মিষ্টি মূহুর্ত [৬ষ্ঠ পর্ব]

লেখক :— a-man & বিচিত্রবীর্য
Typist :— বিচিত্রবীর্য

সুমি অনেক জোর করেও সুচিকে রাতে কিছু খাওয়াতে পারলো না । সুচি খাবার টেবিলে না আসায় সুচির বাবা বললেন , “ ইচ্ছা হলে খাবে। না হলে খেতে হবে না। পাড়ায় মুখ দেখাবো কিভাবে সেটাই ভাবছি ! „
বাবার রাগ দেখে সুমি কিছু বললো না । বাবার খাওয়া হয়ে গেলে সুমি আর সুমির মা খাবার নিয়ে সুচির ঘরে গেল। সুচি বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে । সোসাইটির পূজা মন্ডপের গান সুচির কানে যাচ্ছে না। চোখ দিয়ে বয়ে চলা নোনা জলে বালিশ ভিজে গেছে। সুমি গিয়ে বোনের পাশে বসে বললো , “ খেয়ে নে । খাবারের উপর রাগ করতে নেই ! „
ভেজা গলায় সুচি বললো , “ আমার খিদে নেই । „
“ খেয়ে নে । যা হওয়ার হয়ে গেছে…..
দিদিকে কথা শেষ করতে দেওয়ার আগেই সুচি বললো , “ সব শেষ হয়ে গেছে দি। সব শেষ। „ এর উত্তরে সুমি কিছু বললো না। সুচির মা চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আঁচলে মুখ চেপে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুচি বললো , “ চলে যা তুই। আমি খাবো না । „
সুমি আর সুমির মা কথা বাড়াননি। সুমি মশারি খাটিয়ে বললো , “ শাড়িটা পাল্টে নে । „
সুচি কে নিরুত্তর দেখে সুমি লাইট বন্ধ করে দিয়ে খাটে এসে শুয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো , “ দেখ। তুই বড়ো হয়েছিস। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তোদের সম্পর্ক কেউ মানবে না। move on কর। জানি খুব কষ্ট হবে। কষ্ট হচ্ছে। তবুও জীবন থেমে থাকে না। সবকিছু পিছনে ফেলে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়……
সুমি সুচিকে বোঝাতে বোঝাতে ঘুমিয়ে পড়লো। সুমি ঘুমালেও সুচি ঘুমাতে পারলো না।
সারারাত সুচির ঘুম হলো না। একটা শব্দ তার চোখের পাতা এক করতে দেয়নি। শব্দটা হলো মানসিক রুগী । ঘুম না হওয়ার জন্য চোখের নীচে কালশিটে পড়ে গেল। গতকাল যে হলুদ শাড়ি পড়ে ঠাকুর দেখতে গেছিল সেই শাড়ি এখনও পড়নে আছে।
সুমি ঘুম থেকে উঠে দেখলো তার বোন সেইভাবেই পাশ ফিরে শুয়ে আছে। মশারি খুলতে গিয়ে বোনের মুখটা দেখে সুমির বুক শুকিয়ে গেল। একরাতেই চোখ ঢুকে গেছে। চোখের নীচে কালশিটে পড়ে গেছে। কোন যান্ত্রিক মেশিনের মতো চোখের পাতা উপর নীচ হচ্ছে। এই চোখে কোন প্রানের ছোঁয়া নেই। পুরোটাই যান্ত্রিক।
সুমি মশারি খুলে জোর করে বোনকে তুলে বাথরুমে পাঠিয়ে দিল। সুমি যখন ঠেলতে ঠেলতে তার বোনকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন সুমির মনে হচ্ছিল কোন লাশকে সে নিয়ে যাচ্ছে।
সুচি বাথরুমে ঢুকে কয়েক মিনিট চুপচাপ মেঝেতে বসে রইলো। এই এক দুই মিনিট-ই তার কাছে এক দুই ঘন্টার সমান মনে হলো। তারপর কলের নবের নিচে বালতি বসিয়ে নব ঘুরিয়ে দিল। কল থেকে জল পড়ছে কিন্তু তার শব্দ সুচির কানে পৌঁছাচ্ছে না। বালতি ভর্তি হয়ে গেলে নব ঘুরিয়ে কল বন্ধ করে দিল। দুই মগ জল মাথাতে ঢালতেই সারা রাতের জমে থাকা দুঃখ চোখের জলের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগলো। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো সুচি। কাঁদতে কাঁদতেই অগুনতিবার মগ থেকে জল মাথায় ঢালতে লাগলো।
দুই বালতি জলে স্নান করে একটা টপ আর হাফ প্যান্ট পড়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। সব দুঃখ চোখের জলের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে গেছে। সুমি একটা গামছা দিয়ে সুচির চুল মুছিয়ে দিল। চুল মোছা হয়ে গেলে সুচি আবার গিয়ে খাটে শুয়ে পড়লো। কিছুতেই তাকে ব্রেকফাস্ট করানো গেল না। কিন্তু দুপুরে জোর করে কয়েক গাল ভাত খাইয়ে দিলেন তার মা।
এদিকে সকাল হতেই আকাশ সুচিকে মেসেজের পর মেসেজ করে যাচ্ছে। ফোনের পর ফোন করছে কিন্তু বারবার একই কথা ভেসে আসছে , আপনি যে ব্যাক্তির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করছেন তার ফোন এখন সুইচড অফ আছে। কিছুক্ষণ পর চেষ্টা করুন। বারবার একই কথা শুনে আকাশ বিরক্ত হয়ে গেল। সুচির সাথে একবার কথা বলার জন্য তার মনটা উতলা হয়ে উঠলো। আগের মতো হুট করে পাশের ফ্ল্যাটে ঢুকে যাবে তারও উপায় নেই। কোন একটা বাঁধা তাকে পেছন থেকে টেনে ধরে রেখেছে।
সুচি লক্ষ্য করলো বাবা তার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে। রাতে খাওয়ার সময় সে লক্ষ্য করলো বাবা তার দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত।
পরের দিন সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠে সুচি দেখলো সুমি ফোনে কথা বলছে। সঙ্গে সঙ্গে সুচির মনে পড়লো ‘ ফোন ! ওই ঘটনার পর ফোনে তো হাত- ই দেয়নি সে। কোথায় আছে ফোনটা ? ‚ কিছুক্ষণ খোঁজার পর সুচি ফোনটা পেল তার হ্যান্ড ব্যাগের ভিতর। এই ব্যাগটাই কাঁধে ঝুলিয়ে অষ্টমীতে সে ঠাকুর দেখতে গেছিল। ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করার পর ফোনটাকে অন করার চেষ্টা করলো সুচি। কিন্তু ফোনটা অন হলো না। বুঝলো চার্জ শেষ। ফোনটাকে চার্জে বসিয়ে দিল।
ফুল চার্জ হওয়ার পর ফোনটা অন করে দেখলো বৈশাখী চার পাঁচবার মিসড কল করেছে আর কয়েকটা মেসেজ। কিন্তু যেটা সবথেকে বেশি চমকে দিল সেটা হলো আকাশ প্রায় ত্রিশ চল্লিশ বার ফোন করেছে। আর অজস্র মেসেজ। সুচি এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে সে আকাশের সাথে কথাই বলবে না। তাই সে বৈশাখীর মেসেজ খুলে পড়তে শুরু করলো।
বৈশাখী — কি হয়েছে রে ? গৌরব কি বলছে এসব ? তুই নাকি শুধু টাকা বুঝিস ! গৌরবের থেকে আকাশের টাকা বেশি। আমি কিছুই বুঝতে পারি নি। তাই গৌরবকে ফোন করেছিলাম। ও বললো ‘ সেটা তোকেই জিজ্ঞাসা করতে , ।
তারপর টানা কয়েক ঘন্টা রিপ্লাই না পেয়ে বৈশাখী ফোন করেছিল। চিন্তা হচ্ছিল বলে মেসেজ করেছিল — রিপ্লাই দিচ্ছিস না , ফোন করলে বলছে সুইচড অফ। কি হয়েছে বলতো ?
এইসব দেখে সুচি বৈশাখী কে একটা ফোন করলো। সুচি — হ্যালো। হ্যাঁ বল !
বৈশাখী — ফোন ধরছিলি না কেন ? আমার তো চিন্তা হচ্ছিল খুব।
সুচি — শোন শোন উতলা হোস না। কিছু হয়নি। ফোনের ব্যাটারি…..
সুচিকে কথা শেষ না করতে দিয়েই বৈশাখী বললো — ওওও তাই বল। আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল জানিস ! ও হ্যাঁ। গৌরব কিসব বলছিল। কি হয়েছে বলতো !
সুচি — কি হয়েছে সেটা ওকেই জিজ্ঞাসা করছি। দাড়া।
বৈশাখীর গলায় বিস্ময় ঝড়ে পড়লো — কি হয়েছে সেটা তুই জানিস না ! গৌরব বললো তুই জানিস। তোকেই জিজ্ঞাসা করতে।
সুচি — বললাম না ব্যাটারী ডেড ছিল। আমি জানি না কিছু। ওকে ফোন করছি দাড়া।
সুচি বৈশাখীর ফোন কেটে দিয়ে গৌরবকে ফোন করলো। খুব রাগী স্বরে সুচি জিজ্ঞাসা করলো — তুমি বৈশাখীকে কি বলেছো ওসব ?
গৌরব তার থেকেও বেশি রাগ দেখিয়ে বললো —- রাগ দেখিয়ে কথা বলো না। তোমার মতো মেয়েদের আমি খুব ভালো করে চিনি।
সুচি বজ্রকঠিন গলায় বললো —- কি উল্টোপাল্টা বলছো এসব ?
গৌরব এবার ব্যাঙ্গ করে বললো —- বেশি ন্যাকামি করো না। শোন। আমি ওখানে দাড়িয়ে সব দেখেছি। তাই আমার সামনে আর ন্যাকামি মের না। তোমার মতো মেয়েরা শুধু টাকা চেনে। যেই দেখলে আকাশের বাবার কাছে আমাদের থেকে বেশি টাকা আছে ওমনি জিভটা লকলক করে উঠলো……
ফোনটা কেটে দিয়ে অবহেলায় খাটে ছুড়ে দিল সুচি। এতো অপমান কখনো কেউ তাকে করেনি। রাগ হচ্ছে খুব। নিজের উপর রাগ হচ্ছে। রাগে ঘৃণায় অপমানে চোখে জল চলে এলো সুচির। কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার সময় হয়ে এলো। চোখে মুখে জল দিয়ে খেতে বসে সুচি দেখলো আগের দিন রাতের মতোই বাবা তার দিকে তাকাচ্ছে না। মাথা নিচু করে কিংবা বাইরের দিকে তাকিয়ে খেয়ে উঠে চলে গেলেন সুচির বাবা। সুচির মনে হলো এখন সবকিছু ভুলে বাবার রাগ ভাঙাতে হবে।
সবকিছু এক লহমায় কেমন পাল্টে গেল। সুস্থ সম্পর্ক আর সুস্থ নেই। বাবার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া , গৌরবের কাছে অপমান , আকাশের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা , এতো কিছু সুচির মনটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করতে লাগলো ঠিক যেমন সমুদ্রের ঢেউ সমুদ্র তীরবর্তী পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করে। দুই দিন টানা কয়েকবার চোখের জল ফেলে এখন মনে হয় চোখেও আর জল নেই।
খাটের উপর বসে বসে নিজের দুঃখ কষ্টের তল খুঁজতে খুঁজতে কখন যে অন্ধকার হয়ে এলো সেটা সুচি বুঝতে পারলো না। বাইরে ঢাকের উপর কাঠি পড়ার আওয়াজ হতেই সুচির হুশ ফিরলো। আজ তো বিজয়া দশমী। সবাই নিশ্চয়ই সিঁদুর খেলছে। প্রতিবার সুচিও খেলে । এবার আর খেলার ইচ্ছা নেই। কোন কিছুই করতে আর ইচ্ছা নেই।
এদিকে ঢাকের আওয়াজ শুনে আকাশ নিচে নেমে এলো এই আশায় যে হয়তো সুচি সিঁদুর খেলতে নামবে। কিন্তু আধঘন্টা অপেক্ষা করে চারিদিকে খুঁজে সুচির দেখা পেল না। উদাস মনে আবার উঠে আসতে লাগলো।
ঢাকের আওয়াজ কয়েকবার শুনেই সুচির বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা হলো খুব। সুচি উঠে বাইরে এসে নিচে নামতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। তারপর পিছন ফিরে উপরে ছাদে ওঠার সিড়িতে পা দিল। ঠিক সেই সময় আকাশ উপরে উঠে এসে সুচির পিঠ দেখতে পেল। বুঝতে পারলো যে সুচি উপরে উঠছে।
সুচিকে দেখেই আকাশের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। এখন তো আর ওরা বন্ধু নয়। এখন ওরা প্রেমিক প্রেমিকা। দুই দিন আগেই সুচি তার ভালোবাসার কথা স্বীকার করেছে । এখন ছাদে গিয়ে সুচির সাথে কথা বলার ইচ্ছা হলো খুব। কিন্তু কি দিয়ে শুরু করবে ? কিভাবে জিজ্ঞাসা করবে ভালোবাসার কথা সত্যি কি না। তারপর নিজেও স্বীকার করবে। এইসব ভাবতে ভাবতে আকাশ ছাদে উঠে এলো।
সুচি ছাদে উঠে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিচের সবার সিঁদুর খেলা দেখতে দেখতে খেয়ালই করতে পারলো না যে আকাশ তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আকাশ চুপচাপ এসে সুচির পাশে দাঁড়িয়ে সিঁদুর খেলা দেখতে লাগলো। কি বলে কথা শুরু করবে সেটাই আকাশ ভেবে পেল না। সুচির সাথে কথা বলার জন্য একদিন তাকে এতো লজ্জা পেতে হবে সেটা আকাশ কখনো ভাবেনি।
আকাশ যখন সুচির পাশে দাঁড়ালো তখন সুচি আকাশকে দেখতে পেলো। আকাশের দিকে না তাকিয়ে কিছুক্ষণ নিচে মাঠের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ঘুরে নিচে চলে যেতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে আকাশ সুচির হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিল। এতক্ষণ লজ্জায় কিছু না বলতে পারলেও এখন সুচির হঠাৎ চলে যাওয়া দেখে আকাশ সুচির হাত ধরে কথাটা বলেই ফেললো , “ তুই আমাকে ভালোবাসিস ? „
গম্ভীর দৃঢ়কন্ঠে সুচি বললো , “ না। হাত ছাড় আমার । „
আকাশ সুচির হাত না ছেড়ে বললো , “ আমার দিকে তাকিয়ে উত্তর দে । „
সুচির চোখে আবার জল চলে এলো, “ বললাম তো না। আমার হাত ছাড় । „
আকাশ দৃঢ়কন্ঠে বললো, “ আমার চোখে চোখ রেখে বল । „
কিছুক্ষণ ছাদের মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকার পর সুচি পিছন ঘুরে আকাশের দিকে তাকালো। চোখে জল টলটল করছে , “ আমি তোর মতো ছেলেকে ভালোবাসি না। ছাড় আমায় । „ বলে নিজের হাতটাকে জোর করে ছাড়িয়ে নিচে দৌড়ে চলে গেল। চোখের মধ্যে টলটল করতে থাকা অশ্রুবিন্দু হাওয়ায় ভেসে মহাকাশের কোন উজ্জ্বল তারার মতো চকচক করে উঠলো। নিচে নেমে ঘরে ঢুকে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। শুকিয়ে যাওয়া চোখে আবার বাঁধ ভেঙে জল বেরিয়ে এসে বালিশ ভিজিয়ে দিতে লাগলো ।
সুচির চলে যাওয়ার পর আকাশ চুপচাপ ছাদে দাঁড়িয়ে রইলো। একা ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো ‘ সুচি যে মিথ্যা কথা বলছে সেটা ওর চোখের জল দেখে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু মিথ্যা বললো কেন ? জেঠুর ভয়ে ? ,
নিজেকে প্রশ্ন করে কোন উত্তর খুঁজে পেল না আকাশ । ঠিক কি কারনে এখন অস্বিকার করছে সেটা কথা বলে জিজ্ঞাসা করারও উপায় নেই। সুচি তার ফোন ধরছে না আর মেসেজের উত্তরও দিচ্ছে না।
ঘরে ফিরে আকাশ ভাবতে লাগলো কিভাবে সুচির সাথে একাকী কথা বলা যায় ? আগের মতো এখন আর সরাসরি যখন তখন জেঠুর ফ্ল্যাটে ঢুকতে পারবে না। কোন এক নাম না জানা অদৃশ্য দেওয়াল ওই ফ্ল্যাটে ঢুকতে বাঁধা দিচ্ছে। আকাশ জানে না এই দেওয়াল ঠিক কতোটা শক্তিশালী। আকাশ এটাও জানে না যে এই দেওয়াল কার তৈরি ?
পরের দিন বিকাল বিকাল কৌশিক তার বৃদ্ধা মা কে নিয়ে চলে এলো। বেশ বয়স হয়েছে কৌশিকের মায়ের। তিন তলা সিড়ি ভাঙতেই তার হাটু খুলে যাওয়ার জোগাড়। কৌশিক তার মাকে নিয়ে সুমির ফ্লাটে ঢুকলে খাতির যত্নের কোন ত্রুটি হলো না। সুচি নিজে দিদিকে সাজিয়ে পাত্রপক্ষের সামনে আনলো। কৌশিকের বৃদ্ধা মা সুমিকে দেখে বললেন , “ তোমার কথা ছোটুর কাছে অনেক শুনেছি মা। তোমার ফটোও ছোটুর ফোনে দেখেছি। আমার ছোটুর পছন্দ আছে বলতে হয় । „
এতক্ষণ ধরে সুচির বাবা যে প্রশ্নটা করবো না করবো না করে উশখুশ করছিলেন সেটা করেই ফেললেন , “ আপনারা আর কাউকে নিয়ে আসেন নি ? „
কৌশিকের মা বললেন, “ এই বুড়ির দুঃখের কথা কি আর বলবো । আমার দুই ছেলে। বড়ো ছেলে কমলেশ চাকরি করতে বিদেশে গেছিল। সেখানেই এক সাদা চামড়ার মেয়েকে বিয়ে করে । আর সে এই মুখো হয়নি। আমার ছোট ছেলে কৌশিক-ই আমার দেখভাল করে। „
কৌশিকের মায়ের কথা শুনে সুমির বাবার মনটা ভরে এলো। কৌশিকের মা সাদা চামড়া কথাটা যে ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে বললেন সেটা তিনি বুঝতে পারলেন । ওদিকে কৌশিকের মা বলে চলেছেন , “ আমার খুব শখ ছিল এক মেয়ে হবে। কিন্তু আমার পোড়া কপালে মেয়ের সৌভাগ্য লেখা নেই। তোমার মেয়েকে আমি নিজের মেয়ের মতো রাখবো । তুমি চিন্তা করো না ……
সুমির বাবা পাত্রপক্ষের পরিবার সম্মন্ধে আগেই খোঁজ খবর নিয়েছিলেন। কৌশিকের বাড়ি খিদিরপুরে। মায়ের সাথেই থাকে। কোন বদ অভ্যাস নেই। কৌশিক সুমির মতোই ভদ্র মেধাবী এবং এক শক্তিশালী চরিত্রের অধিকারী।
কৌশিকের বৃদ্ধা মা দেখলেন যে কৌশিক সুমির দিকে তাকিয়ে আছে। একটু হেসে বললেন, “ তুমি এই বিয়েতে রাজি থাকলে আমি তারিখ বলতে পারি। „
বিয়ের তারিখ শুনে সমরেশ বাবু থতমত খেয়ে গেলেন। কৌশিকের মা বললেন , “ দুই মাস পর একটা ভালো তারিখ আছে। আমি বাড়ি থেকে দেখেই এসছি । „
“ দুই মাস পর ! এত তাড়াতাড়ি ! আমাদের আয়োজন করতেই তো অনেক সময় লাগবে ! „
“ আমি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সুমি কে আমার মেয়ে করে নিয়ে যেতে চাই। না করো না ! „
কৌশিকের মা এইভাবে রিকোয়েস্ট করায় সুচির বাবা একটু হেসে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। সুচির মা এমন ভাব করলো যেন স্বামীর সিদ্ধান্তোই তার সিদ্ধান্ত। স্ত্রীর সম্মতি দেখে সুমির বাবা রাজি হয়ে গেলেন।
বিয়ের পাকা কথা বলে কৌশিকের মা আর কৌশিক চলে গেল। কৌশিকের মাকে ছাড়তে সোসাইটির গেট পর্যন্ত সুমির বাবা গেলেন।
সুমি ঘরে আসতেই সুচি দিদিকে জড়িয়ে ধরলো। এই দুঃখ কষ্টের মধ্যে একমাত্র দিদিই তার পাশে আছে। এখন সেও চলে যাবে দুই মাস পর। সুমি সেটা বুঝতে পেরে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “ শোন। আমাকে কিন্তু তোকেই সাজিয়ে দিতে হবে। „
“ আমি তো কখনো কণে সাজে কাউকে সাজাইনি ……
বোনের কথা শেষ হওয়ার আগেই সুমি বললো , “ আমি চাই তুই সুখে থাক । „ তারপর মেকআপের দিকে তাকিয়ে বললো , “ দু দিনেই এগুলোতে ধুলো পড়তে শুরু করেছে। আমি বুঝি তোর কষ্ট । আমাকে তুই যেভাবেই সাজাবি আমি সে ভাবেই বিয়ে করবো । „
নাছোড়বান্দা দিদির কথা শুনে সুচি বললো , “ কিন্তু আমার কাছে অনেক জিনিস নেই। ফাউন্ডেশন নেই। তোর স্কিন ম্যাচ করে এমন মেকআপ ও নেই ! „
“ কতো লাগবে কিনতে ? „
“ আমি ঠিক জানিনা। তবে পনের কুড়ি হাজারের মধ্যে সব এসে যাবে । „ সঙ্গে সঙ্গে সুমি আলমারি খুলে গুনে গুনে কুড়ি হাজার টাকা বার করে দিল।
বিয়ে হবে ডিসেম্বরে। মোটামুটি দুই মাস সময় আছে হাতে। বিয়ের খবর পেতেই সুমির মামাতো ভাইবোন , মামা মামি চলে এলো সাহায্য করতে। আকাশ যে একটু নিরিবিলি দেখে সুচি কে একটা কোনায় টেনে নিয়ে গিয়ে কথা বলবে সেটা আরও কঠিন হয়ে উঠলো। সব সময় কেউ না কেউ ওই বাড়িতে আছে। সুচির মামাতো ভাইবোন আকাশকে চেনে। সুচির সাথে অনেকবার কথা বলতে দেখেছে। কিন্তু এখন যে কথা আকাশ বলতে চায় সেটা কারোর সামনেই বলা যায় না।
আত্মীয়দের মাঝে থেকে বিভিন্ন কেনাকাটা করতে করতে সুচির একাকিত্ব কাটলো। কিন্তু অনুষ্ঠান বাড়ির কোন উৎসাহ সুচির মনে দেখা দিল না। এই দুই মাস আকাশের অবস্থা জলহীন মাছের মতো হয়ে দাড়ালো। বারবার মেসেজ করছে কিন্তু কোন উত্তর নেই। সুচি যখন কেনাকাটা করতে যায় তখন আকাশ তাকিয়ে থাকে। যতোই আকাশের সাথে কথা না বলার এমনকি আকাশের দিকে না তাকানোর সিদ্ধান্তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হোক ! সুচিও আড়চোখে আকাশকে দেখা থেকে আটকাতে পারে না।
আগে সুচির বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে সবার প্রথম সাহায্যের জন্য এগিয়ে যেতেন আকাশের মা। কিন্তু এবার তিনি কোন সাহায্য-ই করতে পারলেন না। আকাশের মা ভাবলেন ‘ সাহায্য করলে যদি আকাশের বাবা রেগে যায় ! ‚ ।
এদিকে আকাশের মায়ের কাছ থেকে কোন রকম সাহায্য না পেয়ে সুচেতা দেবী ভাবলেন ‘ আকাশকে মারার জন্য আকাশের মা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ‚
নেমন্তন্ন করার সময় সুচির বাবা প্রথম আকাশের পরিবারকে দিয়েই আমন্ত্রণ করা শুরু করলেন। বিয়েতে বেশি কাউকে আমন্ত্রণ করা গেল না। কারন সুচির বাবার তিন কূলে কেউ নেই। সুচির মায়ের তিন ভাই ছাড়া আর আপন কেউ নেই। আর কৌশিকের প্রতিবেশী ছাড়া কেউ নেই। তাই বিয়েতে দুশোর বেশি লোক হলো না। সুমি আগে থেকে বলে রেখেছিল সুচিই তাকে কণে সাজে সাজাবে। বিয়ের দিন সুচিই তার দিদিকে সাজিয়ে দিল।
বিয়েতে সুচি একটা নীল লেহেঙ্গা , নীল ব্লাউজ আর একটা ওড়না পড়লো। এই প্রথম আকাশ সুচির থেকে চোখ ফেরাতে পারলো না। এতো সুন্দর কখনো লাগেনি। হয়তো এখন দৃষ্টি আলাদা। সুচি যখন বন্ধু ছিল তখন বন্ধুর দৃষ্টি আর এখন প্রেয়সী হয়ে ওঠায় প্রেমিকার দৃষ্টি। দুটোর পার্থক্য খুব ভালো ভাবে বুঝলো আকাশ।
বিয়ে হচ্ছে সোসাইটির কমিউনিটি হলে । বিয়ের সাজে সেজে উঠেছে সোসাইটি। বিয়ের সময় নেমন্তন্নের সবাই এলো শুধু আকাশের বাবা বাদে। লোকজন যখন গিফ্টের বাক্স দিচ্ছিল তখন সুচেতা দেবী সুচিকে বললেন , “ এখানে এগুলো রাখা ঠিক না। তুই ঘরে গিয়ে রেখে দিয়ে আয়। „
সুচি কয়েকটা গিফ্টের বাক্স নিয়ে নিল। আকাশ ঠিক এই সুযোগটাই খুঁজছিল। এখন সুচির বাড়িতে কেউ নেই ভেবে নিয়ে সেও তিনটে বাক্স হাতে নিয়ে সুচির পিছন পিছন চলে এলো। সুচির ঠিক পিছনে সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আকাশ জিজ্ঞাসা করলো , “ তুই মিথ্যা কথা কেন বলছিস ? „
সুচি আকাশের গলা শুনেই দুদ্দাড় করে সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলো। আকাশও সঙ্গে সঙ্গে উপরে এলো। আকাশ ভেবেছিল ঘরে কেউ নেই। কিন্তু লিভিংরুমে বসে কয়েকজন গল্প করছে। সুচি নিজের ঘরে খাটে গিয়ে গিফ্ট গুলো রাখতেই আকাশ এসে খাটে গিফ্ট গুলো রেখে দিল। সুচি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই আকাশ দরজার সামনে গিয়ে সুচিকে ঘরের বাইরে যেতে বাধা দিল। সুচি বাধা পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। আকাশ এগিয়ে আসতে লাগলো সুচির দিকে , “ তুই মিথ্যা কেন বলছিস ? জেঠু কিছু বলেছে ? „
মুখটা পাথরের মতো শক্ত করে সুচি বললো , “ আমার কাছে আসবি না। আর কাছে আসার চেষ্টা করিস না…..
সুচির কথা শুনে আকাশের গলার স্বর কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল “ এখন কেন ধরা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিস ? „
“ আজেবাজে কথা বলিস না। সরে যা সামনে থেকে । „
“ দুই মাস তোর সাথে কথা বলতে না পেরে আমার কি অবস্থা হয়েছে জানিস তুই ? একবার তোর দেখা পাওয়ার জন্য কতো কষ্ট পেয়েছি জানিস তুই ? „
আকাশের কষ্ট হচ্ছে শুনে সুচির চোখটা ভিজে গেল। অশ্রুসিক্ত চোখে বললো , “ প্লিজ সরে যা। আমার আর কাছে আসিস না । „
এর উত্তরে আকাশ কিছু বলার আগেই সুচির ফোনে কেউ একজন ফোন করলো। ফোনটা ধরেই সুচি বললো , “ হ্যাঁ আসছি আমি। „ বলে আকাশকে ঢেলে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল । আকাশ সুচির চোখে জল দেখে বুঝতে পারলো সেও কষ্ট পাচ্ছে। কোন একটা কারনে সে মিথ্যা কথা বলছে।
সুচি নিচে কমিউনিটি হলে চলে এলো। বিয়ে হয়েই গেছিল। এখন বিদায় পর্ব। সব হয়ে গেছে। পিছন ফিরে সুচেতা দেবীর আঁচলে চাল ঢেলে তোমার সব ঋণ শোধ করে দিলাম মা । সেটাও বলা হয়ে গেছে । সুমির বিদায় নেওয়ার সময় সমরেশ বাবুর চোখে জল চলে এলো। এইতো সেদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় সুমি ঘুমন্ত বাবার পেটের উপর উঠে বলতো “ বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে না। ওঠো। „ এই তো সেদিন স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় এই সোসাইটির বাইরে বার হলেই সুমি আবদার করতো “ বাবা কোলে নাও। পা ব্যাথা করছে । „
এইসব চোখের সামনে দেখতে পেয়ে সুমির বাবার চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো। অনেক কষ্টে চোখের জল আবার চোখের ভিতরে পাঠিয়ে দিলেন। বাবাকে কাঁদতে দেখলে যে সুমি আরও কাঁদবে। বিয়ের সাজে সোসাইটি আলোকিত হলেও সোসাইটির কিছু জায়গায় এখনও অন্ধকার হয়ে আছে। ঠিক সেইরকম একটা অন্ধকার বেছে নিয়ে সেই অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে একটা লম্বা ছায়ামূর্তি অনেকক্ষন ধরে সুমির বিদায় দেখছিল। চোখের জলে সবাইকে ভাসিয়ে দিয়ে যখন সুমি চলে যাচ্ছে তখন সেই ছায়ামূর্তি সুমিকে প্রান ভরে আশীর্বাদ করলো , “ সুখে থাক । „
গাড়িতে ওঠার আগে বোনকে জড়িয়ে ধরে সুমি বললো , “ বাবা মায়ের খেয়াল রাখিস। পড়াশোনা করবি ঠিক মতো। আমি ফোন করবো। „ কথা গুলো শুনতে শুনতে সুচি আরো ডুকরে কেঁদে ফেললো।
বিয়ে হয়ে গেছে দুই দিন হলো। সুমির অনুপস্থিতি এখন সুচিকে অনেক কষ্ট দেয়। সুচির ঘরের চার দেওয়াল সুমির স্পর্শ চায় কিন্তু পায় না। সুমির মা বাবা এখন আগের থেকে অনেক শান্ত হয়ে গেছে। বাড়িতে এখন চার জনের জায়গায় তিন জনের জন্য চাল হাড়িতে দেওয়া হয়। কিন্তু দু বার সুচেতা দেবী ভুল করে চার জনের চাল হাড়িতে দিয়ে ফুটিয়ে দিলেন। ভাত দেখে যখন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন তখন চোখের জল আর বাঁধ মানে না। সুমির বাবা একটা কাজের জন্য ভুল করে সুমি বলে ডেকে বসলেন। সুমির জায়গায় যখন সুচি বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে ঘরে এলো তখন সমরেশ বাবু নিজের ভুল বুঝতে পেরে বুকে একটা ব্যাথা অনুভব করলেন। সুমি মাঝেমাঝেই ফোন করে নিজের সুখে থাকার কথা জানান দিচ্ছে। এতেই সুমির মা বাবা সুখী।
বিয়ের দিন দুই পরেও সুচি কলেজ গেল না। আকাশ ভেবেছিল বিয়ে হয়ে গেছে তাই সুচি এবার নিয়মিত কলেজ যাবে। কিন্তু কলেজ গিয়ে সুচির দেখা না পেয়ে বাড়ি ফিরে এলো। বাড়ি আসতে আসতে অন্ধকার হয়ে এলো। বাড়ি ফিরেই আকাশ আর থাকতে না পেরে সুচিকে ফোন করতে শুরু করলো। সুচি সোফায় বসে মায়ের সাথে গল্প করছিল। আকাশের ফোন দেখে বারবার কেটে দিচ্ছিল। আরও কয়েকবার ফোন করার পর সুচির মা বললেন , “ কার ফোন ? „
“ কলেজের এক বন্ধুর । „
“ ফোনটা ধর। দরকারী কথা থাকতে পারে তো। অনেক দিন কলেজ যাচ্ছিস না . ….
মায়ের কথাতেও সুচি ফোন ফরলো না। আরও দশ এগারো বার ফোন করার পর সুচি ফোনটা ধরতেই আকাশ বললো , “ একবার ছাদে আয় । কথা আছে । „
প্রায় আট নয় মিনিট উশখুশ করার পর কোনো এক তীব্র আকর্ষণে সুচি উপরে ছাদে উঠে এলো । কালো আকাশে তারার মিটমিটে আলো আর বাকা চাঁদের উপস্থিতি সুচির মনটাকে আরও বেশি কোমল দূর্বল করে তুললো। আকাশ আগে থেকে আকাশের দিকে উদাস মনে তাকিয়ে তারার ঝিকমিক আলো উপভোগ করছিল। সুচি এসে দাঁড়াতে আকাশের হুশ ফিরলো। সুচি কর্কশ স্বরে জিজ্ঞাসা করলো , “ কি বলবি বল ? „
আকাশ ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ আমি শুধু একটা কথা জানতে চাই। তুই এখন কেন অস্বীকার করছিস ? নিজে কষ্ট পাচ্ছিস আর আমাকেও কষ্ট দিচ্ছিস । আমি আর পারছি না থাকতে ! „
কর্কশ স্বর বজায় রেখে সুচি বললো, “ অস্বীকার করার মত কিছু নেই আকাশ। আমি আগেও বলেছি আমি তোকে ভালোবাসি না। „
আকাশ রেগে গিয়ে বললো, “ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল । „
মনটাকে শক্ত করে আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে সুচি বললো , “ আমি তোকে ভালোবাসি না কতবার বলবো । „
আকাশ এবার কাছে এসে সুচির হাতের মুঠো নিজের হাতের তালুর মধ্যে বন্দি করে বললো , “ সে তোর চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুই সত্যি বলছিস কি মিথ্যা বলছিস ……
“ ছাড় আমায় । „ বলে সঙ্গে সঙ্গে সুচি আকাশের হাতের মধ্যে থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল।
সুচির কাছ থেকে বাধা পেয়ে আকাশের জেদ চেপে গেল। সুচিকে এবার কোমড়ের পিছন দিয়ে বেড় দিয়ে , সুচির শরীরকে কাছে টেনে নিয়ে , মাথাটাকে একটু ঝুকিয়ে সুচির ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দিল।
জীবনের প্রথম চুম্বন এইভাবে হবে সেটা কেউ ভাবে নি। প্রথম চুমু হয় ভালোবাসার মানুষের প্রতি বিশ্বাস আর সম্মানের ফল। কিন্তু এখানে এদের প্রথম চুম্বন হলো আকাশের জেদের ফল।
প্রথমে একটু বাঁধা দিলেও আকাশের পুরু ঠোঁট নিজের কোমল পেলব ঠোঁটের মধ্যে অনুভব করতে পেরে সুচি আকাশের বাহুপাশে বন্দী হয়ে গেল। প্রেমিকের চওড়া কঠিন বুকে নিজেকে সঁপে দিল । দুই হাত দিয়ে আকাশের মাথাটাকে ধরে তার প্রেমিকের শুষ্ক ওষ্ঠ্য নিজের মুখের ভিতর নিয়ে খেলতে লাগলো। সবকিছু ভুলে গেল সুচি। প্রথম চুম্বন তাদের সামাজিক মানসিক অবস্থা ভুলিয়ে দিল।
সুচির কাছ থেকে বাঁধা না পেয়ে আকাশ সুচির শরীরটাকে এক হাতে পালকের মতো তুলে নিল । আর একহাতে সুচির মাথার পিছনে হাত দিয়ে প্রেয়সীর মাখনের মতো সরু ওষ্ঠ্যদ্বয় নিজের মুখের ভিতর অনুভব করতে লাগলো। এখন সুচির পা মাটিতে নেই। সুচির মনে হলো সে সুখের স্বর্গে ভাসতে ভাসতে তার প্রেমিকের ওষ্ঠ্য নিজের মুখে নিয়ে আছে। আকাশের মনে হলো সুচির ঠোঁট ওর মুখের মধ্যে মাখনের মতো গলে যাবে। দুজনের বুকে দামামা বাজতে শুরু করলো। এতো ভালো কখনো লাগেনি দুজনের।
দীর্ঘ চুম্বনের পর যখন আকাশ সুচিকে ছাড়লো তখন সুচি একদৃষ্টিতে আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। ঠোঁট কাঁপছে সুচির । কিছুক্ষণ তাকিয়ে আকাশের দিকে থাকার পরেই সুচির চোখের জল বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো । ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছাদে বসে পড়লো। সুচিকে এইভাবে কাঁদতে দেখে আকাশও মেঝেতে বসে পড়লো , “ কি হয়েছে ? কাঁদছিস কেন ? „
প্রথম চুম্বনের স্বাদ পেয়ে সুচি এতোটাই কোমল আর দূর্বল হয়ে উঠলো যে , এতদিন যেকথাটা তাকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়েছে সেই কথাটা সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে ফেললো , “ আমি একজন মানসিক রোগী আকাশ। আমি শুধু তোর ক্ষতি করেছি…..
আকাশ সুচির কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলো না , “ কি বলছিস এসব। কে বলেছে তোকে তুই মানসিক রোগী ? „
চোখের জলে দুই গাল ভাসিয়ে সুচি বললো, “ যেই বলুক । কিন্তু এটাই সত্যি। আমি তোকে মারি। তোর উপর অত্যাচার করি …….
সুচির কথার রেশ ধরে আকাশ বললো, “ তুই যেমন তেমন-ই আমি তোকে ভালোবাসি। আমি চাই তুই আমাকে শাসন কর। চড় মার। আমি তোর ফিলিংস বুঝতে পারি নি। মার আমায় …….
এর আগে কখনো সুচি নিজেকে এতোটা দুর্বল অনুভব করেনি , “ আমি পারছি না আকাশ । আমি আর পারছি না । চলে যা তুই। „
সুচির কোমল মুখটা দুই হাতের তালুতে বন্দি করে বুড়ো আঙুল দিয়ে সুচির চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললো, “ কি হয়েছে সেটাতো বল ? কি জন্য তুই এখন আমাকে দুরে সরে যেতে বলছিস ? „
“ আমাদের সম্পর্ক কেউ মানবে না। না আমার মা বাবা মানবে , না কাকা কাকি মানবে । প্লিজ তুই চলে যা। আমার কাছে আর আসিস না। প্লিজ ……..
এতদিন পর আকাশ জানতে পারলো কেন সুচি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এখন যখন সে কারনটা জানতে পারলো তখন কি বলবে সেটাই ভেবে পেল না, “ তাহলে চল কোথাও চলে যাই। তুই সাবালক আর আমিও কয়েকমাস পরেই সাবালক হয়ে যাবো। তখন কেউ কিছু করতে পারবে না …….
“ প্লিজ এমন কথা বলিস না। আমি কাকিকে কষ্ট দিতে পারবো না । „
আকাশ নিজে যা বলছে সেটা নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু এখন এই দুই মাসের বিচ্ছেদের কষ্ট তাকে পাগল করে তুলেছে , “ আর তুই নিজে যে কষ্ট পাচ্ছিস সেটা কে দেখছে ? আমি যে কষ্ট পাচ্ছি সেটা কে দেখছে ? „
যতোই আকাশ সুচির চোখের জল মুছিয়ে দিক, সুচির চোখের জল এখন বাঁধ মানছে না, “ আমি পারবো না আকাশ। আমি পারবো না। „
“ নিজের কষ্টটা বোঝ। একবার শুধু বল। দূরে কোথাও চলে যাই । „
“ ছেলেমানুষি করিস না আকাশ। আমি মা বাবা কাকা কাকির মাথা নিচু করতে পারবো না । বোঝার চেষ্টা কর ……
কিছুক্ষণ চুপ থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর সুচির চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে আকাশ বললো , “ তোর কাছে তোর কষ্টের কোন দাম নেই ! আমার কষ্টেরও কোন দাম নেই ? „
“ ওরা আমাদের জন্ম দিয়েছে। ছোট থেকে কতো কষ্ট করে , কতো ত্যাগ করে বড়ো করেছে। পড়িয়েছে খাইয়েছে । আমাদের সব শখ পূরণ করেছে। ওরা আমাদের মা বাবা । আমি কিভাবে ওদের মাথা নিচু করবো ! আমরা পালিয়ে গেলে ওরা মুখ দেখাতে পারবে না . ….
ভবিষ্যতে কি হতে চলেছে সেটা ভেবেই আকাশের চোখ কপাল নাক ব্যাথায় কুঁচকে গেল “ ঠিক আছে। সারা জীবন তোর কথাই শেষ কথা হয়েছে। এখনও তাই হবে। আমি অপেক্ষা করবো তোর হ্যাঁয়ের। যদিন বলবি সেদিনকেই তোকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবো। „ বলে আকাশ উঠে দাড়ালো।
আকাশের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে সুচি ছাদ থেকে নামতে শুরু করলো। আকাশ তখন সুচির পিঠ দেখে বলে যাচ্ছে , “ আমি জানি তুই থাকতে পারবি না। একদিন তুই নিজে এসে বলবি ‘ আমাকে নিয়ে চল আমি আর পারছি না। , আমি অপেক্ষা করছি সেদিনের……
সুচি আর কিছু শুনতে পারলো না। দুদ্দাড় করে সিড়ি ভেঙে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়লো। ঘরে ঢুকে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। বিছানার চাদর চোখের জলে ভিজে লাগলো।
আকাশ ছাদ থেকে নেমে এসে নিজের ঘরের খাটে এসে শুয়ে অতীতের সুবর্ণ দিন গুলোর কথা মনে করতে লাগলো। বর্তমান ওকে কষ্ট দিচ্ছে কিন্তু অতীত তাকে ব্যাথা দিতে শুরু করলো। যদি তখন জানতাম যে এরকম একটা দিন আসবে তাহলে সুচিকে আকড়ে ধরে রাখতাম। কি সুন্দর ছিল সেইদিন গুলো, এক সাথে সিনেমা দেখা, হাতে হাত ধরে স্কুলে যাওয়া, অকারনে ঝগড়া মারপিট করা , একসাথে মেলায় যাওয়া।
নিজের মনে হেসে নিয়ে আকাশ ভাবলো মেলায় গিয়ে একসাথে নাগরদোলনা চড়ার সময় সুচি ওকে কিভাবে জড়িয়ে ধরেছিল। নিজের ঠোঁটে সদ্য সুচির নরম কোমল ঠোঁটের স্পর্শ আর সেদিনের জড়িয়ে ধরা মিলে মিশে আকাশকে এক তীব্র যন্ত্রনার অনুভূতি দিল।
হ্যাঁ মেলায় গিয়ে তো সুচি তাকে একটা আংটি পছন্দ করে দিয়েছিল। পর্ণ দেখতে গিয়ে ধরা পড়ায় রাগে আংটিটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল।
সঙ্গে সঙ্গে খাট থেকে উঠে বসলো। নিজের মনেই বললো ‘ না আমি ফেলি নি। পরে আলমারির কোথাও একটা রেখেছিলাম। ,
কথাটা মনে পড়তেই আকাশ আলমারি খুলে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো। সব জামা কাপড় লেপ কম্বল খাটে বিছিয়ে দিল। আলমারি লন্ডভন্ড করার পর একটা কোনায় সে আংটিটা পেল।
আংটিটা পেয়ে আকাশের মনে হলো যেন সে পুরানো হারিয়ে যাওয়া প্রেম খুঁজে পেয়ে গেছে। আংটিটা সোনার নয়। স্টিলের উপর সোনালী রঙ করা। এখন সেই রঙ অনেক উঠে গেছে। কিন্তু আবছা বোঝা যাচ্ছে যে আংটিটা সোনালী রঙের ছিল। আংটিটা হাতে নিয়ে লেপ কম্বল জামা প্যান্ট বিছানো খাটের উপর বসলো। আংটিটা তার ডান হাতের অনামিকাতে গলানোর চেষ্টা করলো। হলো না। আঙুল মোটা আর বড়ো হয়ে গেছে। অনামিকাতে ব্যার্থ হয়ে কনিষ্ঠা আর তর্জনী তে পড়ার চেষ্টা করলো। বার বার চেষ্টা করেও কোন আঙুলেই আর আংটিটা ঢুকলো না। আংটিটা বড্ড ছোট হয়ে গেছে। না ! আংটি ছোট হয়নি। আকাশ বড় হয়ে গেছে।
Update 2
বেহায়া মন সারারাত ধরে জীবনের প্রথম চুম্বনের কথা মনে করিয়ে সুচিকে ঘুমাতে দিল না। চুম্বনের কথা মনে করতে করতে বারবার সুচির ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ভোরবেলার দিকে ঘুমিয়ে পড়ার পর সুমির ফোনে সুচির ঘুম ভাঙলো। ঘুম জড়ানো চোখে ফোনটা ধরে সুচি বললো , “ হ্যালো । „
বোনের গলার স্বর শুনেই সুমি বুঝলো সুচি এখনও ঘুমাচ্ছে , “ আটটা বাজে আর তুই এখনও ঘুমাচ্ছিস ! „
সুচি বিরক্ত হয়ে বললো , “ কি বলবি বল ? „
সুমি আদেশের সুরে বললো , “ ওঠ বিছানা থেকে। কলেজ যা। কতদিন এইভাবে কাটাবি ? মা কাল রাতে ফোন করে কান্নাকাটি করছিল। আর কতো কাঁদাবি মাকে। শোন , আমার অফিস যেতে দেরি হয়ে যাবে। এখন রাখছি। অফিস থেকে ফিরে ফোন করে খোঁজ নেবো…..
দিদির কথা শুনে সুচির ঘুম উড়ে গেল। চুপচাপ খাটের উপর কিছুক্ষণ বসে থেকে কালকের চুম্বনের কথা মনে করলো। জীবনের প্রথম চুম্বন মনে পড়তেই সুচির ঠোঁট কেঁপে উঠলো। চুমুর কথা মনে করতেই বড্ড শীত করতে লাগলো । শীত অনুভব করে সুচি দুই কাঁধে হাত বোলাতে শুরু করলো। একটু উষ্ণতা চাই সুচির মনের। চোখটা ঝাপসা হয়ে এলেও এখন আর চোখ দিয়ে জল বার হয় না। সবার মতো চোখের জল-ও সুচিকে ছেড়ে চলে গেছে। সত্য কে সে মেনে নিতে শুরু করেছে। কেউ এই সম্পর্ক মেনে নেবে না। এটাই এখন সবথেকে বড়ো সত্য।
সুচি উঠে বিছানা গুছিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। খেয়ে দেয়ে ব্যাগ কাঁধে করে নিচে নামতেই দেখলো আকাশ পিঠে ব্যাগ নিয়ে সোসাইটির গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সুচি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আকাশের চওড়া পিঠ দেখতে দেখতে অপেক্ষা করতে লাগলো। আকাশের পিঠ দেখতে দেখতে একটা গভীর নিশ্বাস বার হলো সুচির। আকাশ একটা অটোতে উঠে চলে গেলে সুচি স্কুটি স্টার্ট দিতে শুরু করলো। হলো না। কয়েক মাস ধরে খুব ডিস্টার্ব করছে স্কুটিটা । আগেও তিন চার বার খারাপ হয়ে গেছে। নয় নয় করেও আট নয় বছর বয়স হতে চলল এই স্কুটির। স্কুটি স্টার্ট নিচ্ছে না দেখে সুচি মনে মনে বললো ‘ তুইও ছেড়ে চলে যেতে চাইছিস ! ‚
আরও কয়েকবার স্কুটি স্টার্ট করার ব্যার্থ চেষ্টা করে সুচি চাবি খুলে নিয়ে সোসাইটির বাইরে এসে বাস স্টপের জন্য অটো ধরলো । কলেজ পৌঁছে সুচি ক্লাস রুমে ঢুকে গেল। ক্লাসে ঢুকতেই বৈশাখী এসে ধরলো , “ বললি না তো কি হয়েছিল ? „
সুচি বৈশাখীর মুখ দেখে অবহেলার সুরে বললো , “ ও কিছু না । „
বৈশাখীও নাছোড়বান্দা। সুচির অবহেলা অগ্রাহ্য করে বললো , “ তাহলে গৌরব আর আমার সাথে কথা বলছে না কেন ? „
গৌরবের করা অপমান সুচি এখনও ভোলেনি। দাঁতে দাঁত পিষে সুচি বললো , “ যার কথা বলার ইচ্ছা নেই সে বলবে না। তুই গেছিস কেন ওর কাছে ? „
সুচির রাগ দেখে বৈশাখী বললো , “ নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে । না হলে তুই এতো রেগে কথা বলতিস না ! „
সুচি বিরক্ত হয়ে বললো , “ ছাড় তো ! „
অনেক পীড়াপীড়ি করার পরেও সুচির মুখ দিয়ে কিছু জানা গেল না। ওদিকে গৌরব দুজনের সাথেই বন্ধুত্ব ভেঙে দিয়েছে দেখে বৈশাখী খুব অবাক। অন্তত কারনটা জানতে পারলে একটা মীমাংসায় আসা যেত। আবার আগের মতো তিনজনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠতো। কিন্তু এখানে সমস্যাটাই তো জানা নেই , তাহলে সমস্যার সমাধান করবে কি করে !
বিজয়ার পরেই লাবনী জামশেদপুর তার মাসীর বাড়ি গিয়েছিল । ফিরলো এখন। জামশেদপুরে থাকাকালীন লাবনী আকাশের সাথে তেমন কথা বলতে পারেনি নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য। এখন কলকাতায় ফিরেই আকাশকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য ফোন না করে ডাইরেক্ট কলেজে এসে দেখা দিল। লাবনীকে দেখতে পেয়ে আকাশ হাসলো। আকাশের হাসি দেখে লাবনী গোমড়ামুখ করে বললো , “ আমাক দেখে তুমি খুশি নও মনে হচ্ছে ! „
আকাশ হেসে বললো , “ না , না , তেমন কিছু না। তোমাকে দেখে আমি সত্যিই খুশি হয়েছি। „
পরবর্তী কয়েকটা ক্লাস লাবনী লক্ষ্য করলো আকাশ হাসছে , “ হাসছো কেন ? „
“ তোমার জন্য আমি আমার ভালোবাসাকে পেলাম। তাই তোমাকে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা করছে । „
লাবনী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। তার জন্য আকাশ নিজের ভালোবাসা পেয়েছে। সে কি করলো ? লাবনীর মুখ দেখে আকাশ বুঝতে পারলো যে লাবনী কিছুই বোঝেনি , “ তুমি অষ্টমী তে আমার গালে কিস করেছিলে মনে আছে ? সেটা দেখতে পেয়েই আর থাকতে না পেরে সে সবকিছু বলে দিয়েছে। নামটা জানতে চেও না প্লিজ। „
লাবনী ঠিক বুঝতে পারলো যে সে মেয়ে আর কেউ নয় , সে হলো সুচি। এরপর কি হলো কে জানে ? লাবনী আর আকাশের সাথে তেমন গায়ে গা জড়িয়ে মেশা বন্ধ করে দিল। খুব বেশি কথা বলাও বন্ধ করে দিল। আকাশের বয়েই গেল লাবনীর কথা বলা বন্ধ করে দেওয়াতে।
এদিকে রোজ আলাদা বাসে কলেজ যেতে যেতে আর রোজ একই বাসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে কয়েক মাস কেটে গেল। একই বাসে বাড়ি ফিরলেও সুচি আকাশের দিকে তাকায় না। কিন্তু আকাশ মনটা শান্ত করার জন্য বাসের সিটে ফেলে রাখা সুচির চুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখতে দেখতে সেমেস্টারের পরীক্ষা হয়ে গেল। রেজাল্ট বার হলে দেখা গেল সুচি আর আকাশ দুজনেই খুব খারাপ নাম্বার পেয়েছে । মা বাবার কাছে দুজনেই খুব বকা খেল। ঠিক সেই সময়েই সুমি সুচিকে ফোন করে সুখবরটা দিয়ে দিল।
দিদি প্রেগন্যান্ট শুনে এতদিন পর সুচির মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে মাকে খবরটা জানিয়ে দিল সুচি। সুচেতা দেবী ফোনটা ধরে বললো , “ শোন না , বলছি যদি তোর ওখানে অসুবিধা হয় তাহলে এই কটা মাস এখানে এসে থাক ! „
“ মা , এখানে আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। কৌশিকের মা আমাকে নিজের মেয়ের মতোই যত্ন করছে। উনিও খুব খুশি খবরটা শুনে। „
এর কয়েক সপ্তাহ পরেই আকাশের বয়স আঠারো হয়ে গেল। যা করার এখনই করতে হবে ভেবে নিয়ে সে কয়েক দিন টানা কলেজ গেল না। মা জিজ্ঞাসা করলে আকাশ বললো , “ আগে বাইক কিনে দেবে । তারপর কলেজ যাবো । „
বাইকের কথা শুনেই স্নেহা দেবী রেগে গেলেন , “ থাক তাহলে ঘরে বসে। ওই যম আমি আমার বাড়িতে তুলবো না । „
টানা দুই সপ্তাহ আকাশ কলেজ গেল না। স্নেহা দেবী বাধ্য হলেন আকাশকে বাইক কিনে দিতে। আকাশের পছন্দ ছিল BMW s1000 মডেলের বাইক। কিন্তু বাইকের পিছনে এত টাকা খরচা করলে হয়তো মা আর বাড়িতেই ঢুকতে দেবে না। এই ভয়তে আকাশ BMW থেকে সোজা yamaha তে নেমে এলো। নিল রঙের yamaha fz 25 কিনে আকাশ যখন বাড়িতে ঢুকলো তখন বাইক দেখেই স্নেহা দেবী ভিরমি খেলেন । এই বাইকই তো তিনি রাস্তায় চ্যাংড়া ছেলেদের ওড়াতে দেখেছেন।
আকাশ রোজ রাতে সুচিকে একবার করে ফোন করে ঘুমায়। আশায় বসে থাকে একবার তো ফোন ধরবে। কিন্তু সুচি ফোন ধরে না। সুচিও রোজ রাতে অপেক্ষা করে থাকে আকাশের ফোনের। ফোন রিসিভ না করে ফোনের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা আকাশ নামটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । ফোন না ধরলে আকাশ একটা গুড নাইট মেসেজ করে ঘুমায়।
আজকে সে ফোন না করে মেসেজে লিখলো — বাইকটা তো দেখলি , কেমন হলো বললি না তো ? শোন , কালকে আমরা একসাথে কলেজ যাবো। ঠিক আছে ?
সুচি মেসেজটা পড়লো কিন্তু কিছু লিখলো না। সুচির নিরবতার কারন আকাশ ভালো ভাবে জানে। তাই সে জেদ ধরলো —- কালকে সোসাইটির বাইরে আমি বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো। যদি তুই না আসিস তাহলে আমি ওইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবো , কলেজ যাবো না । যতদিন না উঠবি ততদিন কলেজ যাবো না। আমার বাইকে প্রথম তুই-ই উঠবি। বুঝেছিস ।……. Good night.
সুচি মেসেজটা পড়ে খুব বিরক্ত হলো। আকাশের থেকে সুচি যত দূরে থাকার চেষ্টা করছে আকাশ তত এগিয়ে এসে কষ্ট দিচ্ছে। সকালে সোসাইটির বাইরে এসে সুচি দেখলো দূরে ইলেকট্রিক পোস্টের পাশে আকাশ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ রেয়ারভিউ মিরার দিয়ে সুচিকে দেখতে লাগলো। আকাশ দেখলো সুচি পরপর দু দুটো অটো ছেড়ে দিলো। তৃতীয় অটো ছেড়ে দিয়ে সুচি বাধ্য হলো আকাশের বাইকে বসতে।
আকাশ একটা মিচকি হাসি হেসে বাইক স্টার্ট করে দিল। আকাশের বাইকের পিছনের সিটটা চালকের সিটের থেকে আলাদা হয়ে উঁচু হয়ে আছে। আর সিটটা এমন ভাবে আছে যে , একটু ব্রেক চাপলেই পিছনে যে বসে আছে তার বুক চালকের পিঠে এসে লাগবে। সারা রাস্তা অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও সুচির বুক আকাশের পিঠে ঢেকে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর আকাশ জিজ্ঞাসা করলো , “ বললি না তো কেমন হয়েছে বাইকটা ? „
প্রাণহীন রুক্ষ স্বরে সুচি বললো “ ভালো । „ সুচির ছোট উত্তর পেয়ে আকাশ আর কিছু বললো না। কিছুদূর যাওয়ার পর সুচি বললো , “ এই শেষবারের মত বসলাম। আর জেদ করবি না এরকম। জেদ করলেও আমি বসবো না। „
নিজের নিয়মে সূর্য পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে যায়। দিন রাত হয়ে যায় , রাত দিন হয়ে যায় কিন্তু সেই দিন গুলো ডায়রির পাতায় লিখে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না। সুচি এখন বাড়ির সবকাজে মায়ের সাহায্য করে। আগের মতো সবসময় বগরবগর করে না। খাওয়ার সময় চুপচাপ খেয়ে চলে যায়। মুখের হাসিটাকেও যেন অমাবস্যার অন্ধকার গ্রাস করেছে। আগের মতো আকাশ সুচি সিনেমা দেখতে যায় না। ঘুরতে যায় না। কলেজ-বাড়ি বাড়ি-কলেজ এই হলো দুজনের জীবন। সুচির বাবা মেয়ের মুখ দেখে নিজের অজান্তেই বলে ওঠেন ‘ এটা আমি চাই নি। ,
মাসের পর মাস অতিবাহিত হলো । গাছের পাতা পড়ে গিয়ে নতুন পাতা গজালো । সোসাইটির বার্ষিক অনুষ্ঠানে সুচিকে নাচতে দেখা গেল না। সুমি অনেক বলেও সুচিকে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাতে পারলো না। পূজার কটা দিন ঘরে বসেই কাটালো দুজনে ।
ডিসেম্বরের দিকে সুমির মেয়ে হলো। নাম রাখা হলো প্রজ্ঞা। যেন সুমির মুখ কেটেই প্রজ্ঞার মুখে বসানো । সপরিবারে সবাই খিদিরপুরে গিয়ে কয়েকদিন থেকে এলো। সুচি ছোট্ট বোনঝিকে ছাড়তেই চায় না। মন চায় সবসময় এই বাড়িতে পরে থাকে। কিন্তু দিদির শশুর বাড়িতে দিনের পর দিন থাকবে এটা খারাপ দেখায়। তার উপর কৌশিকের মা কি ভাববে ! তাই মন চাইলেও একমাত্র বোনঝির সাথে বেশি খেলা খেলতে পারে না সুচি।
এর সমাধান স্বয়ং ঈশ্বর নিজেই করে দিলেন। প্রজ্ঞার দুই মাস বয়স হতেই কৌশিকের মা ইহজগত ত্যাগ করে চলে গেলেন। সুমি বোনের মুখে হাসি কাড়তে চায় না তাই সে বললো , “ তুই চাইলে রবিবার করে এখানে এসে থাকতে পারিস। তোর জামাইবাবুর কোন অসুবিধা হবে না। „
দিদির কথা মতো সুচি রবিবার সকালে দেড় দুই ঘন্টা বাসে চেপে চলে যায় খিদিরপুর। সেখানে সারাদিন থেকে প্রজ্ঞার সাথে অনেক দুষ্টুমি করে রাতের বাসে আবার ফিরে আসে। ফেসবুকে প্রজ্ঞার সাথে অনেক মজার কিংবা খুনসুটির ফটো, ভিডিও আপলোড করে। সেগুলো দেখেই আকাশের দিন কেটে যায়। নতুন ভিডিও কিংবা ফটো আসার অপেক্ষা করতে থাকে সে।
আরও কয়েকমাস পরে দোল চলে এলো। প্রতিবছর হইহই করে দোল খেলা হয়। আকাশ সুচি সুমি বিপ্লব জয়শ্রী সোসাইটির আরও সব ছেলে বাচ্চাকাচ্চা বড়ো বুড়ো এই খেলায় যোগ দেয়। কিন্তু এখন সুমি এই সোসাইটিতে থাকে না। সুচি ঘর থেকেই বার হয়না। আকাশ খেলার সঙ্গী না পেয়ে কিছুক্ষণ ঘরে বসে থাকলো। মনে মনে ভাবলো ‘ না এইভাবে দিনটা অন্যান্য দিনের মতো কাটানো যাবে না । ,
কথাটা ভেবেই আকাশ সোসাইটির বাইরে এসে একটা আবিরের প্যাকেট কিনে এনে ছাদে চলে এলো। এসেই সুচিকে ফোন করতে শুরু করলো । দুই তিন বার ফোন করার পর সুচি ফোন ধরতেই , “ ছাদে আয়। „ বলে আকাশ ফোনটা কেটে দিল।
সুচি যাবো না যাবো না করেও দশ মিনিট পরে ছাদে চলে এলো। ছাদে এসে দেখলো আকাশ নিচে সোসাইটির বাইরে রাস্তার সব বাচ্চাদের খেলা দেখছে। সুচি গলার স্বর খাদে নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ কি বলবি বল ? „
আকাশ ঘাড় ঘুরিয়ে বললো , “ সবসময় কিছু বলার জন্য ডাকবো এটা কি করে ভাবলি তুই ! „ বলে পকেট থেকে আবিরের প্যাকেট থেকে হলুদ আবির বার করে সুচির ফর্সা গালে মাখিয়ে দিল। তারপর আবিরের প্যাকেট সুচির দিকে বাড়িয়ে ধরে আকাশ বললো , “ আমাকে মাখাবি না ? „
সুচি বিষন্ন মনে প্যাকেট থেকে একটু আবির বার করে আকাশের দুই গালে মাখিয়ে দিল। সুচির হাতে আবির মেখে আকাশ ছাদে বসে পড়লো । আকাশের মেঘের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো , “ মনে আছে ! তোকে আমি পাকা রঙ মাখিয়ে ছিলাম ! আর দিদিমার সাথে মিলে রাতে তুই আমাকে পাকা রঙ মাখিয়ে ছিলি …..
সুচি কিছু বললো না। ছাদে দাড়িয়ে চুপচাপ নীল আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘেদের আনাগোনা দেখতে লাগলো। আকাশ বলে চলেছে , “ মনে আছে ! আমি তোকে কি নামে রাগাতাম ? ক্ষ্যাপা , তারপর তালগাছের মতো ঢ্যাঙা , কোন জেলার তালুকদার তুই ? এইসব বলে রাগাতাম । „ বলে মুচকি হাসলো আকাশ ।
কথা গুলো শুনতে শুনতে সুচি আকাশের স্বরে যে ব্যাথা আছে সেটা অনুভব করলো। আকাশ বলে চলে চললো , “ আমি এইসব স্মৃতিতে বাঁচতে চাই না সুচি। আমি নতুন স্মৃতি তৈরি করতে চাই। প্লিজ একবার হ্যাঁ বলে দে । তোকে নিয়ে কোথাও চলে যাবো। খুব সুখে থাকবো আমরা । „
এর উত্তরে কিছু বলতে গিয়ে সুচি নিজের গলায় কিছু একটা দলা পাকিয়ে গেছে সেটা বুঝলো। একটা ঢোক গিলে বললো , “ আমি সেই স্মৃতি গুলোর নিচেই চাপা পড়ে আছি । „ বলেই চোখ দিয়ে দুই ফোটা জল বেরিয়ে এলো। আকাশকে ছাদে রেখেই সুচি নিজের ফ্ল্যাটে চলে এলো।
আকাশ ছাদে চুপচাপ বসে বসে মেঘেদের খেলা দেখতে লাগলো। পরিস্থিতি যে কষ্ট দিচ্ছে সেই কষ্টের বোঝা বুকে নিয়েই ছাদে সে শুয়ে পড়লো।
এর কয়েক মাস পর সুচি M.com পাস করলো । আগের থেকে অনেক ভালো নাম্বারে পাস করলো সুচি। দিদির কথাতে হাতে রেজাল্ট আসতেই সুচি বিভিন্ন কোম্পানিতে বিভিন্ন পদের চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে শুরু করলো। সকাল দশটায় বার হয়ে সারাদিন ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরতে বিকাল হয়ে যায়।
কয়েকটা জায়গায় দেড় দুই লাখ টাকার ইনশরেন্স করাতে বলে তো কয়েক জায়গায় বেতন খুব কম। বিভিন্ন কারনে পাঁচটা জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েও কোন লাভ হলো না।
সুচি যে চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দিচ্ছে সেটা আকাশের বাবা দেখতে পেলেন। বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করে বুঝলেন ব্যাপারটা। একদিন বিকালে অফিস থেকে ফিরে আকাশের বাবা দেখলেন সুচির বাবাও বাস থেকে নামলেন। সিড়িতে দুজনার মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। পাশাপাশি হাটতে হাটতে আকাশের বাবা গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন , “ আজ কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছি তোমার মেয়ে সকালে কোথাও একটা যাচ্ছে । কলেজ তো শেষ ? „
সুচির বাবা আরও গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন , “ এখন চাকরি খুঁজছে। ইন্টারভিউ দিতে যায়। „
সুচির বাবার গম্ভীর স্বরের ব্যাঙ্গ উপেক্ষা করে আকাশের বাবা বললেন , “ সুচি যদি C.A র চাকরি করতে চায় তাহলে আমার ওখানে ভ্যাকেন্সি আছে। পরশু থেকে ইন্টারভিউ নিয়ে ইন্টার্ন নেওয়া হবে। একবার ইন্টারভিউ দিতে বলো । „
আকাশের বাবার কথা শুনে সুচির বাবার ভুরু কুঁচকে গেল । রাতের খাওয়ার সময় পর্যন্ত সেই ভুরু কুঁচকে রইলো । খেতে বসে তিনি ছোট মেয়ের মুখ দেখলেন , মুখটা শুকিয়ে গেছে। বেশ খাটাখাটনি চলছে সেটা সুচির বাবা বুঝতে পারছেন । খেতে খেতে বললেন , “ যদি অসুবিধা না থাকে তাহলে আকাশের বাবার কোম্পানিতে একটা ইন্টারভিউ দে। পরশু থেকে ওখানে ইন্টারভিউ নেবে । „
বাবার কথা শুনে সুচি যতোটা না খুশি হলো তার থেকেও বেশি অবাক হয়ে গেল । এই বাবাই তো বলেছিল যে এদের সাথে আমাদের কোন ধরনের সম্পর্ক হয় না। তাহলে কি বাবা এটা বোঝাতে চাইছে যে , আকাশরা হলো মালিক শ্রেণী আর আমরা হলাম শ্রমিক শ্রেণী ! সুচি এর কিছুই বুঝতে পারলো না। কিন্তু বাবার কথা রাখতে সে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
সুচি খবরটা আকাশকে জানালো না। দুদিন পরে সকাল সকাল নিজের CV আর সব মার্কশিট , সার্টিফিকেট নিয়ে আকাশের বাবার কোম্পানির অফিসে পৌঁছে গেল। আগে যেখানে বড়ো বড়ো ছয় চাকা কিংবা আট চাকার গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতো তার পাশেই অফিস ছিল। এখন সেটা বড়ো একটা বিল্ডিংয়ে পরিনত হয়েছে। দশ বারো তলা তো হবেই। বিল্ডিংয়ে ঢুকতেই গার্ড কে জিজ্ঞাসা করতে গার্ড বললো , “ DS import & export এর অফিস seven ফ্লোরে। আপনি ইন্টারভিউ দিতে যাবেন তো ? „
“ হ্যাঁ । „
“ তাহলে আপনি fifth ফ্লোরে চলে যান। আর এখানে নিজের নাম আর এড্রেস লিখে যান। „
সবকিছু লিখে সুচি fifth ফ্লোরের লিফ্ট ধরলো। লিফ্ট থেকে বেরিয়ে একটা করিডোর পার করেই একটা বড়ো ওয়েটিং রুম দেখতে পেলো। সুচি দেখলো সেখানে আরো পঞ্চাশ ষাট জন বসে আছে। নিজের ফাইল জমা দিয়ে সুচিও একটা সিটে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো। কে ইন্টারভিউ নিচ্ছে সেটা সুচি বুঝতে পারছে না। অফিসের কাউকেই সুচি চেনে না। বাকি ক্যান্ডিডেট দের মধ্যে বেশিরভাগ সবাই কোর্ট প্যান্ট পড়ে আছে। খুব কম ছেলে মেয়ে জামা জিন্স , কিংবা চুড়িদার কুর্তি এইসব পড়ে আছে।
সুচি তাকিয়ে দেখলো ওয়েটিং রুমের দেওয়ালে বিভিন্ন পোস্টারে আন্দামান , কুলু , সিকিম , রাজস্থান , গোয়ার ফটো দেওয়া আছে। কয়েক বছর হলো এই কোম্পানি ট্রাভেলিং এর বিজনেসও শুরু করেছে , এটা সুচি জানে। কিছু দিন আগে বিদেশে যেমন জাপান , হংকং , সিঙ্গাপুরেও বিজনেস শুরু করেছে। আকাশ একবার বলেছিল, “ যখন অফিসে জয়েন করবো, তখন আমি আর তুই সব জায়গায় ঘুরবো । „
কথাটা এখন সুচির মনে পড়ে গেল। কথাটা মনে পড়তেই সুচি বুকে ব্যাথা অনুভব করলো।
সুচি লক্ষ্য করলো এক একজন বেশ ভালোই সময় নিচ্ছে। কুড়ি মিনিট তো হবেই। সকাল গড়িয়ে দুপুর গড়িয়ে গেল। তখন পাশ বসা আরও একটা মেয়ে বললো , “ আমাদের লাইন আসতে এখনও দুই তিন ঘন্টা বাকি। কিছু খেয়ে আসবে ? „
মেয়েটার গায়ে সুচির মতোই কুর্তা কিন্তু জিন্সের বদলে আছে লেগিংস। সুচি ভাবলো হয়তো কোর্ট প্যান্ট পড়া দল আলাদা জগতের লোক। তাই কাপড় দেখে সুচিকে নিজের জগতের লোক ভেবে নিয়েছে। সুচি হেসে বললো , “ হ্যাঁ আমারও খিদে পেয়েছে। চলো। „
নিচে এসে একটা ছোট দেখে ধাবা বেছে নিয়ে দুজনে মাসালা ঢোসা অর্ডার করলো । মেয়েটা জিজ্ঞাসা করলো , “ এই নিয়ে কটা ইন্টারভিউ দিচ্ছো ? „
সুচি অপরিচিত একজনকে বলবে কি বলবে না ভেবে নিয়ে বলেই ফেললো , “ এটা নিয়ে ছটা কোম্পানি হবে । „
“ আমার তিনটে। আসলে কি বলো তো ! , বেসরকারি কোম্পানি তার উপর ইন্টার্নশীপ দুই বছরের। আর সব জায়গায় মাইনে পনের হাজার থেকে পচিশ হাজার। কিন্তু এখানে ইন্টার্নশীপ এক বছরের আর শুরুতেই মাইনে ত্রিশ হাজার। „
সুচি মিষ্টি গলায় বললো , “ খুব লোভনীয় । „
মেয়েটা চোখ বড়ো বড়ো করে বললো “ তা আর বলতে ! একবার যদি পেয়ে যাই চাকরিটা ! এক বছর যাইহোক করে কাটিয়ে তারপর রানীর মতো থাকবো । „
সুচি না হেসে পারলো না । সুচির হাসি দেখে মেয়েটা বললো , “ দেখেছো ! আমার নামটাই বলা হয়নি। আমার নাম মধুমিতা ঘোষ। „
সুচিও হেসে বললো, “ আমার নাম সুচিত্রা তালুকদার। „
পরিচয় পর্ব শেষ হলে অর্ডার করা খাবার চলে এলো। খেয়ে দেয়ে আবার ওয়েটিং রুমে এসে বসার একঘন্টা পর মধুমিতার ডাক পড়লো। মধুমিতার পরেই সুচি। তাই সুচি মানসিকভাবে তৈরী হতে লাগলো। মধুমিতা বেরিয়েই চোখ বড়ো বড়ো করে একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুচিকে বেস্ট অফ লাক বলে চলে গেল। দুই মিনিট পরেই একজন দরজা দিয়ে মুখটা বার করে বললো , “ সুচিত্রা তালুকদার । „
সুচিত্রা উঠে দাড়াতেই লোকটা ভিতরে চলে গেল। সুচি গিয়ে সব ফর্মালিটি পালন করে সিটে বসলো। সামনে দুই জন পুরুষ কোর্ট প্যান্ট পড়ে বসে আছে। একজন ইয়াং আর একজন বয়সে একটু বড়ো। আর তৃতীয় জন হলো মহিলা। ইন্টারভিউ চললো পনেরো মিনিট। সব প্রশ্নের উত্তর কনফিডেন্স এর সাথে সঠিক ভাবে দিল সুচি। ইন্টারভিউ শেষে মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন , “ আমরা তোমাকেই এই পোস্টের জন্য নেবো কেন ? „
সুচি খুব কনফিডেন্স এর সাথে বলতে শুরু করলো , “ দেখুন ম্যাম , কলেজে বসে বই পড়ে নিজের কাজ সম্পর্কে জানা আর এখানে হাতে কলমে কাজ শিখে জানা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। আমার আগে যারা ইন্টারভিউ দিয়েছে আর যারা আমার পড়ে ইন্টারভিউ দেবে তাদের মধ্যে অনেকেই আমার কলেজের থেকে ভালো কলেজে পড়ে আমার থেকে বেশি নাম্বার পেয়ে পাস করেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস এখানে থেকে হাতে কলমে কাজ শিখে ওদের থেকে বেশি আমি আপনাদেরকে সাহায্য করতে চেষ্টা করবো । তাই আপনাদের বেশি সাহায্যের জন্য আপনারা আমাকে এই পোস্টের জন্য নেবেন। „
ইন্টারভিউ শেষ হলে সুচি বাড়ি চলে এলো। দুই দিন ধরে ইন্টারভিউ চললো। তৃতীয় দিনে ইন্টারভিউতে উত্তীর্ণদের ফাইল কোম্পানির হেডের টেবিলে এলো। প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাটটা ফাইল আছে। তাদের মধ্যে তিনটে আলাদা ডিপার্টমেন্টের জন্য তিন জনকে সিলেক্ট করতে হবে। সঞ্জয় আর আকাশের বাবা ফাইল গুলো আর তাদের পারফরম্যান্স এর কাগজ গুলো দেখতে বসলেন। ফাইল দেখলেও আকাশের বাবার মনযোগ কিন্তু অন্য দিকে। তিনি ফাইল খুলেই প্রথমে সবার ফটো দেখছেন। কুড়ি ত্রিশটা ফাইল দেখার পর তিনি মুষড়ে পড়লেন ‘ ইন্টারভিউ তেই কি তাহলে মেয়েটা হেরে গেল। ,
না ! আরও পাঁচটা ফাইলের পর একটা গোলাপি রঙের ফাইল খুলেই তিনি সুচির ফটো দেখতে পেলেন। ফটো দেখেই আকাশের বাবার মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি ইন্টারভিউ যারা নিয়েছিল তাদের ডাকলেন। তিন জন আসতেই আকাশের বাবা জিজ্ঞাসা করলেন , “ একে কেমন লাগলো তোমাদের ? „
যে মহিলা ইন্টারভিউ নিয়েছিল সে সুচির ফটো দেখে খুশি হয়ে বললো , “ স্যার , মেয়েটাকে খুব কনফিডেন্স আর সৎ মনে হয়েছিল। „
“ তাহলেই চলবে । একে ফোন করে বলে দাও সামনের মাস থেকে জয়েন করতে । „
বসের কথার উপর আর কারোর সিদ্ধান্ত চলে না। এখানেও চললো না। আকাশের বাবা সুচিকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথাটা আর বাড়ির কাউকে বললেন না। সুচিও আকাশকে খবরটা বললো না। চাকরিতে জয়েন করার পর সুচি সোম থেকে শনি অফিসে কাটিয়ে রবিবার সকাল সকাল একমাত্র বোনঝির কাছে খিদিরপুর চলে যায় শুধু একটু বেঁচে থাকার জন্য। সারাদিন ওখানে থেকে প্রজ্ঞার সাথে খেলে দুপুরে লাঞ্চ করে এবং বিকালে টিফিন করে সুচি বাড়ি চলে আসে।
কয়েক সপ্তাহ সবকিছু খুটিনাটি জেনে নিয়ে সুচি নিজের কাজ মন দিয়ে করতে শুরু করলো। সুচির কাজ অফিসে সবার নজর কাড়লো। চার মাস পর আকাশের বাবা খুশি হয়ে এতদিন চেপে রাখা খবরটা ডিনারে বলে ফেললেন , “ তোমাকে তো বলা হয়নি ! সুচি আমার ওখানে ইন্টারভিউ দিয়েছিল। সিলেক্ট হয়ে এখন কাজ করছে। সবকাজ নিট এন্ড ক্লিন। „
আকাশের মা বোকা বনে গেলেন , “ সুচি আমাদের কোম্পানিতে চাকরি করে আগে বলো নি তো ! „
“ চাকরি করে না। এখন ইন্টার্নশীপে আছে। ওর কাজ ওকে খুব শীঘ্রই পাকাপাকি চাকরি পাইয়ে দেবে । „ স্ত্রী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে আকাশের বাবা আরও বললেন , “ তুমিই তো বলো অফিসের কথা বাড়িতে না আনতে । „
“ এই কথাটা আর অফিসের কাজ এক হলো ! „
আকাশের বাবা আর কিছু বললেন না। কিন্তু আকাশ খাবার প্লেটে রেখেই উঠে পড়লো। এতক্ষণ বাবার মুখে কথাগুলো শুনে আকাশের যে কি আনন্দ হচ্ছিল সেটা বলে বোঝানোর জন্য নয়।
আকাশ ঘরে এসে সুচিকে ফোন করলো। সুচি ভাবলো এটা হয়তো প্রতিদিনের মতো একটা ফোন। তাই সে ফোন ধরলো না। কিন্তু আকাশ দ্বিতীয় বার ফোন করতেই সুচি অবাক হয়ে গেল। নিশ্চয়ই কিছু বলার আছে। আকাশ তৃতীয় ফোন করতে সুচি ফোনটা ধরলো , “ বল। „
আকাশ রাগী আর গম্ভীর স্বরে বললো , “ আমি ভেবেছিলাম তুই প্রজ্ঞার সাথে খেলতে যাস কিন্তু তুই আমাদের কোম্পানিতে চাকরি করছিস বলিস নি কেন ? „
সুচি রুক্ষ স্বরে বললো , “ তোকে কতবার বোঝাবো , আমাদের মধ্যে এখন আর কিছু আগের মতো নেই……
সুচির রাগে আকাশের উৎসাহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়লো না , “ শোন , বাবা তোর কাজে খুব খুশি । বাবা বললো তোর চাকরি পাকা হয়ে যাবে। যেভাবেই হোক বাবাকে খুশি করতে পারলে বাবা আমাদের সম্পর্ক ঠিক মেনে নেবে । „
“ তুই জানিস তুই কি বলছিস ? কাকা এখন আমার বসের বসের বসের বস। এটার মানে জানিস তুই ? তিন চার মাস হয়ে গেল আমি আর কাকা একই বিল্ডিংয়ে কাজ করছি ! একবার কাকার অফিসে যাওয়া তো দূর আমি কাকাকে দেখিইনি । আর তুই বলছিস কাকাকে খুশি করতে ! „ বলেই আকাশের মুখের উপর সুচি ফোনটা কেটে দিল ।
যা একটু আশার আলো আকাশ দেখতে পেয়েছিল সেই আলো ধপ করে জ্বলে আবার নিভে গেল। দেখতে দেখতে আকাশ BBA পাস করলো। এবার সুচিকে সবসময় সামনে থেকে দেখতে পাবে। এই আশায় মাকে বললো , “ কাল থেকে বাবার সাথে অফিস যাবো । কাজ শিখবো। „
স্নেহা দেবী ছেলের কথা শুনেই রুদ্রমূর্তি ধরলেন , “ অফিস যাবি মানে ? বয়স কতো তোর ? এখন পড়াশোনা করার বয়স । পড়াশোনা কর। কাজ করার সময় অনেক আছে। „
“ আর কতো পড়বো ? গ্রাজুয়েট তো হয়ে গেলাম ! „
“ মাস্টার্স করবি। MBA করবি । „
আরও কিছুক্ষণ চললো মায়ের সাথে তর্কাতর্কি। পুরো কথোপকথনটাই আকাশের বাবা শুনলেন। তিনিও আকাশের মায়ের সাথে একমত। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। কারন তিনি ছেলের এই আচরণের মানে খুব ভালো ভাবে জানেন। আকাশ সুচির সাথে একসাথে থাকার সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু এখন পড়াশোনা করাটা দরকার তাই তিনি ছেলের কথা না শুনে স্ত্রীর সুরে সুর মেলালেন । বাবা মা একদিকে হওয়ায় তর্কের শেষে আকাশ হার মানতে বাধ্য হলো।
Update 3
প্রজ্ঞা জন্মানোর পর সুমি দুই তিন বার বাবার বাড়িতে এসেছিল কিন্তু কৌশিকের অফিসের জন্য বেশিদিন থাকতে পারে নি। সেই কয়দিন আকাশের খুব ইচ্ছা হতো প্রজ্ঞাকে আদর করার , কোলে নেওয়ার। কিন্তু সেই ইচ্ছা কখনোই পুরন হয়নি।
সুচি যে সারা সপ্তাহ অফিসে কাজ করে রবিবার সারাদিন দিদির বাড়িতে কাটায় এটা আকাশ সুচির ফেসবুকে পোস্ট দেখে জানে। আকাশ এমনিতেই সুচির কাছে থাকার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। তাই সে ঠিক করলো সামনের রবিবার সুচি আর ও একসাথে সুমির বাড়িতে যাবে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। রবিবার সকাল দশটা বাজার আগেই স্নান করে খেয়ে দেয়ে ভালো জামা পড়ে বাইক নিয়ে সোসাইটির গেটের সামনে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে রইলো। মাকে বললো ‘ বন্ধুর জন্মদিন তাই আসতে রাত হবে। , আর সুচিকে আগে থেকে কিছুই জানায়নি কারন সুচি বেঁকে বসতে পারে।
প্রতি রবিবারের মতোই সুচি সাড়ে দশটার মধ্যে স্নান করে সকালের ব্রেকফাস্ট করে সোসাইটির বাইরে এলো অটো ধরবে বলে। সোসাইটির বড়ো লোহার গেটের বাইরে এসেই আকাশকে দেখে সুচি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো । কিছুক্ষণ বজ্রকঠিন মুখে আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আকাশের এখানে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কারন বোঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোন কারন সুচি বুঝতে পারলো না , তাই সে জিজ্ঞাসা করলো , “ এখানে কি করছিস ? „
আকাশ ভুরু কপালে তুলে বললো , “ তোর সাথে খিদিরপুর যাবো । „
সুচি আকাশের মুখভঙ্গি দেখে রেগে গিয়ে বললো , “ খিদিরপুরে তোর কি ? „
আকাশ ঠোঁটে হাসি নিয়ে ইয়ার্কি করে বললো , “ আমার ম্যামের বাড়ি ওখানে। তার মেয়েকে দেখতে যাবো। „
সুচি আকাশের কথা বুঝতে পারলো। এক সময় সুমি আকাশকে পড়াতো । সেই সূত্রে আকাশ সুমিকে ম্যাম বলছে । আকাশের কথা বুঝতে পেরে সুচির খুব হাসি পেল। কিন্তু আকাশ যে তার সাথে থাকার জন্যেই এরকম করছে সেটাও সুচি বুঝতে পারলো। তাই খুব কষ্টে হাসি চেপে রাগি স্বরে বললো , “ মানে ! „
“ প্রজ্ঞাকে দেখতে যাবো। কখনো কোলে নিই নি। কথা না বাড়িয়ে এবার ওঠ । দেরি হয়ে যাবে। „
সুচি তার কন্ঠে রাগ বজায় রেখে বললো , “ আমি তোর সাথে যাবো এটা ভাবলি কি করে তুই ! „
আকাশ খুব ভালো করে জানে সুচি কেন এরকম করছে । কিন্তু আকাশের কষ্টটা সুচি বুঝতে চাইছে না। তাই সে পাল্টা প্রশ্ন করলো , “ কেন ? আমার সাথে যেতে তোর কি অসুবিধা ? নাকি আমাকে তোর আদরের বোনঝির থেকে দূরে রাখতে চাইছিস ! „
আকাশের কথায় সুচি খুব রেগে গেল কিন্তু কিছু বললো না। আকাশ এখন সুচির পছন্দ মতো চাপদাড়ি রাখে। চওড়া মুখে চাপদাড়িতে আকাশকে খুব সুন্দর দেখতে লাগে। সেই সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সুচি কিছু একটা ভাবলো। তারপর কিছু না বলে আকাশের বাইকের পিছনের সিটে দুই দিকে পা দিয়ে বসে পড়লো ।
আকাশ ভাবেনি সুচি এত সহজে রাজি হয়ে যাবে। সুচি বাইকে বসতেই আকাশ মাথায় তার নিল হেলমেটটা গলিয়ে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিয়ে দিল। বাইক ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চললো খিদিরপুরের দিকে। APC রোড হয়ে সোজা AJC রোডে উঠে ডান দিকে ঘুরে , বা দিকে চিড়িয়াখানা ফেলে খিদিরপুর বাজারে ঢুকে গেল আকাশ। তারপর সুচির নির্দেশ মত এগলি ওগলি করে একটা নির্জন গলির মধ্যে ঢুকে সুচি বললো , “ এখানে থামা । „
আকাশ দেখলো গলিটা পুরানো কলকাতার অলিগলির মতো সরু । রাস্তাটা পিচমোড়া। আর রাস্তার দুই পাশে বাড়ির সারি। দুরে একটা চাতালে দুজন আকাশের বয়সী ছেলে বসে গল্পো করছে । আকাশ আশেপাশের বাড়ি দেখতে দেখতে বললো “ এখানে ? „
সুচি বাইক থেমে নেমে সামনের সবুজ কাঠের দরজায় লাগানো শেকলে কড়া নেড়ে বললো , “ এটা দিদির শশুর বাড়ি । „
কয়েক সেকেন্ড পড়েই সুমি প্রজ্ঞাকে কোলে করে নিয়ে এসে দরজা খুলে দিল। সুমি দরজা খুলে দিলে সুচি বললো , “ বাইকটা ভিতরে রাখ । „
আকাশ বাইকটা সেই সবুজ দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দেখলো সরু করিডোরের মত উঠোন। তার মাঝে আছে একটা বাধানো তুলসী গাছ। আকাশ সেই তুলসীতলার পাশেই বাইকটা রেখে দিল।
আকাশকে দেখেই সুমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছিল। সুমি একবার সুচির দিকে তাকিয়ে আকাশের এখানে আসার কারন জিজ্ঞাসা করলো। সুচি চোখ দিয়ে ইশারা করে বলে দিল , “ পরে বলছি । „
বোনের ইশারা বুঝতে পেরে সুমি আকাশকে জিজ্ঞাসা করলো , “ কেমন আছি ? „
আকাশ বাইক থেকে চাবি খুলে নিয়ে বললো , “ আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো ? „
“ আমিও ভালো আছি । আয় , ভিতরে এসে বোস । „ বলে একটা ঘরে ঢুকে গেল সুমি।
সুমির পিছন পিছন সুচি আর আকাশ সেই ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকে দেখলো এটা লিভিংরুম সাথে ডাইনিং রুম-ও। ঘরের একদিকের দেওয়ালের গা ঘেসে একটা টেবিল আছে। টেবিলের উপর বাক্স টিভি বসানো। তিনটে সোফা টিভির দিকেই ঘোরানো। সোফার থেকে কিছু দূরেই আছে ডাইনিং টেবিল। দেওয়ালে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের কারুকার্য করা পেন্টিং , মুখোশ , কাঠের জিনিস সাজানো আছে। আকাশ গিয়ে সোফায় বসে পড়লো। ঠিক তখনই কৌশিক চশমা জামায় মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলো । আকাশ সোফায় বসলে সুমি বললো , “ তুই কৌশিকের সাথে কথা বল । আমি তোদের খাবারের ব্যাবস্থা করছি। „
কৌশিক চশমাটা পড়ে নিয়ে দেখলো আকাশ সোফায় বসে আছে। হাসি মুখে আকাশের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা সোফায় বসতে বসতে বললো , “ কেমন আছো ? „
সুমি আকাশকে বসতে বলে প্রজ্ঞাকে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। সুচিও পিছন পিছন গিয়ে ঢুকলো রান্নাঘরে। সুমি প্রজ্ঞাকে বোনের কোলে দিয়ে গ্যাসের নব ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ ওকে এখানে আনলি কেন ? বাবা জানতে পারলে কি হবে ভেবে দেখেছিস ? „
সুচি বোনঝির গালে একটা চুমু দিয়ে বললো , “ আমি কি ইচ্ছা করে এনেছি ওকে ! ওই জোর করলো। „ তারপর কিছুক্ষণ থেমে প্রজ্ঞার নাকে নাক ঘসে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলো , “ ওকে তুই এবার বোঝা । আমার কোন কথাই ও শুনছে না। „
সুমি গ্যাসের উপর চা করার কেটলিটা বসিয়ে দিয়ে বোনের দিকে ঘুরে জিজ্ঞাসা করলো , “ কোন কথা ? „
“ ও আমার কোন কথাই বুঝতে চাইছে না। বারবার অবুঝের মতো কাজ করছে । „ কথাটা বলতে গিয়ে লজ্জায় সুচির মাথা কাটা গেল ।
সুমি বুঝলো কথাটা কিন্তু কিছু বললো না। সে সবার জন্য চা করে বিস্কুট সহযোগে ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে সোফার সামনে রাখা ছোট টেবিলে এনে রাখলো। টেবিলে ট্রে রাখার সময় আকাশ আর কৌশিকের কথাবার্তা সুমির কানে এলো । আকাশের পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারের কথা বলছে দুজনে। সুমি বললো , “ চা নাও । „
কৌশিক একটা পেয়ালা আকাশের দিকে এগিয়ে দিল। আকাশ সেটা তুলে নিল। কৌশিক জিজ্ঞাসা করলো , “ দুপুরে খেয়ে যাবে তো ? „
আকাশ পেয়ালা থেকে এক চুমুক চা খেয়ে পেয়ালাটা আবার টেবিলে রেখে বললো , “ হ্যাঁ । অনেক দিন সুমিদির হাতে খাওয়া হয়নি। খেয়ে একেবারে বিকালে যাবো । „
কৌশিক বললো , “ তাহলে বাজার করে আনি। তোমার দিদি খাসির মাংস খুব ভালো রান্না করে । „
তারপর আরও কিছু কথা বলতে বলতে চা শেষ করে , বাজারের থলি হাতে নিয়ে , কৌশিক চলে গেল বাজারে। কৌশিক চলে গেলে সুমি বাইরের দরজা ভেতর দিয়ে বন্ধ করে এসে আকাশের পাশে বসলো , “ কাকি জানে তুই এখানে এসছিস ? „
আকাশ পাশের সোফায় বসে থাকা সুচি আর প্রজ্ঞার খুনসুটি আর প্রজ্ঞার খিলখিলিয়ে হাসি দেখতে দেখতে বললো , “ না । „
সুমি একবার বোন আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ তাহলে কি বলে এসছিস ? „
আকাশ তার দৃষ্টি সুচির দিকে রেখেই বললো , “ আমার বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে যাচ্ছি বলে এসছি। „
সুমি আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের পলক না ফেলে বললো, “ যখন মিথ্যা কথা বলতে হলো ! তখন এলি কেন ? „
আকাশ এবার সুমির দিকে তাকিয়ে বললো , “ তোমার বাড়িতে আমি আসবো না ! „
“ অবশ্যই আসবি। একশোবার আসবি। কিন্তু কাকা কাকিকে সত্যিটা বলে আসবি । „
আকাশ সুমির থেকে চোখ সরিয়ে মেঝেতে তাকিয়ে বললো , “ মা কি বলবে জানি না। হয়তো আসতে দেবে না । „
“ তাহলে নিজেই বুঝতে পারছিস যে তোর আর বোনের সম্পর্ক কাকা কাকি মানছে না। তাহলে কেন বোনকে কষ্ট দিচ্ছিস ? „
“ তুমিও এই কথা বলছো ? „
“ হ্যাঁ আমিও এই কথা বলছি কারন তুই বুঝছিস না। তুই যে এখানে এসছিস সেটা যদি আমার মা বাবা জানতে পারে তাহলে কি হবে ভেবেছিস ! „
তারপর কিছুক্ষণ থেমে নিশ্বাস নিয়ে সুমি আবার বললো , “ বড়ো হয়েছিস। ম্যাচিউর হয়ে গেছিস। সবকিছু বুঝতে শিখেছিস । তবুও তুই সুচিকে বারবার পালিয়ে যেতে বলছিস। একবারও ভেবেছিস তুই পালিয়ে গেলে কাকা কাকির কি হবে ! তুই ছাড়া কাকা কাকির আর কে আছে বলতো আমাকে ! „
সুমির কথা থেকে আকাশ বুঝতে পারলো যে সুচি সুমিদিকে সব খুলে বলে দিয়েছে। আর সুচি এই কারনেই ওকে এখানে এনেছে সেটাও আকাশ বুঝতে পারলো। সুমি এদিকে আকাশকে উদ্দেশ্যে করে বলে চলেছে , “ আগে একটা বড়ো ঘটনা ঘটে গেছে আর কোন ঘটনা তোরা ঘটাস না । মা বাবা , কাকা কাকি কেউ আর নিতে পারবে না। „
যা বোঝার আকাশ বুঝে গেছে। এতদিন যে পালানোর চিন্তা সে করছিল সেটা যে কতো বড়ো মূর্খের সিদ্ধান্ত সেটা আকাশ বুঝলো। পালানোর সিদ্ধান্ত বাতিল হওয়াতে এখন আরও একটা রাস্তা আপনাআপনি আকাশের সামনে খুলে গেল। সেটা হলো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মা বাবাকে যেকোন প্রকারে রাজি করিয়ে সুচিকে বিয়ে করা। কিন্তু এরজন্য তাকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই আকাশ সুমির কথা শুনছিল। কিছুক্ষণ পর কৌশিক খাসির মাংস নিয়ে চলে এলো। তারপর কৌশিক আকাশকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিজের বাড়ি দেখাতে শুরু করলো। বাড়িটা দুতলা। নিচের তলায় দুটো ঘর , একটা লিভিংরুম , বাথরুম আর রান্নাঘর। নিচেই সুমিরা থাকে। উপরে দুটো ঘর। কৌশিকের দাদা যখন আসে তখন উপরতলায় থাকে। বাড়ি দেখতে আকাশের আর কোন আগ্রহ নেই। দুপুরে খাবার সময়েও আকাশ রুচি পেল না।
খেয়ে দেয়ে কৌশিক সুমিকে নিয়ে আকাশের সাথে গপ্পো করতে বসলো। আকাশ-সুচি ছোটবেলায় কত দুষ্টু ছিল। এই পাড়ায় কে কেমন ? কৌশিকদের এটা পৈতৃক বাড়ি। কৌশিকের দাদার ফটো। আরও নানা রাজ্যের কথা।
সুচির সেসব শুনতে আগ্রহ নেই কারন সে আগেই এসব শুনেছে। সুচি প্রজ্ঞার সাথে খেলতে শুরু করলো। নিজের ফোনটা বার করে গ্যালারি থেকে প্রজ্ঞার ফটো বার করে সুচি বললো , “ এটা কে বলোতো ? „
প্রজ্ঞা একভাবে মাসির ফোনের ফটোর দিকে তাকিয়ে রইলো। সে এখনও বুঝতে শেখেনি। সুচি বললো , “ এটা আমার দিদির মেয়ে । তোমার থেকে অনেক সুন্দর দেখতে। „
প্রজ্ঞার বয়স দেড় বছর হয়ে গেছে। সে তার কথা বুঝলো কি না সুচি বুঝতে পারলো না। কিন্তু প্রজ্ঞা একভাবে মাসির ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। সুচি বললো , “ ফোন নেবে ? „
কথাটা বলে সুচি ফোনটা দুরে রেখে দিল। প্রজ্ঞা হামাগুড়ি দিয়ে ফোনটা নিতে গেল। ফোনটা ধরার আগেই সুচি প্রজ্ঞাকে কোলে তুলে নিল । তারপর ফোনটা নিয়ে ক্যামেরা অন করে ভিডিও করতে শুরু করলো। ভিডিওতে সুচি জিভ ভেঙাতে শুরু করলো। মাসির দেখাদেখি প্রজ্ঞাও জিভ ভাঙাতে শুরু করলো। প্রজ্ঞাকে দেখে সুচিও বিভিন্ন মুখভঙ্গি করতে শুরু করলো। ভিডিও হয়ে গেলে সেটা ফেসবুকে ছেড়ে দিল।
সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবতে শুরু করলে আকাশ আর সুচি সবাইকে বিদায় জানিয়ে আর প্রজ্ঞাকে টাটা করে বাড়ির রাস্তা ধরলো। আসার সময় আকাশ খুব কথা বললেও বাড়ি ফেরার সময় আর একটাও কথা বললো না।
রাতে খেয়ে দেয়ে বিছানায় শুয়ে শান্ত মস্তিষ্কে আকাশ ভাবতে শুরু করলো। অতীতের দিনগুলোর কথা মনে করতে লাগলো। একসাথে ভুতের সিনেমা দেখা। স্কুল থেকে ফেরার পথে আচার কিনে খাওয়া। দিদিমার লুকিয়ে সুচির জন্য আচার রেখে দেওয়া। কারনে অকারনে মারপিট করা। তারপর মা জেঠিমা আর দিদিমার ঠেকানো। কি সুন্দর ছিল দিনগুলো। আর তার কারন হলো সুচি। সুচি ছিল বলেই তার অতীত এতো সুন্দর ভাবে কেটেছে। আকাশ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো —— ‘ বর্তমান যাই হোক যেমনই হোক ! অতীতের মত ভবিষ্যতকেও সুন্দর করতে হবে। যাই হোক করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মা বাবা , জেঠুকে রাজি করাতে হবে। আর যদি রাজি না হয় তাহলে সে দেখে নেবে কে এই বাড়ি থেকে সুচিকে বিয়ে করে নিয়ে যায় ! ,
সেদিনের পর থেকে আকাশ রাতে একবার ফোন করা আর তারপর গুড নাইট মেসেজ করা বন্ধ করে দিল। এই ঘটনায় সুচির মুখে যা-একটু হাসি অবশিষ্ট ছিল সেটাও মুছে গেল। সুচি রোজ অপেক্ষা করে থাকে একবার হয়তো ফোন আসবে , একবার হয়তো গুড নাইট & গুড মর্নিং মেসেজ আসবে। কিন্তু আসে না।
কয়েক মাস পর একদিন সকালে সুচি ঘুম থেকে উঠে দেখলো বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির আওয়াজে সুচির মনটা নেচে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বাসি মুখে ছাদে চলে এলো। দুই হাত মেলে ধরে মুখে বৃষ্টির ফোটা অনুভব করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরেই সুচি খেয়াল করলো নিচে মাঠে সিরাজ কাকার মেয়ে আমিনা জল কাদায় খেলছে। আমিনার খেলা দেখতে দেখতে সুচির নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। একসময় বাদশা , আকাশ আর সুচিও এইভাবে জল কাদায় লাফালাফি করতো। বাদশা এখন আর নেই। আকাশ সত্যিটা মেনে নিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির কথা ভাবতেই সুচির বুকটা মুচড়ে উঠলো। চোখ দিয়ে অজস্র অশ্রুবিন্দু বেরিয়ে আসতে লাগলো। আকাশের বৃষ্টির জল সুচির চোখের জল বারবার ধুয়ে দেওয়ার ব্যার্থ চেষ্টা করতে লাগলো। ছাদে বসে দুই হাটুর মধ্যে কপাল ঠেকিয়ে সুচি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। চোখের জলের মধ্যে দিয়ে সব সম্পর্ক , সব অনুভূতি , সব কষ্ট জ্বালা যন্ত্রণা ধুয়ে বেরিয়ে যেতে লাগলো। সেদিন আর সুচি অফিস গেল না।
সুমির কথায় আকাশ যে আর সুচির সাথে কথা বলছে না সেটা সুচি দিদিকে বললো। সুমি সবকিছু শুনে বললো , “ তাহলে নতুন করে জীবন শুরু করে। আগের মতো আবার নাচ শুরু কর । তিন বছর ধরে তোকে নাচতে দেখছি না। এবার পুজাতে বাড়ি গিয়ে তোর নাচ দেখতে চাই আমি। মনে রাখবি কথাটা। „ শেষের কথাটা আদেশের সুরেই বললো সুমি।
সুমির কথায় সুচি আবার নাচের অভ্যাস শুরু করলো। দীর্ঘ তিন বছর পর সুচি আবার সোসাইটির নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলো। তিন বছর আগের মতো আবার সুচিকে কেউ হারাতে পারলো না। প্রজ্ঞা মাসির নাচ দেখে হাততালি দিল। সুচির নাচ আকাশ প্রথম সারির বেঞ্চে বসে দেখলো। সেটা সুচির চোখ এড়ালো না।
এরপরের বছরেই আকাশের কলেজের ইউনিয়নের ভোট হলো। নতুন পদপ্রার্থীর নাম পলাশ সহায়। আকাশদের ওয়ার্ডের বিধায়ক পঙ্কজ সহায়ের ছোট ছেলে হলো এই পলাশ সহায়। হলুদ পার্টির যুব নেতা হিসাবে খুব নাম করেছে এই পলাশ।
ভোটে জয়ী হলো পলাশ। ভোটে জেতার জন্য নিজে থেকে একটা পার্টি দিতে চাইলো সে। একটা বড়ো করে ফাংশন হবে। ফাংশন হবে MBA ফাইনাল সেমেষ্টারের পরিক্ষা হওয়ার পর । ফাংশনে টলিউডের নাম করা দুজন অভিনেত্রী আসবে। এই নিয়েই কলেজ মশগুল।
আরও কে কে নাচবে এই নিয়ে কলেজের ইউনিয়ন রুমে বসে কথা হচ্ছিল। একজন বললো , “ অঞ্জলি কে নাচতে বলো। ফিগারটা দারুণ। „
আর একজন এর প্রতিবাদ করে বললো , “ অঞ্জলির আবার ফিগার ! চোখে কি ন্যাবা হয়েছে তোর ! ফিগার ছিল সুচিদির। যখন নাচতো তখন স্টেজ কাঁপিয়ে দিত । „
পলাশ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো , “ সুচি কে? „
“ আমাদের কলেজেই পড়তো। প্রাক্তনী। খুব ভালো নাচতো। „
মেজাজ হারিয়ে তিরিক্ষি গলায় পলাশ বললো , “ ফটো টটো থাকলে দেখা। অতো কথা বলছিস কেন ! „
ছেলেটা ফোন বার করে ফেসবুক খুলে সুচির নাচের একটা ভিডিও দেখালো । পলাশ মন দিয়ে পুরো নাচের ভিডিওটা দেখলো। একবার ঠোঁট চেটে নিয়ে মনে মনে ভাবলো ‘ এইবার দাদাকে একটা বড়ো কম্পিটিশন দেওয়া যাবে। , কিন্তু মুখে বললো , “ একে নাচের ইনভিটেশন দিয়ে দে। বলবি ওকে গেস্ট ডান্সার হিসাবে আনা হয়েছে । „
পলাশের কথা মতো সুচির বাড়িতে একটা ইনভিটেশন এর চিঠি চলে গেল। তাতে খুব বিনয়ের সাথে সুচিকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। চিঠিতে দেওয়া ফোন নাম্বারে ফোন করলো সুচি। একজন মেয়ে ফোনটা রিসিভ করলো। সুচি জিজ্ঞাসা করলো , “ আমার বাড়িতে একটা চিঠি এসছে…..
সুচির কথা শেষ হওয়ার আগে মেয়েটা বললো , “ হ্যাঁ দিদি। আমাদের কলেজে এবার ফাংশনে আপনাকে গেস্ট হিসাবে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। „
“ আমাকেই কেন ? আর এই সময় তো কলেজে কোন ফাংশন হয় না । „
মেয়েটা বললো , “ আসলে এবছর আমাদের কলেজের ভোটে যিনি জিতেছেন তার পক্ষ থেকে এই ফাংশন। আর আমরা কলেজের নিজের একজন ডান্সার চাইছিলাম। আর আপনিই আমাদের কলেজের সর্বকালের সেরা পারফর্মার ছিলেন। প্লিজ না করবেন না । „
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুচি বললো , “ ঠিক আছে আমি ভেবে বলছি । „
“ কাইন্ডলি প্লিজ । „ বলে মেয়েটা ফোন রেখে দিল।
রাতের বেলা সুচি দিদিকে ফোন করে সব কথা বললো। সুমি বললো , “ তোর কলেজে তোকে গেস্ট হিসাবে নিয়ে যেতে চাইছে। আর তুই আমাকে জিজ্ঞাসা করছিস ! যা তুই। মন ভালো থাকবে । „
সুচি পরের দিন মেয়েটাকে ফোন করে বলেদিল সে যেতে রাজি। মেয়েটা বললো , “ দিদি আমি আপনাকে মেসেজে আপনার গান গুলো লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছি। „
কিছুক্ষণ পর সুচির ফোনে একটা মেসেজ এলো। মেসেজটা খুলে গান গুলো দেখলো সুচি। মোট তিনটে গান। প্রথমটা হলো জিতের বচ্চন সিনেমার গান ‘ লাটাই। , দ্বিতীয়টা হলো ঋত্বিক রোশন এর আগনিপাথ সিনেমার গান ‘ চিকনি চামেলী। , আর তৃতীয় টা হলো শাহরুখ খানের হ্যাপি নিউ ইয়ার সিনেমার গান ‘ লাভলি। ‚
নামগুলো পড়ার পর সুচি মনে মনে বললো , ‘ স্টুডেন্ট দের ফাংশনে আর কোন ধরনের নাচ হবে ! ,
এরপর সুচি সারাদিন অফিসে কাজ করে বিকালে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে তিনটে গানের নাচের অভ্যাস শুরু করলো। সুচি যে ফাংশনের একজন গেস্ট ডান্সার হয়ে নাচবে সেটা আকাশের কানে গেল। মনে মনে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে এই ফাংশনে সে যাবেই।
MBA পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেই ফাংশনের দিন এগিয়ে এলো। ফাংশনের একদিন আগেই আকাশের ধুম জ্বর হলো। স্নেহা দেবী আকাশকে বিছানা থেকে উঠতেই দিলেন না।
একটা কালো টপের উপর লাল রঙের ভেস্ট কোট আর জিন্স পড়ে ফাংশনে পরপর তিনটে গানে নাচলো সুচি। প্রথম সারির দর্শকদের মধ্যে পলাশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখলো এবং ভিডিও করলো। নাচ শেষে সুচি বাড়ি ফেরার সময় পলাশ গিয়ে আলাপ করলো , “ হায় আমি পলাশ। সরি আসলে আপনার সাথে ফাংশন শুরু হওয়ার আগে আলাপ করার ইচ্ছা ছিল কিন্তু ট্রাফিকের জন্য আসতে দেরি হয়ে গেল । „
“ না না ইটস্ ওকে। আমি কিছু মনে করিনি। „ কথাটা বলে সুচি পলাশকে দেখলো। বয়স খুব জোর 27-28 হবে। দুই গালে ব্রণের দাগ স্পষ্ট। আর মুখের যে জিনিস টা সবথেকে বেশি দৃষ্টি টানে সেটা হলো ওর জোড়া ভুরু।
“ আমিই এবছর ইলেকশনে জিতেছি ……
পলাশের কথা শেষ করতে দেওয়ার আগেই সুচি বললো , “ কংগ্রেজুলেশন। সরি , আমার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। আপনার সাথে কথা বলার ইচ্ছা ছিল কিন্তু….
“ না না সে ঠিক আছে। আলাপ হতে থাকবে। আপনি প্লিজ ! „ পলাশের কথায় সুচি চলে যেতে লাগলো। আর পলাশ পিছন থেকে সুচির হাটা দেখতে লাগলো।
বাড়ি ফিরে , ফ্রেশ হয়ে , ডিনার খেয়ে , বিছানায় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে ফোনটা খুলে সুচি দেখলো একটা অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে। সুচি মেসেজটা খুলে দেখলো ডিপিতে পলাশের ফটো দেওয়া। পলাশের মেসেজটা পড়লো সুচি ।
পলাশ লিখেছে —- আজকে যারা টলি পাড়া থেকে এসছিল তাদের থেকেও ভালো পারফর্ম করেছেন আপনি। তারাও আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
সুচি একটা thank you লিখে দিল।
জ্বর থেকে উঠেই আকাশ মাকে বললো , “ এবার তো অফিসে যেতে দাও নাকি এরপর আরও পড়তে হবে ! „
আকাশের বাবা বললেন , “ কাল থেকে আমার সাথে চল। „
রাতে আকাশের ঘুম হলো না। এতদিন যে জন্য অপেক্ষা করেছিল সেটা কালকে সফল হবে। সুচিকে নিজের পার্সোনাল এসিস্টেন্ট বানিয়ে সবসময় নিজের চোখের সামনে রাখবে।
সকালে বাবার সাথে অফিসে যেতে যেতে আকাশ জিজ্ঞাসা করলো , “ আমাকে কি কাজ দেবে ? সুপারভাইজার খুব ভালো হবে। ম্যানেজার হলে তো আরও ভালো । „
আকাশের বাবা মিচকি হেসে বললেন , “ অফিসে চল বলছি। „

অফিসে ঢুকতেই আকাশের বাবাকে দেখে সব এমপ্লয়িরা দাঁড়িয়ে পড়লো। আকাশের বাবা আকাশের পিঠে হাত দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন , “ এ হলো আমার একমাত্র ছেলে আকাশ। আজ থেকে তোমাদের সাথেই কাজ করবে। তোমাদের ফাইল পৌঁছে দেওয়ার কাজ করবে । সবাই একে সহযোগিতা করো। „
কথাটা বলেই আকাশের বাবা নিজের কেবিনের দিকে চলে গেলেন। আকাশ সহ বাকিরা নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। কোম্পানির মালিকের ছেলে যে ভবিষ্যতে মালিক হবে সে কেরানীর কাজ করবে !
আকাশ কিছুক্ষণ হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে থাকলো। বাবা যে তাকে অপমান করছে সেটা বুঝতে পেরেই সে বাবার কেবিনের দিকে চলে গেল। বাবার কেবিনের ঢুকে বললো , “ আমি ফাইল এদিক ওদিক করবো ! মানে আমি পিওনের কাজ করবো ? „
আকাশের বাবা চেয়ারে বসতে বসতে বললেন , “ অসুবিধা কোথায় ? „
আকাশ ভুরু কুঁচকে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো , “ আমি তোমার ছেলে হয়ে এই কাজ করবো ? „
“ তুই আমার ছেলে তাতে অসুবিধা নাকি এই ফাইল এদিক ওদিক করা এটাতে তোর অসুবিধা ? „
আকাশ দুই দিকে মাথা নেড়ে বললো , “ আমি এ কাজ করতে পারবো না । „
“ বুঝেছি। তুই এই কাজটাকে ছোট বলছিস। তোর হয়তো মনে নেই যে সুচির বাবা সরকারি অফিসে ঠিক এই কাজটাই করে। আর তুই সেই কাজটাকেই অপমান করছিস ? „
এই কথাতেই সঞ্জীবনী ওষুধের মত কাজ হলো। সমরেশ জেঠু যে এই কাজটাই করে সেটা আকাশ ভুলে গেছিল। এখন মনে পড়তেই মাথাটা নিচু হয়ে গেল। এই কারণে নয় যে সে এই কাজটাকে অপমান করছে। বরং এই করনে যে সে সুচির বাবাকে অপমান করছে।
আকাশকে চুপ মেরে যেতে দেখে শুভাশীষ বাবু বললেন , “ আর কিছু বলবি ? „
আকাশ দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে ‘ না , বলে বাইরে এসে একটা চেয়ারে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ পর সঞ্জয় অফিসে ঢুকে আকাশকে দেখে অবাক হলো , “ ইয়াং ম্যান। এখানে কি মনে করে ! „
আকাশের এখনও ব্যাপারটা ঠিক হজম হয়নি। এতদিনে যে পরিকল্পনা মত সে চলছিল সেটা এই ভাবে ভেস্তে যাবে সেটা আকাশ বুঝতে পারে নি। এখন সে কি করবে সেটাই ভাবছিল। সঞ্জয়ের কথায় হুশ ফিরলো। সঞ্জয়কে দেখে বললো , “ আজ থেকে অফিসে জয়েন করলাম। „
কথাটা শুনেই সঞ্জয়ের মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো , “ তা এখানে বসে কেন ? তোমার বাবার কেবিনে চলো । „
“ এটাই আমার কেবিন। পিওন হিসাবে কাজ করছি। „ কথাটা বলতে হাল্কা লজ্জা লাগলো আকাশের।
কথাটা শুনেই সঞ্জয়ের ভুরু কপালে উঠে এলো , “ বলো কি ! তোমার বাবার সাথে তো কথা বলতে হচ্ছে । „
কথাটা বলেই সঞ্জয় আকাশের বাবার কেবিনের দিকে চললো। কেবিনে ঢুকে গুড মর্নিং জানিয়ে সঞ্জয় বললো , “ বাইরে আকাশকে দেখলাম। আপনি ওকে পিওনের কাজ দিয়েছেন ? „
আকাশের বাবা জানতেন যে তার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অনেকে কথা বলবে। তাই তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন , “ হ্যাঁ। ওর এখন ট্রেনিং পর্ব চলছে। „
সঞ্জয় আকাশের বাবার কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলো না। এতে তার কিছুই যায় আসে না। সে এখন চিন্তা করছে এবার গোধূলিকে অফিসে আনতে হবে। তারপর এই কোম্পানির মালিক তিনি।
সারাদিন ওই চেয়ারে বসে ফোন ঘেটেই আকাশের দিন চলে গেল। টিফিন ব্রেকে বাবার সাথে টিফিন করে আবার সেই চেয়ারে বসে রইলো। কোন অফিস এমপ্লয়ি ভয়তে আকাশকে দিয়ে কোন কাজ করালো না। এমন একটা মুখরোচক খবর বিদ্যুতের গতিতে উপর নিচ কর্মরত সবার কানে চলে গেল। সুচিও বাদ গেল না।
আকাশ অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে স্নেহা দেবী হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করলেন , “ কেমন কাটলো অফিসের প্রথম দিন ? „
আকাশ লজ্জা পেলেও মাকে সব বলে দিল। সব শুনে আকাশের মা রাগে চন্ডী রুপ ধরলেন। স্বামীর দিকে ফিরে চেঁচিয়ে বললেন , “ তুমি আমার ছেলেকে দিয়ে পিওনের কাজ করাচ্ছো । „
শান্ত নির্বিকার ভাবে আকাশের বাবা বললেন , “ তুমি যেটাকে ছোট কাজ বলছো সেই কাজের থেকেও ছোট কাজ আমি করেছি। „
স্নেহা দেবী স্বামীর কথায় চুপ মেরে গেলেন। দীর্ঘ তেইশ চব্বিশ বছরের সংসার জীবনে তিনি বহুবার স্বামীকে তার স্কুল জীবন , ছোটবেলার কথা জিজ্ঞাসা করেছেন । কখনোই আকাশের বাবা কিছুই খুলে বলেন নি। আজও বলবেন না সেটা আকাশের মা ভালোমতো জানেন । তাই তিনি আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না।
রাতে বিছানাতে শুয়ে তিনি বললেন , “ আমি এটা মানতে পারছি না। „
স্ত্রীর কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা বড় নিশ্বাস ছেড়ে বললেন , “ ওর এখনও শিক্ষা পুরো হয়নি। „
এরপর আর স্নেহা দেবী কিছু বললেন না। সুচি ডিনার করে প্রতিদিনের মতো দিদিকে ফোন করলো। আজকের তাজা মুখরোচক খবরটা দিদিকে বলে দিল। সবকিছু শুনে সুমি বুঝলো যে সুচি এখনও আকাশকে ভুলতে পারে নি। ভোলা সম্ভব-ও না। যার সাথে পুরো আঠারো উনিশ বছর কেটেছে তাকে কিভাবে ভালো যায়। সবকিছু বুঝে সুমি জিজ্ঞাসা করলো , “ ওই পলাশের কি খবর ? কিছু এগিয়েছে ? „
সুচি বললো , “ ও বিধায়কের ছেলে। নিজেও পার্টি করে। শুনেছি ওদের অনেক খারাপ ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে। „
“ সেটা ওর সাথে না মিশলে বুঝবি কিভাবে ? আগে মিশে দেখ , যদি খারাপ কিছু শুনতে পাস তখন সরে আসবি। „ তারপর হেসে বললো “ তারপর বাবার পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে করবি। „
সুচি কপট রাগ দেখিয়ে বললো , “ আমার বয়স কতো রে যে বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দেবে ? „
“ মায়ের বিয়ে হয়েছিল বাইশ তেইশ বছর বয়সে। আমার বিয়ে হয়ে ছিল ছাব্বিশ সায়ত্রিশ বছর বয়সে । তোর এখন ছাব্বিশ চলছে….
দিদির হিসাব শাস্ত্র সুচি আর শুনতে পারলো না , “ আমার ঘুম পেয়েছে আমি রাখছি । „ বলে ফোনটা কেটে দিয়ে সুচি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো কিন্তু পারলো না। সুচি নিজেই হিসাব করতে বসলো ‘ এক মাস পরেই ও সাতাশ বছরে পড়বে। পরের বছরেই আকাশের তেইশ হবে। তারপর কাকি ওর বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগবে। , এই কথাটা সুচির চোখের ঘুম কেড়ে নিল।
প্রথম তিন চার দিন কেউই কোম্পানির মালিকের ছেলেকে দিয়ে এই পিওনের কাজ করাতে চাইলো না। কিন্তু আকাশের বাবার দ্বিতীয় বার বলাতে সবাই আকাশকে দিয়ে নিচ তলা থেকে উপর তলায় , এই টেবিল থেকে ওই টেবিল ফাইল আনাতে শুরু করলো।
আকাশ ভেবেছিল সে অফিসের বস হয়ে সুচিকে এমন একটা কাজ দেবে যে সুচি সবসময় তার চোখের সামনে থাকে। কিন্তু সেরকম কিছুই হলো না। ফাইল আনতে যখন নিচ তলায় যায় তখনই সুচিকে চোখের এক পলক দেখে আবার চলে আসে। সুচিও আকাশকে চোখের ওই এক পলক দেখেই আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়।
পরের মাসেই সুচির জন্মদিনে রাত বারোটায় পলাশ সুচিকে ফোন করে হ্যাপি বার্থডে উইশ করলো। সুচিও থ্যাঙ্ক ইউ বললো।
পলাশ এগিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু সুচির কোথাও একটা বাঁধা লাগছে। পরের বছরেই কাকি আকাশের বিয়ে দিয়ে দেবে এটা ভেবে সুচি , আর এতদিনের পরিকল্পনা এইভাবে ব্যার্থ হয়ে যাওয়ায় আকাশ , দুজনেই জ্যান্ত লাশ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীবন যে কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মতো বা একটা বাঁধা ছকে চলে না সেটা দুজনেই বুঝতে পারলো। জীবনকে আমরা চালনা করতে পারি না। জীবন আমাদেরকে চালনা করে। জীবনে গূঢ় তত্ত্বটা দুজনেই নিজেদের জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি দিয়ে উপলব্ধি করলো।
কোন কিছুতেই সুচির আর রুচি নেই। পলাশের সাথে রিলেশনে যেতেও রুচি নেই। শুধু পলাশ কেন ! কারোর সাথেই আর রিলেশনে যেতে সুচির ইচ্ছা নেই। ইচ্ছা মারা গেছে অনেক আগে। আর আকাশ এখন ভেবে চলেছে ‘ কি করা যায়। কিভাবে মা কে বললে মা রাজী হবে। তারপর বাবাকেও রাজি করাতে হবে। এইসব ভেবে চলেছে দিনরাত। কিন্তু কিছুই মাথাতে আসছে না। ,
আরও এক মাস কাটলো। এই ফাইল এদিক ওদিকের কাজ করায় আকাশ জানতে পারলো যে , কোথায় কোথায় তাদের নিজস্ব হোটেল আছে। কোথায় কোথায় হোটেল লিজ নেওয়া আছে। কোন কোন দেশে ব্যাবসা ছড়ানোর কথা চলছে। কোন কোন কোম্পানি পুরানো গ্রাহক। কোন কোম্পানি পেমেন্ট করতে বেশি দেরি করে আর কে সঙ্গে সঙ্গে পেমেন্ট করে দেয়। শুধু এতোটাই না ! সাথে এই কোম্পানির কোন এমপ্লয়ির কিরকম ব্যাবহার সেটাও আকাশ জানতে পারলো। এটাও সে চাক্ষুষ করলো যে , এই কোম্পানির যে সবথেকে অভদ্র লোক সে সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করলেও আকাশের সাথে কখনোই খারাপ ব্যবহার করে না। সবসময় তুমি তুমি করে কথা বলে।
একদিন টিফিন ব্রেকে আকাশের খাওয়া শেষ হতে যায় এমন সময় আকাশের বাবার ফোনে একটা ফোন এলো। আকাশ ফোনের ওপ্রান্তের কথা শুনতে না পেলেও বাবার কথা শুনতে পেল।
আকাশের বাবা — হ্যালো , হ্যা , বলুন মি . গুছাইত । অনেক দিন পর মনে পড়লো……. কোথায় নিয়ে যেতে হবে ?….. মালদা…. তা আপনি আমাকে ফোন না করে ক্ষুদিরাম কেই তো ফোন করতে পারতেন…. ও বুঝেছি । ঠিক আছে। আমি বলছি…. পরশু তো ! … হ্যাঁ হয়ে যাবে ।
কথা গুলো বলে আকাশের বাবা ফোন রাখলেন । ফোনটা রাখতেই আকাশ বললো , “ কোন গুছাইত ? „
“ অধিকরণ গুছাইত। „
“ গুছাইতের সাথে ব্যাবসা করো কেন ? সামান্য কয়েকটা টাকা মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখে। আর আমাদেরই পেউ পেউ করে টাকা চাইতে হয়। „
“ ডিলটা নেবো না বলছিস ! „
“ যেখানে নিজেদের হেনস্থা হতে হয় সেখানে তুমি কন্ট্রাক্ট নিতে পারো কিন্তু আমি নেবো না। „ কথাটা বলে আকাশ উঠে হাত ধুতে চলে গেল।
ছেলের কথা শুনে আকাশের বাবার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সেদিন রাতেই বিছানায় স্নেহা দেবী বললেন , “ শুনছো। „
“ বলো । „
“ ওর তো তেইশ হতে যায়। পাত্রী দেখতে হবে তো । „
পাত্রীর কথাতে সঞ্জয়কে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়ে গেল , “ সঞ্জয়ের সাথে কথা বলবো ? ওর মেয়ে গোধূলির ব্যাপারে । „
“ গোধূলি তো শুনেছি বিদেশে পড়ে। আগে আমি ওর স্বভাব চরিত্র দেখবো। তারপর ….
“ ঠিক আছে। „
পরের দিন অফিসে সঞ্জয়কে কথাটা বলার আগেই সঞ্জয় আকাশের বাবার কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসে বললো , “ একটা সুখবর আছে। পরের সপ্তাহে আমার মেয়ে ফিরছে। „

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 5 / 5. মোট ভোটঃ 4

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment