েছিল। „ তারপর অবাক হয়ে আকাশ বললো , “ আজকে কি তুমি শুধু অ্যালবাম দেখবে ? „
সুচি ভুরু কুঁচকে বললো , “ কেন ? আর কি করবি তুই ? „ বলতেই আকাশ সুচির ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে একটা কিস করলো ।
সুচি চোখ বড়ো বড়ো করে বললো , “ অসভ্য। একটা মেয়েকে একা ঘরের মধ্যে পেয়ে এইসব । „
“ তুমি এখন আমার স্ত্রী। আইনত এবং ধর্মীয় দুই দিক থেকেই …..
“ খুব শখ না স্বামী হওয়ার। দেখাচ্ছি তোমায় । „ বলেই আকাশের পাঞ্জাবির কলার টেনে ধরে একটা চুম্বন করলো। যখন সুচির ঠোঁটের লিপস্টিক আকাশের ঠোঁটে বসে গেল তখন আকাশ সুচিকে ছেড়ে দিল । সুচি বললো , “ কি হলো ? „
“ লাইটটা জ্বলছে। „ বলে আকাশ খাটে থেকে নেমে লাইট নিভিয়ে আবার খাটে চলে এলো।
কিছু সময়ের মধ্যেই দুজনের শরীরের উষ্ণতা বিছানার চাদর গরম করে দিল। পরবর্তী কয়েক মূহুর্ত তাদের জীবনের সবথেকে মিষ্টি মূহুর্ত হয়ে রইলো।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 3 / 5. মোট ভোটঃ 2

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment