মুখোশ – The Mask [৩৫]

লেখকঃ Daily Passenger

৩৫
সবার মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। ম্যাডামও একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। উত্তর আসতে বেশী দেরী হল না। আর উত্তরটা এলো বজ্র কঠিন শব্দে। “সকাল সাড়ে ছটায়। কিন্তু অনেক সময় আপাত ভাবে যেটাকে ঠিক বলে মনে হয় সেটা আসলে ঠিক হয় না। আসল সত্যি হয়ত অন্য কিছু। কিন্তু আমাদের চোখের ওপর এমন একটা পর্দা ফেলে দেওয়া হয় যে ভুলটাকেই আমরা ঠিক বলে ধরে নি। তাই আবারও জিজ্ঞেস করছি ১৫ই আগস্ট আপনি কোথায় ছিলেন? “ এইবার আমারও উত্তরটা এলো ইস্পাতের মতন ঠাণ্ডা স্বরে।
“ ম্যাম আপনি কি কিছু বলবেন? সেদিনের আপনার রোগা হওয়ার রিসোলিউশনের ব্যাপারে?” ম্যাডাম এইবার নড়েচড়ে বসলেন। উনি বললেন “অর্জুন তোমার সন্দেহ নিরাধার। সেদিন ভোরবেলায় আমি সংকেতকে জাগিয়ে বলি আমার সাথে মর্নিং ওয়াকে যেতে। ও রাজি হয়। আমরা…” বাকি কথাটা আর ওনাকে শেষ করতে দিলাম না। বললাম “ স্যার। ওই অভিজ্ঞতা আমার কাছে ট্রমা। উনি আমাকে রোগা হওয়ার জন্য মর্নিং ওয়াকে নিয়ে গেলেন। কিন্তু স্বাধীনতা দিবসের জন্য চারপাশে যে সাজগোজ হচ্ছে সেটা দেখে উনি মর্নিং ওয়াক ছেড়ে সেলফি তে মননিবেশ করলেন। সেলফির পিছনে অধিকাংশ সময় নষ্ট করেছেন। এখানে সেলফি ওখানে সেলফি, এই স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি, ওই স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি। বাই দা অয়ে একটা স্কুলে দিদি ট্রেস পাসিং করতে যাচ্ছিলেন। না আটকালে বিপদ হত। শেষে পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে সেলফি। আরে সেলফি তুললে বাড়িতে তুলুন, মর্নিং ওয়াক ইজ নট দা প্লেস ফর দ্যাট। “ সব কথা শোনার পর উনি শান্ত ভাবে শুধু একটাই কথা বললেন “ এনি প্রুফ অফ দোজ সেলফিস?” ম্যাম বললেন “সব কটা তৎক্ষণাৎ ফেসবুকে আপলোড করেছি। একটা নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। যা দেখেছি যা তুলেছি সব পোষ্ট করেছি। ফেসবুকে পাবে।” উনি কথা বন্ধ করে সামনে রাখা ল্যাপটপটা অন করলেন। পাঁচ মিনিট সব চুপ। কি দেখলেন উনিই জানেন। সব কিছু দেখে শুনে আবার প্রশ্ন করলেন “ ১৫ইআগস্টে ফিরে আসা যাক।” ম্যাডাম বললেন “ ওই দিন কি এমন হয়েছে? ওই মেয়েটা যেদিন মারা গেছে সেই সময় ও যে মেয়েটার বাড়িতে ছিল না সেটা তো গোটা দুনিয়া এতক্ষনে আমার ফেসবুক পোষ্টে দেখে ফেলেছে। তুমি ১৫ই আগস্ট নিয়ে এত মাতামাতি করছ কেন?” উনি ঠাণ্ডা গলায় বললেন “ অ্যালিবাই ভালো। কিন্তু অনেক সময় অ্যালিবাইও কাজে লাগে না মিস্টার রায়। শেষ বারের মতন জিজ্ঞেস করছি ১৫ই আগস্ট কোথায় ছিলেন?”
আমি বললাম “ ১৫ইআগস্ট আপনাকে গাড়ি ধরিয়ে দিয়ে আমি জল ভেঙ্গে অন্য দিকে গিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরি। দোলনের বাড়ি যাই। সেখানে সন্দীপদা, শঙ্খদা, রাকা… আরও অনেকে ছিল। আমরা সবাই বাজার করেছি। অনেক জিনিস জোগাড় করার ব্যাপার ছিল। সব করেছি। বাড়ি ভর্তি লোক জানে যে সেদিন আমি ওই বাড়িতে ছিলাম। এইবার আপনি বলবেন যে কেন এই একই প্রশ্ন বারবার করছেন?” উনি আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন “করছি কারণ ওই মহিলাদের মতামত অনুযায়ী তুমি সেদিন বিকাল থেকে ওই বাড়িতে ছিলে। আর ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং সংকেত, যে সময় তুমি আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে বিদায় নিলে, ওখান থেকে শিখার বাড়ি যত দূরে, আর যখন ওনাদের বয়ান অনুযায়ী তুমি ওই বাড়িতে পৌছালে, সব কটা জিনিস কিন্তু খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। তুমি বলছ সবাই তোমাকে দোলনের মুখার্জির বাড়িতে দেখেছে?” ঘরের মধ্যে তিন চারজন বলে উঠল “আমরা সবাই ওখানে ছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে এক সাথে বাজার হাট করেছি। বৃষ্টির জন্য জল জমে যাওয়ায় আমাদের অনেক বেশী সময় লেগেছিল সেদিন। “ রাকা বলল “আমিও ছিলাম। আনটি, মানে দোলনের মা, আমাদের সবাইকে খেয়ে যেতে বলেছিলেন, আমরা বাকিরা ওখানে খেলেও সংকেত অনেক দূরে ফিরবে বলে না খেয়েই বেরিয়ে পড়ে। “
উনি সরাসরি সঞ্চিতা ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন “সংকেত বাড়ি ফিরল কখন?” ম্যাডাম একটু চিন্তা করে বললেন “ সাড়ে দশটার একটু আগে। বা ওরকম সময়। আমার ডিনার হয়ে গেছিল। ওর জন্য খাবার বার করতে হয়েছিল। কিন্তু একটু আগেই ফ্রিজে ঢুকিয়েছিলাম বলে খাবার আর নতুন করে গরম করতে হয়নি। “ উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “ কটায় তুমি বাড়ি ফিরলে?” আমি বললাম “ ঠিক ১০ টা বেজে ২৮ মিনিটে। লেট হয়ে গেছে জানতাম। ম্যাডাম বকতে পারেন সেটাও জানতাম। তাই আগে থেকে ঘড়ি দেখে অজুহাত রেডি করার চেষ্টা করছিলাম। যাই হোক সেই অজুহাত দেওয়ার দরকার পড়েনি।” উনি হেসেবললেন “পারফেক্ট অ্যালিবাই। এখন তোমরা সবাই যেতে পারো। কিন্তু…” আমি বললাম “ একটা ব্যাপারে আমি আপনাদের আগ বাড়িয়ে হেল্প করতে পারি।” উনি ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করলেন “কিভাবে?”
বললাম “ আপনি একটু আগেই বলেছেন যে শিখাদির শরীরের ভেতরে…মানে স্পার্ম পাওয়া গেছে। এই কথা ঠিক যে আমিও একজন সুস্থ স্বাভাবিক ছেলে। আপনি চাইলে স্পার্ম টেস্ট করে দেখতে পারেন।” উনি ভুরু জোড়া আরও উপরে তুলে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন “ দেশ আইন আদালত আছে ভাই। এইসব টেস্ট এমনি এমনি হয় না। আজ আপনার জন্য এই টেস্ট করব আর তারপর আপনি কোর্টে গিয়ে বলবেন যে আমরা জোর করে এইসব টেস্ট আপনাকে দিয়ে করিয়েছি! অ্যালিবাই যেমন প্রবল, আইডিয়াও তেমনই প্রবল।” বললাম “ লিখিত রূপে দিচ্ছি। এতে আমার পড়াশুনার ক্ষতি হচ্ছে। তাই আমি এই নিয়ে নিজেই জোর করছি। আমি আবার বলছি যে যে-কোনও শারীরিক টেস্ট করে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলা হোক।” উনি কি একটা ভেবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দুঁদে অফিসার কে ডেকে বললেন “ উকিলের সাথে কথা বল। সিবিআই বোধহয় দেখবে। তাড়াতাড়ি কথা বলে ফেলো। আমাকে জানাও। স্বেচ্ছায় কেউ হেল্প করতে এলে কি প্রসিডিওর?”
এইবার আমি বললাম “স্যার একটা কথা কিন্তু এখনও বললেন না। এমনি জানতে ইচ্ছে করছে বলে বলছি।” উনি একটু হেসেবললেন “কি জানতে চাও বলো। “ বললাম “স্যার ব্যাপারটা ঠিক হজম করা যাচ্ছে না। শিখাদির মতন একজনের মার্ডারের জন্য আপনি মাথার চুল ছিঁড়ে মরছেন? ভেতরের ব্যাপারটা কি একটু খুলে বলবেন?” উনি হেসেবললেন “ ঠিকই ধরেছ। ব্যাপারটা শিখার মার্ডার কেস নয়। আরও অনেক বেশী সিরিয়াস। তবে আমি শুরু করলাম ওইখান থেকে যেটা তোমাদের সবার জানা। বুঝতে পারলে? পরে আরও অনেক প্রশ্ন আসবে। গেট রেডি ফর দ্যাট।” এরপর আর কোনও কথা হয় না। এখন অপেক্ষা করতে হবে সবাইকে বসে বসে। আমি একবার ওনার অনুমতি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। সিগারেট খাওয়া খুব দরকার। আমরা সবাই এখন খুব স্বাভাবিক ভাবে গোটা পুলিশ স্টেশনের ভেতর ঘোরাঘুরি করছি। অর্জুন বেরার অতিথি এখন আমরা। ম্যাডাম অবশ্য স্যারের সাথে ঘরের ভেতরেই রয়ে গেলেন।
রাকাও বেরিয়ে এলো আমার সাথে। আমাকে বলল “ তুই কিন্তু এটা বাড়াবাড়ি করছিস। এই টেস্ট ওরা করাতে পারে না। আমি বাপী কে এক্ষুনি কল করছি।” আমি বললাম “আমরা বিয়ে করে এক হব। তার আগে অনেক পড়াশুনা করতে হবে আমাকে। এরকম মাইন্ড নিয়ে শান্তিতে পড়াশুনা করা যায় না। আমাকে দাঁড়াতেই হবে। আমি ভয় পাইনা। কারণ আমি কিছু করিনি। একটা এস্পার অস্পার হওয়া দরকার। ওদের বোঝা উচিৎ যে আমাকে জাস্ট স্কেপ গোট হিসেবে ব্যবহার করছে। সব বুঝতে পারছি, কিন্তু শুধু দুটো জিনিস মাথায় ঢুকল না। এক, কে আমাকে স্কেপ গোট বানাতে চাইছে। দুই। আমার ছবির ডেসক্রিপশন দিতে ওই মহিলা দের কে বলেছে?” আমি নিরবে ধূমপান করে চললাম আর রাকা চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ পাতাল ভেবে চলল। সব শেষে বললাম “নাহ। এইবার মনে হচ্ছে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সুবীর রায় কে একটা কল না করলেই নয়। আরও অনেক ব্যাপার হয়ে গেছে এর মধ্যে যেটা তুই জানিস না। “ ও বলল “ কি হয়েছে?”
বললাম “তোর মা আর বেলা আনটি আমাকে কল করে থ্রেট করেছেন। ওনারা তখন ভীষণ ড্রাঙ্ক ছিলেন। ওনাদের সাথে তখন কথা বলার কোনও মানে হত না। তবে এইবার একটু কোলকাতা কে বোঝানোর সময় এসেছে যে সংকেত রায় কে। টু হেল উইথ সান্যাল অ্যান্ড মুখার্জি অ্যান্ড বেরা।” রাকা চমকে উঠে আমার একটা হাত ধরে নিয়ে বলল “এত বড় কথা তুই বলতে পারলি? আমি তোর কেউ নই?” বললাম “সেটা কখন বললাম?” বলল “ এই তো বললি। টু হেল উইথ সান্যাল।” আমি ওর পিঠ চাপড়ে বললাম “ সরি। না ভেবে কথাটা বলে ফেলেছি। ঠিক ভাবে বলতে গেলে টু হেল উইথ সুধা সান্যাল। কি? এইবার ঠিক আছে?” ও আমার দিকে তাকিয়ে হেসেবলল “টু হেল উইথ সুধা অ্যান্ড অবিনাশ সান্যাল। বাট রাকা ইস গুড।” বললাম “ সে আর বলতে। কাল যে মেয়ে আমার মাথার ওপর বসবে তাকে চটানোর সাহস আমার আছে?” দুজনেই ভেতরে ঢুকে গেলাম। সত্যি এইবার কল করার সময় এসেছে। তবে সুবীর রায়কে নয়। অন্য কাউকে। কিন্তু এখন এই অবস্থায় করা ঠিক হবে না। বাইরে বেরিয়ে সিগারেট খাওয়ার সময় অবশ্য লক্ষ্য করেছি যে উকিল বাবু তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে একই জায়গায় অপেক্ষা করে আছেন। পরিস্থিতি বিগড়ালেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন পুরো টিম নিয়ে। এই না হলে চাকর!
ঘরে ঢুকে দেখলাম ম্যাডাম থমথমে মুখ নিয়ে বসে আছেন। স্যার বললেন “আমি আবারও বলছি আদালতের আদেশ ছাড়া এইসব জিনিস আমরা করাই না। মানে এই সব টেস্ট। অনেক সময় আদালত এইসব টেস্ট করার অনুমতিও দেয় না। কিন্তু আপনার মতামত থাকলে একটা ফর্ম আপনাকে ফিল আপ করতে হবে। পড়ে দেখে ফিল আপ করবেন। হয়ত কেমিক্যাল টেস্টের দরকার নাও হতে পারে। এই সব ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপে আমরা এগোই। আমরা সিবিয়াইয়ের উকিল কে আসতে বলেছি। এসে পৌছাবেন এক্ষুনি। আবারও বলছি আপনি আপনার উকিলের পরামর্শ নিতে পারেন। “ আমি বললাম “ মানে একটা নয় অনেকগুলো টেস্ট হবে?” উনি বললেন “সংকেত, শুনুন, প্লীজ। অন্যভাবে নেবেন না। আমি চাই না আপনার সাংবিধানিক অধিকার কোনও ভাবে খণ্ডন করা হোক। একটা প্রভিশন আছে যেখানে আপনার ইচ্ছেতে আমরা তদন্তের খাতিরে এইসব টেস্ট করে ফেলতে পারি। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। আমি নিজে মন থেকে মেনে নিতে পারছি না গোটা ব্যাপারটা। তাই এই সব ক্ষেত্রে আগে কিছু প্রাথমিক টেস্ট করে দেখা হয় কেমিক্যাল টেস্টের আগে। সেই টেস্টের বা টেস্টগুলোর রেজাল্ট দেখে আপনি তখনই বলতে পারেন যে আমি এর পর আর এক ধাপও এগোতে চাই না। আমরা তখনই থেমে যাব। আপনি একটাও টেস্ট না করাতে পারেন। কিন্তু এগোতে হবে ধাপে ধাপে যাতে আপনি আপনার সাংবিধানিক অধিকার পূর্ণ রূপে প্রয়োগ করতে পারেন। যেকোনো সময় আপনি আপনার উকিলের পরামর্শ নিতে পারেন। যে কোনও সময়ে আপনি নেক্সট টেস্ট দিতে অস্বীকার করতে পারেন। আর যেকোনো সময়ে আপনি উঠে বেরিয়ে যেতে পারেন। তবে হ্যাঁ, আপনার যদি কোনও কারণে মনে হয় যে আপনি মানসিক বা শারীরিক ভাবে সুস্থ নন আমরা তৎক্ষণাৎ সব কিছু বন্ধ করে দেব। আমি কি সব কিছু ক্লিয়ারলি বোঝাতে পেরেছি?”
এর থেকে পরিষ্কার করে হয়ত আমার বাবাও কিছু বোঝাতে পারতেন না। আমি বললাম “বুঝতে পেরেছি। আপনারা নিচ থেকে একটা একটা করে ধাপ উঠতে চাইছেন। যদি দরকার পড়ে তবেই পরের ব্যাপারটা করবেন। অর্থাৎ পরের পরীক্ষাটা। আর আমারও অধিকার আছে যে আমি যেকোনো মুহূর্তে উকিলি পরামর্শ নিতে পারি। অথবা পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে বিরধিতা করতে পারি। আর সেই ক্ষেত্রে আপনারা আমার মতামত মেনে নেবেন। শরীর বা মনে কোনও রকম অস্বস্তি থাকলে আপনারা আর প্রসিড করবেন না। রাইট?’ উনি বললেন “ঠিক বুঝেছেন।” আমি হেসেবললাম “একটা জিনিস বলে দিন। ধরুন যদি এমন কেউ আপনার সামনে বসে থাকে যে কোনও উকিল কে চেনে না। তাহলে সেক্ষেত্রে তার উকিলি পরামর্শ কে দেবে?” উনি বললেন “সেক্ষেত্রে যতক্ষণ না উকিলের বন্দবস্ত করা যায় ততক্ষণ আমরা নেক্সট স্টেপ নেব না। আপনার উকিলের বন্দবস্ত করার দায়িত্ব সরকারের। এই ক্ষেত্রে আমার। তবে আপাতত আমি বিশ্বাস করাতে চাই এই বলে যে আপনার স্বার্থ যাতে সব দিকে থেকে রক্ষা হয় সেটা দেখার দায়িত্ব আমার।” আমি বললাম “আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। আমার শরীর খারাপ লাগলে আমি তখনই আপনাকে জানিয়ে দেব। মন খারাপ এমনি এমনি হয় না। হেহে।” রাকা বলল “ তেমন হলে আমি বাপী মানে মিস্টার অবিনাশ সান্যাল কে বলব ওর কেস নিতে।” বললাম “তার দরকার হবে বলে মনে হয় না।”
খেলা জমে গেছে। বিকেল পাঁচটা। একজন উকিল এসে হাজির হলেন। মধ্য বয়সী লোক। উনি মিস্টার বেরার সাথে কিসব কথা বার্তা বললেন ফিসফিস করে। এরপর একটা ফর্ম নিয়ে এসে আমাকে ধরিয়ে দিলেন। বললেন “প্লীজ রিড ইট। অ্যান্ড রিড ইট কেয়ারফুলি। “ ফর্মে যা লেখা আছে সেগুলো মিস্টার বেরা ইতিমধ্যে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবুও আরেকবার অন্য ভাবে জানিয়ে রাখি। এই জিনিসগুলো খুব ক্যাটেগরিকালি লেখা আছেঃ
১। গোটা জিনিসটায় যে আমার মত আছে সেটা কতৃপক্ষ নিজের মতন রেকর্ড করবে। আমি ভবিষ্যতে কখনও কতৃপক্ষ কে এই নিয়ে আইনি খেসারত দিতে বলতে পারব না।
২। যে কোনও সময়ে আমি যে কোনও টেস্ট করাতে বিরধিতা করতে পারি।
৩। কতৃপক্ষ তদন্তের যেকোনো সময়ে আমাকে উকিলি সাহায্য দিতে দায়বদ্ধ। কতৃপক্ষ হিসাবে সাইন করছেন……
৪। আমাকে কোনও রকম জোরাজুরি করা হচ্ছে না।
৫। আমাকে সব কিছু বুঝিয়ে বলার পর আমি এইসব জিনিসে হ্যাঁ বলেছি।
৬। আমি জানি যে আদালত বহির্ভূত ভাবে এইসব জিনিস করানো অসাংবিধানিক। তবুও আমি স্বেচ্ছায় দেশ এবং তদন্তের স্বার্থে নিজের সম্মতি দিয়েছি। আমার স্বার্থ যদি কিছু থাকে তো “বেস্ট নোন টু মি।”
৭। আমার শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা পূর্ণ রূপে সুস্থ। নিচে লেখা যে কোনও টেস্ট চলা কালীন বা টেস্টের পরে আমি শারীরিক বা মানসিক রূপে দুর্বল হয়ে পড়লে আনকন্ডিশানালি ওয়াক আউট করতে পারি। সেক্ষেত্রে কতৃপক্ষ আমাকে মেডিক্যাল সাপোর্ট দিতে দায়বদ্ধ।
৮। কোনও কিছু পড়ে না বুঝতে পারলে তৎক্ষণাৎ আমি কতৃপক্ষ কে বলতে পারি। আমার সন্দেহ নিবারন করার দায়িত্ব ওদের।



এরকম আরও অনেক কিছু ইনিয়ে বিনিয়ে লেখা আছে। এখানে সেই সব লিখে পাতা ভরানো অবান্তর। তবে কয়েকটা জিনিস লেখা আছে যেগুলো না লিখলেই নয়।
১। টেস্টের রেজালট কোর্টে দেওয়া হবে কি হবে না সেই ব্যাপার দুই পক্ষ মিলে ডিসিশন নিয়ে ঠিক করবে। কোনও এক পক্ষের না থাকলে সেই তথ্য কোর্টে পেশ করা হবে না। কোনও পক্ষ এই নিয়ে অন্য পক্ষের বিরোধিতা করতে চাইলে কোর্টে তার অ্যাপিল করতে পারেন।
২। কতৃপক্ষ নিজের অধিকারে এই ব্যক্তি বিশেষকে পরে রাজ সাক্ষী হিসাবে কোর্টে দাখিল করতে পারেন। কিন্তু কতৃপক্ষ এই ব্যাপারে কোনও ভাবে দায়বদ্ধ নন। অর্থাৎ আমাকে কতৃপক্ষ কোনও রকম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না যে আমাকে তারা পরে রাজ সাক্ষী করবেন।
৩। আমাকে আমার নিজের মতামত লিখিত রূপে দিতে হবে। আমার মতামত খোলা ভাষায় লিখে জানাতে হবে যেটা পরে কোর্টে প্রয়োজন মতন দাখিল করা যেতে পারে। আমি এই মতামত থেকে পরে পিছতে পারব না। এই যুক্তি মেনে নেওয়ার আগে উকিলি পরামর্শ নেওয়া দরকার। আমার সেই অধিকার আছে।
৪। কোনও বিষয়ে আমার স্বার্থ দেখা হচ্ছে না মনে হলে আমি তৎক্ষণাৎ পুরো ব্যাপারটায় যবনিকা টেনে দিতে পারি। সেক্ষেত্রে আমার অধিকার আছে এই যে আমি এর আগে হওয়া সব কটা টেস্টের রিপোর্ট নিজের সজ্ঞানে বাতিল করে দিতে পারি। আমি আমার নিজের ইচ্ছেতে সরকার আর দেশের জন্য এগিয়ে এসেছি, সুতরাং আমার সাংবিধানিক অধিকার খণ্ডিত হচ্ছে দেখলে আমি আগের সব টেস্টের রিপোর্ট আংশিক বা পুরোপুরি বাতিল করে দিতে পারি।
৫। টেস্ট করা হচ্ছে তদন্তের স্বার্থে। আমার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার জন্য নয়। যদি কোনও টেস্টের রেজাল্ট সম্পূর্ণ ভাবে বা আংশিক ভাবে আমি অ্যাকসেপ্ট করি তাহলে সেটা আমাকে সাইন করে অ্যাকসেপ্ট করতে হবে। সেটা কোর্টে দাখিল যোগ্য এভিডেন্স। আমার অধিকার আছে সাইন না করার। কোথাও সাইন করার আগে দরকার মতন আমি উকিলি পরামর্শ নিতে পারি। কতৃপক্ষ এই ব্যাপারে দায়বদ্ধ।
সবটা পড়তে আমার ১ মিনিটও লাগেনি। রাকা, সঞ্চিতা ম্যাডাম আর অনেকে আমার ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে সেই কাগজে কি লেখা আছে পড়ে নিল। রাকা বলল “ শোন। তুই এটাতে সাইন করবি না। আমি বাপির সাথে কথা বলব। তারপর ও যা বলবে সেই মতন কর। এইগুলো তুই বুঝবি না। “ আমি ততক্ষণে ফর্মটা ফেরত দিয়ে দিয়েছি। ও আমাকে বলল “ পুরোটা পড়লি না?” রাকাকে বললাম “ তিন পাতার লেখা পড়তে কতক্ষণ লাগে? হয়ে গেছে পড়া। যা বোঝার বুঝে গেছি। আমি আমার ক্যারিয়ার বাঁচাতে চাই। “ ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে বললাম “ চিন্তা করবেন না। নির্দোষ লোক কে কেউ …” ওনাদের দুজন কে দেখেই মনে হচ্ছে যে ওনারা পুরো ঘেঁটে গেছেন। রাকা বলল “অফিসার আমি একবার পুরো জিনিসটা পড়ে দেখতে চাই। “ কালো কোর্ট পরা উকিল বললেন “আমি অফিসার নই। আমি উকিল। তবে এটা আপনাদের পড়ার জন্য নয়। যার পড়ার তিনি পড়েছেন। এইবার তার মতামত আমি শুনব।” রাকা বলল “আমি তো কিছু ঠিক করে পড়তে পারিনি। “ আমি বললাম “ তিন পাতা পড়তে কতক্ষণ লাগে? বললাম না? সব কিছু পড়ে ফেলেছি। বুঝে ফেলেছি। আমি রেডি।” শেষ কথাটা বললাম উকিলের দিকে তাকিয়ে। আমার সামনে ভিডিও ক্যামেরা লাগিয়ে রাখা আছে। উনি বললেন “ পুলিশ বা কতৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করার আগে আমি ফর রেকর্ড কয়েকটা প্রশ্ন তোমাকে করতে চাই। তুমি রেডি?”
আমিঃ হ্যাঁ।
উঃ তুমি সুস্থ?
আমিঃ হ্যাঁ।
উঃ মানসিক ভাবে?
আমিঃ হ্যাঁ
উঃ তুমি আইনি সাহায্য নিতে চাও।
আমিঃ এই অবস্থায় না।
উঃ আগে তুমি তোমার মতামত লিখবে। কথায়। তারপর বাকি জায়গাগুলোয় সাইন করবে। ইচ্ছে না হলে করবে না।
আমিঃ পুরোটা এক বারেই ভরে দিচ্ছি।
ফর্ম ফিল আপ হয়ে গেল। কি লিখেছি সেটা বলার কোনও মানে হয় না। কারণ আগে যা বলেছি, অর্থাৎ আমার ক্যারিয়ার আর পড়াশুনার স্বার্থে আমার মানসিক শান্তি চাই। তাই হয় এস্পার নয় অস্পার। আমাকে কেউ কোনও রকম প্রেসার দেয়নি। বাকি যেখানে যেখানে সাইন করতে হবে করে দিলাম। অর্জুন বাবু বাকি জায়গা গুলোতে কতৃপক্ষ হিসাবে সাইন করে দিলেন। যুদ্ধ শুরু হবে এইবার।
নিচের টেস্টগুলোর ব্যাপারে আলাদা ভাবে বলার কিছু নেই। একে একে সব ব্যাপারে বলব।
লাকিলি সব কটা টেস্ট আমার ওপর করার দরকার পড়েনি। প্রথম টেস্ট সাইকোলজিকাল। তার আগে অবশ্য একজন ডাক্তার এসে আমার হাইট ওয়েট প্রেসার ইত্যাদি সব মেপে নিয়ে লিখে দিলেন যে আমি সুস্থ। মানসিক ভাবে সুস্থ কিনা সেটা লেখার দায়িত্ব পরের লোকের। সরি মহিলার। একজন মধ্য বয়সী মহিলা আমার সামনে বসে বললেন “হ্যালো।” বললাম “কি চাই?” উনি কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে পড়লেন। রিপোর্টে কি লিখলেন সেটা এখনও জানি না। কিন্তু উনি চলে যাওয়ার পর আমি বললাম “কি লিখলেন সেটা দেখার অধিকার আমার আছে। রাইট?” ফর্মটা বাড়িয়ে দেওয়া হল। লেখা আছে “ব্যক্তিটি (সাবজেক্ট) ভীষণ সাহসী আর মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ। কথা বলার দরকার পড়েনি কারণ ওনার বডি ল্যাঙ্গোয়েজ থেকে সেটা স্পষ্ট। উনি নিজের ব্যক্তিগত মতামত জানাতে পারেন। খুব সতর্ক চোখ। চোখের ভাষা পড়া গেল না।”
পরের পরীক্ষা লাই ডিটেক্টর। আমাকে জিজ্ঞেস করা হল আপনি এই জন্য প্রস্তুত? বললাম “হ্যাঁ।” অর্জুন বেরা নিজে আমার সামনে বসেছেন। বললেন “সবার সামনেই দুধ কা দুধ পানি কা পানি হয়ে যাক? নাকি অন্য ঘরে গিয়ে।” বললাম “ হয়ে যাক। আমি ভয় পাই না।” উনি বললেন “আরেকবার প্রেসারটা চেক করে নেওয়া দরকার। রেডি?” বললাম “ইয়েস।” উনি বললেন “পুরো ব্যাপারটা রেকর্ড করা হবে। কোনও আপত্তি থাকলে এখনই বলতে হবে। এরপর রেজাল্ট অগ্রাহ্য করা যেতে পারে কিন্তু রেকর্ডটা ভ্যালিড পুলিশ রেকর্ড। কোর্টে না দেখালেও আমাদের স্বার্থে এটা খুব জরুরি।” বললাম “কিচ্ছু দরকার নেই। শুরু করুন।” আরেকবার প্রেসার মাপা হল। সব কিছু নর্মাল। সারা গায়ে অদ্ভুত সব জিনিস পরিয়ে দেওয়া হল। কিছু জিনিস জেল মাখিয়ে গায়ের সাথে সেঁটে দেওয়া হল। তারপর আবার জিজ্ঞেস করা হল আমি স্বাভাবিক ফিল করছি কি না। আমি হ্যাঁ বলাতে আসল খেলা শুরু হল। অবশ্য এটা আমাকে জানিয়ে দেওয়া হল যে আমার অধিকার আছে এই ব্যাপারে যে কোনও প্রশ্নের উত্তর আমি নাও দিতে পারি।
অঃ আপনার নাম?
সঃ সংকেত।
অঃ পুরো নাম।
সঃ সংকেত রায়।
অঃ বাড়ি?
সঃ (ঠিকানা বললাম)
অঃ বাড়িতে কে কে আছে?
সঃ বাবা, মা, এক কাকা, কাকিমা, বোন, দিদা, দাদু।
অঃ এখানে এসেছ কেন?
সঃ ইঞ্জিনিয়ার হতে।
অঃ সুবীর বাবু কি করেন?
সঃ সমাজসেবী। অন্য কিছু করলে জানা নেই।
অঃ তুমি আজ অব্দি কাউকে প্রত্যক্ষ ভাবে খুন করেছ?
সঃ নেভার।
(এইবার প্রশ্নের স্পীড বাড়তে শুরু করে দিয়েছে। আমাকে অবশ্য কোনও রকম তাড়া দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমি প্রশ্নের প্রায় সাথে সাথেই উত্তর দিয়ে গেলাম)
অঃ এখানে তোমার সবথেকে বড় শত্রু কে?
সঃ দীপক। সে আর বেঁচে নেই।
অঃ ও কেন?
সঃ র্যাগিনের সময় ওর ঘরে নিয়ে গিয়ে এমন জোরে মেরেছিল যে বাইরে থেকে সবাই সেটা শুনতে পেয়েছিল। আর ওর গার্লফ্রেন্ড শিখাদি আমাকে ক্লাসের মাঝে সবার সামনে থাপ্পড় মেরেছিল।
অঃ শিখার ওপরও তাহলে তোমার রাগ আছে।
সঃ আছে।
অঃ খুন করার কথা কোনও দিন মাথায় আসেনি?
সঃ না।
অঃ প্রতিশোধ নেওয়ার কথা?
সঃ হ্যাঁ।
অঃ কিভাবে নিতে প্রতিশোধ?
সঃ জানি না।
অঃ তুমি কোনও দিন শিখার সাথে সহবাস করেছ?
সঃ না।
অঃ শিখার খুনের ব্যাপারে কিছু বলতে পারো।
সঃ জানি না।
অঃ কোলকাতায় এসে কারোর প্রেমে পড়েছ?
সঃ হ্যাঁ।
অঃ কে?
সঃ বলতে বাধ্য নই।
অঃ সে কি এই খুনের ব্যাপারে যুক্ত?
সঃ জ্ঞানত না। আমি জানি না।
অঃ রঞ্জন বাবুর ব্যাপারে কি জানো?
সঃ বিশাল বড় একজন সাইন্টিস্ট।
অঃ আর?
সঃ আমি ওনার মতন হতে চাই। বড় সাইন্টিস্ট।
অঃ আর?
সঃ ওনার মেয়ে আছে যে আমার ক্লাসমেট। আর কিছু জানি না।
অঃ সঞ্চিতার ব্যাপারে তোমার কি মতামত?
সঃ উনি আমাদের শিক্ষিকা।
অঃ উনি কেমন রান্না করেন?
সঃ খুব খারাপ। নুন থাকে না রান্নায়। (ঘরের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন শোনা গেল। অর্জুন বাবু একটু ঠোঁট টিপে হেসেসঞ্চিতা ম্যাডামের দিকে তাকালেন। হাত তুলে সবাইকে চুপ করতে ইশারা করে আবার শুরু করলেন।)
অঃ তুমি রঞ্জন বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে কোনও ভাবে জড়িত নও?
সঃ না।
অঃ এখানে এসে কোথায় উঠেছিলে?
সঃ …
অঃ তুমি তো বলেছিলে যে তুমি ধর্মশালায় উঠেছ।
সঃ মিথ্যা বলেছিলাম।
অঃ কেন?
সঃ আমাদের টাকা নেই। কিন্তু বাবা জোর করে ভালো জায়গায় রাখতে চায়। হোটেলের নাম শুনলে সবাই পালিয়ে যাবে। শস্তায় থাকার জায়গা কেউ দেবে না। তাই আমি …
(ওনার ভুরু কুঁচকে গেল। কি একটা ভেবে নিয়ে বললেন)
অঃকত নম্বর রুমে ছিলে?
সঃ১০৭।
অঃ রাজেন মেহেরা বলে কাউকে চেন?
সঃ না।
অঃ ভেবে বল।
সঃ না।
অঃ আবার জিজ্ঞেস করছি রাজেন মেহেরা বলে কাউকে চেন?
সঃ না।
অঃ রাজেন নামটা চেনা চেনা মনে হয়?
সঃ না।
অঃ ডিফেন্স মিনিস্ট্রির কাউকে চেন?
সঃ না।
অঃ কোনও গবেষণা নিয়ে জানো?
সঃ কিসের?
অঃ অয়েপন রিলেটেড?
সঃ না।
অঃ কি নিয়ে রিসার্চ করতে চাও।
সঃ এখনও জানি না।



এরকম অনেক প্রশ্ন হল। পরে দু একটা ব্যাপার বলতেই হবে। কিন্তু এখন আপাতত রিপোর্টটায় আসা যাক। রিপোর্ট লিখে আমার সামনে বাড়িয়ে ধরা হল। লেখা আছে … সব কথা সত্যি। হাহা। অর্জুন বেরা আমায় ভাঙবে? ভালো। সাইন করে দিলাম।
এইবার আর অন্য কোনও টেস্ট না করে সোজা সুজি সেই কেমিক্যাল টেস্টের দিকে ওনারা এগিয়ে গেলেন। আমি সায় দিলাম। বললেন “ আর্জেন্ট বেসিসে রেজাল্ট আনা হবে। তবে এখানে একটা ব্যাপারে আপনাকে সাইন করতে হবে।” বললাম “কি ব্যাপারে?” উনি বললেন “ সম্মতি তো দিতেই হবে। তাছাড়া। (একটু থেমে বললেন) যত দিন না রেজাল্ট আসছে ততদিন আপনি কিন্তু শহর ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না। “ আমি বললাম “ এটা বাজে ব্যাপার। কিন্তু তবুও জানতে চাইছি এটাই তো সেই স্পার্ম টেস্ট? রাইট?” বললেন “ইয়েস। মানে ওইরকম একটা টেস্ট।” বললাম “কত দিনে রেজাল্ট আসার ডেডলাইন?” উনি হেসেবললেন “আগামিকাল। ম্যাক্স টু ম্যাক্স পরশু। ডিটেল রিপোর্ট হাতে আসতে সময় লাগবে অনেক। তবে ম্যাচ পজিটিভ না নেগেটিভ সেটা পরশুর মধ্যেই জানা যাবে। আমরা ইতিমধ্যে ল্যাবের সাথে কথা বলে রেখেছি। টেস্ট হলেই তৎক্ষণাৎ সব কিছু ল্যাবে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।“ বললাম “ ধুসস। পরশু অব্দি আমি আপনার বাড়ির ভাত খাব।” আমাকে নিয়ে ওনারা চলে গেলেন……সব হয়ে গেছে।
এইবার রেজাল্ট এলে সব কিছু জানা যাবে। আমি বললাম “ শহর ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি নেই। কিন্তু শহরের ভেতরে অন্য কোথাও?” উনি বললেন “আই অ্যাম সরি সংকেত। তোমাকে এতটা হ্যাপা পোহাতে হচ্ছে। কিন্তু আমি তোমাকে বারবার মানা করেছিলাম। (একটু থেমে বললেন) তুমি এই শহরে যেখানে খুশি ঘুরতে পারো। কোনও সমস্যা নেই। কোথায় থাকবে কি করবে সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। যেমন চলছে সবকিছু তেমনই চলবে। (আবার একটু থেমে কি একটা ভেবে বললেন) আমার কেন জানি মনে হচ্ছে গোটা ব্যাপারটা অনেক বেশী ঘোড়েল, জিনিসটা যতটা সিম্পল ভেবেছিলাম ততটা নয়।” বললাম “বেশ।” ওরা আরেক রাউন্ড ফিসিকাল টেস্ট করে বলল মেডিক্যালি সব ঠিক আছে এখন। অতএব থানা থেকে আমার ছুটি হয়ে গেল। সবাই আমার জন্য বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। এখনও ওদের মাথায় ঢুকছে না লাই ডিটেকটর টেস্টে পাশ করা সত্ত্বেও এই টেস্ট করার কি মানে থাকতে পারে।
আমি বেরিয়ে এসে দেখলাম দোলন, বেলা আনটি, সুধা আনটি সবাই এসে থানার ক্যাম্পাসের ভিতরেই দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে থানার দরজায় ছেড়ে দিয়ে অর্জুন স্যার ভেতরে ঢুকে গেলেন। সবাইকে বলে দিলেন যে এইবার আপনারা আসুন। এরপর থেকে দরকার পড়লে ওনারাই যোগাযোগ করে নেবেন। সবাই যে যার মতন ফিরে গেল। ও হ্যাঁ একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। থানার বাইরে বেরিয়ে দেখলাম আমার সেই উকিল বাবু এখনও ক্যাম্পাসের বাইরে অপেক্ষা করছেন। আমাকে সবার সাথে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে দেখে ধীরে ধীরে উনিও কেটে পড়লেন। আমি সঞ্চিতা ম্যাডামের সাথে গাড়ি করে বাড়ি ফিরে চললাম। পথে আমাদের মধ্যে তেমন কোনও কথা হল না। সঞ্চিতা ম্যাডাম শুধু আমাকে জানিয়ে দিলেন আজ এত ধকলের পর আর টিউশানি করতে হবে না। সেটা শুরু হবে আগামীকাল থেকে। আমি ওনাকে একবার বলার চেষ্টা করলাম যে আমি একদম বিন্দাস আছি। উনি আমার কথায় তেমন আমল না দিয়ে বললেন “আমি অলরেডি ওদের জানিয়ে দিয়েছি। “

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment