মুখোশ – The Mask [৩৮-৩৯]

লেখকঃ Daily Passenger

৩৮
সবাইকে আমরা যা যা জানতে পেরেছি সেই ব্যাপারে কিছুটা ওয়াকিবহাল করা দরকার। আমি খুব একটা ডিটেল করছি না। শুধু আমি কয়েকটা সিদ্ধান্তে এসেছি সেইগুলো এই বেলা বলে রাখতে চাই। আরিফ ভুল হলে ঠিক করে দিও। বা কোনও কাউন্টার হাইপোথিসিস থাকলে সেটাও বলতে পারো।
ও হ্যাঁ। ম্যানেজারের সাথে আমাদের যা কথাবার্তা হয়েছে সেগুলো আমরা সব রেকর্ড করেছি। তোমরা পরে সেগুলো শুনে নিও। তোমাদেরও যদি অন্য কোনও প্রশ্ন বা হাইপোথিসিস থাকে সেটাও পরে বলতে পারো। হোটেলের ফুটেজগুলোও আছে, সেগুলোও দরকার হলে দেখে নিও। আমি আপাতত ওইগুলো রেখে দিয়েছি, কারণ পরে দরকার হতে পারে। এবারও আমি পয়েন্ট অয়াইস বলছি। আর যেভাবে ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে মনে করছি সেইভাবে সাজাচ্ছি। আবারও বলছি এটা হল আমার হাইপোথিসিস। এইবার বলছি তাহলে? প্লীজ কেউ একজন নোট করে নাও। খাবারের কথা বলেছ? প্রথমে আমি কিছু ফ্যাক্টস বলছি, তারপর হাইপোথিসিস।“
১। আমাদের ডিফেন্স রিসার্চ একটা ডেডলি অস্ত্র বানানোর ডিসিশন নেয় বছর দুয়েক আগে। রঞ্জন বাবু তখন থেকে ওদের সাথে কাজ করছেন গোপনে। মাঝে অবশ্য ছাড়া ছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শুরু দিকটায় উনি খুব ক্লোসলি কাজ করেছেন টিমের সাথে। মেহেরাও সেই সময় থেকেই একই টিমের পার্ট। শুনে বুঝতে পারলাম যে এই অস্ত্র একবার তৈরি হলে আমাদের শ্ত্রু দেশগুলোর থেকে আমরা অনেকটাই এগিয়ে থাকব। এই রকম জিনিস আগে কেউ কখনও বানায়নি।
২। মাস আটেক আগে মেহেরা কোলকাতায় আসেন। রঞ্জন বাবুর সাথে দেখা করেন। ডিফেন্সের কাজ মোটামুটি শেষ। রঞ্জন বাবুকে উনি পুরো জিনিসটা রিভিউ করতে বলেন। আর সেই সাথে আরেকটা অনুরোধ করেন। ডিভাইসটার জন্য একটা ইন্টালিজেন্ট ফিউস তৈরি করতে। ওইটা ছাড়া এই জিনিসটা ব্যবহার করা যাবে না। এই নিয়ে নাকি রঞ্জন বাবুর পচুর পড়াশুনা আছে, আর একটা পেটেন্ডও নিয়েছেন উনি। প্লীজ ডোন্ট আস্ক যে এই ইন্টালিজেন্ট ফিউস বস্তুটা কি, কারণ আমি সেটার মাথা মুণ্ডু কিছুই জানি না। আমি আজ অব্দি বাড়ির ফিউসই জীবনে কোনও দিনও চেঞ্জ করিনি। মিস্টার মুখার্জিকে বলা হয় যে সেন্ট্রাল গভমেন্ট এই ব্যাপারে ওনাকে সব রকম সহযোগিতা করবে।
৩। রঞ্জন বাবু কাজটা হাতে নেন। উনি বিচক্ষন লোক। খুব কম সময়ের মধ্যে মোটামুটি জিনিসটা তৈরিও করে ফেলেন। ডেমোর বন্দবস্ত করা হয়। সবাই দেখে খুশি। ডিসাইন ফাইনাল করার কথা বলা হয় রঞ্জন বাবুকে।
৪। মাস তিনেক আগে রঞ্জন বাবুর কাজ শেষ হয়। মেহেরাকে উনি ব্যাপারটা জানান। মেহেরা ঠিক করেন যে তিনি নিজে আসবেন কোলকাতায়। কথাবার্তা বলার পর ডেট ফাইনালাইস করা হয়।
৫। ব্লু রিসোর্ট হোটেলে ওনার নামে রুম বুক করা হয়। রুম এখনও ফাইনাল নয়। কারণ হোটেলের প্রথা হল এই যে চেক ইনের সময় গেস্টের প্রেফারেন্স আর রুমের অ্যাভেইলেবিলিটি দেখে তাকে রুম দেওয়া হবে।
৬। এর মধ্যে ইয়া বড় বড় আর্মি অফিসাররা এই ব্যাপারের সাথে ইনভলভ হয়ে পড়েন। কিন্তু এই সময় একটা সমস্যা দেখা দিল। এটা এমন একটা জিনিস যেটা নিয়ে বাইরে আলোচনা করা যাবে না। জানবে শুধু আর্মির কিছু অফিসার, আর কিছু উচ্চ পদস্থ অফিসার ফ্রম মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্স। কিছু বৈজ্ঞানিকও জানবেন এই ব্যাপারটা নিয়ে। পার্ট বাই পার্ট এগোনো হবে গোটা জিনিসটা নিয়ে। গোটা প্রজেক্টের অনেকগুলো ফেস আছে। যতটা সম্ভব গোপনীয়তা বজায় রেখে পুরো কাজটা শেষ করতে হবে।
৭। সমস্যা হল চারপাশে চরের অভাব নেই। আমাদের শত্রু দেশগুলোর চর তো আছেই। তাছাড়া ইন্টারনাল এনিমিও কম নয়। তাছাড়া আছে টেরর প্রবলেম। মেহেরা একটা খুব বিখ্যাত ফেস। মেহেরা বেশী ছোটাছুটি করছে মানে এরা সবাই বুঝে যাবে যে কিছু নতুন ব্যাপার হতে চলেছে। তাই ওনাকে স্পেশাল সিকিউরিটি প্রভাইড করেছে গভমেনট। কিন্তু এখন প্রবলেম হল যাদের সাথে মেহেরা দেখা করবেন তারাও সবাই নেক্সট জেনারেশন আর্মসের সাথে কোনও না কোনও ভাবে লিঙ্কড। সুতরাং ব্যাপারটা জানাজানি হতে বেশী সময় লাগবে না। তাই চাই নিরাপত্তা। আর যথা সম্ভব গোপনীয়তা। এই ব্যাপারে কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না। এমনকি গভমেন্টের নিজের লোককেও নয়।
৮। বাইরে কোথাও মিটিং মিছিল করলে জানাজানি হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। আর মিথ্যা বলব কেন আমাদের নিজেদের ভেতরেও তো কথা চালাচালি করার লোকের কোনও অভাব নেই। সুতরাং ঠিক হল দরকারি মিটিংগুলো সব হবে ভীষণ গোপনে এই ব্লু রিসোর্ট হোটেলে।
৯। এইবার রঞ্জন বাবুর মতন লোক ছাতি চিতিয়ে হোটেলে এলে আর কেউ জানুক না জানুক গোটা মিডিয়া সেটা নিয়ে তুলকালাম বাঁধিয়ে দেবে। তার ওপর হোটেলে আছেন মেহেরা। সুতরাং। আরেকটু ভেবে ঠিক করা হল পাবলিকলি কেউ কাউকে মিট করবে না। হোটেলের স্টাফদেরও বিশ্বাস করা যাবে না। সুতরাং যারা মেহেরার সাথে দেখা করতে আসবেন তারা আসবেন পেছনের গেট দিয়ে। এমারজেন্সি এক্সিটের প্যাসেজ দিয়ে ওনারা ওপরে উঠে আসবেন। এইবার ঘর যদি করিডরের মাঝ খানে হয় তো আসতে যেতে কারোর না কারোর সামনে আগন্তুক কে পড়তে হতে পারে। তাই এক্সিট ডোরের একদম সামনের ঘরটা বুক করতে হবে। তাতেও কেউ না কেউ দেখে ফেলতে পারে। স্টিল দ্যাট ইস মোর সিকিওর্ড। সিকিউরিটি মেসার হিসাবে কয়েকটা জিনিস ঠিক করা হল।
ক। হোটেলের পেছন দিকের সিসি টিভি ক্যামেরা বন্ধ থাকবে।
খ। যখন কোনও গেস্ট পেছনের গেট দিয়ে ঢুকবেন তখন সমস্ত হোটেলের কর্মচারীদের সেখান থেকে
সরিয়ে নেওয়া হবে।
গ। যে ফ্লোরে মেহেরা থাকবেন সেই ফ্লোরের ক্যামেরা বন্ধ থাকবে।
ঘ। ঘর হবে এক্সিটের একদম মুখে।
ঙ। যখন কোনও গেস্ট আসবেন তার আগে সেই ফ্লোর থেকে সব রুম বয়দের সরিয়ে নেওয়া হবে।
চ। হোটেলের একজন কি দুজন বাদ দিয়ে কেউ জানবে না যে কোনও হাই প্রোফাইল গেস্ট এসেছে মেহেরার রুমে।
ছ। আর মেহেরা খুব লো প্রোফাইল মেন্টেন করবেন নিজে।
জ। বাইরে গভমেন্ট প্লেসে কোথাও এরা মিট করবেন না। কারণ সেখানে চর না থাকলেও মিডিয়ায় এই ব্যাপারটা প্রচার হতে বেশী সময় লাগবে না। তারপর সবাই কিছু একটা হচ্ছে সেটা বুঝে ফেলবে।
১০। আড়াই মাস মতন আগে মেহেরার সেক্রেটারি নিজে এসে পুরো হোটেল দেখে ম্যানেজারকে গোপনীয়তার ব্যাপারে কিছুটা আভাষ দিয়ে দুটো রুম বুক করেন। বুকিং করলেও ১০৯ আর ১১০ নম্বর ঘরের ব্যাপারে তখন কোনও কিছু ঠিক করা ছিল না। ১০৯ আর ১১০ নম্বর ঘরেই যে ওনারা থাকবেন সেইটা ওনার আসার ২৫ দিন মতন আগে এসে ঠিক করেন এই সেক্রেটারি বাবু। ঘর দুটো করিডরের একদম শেষ প্রান্তে। তারপরেই এমারজেন্সি এক্সিট। আর এই এক্সিটটা সোজা নেমে গেছে হোটেলের পেছনের গেটের সামনে।
১১। এইবার অন্যদিকে বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেছে ইতিমধ্যে। এর মধ্যে দুটো ফ্যাক্ট আর বাকিগুলো হাইপোথিসিস।
হাইপোথিসিস-১। এত গোপনীয়তা সত্ত্বেও ইতিমধ্যে আমাদের শত্রু বা শত্রুরা খবর পেয়ে গেছে যে একটা ভয়ানক কিছু তৈরি করছে আমাদের দেশের বৈজ্ঞানিক মহল। এবং সেটা আর্ম সংক্রান্ত কিছু। সুতরাং লোক লাগিয়ে দেওয়া হল পিছনে।
হাইপোথিসিস-২। ওরা রঞ্জন বাবুর ইনভলভমেন্টের ব্যাপারটা জেনে ফেলে। এইখানে একটা তথ্য জানিয়ে রাখছি। একটা সহজ সলিউশন হতেই পারত গোটা ব্যাপারটার। আমি এই প্রশ্নটা মিস্টার মেহেরাকে করেছিলাম। এতকিছু না করে রঞ্জন বাবুকে প্রপার সিকিউরিটি দিয়ে নিয়ে গেলেই তো হত। দিল্লি হোক বা কোনও একটা আর্মির ব্রাঞ্চে। কিন্তু সেটা এই পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়। কারণ আমাদের দেশের রাজনীতি। দুটো জায়গায় বাই-পোল ইলেকশন হবে। এই দুটো জায়গাতেই রঞ্জন বাবু পার্টির ফেস। ওনাকে এখন রাত দিন ভোট জোটানোর জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। এছারাও পার্টির অনেক কাজ দেখতে হচ্ছে ওনাকে। রঞ্জনবাবু যে কাজটা করছিলেন সেটা করছিলেন গোপনে। উনি যে রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত সেই দলের নেতারাও ওনার এই কাজের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। এই অবস্থায় উনি কোলকাতা ছেড়ে চলে গিয়ে আর্মির অফিসারদের সাথে বসে মিটিং মিছিল করলে পার্টির উপর মহল সেটাকে ভালো চোখে মেনে নেবে না। পার্টির ভেতরেই ওনার পেছেন লোক লাগবে এটা জানার জন্য যে কি এমন কাজ আছে ওনার ডিফেন্স মিনিস্ট্রির সাথে যার জন্য উনি নিজের পার্টিকে এই ইলেকশনের সময় অবহেলা করছেন। আর আপনারা নিশ্চই এটা জানেন যে রাজনৈতিক পার্টির অনেকের সাথেই আমাদের শত্রুপক্ষের চরদের গোপনে যোগাযোগ থাকে। মোটের ওপর পার্টির কাজ ছেড়ে রঞ্জন বাবুর এই পরিস্থিতিতে কোলকাতা ছেড়ে কয়েকদিনের জন্য কোথাও যাওয়া অসম্ভব। আর তাতে অন্যান্য রিস্কও থেকে যায়। রাজনৈতিক মহলে কথা চালাচালি শুরু হলে ব্যাপারটা জানাজানি হতে বেশী সময় লাগবে না। আমাদের দেশের এটা দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশের রাজনীতি আমাদের দেশের বিজ্ঞানের থেকে অনেক বেশী শক্তিশালী। সুতরাং কি দাঁড়াল? যা হবার সব কিছু হবে এই কোলকাতার বুকে।
হাইপোথিসিস-৩। আমার বিশ্বাস কোনও একটা ব্যাকচ্যানেল লাগিয়ে সংকেত রায় নামক এই ব্যক্তিটিকে এন্ট্রান্সে উত্তীর্ণ করে দেওয়া হয়। বোর্ডের পরীক্ষায় তার নাম বেরোয়। পয়সা দিলে এমনটা যে হয়েই থাকে সেটা অস্বীকার করার কোনও মানে নেই। আর ব্যাক চ্যানেল বলতে আমি খুব স্ট্রং ব্যাক চ্যানেল বলছি। কোন চ্যানেলে এটা করা হয়েছে সেটা আপাতত আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। যে নিজের প্রভাব খাটিয়ে সংকেতের নাম মেরিট লিস্টে তুলে দিয়েছে সে হয়ত নিজেই জানে না যে এর পেছনে কোন চক্রান্ত কাজ করছে। হয়ত তার কোনও এক প্রভাবশালী বন্ধু মদের ঠেকে তাকে এই উপকারটা করতে বলেছেন টাকার বিনিময়ে আর উনি করে দিয়েছেন। যিনি উপকারটা চেয়েছেন তিনিও হয়ত এর মাথামুণ্ডু কিছুই জানেন না কারণ তাকেও হয়ত কেউ না কেউ টাকা খাইয়ে এই রিকোয়েস্ট করেছে। মানে হতে পারে ইট ইস অ্যা লং চেইন। তাই এই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কোনও লাভ নেই।
ফ্যাক্ট-১। যেই মুহূর্তে মিস্টার মেহেরার জন্য ব্লু রিসোর্ট হোটেলে দুটো রুম বুক করা হল ঠিক তার তিন দিন পরে সংকেতের নামে একটা রুম বুক করা হল সেই একই হোটেলে। দুজনকে একই হোটেলে রাখতেই হবে।
ফ্যাক্ট-২। যেই মুহূর্তে বেশী টাকা দিয়ে মিস্টার মেহেরার সেক্রেটারি ১০৯ আর ১১০ নম্বর রুম ফিক্স করলেন ঠিক তার পরের দিন একজন অচেনা লোক এসে ১০৭ নম্বর রুমটা ফিক্স করে ফেলল সংকেত রায়ের জন্য। একেও অনেক চড়া রেটে ঘর বুক করতে হয়েছে। সংকেতের বক্তব্য ওদের টাকার টানাটানি। কিন্তু সেটাই যদি হবে তো এরকম চড়া রেটে ২৫ দিনের জন্য রুম বুক করা হল কেন?
হাইপোথিসিস-৪। মেহেরার রুম ফিক্স করার ব্যাপারে যথেষ্ট গোপনীয়তা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও সেটা জানাজানি হওয়ার অর্থ হল হোটেলের ভেতরেই কেউ আছে যে ব্যাপারটা লিক করেছে। হতে পারে মিস্টার মেহেরা এই হোটেলে ঘর বুক করার পর তাকে টাকা দিয়ে দলে টেনে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মোটের ওপর কেউ একজন হোটেলে আছে যে এই খবর গুলো লিক করেছে। অন্তত রুম ফিক্স করার খবরটা। শহরে কে যে কি করছে সেটা কি আর ঠিক করে বলা যায়! আরও গুছিয়ে বলতে মোটের ওপর আমার মতে এই হোটেলে কেউ একজন আছে যে খবর লিক করছে বা সংকেতকে হেল্প করছে। এই নিয়ে পরে আরও কিছু বলার আছে আমার। ভুলে গেলে মনে করিয়ে দিও।
১২। আবার মেইন ঘটনায় ফেরা যাক। সংকেত চলে এলো হোটেলে, ছাত্রের বেশে। ঘর আগে থেকেই ফিক্সড।
১৩। তারপর এলেন মিস্টার মেহেরা। এনার ঘরও আগে থেকেই ফিক্সড।
১৪। সব রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা পাকা করা হল মিস্টার মেহেরার জন্য।
১৫। উনি এখানে আসার আগের দিন থেকে ফার্স্ট ফ্লোর আর পেছনের গেটের ক্যামেরা অফ করে দেওয়া হল।
১৬। সংকেত রায় জেনে ফেলল যে ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কি করে জানল সেটা আমাদের ভালো মতন ভেবে দেখতে হবে। হতে পারে… যে আগে রুমের ব্যাপারে সংকেত দের খবর দিয়েছিল সেই জানিয়েছে। কিন্তু এখানে একটা অন্য সমস্যা আছে। ম্যানেজারের বয়ান অনুযায়ী ৪-৫ জন লোক ছাড়া কেউ জানত না এই ব্যাপারটা। তারা সবাই হোটেলের পুরানো আর বিশ্বস্ত লোক। বুকিঙের খবর জানাজানি হতে সময় লাগে না। কিন্তু এটা এমন একটা জিনিস যেটা সহজে জানতে পারা যায় না। কেউ হঠাৎ করে গিয়ে ক্যামেরার একটা সুইচ বন্ধ করে দিলে বাকি কারোর সেটা জানার কথা নয়। কম্পিউটারে বসে রেকর্ড বা ফুটেজ চেক না করলে ক্যামেরা কাজ করছে কিনা সেটা বোঝার দ্বিতীয় কোনও উপায় নেই। আমার বলার অর্থ এইঃ প্রথম ব্যক্তি, যে সংকেতদের রুমের ব্যাপারে জানিয়েছিল আর দ্বিতীয় ব্যক্তি, যে ক্যামেরার ব্যাপারটা সংকেতকে জানিয়েছে, হতেই পারে তারা ভিন্ন দুজন ব্যক্তি। আবার এমনও হতে পারে যে তারা একই ব্যক্তি। আরেকটা সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না এখানে, সেটাও বলে রাখছি, সংকেত নিজেই হয়ত কোনও ভাবে জেনে গেছে যে ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরা কাজ করছে না। সবটাই জানতে হবে।
১৭। সংকেত রায় জেনে বুঝে লিফটের সামনে গিয়ে ধাক্কা মারে মিস্টার মেহেরাকে। কারণ সেই সুযোগে তার ঘরের চাবিটা সরিয়ে নেওয়া। সোজা কথায় পকেট মেরেছে।
১৮। মিস্টার মেহেরার গার্ডরা এসে সংকেত কে সরিয়ে নিয়ে যায়। মিস্টার মেহেরাকে নিয়ে ওরা নিচে নেমে যায়। অন্য দিকে চাবি হাতে পেয়েই সংকেত ওনার ঘরে গিয়ে কিছু একটা করে ফেলল। সেটা কি আমি জানি না। কিন্তু ওরা নেমে যাওয়ার আরও ১৫ মিনিট পরে সংকেত নিচে নেমে আসে অন্য দিকের এমারজেন্সি এক্সিট দিয়ে। এই এক্সিটটা হোটেলের সামনের দিকের এক্সিট যেটা শেষ হয় হোটেলের মেইন রিসেপশনের ঠিক পাশে। এই ১৫ মিনিট ল্যাগের জন্যই আমার বিশ্বাস সংকেত চাবিটা হাতে পেয়ে কিছু একটা নিশ্চই করেছে।
১৯। সংকেতের কাজ শেষ হওয়ার পর ও চাবিটা ইচ্ছে করে করিডরের এক পাশে ফেলে দেয়। তার আগে অবশ্য সেই চাবি থেকে নিজের হাতের ছাপ মুছে দিয়েছিল। আর তাই চাবিতে শুধু সংকেতের নয়, অন্য কারোর, এমনকি মিস্টার মেহেরার হাতের ছাপও সেদিন পাওয়া যায়নি।
২০। মেহেরা সাবধানী লোক এবং একই সাথে বিচক্ষনও বটে। মেহেরা তক্ষুনি যদি বুজতে পারে যে চাবিটা মিসিং তাহলে খুব বিপদ হয়ে যাবে। সুতরাং এই অবস্থায় সংকেত কে অন্য একটা diversionary tactic অ্যাপ্লাই করতে হয়। রাদার ও সেফটির জন্য সেটা করতে বাধ্য হয়। ও জানে যে এই ফ্লোরের ক্যামেরা কাজ করছে না। ও চুপচাপ নো স্মোকিং বোর্ডটা সরিয়ে ফেলে। সেখানেই দাঁড়িয়ে সিগারেট জ্বালায়। আলার্ম বেজে ওঠে। একজন দশাসই সিকিউরিটি ছুটে এসে ওকে ধূমপান করতে বারণ করে। ও তাকে পাত্তা না দেওয়ার ভান করে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। সিকিউরিটি নিজের ডিউটি করতে গিয়ে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু সংকেতকে ওই সিকিউরিটি চিনত না। সংকেত সিকিউরিটির বেশ কয়েকটা হাড় ভেঙ্গে দেয় কয়েক মুহূর্তে, দিয়ে তাকে লিফটে করে নিচে পাঠিয়ে দেয়।
২১। নিচে এসে সিকিউরিটি কমপ্লেন করে। সংকেত এমারজেন্সি এক্সিট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে ভালোমানুষ সেজে পুরো ব্যাপারটা অস্বীকার করে। মিস্টার মেহেরার বডি গার্ড ওকে ধাক্কা দিয়ে লিফটের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনাটাকে প্রচণ্ড রঙ চড়িয়ে সবার সামনে তুলে ধরে ব্যাপারটাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ওর হাতিয়ার একটা, আর টার্গেটও একটা। হাতিয়ারঃ ওপরের ক্যামেরা কাজ করে না। তাই কেউ চাইলেও কিছু প্রমান করতে পারবে না। টার্গেটঃ মিস্টার মেহেরাকে কোনও ভাবে বিচলিত করে অন্য দিকে ব্যস্ত রাখা। ওনার মনটা ওনার চাবির দিকে যেতে দেওয়া চলবে না। ফিকিরটা কাজে লাগে। ও সবার সামনে উপরে সিকিউরিটিকে পেটানোর ব্যাপারটা অস্বীকার করে। এবং একই সাথে নাম না নিয়ে এটাও বলে যে মিস্টার মেহেরার বডি গার্ড ওকে ফিসিকালি অ্যাবিউস করেছে। কোনও গেস্টেকে কেউ ফিসিকালি অ্যাবিউস করতে পারে না। সুতরাং, সংকেত একসাথে দুটো চ্যালেঞ্জ করে বসে হোটেলের ম্যানেজমেন্টের সামনে। এক, সবার সামনে ফুটেজ খুলে দেখা হোক ওই বডি গার্ড ওকে ফিসিকালি অ্যাবিউস করেছে কিনা!
আর দুই, ও সিকিউরিটির গায়ে হাত তুলেছে কিনা সেটাও ফুটেজ খুলে সবার সামনে দেখা হোক। সাইকোলজিকাল গেমটা চিন্তা কর। ও যদি না জানত যে ক্যামেরা কাজ করছে না তাহলে এত সাহস করে এতগুলো লোকের সামনে মিস্টার মেহেরাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারত না। কিন্তু এখন মিস্টার মেহেরা আর হোটেল ম্যানেজমেন্ট দুজনেই ব্যাকফুটে পড়ে গেছে। এরা দুজনেই জানে ফুটেজ নেই। তাই কিছু প্রমান করতে পারবে না। হোটেল ম্যানেজমেন্ট সংকেতের চেঁচামেচি শুনে মিস্টার মেহেরাকে আটকে রাখতে বাধ্য হয়। স্বাভাবিক ভাবেই এই অবস্থায় মিস্টার মেহেরার মন কোনও ভাবে ওনার চাবির দিকে যেতে পারে না। অন্য দিকে হোটেল ম্যানেজমেন্টও ভয় পেয়ে গেছে কারণ সংকেত কথার ছলে সবার সামনে ঘোষণা করে দিয়েছে যে যদি ফুটেজ না থাকে তাহলে ম্যানেজমেন্টকে হোটেলের গেস্টদের সিকিউরিটি নিয়ে ছিনিমিনি খেলার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ভিড় জমতে শুরু করে। ম্যানেজমেন্ট কোনও মতে প্রাইভেসির অজুহাত দেখিয়ে গোপনে ফুটেজ চেক করার ভান করে জানিয়ে দেয় যে দুজনেই নিরপরাধ। সবাই সরে পড়ে। সংকেতের কাজ হয়ে যায়। এরকম ঘটনার পর স্বাভাবিক ভাবেই মানুষ ডিস্টার্বড হয়ে থাকে। তাই বিকেল অব্দি মিস্টার মেহেরা বুঝতেই পারেননি যে ওনার পকেটে ওনার ঘরের চাবিটা আর নেই। পরে বুঝতে পেরে অবশ্য এফ আই আর করেছিলেন।
২২। এর পর একদিন সংকেত কোনও ভাবে জানতে পারে যে ওর যা দরকার সেটা মিস্টার মেহেরার ঘরে চলে এসেছে। কিভাবে জানতে পারে সেটা নিয়ে আমাকে আরও ভাবতে হবে। কিন্তু এটা ঠিক যে আর্মির দুই জন অফিসার ঠিক সেদিনই মিস্টার মেহেরার হাতে আরেকটা জিনিস হ্যান্ড ওভার করে কালো রঙের সুটকেসে। ফার্স্ট ইন্টালিজেন্ট ফিউস। রঞ্জন মুখার্জির ডিসাইন ব্যবহার করে ইঞ্জিনিয়াররা এই ফিউসটা বানিয়েছে। সুতরাং কি দাঁড়াল পুরো ব্যাপারটা? মিস্টার মেহেরার ঘরে আগেই ফাইলটা এসে গিয়েছিল। আর এখন ফার্স্ট ফিউসটাও চলে এসেছে। এগুলো স্থানান্তরিত হওয়ার আগে হাতিয়ে নিতে হবে। রাত ২ টো বেজে ১০ মিনিটে মিস্টার মেহেরা ড্রিংক করে ঘুমাতে যান। ২.৩০ মিনিটের পর ওনার ঘরে ঢোকে সংকেত রায়। কি ভাবে ঢুকেছিল সেটাও ভাবার বিষয়। কিন্তু মোটের ওপর সংকেত যা নেওয়ার নিয়ে বেরিয়ে যায়। সেদিনই ৩.৩০ মিনিটে ও চেক আউট করে। ঠিক ৫ টা বেজে ২৫ মিনিটে ও হোটেল ছেড়ে চলে যায়। চলে আসে আমাদের বাড়িতে।
এইখানে বলার জিনিস একটাই, ভুলে যেও না দুটো ফাইলই আগে থেকে মিস্টার মেহেরার হাতে ছিল। কিন্তু ঠিক যেদিন অ্যাকচুয়াল ফিউসটা মিস্টার মেহেরার হাতে আসে, ঠিক সেদিনই রাতে ওটা চুরি যায়। চুরি যায় ২ টো বেজে ১০ মিনিটের পর। কারণ তার আগে মিস্টার মেহেরা জেগে ছিলেন। আর জিনিসগুলো ছিল ওনার চোখের সামনে। উনি ঘুমিয়ে পড়ার পরই জিনিসটা চুরি যায়। আমরা ফুটেজে দেখেছি সংকেত ২.৩০ অব্দি অন্য একজনের ঘরে ছিল ফোর্থ ফ্লোরে। তারপর ও নিচে নেমে আসে। এইখানে একটা জিনিস বলে রাখি, ফিউস জিনিসটা খুব একটা বড় কিছু নয়। যদিও সেটাকে একটা বড় সুটকেসে ভরে নিয়ে আসা হয়েছিল, তবুও জিনিসটাকে খুব সহজেই একটা খুব ছোট হ্যান্ড ব্যাগের ভেতর পুরে রাখা যায়। এটা মিস্টার মেহেরাই আমাকে বলেছেন।
২৩। অন্য দিক থেকে বলছি এইবার। সংকেতকে যদি শুধু জিনিসটা বানানোর ফরমুলা চুরি করতে হত তাহলে কিন্তু আগেই করতে পারত। কারণ মিস্টার মুখার্জির ফাইলটা অনেক আগেই মিস্টার মেহেরা পেয়ে গেছেন। আর আমি আশা করছি সংকেত সেটা জানত। তাহলে ওকে ফিউসটা হাতে আসা অব্দি ওয়েট করতে হল কেন? এই থেকেই আমি আরেকটা ঘটনার ব্যাপারে একটা হাইপোথিসিস তৈরি করেছি। মন দিয়ে শোনো সেটা। ইন্টারেস্টিং লাগবে।
ক। রঞ্জন মুখার্জি কেন মারা গেলেন? রঞ্জন মুখার্জি ছাড়া এই জিনিস আর কেউ বানাতে পারবে না। মানে আজকের ডেটে। পরে কি হবে সেটা নিয়ে আপাতত চিন্তা করার কোনও কারণ নেই। মিস্টার মেহেরার বয়ান অনুযায়ী, যেদিন রঞ্জন মুখার্জি ওনাকে ফাইলটা হ্যান্ড ওভার করেন ঠিক তার দুদিনের মধ্যেই ওনাকে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ দা ব্রেন ইস গান। অ্যান্ড এই অবস্থায় ফিউসের ডিসাইনের দুটো কপি আছে। যার একটা আছে মিস্টার মেহেরার কাছে। আর একটা রঞ্জন মুখার্জির প্রাইভেট সেফের ভেতর। অবশ্য আরেকটা কপি আছে, সেটার কথায় আসছি।
খ। রঞ্জন মুখার্জির দেওয়া ফাইলটা যদি মেহেরার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় তাহলেও ব্যাপারটা পুরোপুরি কভার করা যাবে না। কারণ, সংকেত জানত যে ইতিমধ্যে বৈজ্ঞানিক আর ইঞ্জিনিয়াররা মিলে গোপনে আর্মিদের রিসার্চ সেন্টারে মিস্টার মুখার্জির ডিসাইন অনুযায়ী একটা কিছু তৈরি করছে। সেটা দেওয়া হবে মিস্টার মেহেরার হাতে। আর সেটা যত দিন না হাতে পাচ্ছেন ততদিন মিস্টার মেহেরা শহর ছেড়ে নড়বেন না। সেই সাথে আরেকটা জিনিস বলে রাখি তোমাদের। সুটকেসে শুধু ফিউসটাই ছিল না। আরেকটা ছোট ফাইলও ছিল। সেই ফাইলটা পড়েই ইঞ্জিনিয়াররা এই জিনিসটা বানিয়েছে। অর্থাৎ সিকিউরিটি রিসনে ইঞ্জিনিয়াররা যে ডিসাইন দেখে ফিউসটা বানিয়েছে সেই জিনিসটাও সরকারের হাতে তুলে দিচ্ছে। এরপর ওরা চাইলেও আরেকটা ফিউস বানাতে পারবে না। বলাই বাহুল্য যে অনেকে মিলে এটা বানিয়েছে। সেই অনেকের প্রত্যেকেই শুধু একটা ছোট অংশের ওপর কাজ করেছে। পুরো ব্যাপারটা কেউই জানে না। সিকিউরিটি ইস্যু! বুঝতেই পারছ।
এইবার, দুটো ফাইল, অর্থাৎ ফার্স্ট ফাইল আর রঞ্জন মুখার্জির দেওয়া ফাইলটা যদি ইতি মধ্যে চুরি হয়ে যায় তাহলে এই থার্ডফাইলটা আর কোনও দিনই সিকিউরিটি রিসনে মিস্টার মেহেরা নিজের ঘরে আনবেন না। অর্থাৎ, অরিজিন্যাল জিনিসটার, মানে ফিউস ছাড়া বাকি জিনিসটার অনেকগুলো ফাইল অলরেডি আমাদের দেশের কাছে আছে। আর ফিউসের ডিসাইনের এই থার্ড কপিটাও আমাদের কাছে আছে। তাই মিস্টার সংকেত রায় অপেক্ষা করতে লাগল কবে এই থার্ড আর লাস্ট কপিটা মিস্টার মেহেরার হাতে এসে পৌছায়। আর সেই সাথে ফিউসটা। ফিউসটাও হাতানো খুব দরকার। কারণ পরে এই ফিউসটা দেখেই আবার সেই অরিজিন্যাল ডিসাইনের আরেকটা কপি বৈজ্ঞানিকরা বানিয়ে ফেলতে পারবে। রঞ্জন মুখার্জি আউট। সুতরাং এই কটা জিনিস হাতিয়ে নিতে পারলে আমাদের দেশের হাতে আর কিছুই থাকবে না। অনেক প্ল্যান করে খেলাটা খেলা হয়েছে আরিফ। যত ভাবছি তত নতুন দিক খুলে যাচ্ছে।
গ। সংকেত সবকিছু হাতিয়ে নিয়ে সেদিনই বেরিয়ে গেল হোটেল ছেড়ে। ব্যস। গল্প এখানেই শেষ।
২৪। ব্রেন, মানে রঞ্জন মুখার্জিকে শেষ করা এই গোটা মিশনের একটা বড় পার্ট। এমনিতে রঞ্জন মুখার্জির নাগাল পাওয়া সংকেত রায়ের পক্ষে তেমন সহজ কিছু নয়। দোলন মুখার্জি সংকেতের ক্লাসমেট। ওকে পটিয়ে ওদের বাড়িতে ও যে ইতিমধ্যে এন্ট্রি নিয়ে নিয়েছে সেটা আমি জানি। কিন্তু রঞ্জন মুখার্জির বাড়িতে ঢুকে রঞ্জন মুখার্জিকে খুন করলে সবাই খুব সহজেই বুঝে যাবে যে ওই খুনি। তাই রঞ্জন মুখার্জিকে মারতে হবে এমন একটা জায়গায় যেখানে অনেক লোকের ভিড়। আর সবাই ব্যস্ত। যেখানে কেউ সংকেত রায়কে সন্দেহ করবে না।
২৫। সুতরাং…প্রথমে শান্তনু কে মেরে রঞ্জন মুখার্জি কে পাবলিক প্লেসে আসতে বাধ্য করো। দোলনের বন্ধু হিসাবে ও রঞ্জন বাবুর ধারে কাছে থাকতে পারবে। আর কোনও একটা সুযোগে…
৩৯
“নাহ আর ভাবতে পারছি না। এখন আপাতত এই অব্দিই থাক। কি বলো? এখনও অনেক কাজ বাকি। কি হল? পিজ্জাগুলো তো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। নাও, খেয়ে নাও। পরে ভেবে আমার কথাগুলোর ব্যাপারে কমেন্ট করবে। আরও অনেক কিছু ভাবা বাকি। অনেক কিছু করা বাকি। তবে এতগুলো হাইপোথিসিস থেকে শুধু একটাই ফাইনাল হাইপোথিসিস করা যায়। আমার মতে সংকেত রায় সুবিধের ছেলে নয়। ওর সব কিছু ফেক। নাও নাও শুরু করো। আমাকেও একটা স্লাইস দাও প্লীজ। তবে একটা ব্যাপার ক্লিয়ার করে দিচ্ছি এখনই। এই ব্যাপারে যতক্ষণ না একটা কিছু সুরাহা হচ্ছে ততক্ষণ অব্দি বাড়ি ফেরার কথা মাথা থেকে বের করে দাও সবাই। আগে কাজ, তারপর বাকি সব কিছু। ”
একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁসতে হাঁসতে মিস্টার বেরা বললেন “ আমি অ্যাকশন নেবো। কিন্তু তার আগে একটু সিওর হয়ে নিতে চাইছি শুধু একটা ব্যাপারে। সেটা হল এই যেঃ সংকেত ইস দা কালপ্রিট। কপাল ভালো হলে আমার হাইপোথিসিস যে ঠিক তার একটা প্রমান অন্তত কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাব। আমার বিশ্বাস মিস্টার মুখার্জির প্রাইভেট সেফের ভেতর থেকে সেই ফাইল আর পাওয়া যাবে না। কারণটা কি জানো আরিফ? আমি জানি ইতিমধ্যে অনেকবার সংকেত রায়ের পায়ের ধুলা ওই বাড়িতে পড়েছে। ওই ফাইলটা ও ইতিমধ্যে সরিয়ে ফেলেছে। আমরা সব জায়গায় ওর থেকে পাঁচ পা করে পিছিয়ে আছি। কিন্তু কেন? ভাবো আরিফ… ভাবো। আরও বড় সমস্যা হল এই যে..এই অবস্থায় সংকেতকে নিয়ে কোর্টে গেলে হাসির খোঁড়াক হতে হবে। হি ইজ অ্যা ড্যাম গুড প্রফেশনল। সংকেত রায়, আমি তোমাকে ছাড়ব না। শুধু একটা ভুল চাল চেলে দেখো। তোমাকে জেলের ঘানি টানিয়ে তবেই আমি ছাড়ব। “ আপাতত মিটিং ভেঙ্গে গেল। সবাই যে যার কাজে ফিরে গেল। মিস্টার বেরা বাইরে গেলেন একটা সিগারেটের প্যাকেট কিনতে।
মিস্টার বেরা থানায় ফিরতে না ফিরতেই প্রথম দুঃসংবাদটা এসে হাজির হল। আর সেটা এলো লেট মিস্টার মুখার্জির বাড়ি থেকে। দুজন দুঁদে অফিসার সরকারি অর্ডার নিয়ে রওয়ানা দিয়েছিল সেই ফিউস বানানোর ফাইলটা উদ্ধার করতে। বেলা মুখার্জির দিক থেকে কোনও রকম বাঁধা আসেনি। কাজের ঘরের দরজায় তালা মারা ছিল। ঘর খুলে উনি মিস্টার মুখার্জির কাজের ঘরের সব কটা ড্রয়ার আর প্রাইভেট সেফের চাবি এক কথায় অফিসারদের হাতে হস্তান্তরিত করে দিয়েছিলেন। অফিসাররা সমস্ত ড্রয়ার আর সব সেফ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই ফাইলের হদিস পায়নি। এখানেই শেষ নয়। সব কটা প্রাইভেট সেফ খাঁখাঁ করছে। একটা কাগজের টুকরো পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি। ড্রয়ার আর আলমারি খুঁজে গুটি কয়েক ফাইল তারা উদ্ধার করেছেন। সেই ফাইলগুলো তারা সিজ করেছেন। মিস্টার মুখার্জির ল্যাপটপ ওনারা সিজ করেছেন। বেলা মুখার্জি ল্যাপটপ সিজের ব্যাপারে প্রথমে আপত্তি করলেও পরে বাধা দেননি। ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড মিসেস মুখার্জির অজানা। এইসব জিনিস আর কাগজপত্র নিয়ে দুজন অফিসার থানায় ফিরে এসেছেন।
আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয়। মিস্টার মুখার্জির কাজের ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে একটাও ফিঙ্গারপ্রিন্ট উদ্ধার করা যায়নি। মানে কেউ খুব যত্নে সমস্ত ফিঙ্গার প্রিন্ট মুছে দিয়ে গেছে। মিসেস মুখার্জিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারা যায় যে এই ঘর বিগত ৩-৪ দিন ধরে বন্ধ পড়ে আছে। এমনকি ধোয়া মোছাও করা হয়নি এই ঘরে। উনি নিজেই ৩-৪ দিন আগে এই ঘরে তালা মেরেছিলেন, আর চাবি থাকত ওনার বেডরুমের প্রাইভেট সেফে। অফিসারদের অনুরোধে উনি বাড়ির বাকি প্রাইভেট সেফগুলোও নিজে খুঁজে দেখেছেন। একটাও কাজের জিনিস কোথাও পাওয়া যায়নি। মোটের ওপর এই। মিস্টার বেরা, মিস্টার আরিফ খান আর রবিনবাবু মিস্টার মুখার্জির বাড়ি থেকে উদ্ধার করা ফাইলগুলো উপর হামলে পড়লেন। সাইবার ক্রাইম বিভাগের দুজন বড় অফিসারকে তক্ষুনি তলব করে নিয়ে আসা হল থানায়। ল্যাপটপটা চালান করে দেওয়া হল তাদের জিম্মায়। ফাইলের ব্যাপারে সবাই হাল ছেড়ে দিলেও মিস্টার বেরার একটা ক্ষীণ আশা এখনও টিকে আছে এই ল্যাপটপের ওপরে। ওনার ধারণা ফাইলটার একটা সফট কপি ল্যাপটপে পাওয়া গেলেও যেতে পারে।
প্রায় ঘণ্টা খানেক ধরে মিস্টার মুখার্জির বাড়ি থেকে উদ্ধার করে আনা ফাইল,কাগজ পত্র আর ল্যাপটপ ঘেঁটে মিস্টার বেরা অ্যান্ড হিজ টিম যে তথ্যগুলো সংগ্রহ করতে পেরেছেন সেগুলো নিচে লিখে দেওয়া হল।
১। ল্যাপটপের গায়েও কোনও আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। সেটা অবশ্য আগে থেকেই জানা।
২। ল্যাপটপের ডিস্কটাও ওনার প্রাইভেট সেফের মত খাঁ খাঁ করছে। অনেক চেষ্টা করেও কোনও ডাটা রিট্রিভ করা গেলো না। বিশেষজ্ঞদের ধারণা এটা একটা আনকোরা নতুন হার্ড ডিস্ক। ল্যাপটপের মডেল নাম্বার ইত্যাদি সব নোট করে নেওয়া হয়েছে। এই ল্যাপটপের বিক্রেতাকে খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ এখন উঠে পড়ে লেগেছে।
৩। যে ফাইলগুলো সিজ করে আনা হয়েছে তাতে কোনও কাজের জিনিস পাওয়া যায়নি। ওনার সারা জীবনের বিভিন্ন গবেষণা আর পড়াশুনার কিছু অত্যন্ত সাধারণ নোটস ছাড়া তেমন কিছু নেই এই কাগজের টুকরোগুলোতে।
৪। এইটা খুব জরুরি তথ্য। একটা ছোট রাইটিং প্যাড নিয়ে আসা হয়েছিল। মিস্টার মুখার্জির নিজের হাতের লেখা পাওয়া গেছে এতে। ক্রোনোলজিকালি কবে কবে উনি কোন কোন আর্মসের ব্যাপারে গবেষণা শেষ করেছেন সেগুলো লেখা আছে এই প্যাডে। গবেষণার রেজাল্ট কি সেটাও পাওয়া যাচ্ছে এই প্যাডের লেখা থেকে। কোন প্রাইভেট সেফ খুললে কোন গবেষণার ফাইল পাওয়া যাবে সেই তথ্যও লেখা আছে এই প্যাডে। জরুরি বিষয় হল, এই ফিউসের উল্লেখও পাওয়া গেছে এই প্যাডে, এটাই প্যাডের একদম লাস্ট এন্ট্রি। কোন সেফে সেই ফাইল পাওয়া যাবে সেটাও লেখা আছে এই প্যাডে। কিন্তু সেফ খুলে যে কিছুই পাওয়া যায়নি সে কথা তো আগেই বলেছি।
মিস্টার বেরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। বাকিরা চুপ করে ওনাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন। আরিফ একটু সাহস করে বললেন “স্যার কিছু তো বলুন!” মিস্টার বেরার মুখ থমথমে। উনি বললেন “ নিজের গালে একটা থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করছে। মিস্টার মুখার্জি ছিলেন আমাদের দেশের সম্পদ, এক বিরল প্রতিভা। ওনার মতন এত রকমের আর এত সংখ্যায় আর্মস নিয়ে আগে কেউ গবেষণা করেছেন বলে মনে হয় না। সারা জীবনে ২২ টার ওপর বিভিন্ন রকমের আর্মস নিয়ে উনি গবেষণা করেছেন। ফিউসটার ফাইলের কথা ছেড়েই দিলাম। আরও ৯ টা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফাইল সযত্নে রাখা ছিল ওনার বিভিন্ন প্রাইভেট সেফে। আরিফ, চোর বিশাল বড় দাও মেরেছে। চোর এই ফিউসের ফাইলটার সাথে বাকি ৯টা গবেষণার ফাইলও নিয়ে গেছে।” রবিন বাবু বললেন “স্যার সংকেতের ওপর আমাদের সন্দেহ যখন এতটাই প্রবল তখন আপনার বাড়ি গিয়ে ওর জিনিসপত্র খানা তল্লাশি করে দেখলে হয় না। হয়ত জিনিসগুলো এখনও ওর কাছেই আছে। “
মিস্টার বেরা বললেন “বাড়িটা আমার ঠিকই। কিন্তু ওর জিনিস খানা তল্লাশি করে দেখতে হলে আরও স্ট্রং বেসিস চাই, এভিডেন্স চাই। সোজা কথা বলতে গেলে, আমাদের কাছে আছে কিছু হাইপোথিসিস, প্রমান একটাও নেই। তাছাড়া সংকেতের বিরুদ্ধে এখন অব্দি এই চুরি সংক্রান্ত কোনও কংক্রিট লিড আমাদের হাতে আসেনি। খুনের ব্যাপারে ওর বিরুদ্ধে প্রমান ছিল। কিন্তু ও নিজে এগিয়ে এসে স্পার্ম টেস্ট করিয়ে নিল আমাদের দিয়ে। (একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন) আমাদের সামনে এইবার খুব ডেঞ্জারাস একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ল্যাপটপ আর হার্ড ডিস্কটা কোথা থেকে কেনা হয়েছে সেই নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তথ্য জোগাড় করার চেষ্টা করো। প্রমান চাই …প্রমান। সংকেতের ফোন ট্যাপ করো। ও কি করছে, কি বলছে, কি ভাবছে সব আমি জানতে চাই। আরিফ আরেকটা কাজ করো। মালিনী বলে ওই মেয়েটার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করো। আর সংকেতের মোবাইল লোকেশন আর কল ডিটেলস কতক্ষণে আসবে? তাড়া দাও ওদের। আজ সংকেতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়েছিল। দেখো আমাদের ডেটাবেসে কোনও ম্যাচ পাওয়া যায় কিনা। ওর ফেস চেক করো আমাদের ডেটাবেসে, দেখো কোনও ফেসিয়াল ম্যাচ পাওয়া যায় কিনা। আর সংকেতের পিছনে কাকে পাঠিয়েছে? “
আরিফ বললেন “ স্যার আপনার প্রিয় সুজন পাণ্ডে। “ মিস্টার বেরা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন “যাক এটা একটা ভালো কাজ করেছ। দেখি অমিতাভ বচ্চনের সাথে পালা পড়লে এই ছেলের কি হাল হয়!” যদিও মিস্টার পাণ্ডে এই লেখায় তেমন সিরিয়স কেউ নয় আর ওর রোল শুধু মাত্র কয়েক মিনিটের তবুও এখানে সুজন পাণ্ডের ব্যাপারে একটু বলে রাখি। সুজন পাণ্ডের বয়স ২৮। কম্যান্ডো ট্রেনিং প্রাপ্ত যুবক। উচ্চতা ৬ ফুট সাড়ে ৪ ইঞ্চি। এই উচ্চতার জন্য ডিপার্টমেন্টে ওর নাম হয়েছে আমিতাভ বচ্চন। তিনটে ডাকাতকে একা হাতে গ্রেপ্তার করার জন্য সরকার পক্ষ থেকে ওকে মেডেল দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ বিভাগে যে বক্সিং টুর্নামেন্ট হয় তাতে মিস্টার পাণ্ডে শেষ তিন বছর ধরে খেতাব জিতে এসেছেন। ভীষণ ফিট বডি আর তেমনই দশাসই চেহারা। পুলিশ মহলে ওনার আরেকটা নাম আছে। ফাস্টেস্ট হ্যান্ড। কারণ একটাই… ভীষণ দ্রুত ঘুষি মারতে পারেন উনি, আর তেমনই জোর ওনার ঘুষির। এত ফাস্ট ঘুষি ডিপার্টমেন্টে আর কেউ মারতে পারে না। এই ভদ্রলোককে মিস্টার আরিফ খান আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের কথা হল এই যে, যখন, এই কথাগুলো হচ্ছে তখন অলরেডি এই নাটকে ওনার রোল শেষ হয়ে গেছে। আমিতাভ বচ্চনকে এই সব ফালতু কাজে বেশীক্ষণ বেঁধে রাখা যায় কি? উনি শুধু গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স দিয়ে কেটে পড়েছেন। খবরটা যদিও এসেছে বেশ খানিকক্ষণ পড়ে।
খারাপ সময় চললে একের পর এক দুঃসংবাদ আসতেই থাকে। মিস্টার বেরার আজ তেমনই একটা দিন। হঠাৎ করে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে মণ্ডল বাবু বললেন “স্যার সর্বনাশ হয়ে গেছে। এক্ষুনি একবার যেতে হবে।” মিস্টার বেরা একটু বিরক্তির সাথে বললেন “কোথায়?” উনি বললেন “হাসপাতালে।” মিস্টার বেরা জিজ্ঞেস করলেন “ তোমার বাড়িতে আবার কার কি হল? এই তো কয়েকদিন আগে তোমার বউয়ের কোমর না পা কি একটা ভেঙ্গে গেছিল না?” “স্যার সুজন। এক্ষনি চলুন। “ এই কথা শোনার পর আর বসে থাকা যায় না। মিস্টার বেরা ওনার গোটা টিম নিয়ে দ্রুত থানা থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে চড়ে বসলেন। দুটো পুলিশের জিপ ছুটে চলল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। হাসপাতাল অবশ্য থানা থেকে বেশী দূরে নয়। পথে যেতে যেতে মিস্টার বেরা মণ্ডলকে জিজ্ঞেস করলেন “কি হয়েছে কিছু জানতে পেরেছ?” মণ্ডল বললেন “না স্যার হাসপাতাল থেকে ফোন করে আর্জেন্ট বেসিসে আসতে বলা হয়েছে। হাসপাতাল থেকে পুলিশের কন্ট্রোল রুমে ফোন করেছিল। অবস্থা নাকি সিরিয়স। ও আপনাকে কিছু বলতে চায়। আর শুধু আপনাকেই বলতে চায়। “
হাসপাতাল এসে গেছে। সবাই পড়ি মরি করে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে নিজেদের পরিচয় দিতেই সরাসরি ওদের নিয়ে যাওয়া হল সুজন পান্ডের কেবিনে। ২০ মিনিট আগে ওনাকে অ্যাডমিট করা হয়েছে। ওনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ওনার আয়ু আর বেশীক্ষণ নেই। মিস্টার বেরা নিজের অত্যন্ত প্রিয় চেলা সুজন পান্ডের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন “ সুজন তোমার কিচ্ছু হবে না। শান্ত হও আগে। তারপর বলো, আমাকে তুমি কি বলতে চেয়েছিলে? “ সুজনের মুখে যে হাসিটা ফুটে উঠল সেটা প্রায় চোখেই দেখা যায় না। ওনার হাঁপ ধরে গেছে। ব্যথায় অসম্ভব কাতরাচ্ছেন ভদ্রলোক। তবুও কোনও মতে মুখ খুললেন উনি। “ স্যার সংকেত।” মিস্টার বেরা বললেন “হুম বলো। সংকেত কি?” মিস্টার পান্ডে একটা জোরে দম নিয়ে কোনও মতে পরের কথাগুলো বলে ফেললেন,” স্যার সংকেত আমাকে মেরেছে। “
মিস্টার খান ততক্ষণে নিজের মোবাইল খুলে আমার ছবিটা ওনার সামনে মেলে ধরেছেন, “ঠিক দেখেছ সুজন? এই ছেলেটাই?” মিস্টার পাণ্ডে আরেকটা দম নিয়ে কোনও মতে বলে চললেন “ স্যার আপনার বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমি বাড়ির দিকে লক্ষ্য রেখেছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হল আমার প্যান্টের পকেটে একটা চিরকুট কেউ ফেলে দিয়ে গেছে। কখন ফেলে দিয়ে গেছে জানি না।” ডাক্তার সেই চিরকুটটা মিস্টার বেরার সামনে মেলে ধরলেন। বাঙলায় লেখা কয়েকটা লাইন “ ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও। আমার নাগাল পাওয়া অর্জুন বেরার ক্ষমতার বাইরে। আমার যা দরকার সেটা আমি হাতিয়ে নিয়েছি। এখন আমার পেছনে লেগে বেকার সময় নষ্ট করে কোনও লাভ নেই। …আপনার হিতৈষী শ্রীমান সংকেত রায়।”
সুজন বলে চললেন “ চিরকুটটা পড়েই পেছনে ঘুরে দেখি সংকেত আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাঁসছে। আমাকে ওর পিছন পিছন আসতে ইশারা করে ও দৌড় মারল। আমি ভাবলাম ও পালিয়ে যাচ্ছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। ওর পিছন পিছন দৌড়ালাম। প্রায় মিনিট দশেক দৌড়ানোর পর একটা অন্ধকার ফাঁকা গলির মধ্যে ঢুকে বুঝতে পারলাম যে ওকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। আবার আপনার বাড়ির সামনে ফিরে যাব ঠিক করে পিছনে ঘুরতেই দেখি ও আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। স্যার দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে এই সংকেত রায়। আজ যাকে আপনারা অতক্ষন ধরে থানায় বসিয়ে রেখেছিলেন। আমার কোনও ভুল হয়নি। হি ইস সংকেত রায়। একই মুখ, একই হাইট, একই বডি ল্যাঙ্গোয়েজ। গলার আওয়াজও এক। ও আমাকে ওপেন চ্যালেঞ্জ দিল। আমি পিস্তল বের করার আগেই এক লাথিতে ও আমাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে। পিস্তলটা অন্ধকারে কোথায় গিয়ে পড়েছে জানি না। ঠিক করলাম হাতাহাতি করে ব্যাটাকে শায়েস্তা করব। কিন্তু স্যার আয়াম ভেরি সরি। আই অ্যাম নো ম্যাচ ফর দিস সংকেত রায়। অমানুষিক গায়ের জোর আর তেমনই কমব্যাট টেকনিক। খুব বেশী হলে ৩০-৪০ সেকেন্ড। বলতে পারব না কি হল। আমি মাটিতে পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছি আর সংকেত হাঁসতে হাঁসতে ওখানে থেকে চলে গেল। ৭.৩০ থেকে কতক্ষণ মরার মতন…”
মিস্টার পাণ্ডের অবস্থা এখন আরও খারাপ তাই ডাক্তার মিস্টার বেরাদের ওখান থেকে বের করে দিলেন। ওনারা বাইরে আসতে না আসতেই খবর এলো মিস্টার পাণ্ডে ওনার ইহলীলা সাঙ্গ করে অন্য জগতে পাড়ি দিয়েছেন। ডাক্তার কে মিস্টার বেরা জিজ্ঞেস করলেন “পাণ্ডের কি কি ইনজুরি ছিল?” ডাক্তার বললেন “স্যার উনি যে এতক্ষন বেঁচে ছিলেন কি করে সেটাই আশ্চর্য। পুরো স্পাইনাল কর্ড টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। হাঁটু থেঁৎলে গেছে। কোমরও ড্যামেজড। আরও কিছু হাড় ভেঙেছে বাজে ভাবে। কিন্তু ৩০-৪০ সেকন্ডে এরকম চেহারার একটা লোকের কেউ এই হাল করতে পারে? “ উনি এক মুখ হতাশা নিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বিদায় নিলেন। মিস্টার বেরা হঠাৎ কি মনে করে সবাইকে বললেন “চটপট থানায় ফিরতে হবে। পাণ্ডের বডি পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। “ আবার সবাই পড়ি কি মরি করে ফিরে এলো থানায়। থানায় ঢুকেই উনি থানার নম্বর থেকে ওনার বাড়িতে ডায়াল করলেন। ঘড়িতে সময় ৯.৪৫।
প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল। কেউ কল ওঠাল না। আবার ডায়াল করলেন উনি। এইবার অন্য দিক থেকে ভেসে এলো সঞ্চিতা ম্যাডামের গলা। “হ্যালো।” মিস্টার বেরা চেয়ারে বসে পড়ে বললেন “সঞ্চিতা আমি বলছি। “ ম্যাম বললেন “হুম বলো।” মিস্টার বেরা বললেন “ আরে একটা কথা বলার জন্য ফোন করেছিলাম। আজ রাত্রে আমি ফিরছি না। ফিরলেও অনেক দেরী হবে। তোমরা ডিনার করে নিও। আমি খেয়েই আসব। “ ওই দিক থেকে চীৎকার ভেসে এলো। “ সে তুমি আর বাড়ির খাবার খাবে কেন? আমি তো রান্নাই করতে পারি না। নুন ছাড়া রান্না কি আর পোষায়?” ম্যাম এত জোরে কথা বলছেন যে ঘরের সবাই সেই কথা শুনতে পাচ্ছে। স্যার গলা নামিয়ে বললেন “আহা সঞ্চিতা এখনও তুমি ওই রাগ ধরে বসে আছো? আর একটু আস্তে কথা বলো। চারপাশে লোক আছে। সবাই তোমার গলা শুনতে পাচ্ছে। “ ওই দিক থেকে ম্যাডাম বললেন “সরি। “ স্যার বললেন “সংকেত কেমন আছে? সব ঠিক ঠাক?” ম্যাডাম বললেন “হ্যাঁ। ও ঠিকই আছে। এই তো সামনে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছে। “ স্যার বললেন “ শোনো না একটা ছোট হেল্প করতে হবে তোমাকে। একটু আমার কাজের ঘরে যাও। “ ম্যাডাম বললেন “কেন? আর ঘরটার কি অবস্থা হয়েছে গো?” স্যার বললেন “উফফ কথা না বাড়িয়ে আমার কাজের ঘরে যাও। একটু দরকার আছে।”
যতক্ষণে ম্যাডাম উপরে উঠে ওনার কাজের ঘরে গেলেন ততক্ষণে মিস্টার বেরা কলম দিয়ে খসখস করে একটা সাদা কাগজে কিছু লিখে কাগজটা মিস্টার মণ্ডলের দিকে এগিয়ে দিলেন। কাগজটা হাতে নিয়েই মিস্টার মণ্ডল দৌড় মারলেন। ওই দিক থেকে ম্যাডাম বললেন “ হুম বলো। চলে এসেছি। কি খুঁজতে হবে?” স্যার বললেন “ কোনও কথা বলবে না। যা বলছি। শুধু শুনে যাও। কোনও প্রশ্ন নয়। আর আমি কোনও প্রশ্ন করলে এক কথায় তার উত্তর দেবে। “ ম্যাডাম বললেন “ওকে।” স্যার “সংকেত এখন নিচে?” ম্যাডাম “হ্যাঁ। কিন্তু তুমি…” স্যার বললেন “সঞ্চিতা। কোনও কথা বলবে না। শুধু উত্তর দাও। তোমরা কটায় বাড়ি পৌঁছালে?” ম্যাডাম একটু ভেবে বললেন “৬.৪০ এর দিকে।” স্যার “ তারপর কি আর সংকেত বাড়ি থেকে বেরিয়েছে?” ম্যাডাম “না।” স্যার “তুমি ১০০% শিওর?” ম্যাম “হ্যাঁ। আমি ড্রেস চেঞ্জ করে নিচে নামলাম। সংকেতও ৫ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে এসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বসে গেল। তারপর থেকে তো ওখানেই আছে।”
স্যার বললেন “ এখন সংকেত কোথায়?” ম্যাডাম বললেন “নিচে।” স্যার বললেন “ যেটা বলছি খুব মন দিয়ে শোনো। ভয় পাবে না। একদম স্বাভাবিক থাকবে। আমাদের ধারণা সংকেত সুবিধের ছেলে নয়। অনেক কারণ আছে এরকম ভাবার। তুমি জানো আমি ব্লাইন্ড খেলি না। আপাতত ওর ঘর আমাদের সার্চ করতে হবে। আর এখনই করতে হবে। “ ম্যাডাম বললেন “কিভাবে?” স্যার বললেন “চুপ করে শুনে যাও। তুমি সংকেত কে গিয়ে একদম স্বাভাবিক ভাবে বলো যে আমি তোমাকে একটা ফাইল খুঁজতে বলেছি।সেটা তুমি খুঁজে পাচ্ছ না। বা বুঝতে পারছ না কোন ফাইলের কথা বলছি। ওকে হেল্প করতে বলো। খেয়াল রেখো, একদম ক্যাজুয়ালি গিয়ে কথাটা বলবে। আমি লাইন ধরে আছি। ফোনটা ওর হাতে দিয়ে ওকে দোতলায় পাঠিয়ে দেবে। তুমি নিচেই থেকে যেও। “ ম্যাডাম বললেন “ওকে। ওয়েট করো।”
কিছুক্ষণ পর আবার ম্যাডামের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। একদম স্বাভাবিক। “এই সংকেত। ও একটু তোমার সাথে কথা বলতে চায়। কি ফাইল দরকার। আমি ছাতার মাথা কিছুই বুঝতে পারছি না। এইসব ফাইল টাইল বোঝা কি আমাদের কাজ? বলো? বাপু এত দরকারি ফাইল হলে অফিস যাওয়ার আগেই নিয়ে গেলে হয়। “ আমি ফোনটা উঠিয়ে বললাম “হ্যাঁ স্যার বলুন। “ মিস্টার বেরা বললেন “সংকেত, কেমন আছ? আমি কিন্তু আজকের জন্য আবার সরি বলছি। “ বললাম “স্যার আপনি বেকার ভাবছেন। বলুন। কি ফাইল, আর কোথায় আছে?” স্যার বললেন “আমার কাজের ঘরে যাও। তারপর বলছি।” আমি ততক্ষণে ম্যাডামের ইশারায় ওনার কাজের ঘরের দিকে দৌড় মেরেছি। বললাম “হ্যাঁ স্যার বলুন। “ উনি বললেন “ দেখো টেবিলের পাশে ফাইলের যে স্তূপ আছে, সেখানে ডিপ ব্লু কালারের একটা মোটা ফাইল আছে কি না?” হেসেবললাম “ স্যার টেবিল আর কোথায়? টেবিল তো ভেঙ্গে গেছে। না তেমন কোনও ফাইল দেখতে পাচ্ছি না তো। ও হ্যাঁ পেয়েছি। ডিপ ব্লু না মেরুন?”
স্যার কিছু বলার আগেই আমি ফাইলটা দেখতে পেয়ে বললাম “স্যার, পেয়েছি।” উনি বললেন “ওটা একটু বের করবে?” বললাম “করে ফেলেছি। এইবার?” স্যার বললেন “ ফাইলটা খুলে ফার্স্ট এন্ট্রিতে কি আছে একটু বলবে?” বললাম “স্যার এটা তো গোপন ফাইল? পড়ব?” উনি হেসেবললেন “হ্যাঁ। এখন আর তেমন গোপন কিছু নয়। “ আমি পড়ে শোনালাম। স্যার বললেন “ ভেরি গুড। তোমার শরীর কেমন এখন? ফ্র্যাঙ্কলি বলো। “ বললাম “ ঠিকই আছে। “ উনি বললেন “আমার একটা ছোট্ট কাজ করে দেবে? অবশ্য তুমি যদি পড়াশুনা করছিলে তো…” বললাম “না না। ম্যাচ আছে আজ। ইন্ডিয়া-ইংল্যান্ড। ওই দেখছিলাম। “ স্যার বললেন “ তাহলে বাইরে গিয়ে এই ফাইলটার ৩ কপি জেরক্স করিয়ে আনতে পারবে? “ বললাম “গোটা ফাইলটার? এতো বেশ মোটা ফাইল স্যার।” স্যার বললেন “হ্যাঁ। কটা কপি করাবে?” বললাম “৩ কপি। “ উনি বললেন “ নিচে গিয়ে তোমার ম্যাডামের হাতে ফোনটা দাও। ওনাকে দুটো কথা বলার ছিল। তুমি রেডি হয়ে নাও। অনেক রাত হয়ে গেছে এমনিতেই। আর সাবধানে যেও। “ অগত্যা দৌড়ে গিয়ে ম্যাডামের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বললাম “ ২ মিনিটে আসছি।” ম্যাডামের গলা ভেসে আসতেই স্যার বললেন “ ও কি ওপরে চলে গেছে?” ম্যাডাম বললেন “হ্যাঁ। “ স্যার বললেন “ ওকে বিশু বাবুর দোকানে যেতে বলো। হাতে ১০০০ টাকার মতন ধরিয়ে দাও। জেরক্স করাতে কাজে লাগবে। দুজন অফিসার তোমার বাড়িতে যাবে ওর ঘর সার্চ করতে। ওদের সংকেতের ঘরটা দেখিয়ে দিও। বুঝতে পেরেছ? “
ম্যাডাম কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন “কিন্তু ও যদি ফিরে আসে?” মিস্টার বেরা বললেন “ সেই চিন্তা আমাকে করতে দাও। আর ও নিচে এলে আরেকবার ওকে ফোনটা দিও। “ আমি ইতিমধ্যে রেডি হয়ে নিচে নেমে এসেছি। ম্যাডাম আমার হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলেন। “ বললাম “হ্যাঁ স্যার।” উনি বললেন “ সংকেত বাজে কষ্ট দিচ্ছি তোমাকে। তোমাকে কোথায় গিয়ে জেরক্স করাতে হবে সেটা ম্যাডামের কাছ থেকে জেনে নিও। দোকানটা কাছেই। উনি তোমাকে টাকাও দিয়ে দেবেন। ঠিক তিন কপি করিও। আমি পরে কোনও এক সময় এসে ওইগুলো নিয়ে আবার বেরিয়ে যাব। দোকানদার যদি বলেন যে এখন ওনার অনেক কাজ আছে বা দোকান বন্ধ করতে হবে তাহলে আমার নাম করবে। দোকান যদি দেখো ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে তাহলে দরজায় কড়া নাড়বে। উনি ভেতরেই থাকেন। উনি এলে আমার নাম বলবে। কাজ হয়ে যাবে। “ আমি “ওকে” বলে ফোন কেটে দিলাম। ঘড়িতে ৯.৫৫। ম্যাডাম আমাকে দুটো ৫০০ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বললেন “এরকম মোটা ফাইল কেউ জেরক্স করায়? যাই হোক। তুমি বিশু বাবুর দোকান চেনো? এখন হয়ত অন্য দোকান সব বন্ধ হয়ে যাবে।” বললাম “না। চিনি না।” ম্যাডাম মোটামুটি বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে স্টার জেরক্সের দোকানে যেতে হবে। হাঁটা পথে খুব বেশী হলে ৫ মিনিট। ম্যাডাম একটা প্লাস্টিকের ভেতর ফাইলটা ভরে দিলেন। আমি দৌড় মারলাম।
অন্যদিকে ফোনটা কেটেই মিস্টার বেরা আরেকটা নাম্বার ডায়াল করেছেন। ফোন ওঠাতেই মিস্টার বেরা বললেন “বিশু বাবু। আমি অর্জুন বেরা। কাজের কথা আছে। শুনে যান। আপনার দোকান কি এখন খোলা? “ উত্তর এলো “হ্যাঁ।” মিস্টার বেরা বললেন “ভেরি গুড। একটা ছেলে একটা ডিপ ব্লু রঙের ফাইল নিয়ে আপনার দোকানে আসবে ৩ কপি জেরক্স করাতে। এখন আপনার কাজ হল ওকে আপনার দোকানে আটকে রাখা। “ প্রশ্ন এলো “কতক্ষণ?” মিস্টার বেরা বললেন “ যতক্ষণ না আমার মোবাইল থেকে আপনার মোবাইলে মেসেজ ঢুকছে ততক্ষণ। পাতি আটকে রাখুন। ও জেরক্স না নিয়ে ফিরবে না। সুতরাং আপনি আপনার খেলা চালিয়ে যাবেন। বুঝতে পেরেছেন?” উত্তর এলো “হ্যাঁ।” ফোন কেটে গেল। সবাই উঠে দৌড় লাগাল কন্ট্রোল রুমের দিকে। মিস্টার বেরা মণ্ডলের দিকে তাকিয়ে বললেন “সব রেডি।” মণ্ডল বললেন “স্যার দুটো টিমই আর ২-৩ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে। “ স্যার বললেন “আমি পুরো ভিডিও কভারেজ চাই। কোনও মিস্টেক আমি বরদাস্ত করব না এইবার। ফোন স্পিকারে দাও। দুটো টিমের সবাইকে একটা কনফারেন্সে জয়েন করাও। মণ্ডল বাবু একে একে সবাইকে কনফারেন্সে জয়েন করালেন। মিস্টার বেরা বললেন “ টিম -১ লোকেশন থেকে কতদূরে?” একজন জবাব দিল “ স্যার এই পৌঁছে গেছি। “ মিস্টার বেরা বললেন “টিম-২?” উত্তর এলো “আপনার বাড়ির সামনে। “
স্যার বললেন “ বাড়ি থেকে একটু দূরে গাড়ি পার্ক করে ভেতরে ঢুকে পড়ো। আর ভিডিও কভারেজ কোথায়?” সামনে রাখা দুটো টিভিতে ভিডিও স্ট্রিমিং হতে শুরু করে দিল। টিম-১ কি ভিডিও তুলছে সেটা বলার মানে নেই কারণ ওই ভিডিও করা হচ্ছে আমাকে নিয়ে। তাই এখানে কি হচ্ছে সেটা সরাসরি লিখে দিচ্ছি। আমি ম্যাডামের কথা মতন বিশু বাবার দোকানের সামনে এসে হাজির হলাম। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এক মনে একটা মোটা বই জেরক্স করে চলেছেন। আমি ওনাকে বললাম “দাদা, একটা জেরক্স করাতে হবে।” উনি বিরক্তির সাথে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “ ক-পাতা আছে?” বললাম “অনেক। “ উনি বললেন “ কয় কপি?” বললাম “৩।” উনি এগিয়ে এলেন আমার দিকে। “কই দেখি?” আমি ফাইলটা ওনার হাতে ধরিয়ে দিলাম। উনি ফাইলটা উল্টে পাল্টে ফেরত দিয়ে বললেন “ এখন এত বড় একটা ফাইল নিয়ে এসেছ? আজ হবে না।” বললাম “ মিস্টার অর্জুন বেরা আমাকে পাঠিয়েছেন। “ উনি খেঁকিয়ে উঠলেন “ অর্জুন বেরা তো কি হয়েছে? আমি কি ওরটা খাই না পরি? মাথা কিনে নিয়েছে যেন… অর্জুন বেরা। জত্তসব ফালতু। আচ্ছা করে দিচ্ছি। বসতে হবে। আগে এইটা শেষ করব। তারপর। “ বললাম “ কতক্ষণ লাগবে? আমি ঘুরে আসব কিছুক্ষণ পর?” উনি নড়ে চড়ে উঠে বললেন “ ভাই দোকান বন্ধ করে দেব। কি এত তাড়া হে তোমার? আর পুলিশের ফাইল আমি এইভাবে আমার জিম্মায় রাখতে পারব না। তুমি বাপু ফাইল নিয়ে কেটে পড়ো।” আমি ব্যস্ত ভাবে বললাম “আরে না না। ঠিক আছে, আপনি ফাইলটা রাখুন। আমি অপেক্ষা করছি। “ টিম-১ এর ভিডিও তে আমাকে দেখা যাচ্ছে। আমি একটা দোকানের সামনে বোকার মতন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করে চলেছি।
টিম-২ এদিকে ততক্ষণে গিয়ে প্রবেশ করেছে আমার ঘরে। সমস্ত জিনিস উল্টে পাল্টে দেখে চলেছে ওরা। পটু হাতের কাজ। আলমারি খোলাই ছিল। ভেতরটা নেড়ে ঘেঁটে দেখেও খুব একটা কিছু পাওয়া গেল না। শুধু ধরা পড়ে গেল আমার সেই দামি ল্যাপটপটা। ওরা তৎক্ষণাৎ তার মডেল নাম্বার ইত্যাদি সব নোট করে নিল। সেই ল্যাপটপের রসিদের জন্য ওরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওটার হদিশ পেল না। গোটা ঘরে আর কোনও রকম সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায়নি। ড্রয়ারে হাজার তিনেক টাকা ছিল। ব্যস। সব কাগজ পত্র উল্টে পাল্টে দেখে শেষমেশ ওরা হাল ছেড়ে দিল। মিস্টার বেরা বললেন “ এইবার সংকেতের ঘর থেকে কার কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায় কালেক্ট করে নাও।” ওদের নিজেদের হাতে গ্লাভস। ওদের আঙুলের ছাপ পাওয়া যাবে না। ওরা সারা ঘরময় তন্নতন্ন করে খুঁজে যতরকমের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আবিস্কার করতে পেরেছে সব কালেক্ট করে নিল। এইবার নিচে যাও। মিস্টার বেরা ইতিমধ্যে সঞ্চিতা ম্যাডামকে কল করেছেন। ম্যাডাম হ্যালো বলতেই স্যার বললেন “ ওরা নিচে আসছে। ওদের তুমি তোমার ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে দাও। একটু মনে করে বলো আজ শ্যামাদিকে দিয়ে শেষ কোন কাজটা করিয়েছিলে?” ম্যাডাম বললেন “শ্যামাদি তো এই দুদিন হল আসছে না। সব কাজ আমাকে করতে হচ্ছে।” স্যার বললেন “ও কি হল হঠাৎ করে?” ম্যাডাম সেই মহিলার মুখ থেকে শোনা কথাগুলো তাড়াতাড়ি উগড়ে দিলেন। স্যার বললেন “স্ট্রেঞ্জ। এরকম তো আগে কখনও করেনি। ওর বাড়ির ঠিকানাটা চট করে দাও তো। “
ম্যাডাম দিলেন। মিস্টার খান সেটা নোট করে নিলেন। স্যার বললেন “ এক কথায়, আমরা কিভাবে শ্যামাদির ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাব? সেটা একটু ভেবে বলে ফেলো।” ম্যাডাম কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। চেপে গেলেন (বেডরুমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট কালেক্ট করলে আমার হাতের ছাপও পাওয়া যাবে। আমার বেডরুমে ওনার আঙুলের ছাপ পাওয়া গেলে কোনও ক্ষতি নেই কারণ উনি আমার ঘরে অনেকবার এসেছেন, কিন্তু ওনার বেডরুমে আমার যাওয়ার কথা নয়।)। উনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন “ঘর মোছার বালতিতে পাওয়া যাবে নিশ্চই। “ সেখান থেকে যত রকমের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেল সব কালেক্ট করে নেওয়া হল। বিদায় নেওয়ার আগে ওরা একটা ধোয়া গ্লাসে ম্যাডামের আঙুলের ছাপ ফেলে সেই গ্লাসটা সঙ্গে নিয়ে নিল। সহজ ভাবেই ওরা ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিতে পারত বটে, কিন্তু হাতে কালির দাগ লেগে থাকলে পাছে আমার সন্দেহ হয়, তাই এই পন্থা।
ওরা বেরিয়ে যেতে না যেতেই আমার ফোনটা বেজে উঠল। বললাম “হ্যালো?” স্যার বললেন “ তোমার কাজ হয়েছে?” বললাম “ না। এই সবে শুরু করেছে। “ উনি বললেন “বিশুবাবুকে একবার ফোনটা দাও। তোমার ম্যাডাম ওইদিকে চেঁচামেচি করছেন।” আমি ফোনটা বিশু বাবুর হাতে ধরিয়ে দিলাম। বিশু বাবু তিনবার হ্যাঁ, ঠিক আছে, আচ্ছা মতন বলে ফোনটা কেটে আমার হাতে ফেরত দিয়ে বললেন “তুমি বাড়ি ফিরে যাও। উনি লোক পাঠিয়ে পরে এইগুলো কালেক্ট করে নেবেন।” আমি বললাম “ একটু আগে যে বললেন পুলিশের ফাইল নিজের কাছে রাখতে চান না। এখন কি হল?” উনি এমন একটা নজর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন যে এরপর আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ঘরে ঢুকে ম্যাডামকে স্যারের সাথে কি কথা হয়েছে বলে উপরে উঠে এলাম।
পুলিশরা এই মুহূর্তে তিনটে কাজ নিয়ে ব্যস্ত। ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে দেখা। মালিনীর ব্যাপারে খবর নেওয়া। আমার কল রেকর্ড আর আমার মোবাইল লোকেশন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া। ও হ্যাঁ… আরেকটা জিনিস আছে। সেটা হল আমার ল্যাপটপের ব্যাপারে আরও কিছু গবেষণা করে যা কিছু তথ্য পাওয়া যায় সব জেনে নেওয়া। ওদের ফাইন্ডিংসের কথায় একটু পরে আসছি কারণ এইসব কাজ গোটাতে ওনাদের অনেক টাইম লাগবে। সেই সুযোগে অন্য দিকে কি কি হয়েছে সেই কথা এই বেলা বলে নেওয়া দরকার। ঘরে ঢুকেই ম্যাডাম আমাকে বললেন “ যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। তোমার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে দেয়ে একটু রেস্ট নাও। “ আমি ওনার পিঠের সাথে সেঁটে দাঁড়িয়ে বললাম “আপনাকে দেখলেই আমি ফ্রেশ হয়ে যাই।”
ম্যাডাম আমার দিকে ফিরে আমার বুকে একটা কিল মেরে বললেন “ আমার রান্না খুব খারাপ। তাই না?” আমি বললাম “ উফফ সত্যি কথা না বললে ওখানে তো আমি উল্টে কেস খেয়ে যেতাম। হেহে।” ম্যাডাম বললেন “তুমি ভারী অসভ্য।” বললাম “কেন? আমি আবার কি অসভ্যতা করলাম?” ম্যাডাম বললেন “ জিজ্ঞেস করল এখানে এসে প্রেমে পড়েছ কিনা আর তুমি ফস করে বলে দিলে হ্যাঁ?” আমি বললাম “ আপনার জন্য আমি হয়ত টাইমপাস, কিন্তু আমার কাছে তো আপনি…” কথাটা শেষ না করে একটা চোখ মারলাম। ম্যাডাম আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন “আমার বুকটা কেমন ধুকপুক করছিল জানো। যখন তোমাকে নাম জিজ্ঞেস করা হল।” বললাম “ উত্তর দেওয়া না দেওয়ার অধিকার তো আমার। আর তাছাড়া এই ক্রিমিন্যাল কেসের সাথে আমার লাভ লাইফ আসছে কোথা থেকে। তবে সত্যি এটা চিন্তার কথা। শিখাদির বাড়ির লোকেরা আমাকে ওখানে সেদিন দেখল কি করে? আমি তো আপনার সাথে ছিলাম সারারাত। “ ম্যাডাম বললেন “আমিও সেটা বুঝতে পারলাম না। তবে আমার নামটা তুমি না বলে আমার সংসারটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছ। এই জন্য তোমার একটা কিসি প্রাপ্য।” উনি আমার ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমু খেলেন। ওনাকে বললাম “এতো অল্পে মন ভরে না। আরও চাই।”

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 5 / 5. মোট ভোটঃ 1

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment