মুখোশ – The Mask [৪২]

লেখকঃ Daily Passenger

৪২
মিস্টার বেরা বললেন “ প্লীজ, গো অ্যাহেড উইথ দা গুড নিউস। “ রবিন বাবু বললেন “ স্যার সংকেতের ঘর থেকে যে ল্যাপটপটার ছবি আমরা তুলে এনেছি, খোঁজ নিয়ে জানলাম সেই ল্যাপটপ ইন্ডিয়ায় পাওয়াই যায় না। আমেরিকায় মাস দুয়েক আগে সেটা লঞ্চ হয়েছে। মজার জিনিস হচ্ছে আমেরিকার বাইরে আর কোথাও এই ল্যাপটপ এখনও ওরা ছারেনি। আর এই ল্যাপটপ জেনেরাল ইউসের জন্য তৈরি করাও হয়নি। এই ল্যাপটপে গোটা পঞ্চাশেক এমন সব ফিচার আছে যেগুলো শুধু ডিফেন্সের বা সিকিউরিটির কাজ কর্মের কথা মাথায় রেখে বানানো হয়েছে। তাই এর দামও অনেক। আমেরিকায় সাধারণ লোক সেই ল্যাপটপ কিনতে পারবে না। কিনতে হলে গভমেন্টের কাছ থেকে আর আর্মির কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। আর ল্যাপটপের দাম শুনলে আপনি পড়ে যাবেন। ভারতীয় মুদ্রায় এর দাম সাড়ে চার লাখের কিছু বেশী। আর …” মিস্টার রাহা এইবার সোজা হয়ে বসেছেন “ আর আমি যতদূর জানি ফার্স্ট লটে এই মডেলের যতগুলো প্রডাক্ট ম্যানুফ্যাকচার করা হয়েছিল তার মধ্যে একটা প্রোডাক্ট মিসিং হয়েছে।” মিস্টার বেরা বললেন “ মানে? প্লীজ ক্লারিফাই।”
মিস্টার রাহা বললেন “ ২০ দিন মতন আগে আমি আমেরিকায় গেছিলাম একটা কনফারেন্সে। ওখানে আমার চেনা একজন খুব বড় ক্রিমিনাল সাইকলজিস্ট আছেন। জন রাসেল। ওর শ্যালক জো ক্লেটন পেন্টাগনে কাজ করে। একদিন মদের ঠেকে ওর ওই শ্যালকের সাথে আমার আলাপ হয়। জানতে পারি যে মাস কয়েক আগে একটা বড় হার্ডওয়্যার কোম্পানির সাথে পেন্টাগনের কিছু ডিল সাইন হয়। ওদের অনুরোধে, ওদের আর ওদের মতন কিছু সংস্থার কাজের কথা মাথায় রেখে সেই কোম্পানি এই মডেলের ল্যাপটপ তৈরি করে। স্যাটালাইট ট্র্যাকিং, ডিভাইস ট্র্যাকিং, অ্যাডভানসড জিপিএস এরকম অনেক টেকনোলজি আছে এই ল্যাপটপে। কথা হয়েছিল অর্ডার হলে তবেই এই মডেলের ল্যাপটপ ম্যানুফাকচার করা হবে। ফার্স্ট লটের অর্ডার ছিল ৭ টা। ওরা বানিয়েছিল। কিন্তু হ্যান্ডওভার করার আগেই সেই কোম্পানির কাছ থেকে একটা ল্যাপটপ চুরি হয়ে যায়। আমি যখন আমেরিকায় ছিলাম তখন এই নিয়ে ভেতরে ভেতরে নাকি প্রচুর গোলমাল চলছিল। কারণ ভুল লোকের হাতে এই ল্যাপটপ পড়ে গেলে নাকি জিনিসটা ভালো হবে না। তাই সেটাকে উদ্ধার করতেই হবে। শেষ পর্যন্ত জানা যায় যে মিডল ইস্টের কোনও একটা দেশে নাকি ল্যাপটপটা চোরা পথে পাচার করে দেওয়া হয়েছে। কোন দেশ, কোন কোম্পানি, কতজন সাসপেক্ট ইত্যাদি জিজ্ঞেস করে কোনও লাভ নেই। কারণ ওই ছেলেটা আমাকে সেই নিয়ে কিছু বলেনি। ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবেই ভীষণ গোপনীয়। আর ল্যাপটপের মডেল নাম্বার -xxxx-xx-xxxxxx। কি তাই তো? স্মরণশক্তিটা এখনও ভালোই আছে তাহলে। “ মিস্টার বেরা বললেন “আর সেই সাথে এটাও প্রমান হয়ে গেল যে আমার দুটো হাইপোথিসিস অন্তত ঠিক। এক। ছেলেটা ভীষণ গোলমেলে। দুই। ছেলেটা জেনে বুঝে লাই ডিটেক্টর মেশিনটাকে বিট করেছে। একটা প্রশ্নের উত্তরে ও বলেছিল যে ওদের টাকা নেই। অর্থাৎ ওরা গরীব, অন্তত গরীব না হলেও তেমন বড়লোক নয়। তাহলে এত দামি ল্যাপটপ ওর কাছে এলো কি করে! “
মিস্টার বেরা আবার চেয়ার থেকে উঠে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। “সেই সাথে আরও কয়েকটা জিনিস ক্লিয়ার হয়ে গেল। আরিফ কালো ডাইরিটাতে নোট করে নাও তো। “
১। সংকেত লাই ডিটেক্টর মেশিনের সামনে বসে কোনটা সত্যি কথা বলেছে আর কোনটা মিথ্যা কথা বলেছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। হতে পারে ম্যাক্সিমাম উত্তরই মিথ্যা। অন্তত একটা মিথ্যা কথা যে ও বলেছে আর মেশিন সেটা ধরতে পারেনি তার প্রমান এখন আমাদের কাছে আছে।
২। আমি সিওর সংকেত ওর আসল নাম নয়। অর্থাৎ ওর বাড়ির ঠিকানাও ভুয়ো বা জালি।
৩। আমি এখন সিওর যে ১০৭ নম্বর রুমের বুকিঙটা কাকতালীয় নয়। আগেই বোঝা গেছিল যে ওটা কাকতালীয় নয়, কিন্তু এখন মোটামুটি ভাবে সিওর হয়ে বলা যায় যে ১০৯,১১০ নম্বর রুম বুক হওয়ার পরই ও ১০৭ নম্বর রুমটা বুকে করে পারপাসফুলি।
৪। গরীব সেজে আমার বাড়িতে এসে পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকাটাও এখন আর কাকতালীয় ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে না।
৫। রঞ্জন মুখার্জির ডেথ, মিসিং ফাইল যে একই সুতোয় গাঁথা সেটা আমরা আগেই বুঝেছি।
গোটা ঘরে একটা থমথমে ভাব। মিস্টার বেরা আবার মুখ খুললেন “ তার থেকেও একটা সিরিয়াস প্রশ্ন আছে। কিন্তু …“ উনি ঘরময় পায়চারি করছেন আর বারবার এক হাত দিয়ে অন্য হাতের চেটোতে ঘুষি মেরে চলেছেন। একসময় নিজের চেয়ারে ফিরে এসে বললেন “ সংকেত হোটেলে চেকইনের টাইমে কি একটা লোকাল ঠিকানা দিয়েছিল বলে রেজিস্টারে দেখেছিলাম। আরিফ ওই ঠিকানায় লোক পাঠিয়ে দাও। একটা সমস্যা কি জানো আরিফ, একটা চুরি করা ল্যাপটপ ওর কাছে আছে বা ও বড়লোক বলে ওকে আমি জেলে ঢোকাতে পারব না। সব কিছু বুঝতে পারছি কিন্তু তবুও জেলে ভরতে পারব না এত সহজে। “ আরিফ বললেন “কেন? চোরাই ল্যাপটপটা ওর কাছে থাকা সত্ত্বেও…”
মিস্টার বেরার হঠাৎ করে যেন কিছু একটা মনে পড়েছে। উনি রবিন বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন “ এই একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। লাস্ট টাইম আমি মুম্বাইতে গেছিলাম না, ওখানে একটা ভালো মোবাইল সেট গিফট পেয়েছি। দাম ৩৬ হাজার টাকা। তোমাকে আমি ২৫ হাজারে ছেড়ে দেব। তুমি বাজারে যা মোবাইল পাও তার থেকে ঢের ভালো সেট। এখনও ইউস করিনি। লাগলে বলতে পারো। তবে ফ্রিতে ছাড়ব না।” রবিন বাবু খুশি হয়ে বললেন “স্যার জানেনই তো এই একটা ব্যাপারে আমার দুর্বলতা একটু বেশী। স্পেকটা বলতে পারবেন?” মিস্টার বেরা স্পেক বললেন। রবিন বাবু লাফিয়ে উঠে বললেন “স্যার ওটা আমি এখনই বুক করে দিলাম। কাল আপনাকে নেট ট্রান্সফার করে দেব।” মিস্টার বেরা লাফিয়ে উঠে বললেন “ব্যস। আরিফ, রবিনকে গ্রেফতার করে জেলে ভরো।” আরিফ বললেন “মানে?” মিস্টার বেরা বললেন “ ধরে নাও মোবাইলটা চুরি করেছি আমি। এখন ওকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করলাম। এখন মোবাইলের মালিক রবিন। বলাই বাহুল্য এর কোনও রসিদ নেই। কিন্তু ওর কাছ থেকেই মোবাইলটা উদ্ধার হবে। তাই তো? “ আরিফ বললেন “কিন্তু স্যার…ওর কাছে চোরাই জিনিসটা থাকার মানেই যে ও কোনও খারাপ কাজ করেছে সেটা আপনি কি করে ধরে নিচ্ছেন।”
মিস্টার বেরা বললেন “ এইবার তুমি পথে এসেছ। সংকেতের কাছে চোরাই ল্যাপটপ থাকার মানেই সংকেত দোষী, এটাই বা তুমি কি করে ধরে নিচ্ছ? আর এই কথাটা আমি বলছি না, আদালতে দাঁড়িয়ে এই কথাটাই বলবে সংকেতের উকিল। আর সেই সাথে ওর উকিল এও বলে দেবে যে কার কাছ থেকে মোবাইলটা ও কিনেছে। তাকে ধরতে গিয়ে দেখবে সেই লোক অনেক আগে মার্কেট থেকে সরে পড়েছে। আচ্ছা…” একটু থেমে বললেন “ লাহিড়ী। সংকেতের মোবাইল লোকেশনের রিপোর্টটা নাও। এখন অনেক রাত জানি। আর সেটাই আমাদের প্লাস পয়েন্ট। সংকেতের একটা বড় ছবি নিয়ে দুইজন অফিসারকে পাঠাও। ১৫ই আগস্ট সকাল বেলায় সংকেত যেখানে যেখানে নিজের পায়ের ধুলো ফেলেছে ওই সব কটা লোকেশনে গিয়ে সবাই কে জিজ্ঞেস করো ছবি দেখিয়ে। দরকার আছে। দেরী করো না। “ মিস্টার লাহিড়ী মাথা চুলকে বললেন “স্যার মাথা মুণ্ডু কিছুই তো বুঝতে পারছি না। এত রাতে গিয়ে কাকে জিজ্ঞেস করব? কেই বা আমাদের হেল্প করবে? স্যার দিনের বেলায় এটা করলে ভালো হত না?”
মিস্টার বেরা চেঁচিয়ে উঠলেন “মূর্খ, রাতে খোঁজ খবর করাই আমাদের প্লাস পয়েন্ট। দিনের বেলায় খোঁজ খবর করতে গেলে সংকেতের চরও ব্যাপারটা জেনে যাবে। এখন যে আমরা ওর খোঁজ করছি সেটা বোধহয় ওরা ভাবতে পারবে না। তাই যা করার এখনই করতে হবে। তার আগে দাঁড়াও। সার্চটা আরেকটু স্পেসিফিক করতে হবে। এই দেখো, এই লোকেশন গুলো তে লোক পাঠানোর দরকার নেই। কারণ সময়টা লক্ষ্য করো। এইসময় ও আমার গিন্নীর সাথে বাড়ি থেকে কিছু দূরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। মর্নিং ওয়াক। যার ছবি ফেসবুকে তোলা আছে। এইবার এই রেকর্ডটা দেখো। এটা একদম আমার বাড়ির লোকেশন। এইবার খেয়াল করো, ১০.৪০ এর পর ওর মোবাইল আবার মুভ করা শুরু করেছে। তার আগে ওর মোবাইল লোকেশন চেঞ্জ করছে না। ১১.১০ এ দেখো একটা ফিক্সড লোকেশনে গিয়ে মোবাইলটা মিনিট দশেক একই জায়গায় ছিল। তারপর আবার মোবাইল মুভ করছে। বাকি কয়েকটা রেকর্ড দেখে বুঝতে পারবে যে সংকেত ১১.২০ নাগাদ আবার আমার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেছে। আমি জানতে চাই ১১.১০ থেকে ১১.২০ এর মধ্যে সংকেত কোথায় কোথায় ছিল? আমি যতদূর জানি এটা একটা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া। খোঁজ নিয়ে দেখো।” লাহিড়ী তখনও দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাচ্ছে দেখে আরিফ বললেন “ ওই খানে যতগুলো বাড়ি আছে, সব কটা বাড়ির লোক কে ঘুম থেকে ওঠাও। ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করো। দোকান দেখলে দরজায় ধাক্কা মেরে জাগাও। যদি কোনও দোকান খালি থাকে, মানে ভেতরে কেউ নেই, তাহলে সেই দোকানের নাম আর ঠিকানা নোট করে নেবে। কাল সকালে গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করবে। সে বাড়ি হোক আর দোকানই হোক, সব দরজায় কড়া নেড়ে ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করবে। আর একটা স্পাইক্যাম লাগিয়ে রাখো। এখান থেকে কি হচ্ছে না হচ্ছে সব আমরা দেখতে চাই। বুঝতেই পারছ খুব ফিক্সড লোকেশন। সুতরাং খুব বেশী বেগ পেতে হবে না। “
দুজন দুঁদে অফিসার তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে গেল। আরিফ বললেন “স্যার আপনি হঠাৎ করে এই লোকেশন নিয়ে এত মাতামাতি করছেন কেন? এটা তো আর শিখার বাড়ির লোকেশন নয়…” মিস্টার বেরা বললেন “ মাতামাতি করছি না। বটম আপ অ্যাপ্রচে দেখতে চাইছি এই সংকেত বাবাজীবন কোথায় কোথায় নিজের পায়ের ধুলো রেখেছেন। সেই সাথে এটাও জানতে চাইছি যে এই শহরে আর কে কে আছে যারা সংকেতকে চেনে। “ ওরা লোকেশনে গিয়ে পৌঁছে ভিডিও স্ট্রিমিং শুরু করুক। তার আগে আমাদের অন্য আরেকটা জিনিস নিয়ে ভাবতে হবে। অনেকক্ষণ ধরেই মনের ভেতরটা কেমন জানি খচ খচ করছে। “ উনি মোবাইল উঠিয়ে সঞ্চিতা ম্যাডামকে একটা ফোন করলেন। ম্যাডাম ফোন ওঠালেন। ঘুমে জড়ানো গলা। “ ফিরছ কখন।” স্যার বললেন “ ঘুম কাটাও, সোজা হয়ে উঠে বসে পড়ো। আমি তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপে কিছু কথা লিখব। তার উত্তর দাও।” কল কেটে দিলেন।
(সঃ হল স্যার। আর মঃ হল ম্যাম)
সঃ সংকেতের বিরুদ্ধে কিছু বাজে প্রমান আমাদের হাতে এসেছে। আরেকটা জিনিস বলে রাখছি, কেসটা শিখার মার্ডার কেস নয়। তাই বাজে প্রশ্ন না করে উত্তর দাও ঠিক করে। গোটা দেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে যদি আমাদের কিছু ভুল হয়।
মঃ তোমরা তো ওর ঘর সার্চ করে কিছুই পেলে না।
সঃ যা পাওয়ার পেয়ে গেছি। সংকেতকে আমাদের পেয়িং গেস্ট বানানোর ডিসিশনটা কি করে নিলে পুরোটা খুলে বলবে এইবার?
মঃ (ম্যাডাম অসংলগ্ন ভাবে অনেক কিছু লিখে গেলেন যেগুলো সাজালে এরকম দাঁড়ায়।)
১। স্যার কাজের জন্য প্রায়ই বাইরে বাইরে থাকেন। ম্যাডাম কে একা থাকতে হয়।
২। পাড়ায় চুরি চামারি লেগেই আছে। তাই এত বড় বাড়িতে একটা থাকতে ম্যাডামের অনেক দিন থেকেই ভয় ভয় করত। আর স্যারের সাথে অসংখ্য বার এই নিয়ে কথাও বলেছেন তিনি। স্যার যখন বাড়িতে ছিলেন তখনও বলেছেন স্যার যখন বাইরে ছিলেন তখনও ফোনে এই নিয়ে কথা বলেছেন।
৩। ওনাদের বেডরুমের পাশে একটা ঘর খালি পড়ে আছে সেই বহুদিন থেকে। সেখানে একটা পেয়িং গেস্ট রাখলে ম্যাডাম অনেকটা নিরাপদ ফিল করবেন। এটা নিয়েও স্যারের সাথে বহুবার ফেস টু ফেস আর ফোনে কথা হয়েছে। পেয়িং গেস্ট রাখতে না পারলে রাতে অন্তত একজন পাহারাদার রাখতে হবে। পেয়িং গেস্ট বা পাহারাদার রাখার ব্যাপারে এই লাস্ট কয়েকদিনে ওনাদের মধ্যে বহুবার আলোচনা হয়েছে। কারণ ম্যাডামের একটা থাকতে ভয় করে।
৪। তারপর একদিন ওনাদের বাড়িতে চোর এলো। এটাও উনি তক্ষুনি ফোন করে স্যার কে জানিয়েছেন।
৫। বাড়িতে চোর আসার পরে উনি আরও উঠে পড়ে লাগেন একজন পেয়িং গেস্ট রাখার ব্যাপারে। স্যারই ম্যাডামকে বলেছিলেন যে পাহারাদার রাখলে বেকার কিছু পয়সা বেরিয়ে যাবে। তাই প্রথমে পেয়িং গেস্ট খুঁজে দেখা যাক। নিতান্তই না পাওয়া গেলে তখন পাহারাদারের বন্দবস্ত দেখা যাবে। বাট পেয়িং গেস্ট অয়াস দা ফার্স্ট প্রেফারেন্স।
৬। এটা যেদিন ডিসাইড হল, ঠিক তার পরের দিনই সকাল বেলায় স্যার কাজে আবার বাইরে বেরিয়ে গেলেন দিন দুয়েকের জন্য। আর ঠিক সেইদিন কাকতালীয় ভাবে ম্যাডাম আমাকে বাজারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন।
৭। আমি ওনাকে হেল্প করি। উনি আমার প্রব্লেমের কথা শুনে আমাকে ওনাদের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকার কথা বলেন। অবশ্য তখনই বলেননি। বলেছেন এক দিন পর।
৮। আমি ওনাদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হই।
সঃ আমরা যে বাড়িতে পেয়িং গেস্ট রাখতে চাই এই নিয়ে আর কে কে জানত?
মঃ কাউকে কিছু জানানোর আগেই তো সংকেতকে পেয়ে গেলাম।
সঃ তুমি একদম ঠিক জানো যে গল্পের ছলেও তুমি কাউকে এটা বলোনি যে তুমি পেয়িং গেস্ট খুঁজছ?
মঃ না। একদম না।
সঃ শ্যামাদিকে বলেছিলে? বা তোমার কোনও কলিগকে?
মঃ শ্যামাদির সাথে এই নিয়ে আমার কোনও দিনও কোনও কথা হয়নি। আর আমার কোনও কলিগও এই ব্যাপারে কিচ্ছু জানে না।
সঃ আর তুমি বলছ যেদিন তুমি একদম বদ্ধ পরিকর হয়ে উঠলে যে এইবার একটা পেয়িং গেস্ট না রাখলেই নয়, ঠিক তার পরের দিনই সংকেতকে পেয়ে গেলে কাকতালীয় ভাবে?
মঃ একই কথা আর কতবার বলাবে আমাকে দিয়ে। পেয়িং গেস্ট রাখার ব্যাপারে তো আমাদের মধ্যে রোজই কথা হত। চোর আসার পর ব্যাপারটা নিয়ে আমরা আরও সিরিয়াস হলাম। এই যা। কিন্তু পাড়ার যা অবস্থা, তাতে বাড়িতে একা থাকতে যে আমার ভয় লাগে সেটা তো তুমি জানতেই। আর কিছু? নাকি এইবার আমি ঘুমাতে যাব?
সঃ গুড নাইট। একটু আলার্ট থেকো।
স্যার মোবাইলটা আরিফের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ওই দিকে ভিডিও স্ট্রিমিং শুরু হয়ে গেছে।
একদিকে আরিফ মন দিয়ে চ্যাটের লেখাগুলো পড়ে চলেছেন আর অন্য দিকে দুজন অফিসার মাঝ রাতে এক এক করে বাড়িতে নক করে লোকের ঘুম ভাঙ্গিয়ে আমার ছবি দেখিয়ে আমার কথা জিজ্ঞেস করছে। সত্যিই পুলিশ চাইলে পারে না এমন জিনিস হতেই পারে না। প্রায় এক ডজন বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর একটা বাড়ির কড়া নাড়তে একজন মধ্যবয়সী মহিলা এসে দরজা খুলে আমার ছবি দেখে আমাকে চিনতে পেরেছেন। ওদের মধ্যে কি কথাবার্তা হচ্ছে সেট কন্ট্রোল রুম থেকে বসে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। কল কনফারেন্স চলছে সেই অনেকক্ষণ ধরে। আর স্পাই ক্যামতো আছেই। মেয়েটার বয়ান নোট করে দুজন অফিসার আরও কয়েকটা বাড়িতে খোঁজ নিয়ে ফাইনালি থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। আরিফের হাত থেকে মোবাইলটা ইতিমধ্যে সবার হাত ঘুরে আবার মিস্টার বেরার হাতে ফিরে এসেছে। মিস্টার রাহা বললেন “ অর্জুন , গোটা ব্যাপারটাই তো গটআপ বলে মনে হচ্ছে!” মিস্টার বেরা চেয়ার ছেড়ে আবার উঠে পড়েছেন। “আরিফ ডাইরিতে লেখো।”
১। সংকেত জানলো কি করে যে সঞ্চিতা একজন পেয়িং গেস্ট খুঁজছে?
২। সংকেত কোলকাতায় আসার আগে থেকেই ও পেয়িং গেস্ট খুঁজছিল। কারণ পাড়ার অবস্থা ভালো নয়। কিন্তু আমার বাড়িতে আজ অব্দি কোনও দিন চোর আসার সাহস করেনি। চোর আসার পর সঞ্চিতা মরিয়া হয়ে উঠল পেয়িং গেস্ট রাখার জন্য। কিন্তু এই চোরটা কে?
৩। আমার বাড়ি থেকে যে ফাইলগুলো চুরি হয়েছে সেটা নিয়ে চোর কি করবে?
৪। সংকেত জানলো কি করে ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরা অফ করে রাখা আছে? এটা আমাকে এখন আরও বেশী করে ভাবাচ্ছে।
৫। ১৫ই আগস্ট মিস্টার ধরের বাড়ি যাওয়ার কারণ? ব্যস এই অব্দি থাক।
“আরিফ এই সব কটা প্রশ্নের উত্তর এক্ষুনি ভেবে বের করতে হবে। তুমি একজন অফিসারকে এক্ষুনি নিয়ে আসো যার নেটওয়ার্ক খুব স্ট্রং। অন্তত আমার বাড়ির লোকেশনে কি হচ্ছে না হচ্ছে এই নিয়ে যে সব থেকে বেশী খবর দিতে পারবে। কুইক আরিফ। সময় বেরিয়ে যাচ্ছে। “
কথামতন কাজ হল। একজন অফিসার এসে হাজির হল। তাকে নির্দেশ দিতেই সে বেরিয়ে গেলো। বলে দিয়ে গেলো, ৩০ মিনিটের মধ্যে এসে ব্রিফিং করবে। একজন অফিসার একটা ল্যাপটপের সামনে বসে বসে কল রেকর্ড দেখেই চলেছে। বাকিরা ওই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা শুরু করল। মিস্টার বেরা বললেন “মিস্টার রাহা। আপনি আপনার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বলুন। আপনার হাইপোথিসিস। তারপর আমরা বাকিরা সেই নিয়ে ক্রস করতে শুরু করব। “ মিস্টার রাহা ডাইরির প্রশ্নগুলোর দিকে একমনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন “মিস্টার বেরা। আমাদের ব্রেনটাকে রেস্ট দেওয়া দরকার। একটু রিল্যাক্স করে নেওয়া যাক। আগে ওই অফিসার ফিরে আসুন। তারপর বাকি সব ভাবা যাবে। আরেকটা জিনিস, আপনার বাড়ির কাজের লোকের ব্যাপারে যে খোঁজ নিতে পাঠিয়েছিলেন সেটার কি হল? আর মালিনী বলে মেয়েটার ব্যাপারে যে খোঁজ খবর নিতে পাঠিয়েছিলেন, তার কি হল? সেইগুলো একটু হাতে আসা দরকার। “ মিস্টার বেরা বললেন “ বেশ। একটু রেস্ট নেওয়া যাক। “ মালিনীর খবর ব্রিফ করা হল। মালিনীর ব্যাপারে আমি যতদূর জানি তার থেকে বেশী কিছু ওনারা সংগ্রহ করতে পারেননি। কল রেকর্ড এখনও ঘাঁটা হচ্ছে। তবে ইতিমধ্যে কয়েকটা অবসারভেশন করা গেছে। উল্লেখযোগ্য জিনিসগুলো হলঃ
১। এই সিমটা চালু হয় আমি কোলকাতায় আসার ঠিক এক দিন আগে। অন্য একটা আই এম ই আই থেকে সিমটা চালু করা হয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে চালু করেই সিমটা খুলে ফেলা হয়। পরে সিমটা আমার মোবাইলে ঢোকানো হয়েছে। আই এম ই আই টাকে আর ট্র্যাক করা যাচ্ছে না। সিম চালু করার সময় সিমের লোকেশন ছিল বালিগঞ্জ ফাঁড়ি।
২। এই সিম থেকে প্রথম কল করি আমি, কোলকাতায় পৌঁছে। বোঝাই যাচ্ছে, তখন মোবাইলের লোকেশন হাওড়া স্টেশন।
৩। শিখা, রাকা, দোলন, বেলা আনটি, কুন্তল, মালিনী,সঞ্চিতা ম্যাডাম ইত্যাদি পরিচিত লোকজন ছাড়া আমার মোবাইলে এই অব্দি প্রায় ১৫০ ওর ওপর বিভিন্ন নাম্বারের সিম আর আই এম ই আই থেকে কল আর এস এম এস এসেছে।
৪। এই নাম্বার গুলোর একটাও এখন আর অ্যাকটিভ নেই। একটা কি দুটো কল করেই সিম খুলে নেওয়া হয়েছে। ওই আই এম ই আই গুলোও আর ট্র্যাক করা যাচ্ছে না।
৫। সিমগুলো তোলার সময় যে তথ্যগুলো দেওয়া হয়েছিল, যেমন, নাম, ঠিকানা, ইত্যাদি, সেগুলো সব জালি।
আমার সিমটা যার নামে ওঠানো হয়েছে তার নাম সংকেত রায়। বাবার নাম সুবীর রায়। ঠিকানাঃ ব্লু রিসোর্ট হোটেল। রুম নাম্বার ১০৭। ওই ১৫০ টা সিমের লোকেশন রিপোর্ট বের করা হচ্ছে। মানে সিমগুলো যখন চালু ছিল তখনকার লোকেশন রিপোর্ট। মোটের ওপর এই। আচ্ছা ইতিমধ্যে ১০৭ নম্বর রুম সার্চ করে অফিসাররা ফিরে এসে ব্রিফিং করে দিয়েছে। নতুন কিছু পাওয়া যায়নি। মিস্টার বেরার অনুমানই ঠিক। গোটা ঘরে একটাও ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি। দুটো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে। তবে সেগুলো হোটেলের দুজন রুমবয়ের আঙুলের ছাপ। অলরেডি মিলিয়ে দেখা হয়েছে। আমার চেকআউট করার পর এরাই ১০৭ নম্বর ঘরটা পরিষ্কার করেছিল। আরেকটা তথ্য একই সাথে দিয়ে রাখছি। ১০৭ নম্বর ঘরের মতন ১০৯ আর ১১০ নম্বর ঘরও সার্চ করা হয়েছে। ওই ঘর দুটোতে অবশ্য অনেকের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। তবে আমার আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। তাতে অবশ্য মিস্টার বেরা খুব একটা আশ্চর্য হননি। কারণ ওনার ধারণা যেই মিস্টার মেহেরার ঘরে ঢুকে থাকুক না কেন তার হাতে নিশ্চই দস্তানা পরা ছিল। কারণ নিজের আঙুলের ছাপ ছেড়ে যাওয়ার মতন বোকা লোক সে নয়। ফোর্থ ফ্লোরের যেই ঘরে আমি সেদিন রনির সামনে মালিনীর সাথে ফুলশয্যা করেছিলাম সেই ঘরও খুব ভালো ভাবে সার্চ করা হয়েছে। ওখানেও আমার ফিঙ্গারপ্রিন্টের হদিশ মেলেনি। মিস্টার বেরা বললেন আরিফ আরও তিনটে প্রশ্ন অ্যাড করো। আগের হাইপোথিসিস গুলো কে এইবার সত্যি ভেবে এগিয়ে পড়তে হবে। পথে বাঁধা পেলে তখন অন্য কিছু ভাবা যাবে।
৬। সংকেতের সাথে মালিনীর এত মাখামাখি কেন? রেকর্ড থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে বেশ কয়েকবার ওদের মধ্যে ফোনে কথাবার্তা হয়েছে। এমনকি ওদের মধ্যে মেসেজ আদান প্রদানও হয়েছে। নিজের ভাইয়ের ব্যাপারে কি এমন বলার থাকতে পারে যে ঘন ঘন ওর ঘরে গিয়ে সময় কাটাতে হয়? আর ফোনে এত কথা বলারই বা কি আছে? আর মেসেজ আদানপ্রদানই বা কেন?
৭। যদি ধরে নি সংকেত মিস্টার মেহেরার সাথে ধাক্কা লাগার ভান করে ওনার পকেট থেকে চাবিটা সরিয়ে নিয়েছিল, তাহলে সেই চাবিটা দিয়ে সংকেত পরের ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে কি করেছে?
৮। সংকেত কি করে জানতে পারল যে মিস্টার মুখার্জির ডিজাইন মাফিক একটা ফিউস তৈরি করে মিস্টার মেহেরার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে?
৯। সংকেত কি করে জানতে পারল যে সেই দিনই মিস্টার মেহেরার হাতে ফিউসের ফার্স্ট মডেলটা এসে পৌঁছেছে? ( কেন মিস্টার বেরার ধারণা আমাকে দুটো ফাইল আর ফিউসটাকে একসাথে চুরি করতে হল? বা অন্য ভাষায় বলতে গেলে কেন আমাকে ফিউসটা মিস্টার মেহেরার হাতে আসা অব্দি অপেক্ষা করতে হয়েছে? কেন শুধু দুটো ফাইল নিয়েই আমি কেটে পড়িনি? এগুলো সবই ওনার হাইপোথিসিস। এইসব ব্যাপারে আগেই ডিটেলে লেখা হয়েছে।)
“আরিফ আরেকটা জিনিস। শুধু ওই ১৫০ টা সিমের লোকেশন রিপোর্ট বের করে লাভ নাও হতে পারে। সংকেতের সাথে যাদের যাদের ফোনে যোগাযোগ ছিল, যেমন, রাকা, দোলন, মালিনী, বেলা মুখার্জি,সঞ্চিতা এদের সবার সিম লোকেশনের রিপোর্ট বের করো। “ মিস্টার খান একটু গলা খাঁকড়িয়ে বললেন “ মিসেস বেরার সিম লোকেশনের রিপোর্টটা বেরা করা কি সত্যি খুব জরুরি?” মিস্টার বেরা এইবার খেঁকিয়ে উঠেছেন “ কেন? আমার বউ বলে কি গোটা রাজ্যের মাথা কিনে নিয়েছেন? যা বলছি তাই করো। আর খুব কুইক করো। “ মিস্টার আরিফ বললেন “স্যার আরেকটা জিনিস অনেকক্ষণ ধরে মনে হচ্ছিল। আমরা সংকেতকে অ্যারেস্ট করছি না কেন?”
মিস্টার বেরা বললেন “ কতবার বলব যে বোকার মতন কথা বলবে না। ওর অপরাধটা কি? মিস্টার মেহেরার সাথে একই হোটেলে একই ফ্লোরে থাকা? ওর সাথে মিস্টার মেহেরার একবার ধাক্কা লেগেছিল? যার আবার কোনও প্রমান নেই। ওর ঘরে একটা ল্যাপটপ আছে যেটা চোরাই মাল? মালিনীর সাথে ওর সম্পর্ক ছিল? ১৫০ টা ভুয়ো নম্বর থেকে ওর কাছে ফোন এসেছিল বা এস এম এস এসেছিল? কিসের জন্য ওকে অ্যারেস্ট করব একবার বুঝিয়ে বলবে? প্রথম দিনেই আদালাত থেকে ও ছাড়া পেয়ে যাবে। আর তাতে হিতে বিপরীত হবে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে এই শহরে ও একা নয়। ওর ঘরে যে ফাইল নেই সেটা তো আমরা আগেই দেখেছি। তার মানে ফাইল আর ফিউস্টা অন্য কারোর কাছে আছে। ওকে গ্রেফতার করলেই সে সতর্ক হয়ে সরে পড়বে। ওর বিরুদ্ধে একদম কংক্রিট প্রমান পাওয়ার পর ওকে গ্রেফতার করতে হবে। আর একই সাথে ওর সাঙ্গপাঙ্গগুলোকেও গ্রেফতার করতে হবে। সবাইকে একই সাথে গ্রেফতার না করতে পারলে সব গুবলেট হয়ে যাবে আরিফ। তাই এখন বোকার মতন কথা বলো না। (একটু নরম হয়ে বললেন) শ্যামা নস্করের বাড়িতে যে অফিসার গেছিল সে কি ফিরেছে? ওই কালো স্যান্ট্রোর কোনও খবর পাওয়া গেল? ”
আরিফ আমতা আমতা করে বললেন “ ওই অফিসার এখনও ফেরেনি। কোলকাতার বা কোলকাতার চারপাশে যত রেজিস্টারড কালো রঙের স্যান্ট্রো আছে সবগুলোর ইনফরমেশন আমাদের হাতে চলে এসেছে। আমরা এক এক করে ইনভেস্টিগেট করে দেখছি। “ মিস্টার বেরা বললেন “ব্যাপারটা জানি যে ওয়াইল্ড গুজ চেজ করা হচ্ছে। তবুও বলছি। প্রত্যেকটা গাড়ির মালিকের ব্যাপারে খোঁজ নাও। দেখো কারোর সাথে কোনও ভাবে সংকেতকে লিঙ্ক করা যায় কিনা? আমি দশ মিনিট বাইরে থেকে হেঁটে আসছি। তারপর আমরা ডাইরির প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করব।” মিস্টার বেরা ঘর থেকে হন হন করে বেরিয়ে গেলেন।
মিস্টার বেরা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রায় পনের মিনিট কেটে গেছে। সবাই রেডি। চাও এসে গেছে। মিস্টার বেরা ফিরে এলেন হাতে দুটো প্লাস্তিকের থলি। বললেন “ আরিফ দরজা বন্ধ করে দাও। কয়েকটা গ্লাস নিয়ে এসো। এখন আর গলা দিয়ে চা নামবে না। যা বিষ মালের সাথে পালা পড়েছে না… গলা দিয়ে একটু বিষ না ঢাললে হচ্ছে না। “ সবাই বুঝে গেছে যে থলিতে কি আছে। রবিন বাবু বললেন “এত রাতে পেলেন কোথা থেকে?” মিস্টার বেরা বললেন “ ব্ল্যাকে কিনেছি, এই কথাটা কি ঢাক পিটিয়ে না বললেই নয়। “
আসর শুরু করার আগে অবশ্য সেই অফিসারের বয়ান নিয়ে নেওয়া হল। এই অফিসার তার পুরো নেটওয়ার্ক লাগিয়ে কিছু তথ্য কালেক্ট করেছেন। “স্যার, ওই পাড়াতে চুরি চামারি হচ্ছে সেটা ঠিক। কিন্তু সবাই জানে ওটা আপনার বাড়ি। আর ইয়ে, মানে আমরা তো সবাই জানি যে কোন এরিয়া কার? মানে কোন গ্রুপের কোন এরিয়া সেটা তো আগে থেকেই একদম ভাগাভাগি করা থাকে। আমি প্রায় সব কটা গ্রুপের সাথে কথা বলে ভেরিফাই করেছি যে কেউ জ্ঞানত আপনার বাড়িতে চুরি করতে যায়নি। একবারের জন্যও নয়। আর আমার নেটওয়ার্ক বলছে এই বাজারে আর কোনও নতুন চোর আসেনি। আমি একদম সিওর। দরকার হলে সবকটাকে এক্ষুনি তুলে নিয়ে আসতে পারি। স্যার নতুন চোর এলে আমাদেরও আগে সেই এরিয়ার চোরেরা জেনে যাবে। কারণ তাদের পেটেই তো লা…।”
মিস্টার বেরা হাত তুলে ওনাকে বিদায় দিলেন। দরজা বন্ধ হল। গ্লাস সাজিয়ে রাখা আছে। মিসেস রাহার জন্য ভদকা নিয়ে এসেছেন মিস্টার বেরা। মিসেস রাহা শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন যে উনি খুবই অল্প করে নেবেন। গ্লাসে পানীয় ঢেলে একে একে সবাই চিয়ার্স বলল, মিস্টার বেরা চিয়ার্স না বলে বললেন “ হ্যাং সংকেত রায়। মিস্টার রাহা শুরু করা যাক। আপনি বলুন। আমরা ক্রস করব যখন যেমন দরকার হবে। “
মিস্টার রাহা আরম্ভ করলেন। “ মিস্টার বেরা একটা সিগারেট পাওয়া যাবে? মদের সাথে সিগারেট না পেলে…” একটা সিগারেট ধরিয়ে উনি শুরু করলেন “ মিস্টার বেরা কোনও পয়েন্ট নিয়ে এগোনোর আগে কিছু কথা আমি অ্যাজ এ ক্রিমিনাল সাইকলজিস্ট বলতে চাই। কিছু মিস করলে আমার গিন্নি সেই ব্যাপারে পাদপূরণ করে দেবেন। আপনি একজন পোর খাওয়া ইনভেস্টিগেটর। আপনি জানেন, যে কোনও ক্রাইম ক্র্যাক করতে গেলে প্রথমে ক্রাইমের প্যাটার্নটা বুঝতে হয়। ক্রিমিনালের কাজ করার প্যাটার্ন বুঝতে হয়। সেটা ধরতে পারলেই আমাদের ৯০% কাজ শেষ। তারপর সেই লোককে ধরা ইস জাস্ট অ্যা ম্যাটার অফ টাইম। আপনি আপনার ডাইরিতে যে প্রশ্নগুলো লিখেছেন আর চার পাশে যা যা হয়েছে, তার থেকে কোনও প্যাটার্ন ধরতে পেরেছেন? বা কোনও বিশেষত্ব লক্ষ্য করেছেন গোটা ব্যাপারটার ভেতর? ”
মিস্টার বেরা বললেন “ আমার নিজস্ব একটা হাইপোথিসিস তৈরি। বাইরে হাঁটতে গিয়ে সেটা ভেবে ফেলেছি। কিন্তু আগে আপনি বলবেন, আমি শুধু ভেরিফাই করব যে আমারটা আপনার সাথে মিলছে কি না!” মিস্টার রাহা বললেন “ সেটা না করে আপনি নিজের হাইপোথিসিসটা তুলে ধরুন। কারণ অনেক জিনিস আছে এই কেসের ব্যাপারে যেগুলো আমি জানি না। কিন্তু আপনি জানেন। আমি তো এই কিছুক্ষণ হল এসেছি। তবে আমি বলব , একটা একটা করে প্রশ্নের পিছনে ধাওয়া না করে ওভার অল একটা হাইপথিসিস সাজানোর চেষ্টা করুন। কোথাও মতের অমিল হলে আমি বলে দেব। “
মিস্টার বেরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুরু করলেন। “ প্রথমেই বলে রাখি যে আমরা শিখার মৃত্যুর ব্যাপারে কোনও কথা বলছি না। এখানে সংকেত কে বোঝার চেষ্টা করছি। বা ওর কাজ কর্মের প্যাটার্ন বোঝার চেষ্টা করছি। আমার আগের হাইপোথিসিসগুলোতে আমি অলরেডি বলেছি কেন এটা ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে যে সংকেত এখানে এসেছে মিস্টার মেহেরার কাছ থেকে ওই মূল্যবান জিনিসগুলো হাতিয়ে নিতে। এইবার আরও ব্রড ওয়েতে ভাবার চেষ্টা করছি। তার আগে একটা জিনিস বলছি আরিফ। আজ সকাল হতে না হতে, মালিনীকে উঠিয়ে নিয়ে এসো। ওর কাছ থেকে আমার অনেক কিছু জানার আছে। “
১। সংকেত এই শহরে আসছে মিস্টার মেহেরার জিনিস হাতিয়ে নিতে।
২। সংকেত মিস্টার মেহেরার সাথে একই হোটেলে একই ফ্লোরে রুম বুক করে থাকতে লাগলো।
৩। সেখানে ঘটনাচক্রে ও জানতে পারল যে মালিনীর ভাই ওরই ক্লাসমেট।
৪। ওই ভাইয়ের সুযোগ নিয়ে ও মালিনীর সাথে আলাপ করল। ওদের ঘনিষ্ঠতা হল। এখানে একটা কথা বলে রাখি, মালিনীর সাথে না হলে অন্য কারোর সাথে ও ঘনিষ্ঠতা করতে চাইত, কারণ যে হোটেলে ও আছে সেই হোটেলের নাড়ি নক্ষত্র ওকে জানতে হবে।
৫। মালিনী ওর ফাঁদে পা দিল।
৬। মালিনীর কাছ থেকে কোনও মতে ও জানতে পারল যে ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরা কাজ করে না। (আরিফ পুরো জিনিসটা নোট করছেন। এখানে মিস্টার রাহা বাঁধা দিয়ে বললেন, “মিস্টার খান, এখানে একটা প্রশ্ন বোধক চিহ্ন দিয়ে রাখুন।” মিস্টার বেরা এগিয়ে চললেন…) যদি ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরা কাজ করত তাহলে ও কি উপায় অবলম্বন করত সেটা এখন ভেবে লাভ নেই। হতে পারে অন্য কোনও প্ল্যান ছিল কিন্তু ক্যামেরা কাজ না করায় ওর যে কিছুটা সুবিধা হয়েছে সেটা তো মানতেই হবে। মদ্যা কথা মালিনীর কাছ থেকে ও জানতে পারে যে ক্যামেরা কাজ করছে না।
৭। মিস্টার মেহেরার পকেট মেরে চাবি হাতানো, এবং …
মিস্টার রাহা এইবার নড়ে চড়ে বসলেন “ এইখানে আমি কিছু বলতে চাই। ব্যাপারটা অন্য বেশ কয়েকটা জিনিসের সাথে খাপে খাপে বসে যাবে। এখানে প্যাটার্নের কথা আসছে। সংকেত মিস্টার মেহেরার পকেট থেকে চাবি হাতায় এবং ওনার ঘরে ঢুকে ভিডিও ক্যামেরা আর মাইক্রফোন বসিয়ে দিয়ে আসে। আর তাই ওর সেই কাজ করতে গিয়ে ১৫-২০ মিনিট সময় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকে ওই ঘরের ভেতর যা যা হয়েছে, তার সবকিছু সংকেত দুটো ঘর পরে বসে জানতে পেরেছে, দেখতে পেয়েছে। এইভাবেই ও জানতে পারে যে একটা ফিউস তৈরি হচ্ছে। এইভাবেই ও জানতে পারে যে কবে ফিউসটা মিস্টার মেহেরার হাতে আসছে। মানে ও সব কিছু দেখতে পেত, শুনতে পেত।”
মিস্টার আরিফ বললেন “স্যার এখানে একটা সামান্য ক্রস করতে পারি?” মিস্টার বেরা বললেন “অবশ্যই।” আরিফ বললেন “ স্যার একটা জিনিস মাথায় ঢুকছে না। সংকেত যে জাতের ধুরন্ধর, তাতে ওর পকেট মারার দরকার হল কেন? এইসব প্রফেশনলরা তো চাবি ছাড়াই যেকোনো তালা খুলতে পারে বলে শুনেছি বা দেখেছি।” মিস্টার বেরা উত্তর দিলেন “ ভুলে যেও না আরিফ, ফার্স্ট ফ্লোরের ক্যামেরা বন্ধ হতে পারে। কিন্তু গেস্ট আর রুম বয়ের যাতায়াত সর্বক্ষণ লেগেই আছে। ওই চাবি খুলতে গিয়ে ওর দেরী হলে কেউ না কেউ ওকে দেখে ফেলতে পারত। যখন মিস্টার মেহেরার ঘরে কোনও ভি আই পি আসত পেছনের গেট দিয়ে শুধু তখনই ফার্স্ট ফ্লোর থেকে সব রুম বয়দের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। এক্ষেত্রে ঘরের চাবি দিয়ে তালা খুলতে কম সময় লাগবে, আর সেটাই সব থেকে সেফ।”
সুতরাং পুরো হাইপোথিসিসটা কি দাঁড়াচ্ছে? মিস্টার মেহেরা এখন ওর কব্জায় চলে এলো, কারণ ওনার ঘরের ভেতর স্পাইক্যাম আর মাইক্রোফোন সেট করা আছে। মিস্টার রাহা বললেন “এর পরের কথাগুলো আমি আরেকটু গুছিয়ে বলছি।” মিস্টার রাহা বলে চললেন।
৮। এইবার অন্য দিক থেকে ভাবা যাক। জিনিসটা চুরি করে সব কিছু পরিষ্কার করে পালাতে একটু হলেও সময় লাগবে। আর ন্যাশনাল সিকিউরিটি নিয়ে কোনও প্রশ্ন হলে বেস্ট অফিসারকেই সেই দায়িত্ব দেওয়া হবে। অ্যান্ড অফ কর্স দা বেস্ট আর অবভিয়াস চয়েস হল অর্জুন বেরা। (মিস্টার বেরা ছাড়া ঘরের বাকি সবাই হো হো করে হেসেউঠলেন) আর এই সব ব্যাপারে সরকার একফোঁটা দেরী করবে না। কারণ এই জিনিসে গাফিলতি হলে গোটা দেশ লুটে যাবে।
৯। সংকেত এখানে আসার আগেই চুরি করার পরের এক্সিট প্ল্যান গুলো ঠিক করে ফেলল। ও জানে জিনিসটা চুরি যেতে না যেতেই অর্জুন এসে ওর ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলা শুরু করবে। অতএব? এখানে আসার আগেই ও অর্জুন বেরার ব্যাপারে সব খবর কালেক্ট করে নিল।
১০। কিন্তু অর্জুনের ব্যাপারে শুধু খবর নিয়ে কি হবে? অর্জুনের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে ওকে সব সময় অর্জুনের থেকে অন্তত এক পা এগিয়ে থাকতে হবে। অর্থাৎ অর্জুন কি করছে, কি ভাবছে, অর্জুনের কাজ করার প্যাটার্ন এগুলো যতটা সম্ভব আগে ভাগে ওকে জানতেই হবে। নইলে জিনিসটা চুরি যাওয়ার পর ও ফেঁসে যেতে পারে। ও জানে অর্জুন কি ধাতুতে গড়া। সুতরাং এখানে এসেই ও হানা দিল বাঘের ডেরায়।
ঠিক এই সময় কেন জানি না, রবিন দাসের পাশে বসে থাকা অফিসারটি ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মিস্টার বেরা বললেন “ তুমি কিছু বলবে?” উনি এতক্ষন ধরে বসে বসে আমার কল রেকর্ড আর সিম লোকেশন রিপোর্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেক করছিলেন। উনি বললেন “স্যার জানি না, ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভাবে কাকতালীয় কিনা। তবুও বলছি। বেশ কয়েকটা অদ্ভুত জিনিস ওর সিম লোকেশন থেকে আমি পাচ্ছি। কিন্তু তার মধ্যে দুয়েকটা জিনিস এখন না বললেই নয়। (একটু থেমে বললেন) মনে হয় মিস্টার রাহা খুব একটা ভুল বলছেন না। স্যার, হোটেল থেকে সংকেতকে কলেজে যেতে হলে যে পথে যেতে হবে আপনার বাড়ি ঠিক তার উল্টো পথে।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, সংকেত কোলকাতায় আসার ঠিক পরের দিন সকাল ৭ টার কিছু আগে থেকে আপনার বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করছিল। ৭.১০ অব্দি আপনার বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করে ও আবার নিজের হোটেলে ফিরে যায়।
এইবার তার পরের দিনের রিপোর্ট বলছে, ঠিক ৭ টার সময় ও আপনার বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হয়। ৭.১৫ অব্দি ওখানে থেকে আবার হোটেলে ফিরে আসে।
তার পরের দিনের রিপোর্ট বলছে, ৭.২৮ মিনিটে ও আপনার বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছায় এবং ৭.৫৮ অব্দি ও ওখানেই ছিল (এই দিন আমি সবার জন্য জন্মদিনের স্যান্ডউইচ প্যাক করতে গেছিলাম)। তারপর ও আবার কলেজের দিকে রওয়ানা দেয়।
সব থেকে ইন্টারেস্টিং হচ্ছে তার পরের দিনের রিপোর্ট। সেদিন ও ঠিক ৮.০২ এ আপনার বাড়ির সামনে গিয়ে পৌঁছায়। ৮.৩৫ অব্দি ও আপনার বাড়ির লোকেশনেই ছিল। তারপর কলেজের দিকে রওয়ানা দেয়। (এই দিন ফার্স্ট পিরিয়ড ছিল সঞ্চিতা ম্যাডামের। এই দিন আমি বেশ কিছুটা লেটে ক্লাসে ঢুকেছিলাম, আর সেজন্য ম্যাডামের কাছ থেকে ডিসিপ্লিন ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু লেকচারও শুনতে হয়েছিল। )”
অফিসার থামলেন। সিম লোকেশনের কাগজগুলো সবার হাত ঘুরে আবার সেই অফিসারের হাতে গিয়ে পৌছালো। অফিসার আবার শুরু করলেন “ জাস্ট আরও দুটো কথা বলতে চাইছি।” মিস্টার বেরা ওনাকে থামিয়ে বললেন “ তার আগে বল, এই দিনটা শুক্রবার তাই তো?” অফিসার বলল “ হ্যাঁ মানে, ও সাড়ে আটটা অব্দি যেদিন আপনার বাড়ির চারপাশে ছিল, সেদিন ছিল শুক্রবার। আমি কিন্তু তার পরের দিনের কথা বলতে চাইছি। মানে শনিবারের। “ মিস্টার বেরা ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন “ আর শুনে লাভ নেই। মিস্টার রাহা ১০ নম্বর হাইপোথিসিসটা শুরু করেছিলেন। আমি সেটা খতম করছি এইবার। সংকেত সোমবার এসে পৌছালো কোলকাতায়। মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, এই তিন দিন আমার বাড়ির ওপর নজর রাখল। ও দেখে নিল সকাল বেলায় কে কে আমাদের বাড়িতে আসে, কে কখন বেরোয়। সঞ্চিতা প্রত্যেকদিন ৮ টা থেকে ৮.০৫ এর মধ্যে বেরিয়ে যায়। ৮.৩০ থেকে ওর ক্লাস থাকে। ৮ টার পর থেকে আমাদের বাড়ি মোটামুটি খালি হয়ে যায়। শুক্রবার ও ৮ টার সময় গিয়ে আমার বাড়ির সামনে হাজির হয়। এই রকম ক্রিমিনালের কাছে বাড়ির তালা খোলা যে এমন কোনও ব্যাপার নয় সেটা তো আরিফ আগেই বলেছে। ও নিজের কলা কৌশল খাটিয়ে বাড়ির তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। সারা বাড়িতে স্পাই ক্যামেরা আর মাইক্রো ফোন সেট করে বেরিয়ে গেল। ক্লাসে ঢুকতে একটু লেট হল বটে, কিন্তু আসল কাজ হয়ে গেছে। এখন ওর চোখ আর কান দুটোই আমাদের বাড়িতে গোপনে বসানো আছে।
১১। সঞ্চিতা বাড়ি ফেরার পর ওর সাথে সেদিন আমার অনেকক্ষণ ধরে ফোনে কথা হয়। বৃহস্পতিবার রাতেই আমাদের বাড়ি থেকে দুটো বাড়ি পরে চোর এসেছিল। অনেক কিছু নিয়ে গেছে। সেই নিয়ে ও খুব চেঁচামেচি করছিল ফোনে। বার বার বলছিল দোতলার খালি ঘরটাতে একজন পেয়িং গেস্ট রাখার কথা। কথাটা ও বলতে চেয়েছিল আমাকে, কিন্তু শুনে ফেলল সংকেত।
১২। সংকেত আমার ব্যাপারে তখন অনেক কিছু জেনে গেছে। ডিফেন্সের সেই ইললিগ্যাল ওয়েপণ ডিলারদের যে ফাইলগুলো আমার বাড়ি থেকে গতকাল চুরি গেছে সেই ফাইলগুলোর অস্তিত্বের ব্যাপারে ও আশা করছি ইতিমধ্যে জেনে গেছে। কোনও ভাবে ও জানতে পেরেছিল যে ফাইলগুলো আছে আমার বাড়িতে। এদের সোর্সের তো আর অভাব নেই!
১৩। ও যখন কোলকাতায় এসেছিল তখন ওর হাতে ছিল তিনটে মাত্র টার্গেটঃ
— মিস্টার মেহেরার ঘর থেকে জিনিস হাতানো
— মিস্টার মুখার্জির হত্যা
— মিস্টার মুখার্জির বাড়ি থেকে সেই ফিউস রিলেটেড ফাইলের লাস্ট কপিটা সরিয়ে ফেলে ওনার ল্যাপটপের হার্ড ড্রাইভটা বদলে ফেলা।
১৪। কিন্তু এইবার, সঞ্চিতা একা থাকতে ভয় পায়, বাড়িতে পেয়িং গেস্ট বসাতে চায়, আমার বাড়িতে ওয়েপন ডিলারদের ফাইল আছে- এই ৩ টে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ও একটা আরেকটা বাড়তি প্ল্যান বানিয়ে ফেলল।
— মিস্টার মুখার্জির বাড়ি থেকে ফাইল হাতানর সময় মিস্টার মুখার্জির আর যেসব আর্মস রিলেটেড গবেষণার ফাইল আছে সেগুলোও সংকেত হাতিয়ে নেবে।
— আমার বাড়িতে এন্ট্রি নিয়ে অয়েপন ডিলারদের ফাইলগুলো হাতিয়ে নেবে।
— মিস্টার মুখার্জির বাড়ি থেকে চুরি করা বাদ বাকি ফাইলগুলো ও এই অয়েপন ডিলারদের কাছে চড়া দামে বেচে দেবে। অর্থাৎ ফাইলগুলো চুরি করার পর ওকে আর খদ্দের ধরার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে না। মানতেই হবে ছেলেটার মাথায় কিছু দিয়েছেন ভগবান।
১৫। ওর শুধু আমাদের বাড়ির ভেতর ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন সেট করলেই চলত। কিন্তু এই বাড়তি প্ল্যানটা মাথায় আসার সাথে সাথে ও মরিয়া হয়ে উঠল আমাদের বাড়ির ভেতর এন্ট্রি নেওয়ার জন্য।
১৬। স্পষ্ট মনে আছে শুক্রবার রাতেই আমাদের বাড়িতে চোর আসে। অবশ্য সংকেত নিজে আসেনি। সংকেতের কোনও সাকরেদ কে দিয়ে এই কাজটা করিয়েছে। কেন? সঞ্চিতাকে আরও ভয় দেখানো। পাশের বাড়িতে চুরি হলে যে মেয়ে ভয়ে কাঁপতে থাকে তার নিজের বাড়িতে চোর পড়লে তো আর কথাই নেই। ফলও হল সেই মতন। সঞ্চিতা শুক্রবার রাতেই আবার ফোন করে আমাকে বলল যে এইবার হয় একটা পেয়িং গেস্ট বসাতে হবে অথবা একটা পাহারাদার। সংকেতের কাজ সোজা হয়ে গেল।
১৭। শনিবার করে বিকাল বেলায় সঞ্চিতা বাজার করতে যায়। সপ্তাহের বাজার। খবরটা সংকেত পেয়ে গেল। কিভাবে পেয়ে গেল সেটা নিয়ে ভেবে এখন আর কোনও লাভ নেই। হতে পারে এই নিয়ে সঞ্চিতা কাউকে কিছু বলেছে, বা ওর ওপর আগে থেকেই নজর রাখা হচ্ছিল। যাই হোক, সংকেত শনিবার সন্ধ্যের দিকে গিয়ে হাজির হল বাজারের ঠিক মুখে। উনি অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন “কি এটাই বলতে চাইছিলে তো?” অফিসার হেসেমাথা নাড়াল। মিস্টার বেরা বলে চললেন।
১৮। সঞ্চিতার সাথে সংকেতের বাজারের সামনে দেখা হয়। সঞ্চিতা মনে করল ব্যাপারটা কাকতালীয়। সংকেত ওর জিনিস বয়ে নিয়ে বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে যায়। সঞ্চিতা ওকে বাড়ির ভেতর ডেকে বসতে বলে। কথাবার্তার ফাঁকে সংকেত ওকে জানিয়ে দেয় যে ও সস্তায় মেস খুঁজছে। অর্থাৎ সঞ্চিতা যে জিনিসটা পাওয়ার জন্য বাড়িতে চোর আসার পর থেকে মরিয়া হয়ে উঠছে, ও ঠিক সেই জিনিসটাই ওর মুখের সামনে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলে ধরল।
১৯। সঞ্চিতা ওর ফাঁদে পা দিল। রাতে আমার সাথে কথা হল। আমিও গোটা ব্যাপারটা তখন বুঝতে পারিনি। আমি সায় দিলাম। সঞ্চিতা সংকেতকে ডেকে পাঠাল। মোটের ওপর সংকেত যেটা চাইছিল, সেটা ও পেয়ে গেল। আমাদের বাড়িতে এন্ট্রি।
২০। মনে করে দেখো,শনিবারই মিস্টার মেহেরা মিসিং কির ব্যাপারে কমপ্লেন করেছিলেন। আর ওই দিনই হোটেলে সংকেত সেই সিকিউরিটি পিটিয়ে অদ্ভুত একটা নাটক করেছিল। সকালে ও মিস্টার মেহেরার ঘরে ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন বসালো। সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে প্রবেশ করার পথ পুরো সাফ করে ফেলল। ওর এখন মাত্র দুটো কাজ বাকি।
ক। মিস্টার মুখার্জিকে হত্যা, কারণ উনি বেঁচে থাকলে ওই ফিউস উনি আরেকবার বানিয়ে ফেলবেন।
খ। যেকোনো ছুতোয় মিস্টার মুখার্জির বাড়িতে অবাধ যাতায়াতের পারমিশন।
২১। তারপর, এইটা আমার একটু দুর্বল হাইপোথিসিস, কিন্তু আগেও বলছি, এখনও আরেকবার বলছি, মিস্টার মুখার্জিকে বাইরে পাবলিক প্লেসে নিয়ে আসতে না পারলে তাকে হত্যা করা খুব কঠিন। বাড়িতে ঢুকে মারার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। ও সেদিনই রাতে দোলন ইত্যাদিদের সাথে পার্টি করতে গেল। জানতে পারল সবাই মদ্যপ অবস্থায় মন্দারমনি যাওয়ার প্ল্যান করছে সেই রাতে। এক ঢিলে দুই পাখি মারল ও। দীপককে হাত করে গাড়ির দুর্ঘটনা করে শান্তনু মুখার্জিকে মেরে ফেলল।
২২। রঞ্জন মুখার্জি পাবলিক প্লেসে আসতে বাধ্য হলেন। সেই হাসপাতাল। কি করে রঞ্জন মুখার্জিকে ও হত্যা করল সেটা এখনও জানি না। তবে ব্যোমকেশ বক্সির পথের কাঁটা যারা পড়েছেন, তারা অনুমান করতে পারেন কিভাবে পাবলিক প্লেসে সকলের সামনে অনুরূপ একটা অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে ও রঞ্জন মুখার্জিকে হত্যা করেছিল। হত্যার পদ্ধতি বুঝতে পারছি, কিন্তু যন্ত্রের কথাটা এখনও জানি না। কিন্তু পরের ঘটনাটা জলের মতন পরিষ্কার।
২৩। এইটা সেদিন কার অফিসারের বয়ান অনুযায়ী ফাইলেই আছে। সংকেত সবার সামনে ইঙ্গিত করল যে রঞ্জন বাবুর হত্যা দীপকেরই কোনও লোকের কাজ। কারণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ফাইলে দেখেছি, একটা জায়গায় নোট করা আছে, সংকেত সবার সামনে দীপককে বলেছিল যে দীপক যদি খুন করে থাকে তো ও বাইরে বেরনোর সাথে সাথে খতম হয়ে যাবে, মিস্টার মুখার্জির পার্টির লোকজন দীপককে মেরে ফেলবে। সংকেত সেই সাথে আরও বলল… সংকেত নিজে যদি দীপকের জায়গায় থাকত তাহলে ও সুইসাইড করে নিত। লাহিড়ীও তখন ওখানে ছিল। কি ঠিক বলছি না? (মিস্টার লাহিড়ী নিরবে মাথা নাড়িয়ে বললেন “স্যার ও দীপকের দিকে একদম তেড়ে গেছিল। বেশ বুঝতে পারছিলাম যে দীপক ওর কথা বার্তা শুনে ভয় পেয়েছে। তখনই ও দীপককে বলে যে আমি তোমার জায়গায় থাকলে কি করতাম জানো? আমি নিজে সুইসাইড করে নিতাম। তোমার বাচার সব রাস্তা এখন বন্ধ। আর তারপরেই তো স্যার জানেন। আমি অবশ্য তখন ভেবেছিলাম যে পার্টির লোকের হাতে মরার কথা বলছে ওই ছেলেটা, কিন্তু আপনার কথা ঠিক হলে তো গোটা ব্যাপারটাই…” মিস্টার বেরা আবার শুরু করলেন…) লাহিড়ীর এক অফিসার এই নোটটা নিয়েছিল। এইবার কাজের কথায় আসা যাক। সবাই শুনল সংকেত বলছে যে মিস্টার মুখার্জির পার্টির লোক দীপককে মেরে ফেলবে। কিন্তু দীপক শুনল অন্য কথা। ও শুনল, ও বাইরে বেরলেই সংকেত ওকে খুন করে দেবে। আর সংকেত ওকে বলছে যে তুই নিজেই সুইসাইড করে নে। এইবার …
মিস্টার বেরার চারপাশের লোকজন এই হাইপোথিসিসটা শুনে একটু উসখুস করতে শুরু করে দিয়েছে দেখে উনি বললেন “দাঁড়াও। আমি জানি কেন তোমাদের কনফিউশন হচ্ছে। কনফিউশন আমারও একটা আছে। আরিফ চট করে দীপক যে হোস্টেলে থাকত তার নাম্বার ডায়াল কর। স্পিকারে দাও। যতক্ষণ না কেউ ফোন তোলে রিং করতে থাকো। এই ব্যাপারটার একটা হেস্ত নেস্ত হওয়া দরকার। কেন দীপক সংকেতের কথায় ওই দুর্ঘটনাটা ঘটাল? আর কেনই বা সংকেতকে ও এত ভয় পায়? “ আরিফ বললেন “ স্যার আপনি কেন দীপককে সংকেতের সাথে জড়াচ্ছেন সেটা কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না।”
উত্তরটা দিলেন মিস্টার রাহা। বললেন “মিস্টার খান, কারণ এছাড়া ব্যাপারটা দাঁড়ায় না। এখন একটাই জিনিস জানতে হবে যে দীপকের সাথে সংকেতের যোগ সাজশ হল কি করে?” কথা মতন কাজ হল। প্রায় ভোর রাত, কিন্তু তাও একজন এসে ফোন ধরল। মিস্টার বেরা বললেন “ আমি থানা থেকে অর্জুন বেরা কথা বলছি। বিশেষ দরকার আছে ফোন কাটবেন না। এটা সরকারি ব্যাপার। “ ঘুম জড়ানো গলায় বললেন “ বলুন। আমি এখানকার কেয়ারটেকার। আমার নাম বিকাশ পাল। “ মিস্টার বেরা বললেন “ মিস্টার পাল, এরকম অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। কিন্তু আমাদের এখনই দীপক বলে ওই ছেলেটার ব্যাপারে কিছু কথা বলতে হবে। “ উনি বললেন “ ছেলেটা তো মারা গেছে। সুইসাইড…” মিস্টার বেরা বললেন “জানি। ওর সব থেকে কাছের বন্ধু কে ছিল। তাকে একটু ফোনটা দিন। “
ভদ্রলোক একটু ভেবে বললেন “স্যার দীপকের খুব কাছের লোক…দাঁড়ান আছে। ওই দীপকের সাথে কাজ করত। জানেনই তো ও পলিটিকাল …” বুঝলাম গুণ্ডা কথাটা আগবাড়িয়ে বলতে পারলেন না ভদ্রলোক। সবাই অপেক্ষা করছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে একটা ছেলে জড়ানো গলায় বলল “হ্যালো।” মিস্টার বেরা সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলেন “ তোমার নাম?” উত্তর এলো “সন্দীপন।” মিস্টার বেরা বললেন “আমি অর্জুন বেরা কথা বলছি। “ ছেলেটার যেন চমক ভেঙেছে। “ও স্যার আপনি, বলুন স্যার। “ মিস্টার বেরা বললেন “ তুমি দীপকের সবথেকে কাছের বন্ধু ছিলে?” ছেলেটা বলল “হ্যাঁ স্যার। ও সব কথা আমাকে বলত। আমি ছিলাম ওর ডান হাত।” মিস্টার বেরা বললেন “ সরাসরি একটা প্রশ্ন করছি। সংকেতের সাথে দীপকের আলাপ হয় কি ভাবে একদম ডিটেলে বলো। ওয়েট! আরেকটা প্রশ্ন আছে। দীপক সংকেতকে ভয় পেত কেন? তুমি যদি সত্যিই ওর ডান হাত হয়ে থাকো তো তোমার এই প্রশ্নের উত্তর জানা উচিৎ। আর হ্যাঁ, কিছু বলার আগে ভেবে চিনতে বলো। কারণ আমাদের যদি তোমার কোনও কথা শুনে খটকা লাগে, তাহলে তোমাকে থানায় উঠিয়ে নিয়ে এসে পিটিয়ে তোমার পেট থেকে সব কথা বার করব। এবং সেটা আমরা করব এখনই। ”
ছেলেটা একটু দম নিয়ে শুরু করল। এখন আর ওর গলায় সেই জড়ানো ভাবটা নেই। পরিষ্কার গলা। “স্যার সংকেতের ক্লাসে র্যাগিং করতে গেছিল কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজন ছিল দীপকের গার্লফ্রেন্ড। ভুল করে সংকেত ওর গায়ে পড়ে যায়। তারপর দীপকের কানে কথাটা যায়। ও চটে যায়। দীপক খুব ভালো বক্সার জানেন তো! দীপক ঠিক করল কলেজের পর সংকেতকে নিজের রুমে নিয়ে এসে আচ্ছাসে ধোলাই করবে। তারপর মুখে আলকাতরা মাখিয়ে হোস্টেল থেকে বের করে দেবে। সব তৈরি ছিল স্যার। ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই মিলে দীপকের ঘরে ওকে নিয়ে এলাম। দীপক সবাইকে বাইরে বেরিয়ে যেতে বলল। আমরা দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম দীপক ছেলেটাকে উত্তম মধ্যম দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর দীপক ছেলেটাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। আলকাতরা ইত্যাদি নিয়ে আমরা তৈরি ছিলাম। কিন্তু দীপক বলল যে ছেলেটা অনিচ্ছাকৃত ভুলটা করেছে। ও দীপকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। ওকে দীপক মাপ করে দিয়েছে। ছেলেটা শিখার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে বেরিয়ে গেল।
সেদিন রাতে মদ খেতে বসে আমি দীপককে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কেন ও সংকেতকে এত সহজে ছেড়ে দিল। ছেলেরা একটু ভয় পেলে ভোট আদায় করতে সুবিধা হয় জানেনই তো। তখন ঘরে আরও দুই তিন জন ছেলে ছিল। দীপক ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল যে ছেড়ে দিলাম কারণ এর থেকে বেশী ক্যালালে ছেলেটা প্রানে মরে যেত। তাহলে আবার অন্য আরেক কেস। এমনিতেই তো জানিস পার্টির সাথে আমার ঝামেলা চলছে। তাই ছেড়ে দিলাম। আর এই সব ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করার কোনও মানে নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর বাকি ছেলেগুলো বিদায় নিলে আবার কথায় কথায় সংকেতের প্রসঙ্গ ওঠে। দুজনেই তখন নেশায় চুড় হয়ে আছি। ওকে বললাম যাই বলো না কেন বস তোমার হাত কিন্তু হেভি ভারী। বাইরে থেকে শব্দ পাচ্ছিলাম। দীপক হঠাৎ করে ভেঙ্গে পড়ল। ও তক্ষুনি আমাকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলল। বেচারা তখন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। স্যার সত্যি বলছি দীপককে কোনও দিনও কাঁদতে দেখিনি। ও গেঞ্জি খুলে পিছন ফিরে দাঁড়াল। স্যার। বিশ্বাস করবেন না। পুরো পিঠে কালশিটে পড়ে গেছে। ও ওই অবস্থাতেই বসে পড়ে বলল যে ও খুব বাজে ভাবে ফেঁসে গেছে। সংকেত ঘরে ঢোকার পর আমরা বেরিয়ে যাই। তারপর দীপক সংকেতের মুখোমুখি হতেই সংকেত ওর মাথার দুপাশে দুই হাত দিয়ে প্রচণ্ড জোরে বাড়ি মারে। দীপক চোখে অন্ধকার দেখে। দীপকের ভাষায় যেন শক্ত লোহার রড দিয়ে ওর মাথার দুপাশে বাড়ি মারা হয়েছে। তারপর ওর মাথার চুল ধরে ওকে নিচু করে ওর পিঠে দুমাদ্দুম বসিয়ে চলে। আমরা বাইরে থেকে যে শব্দগুলো শুনছিলাম, সেইগুলো দীপকের পিঠে পড়ছিল। দীপক কয়েক সেকন্ডের মধ্যে জ্ঞান হারায়। ওকে সংকেত উঠিয়ে বাথরুমে গিয়ে চোখ মুখ পরিষ্কার করে আসতে বলে।
সংকেত নাকি ওকে বলেছিল যে ও একজন প্রফেশনল অ্যাসাসিন। ও যদি একটু এধার ওধার ঘুষিগুলো বসাত তো এক ঘুষিতেই দীপকের প্রাণ বেরিয়ে যেতে পারত। দীপক নিজে বক্সার, স্যার। ও বুঝেছিল যে সংকেত সত্যি কথাই বলেছে। আর সংকেত এও জানিয়ে দিয়েছিল যে এর পর থেকে ওর চরেরা দীপকের ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখবে। একটুও বেচাল দেখলে ওকে মেরে ফেলে দেবে। তারপর দীপককে একটা ভিডিও ক্লিপ দেখানো হয়। আমাদের মিনিস্টার রঞ্জন মুখার্জি পার্টির লোকের সাথে বসে মিটিং করছে। খুব সম্ভবত বাড়িতে। ওখানে দীপককে নিয়ে কথা হচ্ছে। খুব শিগগির দীপককে সরিয়ে অন্য লোক আনতে হবে, এই ওদের কথা বার্তার টপিক। দীপক জিজ্ঞেস করেছিল যে এই ক্লিপ সংকেতের কাছে এলো কি করে। তাতে নাকি সংকেত বলেছিল যে ও যত্র তত্র সর্বত্র বিরাজ করে। দীপককে ও বলে যে শান্তনু মুখার্জি আমেরিকা থেকে কাল দেশে ফিরছে। রঞ্জন মুখার্জির ঝাল ওর ছেলের ওপর দিয়ে মেটালে সংকেত দীপককে ২০ হাজার টাকা দেবে। ১০ হাজার আগাম। ১০ হাজার কাজ শেষের পর। দীপক প্রথমে রাজি হয়নি। সংকেত তাতে ওকে বলেছিল যে এখন ও জেনে গেছে সংকেত শান্তনু মুখার্জিকে খুন করাতে চায়। সুতরাং ওর হাতে এখন দুটোই রাস্তা। হয় সংকেতের কথা মেনে চলা। অথবা… ও তো আর সারাদিন এই ঘরের মধ্যে পড়ে থাকতে পারবে না স্যার। বাইরে বেরলেই খতম হয়ে যাবে। সংকেতের শাখা প্রশাখা কতদূর ছড়িয়ে আছে সেটা কল্পনা করাও কঠিন। ভয় পেয়ে দীপক রাজি হয়।
সংকেত নাকি ১০ হাজার টাকা দিয়ে ওকে বলেছিল যে কবে কখন কিভাবে মারতে হবে সেই উপায় সংকেতই ওকে বাতলে দেবে। আর এই বলে দীপককে শাসিয়ে দিয়ে যায় যে বাইরে কোনও কিছু লিক হলেও ওর আয়ু শেষ। আর কাজ ঠিক মতন হলে আরও টাকা পাবে। দীপক ওকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল কেন ও শান্তনু মুখার্জিকে খুন করাতে চায়। সংকেত সে কথার কোনও উত্তর দেয়নি। এর থেকে বেশী আমি আর কিছু জানি না স্যার। বিশ্বাস করুন স্যার। আর প্লীজ সংকেত যেন জানতে না পারে যে আমি আপনাদের ওর ব্যাপারে বলেছি। ছেলেটা ডেঞ্জারাস। দীপকের মতন একটা লাশকে যে এইভাবে পেটাতে পারে… “ কথাগুলো যখন হচ্ছিল তখন লাহিড়ী ফিসফিস করে জানিয়ে দিল যে দীপকের পিঠের ওই ঘায়ের দাগ ওরাও দেখেছে। রিপোর্টেও লেখা আছে। ছেলেটার কথা শেষ হওয়ার আগেই মিস্টার বেরা ফোন কেটে দিলেন। সব কথা রেকর্ড করে নেওয়া হয়েছে।

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment