মুখোশ – The Mask [৩৬-৩৭]

লেখকঃ Daily Passenger

৩৬
গল্পের এই অংশে আমি নিজে অনুপস্থিত। কিন্তু যা যা ঘটেছে সেগুলোকে যতটা সম্ভব নিখুঁত ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এখানে দুটো প্রশ্ন সবার মনে আসতে পারে।
১। এই অংশে কেন আমি নেই?
উত্তরঃ পরের অংশটা পড়লে সবাই সেটা বুঝে যাবেন।
২। আমি নিজে অনুপস্থিত থেকেও কি করে ঘটনার নিখুঁত বিবরণ দিতে পারব?
উত্তরঃ সেটা বলার সময় আসবে পরে। এখনও দিস ইস টু আর্লি। এইবার শুরু করা যাক।
আমাদের রেহাই দিয়ে অর্জুন বেরা আবার গিয়ে ঢুকলেন নিজের ঘরে। এটা অবশ্য ওনার নিজের ঘর নয়। বরং বলা যেতে পারে যে এই কয়েক দিনের জন্য এই ঘরটা আর এই থানাটা হল গিয়ে ওনার বেস অফ অপারেশন। আরেকটা লম্বা সিগারেট জ্বালিয়ে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। ধীরে ধীরে ওনার চোখ বুজে এলো। কি এত ভাবছেন সেটা উনিই জানেন। হুঁশ ফিরল একজনের গলার আওয়াজ পেয়ে। “ওহ আরিফ! ল্যাবের কাজ মিটে গেছে?” আরিফ খান হল স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের অফিসার। আরিফ খান অর্জুন বেরার অনেক দিনের সঙ্গী। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আরিফ খান আসন গ্রহণ করে বললেন “ইয়েস। একজন কে দিয়ে স্পেসিমেন পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। জানিয়ে দিয়েছি যে আর্জেন্ট বেসিসে রিপোর্ট চাই”। অর্জুন বাবু জ্বলন্ত সিগারেটে একটা টান দিয়ে বললেন “বাকিদের ডেকে পাঠাও তো। একটা গেম প্ল্যান ঠিক করে নেওয়া দরকার। ব্যাপার ভীষণ গুরুতর। “
আরিফ সাহেব তক্ষুনি চেয়ার ছেড়ে উঠে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। মিনিট ৩ এর মধ্যে আবার ফিরে এলেন। এবার আর উনি একা নন। ওনার সাথে আছেন, মিসেস রাহা। ইনি সেই সাইকোলজিস্ট যিনি আমাকে পরীক্ষা করেছিলেন। আর আছেন ইনস্পেকটর মণ্ডল। ইনি যে একজন উচ্চপদস্থ অফিসার সেটা ওনাকে দেখেই বুঝেছিলাম। এখন অবশ্য বেরা সাহেবের সামনে একটু চুপসে রয়েছেন। রবিন দাস। ইনিও ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের গোয়েন্দা। বিনয় দত্ত। আরেকজন দুঁদে গোয়েন্দা। আর আছেন এই থানার বড় দারোগা। ধ্রুব লাহিড়ী। আরও দুয়েকজন গোয়েন্দা একে একে প্রবেশ করলেন লাহিড়ী বাবুর পেছন পেছন। সবাই আসন গ্রহণ করার সাথে সাথে কোনও রকম ভনিতা না করে মিস্টার বেরা সোজা কাজের কথায় চলে এলেন। “আপনারা জানেন আমাকে কেন এখানে পাঠানো হয়েছে?”
লাহিড়ী একটু আমতা আমতা করে বললেন “ আন্দাজ করতে পারি। শান্তনু মুখার্জি আর রঞ্জন মুখার্জির খুনের ব্যাপারে কি?” মিস্টার বেরা একটু বিরক্তি দেখিয়ে বললেন “ নো মাই ডিয়ার। নট অ্যাট অল। রঞ্জন মুখার্জি মিনিস্টার হতে পারেন আর সেই নিয়ে এত মাতামাতি করার মতন সময় তোমাদের থাকতে পারে, কিন্তু আমার নেই। আর হু ইজ দিস শান্তনু মুখার্জি? ওর নাম তো দুদিন আগে কেউ জানতই না। “ লাহিড়ী বাবু হেসেবললেন “তাহলে নিশ্চই রাজেন মেহেরার ব্যাপারটা! রাইট?” মিস্টার বেরা বললেন “ইয়েস। এইবার পথে এসেছ। আমাকে এখানে আনা হয়েছে রাজেন মেহেরার কেসটা হ্যান্ডেল করতে। ব্যাপারটা যেমন সিরিয়স তেমনই গোপনীয়। (একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন) কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে এই সব কটা জিনিস একই সুত্রে গাঁথা। আমি পুরো ব্যাপারটা গুছিয়ে আপনাদের বলব। কিন্তু তার আগে কয়েকটা প্রশ্ন করতে হবে। “
উনি মিসেস রাহার দিকে তাকিয়ে বললেন “ আপনি ছেলেটাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না কেন? হাই হ্যালো করেই ছেড়ে দিলেন?” মিসেস রাহার উত্তর তৈরি ছিল। উনি বললেন “স্যার প্রশ্ন করে কোনও লাভ হত না। আমি প্রায় এক দশক ধরে ক্রিমিন্যাল সাইকোলজি প্র্যাকটিস করছি। এই চোখের চাহুনি আমার চেনা।” মিস্টার বেরা জিজ্ঞেস করলেন “একটু ক্লারিফাই করে বলুন।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিসেস রাহা বললেন “বাঘা ক্রিমিনালের চোখ। ইনোসেন্ট, কিন্তু ভেতরে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। কিছু মনে করবেন না স্যার একটা কথা তখন বলব বলব করেও আপনাকে বলা হয়নি।” মিস্টার বেরা বললেন “সেটা কি?” মিসেস রাহা বললেন “ ঘরে যারা ছিল সবার ওপর চোখ বুলিয়েই আমি বুঝতে পেরেছি যে সবাই টেন্সড হয়ে আছে। কিন্তু এই ছেলেটার মধ্যে টেনশনের কোনও লেশ মাত্র নেই। শান্ত মুখে বসে আছে। স্থির শান্ত চোখ। ওর চোখের কোনায় কৌতুকের ঝিলিক। দিস ইস ভেরি অ্যাবনর্মাল। ইন ফ্যাক্ট ওর মুখ দেখে মনে হতে বাধ্য যে ও যেন গোটা জিনিসটা এনজয় করছে। ওর চোখ আর বডি ল্যানগোয়েজ দেখে আমার মনে হয়েছে ও আগে থেকেই জানত যে এরকম একটা সিচুয়েশন আসবে। তৈরি হয়েই এসেছে এই সিচুয়েশন ফেস করার জন্য। আর সেই কারনেই ওকে প্রশ্ন করে কোনও লাভ হত না। টলাতে পারতাম না ওকে। আমার ভুল হতে পারে কিন্তু আমি মোটামুটি জানতাম যে ওকে লাই ডিটেক্টর টেস্ট করে টলাতে পারবেন না। “
মিস্টার বেরা বললেন “ হুম, কোথায় আর টলাতে পারলাম?” মিসেস রাহা বললেন “স্যার লাই ডিটেক্টর টেস্টে আপনি তাদের টলাতে পারবেন যারা মিথ্যা বলার সময় কিছুটা হলেও নার্ভাস হয়ে যায়। তখন মেশিন ওদের পালস, প্রেসার, স্কিন কনডাকটিভিটি ইত্যাদি দেখে বুঝতে পারে যে সামথিং ইস নট রাইট। কিন্তু এরকম ধীর স্থির ছেলেকে আপনি টলাবেন কি করে? “ বেরা বললেন “আপনি ঠিকই বলেছেন। নার্ভের ওপর অসাধারন কন্ট্রোল ছেলেটার। আমার ইনফ্যাক্ট অন্য আরেকটা জিনিস স্ট্রেঞ্জ লেগেছে। আজ অব্দি কমবার তো এই টেস্ট করলাম না। এই সব সিচুয়েশনে সত্যি কথা বলার সময়ও সবার মধ্যে একটা হালকা চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়। অ্যান্ড মেশিন সেটা ক্যাচ করতে পারে। কিন্তু এই সংকেতের ক্ষেত্রে সব কটা উত্তর একদম ১০০% ট্রু বলে শো করেছে। অর্থাৎ একটাও উত্তর দেওয়ার সময় এক মুহূর্তের জন্য হলেও ওর শরীরে বা মনে কোথাও কোনও রকম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়নি। এটা রিয়েলি অবিশ্বাস্য। “ মিসেস রাহা বললেন “সেই জন্যই আমি আপনাকে বলব ভাবছিলাম যে এই ছেলেকে লাই ডিটেক্টর মেশিনের সামনে বসিয়ে কোনও লাভ নেই। হি নোস হোয়াট হি ইস ডুইয়িং। অ্যান্ড হি ইস ওয়েল প্রিপেয়ার্ড ফর দ্যাট।” মিস্টার বেরা বললেন “ হুমম। বেশী ভালোমানুষি কখনই ভালো নয়। ১০০% ট্রু ফর অল দা আনসারস ইস ইভেন ওয়ার্স। আর আপনার কথা যদি মেনে নেওয়া হয় তো বলতে হবে যে ছেলে আমাদের নিয়ে খেলা করার জন্য রেডি হয়েই এসেছিল। “
মিস্টার মণ্ডল বললেন “ তাহলে স্যার এখন কি করণীয়? ছেলেটা তো নিজে যেচেই…” মিস্টার বেরা বললেন “ জানি মণ্ডল জানি। ছেলেটা ইচ্ছে করেই স্পার্ম ম্যাচ করে দেখতে বলল। ও জানে আমরা কোনও ম্যাচ পাব না। অর্থাৎ, ছেলেটাকে কড়া নজরে রাখতে হবে। আচ্ছা এইবার কাজের কথায় আসা যাক। তার আগে লাহিড়ী, তুমি রঞ্জন মুখার্জি, শান্তনু মুখার্জি, দীপক, শিখা এদের সবার ফাইল গুলো নিয়ে এসো। কথা বলতে সুবিধা হবে।” কথা মতন কাজ হল। ফাইল এলো। সেই সাথে সবার জন্য চা কফি ইত্যাদি নিয়ে আসা হল। কোর্টের ভেতর থেকে একটা কালো রঙের ডাইরি বের করে মিস্টার বেরা প্রথম ফাইলটা খুললেন। একে একে সব কটা ফাইলের ওপর উনি চোখ বুলিয়ে কিছু জিনিস নিজের ডাইরিতে নোট করে নিলেন। সব শেষে খুললেন রাজেন মেহেরার এফ আই আর এর ফাইলটা। সেটাও খুব ভালো ভাবে খুঁটিয়ে দেখলেন উনি। তারপর নড়ে চড়ে বসে বললেন “ রাজেন মেহেরা এখানে যা বলেছেন, ব্যাপারটা তার থেকেও অনেক বেশী সিরিয়স। গোপনীয়তার কারণে আপনাদের সব কিছু বলতে পারেন নি উনি। এইবার আমি সেই কথাগুলোই আপনাদের বলব। “
“একটা কথা মনে রাখবেন এই ব্যাপার যেন বাইরে কোথাও লিক না হয়। দেশের সিকিউরিটির ব্যাপার এটা। “ একজন উঠে গিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। একটু গলা খাঁকড়িয়ে মিস্টার বেরা শুরু করলেন। “ আমি সব বলছি তার আগে আরেকটা সামান্য প্রশ্ন আছে। শান্তনু মুখার্জির ফাইলে দেখলাম দীপক বয়ান দিয়েছে যে একটা কালো রঙের স্যান্ট্রো দুর্ঘটনার সময় ওদের গাড়ির থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। পরে আপনারা খোঁজ করে দেখেছেন যে সেই গাড়ির নাম্বার ভুয়ো। এই ব্যাপারে কোনও রকম প্রগ্রেস হয়েছে? “ লাহিড়ী বললেন “না স্যার। সেই গাড়ির কোনও খোঁজ আমরা পাইনি।”
মিস্টার বেরা বললেন “সেই গাড়ির খোঁজ পেতে হবে। যাই হোক। রাজেন মেহেরা আপনাদের এখানে পর পর দুটো এফ আই আর করেছেন। প্রথমটাতে উনি বলেছেন যে ওনার রুম কি মিসিং। অর্থাৎ যেটা ওনার কাছে ছিল। পরে অবশ্য অদ্ভুত ভাবে একজন রুম বয় সেটাকে হোটেলের করিডরে আবিস্কার করেছে। আর সেকন্ড এফ আই আরে উনি বলেছেন যে ওনার কিছু ফাইল আর টাকা পয়সা মিসিং হয়ে গেছে। রাইট? যেটা উনি আপনাদের বলেননি সেটা হল, যে ফাইল গুলো মিসিং হয়েছে তার মধ্যে একটা ফাইল হল একটা অয়েপন রিলেটেড ফাইল। বলাই বাহুল্য দেশের ডিফেন্স বিভাগের ফাইল সেটা। সেই ফাইলে একটা স্পেশ্যাল ডিভাইসের ব্যাপারে ডিটেলিং করা ছিল। ডিসাইন, ইনটিগ্রেসন-টেকনিক, ফরমুলা ইত্যাদি সব কিছু লেখা ছিল সেই ফাইলে। এক কথায় আমার হাতে সেই ফাইল পড়লে আমি সেই ফাইল পড়ে ওরকম ডিভাইস বানিয়ে ফেলতে পারি। সঠিক না জানলেও এটুকু বুঝতে পেরেছি যে ডিভাইসটা খুবই মারাত্মক। ভুল লোকের হাতে পড়লে সবার ঘোর বিপদ। দ্বিতীয় যে ফাইলটা মিসিং হয়েছে সেটাও এই একই ডিভাইস রিলেটেড ফাইল। আচ্ছা এখানে একটা কথা বলে রাখি। যে জিনিসটার ব্যাপারে আমরা কথা বলছি সেই ভয়ানক জিনিসটা আমরা এখনও তৈরি করতে পারিনি কারণ সেই জিনিসটা তৈরি করার জন্য যে সব পার্টস লাগে তার মধ্যে একটা পার্টের ডিসাইন এখনও আমরা তৈরি করে উঠতে পারিনি। আমরা বলতে আমাদের দেশের বৈজ্ঞানিকদের কথা বলছি। আর সেই পার্টটা নিয়েই রিসার্চ করছিলেন আমাদের লেট রঞ্জন মুখার্জি। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট থেকে ওনাকে ব্যাক করা হচ্ছিল এই গবেষণার ব্যাপারে। মিস্টার মুখার্জির কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাজেন মেহেরার বয়ান অনুযায়ী দ্বিতীয় মিসিং ফাইলটাতে ছিল সেই মিসিং ক্রুসিয়াল পার্টের ডিসাইন। প্রথম ফাইলের অনেক গুলো কপি আমাদের ডিফেন্সের কাছে আছে। কিন্তু এই পার্টের ডিসাইনের কপি ছিল মাত্র দুটো। প্রথমটা লেট মিস্টার মুখার্জি হস্তান্তরিত করেছিলেন মিস্টার মেহেরাকে। আর আরেকটা কপি আছে ওনার বাড়িতে। গোপন সেফে। ঠিক হয়েছিল যে টেস্টিং ফেস শেষ হওয়ার পর সিকিউরিটির কারণে উনি সেই সেকন্ড ফাইলটা হয় নষ্ট করে দেবেন বা সরকারের হাতে তুলে দেবেন। মিস্টার মুখার্জির সাথে ডিফেন্সের এই নিয়ে পাকা কথা শুরুতেই হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং মোটের ওপর এই দাঁড়াচ্ছে যে এই দুটো ফাইল এক লোকের হাতে পড়লে আমাদের ঘোর বিপদ হতে পারে। শুধু একটা ফাইল পেলে তেমন কিছু হয়ত করতে পারবে না, কিন্তু দুটো ফাইল এক সাথে পেলে…” উনি থামলেন।
“এইবার কয়েকটা কথা পয়েন্ট অয়াইস বলছি। খুব মন দিয়ে সবাই শুনুন।”
১। আমরা জানি অন্তত একজন লোক আছে যার হাতে এখন এই দুটো ফাইলই আছে। কে সেই লোক? যে ফাইলগুলো চুরি করেছে।
২। ফাইলগুলো সে নিজের কাজে ব্যবহার করবে না অন্য কাউকে বেঁচে দেবে সেটা আমাদের জানতে হবে।
৩। সে কি অলরেডি কারোর কাছ থেকে নিযুক্ত হয়েই এই ফাইল চুরি করতে এসেছিল? সেটা আমাদের জানতে হবে। সেক্ষেত্রে এই দুটো ফাইল সেই নিয়োগকর্তার হাতে চলে যাবে কিছু দিনের মধ্যেই। হতে পারে ইতিমধ্যে সেই ফাইল হস্তান্তরিত হয়ে গেছে। যাই হোক আমাদের একটা চেষ্টা দেখতেই হবে।
৪। এই ব্যাপারে একটা স্ট্রেঞ্জ কো ইন্সিডেন্স আছে। মিস্টার মেহেরা থাকতেন রুম নাম্বার ১০৯। ওনার বডি গার্ডরা থাকত রুম-১১০ এ। হোটেলের নাম ব্লু রিসোর্ট। সেই একই হোটেলের ১০৭ নম্বর ঘরে থাকত আমাদের সকলের প্রিয় সংকেত রায়।
৫। আমার ঘর থেকে আজ যে ফাইলগুলো চুরি গেছে সেই ফাইলগুলোও ডিফেন্স সংক্রান্ত। ডিফেন্সে একবার একটা জিনিস কেনা বেচার ব্যাপারে কিছু ফ্রড হয়েছিল। আমি তখন সেই কেসে কাজ করেছিলাম। ফাইলগুলোতে বেশ কিছু ন্যাশনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অয়েপন ডিলারদের নাম ধাম ঠিকানা ইত্যাদি আছে। এদের প্রত্যেকে যে বেআইনি ভাবে নিজেদের ব্যবসা চালাচ্ছে সেটা বলাই বাহুল্য।
৬। রঞ্জন বাবুর বাড়িতে গিয়ে ইম্মিডিয়েটলি আমাদের সেকন্ড ফাইলটা সিকিওর করতে হবে। আর সেটাও যদি ইতি মধ্যে কেউ সরিয়ে দিয়ে থাকে তো বিপদ আরও ভয়ানক। কারণ একজনের হাতে পুরো ডিসাইনটা চলে গেছে বা যাবে, আর আমাদের দেশের হাতে কিছুই নেই। শুধু প্রথম ফাইলের ডিসাইন থেকে সম্পূর্ণ জিনিসটা বানানো অসম্ভব।
৭। রঞ্জন বাবুকে খুন করা হল কেন সেটা বুঝতে হবে। অর্থাৎ, এই খুনটা কি রাজনৈতিক খুন নাকি আরও সিরিয়স কিছু সেটা এখনও আমরা বুঝতে পারিনি।
৮। কালো স্যান্ট্রোটার কি হল সেটা জানতে হবে। যেটা ওই দুর্ঘটনার স্থলে দুর্ঘটনা ঘটার মুহূর্তে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল।
৯। আপাত ভাবে দুর্ঘটনার জন্য দীপক দায়ী। কিন্তু ভাবতে হবে দীপক কেন এই কাজটা করতে গেল। কার ইশারায় ও এই কাজটা করেছে।
১০। শিখাকে খুন করার কারণ কি?
১১। দীপককে বন্দুকটা কে দিল? আর কখনই বা দিল? যাকে ধরা হয়েছে সে তো এখন অব্দি স্বীকার করেনি যে সেই দীপককে বন্ধুকটা চালান করেছিল।
১২। যে সময় শিখা খুন হয় সেই সময় সংকেত আমার ওয়াইফের সাথে মর্নিং ওয়াক করছিল। ফেসবুকে সেই ছবি পোষ্ট করা হয়েছে। তাহলে কেন ওই দুই মহিলা বললেন যে ওনারা সংকেতকেই এই খুনের জন্য দায়ী করছেন। সংকেতের অ্যালিবাই পাকা। কিন্তু ওই দুই মহিলার বয়ান অনুযায়ী সেই দ্বিতীয় সংকেত আগের দিন রাত থেকে পরের দিন সকাল ৮ টা অব্দি ওই বাড়িতে ছিল।
১৩। মহিলাদের বয়ান অনুযায়ী সংকেত বা দ্বিতীয় সংকেত ১২ তারিখ অনেক রাত অব্দি শিখার ঘরে ছিল। অ্যান্ড দে হ্যাড সেক্স। অথচ সংকেত তখন মিস্টার মুখার্জির বাড়িতে। উফফ টু মাচ অফ অ্যালিবাই।
১৪। যদি ধরে নি সংকেত কোনও ভাবে শিখার মৃত্যুর ব্যাপারে জড়িত, তাহলেও কয়েকটা জিনিস এখনও মাথায় ঢুকছে না।
ক। সংকেত রঞ্জন বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে আদৌ জড়িত কিনা।
খ। ওর চুরির ব্যাপারে কোনও রকম হাত আছে কিনা।
গ। আমাকে আজ যে মেরেছে তার মুখ আমি দেখতে পাইনি। কিন্তু আগেই বলেছি যে সেও একই পারফিউম
ইউস করে যেটা সংকেত করে। হতে পারে কোয়িন্সিডেন্স। কিন্তু সংকেত তখন ক্লাসে বসে আছে সবার
সাথে। তাহলে এই দ্বিতীয় ব্যক্তিটা কে?
ঘ। এই প্রশ্নটা খুব ভাইটাল। সংকেত কি সত্যিই নির্দোষ?
১৫। এই সব কটা খুন, দুর্ঘটনা , চুরি কি একই সুত্রে গাঁথা?
উনি একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন “আপাতত এই অব্দিই থাক। আরও অনেক ব্যাপার আছে। সেই গুলো ধাপে ধাপে বলব। এখন একটা গেম প্ল্যান তৈরি করা যাক।”
৩৭
উনি বলে চললেন “কয়েকটা জিনিস আমাদের আজ কালের মধ্যেই শেষ করে ফেলতে হবে। প্লীজ নোট করে নিন। আরিফ পুরো টিমটাকে লিড করবেন। মিসেস রাহাকে আপাতত আমাদের দরকার পড়ছে না। কিন্তু পরে দরকার পড়লে আবার ওনাকে ডাকা যাবে খন। “ মিসেস রাহা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। মিস্টার বেরা আবার শুরু করলেন। “ আরিফ প্লীজ নোট নিয়ে নাও। আর কাকে কোন কাজ দেওয়া হচ্ছে সেটা তুমি ঠিক করবে।
১। সংকেতের ওপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখতে হবে।
২। হোটেল ব্লু রিসোর্টের ম্যানেজার কে ফোন করে এখানে ডাক। আর এখনই ডাক। আমি এখনই ওর সাথে কথা বলতে চাই।
৩। সংকেতের বাড়ির লোকজনের ব্যাপারে খবর নাও। দরকার হলে ইউপি তে লোক পাঠাও।
৪। সংকেত এখানে আসার পর থেকে ওর মোবাইলে কার কার সাথে কথা বলেছে বা কাকে কাকে মেসেজ করেছে সব জানতে চাই।
৫। সংকেত কবে কখন কোথায় ছিল ওর মোবাইলের লোকেশন থেকে বের করে আমাকে জানাবে।
৬। এক্ষুনি একজনকে মিসেস মুখার্জির বাড়িতে পাঠিয়ে সেই ফাইলটাকে সিকিওর করতে হবে।
৭। শিখার আর দীপকের ব্যাপারে যতটা ইনফরমেশন কালেক্ট করতে পারো করে ফেলো।
৮। এই শহরে কালো রঙের স্যান্ট্রো কার কার আছে সবার নাম আর ব্যাকগ্রাউন্ড আমার চাই কালকের মধ্যে।
উনি একটু থেমে বললেন “এই তথ্যগুলো হাতে আসুক আগে। তারপর নেক্সট স্টেপ ওঠানো যাবে। খেয়াল রেখো হোটেলের ম্যানেজারের সাথে এখনই আমি দেখা করতে চাই। আর ওই ফাইলটা এখনই আমাদের সিকিওর করতে হবে। ও হ্যাঁ একটা কথা বলা হয়নি। অবশ্য আমার মনে হয় সবাই অলরেডি এটা জানে। সেটা হল মিস্টার রাজেন মেহেরার পরিচয়। উনি একজন সাইন্টিস্ট,আর অনেক দিন ধরে ডিফেন্সের সাথে কাজ করে চলেছেন। বাই দা অয়ে সব দিক থেকে ওনার রেকর্ড কিন্তু ভীষণ ভালো। “
কাজ শুরু হল। সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে মিস্টার বেরা বললেন “একটা জিনিস, সবাই একটু চোখ কান খোলা রেখো। আমরা সংকেতের ব্যাপারে টু মাচ ইনভেস্টিগেট করতে বাধ্য হচ্ছি কারণ ওই মহিলাদের বয়ান আর হোটেলের রুম। খেয়াল রেখো সংকেত ছাড়া অন্য কেউ এই গোটা ব্যাপারটার মধ্যে থাকতে পারে। সেই সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ডিফেন্স রিলেটেড চুরির সাথে ও আদৌ ইনভলভড কিনা সেই ব্যাপারে আমি শিওর নই। নাউ মুভ অন।”
আমার পিছনে লাগার জন্য একজন দারোগাকে তৎক্ষণাৎ নিয়োগ করা হল। সে প্লেন ড্রেসে জোঁকের মতন সারাক্ষন আমার পেছনে পেছনে ঘুরবে। আমার কল রেকর্ডস, মোবাইল লোকেশন সব বের করার বন্দবস্ত করা হল। একজন ছুটে চলল দোলনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। আর হোটেলের ম্যানেজার রওনা দিল থানার উদ্দেশ্য। তার হাতে মোটা মোটা দুটো রেজিস্টার কপি। আর বেশ কয়েকটা সিডি। এইগুলো গোটা হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজের সিডি। একজনকে ঠিক করা হল যে পরের দিন খুব ভোরে ইউপি র উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবে।
হোটেলের ম্যানেজার থানায় ঢোকা মাত্র ওনাকে মিস্টার বেরার সামনে নিয়ে গিয়ে হাজির করা হল। ঘরের ভেতরে শুধু রইলেন মিস্টার বেরা, ম্যানেজার আর আরিফ সাহেব। দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। আরিফ জিজ্ঞেস করলেন “যা যা আনতে বলা হয়েছিল নিয়ে এসেছেন?” মিস্টার বেরা হোটেলের রেজিস্টারের রেকর্ডের ওপর চোখ বোলাতে শুরু করলেন। এক ফাঁকে কালো রঙের ডাইরিটা বের করে সেটাকে খুলে টেবিলে রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ কারোর মুখে কোনও কথা নেই। মিস্টার বেরা অলস ভাবে একের পর এক রেজিস্টারের পাতা উল্টে চলেছেন। হঠাৎ একটা রেকর্ড দেখেই উনি সোজা হয়ে বসলেন।
“আরিফ কাম হিয়ার। “ আরিফ আর ম্যানেজার দুজনেই ঝুঁকে পড়লেন রেজিস্টারের ওপর। মিস্টার বেরা বললেন “সংকেত রায়ের চেক আউটের ডেটটা দেখো আর সেই সাথে সময়টাও দেখো। “ আরিফ ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বললেন “ ভোর ৩.৩০ এ সংকেত রায় চেকআউট করেছেন? আর ৫.৩০ মিনিটে হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলেন? এত ভোরে হঠাৎ করে চেক আউট করার কারণ?” ম্যানেজার বললেন “সেটা তো বলতে পারব না স্যার। তবে ওনার আরও বেশ কয়েকদিনের বুকিং করা ছিল। আগে ভাগে চলে যাওয়ার জন্য কিছুটা ফাইন ও দিতে হয়েছে। “ মিস্টার বেরা বললেন “আরিফ সংকেত যেদিন ভোরে চেক আউট করেছে, ঠিক সেই দিনই রাজেন মেহেরা মিসিং ফাইলের ব্যাপারে কমপ্লেন করেছেন। আগের দিন রাতে কোনও একটা সময় ওনার ঘর থেকে জিনিসগুলো সরানো হয়েছিল। এইবার তো ব্যাপারটা ভীষণ গোলমেলে ঠেকছে।”
ম্যানেজার একটু আমতা আমতা করে বললেন “একটা কথা বলব স্যার যদি কিছু মনে না করেন? “ মিস্টার বেরা একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বললেন “যা বলার বলে ফেলুন।” উনি মুখটা কাচুমাচু করে বললেন “স্যার সংকেত ছেলেটা সুবিধার ছিল না। “ আরিফ জিজ্ঞেস করলেন “এমন কথা আপনার মনে হওয়ার কারণ?” ম্যানেজার সেই সিকিউরিটি পেটানোর ব্যাপারটা সবিস্তারে বলে চললেন। প্রায় মিনিট পনের পর মিস্টার বেরা বললেন “এক সেকন্ড। অনেক কিছু শুনলাম। সেদিনকার ফুটেজ গুলো এনেছেন?” ম্যানেজার মাথা ঝাঁকিয়ে সিডির কভারটা খুলে কয়েকটা সিডি মিস্টার বেরার হাতে হস্তান্তরিত করলেন।
একটা সিডি দেখিয়ে বললেন “এইটা দেখুন। পুরো ঝামেলাটা দেখতে পাবেন।” মিস্টার বেরা নিজের ল্যাপটপ অন করলেন। সিডি চালানো হল। কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যানেজার বললেন “এইখান থেকে দেখুন।” তিন জনে একটানা কিছুক্ষণ মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ভিডিওটাকে পস করে মিস্টার বেরা বললেন “আপনি বলছেন যে সংকেত রায় আপনাদের বলেছিলেন যে উনি সিকিউরিটির গায়ে হাত তোলেননি। কিন্তু আপনাদের সিকিউরিটির বয়ান অনুযায়ী সংকেত ইস দা কালপ্রিট। কেমন?” উনি মাথা নাড়িয়ে বললেন “স্যার যে ছেলে কয়েক সেকন্ডের মধ্যে ওই সিকিউরিটির এই হাল করতে পারে…” মিস্টার বেরা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন “মশাই অবান্তর কথা বলা একটু বন্ধ করুন এইবার। কাজের কথা হল হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে এই যে ঝামেলাটা দেখলাম তাতে দেখতে পাচ্ছি মিস্টার মেহেরা আর মিস্টার রায় সামনা সামনি দাঁড়িয়ে আছেন। ওনাদের মধ্যে কি কথা হল সেটা একটু গুছিয়ে বলবেন?”
ম্যানেজার আবার শুরু করলেন তার উপাখ্যান। ম্যানেজারের উপাখ্যান শেষ হওয়ার পর মিস্টার বেরা জিজ্ঞেস করলেন “ফার্স্ট ফ্লোরের ভিডিও ফুটেজটা চেক করে সংকেত কে পেনালাইজ করলেন না কেন? ওর নামে এফ আই আর করলেন না কেন?” এইবার ম্যানেজার একটু গলা নামিয়ে বললেন “স্যার এখানে একটা গল্প আছে।“ উনি আরও গলা নামিয়ে বললেন “ওই মেহেরা বলে যে ভদ্রলোক এসেছেন উনি আসার পর থেকে ফার্স্ট ফ্লোরের সিসিটিভি ফুটেজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে। “ এইবার মিস্টার বেরা যে খুবই আশ্চর্য হয়েছেন সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। “এমনটা করার কারণ? আর কেই বা এই নির্দেশ দিয়েছিল?” ম্যানেজার বললেন “স্যার উপর মহল থেকে নির্দেশ এসেছিল। বলা হয়েছিল ওনার ঘরে কে আসছে বা কে থাকছে কিছুই যেন রেকর্ড না করা হয়। ইভেন হোটেলের স্টাফরাও যাতে সেই ব্যাপারে কোনও কিছু ট্র্যাক না করতে পারে। “
ফুটেজ দেখার সময় উনি মিস্টার বেরার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, এইবার নিজের চেয়ারে ফিরে গিয়ে বললেন “ স্যার অনেক ভি আই পি ওনার সাথে দেখা করতে আসতেন। প্রয়াত রঞ্জন মুখার্জিও বার দুই তিনেক এসেছিলেন। তবে কেউ সামনের দিক দিয়ে ঢুকতেন না। ঢুকতেন পেছন দিক দিয়ে। ওই দিকে ক্যামেরা অন থাকে না। আর ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরাও বন্ধ। সুতরাং বুঝতেই পারছেন…” কি একটা ভেবে নিয়ে একটু পরে বললেন “ স্যার একবার মনে আছে দুপুরের দিকে হোটেলের পিছনে দুই জন আর্মির অফিসারও এসেছিলেন। আমাদের বলা হয় ফার্স্ট ফ্লোর থেকে সব রুম বয়দের কিছুক্ষনের জন্য সরিয়ে নিতে। আমি সবাইকে সরিয়ে নেওয়ার পর ওই দুই অফিসার একটা বড় সুটকেস নিয়ে ওপরে উঠে মিস্টার মেহেরার ঘরে ঢুকে যান। ওনারা অনেকক্ষণ ছিলেন ওই ঘরে। পরে ওনারা চলে যান। তবে…” মিস্টার বেরা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন “তবে কি?” জবাব এলো “স্যার মিথ্যে বলব না। যতদূর মনে পড়ে, সুটকেসটা ঘরেই রেখে গেছিলেন ওনারা। “
মিস্টার বেরা কিছু বলার আগেই ম্যানেজার বলে চললেন “স্যার হোটেলের স্টাফরাও যাতে ওনার ঘরে কে আসছে বা যাচ্ছে সেটা জানতে না পারে তার জন্যই হয়ত এই ব্যবস্থা করতে বলেছিল। তাছাড়া, সবাই বুঝত যে মিস্টার মেহেরা খুব হোমরাচোমরা গোছের কেউ। যদিও চেক ইনের সময় উনি নিজের প্রফেসনের জায়গায় লিখেছিলেন ব্যাবসা।” মিস্টার বেরা বেজার মুখ নিয়ে বললেন “সেটা দেখেছি। কিন্তু সমস্যা হল হোটেলের পিছন দিকের আর ফার্স্ট ফ্লোরের সিসিটিভি যদি বন্ধই থাকে তাহলে আর বাকি ফুটেজ দেখে কি করব?” উনি ল্যাপটপ থেকে সিডিটা বের করে সেটা ম্যানেজারের হাতে ফেরত দিতে গিয়েই সিডির ওপর লেখা তারিখটা দেখে চমকে উঠলেন। “আরিফ এই ডেটটাও ভালো করে দেখো। এই একই দিনে মিস্টার মেহেরা দুপুর বেলায় মিসিং কির রিপোর্ট লিখিয়েছিলেন। আচ্ছা একটা কথা বলুন , হোটেল থেকে বেরনোর সময় চাবি রিসেপশনে জমা করে দিয়ে যেতে হয় না?”
ম্যানেজার বললেন “বাকি সবার জন্য এই নিয়ম। কিন্তু বুঝতেই তো পারছেন এনার ব্যাপারটা একটু অন্য। ওনার রুমের দুটো চাবিই উনি চেক ইনের সময় উঠিয়ে নিয়েছিলেন। একটা থাকত ওনার কাছে। আর একটা থাকত ওনার সেক্রেটারির কাছে। সেক্রেটারিরটা খোয়া যায়নি সেদিন। ওনার কাছে যেটা থাকত সেটা খোয়া গেছিল। পরে অবশ্য আমরা দেখি যে সেটা ফার্স্ট ফ্লোরের করিডরের ওপরে পড়ে আছে। তখন আমরা সেই নিয়ে কোনও রকম মাথা ব্যথা করিনি, কিন্তু এখন যে হারে হোটেলে পুলিশ আর গোয়েন্দাদের যাতায়াত লেগে আছে তাতে মনে হচ্ছে…” মিস্টার বেরা বললেন “আপনি বললেন যে সংকেত রায় বলেছিলেন যে মিস্টার মেহেরার বডি গার্ডরা ওনাকে ফিসিকালি আবিউস করেছে। কথাটা কি সত্যি?” ম্যানেজার বললেন “ সেটা আর কি করে ভেরিফাই করব স্যার? ওপরের ক্যামেরা তো বন্ধ করা ছিল।” মিস্টার বেরা বললেন “কেউ কিছু দেখেনি?” ম্যানেজার মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে এই ব্যাপারে ওনার আর কিছু বলার নেই।
“ওপরের ক্যামেরা যে বন্ধ সেটা কে কে জানত?” প্রশ্নটা শুনে ম্যানেজার মাথা চুলকে বললেন “স্যার , হোটেলে ব্যাক অফিসে আর ফ্রন্ট ডেস্কে যারা কাজ করে তারা সবাই জানত। আমরা বুঝতে পারতাম দেশের ডিফেন্সের ব্যাপারে ওখানে কিছু একটা …” মিস্টার বেরা ধমকে উঠলেন “ আপনাকে যেটুকু জিজ্ঞেস করেছি শুধু সেইটুকু বলুন। অহেতুক বাজে কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। মানে হোটেলের লোকেরা জানত যে উপরের ক্যামেরা কাজ করে না। আর আপনি বলছেন সেদিন সংকেত রায় বারবার বলছিলেন যে ফুটেজ চেক করে দেখে বলুন আমি সিকিউরিটিকে মেরেছি কি না? কি তাই তো?“ ম্যানেজার নিরবে মাথা নাড়ালেন, “স্যার ফুটেজ বন্ধ। এইদিকে ছেলেটা গোটা দুনিয়ার সামনে বারবার ফুটেজ দেখাতে বলছে। কি আর করি। কোনও মতে ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দিতে হল। লোকে যদি জানতে পারে যে ক্যামেরা বন্ধ করে রাখা আছে তাহলে বুঝতেই পারছেন সবাই মিলে আমাদের কি হাল করবে…” মিস্টার বেরার ঠোঁটের কোণে এতক্ষনে একটা হাসির ঝিলিক খেলে গেল।
“কিছু বুঝতে পারছ আরিফ? সংকেত রায়ও জানত যে ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরা বন্ধ করে রাখা আছে। আর তাই ও অত সাহস দেখিয়ে সবার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার করে বলছিল ফুটেজ চেক করে দেখতে! ও সিকিউরিটিকে পেটানোর মুহূর্ত থেকে জানত যে এই ফ্লোরের সমস্ত ক্যামেরা অকেজো। হাহা। কিন্তু এইবার প্রশ্ন হল যে সেটা ও জানল কি করে? ম্যানেজার বাবু, আপনি তো বলছেন হোটেলের ভেতরের লোক ছাড়া কেউ জানে না যে ওপরের ক্যামেরা বন্ধ। ” ম্যানেজার বললেন “ ইভেন রুম বয়রা পর্যন্ত এই ব্যাপারটা জানত না। কয়েকজন সিনিয়র স্টাফ ছাড়া আর কেউ এই ব্যাপারে কিছু জানত না। যারা এই ব্যাপারটা জানত তাদের পরিষ্কার বলে রখা হয়েছিল যে এই নিয়ে ওরা যেন রুম বয় বা বাইরের কোনও লোকের সামনে নিজেদের মধ্যেও কোনও রকম আলোচনা না করে। ব্যাপারটা জানাজানি হলে খুব বিপদ হতে পারে।”
মিস্টার বেরা বললেন “হোটেলের স্টাফদের মধ্যে কারোর সাথে সংকেত রায়ের জানাশোনা ছিল?” উত্তরটা দিতে ম্যানেজারের দেরী হল না। উনি বললেন “স্যার একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। আসলে কেউ এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আমাদের হোটেলে একজন কাজ করে মালিনী বলে। ও কিন্তু এই ক্যামেরার ব্যাপারটা জানত। যতদূর শুনেছি, এই মালিনীর ভাই নাকি সংকেতের ক্লাসমেট। “ মিস্টার বেরা হেসেবললেন “ তাই নাকি? আরিফ ম্যানেজার বাবুর জন্য এক কাপ চা! এতক্ষনে উনি কিছু কাজের কথা বলতে শুরু করেছেন।”
ফোন করে চা আনতে বলে দেওয়া হল। ম্যানেজার বলে চললেন “ স্যার, ওই মালিনীর ভাই আগেও আমাদের হোটেলে এসেছিল ওর দিদির সাথে দেখা করতে। কিন্তু ডিউটির সময় বাড়ির লোকদের সাথে দেখা করা নিয়ম বিরুদ্ধ। এই নিয়ে মালিনীকে দুই একবার কথাও শুনতে হয়েছে। এর পর বহুদিন ওই ছেলেটাকে দেখা যায়নি। কিন্তু সংকেত যেদিন এখানে এলো ঠিক তার পরের দিন ছেলেটা আবার হোটেলে এসেছিল। যদিও সংকেত আমাদের সিকিউরিটিকে বলেছিল যে ছেলেটা এসেছে সংকেতের গেস্ট হিসাবে সংকেতের সাথে দেখা করতে, কিন্তু আমি জানি ছেলেটাকে সংকেত ওর দিদির সাথেই দেখা করানোর জন্য নিয়ে এসেছিল। তারপরে অবশ্য আর কোনও দিনও ছেলেটাকে হোটেলে আসতে দেখা যায়নি। “
মিস্টার বেরা বললেন “আর কিছু বলতে পারেন এই মালিনীর ব্যাপারে?” ম্যানেজার আবার আমতা আমতা করতে শুরু করে দিয়েছেন। বললেন “ স্যার ইয়ে মানে। একটা কথা বলা ঠিক হবে কিনা জানি না। মালিনীকে আসলে আমি খুব স্নেহ করি তো। তবে…” মিস্টার বেরা বললেন “যা জানেন নির্ভয়ে বলে যান। নইলে আপনিই ফ্যাসাদে পড়বেন। “ ম্যানেজার বললেন “একটা কানাঘুষা শুনেছি যে … এক মিনিট দাঁড়ান। একটা সিডি দেখুন। এইগুলো গ্রাউন্ড ফ্লোরের ফুটেজ।” আবার সবাই মিলে ল্যাপটপের স্ক্রিনের ওপর ঝুঁকে পড়ল। কিছুটা দেখার পর, ম্যানেজার বললেন “এইবার দের ঘণ্টা মতন ভিডিও এগিয়ে দিন। হ্যাঁ এই যে। এইবার দেখুন। কিছু বুঝলেন?”
আরেকটা সিডি বের করে দিলেন। তাতেও তিনজনে মিলে অনেকক্ষণ ধরে কিছু দেখার পর মিস্টার বেরা জিজ্ঞেস করলেন “এক্সাক্টলি কি বোঝাতে চাইছেন একটু খুলে বলবেন?” কথা থামাতে হল, কারণ চা এসে গেছে। আবার দরজা বন্ধ হতেই ম্যানেজার বললেন “ দেখলেন তো মালিনী নাইট ডিউটির সময় ঘণ্টা খানেকের জন্য দুদিন গায়েব হয়ে গেছিল।” মিস্টার বেরা বললেন “ সো হোয়াট?” ম্যানেজার বললেন “তাহলে একটু খুলেই বলি। মালিনী আগেও নাইট ডিউটির সময় এরকম ভাবে কাউন্টার ছেড়ে চলে যেত। আসলে সেই সময় কাউন্টারে কোনও লোক আসেনা। টুকটাক কল এলে রুম বয়রাই সেই কল রিসিভ করে নিতে পারে। আমি ওকে আগে এই নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলেছিল যে ও হোটেলের ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। খালি খালি কাউন্টারে বসে থাকা ওর কাছে বোরিং তাই ছাদে চলে যায়। আমি দেখেছি কথাটা সত্যি। তেমন কিছু হলে ওর মোবাইলে কল করলেই ও নিচে চলে আসবে। ততক্ষণের জন্য একজন রুম বয় কাউন্টারে বসে কাউন্টার সামলায়। কিন্তু কানাঘুসা শুনেছি যে সংকেত আসার পর থেকে ও নাকি ছাদে যেত না?”
মিস্টার বেরা বললেন “তাহলে কোথায় যেত বলে আপনার ধারণা?” উনি গলা খাটো করে বললেন “সংকেতের ঘরে। আগে অবশ্য ছাদেই যেত আর সেটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। আর এটাও ঠিক যে অন্ধকারে আমাদের হোটেলের ছাদ থেকে শহরের একটা খুব সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। “ মিস্টার বেরা বললেন “ সংকেতের ঘরে যেতে ওকে কেউ দেখেছে?” ম্যানেজার বললেন “হ্যাঁ তেমনটাই শুনেছি। “ মিস্টার বেরা বললেন “ কোনও প্রমান আছে?” ম্যানেজার বললেন “স্যার সেইভাবে তো আর প্রমান নেই। তবে কেউ কেউ নাকি ওকে সংকেতের ঘরে যেতে দেখেছে।”
মিস্টার বেরা কয়েক মিনিটের জন্য চোখ বন্ধ করে বসে বসে কি যেন ভেবে চললেন। ওই দিকে ম্যানেজার মুখ বুজে চা পান করে চলেছেন। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সোজা হয়ে বসে মিস্টার বেরা জিজ্ঞেস করলেন “একটা ব্যাপার বলুন। কবে থেকে ফার্স্ট ফ্লোরের ফুটেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল?” ম্যানেজার উত্তর দেওয়ার আগেই মিস্টার বেরা রেজিস্টারে কি যেন খুঁজতে শুরু করে দিয়েছেন। ম্যানেজার বললেন “ সেটা দেখে বলতে হবে।” মিস্টার বেরা বললেন “ শুধু চট করে একটা জিনিস বলুন মিস্টার মেহেরা যেদিন চেক ইন করলেন সেদিন থেকে বন্ধ করেছেন নাকি তার আগে থেকেই?” ম্যানেজার বললেন “তার আগের দিন সন্ধ্যা থেকে। ওনার সেক্রেটারি এসেছিলেন তার আগের দিন সব ব্যবস্থা চেক করতে। সেই তখন থেকেই ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। “
মিস্টার বেরা হেসেবললেন “ উপায় আছে ভেরিফাই করার, আপনাদের মালিনী ছাদে যেত না সংকেতের ঘরে যেত। মিস্টার মেহেরা হোটেলে চেক ইন করেছেন সংকেতের চেকিন করার দিন তিনেক পর। অন্তত আপনাদের রেজিস্টার তাই বলছে। সুতরাং ওই দুই তিন দিনের ফুটেজ থাকার কথা। চেক করুন।” ম্যানেজার হঠাৎ করে চমকে উঠে বললেন “স্যার ঠিক তো। এটা তো মাথায় আসেনি। ওই দুই দিনের ফুটেজ আছে। “ উনি আবার সিডির খাপ খুলে খুঁজে দুটো সিডি বের করে মিস্টার বেরার হাতে দিয়ে দিলেন। মিস্টার বেরা বললেন “ আমি এই দুইদিনের গ্রাউন্ড ফ্লোরের ফুটেজও দেখতে চাই। ঠিক এই সময়কার।” আবার বেশ কিছুক্ষণ নিরবে তিনজনে ফুটেজ দেখে চললেন।
সিডি কটা ম্যানেজারের হাতে ফেরত দিয়ে মিস্টার বেরা আরিফের দিকে তাকিয়ে বললেন “ দুদিনই এই মেয়েটা সংকেতের ঘরে গেছিল। আমাদের কাছে এখন তার প্রমান আছে। প্রথম দিন বেশীক্ষণ না থাকলেও পরের দিন মালিনী প্রায় ঘণ্টা খানেক কাটিয়ে এসেছে সংকেতের ঘরে। “ ম্যানেজার বললেন, “এরপরেও নাকি বার দুয়েক মালিনীকে সংকেতের ঘরে যেতে দেখেছে কেউ কেউ। “ মিস্টার বেরা বললেন “কি মনে হয় আপনার ম্যানেজার বাবু। এতক্ষন ধরে মালিনী ওই ঘরের ভেতরে কি করছিল?” ম্যানেজার একটু গলা খাঁকড়িয়ে বললেন “আজ্ঞে সেটা আমি বলতে পারব না। তবে মিস্টার মেহেরার ঘর থেকে কিছু জিনিস চুরি হওয়ার পর আমি মালিনীকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে মেহেরার ব্যাপারে বা ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরার ব্যাপারে ও কাউকে কিছু বলেছে কিনা। ও জোর গলায় বলেছে যে ও কাউকে কিছু বলেনি। আমি বিশেস করে সংকেতের কথাও জিজ্ঞেস করেছিলাম। মালিনী আমাকে বলেছিল যে সংকেত ওর ভাইয়ের বন্ধু। সংকেতের সাথে ওর ভাইয়ের ব্যাপারে এমনি দুই একটা কথা হয়েছে বটে, কিন্তু এইসব নিয়ে সংকেতের সাথে ওর কোনও রকম কথাই হয়নি। “
মিস্টার বেরা বললেন “ স্যার কেউ কারোর ভাইয়ের ব্যাপারে দুই একটা কথা বলার জন্য মাঝ রাতে অভিসারিকার মতন কোনও বোর্ডারের ঘরে গিয়ে হাজিরা দেয় না। আর কি এমন কথা ছিল যে সেটা বলতে প্রায় ঘণ্টা খানেক লেগে গেল। ডাল মে কুছ তো কালা হ্যায়। একটা কথা বলুন এই মালিনী বলে মেয়েটির চরিত্র কেমন? আর ও কতদিন ধরে আপনাদের হোটেলে কাজ করছে?” ম্যানেজার বললেন “ওর নামে খারাপ কিছু কোনও দিন শুনিনি। বিয়েটা ভালো হয়নি বেচারির। তবে কোনও বোর্ডারের সাথে ওর যে কোনও খারাপ সম্পর্ক থাকতে পারে সেটা আমি আগে কখনও শুনিনি। “ মিস্টার বেরা জিজ্ঞেস করলেন “এই মালিনীর বয়স কত? দেখে তো মনে হচ্ছে সংকেতের থেকে বয়সে অনেকটাই বড়?” ম্যানেজার বললেন “ ৩০ এর ওপরে। বাকিটা রেকর্ড দেখে বলতে হবে। “ আরিফ হেসেবললেন “স্যার আজকাল বয়সটা কোনও ম্যাটার নয়। “ মিস্টার বেরা বললেন “সেটা জানি আরিফ। তবুও সব দিকটা বুঝে শুনে দেখছি। বাই দা ওয়ে, মালিনীর বিয়ে ভালো হয়নি আপনি সেটা কি করে জানলেন? “
ম্যানেজার বললেন “মালিনীই আমাকে দুঃখ করে বলেছিল সেই সব কথা। ওদের বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তার ওপর মালিনীর ওপর ওর বর সন্দেহ করে। ওর বরের ধারণা হোটেলে রিসেপশনিস্টদের চরিত্র খুব খারাপ হয়। ও মাঝে একবার চাকরি ছেড়ে দেবে ভেবেছিল। কিন্তু পরে আর্থিক সমস্যার কথা ভেবে ছাড়তে পারেনি। ওর বরের মাথার ওপর প্রচুর লোণ। সবটা জানি না। তবে এইটুকু জানি যে ওর বরের আর ওর এখানে মাথা গোঁজার জায়গা নেই। আমাকে খুব শ্রদ্ধা করে বলে এইসব কথা বলেছিল। বাড়িতে কিছু সমস্যা আছে। ওর বর তো বাইরে ইন্সিওরেন্সের দালালি করে। উইক এন্ডে এখানে আসে। শনিবার দুপুরের মধ্যে চলে আসে, সোমবার সকাল বেলায় ফিরে যায়। মালিনী নিজের শশুর বাড়িতে থাকে না। থাকে একটা মেসে। ওর বর এলে এই হোটেলেই আমি ওদের জন্য বন্দবস্ত করে দি। মানে, বুঝতেই তো পারছেন, আমি ওকে খুব স্নেহ করি।”
মিস্টার বেরা বললেন “ আপনাকে কেউ শ্রদ্ধা করে বলেই যে তার চরিত্র খুব ভালো সেটা ঠিক মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। বাট স্টিল, মালিনী কেন নিজের শ্বশুর বাড়িতে থাকে না সেই ব্যাপারে কিছু বলেনি আপনাকে?” ম্যানেজার বললেন “বলেছিল যে বাড়িতে ওর বরের জ্যাঠারা ওদের খুব কথা শোনায়। ওরা নাকি ওর বরের কাছ থেকে অনেক টাকা পাবে। সেই সব আর কি। ঠিক বলতে পারব না। “ মিস্টার বেরা বললেন “এইবার বলুন আপনি কি করে উইক এন্ডে ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন?” ম্যানেজার বললেন “দেখুন আমার দেশের বাড়ি অনেক দূরে। আমি উইক এন্ডে সেখানে চলে যাই। এখানে আমার থাকার জন্য একটা ঘর দিয়েছে হোটেল থেকে। আমি সেখানেই থাকি। উইক এন্ডে আমার ঘরটা খালি পড়ে থাকে। ওরা থাকে সেখানে। “ মিস্টার বেরা বললেন “ বেশ। আপনার ঘরটা কোন ফ্লোরে?” ম্যানেজার বললেন “থার্ড।”
মিস্টার বেরা বললেন “সংকেত সোমবার ভোরে চেকআউট করেছে আপনার হোটেল থেকে। রবিবার গোটা রাতটা ও সেই হোটেলেই ছিল। চুরিটাও হয়েছে ওই দিন রাতেই। চুরির কথায় পরে আসছি। তার আগে একটা কথা বলুন, তারমানে সেইদিনও মালিনী আর তার বর থার্ড ফ্লোরে আপনার ঘরেই ছিল? রবিবার তো ওর বর আপনাদের হোটেলে থাকে। কি তাই তো?” ম্যানেজার বললেন “ ও সেটা বলতে ভুলে গেছিলাম। মিস্টার মেহেরা আসার পর থেকে আমার আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। ওদের জন্য আমি ফোর্থ ফ্লোরে একটা ছোট ঘরের বন্দবস্ত করে দিয়েছিলাম। “ মিস্টার বেরা উঠে দাঁড়িয়ে একটু আড়মোড়া ভেঙ্গে বললেন “ ওই দিনকার ফুটেজ দেখব। গ্রাউন্ড আর ফোর্থ ফ্লোরের। ফার্স্ট ফ্লোরের ফুটেজ না থাকায় সব কিছু কেমন জানি গুবলেট হয়ে গেছে। জানি না আর কত হ্যাপা পোহাতে হবে এই জন্য। “
প্রায় ২০ মিনিট ধরে তিনজন মিলে ফুটেজের বিভিন্ন অংশ মনযোগ দিয়ে দেখলেন। আরিফ বললেন “স্যার এই দিন মালিনী সংকেতের ঘরে যায়নি। সংকেত ওদের ঘরে এসেছে। কিন্তু ব্যাপারটা কেমন জানি গুলিয়ে গেল। ওদের ঘরে তো মালিনীর বরের থাকার কথা। “ মিস্টার বেরা এই কথার কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন। ভিডিওটা একটু একটু করে এগিয়ে দিচ্ছেন উনি। একসময় ভিডিওটাকে পস করে বললেন “সময়টা লক্ষ্য কর আরিফ। ২.৩০ মিনিট। সংকেত এতক্ষন্ ধরে মালিনী আর মালিনীর বরের সাথে ছিল। কি করছিল সেটা জরুরি নয়। ম্যানেজার বাবু সংকেত লিফট ব্যবহার করত না?” ম্যানেজার বললেন “সেটা তো জানি না। “ মিস্টার বেরা বললেন “ এখন তো দেখছি সার্ভিস এক্সিট দিয়ে বেরিয়ে গেল। দেখা যাক।”
আরও কিছুক্ষণ ধরে ফুটেজ দেখে সিডিটা বের করতে করতে মিস্টার বেরা বললেন “ ২ টো বেজে ৩৫ মিনিটে সংকেত রায় আপানাদের মালিনীর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর ৩ টে বেজে ৩০ মিনিটে গিয়ে চেক আউট করে। এর মাঝে ও কি করছিল বা কোথায় ছিল সেটা পরিষ্কার হল না। আর তাছাড়া সংকেত যখন মালিনীর ঘরে গেছিল তখন দুটো ভারী পার্সেল নিয়ে গেছিল। যখন বেরিয়ে এল তখন হাতে একটা মাত্র ছোট পার্সেল। প্রশ্ন হল পার্সেলে কি ছিল? অবশ্য খাওয়ার দাওয়ারের জিনিস থাকতে পারে। এটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে খন। আপাতত চুরিটা যদি ২.৩০ থেকে ৩.৩০ এর মধ্যে হয়ে থাকে তো সংকেতের রোলটা এখানে ঠিক উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ছেলেটা সত্যি অদ্ভু্ত। ও লিফট ব্যবহার করে না…”
বেশ কিছুক্ষণ ধরেই ম্যানেজার বাবু বেশ উসখুস করছিলেন। মিস্টার বেরা ওনাকে বললেন “কিছু বলবেন?” উনি বললেন “স্যার আসলে অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে। আপনাদের যদি আর তেমন কিছু জিজ্ঞাসা না থাকে তো আমি এইবার উঠি?” আরিফ বললেন “ রেজিস্টার বইটার আমরা কয়েকটা জায়গার একটু কপি করে নেব। আর সিডিগুলো আপাতত এখানেই রেখে যান। পরে দেখা হয়ে গেলে পাঠিয়ে দেব। ম্যানেজার উঠতে যাচ্ছিলেন তার আগেই মিস্টার বেরা কি ভেবে বললেন “দাঁড়ান। আরেকটা জিনিস জিজ্ঞেস করার ছিল। “
“দেখুন, ব্যাপারটা একটু অন্য অ্যাঙ্গেল থেকে দেখার চেষ্টা করছি। মেহেরা আসার আগের দিন থেকে ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যায়, রাইট? তার মানে চেক ইন করার আগেই ঠিক ছিল যে উনি ফার্স্ট ফ্লোরেই কোনও একটা ঘরে থাকবেন? ঠিক তো?” ম্যানেজার বললেন “হ্যাঁ।” বেরা বললেন “ অনুমান করতে পারি মেহেরার সেক্রেটারি এসে সব কিছু দেখে শুনে ওনার জন্য ঘর পছন্দ করেন। আর তারপর সেই ক্যামেরা আপনারা বন্ধ করে দেন।” ম্যানেজার বলে উঠলেন “নানা। রুম প্রায় ২৫ দিন আগে থেকে বুক করা ছিল। সঠিক ডেটটা দেখে বলতে হবে। তবে এই বুকিঙটা আমি নিজেই কনফার্ম করেছিলাম তাই মনে আছে। ব্যাপারটা খুলে বলছি। সচরাচর চেক ইন করার সময় গেস্টের প্রেফারেন্স আর কোন ঘর খালি আছে দেখে ঘর দেওয়া হয়। তবে এনার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়েছিল অন্য। প্রায় মাস দুয়েক আগে এনার সেক্রেটারি এনার নামে দুটো রুম বুক করেন। প্রেফারেন্সে লেখা ছিল পাশা পাশি দুটো রুম চাই। নইলে হবে না। তারপর উনি এখানে আসার দিন ২৫ আগে ওনার সেক্রেটারি আবার এসে হাজির হন। আমরা ওনাকে বলি যে পাশাপাশি দুটো রুম ওনাদের দিতে পারব, কিন্তু এক্স্যাক্টলি কোন কোন রুম দিতে পারব সেটা এত আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। চেক ইনের দিন ঠিক করা যাবে সেটা। তাতে সেক্রেটারি গোটা হোটেলটা একবার ঘুরে দেখেন। উনি ফিরে এসে বলে দেন যে ১০৯ আর ১১০ নাম্বার রুমই ওনার চাই। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন যে সেটা সময়ে জানা যাবে। উনি এমন রুম খুঁজছিলেন যেটা এমারজেন্সে এক্সিটের একদম পাশে। ১০৯ আর ১১০ হল এই ফ্লোরের লাস্ট দুটো ঘর। তাই এই দুটো ঘরই ওনার চাই। অগ্রিম একগুচ্ছ টাকাও দিয়ে গেছিলেন। এখন অবশ্য পুরোটা বুঝতে পেরেছি। আসলে…”
মিস্টার বেরা অলস ভঙ্গিতে বললেন “ রুম দুটোর ঠিক পাশেই এক্সিট। আর এই এক্সিটটা হোটেলের পেছন দিককার এক্সিট তাই তো? পিছনের গেট দিয়ে অনায়াসে ভি আই পি গেস্ট এসে ওনার সাথে দেখা করতে পারবেন গোপনে। সুটকেস নিয়ে এসে ওনার ঘরে রেখে দিয়ে চলে যেতে পারবেন। আর তেমন দরকার হলে উনিও সেই এক্সিট দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন। এমনকি ফার্স্ট ফ্লোরের করিডর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কারোর মুখোমুখি হওয়ারও কোনও সম্ভাবনা এখানে নেই, কারণ এক্সিটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেই প্রথম ঘরটা মিস্টার মেহেরার। লোকে না দেখলেও ক্যামেরা ওনাদের গতিবিধি ঠিকই ধরতে পারত আর পরে সেই জিনিস হোটেলের স্টাফ বা অন্য কেউ জেনে যেতে পারত। তাই ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরাও বন্ধ করে দেওয়া হল। অভূতপূর্ব সতর্কতা। একটা কথা, সংকেত মালিনীর ঘর থেকে বেরিয়ে যেই এমারজেন্সি এক্সিটটা দিয়ে … “ ম্যানেজার বললেন “ একই সিঁড়ি। হোটেলের পেছন দিকের এক্সিটে নিয়ে যাবে।” মিস্টার বেরা বললেন “আপনাকে শেষ দুটো উপকার করতে হবে। তাহলেই আপাতত আপনার ছুটি। প্রথমটা এখনই করুন। সংকেত নিজের রুমটা কবে বুক করেছে? আগে থেকেই বুক করা ছিল নাকি অন স্পট বুকিং করেছে এখানে এসে? আমি রুম বলতে ১০৭ নম্বর রুমের কথা বলছি। ” ম্যানেজার বললেন “স্যার এটা একটু চেক করে দেখতে হবে। “
উনি মোবাইল ওঠানোর তোড়জোর শুরু করেছেন দেখে মিস্টার বেরা ওনাকে বললেন “সাবধান। মালিনী যেন এই ব্যাপারটা কিছুতেই জানতে না পারে। “ ম্যানেজার বললেন “ ভেতরের ডাটা অপারেটরকে ফোন করে জেনে নিচ্ছি। আর তাছাড়া আজ মালিনীর নাইট নেই। অনেক দিন ধরে বেচারি নাইট করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আর তার ওপর…হ্যালো। শিবু? ভাই এখনকি তোর সামনে কম্পিউটার খোলা আছে। বাহ খুব ভালো। শোন না একটা উপকার করতে হবে ভাই। আর বলিস কেন? ১ মাসের জন্য রুম বুক করে আগে ভাগে কেটে পড়বে। এখন আবার নতুন বুকিং করে সেই ফাইন অ্যাডজাস্ট করার ধান্দা। একটা জিনিস দেখে একটু বল। ১০৭ নম্বর ঘর তো এখন খালি, নাকি? বেশ বেশ। ১০৭ নম্বর ঘরের লাস্ট বর্ডার কে ছিল একটু দেখে বল তো। হ্যাঁ তাহলে আমার ঠিক মনে আছে। এইবার একটা ছোট জিনিস, এই রুমের বুকিং ডিটেলসটা একটু দিতে পারবি? হ্যাঁ হ্যাঁ আগের বুকিঙের। আর বলিস কেন। হ্যাঁ বল। কি বলিস? আর … আরেকবার চেক করে দেখে বল। আচ্ছা ১০৮ নম্বর রুমের কি খবর রে? বুকিং ডিটেলসটা বল। বেশ বেশ। এইবার ১০৯ আর ১১০ নাম্বার রুমের বুকিং… একই দিনে তো। ঠিক আছে। লক্ষ্মীছেলে আমার। চল এখন রাখছি। একটু পরে গিয়ে কথা বলব। হ্যাঁ… আমার জন্য একটা ফিশ মিল বলে দিস। ভেরি গুড।”
মিস্টার বেরা আর আরিফ দুজনেই ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে আছেন। উনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু আবার ধীরে ধীরে বসে পড়ে বললেন “ ১০৯ আর ১১০ নম্বর ঘরের ব্যাপারে আপনাকে যা বলেছি সেটা একদম ঠিক। কিন্তু অন্যটা তাজ্জব ব্যাপার স্যার। দুই মাস আগে ওদের বুকিঙের ঠিক তিন দিন পর সংকেত রায়ের নামে রুম বুক করা হয় এই হোটেলে। মেহেরার সেক্রেটারি এসে যেদিন ১০৯ আর ১১০ নম্বর রুম ফাইনাল করে পেমেন্ট দিয়ে গেল, ঠিক তার পরের দিনই একজন এসে ১০৭ নম্বর রুমটা সংকেত রায়ের নামে কনফার্ম করিয়ে নিয়ে গেছে। দিনটা ছিল শনিবার, তাই আমি এখানে ছিলাম না। যিনি কনফার্ম করিয়েছেন তিনি আমাদের অন্য একজন জুনিয়র ম্যানেজার। যে এসেছিল সে পুরো ২৫ দিনের ভাড়া আগাম দিয়ে গেছে। অবশ্য কথা হয়েছিল যে চেকইনের সময় এক্সাক্ট কত দিন থাকবে সেটা জানানো হবে। একটু চড়া দামেই রুমটা বুক করা হয়েছে স্যার।”
মিস্টার বেরা বললেন “ধন্যবাদ। আপনি এইবার আসতে পারেন। আপনার সাথে আমাদের একজন অফিসার যাবেন, প্লেন ড্রেসে। তাকে আপনি ১০৭ নম্বর ঘরে নিয়ে যাবেন। উনি একটু ঘরটা সার্চ করে দেখবেন। “ ম্যানেজার বললেন “স্যার এখন সার্চ করে কি করবেন? সে ছেলে তো অনেক দিন হল ঘর ছেড়ে চলে গেছে। তারপর তো ঘর ভাল করে ধুয়ে মুছে সাফ করা হয়েছে। “ মিস্টার বেরা বললেন “ তবুও একবার দেখা যাক। আমি কিছু খুঁজছি না। আমার ধারণা কিছুই পাব না। আর সেটাই আমি কনফার্ম করতে চাই। “ আরিফ মিস্টার বেরার কথার মানে ধরতে পারলেও ম্যানেজার বাবু পারেননি। উনি বললেন “কিছুই পাবেন না তো…” মিস্টার বেরা হেয়ালি করে বললেন “ স্যার, ৭ দিন ধরে একটা ছেলে আপনাদের হোটেলের একটা রুমে ছিল। সে চলে যাওয়ার পর থেকে ওই রুমটায় এসে আর কেউ থাকেনি। কিন্তু তবুও বলছি ওই রুমে আমরা সত্যিই কিছুই পাব না। কিছু পেলেই ভাবনার কথা। কিছু না পেলে আমি আপাতত নিশ্চিন্ত। আপনি এইবার আসুন। ও হ্যাঁ আরিফ একজন ফটোগ্রাফারকেও অফিসারের সাথে পাঠিয়ে দিও। জাস্ট ইন কেস। “
প্রায় ২৫ মিনিট পর আরিফ ফিরে এসে বললেন “স্যার কি বুঝলেন?” মিস্টার বেরা বললেন “মণ্ডল কি চলে গেছে? নইলে ওকেও ডেকে নাও। আর রবিন?” আরিফ বললেন “সবাই আছে। সবাইকেই ডেকে নিচ্ছি। স্যার এইবার আর চা নয় অন্য কিছু খেতে হবে। পেটটা চুই চুই করছে। “ উনি হেসেবললেন “তথাস্তু। অর্ডার করো তোমরা। আমি মিটিয়ে দিচ্ছি।” আবার সবাই এসে গোল করে ঘিরে বসলেন মিস্টার বেরাকে। মিস্টার বেরা শুরু করলেন “ সবার আগে আরিফ তুমি একটা জিনিস জানো না সেটা আমি জানিয়ে দিতে চাই। তুমি যখন ম্যানেজারকে ছাড়তে গেছিলে তখন আমি মিস্টার মেহেরার সাথে ফোনে কথা বলে নিয়েছি। এর আগে অবশ্য একবার ওনার সাথে আমার কথা হয়েছে। তবে এইবার সিরিয়াসলি বললাম। ১০৭ নম্বর রুমের গেস্টকে উনি ঠিক মনে করতে পারছিলেন না। তবে ছবি মেইল করতে একবারে চিনে ফেললেন। সেদিন সকাল বেলার ঘটনাটাও খুলে বললেন। ওনার সাথে সংকেতের ধাক্কা লাগে ফার্স্ট ফ্লোরের লিফটের সামনে। ওনার বডি গার্ডরা এসে সংকেত কে লিফটের সামনে থেকে সরিয়ে দেয়। ওনারা নেমে চলে যাওয়ার প্রায় ১৫ মিনিট পর নিচে হইচই শুনে উনি দেখেন যে সংকেতের সাথে ম্যানেজমেন্টের বাওয়াল শুরু হয়েছে। বাকিটা পরে বলছি।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment