মুখোশ – The Mask [১৯]

লেখকঃ Daily Passenger

১৯
এখন ঘড়িতে সাড়ে তিনটে বাজে। বাকি সব কাজ মিটিয়ে ঘরে ফিরে এসেছি। আজ আর মর্নিং ওয়াকে যাওয়ার কোনও মানে নেই। সোজা নেমে গেলাম রিসেপশনে। একজন ঘুমন্ত মহিলাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বললাম “আজ অব্দি কি বিল আছে সেটা মিটিয়ে দিন। আমাকে আজ ভোরেই বেরিয়ে পড়তে হবে।” উনি বললেন “এরকম ভাবে হঠাত চলে যাওয়ার কোনও কারণ?” আমি বললাম “শিফট করতে হচ্ছে। সকাল সকাল না গেলে বিপদ ম্যাডাম।” সব হিসাব মিটিয়ে ওপরে উঠে একটা ফোন করলাম। এখন কিচেন বন্ধ। নইলে এক কাপ চা অর্ডার করতাম। ভালো নেশা হয়েছে।
তবে ঘুমনোর সময় এটা নয়। দেড় ঘণ্টার মতন চেয়ারে বসে বসেই কাটিয়ে দিলাম আমার সেই মোবাইলে গান শুনতে শুনতে। ঠিক পাঁচটা বেজে কুড়ি মিনিটে একটা ফোন এল। লাগেজ নিয়ে নিচে নেমে বেরিয়ে গেলাম। আজ বেয়ারা ডেকে সময় নষ্ট করার কোনও মানে নেই। সিকিউরিটির হাতে ১০০ টাকা গুজে দিয়ে একটা টাটা সুমোয় চড়ে বসলাম। সঞ্চিতা ম্যাডামের বাড়ি যাওয়ার আগে আরও অনেক কাজ আছে। কাল রাতে এত মদ না খেলেই ভালো হত। কিন্তু মাগীদের দেখলে আমি কন্ট্রোল করতে পারি না। এই দুর্বলতা একদিন আমাকে নিয়ে ডুববে।
সেই সাইবার ক্যাফের মালিক শুভদার সাথে কিছু কাজ আছে। উনি অবশ্য আমাকে এত ভোর ভোর দেখে ভূত দেখার মতন চমকে উঠেছেন। এখন কাজের সময়, তাই বেশী কথা একদম নয়। মালিকের ছেলে বলেই এত দেমাক এলো কিনা বলা শক্ত, কিন্তু আমি ওকে পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। অবশ্য ভদ্রতা প্রদর্শন ইত্যাদির সময় এটা নয়। ওকে প্রায় ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ওর ঘরের ভেতরে ঢুকে ভেতরের পথ দিয়ে ওনার সাইবার ক্যাফের পিছনের দরজার দিকে চলে গেলাম। এটা সাইবার ক্যাফেটার পিছনের দিক। সাইবার ক্যাফের পিছনে দুটো ঘর নিয়ে উনি আছেন সেই এক যুগ ধরে। উনি অবশ্য বুঝতে পেরেছেন যে কোনও বিশেষ প্রয়োজনে আমাকে এই অদ্ভুত সময়ে এসে ওনার সাইবার ক্যাফে ইউজ করতে হচ্ছে। উনিও আর কথা বাড়ালেন না। দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন চাবির সন্ধানে। মালিকের ছেলে আমি। আমার কাছে কি একটা ডুপ্লিকেট চাবি থাকতে নেই! আমি খালি হাতে ক্যাফের ভেতর ঢুকে কম্পিউটার অন করছি দেখে একবার মিন মিন করে বললেন “তোমার কাছে চাবি ছিল না ভেবেই আসলে আমি ভেতরে গেছিলাম, কিন্তু দেখছি…” ততক্ষণে আমি কম্পিউটারে বসে পরে ছি। “চাবি দিয়ে কি হবে? এক ঘণ্টা পরে আমার জন্য সেই ধাবা থেকে এক প্লেট পরোটা আর এক প্লেট ভালো আলুদ্দম আনিয়ে দিন। সাথে দুই কাপ কড়া কফি। “ বলে ওনার দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিলাম। উনি তখনও দাঁড়িয়ে আছেন দেখে বলতে বাধ্য হলাম “ বলেছি এক ঘণ্টা পরে পরোটা খাব। এখন সেই এক ঘণ্টা টুকুর জন্য এখান থেকে বিদায় নিয়ে আমাকে মুক্তি দিন। ফাস্ট।”
উনি এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পরোটা এক ঘণ্টা পর এলো না। কারণটা স্বাভাবিক। এই অসময়ে কোন ধাবা পরোটা আলুদ্দম বানিয়ে আমার পেট পুজা করবে। আমার কাজ শেষ। ঘড়িতে দেখলাম প্রায় ৮.৩০ বেজে গেছে। উঠে পড়লাম। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলাম উনি ওনার কাজের লোকটার ওপর চোটপাট করে চলেছেন। কাজের লোকের আর কি দোষ! আমি তো জানি যে এখন উনি কিছু আনিয়ে দিতে পারবেন না। বললাম “ ঠিক আছে। আজ আর ওই সব খাবার দাবার আনিয়ে কাজ নেই। আপাতত আমাকে দুই কাপ কড়া করে চা বানিয়ে অন্তত খাওয়ান। ধাবার খাবার পরে কোনও দিন এসে খেয়ে যাব। আর বাথরুমে গিয়ে আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছি। একটা তোয়ালে দিয়ে দিন। পরিষ্কার দেখে দেবেন। ব্যবহার করা তোয়ালে আমি ইউজ করি না।” আবার এক লাফে উনি অন্তর্হিত হলেন আর ফিরে এলেন কয়েক সেকন্ডের ভিতর। হাতে একটা পরিষ্কার সাদা তোয়ালে। আমার সাথে পরিষ্কার তোয়ালে আছে বটে, কিন্তু সেটা বার করতে হলে এখন গাড়ি থেকে লাগেজ নামিয়ে সেটা খুলে অনেক ঝঞ্ঝাট পোহাতে হবে।
বাথরুম থেকে স্নান করে বেরিয়ে এসে দেখলাম যে চা রেডি। আমার সামনে দুই কাপ চা আর চারটে বিস্কুট সাজিয়ে রাখা আছে। টেবিলের অন্য দিকে উনি বসে আছে জবু থবু হয়ে। কথা হল না আমাদের মধ্যে। আমি ঢক ঢক করে দুই কাপ গরম চা গলার ভেতর ঢেলে দিলাম। বিস্কুট খাওয়ার সময় এটা নয়। সঞ্চিতা ম্যাডাম নিশ্চয় এতক্ষনে রেডি হয়ে গেছেন। ইতিমধ্যে তিন বার মেসেজ এসেছে আমার সেই ভয়ানক মোবাইলে। অবশ্য মেসেজ মানে এক্ষেত্রে ই-মেইলের কথা বলছি। সেগুলো পড়ার পর তাড়া যেন আরও বেড়ে গেছে। বেরনোর সময় দেখলাম বিস্কুটের প্লেট হাতে শুভদা কেমন একটা মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। গাড়িতে পৌঁছেই ঘুমন্ত ড্রাইভারকে দিলাম এক ধ্যাতানি। ও ধড়ফড় করে উঠে বসল। বললাম “চলো। কাজ মিটেছে।” ও গাড়ি নিয়ে বড় রাস্তায় উঠে গেল।
কলকাতার শহরে গাড়ি ঘোড়ার ভিড় বাড়তে শুরু করে দিয়েছে বলেই সঞ্চিতা ম্যাডামের বাড়িতে পৌঁছাতে একটু দেরী হয়ে গেল। ওনার বাড়ির বাইরের মেইন গেট খোলা। আমাকে নামিয়ে দিয়ে সুমোটা বেরিয়ে গেল। গেট খুলে ভেতরে ঢুকে কলিং বেল বাজানোর আগে একবার আমার সেই বিখ্যাত বুক ঘড়িতে সময়টা দেখে নিয়ে সেটা আবার সযত্নে পকেটে পুরে রেখে দিলাম। আকাশে রোদের তেজ চড়া, রাস্তায় গাড়ির হর্নের শব্দে কান পাতা মুশকিল। ঘড়িতে বাজে ৯টা বেজে ৪০ মিনিট। বেল বাজার প্রায় সাথে সাথে ভেতরের দরজা খুলে গেল। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে একজন মোটা বেঁটে মতন মহিলা আমার দিকে জিজ্ঞাসু নজর নিয়ে তাকিয়ে দেখছেন। তার ওপর আবার আমার হাতে চারটে লাগেজ। লাগেজ তিনটে, একটা ল্যাপটপের ব্যাগ। আমি হেসে বললাম “ম্যাডাম আছেন?” উনি ভুরুটা যতটা পারা যায় কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছেন দেখে বলতে বাধ্য হলাম “ আজ সকাল সকাল এসে আপনি যার থাকার জন্য ঘরটা পরিষ্কার করছিলেন আমিই সেই অধম।”
উনি আমার কথার সহজ রসিকতাটা ঠিক ধরতে পারেননি সেটা বলাই বাহুল্য। কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন “ আমি যে কারোর ঘর পরিষ্কার করছিলাম সেটা কি করে জানলেন?” বললাম “ আমি ম্যাজিক জানি। এইবার ম্যাডাম কে গিয়ে খবর দিন। আমি ওনার ভাড়াটে।” এইবার ও এক ছুটে ভেতর চলে গেল। না এই ভাবে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। অন্য কারোর বাড়ি হলে এরই মধ্যে হয়ত তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আমি ভেতরে ঢুকে যেতাম। কিন্তু এখানে একটু মার্জিত আচরণ দেখানোই শ্রেয়। মিনিট খানেক পরে উনি ফিরে এসে বললেন “উপরে আসুন। ঘর দেখিয়ে দিচ্ছি।” ভেতরে ঢুকে গেলাম। সদর দরজা বন্ধ হল। সেই স্থূলকায়া মহিলার পেছন পেছন সিঁড়ি বেয়ে উঠে উপস্থিত হলাম সেই ঘরে। এই ঘরে গতকাল আমি এসেছিলাম, এই ঘরটা আমার জন্য বরাদ্দ করে রেখেছেন সঞ্চিতা ম্যাডাম। ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারলাম যে গতকাল যেমনটা দেখেছিলাম সব ঠিক তেমনই আছে। শুধু, বিছানার চাদর, বালিশের কভার, দরজা আর জানালার পর্দাগুলো বদলে গেছে। ঘরটা যে সদ্য মোছা হয়েছে সেটাও বুঝতে পারলাম। জানলার পর্দা সরিয়ে জানলার কপাট খুলে দিয়ে একটা সিগারেট ধরাতে যাব, এমন সময় দেখলাম একটা তোয়ালে হাতে ভেজা চুল মুছতে মুছতে ম্যাডাম এসে উপস্থিত। অগত্যা সিগারেট চালান হয়ে গেল পকেটে। মুখে ফিরে এলো একটা কৃতজ্ঞতায় ভরা হাসি । সে হাসি তে যতটা সম্ভব সারল্য ভরে দেওয়া আছে ঠেসে ঠেসে। সেই মহিলাটি ম্যাডাম আসা পর্যন্ত এক চুলও এদিক ওদিক নড়েননি। ভুরু কুঁচকে প্রচণ্ড সন্দেহ আর অবিশ্বাসের সাথে এতক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে জরিপ করে চলছিল। অবশ্য আমি ওকে পাত্তা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন অনুভব করিনি। বাড়ির কাজের লোকদের দেখলে অনেক সময়েই এটা মনে হতে বাধ্য যে বাঁশের চেয়ে কঞ্চির দাপট বেশী হয়।
ম্যাডাম আসতেই উনি সরে পড়লেন ঘর থেকে। ম্যাডাম বললেন “ভেবেছিলাম তুমি আরেকটু দেরী করে আসবে। তাই স্নান করে নিলাম।” এর কোনও উত্তর হয় না, তাই সেই একই রকম গোবেচারা হাসি হাসি মুখ নিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম একটা কৃতজ্ঞতা ভরা চাহুনি নিয়ে। উনি হেসে বললেন “ আসলে কলেজের ছেলেরা ছুটির দিনে অনেক দেরী করে ওঠে তো। তুমি দেখছি কিছুটা হলেও আর্লি রাইজার। অবশ্য তোমার বয়সে আমি ছুটির দিনে সকাল দশটার আগে বিছানা ছাড়তাম না।” উনি বক বক করেই চলেছেন। আর আমি লক্ষ্য করে চলেছি ওনাকে। সত্যিই আজ ওনাকে অদ্ভুত সুন্দর দেখতে লাগছে। মালিনীর দিকে তাকানোর সময় ইচ্ছেকৃত ভাবে আমি আমার ভেতরের মুগ্ধ হওয়া খাই খাই ভাবটা আমার চেহারায় ফুটিয়ে তুলতাম। কারণ তখন আমি চাইতাম যে ও বুঝুক যে একটা ছেলে ওর সৌন্দর্যের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু সঞ্চিতা ম্যাডাম তো আর আমার মালিনী মাগী নয়। তাই এখানে ঠিক উল্টো নাটকটা করতে হল জেনে বুঝে। অর্থাৎ, চোখে মুখে একই রকম সারল্য ভাব বজায় রেখে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতে লাগলাম ওনার সৌন্দর্য, চোখ দিয়ে। মনে মনে একটা কথা না বলে পারলাম না “ দেখি ম্যাডাম আর কত দিন! আমার ইউ এস পি হল মাগী পটিয়ে তাদের ভিডিও বানানো। এই বিউটি যদি আমি ভোগ না করতে পেরেছি তাহলে পুরুষ হওয়ার কোনও মানে দাঁড়ায় না। এখন শুধু সময় আর সুযোগের অপেক্ষা। ” কিন্তু ওই যে বললাম… মুখে সেই সরল বালকের ভীরু চাহুনিটা কিছুতেই লোপ পেতে দেওয়া যাবে না। একটু মৃদু হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওনার বক বক শুনে চললাম। অবশ্য হ্যাঁ, ওনার কথা গুলোও খুব মন দিয়েই শুনছিলাম।
তবে উনি আরও কি বলে চলেছেন সেগুলো না বললেও চলবে, কারণ সব কটা কথা খেজুরে। আমি চোখ দিয়ে কি দেখছি সেটা একটু না বললেই নয়। ভোরের সদ্য ওঠা সূর্যের রাঙা আলোয় শিশিরে ভেজা সদ্য ফোঁটা নিষ্পাপ শিউলির সৌন্দর্য যে দেখেছে সে বুঝতে পারবে ওনাকে আজ কেমন দেখতে লাগছে। যদিও উনি তোয়ালে দিয়ে মেয়েসুলভ ভাবে এখনও ওনার মাথার পেছনের দিকের ভেজা চুল গুলো ঘষেই চলেছেন, তবুও ওনার মাথার সামনেটা দেখে বলে দেওয়া যায় যে স্নান করে বেরিয়ে ই ভেজা সিঁথিতে নিজের বরের নামে খুব মোটা করে নতুন দিনের তাজা সিঁদুর পরে এসেছেন এই একটু আগে। সিঁদুরের রেখাটা ওনার সৌন্দর্য যেন আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যাদের চোখ আছে তাঁরা রোজ দেখতে পায় এই সৌন্দর্য। সূর্য রোজ সকালে ওঠার সময় বা রোজ সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়ার সময় লাজুক আকাশের কপালে লাল সিঁদুর পরিয়ে তাকে নতুন বউয়ের মতন সুন্দর বানিয়ে দেয়। ওনাকে দেখেও মনে হল যে ওনার ভেতর সেই একই লাজুক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। সেই সাথে আরেকটা ব্যাপার আছে যেটা না বললে “কম” বলা হবে। হতে পারে এই দুই তিন দিনের মুলাকাত আর কথাবার্তার ফলে উনি হয়ত আমার সাথে অনেকটা সহজ আর সাবলীল হয়ে পরে ছেন, বা হতে পারে সদ্য স্নান সেরে অসময়ে বেরিয়ে ছেন বলেই ওনার বেশভূষা অনেকটা অগোছালো আর ঘরোয়া। সত্যি বলতে কি ওনাকে কোনও দিন (বা বলা ভালো যে এখানে আসার পর প্রথম দিনেই) এই রকম ঘরোয়া ভাবে দেখতে পাব সেটা আশা করতে পারিনি।
এইবার ওনার পোশাক আশাকের ব্যাপারে আসা যাক। ম্যাডাম যেটা পরে আছেন সেটাকে এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয় নাইটি, মানে চালু কথায় তাই বলে। কিন্তু ঠিক তেমন কিছু নয় যেমন সবাই ভেবে নেয় নাইটি কথাটা শোনা মাত্র। সাদা রঙের সাধারণ স্লিভলেস ঢোলা ঘরোয়া ভদ্র নাইটি। কাপড়টা মোটেই ফিনফিনে নয়, তবে পাতলা এবং সাধারণ। জিনিসটা মোটেই চাপা নয় যেটা শরীরের সাথে সেঁটে বসে থাকবে, বরং বেশ ঢিলে ঢোলা যেমন সবাই ঘরে পরে থাকে। ঢিলে ঢোলা হওয়া সত্ত্বেও পোশাকের কাপড়টা তেমন পুরু নয় বলেই হয়ত সামনের দিকের শরীরের ভাঁজগুলো খুব পরিষ্কার ভাবে বোঝা যাচ্ছে কাপরে র বাইরে থেকে। তবে আবার বলছি ফিনফিনে কিছু নয় আর বেশ ঢিলে ঢোলা। ভেজা চুল গুলো কাঁধের ওপর অলস ভাবে পরে থাকার দরুন চুল থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটাগুলো কাঁধের কাছটাকে ভিজিয়ে স্বচ্ছ করে তুলেছে। এই এক সমস্যা সাদা রঙের পোশাক পরার। সামান্য দুই কি এক ফোঁটা জল পড়লেই কাপড়টা ভিজে স্বচ্ছ হয়ে যায়। কাঁধের ভিজে যাওয়া স্বচ্ছ জায়গার ভেতর থেকে ওনার ফর্সা কাঁধ দুটো যেন পুরো নগ্ন হয়ে আছে। কাঁধের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া সরু ব্রায়ের স্ট্র্যাপ বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আজ উনি ভেতরে বেগুনী রঙের অন্তর্বাস পরেছেন। মুখে সরল ভাব ফুটিয়ে রাখলেও মনে মনে না হেসে পারলাম না। ইনি যাই করুণ না কেন, আর ওপরে যাই পরুন না কেন, কিছুতেই দুনিয়ার কাছ থেকে ওনার ভেতরে পরা ব্রায়ের রঙ গোপন করতে পারবেন না। ঠিক যেমন দোলন যাই করুক না কেন ওর বুকের ওপরের আধ ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চির মতন স্তন বিভাজিকা সব সময় পোশাকের বাইরে বেরিয়ে নগ্ন হয়ে থাকে। গতকাল সন্ধ্যা বেলায় যখন ওর বাড়িতে গেছিলাম, তখন বেচারি খুব সাধারণ সাদা কামিজ পরেছিল, কিন্তু লক্ষ্য করার মতন ব্যাপার হল যে গতকালও ওর স্তন বিভাজিকার ওপরের অংশটা কামিজের গলার কাছ দিয়ে আধ ইঞ্চির থেকে বেশী নগ্ন হয়ে বাইরে বেরিয়ে ছিল।
যাই হোক আবার সঞ্চিতা ম্যাডামের ব্যাপারে ফিরে আসা যাক। বুকে কোনও ওড়না না থাকায় আজ ওনার নগ্ন হাত দুটো পুরোপুরি ভালো ভাবে দেখতে পেলাম। হাত দুটো কাঁধের দিকে যত এগিয়ে গেছে তত যেন আরও ফর্সা হয়ে উঠেছে। কনুইয়ের ওপর থেকে কাঁধ অব্দি হাতের চামড়ার রঙ যেন একেবারে দুধে আলতা। যদিও উনি আমার সামনে আসার পর থেকেই সারাক্ষন ধরে তোয়ালে দিয়ে মাথার চুল মুছে চলেছেন, তবুও হাতের গোরার দিকটা এতটাও উপরে উঠছে না যাতে ওনার ফর্সা সুন্দর বাহুমূলের, মানে যাকে চলতি কথায় বলতে গেলে ওনার আন্ডারআর্মের দর্শন পাওয়া যায়। আন্ডারআর্মের জায়গাটা হাতের গোরার মাংসের নিচে সমস্ত সময়টা ঢাকা পরে ই রয়েছে। আমার কোনও তাড়া নেই। কতদিন আর ঢেকে রাখবেন নিজেকে! একদিন না একদিন তো দেখতেই পাব! যাই হোক। স্তন দুটো বেশ উঁচু হয়ে আছে বুকের সামনে। দেখে মনে হল যে বেশ গোল আর ভারী স্তন, আর বেশ খাড়া হয়ে উঁচিয়ে আছে। কাপড়টা আরেকটু চাপা হলে অবশ্য আরও ভালো করে ওনার স্তনের আকার আয়তন বুঝতে পারতাম। কিন্তু আপাতত এতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে বইকি। তবে একটা কথা না বলে পারছি না এই সাধারণ হাত কাঁটা নাইটিতে, ভেজা চুলে ওনাকে যেন একটা সুন্দরী লাজুক অপ্সরার মতন লাগছে। আর আমার মতন ছেলেদের এরকম সুন্দরী নিষ্পাপ বউ দেখলে একটাই কথা মাথায় আসে। মন বলে এই নিষ্পাপ ফুলের সব কটা পাপড়ি কামড়ে আঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলে ফুলটাকে নষ্ট করে দি। আপাতত মনের ইচ্ছে মনেই দমন করে রাখতে হল কারণ ম্যাডাম বললেন “চলো, গিয়ে খেয়ে নেবে।” আমি ম্যাডামের থেকে একটু দূরত্ব রেখেই দাঁড়িয়েছি, কারণ খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালে উনি হয়ত আমার গা থেকে মদের গন্ধ পাবেন। প্রথম দিনেই ইম্প্রেশন খারাপ করে দেওয়ার কোনও মানে হয় না। ওনার থেকে, বা বলা ভালো যে এই বাড়ির থেকে এখনও আমার অনেক কিছু পাওয়ার আছে! উনি কিছু দিন বা নাই দিন, এই বাড়ি থেকে অনেক কিছু নিয়ে তবেই বিদায় নেব। উনি আমাকে ওনার পিছন পিছন আসতে বলে যেই না পিছনে ফিরলেন সেই এক মুহূর্তে আমার মাথাটা কেমন যেন বাই করে ঘুরে গেল। হে ভগবান এ আমি কি দেখলাম।
একটু আগে সিগারেট খাব বলে ঘরের পেছনের দিকের বড় জানলাটা খুলে দিয়েছিলাম। পর্দা সরিয়ে দেওয়ার ফলে গোটা ঘর ভরে গেছে আলোয়। আমাদের দুজনের শরীরের ওপরেই এতক্ষন সূর্য দেব নিজের আলো বর্ষণ করছিলেন। কিন্তু ওনার পোশাক ওনার গায়ের সাথে লেগে থাকায় এই আলোর মাধুর্যটা ঠিক অনুধাবন করতে পারিনি। কিন্তু পিছনে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ করার সাথে সাথে দেখলাম ওনার পোশাকের পিছনটা শরীরের থেকে একটু আলগা হয়ে গেল, যেমন সব ঢিলে পোশাকেই হয়ে থাকে। আর সেই ঢিলে কাপরে র ওপর সূর্যের কিরণ পড়ার সাথে সাথে কোমরের নিচ থেকে পায়ের নিচ অব্দি ওনার নাইটির কাপড়টা কেমন জানি স্বচ্ছ হয়ে গেল এক নিমেষে। প্রায় স্বচ্ছ কাপরে র ভেতর দিয়ে ওনার ধবধবে ফর্সা পা দুটো একদম কোমর অব্দি যেন পুরো নগ্ন হয়ে আছে আমার চোখের সামনে। আমি নড়তে পারলাম না কয়েক মুহূর্তের জন্য। সঠিক ভাবে বলতে না পারলেও মনে হল যে ব্রায়ের মতন একই রঙের, মানে বেগুনী রঙের প্যান্টি পরেছেন ভেতরে। উনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে কিন্তু ওনার প্যান্টিতে ঢাকা গোল গোল পাছা আর গোল গোল থাইয়ের ওপর থেকে আমি কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারলাম না, দাঁড়িয়ে রইলাম একই জায়গায়। পাছার মাংসল বলয়গুলো যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে ওনার প্রতিটা ধীর পদক্ষেপের সাথে। আমার প্যান্টের ভেতরে যে ক্রিমিনালটা আঁটকে পরে আছে তার অবস্থা যে এখন কেমন হয়েছে সেই কথায় গিয়ে লাভ নেই। বরং মনটাকে একটু অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করলাম।
হিপ পকেট থেকে মানি ব্যাগ বের করে ভেতরে কত টাকা আছে সেটা একবার চেক করে নিয়েই ওনার পিছু নিলাম। শত চেষ্টা সত্ত্বেও চোখ দুটোকে কিন্তু ওনার পাছা আর প্রায় নগ্ন হয়ে থাকা পা দুটোর ওপর থেকে অন্য কোনও দিকে ঘোরাতে পারলাম না। উনি যখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, মানে সূর্যের আলোর অভাবে যখন ওনার কাপরে র স্বচ্ছতা সম্পূর্ণ রূপে উধাও হল, তখন ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করলাম। রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছে চোখে মুখে যতটা পারা যায় আবার সেই সারল্য ফুটিয়ে তুললাম। যদিও ওনার পিছু নিয়েছি তবুও ওনার থেকে একটু দূরত্ব রেখেই হাঁটছি কারণ… ওই যে বললাম মদের গন্ধ পাওয়ার ভয়। নিচে নেমে উনি আমাকে ডাইনিং টেবিলে বসতে বলে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলেন। আমি সুবোধ বালকের মতন গিয়ে চেয়ারে বসে পড়লাম। আমার চোখের সামনে সেই বইয়ের র্যাক। আবারও চোখে পড়ল সেই বইটা, “প্র্যাকটিকাল সেক্স গাইড”! যাই হোক ওই দিকে না তাকিয়ে বাইরে খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। রান্না ঘর থেকে ভাসা ভাসা গলার স্বর ভেসে আসছে কানে। ওই মহিলার গলা পেলাম। “ছেলেটাকে কিন্তু আমার সুবিধার মনে হল না।” ম্যাডামের গলা পেলাম “কেন কি হয়েছে শ্যামাদি?” কিছুক্ষণ সব চুপ, শুধু বাসনের আওয়াজ আসছে আর জলের আওয়াজ। আবার গলা পেলাম মহিলার। “ছেলেটা আমাকে বলল যে আমি যার ঘর পরিষ্কার করছি সেই সকাল থেকে সেই নাকি ও! ও কি করে জানল যে আমি ওর…” ম্যাডাম ওর কথায় তেমন আমল না দিয়ে বললেন “আস্তে… বাইরে বসে আছে। শুনতে পেলে কি ভাববে?” একটু থেমে বললেন “বোধহয় তোমার সাথে মজা করেছে। বা কাল হয়ত বুঝেছে যে ঘরের চাদর পর্দা সব অনেক দিন পরিষ্কার করা হয়নি, তাই হয়ত একটু অনুমান …” মহিলা তবুও বলার চেষ্টা করল যে “বাবু দুদিন বাড়িতে নেই, উনি ফিরে আসার পর ওকে আসতে বললে ভালো করতে না?” আর কোনও কথা হল না। দুজনে বেরিয়ে এলেন রান্না ঘর থেকে। আমি যেন কিছুই শুনিনি এমন ভান করে জানলার দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম।
বাঁচা গেল। ম্যাডাম আমার ঠিক পাশের খালি চেয়ারটাতে না বসে প্রায় পাঁচ হাত দূরে আমার ঠিক মুখোমুখি উল্টো চেয়ারটাতে গিয়ে বসলেন। আমার পাশের চেয়ারে বসলে কথা বলতে হলে নির্ঘাত আমার মুখ থেকে মদের গন্ধ পেয়ে যেতেন। শ্যামাদির মুখ থেকে কিন্তু সন্দেহের ছাপটা এখনও মিলিয়ে যায়নি। শালা সব বাড়ির চাকর আর ঝি নিজেদের শার্লক হোমস মনে করে। একে একটু টাইট দিতে হবে। আর সেটা এখনই দেব। শ্যামাদি আমাদের দুজনের সামনে প্লেট ভর্তি গরম গরম লুচি আর আলুর তরকারি সাজিয়ে গ্লাসে জল ঢেলে চা বানাতে চলে যেতেই আমি গলাটা যতটা সম্ভব খাদে নামিয়ে নিয়ে বললাম “ম্যাডাম প্রথম দিনে এসেই এই নিয়ে কথা বলা আমার উচিৎ হবে না। কিন্তু না বলে পারছি না।” উনি বললেন “কি নিয়ে?” উনি স্বাভাবিক স্বরেই কথা বলছেন। তাই আমি যদি এখন গোপনীয়তা রাখতে না পারি তাহলে বিপদ হয়ে যাবে। গলার স্বরটা আরও নিচে নামিয়ে বললাম “আপনাদের এই কাজের মাসির কিন্তু হাত টান আছে। (মানে যাকে বলে চুরির স্বভাব)” ম্যাডাম ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু মুখে কিছু বললেন না। আমি কিছু বলার আগেই ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন “ পরে হবে সে সব কথা। এখন বাড়িতে লোক আছে। “
লক্ষ্য করলাম যে এইবার ওনার গলাটাও অনেকটা খাদে নেমে গেছে। মনে মনে হেসে ফেললাম, আমি কাউকে বাঁশ দেব আর সে খাবে না সেটা হতে পারে না। আমিও ইশারায় বুঝিয়ে দিলাম যে পরে ওনাকে বুঝিয়ে বলব যে কি করে আমার এই ধারণা হয়েছে। আমি শুধু খাটো গলায় বললাম “প্রমান আছে।” উনি আবার ইশারায় আমাকে চুপ করে যেতে বললেন। প্রমান সত্যিই আছে আমার কাছে। কিন্তু আপাতত মুখ বুজে খাওয়া শুরু করলাম। জিজ্ঞেস করলাম “ আপনি বানিয়েছেন?” উনি বললেন “তরকারিটা আমার বানানো। লুচিটা ওই শ্যামাদি ভেজেছে।” আমি বোকার মতন মুখ বানিয়ে বললাম “আচ্ছা উনি তাহলে শ্যামাদি!” খাওয়ার মাঝ পথে শ্যামাদি এসে চা দিয়ে চলে গেল। একটু পরে রান্না ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে বলল “ আমি তাহলে এখন যাচ্ছি। বিকালে এসে এঁটো বাসনগুলো ধুয়ে দেব। তোমাকে কিছু ধুতে হবে না। আসছি। আর ও বেলায় কিছু রান্না করতে হলে বলে দিও।” ম্যাডাম মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন যে ঠিক আছে। উনি বেরিয়ে যেতেই ম্যাডাম আমাকে চেপে ধরলেন “ কি করে বুঝলে যে ওর হাত টান আছে?” আমি বললাম “ কত দিন রেখেছেন ওকে?” বললেন “ এই ছয় মাস মতন। “ তারপর একটু থেমে বললেন “ বাড়ির ডুপ্লিকেট চাবি থাকে ওর কাছে। আমরা বাড়িতে না থাকলেও ওর যাওয়া আসায় বাধা নেই। আর দেখতেই তো পাচ্ছ সব কিছুই কেমন খোলা মেলা পরে থাকে এখানে। “ আমি বললাম “ মশলা পাতি চুরি করলে বা দু আধটা পেয়াজ চুরি করলে অবশ্য ধরতে পারতাম না। কিন্তু টাকার ব্যাপার বলেই ধরতে পারলাম।” উনি বললেন “কোন টাকা?” বললাম “তেমন কিছু নয়। কিন্তু সাধারণ ব্যাপার থেকেই এই স্বভাবগুলো ধরা যায়।” একটু থেমে লুচির শেষ টুকরোটা মুখে পুড়ে দিয়ে বললাম “ ঢোকার সময় দেখলাম যে ওই ফ্রিজের ওপর কুড়ি টাকার একটা নোট পরে আছে। “ ম্যাডাম চট জলদি বললেন “আরে ওটা রেখেছি একজনকে দেব বলে। আমার ধার ছিল। “ আমি হেসে বললাম “তো কুড়ি টাকার নোটটার কি ডানা গজাল?” উনি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে দেখলেন ফ্রিজের ওপর। দেখলেন টাকাটা নেই। বললাম “যখন আপনি ওপরে ছিলেন তখনই আর কি!” ম্যাডাম কি যেন ভেবে নিয়ে বললেন “জানো সংকেত এরকম আগেও অনেক বার হয়েছে। পরে মনে হয়েছিল যে আমারই ভুল। আমি হয়ত টাকাটা বের করে রাখিনি। বা কাজের মাঝে এমন কোথাও রেখে দিয়েছি যেটা এখন খেয়াল করতে পারছি না। পরে আবার টাকা বের করে লোক জনকে দিতে হয়েছে। “ আমি বললাম “আমি এই ব্যাপারে নিঃসন্দেহ যে ওই টাকাটা আপনার শ্যামাদিই সরিয়েছে। অবশ্য আপনি আমাকেও সন্দেহ করতে পারেন, কিন্তু কুড়ি টাকা …” বাকি কথাটা অসমাপ্তই রাখলাম। বুঝিয়ে দিলাম ছুঁচো মেরে এরকম হাত গন্ধ করার ছেলে আমি নই।
উনি একটু ব্যস্ত হয়ে বললেন “ না না। আমি তোমাকে কেন হঠাত করে সন্দেহ করতে যাব। বলছি না এরকম আগেও হয়েছে, আর তখন তো তুমি এখানে ছিলে না।” আমি আরও অনেক হিসাব দিতে পারতাম যে শ্যামাদি আর কি কি সরিয়েছে এই বাড়ি থেকে। কিন্তু সেগুলো বললে ম্যাডাম উল্টে আমাকে সন্দেহ করতে পারেন। কিন্তু আমি খুব ভালো করে জানি যে ও এই বাড়ি থেকে আর কি কি সরিয়েছে। যাই হোক প্রত্যক্ষ প্রমান দিয়ে যেটুকু বলা যায় সেটুকু বললেই চলবে আপাতত। উনি শ্যামাদিকে তাড়ান বা নাই তাড়ান সেটা নিয়ে আমার কোনও মাথা ব্যাথা নেই। আমার শুধু এইটুকু লক্ষ্য ছিল যে ম্যাডামের মনে শ্যামাদির ব্যাপারে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া যাতে উনি আর ভবিষ্যতে শ্যামাদির কথার ওপর (অন্তত আমার ব্যাপারে বলা কথার ওপর) তেমন আমল না করেন। কাজ হয়ে গেছে। উঠে পড়লাম। আমার প্লেটটা টেবিলে থেকে ওঠাতে যাব এমন সময় ম্যাডাম বললেন “রেখে দাও। ও তোমাকে নিয়ে যেতে হবে না। আমি নিয়ে যাব। বাই দা অয়ে, এখন কি করবে?” বললাম “তেমন কিছু না। একটু জামা কাপড় বই পত্র গুছিয়ে রাখব।” উনি বললেন “ ওয়ারড্রবটা খালি করে দিয়েছি। ওখানে রেখো জামা কাপড়।” আমি মাথা নেড়ে সিঁড়ির দিকে যাত্রা শুরতে করতে যাব, এমন সময় কি একটা মনে হওয়ায় দাঁড়িয়ে হিপ পকেট থেকে মানি ব্যাগটা বের করে তার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে সযত্নে রেখে দিলাম টেবিলের ওপর। ম্যাডাম ব্যস্ত হয়ে বললেন “এত তাড়াহুড়ার কি আছে?” বললাম “দায়িত্ব মিটিয়ে নিলাম। এইবার স্বাভাবিক ভাবে থাকতে পারব। আসি? ও হ্যাঁ, আজ বিকালের দিকে একটু বেরব।”
ওনার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে নিজের ঘরে চলে এলাম। ঘর গোছাতে লাগল ঠিক দশ মিনিট। মানে সব জিনিস বের করার তো মানে নেই। শুধু কাজের জিনিসগুলো বের করে সাজিয়ে রাখলাম। ঘরে ঢুকে অবশ্য দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এখন একটা ঘুম দিতে হবে। মোবাইলটা এতক্ষন সাইলেন্ট করে রাখা ছিল। সেটা বের করে দেখলাম তাতে চারটে মেসেজ এসেছে। নাহ মালিনী একটাও মেসেজ করেনি। বোধহয় এখনও ঘুমাচ্ছে। জানি না ঘুম থেকে ওঠার পর আজ কি হবে ওর। একটা মেসেজ কোথা থেকে এসেছে সেটা বলার কোনও মানে দাঁড়াচ্ছে না। একটা মেসেজ এসেছে রাকার কাছ থেকে, সারমর্ম হল আমি যেন ভুলে না যাই যে ওর সাথে আজ আমার দেখা করার কথা। একটা মেসেজ এসেছে দোলনের কাছ থেকে, সারমর্ম হল এই যে ওর কিছু কথা বলার আছে। আরেকটা মেসেজ এসেছে খুব অপ্রত্যাশিত একজনের কাছ থেকে। শিখাদি। সারমর্মঃ ওরও নাকি আমার সাথে কিছু কথা আছে। রাকা আর দোলন আমার সাথে কি কথা বলবে সেটা মোটামুটি বুঝতে পারছি, কিন্তু শিখাদি? হতে পারে সেদিন যে ওর সেন্সলেস হওয়ার সুযোগ নিয়ে ওকে আমি ধর্ষণ করেছি সেই নিয়ে সরাসরি কথা বলে আমাকে ধমকি দিতে চায়। আমাকে দেবে ধমকি! ভালো! মজা হবে বেশ। আপাতত একটা লম্বা ঘুম। দুপুরে উঠে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে তারপর এইসব ভাবা যাবে। আমি শুধু রাকার মেসেজটার রিপ্লাই দিলাম “মনে আছে। দেখা হবে। তবে দেরী করিস না। “ ইচ্ছে করেই দোলনকে কোনও রিপ্লাই দিলাম না। আর শিখার মেসেজের রিপ্লাই দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। কানে হেডফোন গুজে সেই বিখ্যাত দামি মোবাইলে একটা ভালো রেডিও স্টেশন চালিয়ে চোখ বুজলাম।
ঘুম ভাঙল একটা ফোনে। মোবাইলটা বাজছে। ঘড়িতে এখন সাড়ে বারোটা। মালিনী! দুই বার ভালো করে গলা খাঁকড়িয়ে ঘুমের আমেজটা কাটিয়ে নিয়ে ফোন ধরলাম। ওই দিক থেকে গলার প্রথম আওয়াজটা ভেসে আসতেই বুঝতে পারলাম যে ওই দিকে ভয় করার মতন কিছু ঘটেনি, অর্থাৎ রনি গতকাল রাতের কোনও কথাই মনে করতে পারেনি। আমি বললাম “ডার্লিং, এতক্ষনে ওঠা হল ঘুম থেকে? অবশ্য ফুল শয্যার পরের দিন মেয়েরা দেরী করে না উঠলে বরের অপমান।” ও মিষ্টি হেসে বলল “আমি এখন কাউন্টারে আছি। এই মাত্র এলাম। এখন এইসব বলবে না। না ওর কিছু মনে নেই। তবে প্রচুর হ্যাং ওভার আছে। কিন্তু বাসের সময় হয়ে যাচ্ছে বলে রেডি হয়ে বেরিয়ে যাবে একটু পরে। তোমার খবর নিচ্ছিল। বলেছে আবার তোমার সাথে বসে পার্টি করবে! আমি ওকে বলেছি যে এরকম ভাবে মদ খেয়ে আউট হয়ে বমি করলে আর কারোর সাথে তোমার আলাপ করাব না। কারণ তাতে আমার প্রেস্টিজ হ্যাম্পারড হচ্ছে। যাই হোক, যে কারণে ফোন করলাম সেটা হল, “ আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম “হ্যাঁ, ঘরে ফেরার পর ঘুম আসছিল না তাই শিফট করে নিলাম। এতক্ষন ধরে ঘর গোছাচ্ছি। কোথায় নতুন বউ ঘর গোছায়, কিন্তু এখানে…(একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম) কি আর করব। পোড়া কপাল আমার। তবে এক দিক থেকে ভালো হল। সামনের সপ্তাহ থেকে বাইরে দেখা করতে পারব যখন তোমার ডিউটি থাকবে না। আর এটা শুনে শান্তি পেলাম যে তোমার ভোঁদাই বরটার গতকালের ব্যাপারে কিছুই মনে নেই। ভালো থেকো। “ ওর কাউন্টারে বোধহয় কেউ একজন এসেছে। ও আমাকে সংক্ষেপে বলল “ পরে কথা হবে। এখন রাখছি। কাজ আছে। “ আমি হেসে ফোন কেটে দিলাম।
উঠে পড়লাম। ব্রাশ, পেস্ট, রেজার ক্রিম, শাওয়ার জেল, শ্যাম্পু আর একটা তোয়ালে নিয়ে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। একটাই সমস্যা এখানে, সব জামা কাপড়, সব কিছু নিজেকেই কাচাকাচি করতে হবে। তাও আবার কোনও অয়াশিং মেশিন ছাড়া, মেঝেতে বসে ধোপাদের মতন কাপড় কাচতে হবে রোজ। যাই হোক, কয়েক দিন এই ভাবেই না হয় কাটিয়ে নেওয়া যাক। ঘুম ভাঙার পর একটা জিনিস বুঝতে পারলাম যে হ্যাংওভার কেটে গেছে। এখন শরীর পুরো ঝরঝরে। ভালো ভাবে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে জানলার নিচটা একবার দেখে নিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। জানলার দিকটা বাড়ির পেছন দিক। পেছন দিকের বিশাল পাঁচিল আর বাড়ির দেওয়ালের মাঝে একটা ছোট বাগান আছে। তবে দেখে মনে হল যে পরিচর্যার অভাবে অধিকাংশ গাছের অবস্থা খুব খারাপ। ফুল প্রায় নেই বললেই চলে। জল না দিলে গাছ গুলো আর বেশী দিন বাঁচবে বলে মনে হয় না। অবশ্য বৃষ্টি হলে অন্য ব্যাপার। খবরে শুনেছি যে নিম্নচাপের একটা সম্ভাবনা আছে। সেটা হলে গাছগুলো প্রানে বেঁচে গেলেও যেতে পারে। সিগারেট শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও আরও কিছুক্ষণ জানলার ধারে দাঁড়িয়ে রইলাম। পাঁচিলের উল্টো দিকে একটা কাঁচা রাস্তা চলে গেছে বলে মনে হল। তার ঠিক পরেই একটা ডোবা। আর তার পরেই একটা ছোট বস্তি আছে। সেখানে কিছু লোকজনের চলা ফেরা দেখতে পাচ্ছি। কয়েকটা দোকান পাটও আছে। হুঁশ ফিরল, দরজায় কেউ নক করছে। জানলার পর্দাটা টেনে দিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম। ম্যাডাম।
“কি ঘুমাচ্ছিলে?” মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলাম যে ওনার অনুমান নির্ভুল। এখনও ওনার পরিধানে সেই একই নাইটি যেটা পরে উনি সকালে আমার সামনে এসেছিলেন। মুখে সেই হাসি খুশি ভাবটা থাকলেও ওনাকে দেখে বুঝতে পারলাম যে সম্প্রতি উনি কোনও কারণে চিন্তায় পরে ছেন। সম্প্রতি বলতে মানে বিগত কয়েক মিনিটের মধ্যে। আগের দিনও ওনার মোবাইলে সেই মেসেজটা আসার পর ওনার মুখে ঠিক এমনই একটা টেন্সড ভাব দেখেছিলাম। উনি অন্যমনস্ক ভাবে ঘরের ভেতর ঢুকে টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। উনি অবশ্য বিছানার দিকে মুখ করে বসেছেন, টেবিলের দিকে মুখ করে নয়। সময়ের সাথে সাথে ওনার মুখের ওপর চিন্তার ছাপটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঘরে লাইট অন করার দরকার পরে নি কারণ বাইরে প্রচুর আলো। তবে পর্দা টেনে রাখায় ঘরের আলো এখন কিছুটা হলেও কম। আমি চুপচাপ ওনার সামনে বিছানার ওপর গিয়ে বসে পড়লাম। দুজনেই চুপ। উনি ঘরের এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছেন অন্যমনস্কভাবে, চোখের দৃষ্টিতে একটা অসহায় ভয়ার্ত ভাব ফুটে আছে আবছা ভাবে।
প্রায় মিনিট পাঁচেক কেটে যাওয়ার পর আমি একটু গলা খাঁকড়িয়ে নিয়ে বললাম “কিছু বলবেন? আমার এখানে আসায় যদি আপনার কোনও প্রবলেম থাকে তাহলে নিশ্চিন্তে বলতে পারেন। আপনার কোনও অসুবিধা হোক এমন অভিপ্রায় আমার নেই।” উনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “ না না তুমি আসাতে আমি একটু নিশ্চিন্ত হয়েছি। আসলে আমার বর তো বাইরে বাইরে থাকে। “ একটু থেমে অন্যমনস্ক ভাবেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন “ তুমি বেরোবে বলছিলে না তখন?” বললাম “হ্যাঁ।” বললেন “কটায় বেরোবে?” বললাম “তিনটের মধ্যে বেরিয়ে পড়ব।” উনি সাথে সাথে প্রশ্ন করলেন “ কোথায় যাচ্ছ?” উত্তর আমার ঠিক করাই ছিল, কিন্তু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন হল না। উনি নিজেই বললেন “না না তোমার পার্সোনাল ব্যাপারে কোনও নাক গলানোর ইচ্ছে আমার নেই। শুধু পড়াশুনার ব্যাপারটা…” আবার উনি অন্যমনস্ক ভাবে থেমে গেলেন। দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ ধরে। বললাম “আসলে কয়েকটা জিনিস জেরক্স করার আছে। বই কিনে লাভ নেই। তবে হ্যাঁ দুই একটা গল্পের বই কেনার প্ল্যান করছি। একটু এই দিকের রাস্তা ঘাট গুলো ঘুরে দেখব। আর একজনের সাথে দেখা করার কথা। আমাদের গ্রামের লোক। কোলকাতায় এসেছেন।” উনি যেন আমার কথা শুনেও শুনলেন না। জিজ্ঞেস করলেন “কটার মধ্যে ফিরবে?” বললাম “ কেন আপনার কি কোনও কাজ আছে? আমার হেল্প লাগলে বলুন। “ উনি অন্যমনস্ক ভাবটাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বললেন “ না না। এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম। আসলে… সেই চোর আসার ব্যাপারটার পর থেকে একা থাকতে একটু ভয় লাগে। তেমন কিছু না। তুমি তোমার কাজ সেরে এসো।” আমি বললাম “আমি সাড়ে সাতটার ভেতর ফিরে আসব আর কোনও বাড়িতে এত তাড়াতাড়ি চোরের আগমন সচরাচর হয় বলে শুনিনি।” ইচ্ছে ছিল জিজ্ঞেস করি যে আপনার বর কখন ফিরবে, কিন্তু ওই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না জেনে বুঝে। উনি ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
উনি যখন দরজার একদম মুখে গিয়ে পৌঁছেছেন, আমি বললাম “ম্যাডাম, চিন্তা করবেন না। এর পর চোর এলে এমন উত্তম মধ্যম দেব যে সে আর এই মুখো সাত জন্মে হবে না।” উনি একবার ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মুখে জোড় করে একটা হাসি আনার চেষ্টা করলেন, পারলেন না, তারপর আবার বাইরে যেতে যেতে বললেন “চোর হলে এতটা চিন্তিত হতাম না…” বাকি কথাগুলো ওনার সাথেই মিলিয়ে গেল। আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম উনি অন্যমনস্ক ভাবে প্রায় টলতে টলতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে চলেছেন। বললাম “ম্যাডাম, লাঞ্চের সময় বলবেন। “ উনি আমার দিকে ফিরেও দেখলেন না। শুধু মাথা নেড়ে নিচে নেমে গেলেন। তবে ঘরে ঢোকার আগে নিচ থেকে ওনার গলার স্বর কানে এলো। “আর এক ঘণ্টা পর খেতে বসব। চলে এসো।”
আমি ঘরে ঢুকে জরুরি কয়েকটা ফোন সেরে নিলাম। পদ্মাসনে সোজা হয়ে বসে চোখ বুজলাম। এই বেলা একটু ধ্যান করে নেওয়া দরকার। ধ্যান করলে শুধু কনসেন্ট্রেশন বাড়ে না, অনেক সময় মনের অনেক জট পরিষ্কার হয়ে যায়। আর মেডিটেশানে বসলে সময়টা খুব শান্ত ভাবে কেটে যায়। মনের জট কাটল কি না বলতে পারি না, তবে, ছোট মোবাইলে অ্যালার্ম বেজে ওঠায় পদ্মাসন ভেঙ্গে উঠে পড়লাম। একটা সিগারেট ধরাতে গিয়েও ধরালাম না। এত শান্ত মন নিয়ে সিগারেট খাবার টান খুব একটা থাকে না। দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম বাইরে। লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে। নিচে নেমে দেখলাম ম্যাডাম টিভি চালিয়ে বসে আছেন। সামনে কিছু একটা নিউজ চলছে। তবে ওনার সেই দিকে কোনও খেয়াল নেই। উনি ওনার স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনের দিকে এক মনে তাকিয়ে আছেন। দুই হাতের আঙুলগুলো টাচ স্ক্রিনের ওপর অবিশ্রাম নড়ে চলেছে। কাকে উনি এত মেসেজ করে চলেছেন?
অবশ্য ফেসবুক আর হোয়াটসআপের যুগে এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। আমি অবশ্য খবরের সারমর্মটা বুঝতে পেরেছি। সেই নিম্নচাপ আর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই যেকোনো সময়ে এসে আছড়ে পড়বে কোলকাতার ওপর। অবশ্য এর প্রবল প্রকোপ দেখতে পাওয়া যাবে সমুদ্রে, তাই যারা মাছ ধরতে যাবে তাদের কে সরকার এই খবরের মাধ্যমে সতর্ক করে দিচ্ছে। তবে কোলকাতাও এই নিম্নচাপের ধাক্কায় ভেসে যেতে পারে, অন্তত খবরে তাই বলা হয়েছে। আমি ম্যাডামের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। উনি আমার পায়ের শব্দ শুনতে পাননি। এখনও এক মনে মেসেজ করে চলেছেন। আবারও গলা খাঁকড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম “ আহহ, আপনি বুঝি খুব নিউজ দেখেন?” আর কি বলব সেটা জানি না। উনি আমার গলার আওয়াজ পেয়ে যেন চমকে উঠলেন। মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়েই মোবাইলের গায়ের সুইচটা চেপে মোবাইলের স্ক্রিনটা অন্ধকার করে দিলেন, মানে মোবাইলটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। বুঝতে পারলাম যে ওনার কোনও ধারণাই নেই যে এখন ১ টা বেজে ৪৫ মিনিট হয়ে গেছে। উনি দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়েই লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মোবাইলটাকে সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে চলে গেলেন। আমাদের মধ্যে আর কোনও কথা হল না। খাবার টেবিলের ওপর সাজানোই ছিল। উনি রান্নাঘর থেকে দুটো থালা নিয়ে এসে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখলেন। আমি অবশ্য এরই মধ্যে আমার জন্য নির্দিষ্ট করা চেয়ারে বসে পরে ছি। আমাকে ভাত বেড়ে দিয়ে উনি আমার পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন ভাত নিয়ে। পুরো লাঞ্চের সময়টা নিরবে কাটল। শুধু দুই একবার উনি জিজ্ঞেস করেছেন যে আমার আর কিছু লাগবে কি না। তেল কইটা যদি ম্যাডাম নিজেই বানিয়ে থাকেন তো মানতে হবে যে ওনার রান্নার হাত বেশ ভালো।
দেওয়াল ঘড়িতে এখন ২.৩০ মিনিট। এইবার আর ম্যাডামের বাধা শুনলাম না। আমি আমাদের দুজনের থালা তুলে নিয়ে গিয়ে বেসিনে রেখে দিলাম। উপরে উঠে বেরনোর জন্য রেডি হয়ে নিলাম। হাতে সময় আর নেই। ম্যাডাম কে একটা মিষ্টি “বাই” করে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে ধেয়ে চললাম দোলনের বাড়ির দিকে।
আমি অবশ্য ল্যাপটপের ব্যাগটা সাথে নিয়ে নিয়েছি। সেটার ভেতর দুটো বই ছাড়া আর কিছু নেই। মাঝ পথে ট্যাক্সি থামিয়ে একটা বড় জেরক্সের দোকানে বই দুটো রেখে তার কয়েকটা পাতা জেরক্স করার জন্য নির্দেশ দিয়ে, দোকানের মালিককে আগাম কিছু দিয়ে আবার ছুটে চললাম দোলনের বাড়ির দিকে। দোলনের বাড়ির দরজা খোলা। বুঝতে পারলাম যে কিছু লোক এসেছে শোক জ্ঞাপন করতে। আমি দারোয়ানকে পাত্তা না দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখলাম দোলন আর মিসেস মুখার্জি একটা সোফায় পাশা পাশি বসে আছে। চারপাশে অনেক লোক। এদের কাউকে আমি চিনি না। চেনার কোনও মানে হয় না। দোলন আমাকে ঢুকতে দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছে। ও আমাকে ইশারায় দোতলায় উঠিয়ে নিয়ে গেল। উঠতে উঠতে আমি জিজ্ঞেস করলাম “ রাকা কাল তোর সাথে ছিল না?” ও বলল “হ্যাঁ। সকালে চলে গেছে।” দোলন আমাকে ওর নিজের ঘরে নিয়ে এসেছে। দরজা বন্ধ করে আমার দিকে কিছুক্ষণ স্থির ভাবে তাকিয়ে রইল। আমি পাথরের মতন নিরুত্তাপ। ও বালিশের নিচ থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বার করে সেখান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলল “আমি তোকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু…” আমি বললাম “ কিন্তু কি?” ও কিছুক্ষণ চুপ। সিগারেটে ঘন ঘন টান দিচ্ছে, আর বেশ জোড়ের সাথে। বলল “ পুলিশ হঠাত করে তোর ওপর সন্দেহ করল কেন?” আমি বললাম “ ফুটেজ দেখে ওদের সন্দেহ হয়েছে, তাছাড়া আমি বাইরের ছেলে, আমিও ওদের জায়গায় থাকলে হয়ত…” ও বলল “বেশ মেনে নিলাম সেটা। কিন্তু কাল পুলিশ স্টেশনে তোর হাবভাব দেখে কিন্তু আমারও কিছুটা সন্দেহ হয়েছে। পরে অবশ্য বুঝতে পারলাম যে তাদের সন্দেহ অমূলক। কিন্তু আবার বলছি গতকাল কেন জানি না আমার তোর হাব ভাব দেখে বার বার মনে হচ্ছিল যে তুই সব কিছু জানিস, কিন্তু কেমন যেন গা ছাড়া ভাবে গা ঢাকা দিয়ে আছিস, বা নিজের গা বাঁচিয়ে চলছিস।”
আমি বললাম “ এই ব্যাপার! গা বাঁচিয়ে চলছি বইকি। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে এরকম একটা বাজে কেসে ফেঁসে গেলে কি হবে বুঝতে পারছিস? পড়াশুনা ছেড়ে দে, জেলে ফেলে রেখে দেবে। পুলিশের সামনে ভয় পেয়ে বারবার চমকে চমকে উঠলে পুলিশ সচরাচর তোর মাথার ওপর চেপে বসবে। তাই যে ব্যাপারের সাথে আমার কোনও রকম সম্পর্ক নেই, সেই রকম ব্যাপার নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলে আমাকে একটু বেপরোয়া ভাব দেখাতে হবে বইকি। কিন্তু এই নিয়ে তোর এত চিন্তার কি আছে বুঝতে পারিনি এখনও।” ও কি যেন চিন্তা করে নিয়ে বলল “ আমার সন্দেহের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, কিন্তু আজ শিখাদি আমাকে মেসেজ করেছে।” বললাম “ তার দাবি কি?” ও পোড়া সিগারেটটা জানালার বাইরে ফেলে দিয়ে আমার দিকে ফিরে বলল “ এক কথায় ও নিজেও তোকে সন্দেহ করে।” আমি ওর বিছানায় বসে পড়লাম হতাশ হয়ে। বললাম “তাহলে এখন ওই শিখাদির কথাও তোর…” ও বলল “এটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা নয়। ও আমাকে বলেছে যে ও আমার সাথে দেখা করে কিছু জিনিস বলতে চায়। ওর ধারণা তুই এর মধ্যে আছিস। “ আমি বললাম “ বেশ মেনে নিলাম। কিন্তু এখানে আমার মোটিভ?” ও বলল “ সেই দিন মদ খেতে খেতে তুই বলে ফেলেছিলিস যে তোর বাবা কিং মেকার। ইউ পি তে অন্য পার্টির সরকার। এখানে অন্য। সুতরাং…” আমি হেসে ফেললাম “আমি বলেছি কিং মেকার। কোন পার্টি গেস করলি কিভাবে?” ও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিল। বললাম “ কিং মেকারদের ক্ষমতা ভালোই থাকে এটা সত্যি। কিন্তু আমাদের পার্টিই যে ক্ষমতায় থাকবে সেটা কে বলেছে? খুব বেশী হলে ওই সিটগুলো জিততে পারে। গ্রো আপ। অবশ্য সিটগুলো না জিতলেও ক্ষমতা ক্ষমতার জায়গাতেই থাকে।” ও বলল “শিখাদি তোর ব্যাপারে কি এমন জানে যে এমন কথা বলছে।” আমি বললাম “সেটা তুই ওকে গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস কর। আমি জানি না যে ও কি জানে। “ ও বলল “সেটা আমি আজ করেছি।” বললাম “তাহলে তো তুই জেনেই গেছিস যে আমি কেন তোর বাবাকে খুন করতে চেয়েছি!” ও বলল “সেটা জানতে পারলে তুই আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতিস না। কিন্তু ও ঠিক কিছুই বলতে পারল না। কিন্তু আমি জানি যে ও অনেক কিছু বলতে চাইছিল। দীপকের আত্মহত্যার পর ও ভেঙ্গে পরে ছে। ও আমাকে বলল যে ওর একটু সময় চাই। আরেকটু ভেবে গুছিয়ে আরেক দিন ভালো করে এই সব কথা জানাবে। কিন্তু ও আমাকে ফেস টু ফেস বলেছে যে ওর বিশ্বাস এসব কিছুর মধ্যে শুধু তুই আছিস। আর শুধুই তুই আছিস। ও আমাকে বলেছে যে ওর কাছে প্রমান আছে। ” আমি বললাম “বেশ সেই কথাটা পুলিশে গিয়ে জানিয়ে দিতে বল। আমি এর থেকে বেশী কিছুই বলতে পারি না। “ দোলন একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে বলল “ তুই যে এর মধ্যে নেই সেটা আমি বিশ্বাস করতেই চাইছি। কিন্তু পারছি না। প্রথমে পুলিশ, এর পর শিখা। আর সত্যি বলতে কি শিখাদির কথা শুনে আমার আজ মনে হয়েছে যে ও সত্যি কিছু জানে। আর সত্যি কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু কিছু একটা ভয়ে বলতে পারছে না। “
আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম “এত সন্দেহ নিয়ে থাকার মানে হয় না। রিলেশন শুরুর প্রথম দিনেই এত সন্দেহ?” ও বলল “ আবারও বলছি তোকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু যারা মারা গেছে তাদেরও আমি ভালবাসতাম। একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। “ বললাম “বলে ফেল। সন্দেহ কাটিয়ে ফেল। কারণ এই সব জিনিস ভীষণ ঘোড়েল হয়। আবার কিছু কথা শুনে বা দেখে তোর মনে হবে আমিই কালপ্রিট। তাই এটা খুব দরকার যে তুই তোর মনের সন্দেহটা আগে ভালো করে মুছে ফেল। আর সেটা মুছে ফেলার জন্য যা করার সেটাই কর। আমি তোর সাথে আছি। “ ওর চেহারায় কোনও নরম ভাব এলো না। ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল “ এর পর যদি পুলিশ তোর কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা চায় তাহলে তুই…” আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম “আরেকবার বলছি, তোর সন্দেহ দূর করার জন্য কি করতে হবে বল, আমি সব করতে রাজি আছি। তবে একটা জিনিস প্র্যাকটিকালই বলছি। যদি দেখি আইনত বাঁশ খেতে চলেছি, তাহলে আমি আইনের সাহায্য নেব। তবে কোনও রকম অসহযোগিতা করব না। পাশে একটা উকিল রেখে সব রকম হেল্প করব যাতে তোর সন্দেহ দূর হয়। আর এতেও তোর মন না ভরলে, আই উইল রাদার সে যে এখানেই আমাদের ইতি টেনে দেওয়া উচিৎ।” আমি দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার উদ্যোগ করতেই ও ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল পিছন থেকে। “পুচু আই লাভ ইউ। কিন্তু ভেঙ্গে পরে ছি। তার মধ্যে এই শিখাদি এসে হঠাত করে…” আমি বললাম “এই সব পলিটিকাল মার্ডারে স্কেপ গোট খোঁজা হয়। এরকম সময় সবাই বলবে যে যদি কিছুই না থাকে তো কেন বার বার একেই ধরা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হল যাকে ধরা হচ্ছে সে হয়ত কিছুই জানে না। জাস্ট অ্যাঁ স্কেপ গোট। তাই বলছি।” ও আমাকে ছারেনি এখনও। বলল “ সেটা দেখা যাক। কিন্তু তুই সহযোগিতা করলে আমার …” কথা শেষ হল না ঘর কাঁপিয়ে ওর মোবাইল বেজে উঠল।
ও ফোন তুলে কয়েকবার হ্যাঁ না বলে কেটে দিল। বলল “ পুলিশ এখনও বাবার ডেথের ব্যাপারে কিছু বুঝতে পারছে না। “ আমি বললাম “জিনিসটা যে জটিল সেটা পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট থেকেই বোঝা যাচ্ছে। যাই হোক আমি এইবার আসি। তুই আমাকে জানাস যে কি করলে তোর সন্দেহ দূর হবে। আর যদি তোর মনে হয় যে তুই কোনও দিনও সন্দেহ দূর করতে পারবি না, তো আমি এখানেই ইতি টেনে দেব।” ও বলল “ বার বার ইতি টানার ভয় দেখাস না। বললাম না, তেমন কোনও প্রমান থাকলে তুই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার সামনে কথা বলতে পারতিস না। তোকে ভালোবাসি বলেই তোকে এত গুলো কথা বললাম।” আমি একটু হেসে ওর দিকে ফিরে ওর চোখে চোখ রেখে বললাম “একটা সত্যি কথা বলি? আমিও ভালোবাসি বলেই বলছি। “ ওর চোখে জল। বলল “বলে ফেল।” বললাম “ তুইও আমাকে বার বার ভয় দেখাস না যে তোর হাতে প্রমান থাকলে আমি এখানে এসে দাঁড়াতে পারতাম না । কোন প্রমান ঠিক আর কোন প্রমান ভুল সেটা নির্ধারণ করার তুই বা আমি কেউ নই। আমার বাবাকে ছেড়ে দে, আমি নিজে চাইলে যেখানে ইচ্ছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াতে পারি, আর যখন ইচ্ছে তখন দাঁড়াতে পারি। আজ অব্দি কেউ আটকাতে পারেনি, কালও পারবে না। আমার রাগ তুই এখনও দেখিসনি। এমন সিচুয়েশন ক্রিয়েট করিস না যে আমার মুখোশ খুলে গিয়ে আমার ভেতরের রাগ বাইরে বেরিয়ে পরে । সেই রুদ্ররূপ তুই বা তোদের এই সরকার হ্যান্ডেল করতে পারবে না। অ্যান্ড আই গ্যারান্টি দ্যাট।” হঠাত করে এরকম প্রতিক্রিয়া দেখে বড়লোক বাপের বিগ্রে যাওয়া মেয়েটা কেমন যেন ঘাবড়ে গেছে। ওর চোখের চাহুনিই জানান দিচ্ছে সেটা। আমি আর দাঁড়ালাম না। বেরিয়ে পড়লাম। দোলনের সাথে ভাঁট বকে আর কত সময় নষ্ট করা যায়। ঘড়িতে দেখলাম এখন বাজে ৪ টে। অনেকক্ষণ হয়েছে। অনেকগুলো কাজ আছে। বেরনোর আগে অবশ্য নিচে নেমে বেলা মুখার্জিকে হাত জোড় করে একটা নমস্কার করলাম। উনি দাঁড়িয়ে বললেন “ তোমার দেওয়া ছবিটা খুব সুন্দর হয়েছে। এখন সময় নেই। পরে একদিন বাড়িতে এসো। তোমার সাথে কথা বলা যাবে। আর গতকাল থানায় যা হয়েছে তার জন্য আমি সত্যিই খুব ল…” পিছন থেকে দোলনের কড়া আওয়াজ এলো “ লজ্জিত হওয়ার মতন কিছু নেই মম। এরকম কেসে জিজ্ঞাসাবাদ হয়েই থাকে। ও পুলিশের সাথে সব রকম সহযোগিতা করবে বলে আমাকে বলেছে। কি সংকেত? আমি ঠিক বলছি…তাই তো?” আমি ওর দিকে ফিরে বললাম “কোনও সন্দেহ আছে?” ও বলল “ একদম নেই। আগে সবার (কথাটা বেশ জোড় দিয়ে বলল) সহযোগিতায় সব কিছু ক্লিয়ার হোক। তারপর না হয় ও বাড়িতে এসে আমাদের সাথে গল্প করবে।” বললাম “বেশ তাই হোক।“ বেরিয়ে পড়লাম। রাকাকে সময় দিয়েছি ৫ টা। তার আগে দুটো কাজ সারতে হবে।
দোলনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সিতে চেপে বসেই একটা সিগারেট ধরালাম। একটা চিন্তা অনেকক্ষণ ধরেই মাথায় ঘোরা ফেরা করছে। শিখাদি কি এমন জানে যে সেটা থেকে ওর ধারণা যে এর মধ্যে আমি আছি, আর শুধুই আমি আছি! স্ট্রেঞ্জ। আরেকটা বড় সমস্যা হল, শিখাদি কি দোলনকে শুধু এই মার্ডারের ব্যাপারেই কথা বলার জন্য মেসেজ করেছিল, নাকি ও সেদিন আমি যে ওর অসহায়তার সুযোগ নিয়ে ওর শরীরটাকে ভোগ করেছি সেটাও দোলনের সামনে বলে দিতে চায়। একবার মনে হল যে শিখাদির জন্য মার্ডার ইত্যাদি সব ফালতু, ও শুধু চায় ওর রেপের গল্পটা দোলনের সামনে তুলে ধরে আমার ইমেজ খারাপ করতে। আর সেটা যদি করতে পারে তো পুলিশের হ্যাপাও পোহাতে হবে। চাপের ব্যাপার! কারণ রেপ ব্যাপারটা তো আর সাধারণ ব্যাপার নয়। পড়াশুনা ইত্যাদি সব মাথায় উঠবে, উল্টে যদি সত্যিই কিছু প্রমাণিত হয় তো আমাকে হাজতবাস করতে হবে। আর সেটা হলে বাবা মা যে কি ভাববে সেটা এখন বলে কাজ নেই। রেপের ব্যাপারটা নিয়ে আরেকটু পরেও ভাবলে চলবে, কিন্তু আপাতত, হঠাত করে কেন যে মার্ডারের ব্যাপারে এরকম বিশ্রী ভাবে জড়িয়ে পড়লাম সেটাই মাথায় ঢুকছে না। সেদিন ওদের সাথে পার্টিতে না গেলেই বোধহয় ভালো করতাম। ড্রাইভারের আওয়াজে চেতনা ফিরে এলো। গাড়ি থেকে নেমে সেই জেরক্সের দোকান থেকে কাগজগুলো কালেক্ট করে বাকি টাকা মিটিয়ে আবার ট্যাক্সিতে চেপে বসলাম। দ্বিতীয় কাজটা আর সারা হল না। একটা সিগন্যালে এসে প্রায় আধা ঘণ্টা গাড়ির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হল। গাড়ির বাইরে একজন পুলিশ দাঁড়িয়েছিল। তাকে হাত নেড়ে ডেকে তার সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। সেই আমাকে বলল যে কোনও এক ভি আই পি নাকি ক্রস করবে, তাই কারোর গাড়ি এগোতে দেওয়া হচ্ছে না। কে এই ভি আই পি ইত্যাদি নিয়ে এই পুলিশের সাথে আরও অনেকক্ষণ গ্যাজালাম। তবে ওর কাছ থেকে তেমন কোনও তথ্য পেলাম না। শুধু জানতে পারলাম যে রাজ্য সরকারের কোনও এক বিশেষ অতিথি। ওর বুকে লাগানো ব্যাচটা দেখে অবশ্য ওর নামটা আমার শুরুতেই জানা হয়ে গেছে। অফিসারের নাম “পুলক হালদার”।
গাড়ি ছাড়ার আগেই মার্ডারের প্রসঙ্গটা আবার ফিরে এলো মাথার ভেতর। তবে একটা জিনিস দোলনের সাথে কথা বলার সময়ই ঠিক করে ফেলেছিলাম। দোলন আমার জন্য এমন জরুরি কিছু নয় যে যার জন্য আমি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে ছিনিমিনি খেলব। দোলন যদি আমাকে চাপে রেখে মাথায় চড়ে বসার চেষ্টা করে বা আমাকে ডোমিনেট করার চেষ্টা করে তো কিছুটা সহ্য করতে হবে বইকি কারণ ওর শরীরটা বেশ ডাঁশা, কিন্তু লিমিট ক্রস করলেই ওকে মাথার ওপর থেকে নামিয়ে নর্দমায় ফেলে দিতে আমার বেশীক্ষণ লাগবে না। শিখা কি জানে সেটা শিখার সাথে দেখা করার আগে জানা যাবে না। কিন্তু একথা পরিষ্কার যে শিখা ওকে কিছু বলতে গিয়েও বলেনি। খুনের ব্যাপারটা ছেড়েই দিলাম। কারণ সেই ব্যাপার নিয়ে শিখার সন্দেহ নিয়ে ভেবে মাথা খারাপ করার কোনও মানে হয় না। তবে রেপের ব্যাপারটা তো ও দোলনকে বলে দিতে পারত। কিন্তু সেটাও ও দোলনকে বলেনি। আর সেই সাথে আমাকেও মেসেজ করে দেখা করতে বলেছে। শিখার ঘর দোর দেখে একটা জিনিস পরিষ্কার যে শিখার অবস্থা ভালো নয়। দীপক যত দিন বেঁচেছিল তত দিন হয়ত দীপকই শিখার ফুর্তির জন্য খরচ করত। কিন্তু এখন দীপক নেই। সুতরাং ওর অবস্থা এখন খুব টাইট। তাছাড়া শিখা মেয়েটা দোলনদের ভাষায় একটা রেন্ডি টাইপের মেয়ে। এটা যদি সত্যি হয় তো ওকে দীপক ভোগ করল না অন্য কেউ সেটা নিয়ে ওর সত্যিই কোনও মাথা ব্যথা থাকার কথা নয়। অবশ্য মাথা ব্যথা আছে কি না সেটা জানা নেই আপাতত। সেই ক্ষেত্রে নিজের হাত খরচা চালানর জন্য আর ফুর্তির খরচা ওঠানোর জন্য ও যে কোনও সহজ পন্থা অবলম্বন করার চেষ্টা করবে। ব্ল্যাক মেইল করবে আমাকে? মনে মনে না হেসে পারলাম না। তবে একটা ব্যাপার এখানে মেলানো যাচ্ছে না কিছুতেই। হোয়াই দোলন?
নাহ…।কিছুতেই মেলানো যাচ্ছে না…অবশ্য একটা সম্ভাবনা থাকতে পারে যে শিখা জানে যে এখন দোলন ওর পরিবারের শোকে ভেঙ্গে পরে ছে। এখন ও হাবি জাবি যা কিছু বলতে পারে আর দোলন সরল মনে ওর কথা বিশ্বাস করে নেবে। তার থেকেও বড় কথা হল দীপকের মৃত্যুর ব্যাপারেও যদি ওর আমার ওপর সন্দেহ হয়ে থাকে (যদিও আমি জানি না যে কেন) তাহলেও ও দোলনের মাথায় সন্দেহ ঢুকিয়ে প্রতিশোধ তোলার চেষ্টা করতে পারে। কারণ দোলনদের ক্ষমতা তো নেহাত কম নয়। তার সাথে রেপের ব্যাপারটা যোগ হলে তো নাথিং লাইক দ্যাট। সেটা হলে বলতে হবে যে শিখা এক মস্ত বড় খেলোয়াড়। দোলনদের ক্ষমতা ইউস করছে পরোক্ষ ভাবে, আর আমাকে মেসেজ করে ডেকে আমাকে ব্ল্যাক মেইল করে কিছু পয়সা হাতাবে। তবে গতকাল সকালে ওর মেইলে যা ঢুকেছে সেটা দেখার পরও ও এত সাহস পায় কি করে! শিখা ব্যাপারটা কেমন জানি মাথা ব্যথার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে মিনিটে মিনিটে। রাকার সাথে দেখার করার জন্য নির্দিষ্ট হওয়া গন্তব্য স্থলে পৌঁছে গেছি সময়ের আগেই। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম যে রাকা এখনও এসে পৌছায়নি। অগত্যা ট্যাক্সি ভাড়া মিটিয়ে সামনের একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বেঞ্চে বসে পড়লাম। আরেকটা সিগারেট ধরালাম। দোলনকে দোষ দিয়ে কি হবে! মাথায় সন্দেহ বা চিন্তা ঢুকলে সেটা যতক্ষণ না শলভ হচ্ছে ততক্ষণ মাথার ভেতরটা খচ খচ করে চলে। এখন আমারও সেই একই অবস্থা। হোয়াই দোলন? পাঁচটা বাজতে যখন ঠিক দুই কি তিন মিনিট বাকি এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। দেখলাম দোলন। ফোন তুলে খুব গম্ভীর গলায় বিরক্তির সাথে বললাম “ হ্যালো।” ও কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলল “সরি সোনা। তুই আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছিলিস। আমার তখন মাথার ঠিক ছিল না। আসলে নিচে বসে বসে লোকজন এমন সব কথা আলোচনা করছে যে তাতে মাথায় সন্দেহ আসতে বাধ্য। তবে তোর ওপর যে কেন বিনা কারণে সন্দেহ করতে গেলাম সেটা এখনও বুঝতে পারছি না। হতে পারে ওই শিখাই এর জন্য দায়ী। তবে তুই চলে যাওয়ার পর মনটা আরও খারাপ হয়ে গেছে। সোনা তুই কিন্তু আমার কথায় কিছু মনে করিস না। এরকম কোনও দিন তোর সাথে হলে বুঝতে পারবি যে এই সময় মাথার ঠিক থাকে না। কাকে কি বলছি সব সময় বুঝে উঠতে পারা যায় না। “ আমি চুপ করে শুনে যাচ্ছি। আমার চোখ চারপাশে রাকাকে খুজে চলেছে। শালা এই সব মেয়েদের কোনও সময় জ্ঞান নেই। ও থেমে বলল “ তুই চুপ করে আছিস? জানি তুই রাগ করেছিস। প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড। মুয়ায়ায়ায়ায়ায়াহ।” আমি নিরুত্তাপ ভাবে বললাম “আমি রাস্তায় আছি। রাকার সাথে দেখা করতে এসেছি।” ও একটু চমকে গিয়ে বলল “রাকার সাথে দেখা করছিস? কোথায়?” বললাম “ কফি শপ, ঢাকুরিয়া লেকের পাশে। তবে ও এখনও আসেনি।” একটু থেমে নিয়ে বলল “ কেন?” বললাম “ জানি না কেন। ও আমায় দেখা করতে বলেছে। যতদূর বুঝতে পেরেছি যে ও তোকে নিয়ে খুব চিন্তিত। গতকাল তোর কিছু কথা থেকে ওরও মনে হয়েছে যে তুই আমাকে সন্দেহ করছিস। তাই ও আমাকে ডেকেছে আমার সাথে কথা বলার জন্য। আমার মনে হল যে ও আমাদের প্রবলেম মিটিয়ে নিতে বলবে। সেই সাথে হয়ত এই ব্যাপারেও আমাকে কিছু জ্ঞান দেবে।” ও বলল “কোন ব্যাপারে?” বললাম “এই যা সব হচ্ছে চারপাশে। খুন, বদনাম ইত্যাদি।” দোলন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল “শালাটার সব ব্যাপারে বাড়াবাড়ি। ওকে কে বলেছে এত নাক গলাতে। মালটা সব ব্যাপারে এরকম ওস্তাদি ফলাতে যায় আর শেষে নিজে ফেঁসে যায়। মালটার ঘটে যে কবে ভগবান শুভ বুদ্ধি দেবেন সেটা কে জানে!” আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম “একটা কথা অনেকক্ষণ ভেবেও আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। পুলিশ আমাকে ডেকেছিল ফুটেজ দেখে সন্দেহ হয়েছিল বলে। কিন্তু তারপর তো ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এসে গেছে। অনেক কিছুই জানা গেছে। তারপরও কেন যে তোর আর শিখাদির মতন লোকজন আমাকে সন্দেহ করছে সেটা কিছুতেই আমার মগজে ঢুকছে না। তোদের সাথে আগের দিন পার্টি করতে যাওয়া ছাড়া আমার যে আর কি দোষ আছে সেটাই দেখতে পাচ্ছি না। “ শেষের কথাগুলো আমি ইচ্ছে করেই বেশ ঝাঁঝের সাথে বললাম। তারপর বিড়বিড় করে বললাম “ বাবা ঠিকই বলেছিল যে শহরের ছেলে মেয়েদের সাথে বাইরে বেশী ফুর্তি করতে যাওয়া মানে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা। ঘাট হয়েছে, এই বিপদ থেকে বেরোই একবার। আর তোদের সাথে আমি নেই এই সব ব্যাপারে।” ওর পরের বুঝতে পারলাম যে ও আমার গলার বিরক্তিটা বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছে। ও বলল “পুচু আবারও বলছি যে তখন কি বলতে কি বলেছি সেই নিয়ে কিছু মাইন্ড করিস না। আই লাভ ইউ। রাকা আর তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল? তবে রাকা একটা গাধা। ওকে বুঝিয়ে বলে দিস যে আমার ব্যাপারে চিন্তা করে আরও রোগা না হতে। তোরা শুধু কফি খাবি?” বললাম “ কফি শপে এখনও বিয়ার সাপ্লাই শুরু করেনি। নইলে এখন মদ খেতেই ইচ্ছে করছে।” ও বলল “ লেকের পাশেই একটা ভালো বার আছে। সেখানে গিয়ে মদ আর ডিনার করে নিতে পারিস। লাভ ইউ। আর শোন রাকা কে বলে দিস যে আমার আর তোর ব্যাপারে এত চিন্তা করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে ও বেশী বাড়াবাড়ি করলে পরে আমাদের ওকে বাঁচানোর জন্য ছুটতে হবে। তাই যেন একটু ঠাণ্ডা থাকে। এটা পুলিশের ব্যাপার। কাকু কে দেখে দেখে ও নিজেকে উকিল ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। “ বললাম “ঠিক আছে। বলে দেব। “ ও বলল “উফফ।। এত কাটাকাটা কথা বলছিস কেন? ছেলের অভিমান তো ভয়ানক। তুই সামনে থাকলে তোকে একশটা কিসি করে তোর সব রাগ ভাঙিয়ে দিতাম। “ বললাম “ আমি টু দি পয়েন্ট কথা বলছি। কাটাকাটা নয়। যাই হোক।” ও বলল “ ঠিক আছে, রাতে একবার কল করব। ফোন তুলিস। এখন রাখছি। লাভ ইউ ভেরি মাচ।” একটু হেসে “লাভ ইউ টু” বলে আমিও কলটা কেটে দিলাম।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment