শেষের পাতায় শুরু [পর্ব ৭] [২]

Written by Pinuram

প্রথমে জিনস পড়তে ইচ্ছে করেছিল ওর কিন্তু রিশু সাথে প্রথমবার কোন বড় রেস্তোরাঁতে ডিনারের জন্য বেড়িয়েছে সেই ভেবেই শাড়ি পড়েছিল। শালিনী সাহায্য না করলে শাড়ির কুঁচি আর আঁচল ঠিক ভাবে ভাঁজ করতে পারত না, এই নিয়ে শাড়ি পরার সময়ে বেশ হাসাহাসি হয় ওর আর শালিনীর। শালিনীকে দেখে মনেই হয়নি যে এরা অচেনা, অতি সহজেই মিশে গিয়েছিল ওর সাথে। ওকে জিজ্ঞেস করেছিল রিশুর কথা, নিপুন ভাবেই সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছিল ঝিনুক। নিজেদের সম্পর্কের ব্যাপারে বাইরের কারুর সামনে উজাগর করতে একদম ইচ্ছুক নয়, হয়ত হতে পারে যে এখন পর্যন্ত ওদের মাঝের বরফের দেয়াল গলেনি তবুও কোনদিন রিশু ওর সাথে খারাপ ব্যাবহার করেনি। এই শাড়িটা কে দিয়েছিল সেটা মনে নেই আর কখন নিজের সুটকেসে গুছিয়েছিল সেটাও আর ওর মনে নেই। নরম গালের ওপরে রিশুর উষ্ণ শ্বাসের ঢেউ আর কানের মধ্যে ওর সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে মাতাল হয়ে যায় ঝিনুক, খুব ইচ্ছে করে ওই বুকের ওপরে মাথা রাখতে, হয়ত গাড়িতে কেউ না থাকলে রিশুর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে নিত।
নিচু গলায় উত্তর দেয় ঝিনুক, “শালিনী একটু হেল্প করল তাই।”
রিশু জিজ্ঞেস করে, “এর আগে ত এই শাড়িটা দেখিনি?”
মৃদু স্বরে উত্তর দেয় ঝিনুক, “ছিল একটা আমিও ঠিক জানতাম না।”
ঝিনুক মনে মনে বলে, হ্যাঁ কত যেন ওর আলমারি ঘেঁটে দেখেছে রিশু, নিজেও জানত না যে এই শাড়িটা আছে, হটাত করেই সুটকেস থেকে একটা টপ বার করার সময়ে চোখে পরে এই শাড়ি। এখন কিছু কিছু জামা কাপড় ওর সুটকেসে আছে, সম্পূর্ণ ভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি নিজের গাফিলতির জন্য।
রাস্তায় গাড়ির জ্যামের ফলে হোটেল পৌঁছাতে বেশ দেরি হয়ে যায় ওদের। ওরা হোটেলে প্রবেশ করা মাত্রই ম্যানেজার, সুজিত নিজে এসে ওদের অভ্যর্থনা করে। এই হোটেলে এর আগেও বন্ধুদের সাথে ডিনারে এসেছে রিশু, তবে ঝিনুকের জন্য এইরকম হোটেলের রেস্টুরেন্টে প্রথমবার। সুজিত ওদের নিয়ে লিফটে করে ছাদে নিয়ে যায়। হোটেলের ছাদে সুইমিং পুলের পাশে ওদের জন্য আলাদা করে জায়গা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। যেহেতু ম্যানেজার শালিনীর পরিচিত তাই ওদের আপ্যায়ন অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। সুইমিং পুলের একপাশে এক জায়গায় কাঠ জ্বালিয়ে একটা ছোট বনফায়ার তৈরি করা আর তার দুইপাশে বেশ বড় দুটো সোফা পাতা। সোফার পাশে দুই দিকে ছোট ছোট সাউন্ড বক্সে বেশ মৃদু সঙ্গীত বেজে চলেছে। মাথার ওপরে খোলা আকাশ, বেশ উঁচু বিল্ডিং হওয়ার ফলে দিল্লীর অনেক দুর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে ছাদ থেকে। একটু কুয়াসা আর গাড়ির ধোঁয়ায় এক আবছা আবরণ চারপাশে ছড়িয়ে, একটু দূরে রাস্তার ওপরে সারি সারি গাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। ঝিনুক এই সব দেখে অবাক হয়ে রিশুর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে, ওর কাছে এইসব একদম নতুন।
সুজিত একটা বেশ বড় ফুলের তোড়া নিয়ে এসে রিশু আর ঝিনুকের হাতে তুলে দিয়ে হাত মিলিয়ে বলে, “আপনাদের মতন এতবড় বড় ডাক্তারদের আথিতিয়তা করা সৌভাগ্যের ব্যাপার।”
ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে ঝিনুক বেশ বিব্রতবোধ করে। ঝিনুকের বিব্রতবোধ কাটিয়ে রিশু সুজিতের সাথে আময়িক হেসে হাত মিলিয়ে বলে, “উই ডু জাস্ট আওয়ার ডিউটি, (আমরা শুধু মাত্র নিজেদের কর্তব্য করি।)” ইন্দ্রজিতের দিকে দেখে রিশু বলে, “সো দিস অয়াজ ইউর আইডিয়া?”
ইন্দ্রজিত মাথা নাড়ায়, “না রে আমার নয়, শালিনীর আইডিয়া।”
শালিনী ঝিনুককে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে, “হাউ ইজ দ্যা সারপ্রাইজ?”
ঝিনুক কি বলবে ভেবে পায়না, একবার রিশুর দিকে দেখে উত্তর দেয়, “সত্যি অবাক করে দিয়েছ।”
শালিনী ঝিনুককে বলে, “আমার বাড়িতে আমরা দুই বোন, ভাই বলে কেউ নেই, এই ডাক্তারি পড়তে এসে ভাইয়া কে পেয়েছি।” রিশুর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ঝিনুককে বলে, “ওর ওপরে অনেক অত্যাচার করেছি।”
রিশু ওর কথা শুনে হেসে ফেলে, “এই সময়ে আবার শুরু হয়ে যেয় না যেন।”
চন্দ্রিকার ঘটনার আসল ব্যাখ্যা ঝিনুকের জানা নেই, তাই একবার রিশুর দিকে তাকিয়ে দেখে আর একবার শালিনীর দিকে তাকিয়ে দেখে।
ইন্দ্রজিত ওর অবাক মুখবয়াব দেখে হেসে ফেলে, “তুমি ওদের কথা ছাড়ো বস বস।”
একটা সোফায় পাশাপাশি রিশু আর ঝিনুক আগুনের অন্যপাশের সোফায় ইন্দ্রজিত আর শালিনী বসে পরে। খালি ছাদ পাশেই সুইমিং পুল, চারপাশ থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আসছে সেই সাথে সামনে গনগনে কাঠের আগুনের তাপ এক ভিন্ন ধরনের উত্তাপ জাগিয়ে তোলে রিশু আর ঝিনুকের মাঝে। পাশে রাখা সাউন্ড বক্সে নতুন হিন্দি সিনেমার গান একটানা বেজে চলেছে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে পরনের জ্যাকেট একটু বেশি করে গায়ে জড়িয়ে নেয় ঝিনুক। ঝিনুক অবাক চোখে চারপাশে তাকিয়ে দেখে, মাথার ওপরে খোলা আকাশ, সুইমিং পুলের অন্যপাশে কাঁচের দেয়ালের পেছনে রেস্টুরেন্ট, বছরের শেষের দিকের দিনে রেস্টুরেন্টে বেশ ভিড় সেই তুলনায় ওদের এই আয়োজন বেশ রোমান্টিক। শালিনী আর ইন্দ্রজিত না থাকলে হয়ত রিশুর বাজু জড়িয়ে শরীরের উত্তাপ গায়ে মাখিয়ে বসে থাকত।
রিশু একটু ঘন হয়ে বসে ঝিনুকের পাশে বসে জিজ্ঞেস করে, “ঠান্ডা লাগছে নাকি?”
মিষ্টি হেসে মাথা দোলায় রমণী, “না না ঠিক আছে, আগুনের তাপে বেশ ভালোই লাগছে।”
সুজিত কিছুক্ষন পরে হাতে একটা বোতল নিয়ে এসে ঝিনুককে দেখিয়ে বলে, “এটা আমার তরফ থেকে আপনার জন্য, স্যাটু দু বোরদে সেভেন্টি থ্রি।”
কলেজে থাকতে ঝিনুক মদ খেয়েছে ঠিক তবে ওর দৌড় ওই কয়েক পেগ হুইস্কি অথবা ভদকা। সুজিতের কথা বুঝতে না পেরে অবাক চোখে রিশুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “এটা কি?”
রিশু ওকে বুঝিয়ে বলে, “এটা ড্রাই ফ্রেঞ্চ ওয়াইন।” তারপরে সুজিতের দিকে তাকিয়ে ভদ্রতার খাতিরে বলে, “এতসব কেন করতে গেলেন?”
সুজিত আময়িক হেসে শালিনীর দিকে দেখে রিশুর প্রশ্নের উত্তরে বলে, “শালিনী ম্যাডাম আমাদের জন্য যা করেছেন তার জন্য সব কিছু দিতে পারি। ম্যাডাম না থাকলে আমার স্ত্রী আর মেয়ে কেউই হয়ত বাঁচত না। আমরা এক সময়ে সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম…” কথাটা বলতে বলতে গলা ধরে আসে সুজিতের।
শালিনী সোফা ছেড়ে উঠে সুজিতের হাত ধরে বলে, “এমন করে কেন বলছেন, ওটা আমাদের কর্তব্য আমাদের কাজ।”
সুজিত ধরা গলায় বলে, “ম্যাডাম আপনি ভগবান।”
সুজিত দুইজন ওয়েটারকে ডেকে বলে, “দিজ আর মাই গেস্ট, এদের আপ্যায়নে যেন কোন ত্রুটি না হয়। যাও লবস্টার নিয়ে এস।”
এবারে শালিনীর অবাক হওয়ার পালা, “এরপরে লবস্টার?”
সুজিত আময়িক হেসে বলে, “হ্যাঁ, গত কাল চারটে ক্রাব এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে, খেলে বলবেন।”
ইন্দ্রজিত বলে ওঠে, “হ্যাঁ হ্যাঁ একটা ক্রাব, সিঙ্গেল মল্টের সাথে দারুন জমবে।”
রিশু চোখ পাকিয়ে ইন্দ্রজিতের দিকে দেখে বলে, “তুই কি হার্ড ড্রিঙ্কস নিবি?”
ইন্দ্রজিত হেসে বলে, “কত ইচ্ছে ছিল তোর বিয়েতে পুরো আউট হয়ে নাচব, সেটা আজকে হয়ে যাক। লবস্টার ক্রাব হোয়াইট ড্রাই ওয়াইন আর স্কচ, আজকের রাত মনে হচ্ছে এই হোটেলেই রুম বুক করতে হবে।”
সুজিত বাবু হেসে ফেলেন, “এট ইওউর সার্ভিস।”
শালিনী ইন্দ্রজিতকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “এই ডিনার কিন্তু ঝিনুকের জন্য, ওকেই চয়েস করতে দাও।”
ঝিনুক হাঁ করে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে, সি ফুড অর্থাৎ সামুদ্রিক মাছ বলতে কোলকাতার মাছের বাজারে যা পাওয়া সচারাচর পাওয়া যায় তার বেশি কিছুই খায়নি। এই লবস্টার আর অস্ট্রেলিয়ান ক্রাব কোনদিন চোখেও দেখেনি। একটু বিব্রতবোধ নিয়েই রিশুকে প্রশ্ন করে, “এ গুলো কেমন খেতে?”
রিশু ওর মনের ভাব বুঝে ওকে জিজ্ঞেস করে, “লবস্টার অনেকটা চিংড়ি মাছের মতন খেতে, আর ক্রাব ও ভালোই খেতে। তোমার এলারজি নেই ত?”
গলদা চিংড়ি অনেক খেয়েছে, তাই উৎফুল্ল হয়ে বলে, “না না এলারজি নেই, নতুন ডিস ট্রাই করতে পারি।”
একজন ওয়েটার ওদের জন্য দুটো প্লেটে দুটো বড় লবস্টার সাজিয়ে নিয়ে ওদের সামনে রেখে দেয়। অন্য ওয়েটার চারটে গ্লাসে ওদের জন্য ওয়াইন ঢেলে দেয়। মদের প্রতি রিশুর কোনদিন আসক্তি ছিল না, বন্ধুদের চাপে না পরলে কোনদিন মদের গ্লাস মুখে তোলে না। ওয়াইনের গেলাস তুলে সবাই চিয়ার্স করে ওয়াইন গ্লাসে হাতেই ধরে থাকে ঝিনুক। এত দামী মদ কোনদিন খায়নি, তার ওপরে রিশুর পাশে বসে মদের গ্লাস হাতে মদ খাবে ভেবেই বেশ বিব্রতবোধ করে ঝিনুক। ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে ওর মনের দ্বিধা বুঝতে পারে রিশু, মনে মনে হেসে ফেলে, লাজ দেখ মেয়ের, যেন কোনদিন ভাজা মাছ উলটে খায়নি এমন ভাব দেখাচ্ছে। গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিয়ে ইশারা করে ঝিনুকের দিকে, চুমুক দিতে পারো অসুবিধে নেই। স্বামীর সম্মতি পেয়ে ছোট গ্লাসে চুমুক দেয়। খাওয়া দাওয়া শুরু হয় তার সাথে ওদের গল্প শুরু হয়। ইন্দ্রজিত, শালিনী আর রিশু নিজেদের কলেজের গল্প হসপিটালের গল্প শুরু করে দেয়, ঝিনুকের এর মধ্যে বিশেষ কিছুই গল্প করার থাকে না। ঝিনুক চুপচাপ মাঝে মাঝে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে লবস্টার খায় আর ওদের দেখে ভদ্রতার খাতিরে একটু মৃদু হাসি দেয়। কথায় গল্পে ইন্দ্রজিত আর শালিনীর গ্লাস শেষ হয়ে যায়, রিশুর ওয়াইনের গ্লাস তখন অর্ধেকও পৌঁছায়নি। ঝিনুকের গ্লাসও শেষ দেখে ইন্দ্রজিত ওর গ্লাসে ওয়াইন ঢেলে দেয়। ঝিনুক প্রথমে একটু বারণ করলেও রিশু মাথা দুলিয়ে ইশারায় সম্মতি দেয়, অসুবিধে নেই খেতে দোষ নেই। ওয়াইনের দ্বিতীয় গ্লাস শেষের পরে, ক্রাবের অর্ডার করে ইন্দ্রজিত সেই সাথে গ্লেনলিভেট স্কচ।
রিশুর ওয়াইনের গ্লাস প্রায় শেষের দিকে, দেখে ইন্দ্রজিত ওকে মজার ছলেই জিজ্ঞেস করে, “কি রে আজকে শেষ পর্যন্ত মেরেই দে।”
মাথা দোলায় রিশু, “না রে ওটা আমার সহ্য হয় না জানিস।”
শালিনী ওকে বাঁচিয়ে দিয়ে বলে, “তুমি জানো ভাইয়া খায় না তাও কেন জোর করছ?” তারপরে ঝিনুকের দিকে মুচকি হেসে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তোমার হুইস্কি চলে নাকি?”
নিচের ঠোঁট দাঁতে কামড়ে লজ্জার মাথা খেয়ে মাথা দোলায় ঝিনুক, “মাঝে মাঝে চলে।”
সেই কথা শুনে হাসিতে ফেটে পরে ইন্দ্রজিত, রিশুর দিকে আঙ্গুল তুলে বলে, “আব তেরা কেয়া হোগা কালিয়া।”
রিশু ঘাড় ঘুরিয়ে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, “ইউ ক্যান এঞ্জয়, (তুমি আনন্দ করতে পারো) আমার আপত্তি নেই।”
ওয়েটার ওদের গ্লাসে একটা লারজ পেগ বানিয়ে চলে যায়। কাঁকড়ার টুকরোর সাথে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দেয় ইন্দ্রজিত, এক চুমুক দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝিনুক আর শালিনীকেও ইশারায় জানিয়ে দেয় গ্লাসে চুমুক দিতে। গ্লাস হাতে ঝিনুক ভীষণ ভাবেই অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পরে যায়, ও ভেবেছিল যে হয়ত রিশু ওর সাথে সঙ্গ দেবে কিন্তু রিশুর হাতে ওয়াইনের গ্লাসের বদলে একটা মকটেলের গ্লাস দেখে ভীষণ বিব্রতবোধ করে। রিশু চোখের কোনা থেকে ঝিনুককে দেখে আর মনে মনে হাসে, দুই গ্লাস ওয়াইনের পরেও এই মেয়ে হুইস্কি খেতে চাইছে, কোলকাতায় থাকাকালীন তাহলে কি না বাউন্ডুলেপনা করেছে তার ইয়াত্তা নেই। হোক মাতাল, সেটাই চায় রিশু, হয়ত মাতাল হলে ওদের মাঝের আগল ভেঙ্গে যাবে, যে দুর্ভেদ্য দেয়ালের দুইপাশে দুইজনে দাঁড়িয়ে হয়ত সেই দেয়াল আর থাকবে না। এক পা এক পা করে এগোতে গেলে অনেক দেরি, একটা ছোট দেশলাই কাঠির ঝলকানির খুব দরকার ওদের মাঝের এই আগুন জ্বালানোর জন্য। ওদের বসার জায়গার মাঝ খানে যে আগুন জ্বালানো হয়েছিল একজন লোক এসে সেই আগুনে আরো কয়েকটা কাঠের গুড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে চলে যায়।
ঝিনুকের দ্বিধাবোধ কাটিয়ে সহজ হওয়ার জন্য ওকে বলে, “আরে ওটা কি শুধু দেখবে নাকি?”
গলা শুকিয়ে আসে ঝিনুকের, “না মানে, তুমি নেবে না?”
মাথা নাড়ায় রিশু, “না, আমার এইসবের গন্ধ একদম সহ্য হয় না।”
ঝিনুক মুখ গোমড়া করে হুইস্কির গ্লাস টেবিলে রেখে দিয়ে বলে, “তাহলে আমিও খাবো না।”
ইসস, তোমার এই অনুরাগের ছোঁয়ায় মরতে রাজি আমি। মনের মধ্যে গানের কলি জেগে উঠেছিল, হয়ত পরিস্থিতি অন্য হলে সেই গান গেয়ে ফেলত রিশু। রাগ যে তোমার মিষ্টি অনুরাগের চেয়ে সাধ করে যে তোমায় রাগাই ওগো সোনার মেয়ে।
ঝিনুকের কাঁধে কাঁধ দিয়ে আলতো ধাক্কা মেরে মজার ছলে বলে, “তোমার খাওয়াতেই আমার খাওয়া হয়ে যাবে।”
নিচের ঠোঁট কামড়ে লাজুক হেসে চোখ রাঙ্গিয়ে প্রশ্ন করে, “আচ্ছা তাই নাকি? সেটা কেমন করে হবে?”
রিশু ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলে, “সেদিন ফুচকা খেলে যেমন ভাবে ঠিক তেমন ভাবেই।” রিশুর ঠোঁটে যেন সেদিনের ঝিনুকের চাঁপার কলি আঙ্গুলের পরশ এখন লেগে রয়েছে এমন ভাব দেখিয়ে ঠোঁটের ওপরে আঙ্গুল বুলিয়ে নেয়।
ওই ভাবে ঠোঁটে আঙ্গুল বুলাতে দেখে সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে ঝিনুকের, ইসস কি শয়তান দেখ, “সেদিন আর একটু হলে ত আমার আঙ্গুল খেয়ে ফেলতে।”
খেতে আর দিল কোথায়, চারপাশে যা লোকজনের ভিড় ছিল সেদিন না হলে শুধু আঙ্গুল নয়, ওই মিষ্টি মেয়েটাকে আদর করে পাগল করে খেয়ে ফেলত রিশু, “কামরাতে আর দিলে কোথায় বল।” মুচকি হেসে ঝিনুককে বলে।
শালিনী হাসিতে ফেটে পরে ওদের প্রেমালাপ দেখে, গান গেয়ে ওঠে ওদের দিকে তাকিয়ে, “রাত বাকি বাত বাকি, হোনা হ্যায় জো হো জানে দো… ”
হুইস্কির গ্লাস দুই ঢোকে শেষ করে ইন্দ্রজিত হো হো করে হেসে বলে, “তোদের দেখে আবার প্রেম…”
শালিনী সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রজিতের পিঠের ওপরে একটা চড় মেরে বলে, “আই উইল কিল ইউ নাই (তাহলে আমি মেরে ফেলব।)”
গ্লাস শেষ হতে না হতেই আরো এক লারজ পেগ সোজা গলায় ঢেলে ইন্দ্রজিত শালিনীকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ডারলিং প্রেম আবার তোমার সাথেই করব।”
গ্লাস শেষ করে উঠে দাঁড়ায় শালিনী, ঝিনুকের হাত ধরে বলে, “ওয়ানা ডান্স? লেটস হিট দ্যা ফ্লোর। (নাচতে চাও? চল নাচি)।”
ইন্দ্রজিত ওয়েটারকে ডেকে পার্টির উপযুক্ত হিন্দি গান চালাতে অনুরোধ করে। গ্লাসের বাকি হুইস্কি গলায় ঢেলে শালিনীর সাথে সোফা ছেড়ে উঠে পরে ঝিনুক। জ্যাকেট খুলে আঁচল খানি কোমরে গুঁজে ফেলার ফলে ফর্সা নরম তুলতলে পেটের খানিক অংশ বেড়িয়ে পরে। আঁচল খানি সামনের দিকে উঁচিয়ে থাকা আঁটো ব্লাউজে ঢাকা দুই উন্নত স্তনের মাঝে নিয়ে কোমরে পেচিয়ে গুঁজে নেয়। শাড়ির কুঁচি নাভির বেশ নিচে বাধার ফলে সুগভীর নাভি খানি অনায়াসে দেখা যায়। সারা অঙ্গে ছন্দ তুলে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে পরে সুন্দরী ঝিনুক। চোখে তারায় হাজার বাতির ঝলকানি হেনে তাকায় রিশুর দিকে। রিশু জুলুজুলু চোখে মত্ত হরিণীর হাঁটার ছন্দের দিকে নিস্পলক চোখ তাকিয়ে থাকে। গানের তালে ওর পা নাচতে শুরু করেছিল কিন্তু কোনদিন নাচেনি তাই আর সোফা ছেড়ে ওঠেনা। দুই গ্লাস ওয়াইনের পরে এক গ্লাস হুইস্কির লারজ পেগ ঝিনুকের শিরা উপশিরায় নেশার মাতন জাগিয়ে তুলেছে। শালিনীও গায়ের জ্যাকেট খুলে ফেলে গানের তালে তালে নাচতে শুরু করে দেয়। সেই সাথে ধিরে ধিরে তাল মেলায় ঝিনুক। ওর দুই হাত মাথার ওপরে উঠে যায়, সারা শরীর সাপের মতন এঁকে বেঁকে মত্ত ছন্দে নাচতে শুরু করে ঝিনুক।
ইন্দ্রজিত গ্লাস হাতে সোফা ছেড়ে উঠে রিশুর পেছনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “ইউ আর আ ড্যাম লাকি গাই, (তুই অনেক ভাগ্যবান)। কি ভেবে এখন পিছিয়ে আছিস জানি না, তবে একে হারাস না।”
শালিনী আর ঝিনুক গানের তালে নাচে মেতে উঠেছে। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঝিনুক আর শালিনীর দিকে দেখে। উচ্চ গানের তালে দুই নারী সব কিছু ভুলে নেচে চলেছে। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে মৃদু হেসে ইন্দ্রজিতের কথার উত্তরে বলে, “কেউ কি আর ইচ্ছে করে কিছু হারাতে চায় রে?”

সুজিতবাবু ডিনারের আয়োজন বেশ ভালো করেছিল, শুয়োয়ের মাংস দিয়ে তৈরি বোলোগ্নেজ লাজানিয়া আর রাশিয়ান স্যালাড, শেষ পাতে টিরামসু আর পর্তুগিজ টারটস। এই ধরনের খাবার ঝিনুকের জন্য একেবারে নতুন। বাইরের দেশের খাদ্যের প্রতি ইন্দ্রজিতের একটু দুর্বলতা আছে তাই রিশু ওর সাথে থেকে থেকে বিভিন্ন খাবার খেয়ে অভ্যস্থ হয়ে গেছে। লাজানিয়া খাওয়ার সময়ে মাংসের স্বাদ পেয়েছিল শালিনী আর ঝিনুক, কিন্তু ইচ্ছে করেই সেই প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে ইন্দ্রজিত। শুয়োরের মাংস খাইয়েছে শুনলে হয়ত ওদের মেরে ফেলত দুই রমণী।
ডিনার শেষে বাড়ি ফেরার পালা। হোটেলের ম্যানেজার সুজিত বাবু কিছুতেই টাকা নেবেন না, অনেক জোরাজুরির পরে শুধু মাত্র কাঁকড়ার দাম নেন তিনি। শালিনী আর ইন্দ্রজিত একটা ট্যাক্সি করে চলে যায়। ঝিনুককে সঙ্গে নিয়ে একটা ক্যাবে করে রিশু বাড়ির পথ ধরে। রাত অনেক, পরের দিন সকালে রিশুর ওপিডি, অন্ধকার ট্যাক্সির পেছনের সিটে রিশু আর ঝিনুক। প্রথম বার যখন দিল্লীতে এসেছিল সেদিন ও এমন এক গভীর রাতে ট্যাক্সির পেছনের সিটে রিশু আর ঝিনুক বসেছিল, সেদিন দুইজনের মধ্যে শত যোজনের ব্যাবধান ছিল। এবারে ট্যাক্সিতে ওঠা মাত্রই ওর গা ঘেঁষে বসে ঝিনুক, রিশুও ইচ্ছে করেই সিটের মাঝখানে ঝিনুকের পাশে চলে যায়। পায়ের সাথে পা ছুঁয়ে যায়, ঊরুর সাথে ঊরু, কাঁধের সাথে কাঁধ মিলিয়ে নব বিবাহিত দম্পতী বসে। রিশু ইচ্ছে করেই বাঁ হাত সিটের পেছনে উঠিয়ে দেয়, হাতের তালু আলতো করে স্পর্শ করে থাকে ঝিনুকের বাঁ কাঁধের ওপরে, খুব ইচ্ছে করছিল ওই থাবা কাঁধে চেপে ধরে কাছে টেনে নিতে।
দুই গ্লাস ওয়াইন, দুটো লারজ পেগ হুইস্কি পেটে যাওয়ার পরে ঝিনুকের ধমনীতে মাতন লেগেছে। কোলকাতায় ওদের পার্টিতে যে মদ খেত সেইসবের চেয়ে এই মদের স্বাদ আর নেশা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওদের পার্টির খাদ্যের বহর এর মতন নয়, ওদের খাবার হত চানাচুর পকোড়া আর বেশি হলে চিলি চিকেন অথবা চিকেন তন্দুরি। দামী স্কচ অথবা বিদেশী ওয়াইন কোনদিন খায়নি, লবস্টার ক্রাব লাজানিয়া এইসব আশাতীত। মদের নেশায় ধিরে ধিরে ওর চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। অন্ধকার ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে শরীর ছেড়ে দেয়, এলিয়ে পরে রিশুর কাঁধের ওপরে।
তন্বী তরুণী স্ত্রীর নধর দেহের চাপ নিজের বুকের ওপরে অনুভব করে হৃদয় তোলপাড় করে ওঠে রিশুর। কাঁধের ওপরে হাত দিয়ে বুকের কাছে চেপে ধরে ঝিনুককে, ভীষণ নরম আর উষ্ণ ওর প্রেয়সী। ওর মুখের নিচেই ঝিনুকের মাথা, ভীষণ ইচ্ছে করে ওই কালো ঘন চুলের মধ্যে নাক ডুবিয়ে ভেসে যেতে। ঝিনুকের শ্বাসে যদিও মদের গন্ধ কিন্তু ওর গায়ের মিষ্টি গন্ধের সাথে সেই মদের গন্ধ মিশে ওর নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে মাতাল করে তোলে। একবার ভেবেছিল বলে, অত ড্রিঙ্ক করোনা না বাড়ি ফিরতে হবে, কিন্তু হৃদয়ের কাছে হার মেনে যায় রিশুর মস্তিস্ক, হৃদয় ওকে বাধা দিয়ে বলে, আজকে ওকে ড্রিঙ্ক করতে দাও হয়ত নেশার ফলে ওর বুকের মধ্যে জমানো ব্যাথা বেড়িয়ে আসবে।
সেই সুমিষ্ট তীব্র মাদক ঘ্রাণের টানে ঝিনুকের দিকে ঝুঁকে নিচু গলায় ডাক দেয়, “এই…”
অর্ধনিমীলিত চোখ তুলে রিশুর দিকে তাকিয়ে নেশা ধরানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, “কিইই…”
রিশুর চোখ জোড়া আটকে যায় ঝিনুকের অর্ধনিমীলিত চোখের পাতার ওপরে, নিচু গলায় ওকে বলে, “তুমি দারুন নাচতে পারো।”
কথাটা কানে যেতেই চোখ তুলে রিশুর দিকে তাকায় ঝিনুক, মদের নেশার চেয়ে বেশি রিশুর গুরু গম্ভির আওয়াজে নেশায় ওর চোখ জোড়া অর্ধ নিমীলিত হয়ে বুকের ওপরে নেমে আসে, “ধ্যাত…” কোলের ওপরে দুই হাত জড় করে আরো বেশি করে চেপে বসে রিশুর পাশে। একটু থেমে ওকে বলে, “এই শোন নাআ”
মত্ত চঞ্চলা হরিণীর কন্ঠস্বর ওর হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে তোলে, “কি হয়েছে?”
আদুরে কন্ঠে আবদার করে বলে, “আগামী কাল ছুটি নিয়ে নাও না প্লিজ।”
তন্বী তরুণী প্রেয়সীর আবদার শুনে হেসে ফেলে রিশু, “পাগল, এমনিতে হসপিটালে ডাক্তার কম তার ওপরে আগামী কাল আমার ওপিডি।” একটু থেমে জিজ্ঞেস করে, “আগামী কাল কি আছে?”
পরের দিন রিতিকার সাথে শপিং করতে যাওয়ার কথা আছে, ভীষণ ইচ্ছে করছিল রিশুর সঙ্গে শপিং করতে যাওয়ার, কিন্তু ছুটি নিতে পারবে না শুনে একটু আহত হয় ঝিনুক। রিশুর বুকের ওপর থেকে একটু সরে এসে মুখ গোমড়া করে বলে, “এই একটু শপিং করতে যেতাম।” একটু ইতস্তত করে বলে, “আমার এক বান্ধবী থাকে দিল্লীতে।” এতদিনে ঝিনুকের ব্যাপারে কিছুই জানা হয়নি তাই ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে রিশু। ঝিনুক ওকে বলে, “এমবিএর এক বান্ধবী রিতিকা দিল্লীতেই একটা কোন কোম্পানিতে চাকরি করে, তার সাথে ভেবেছিলাম শপিং করতে যাবো।”
হেসে ফেলে রিশু, “আবার শপিং?”
ঝিনুক মুখ গোমড়া করে বলে, “বাঃ রে একা একা বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগে নাকি?”
রিশু হেসে বলে, “আচ্ছা যেও।” একটু থেমে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, কি করতে চাও তাহলে?”
ঝিনুকের ঝিমুনি ভাবটা থেকে থেকে বেড়ে উঠছে, গাড়ির ঝাঁকুনিতে মাঝে মাঝেই রিশুর বুকের ওপরে মৃদু আছড়ে পড়ছে ঝিনুকের নধর দেহ পল্লব। রিশুর শেষের কথাটা ঠিক ভাবে ওর কানে পৌঁছায়না তাই নাক কুঁচকে আদুরে কন্ঠে ওকে বলে, “বাড়ি বসে বসে বোর হয়ে যাই, জানো।”
ওই ভাবে নাক কুঁচকে আদুরে কন্ঠ শোনার পরে কার মাথা ঠিক থাকে, রিশু ঝিনুকের মুখের ওপরে একটু ঝুঁকে পরে জিজ্ঞেস করে, “চাকরি করতে চাও?”
মাথা দোলায় ঝিনুক, চাকরি নয় তবে এই বদ্ধ জীবন থেকে ভীষণ ভাবেই মুক্তি পেতে চায়, “হুম…” ওর চোখের পাতা ধিরে ধিরে ভারী হতে শুরু করে দিয়েছে, সেই সাথে একটু ঝিমুনি ভাব ধরেছে মাথায়। হটাত করে রিশুর বুকের ওপরে আলতো করে কুনুইয়ের ধাক্কা মেরে বলে, “তুমি এত কম কথা বল কেন?”
প্রেয়সীর নেশা ধরা গলা শুনে হেসে ফেলে রিশু, “কই কম কথা বলি? আজকে তো তুমি গল্প করনি, তুমি তো একদম চুপ ছিলে।”
রিশুর বাহুপাস থেকে নিজেকে মুক্ত করে ওর দিকে তর্জনী নাড়িয়ে বলে, “মিথ্যে বলবে না একদম, তুমি আমার সাথে একদম গল্প কর না।” কাঁদো কাঁদো চেহারা করে বলে, “তুমি আমাকে একদম বুঝতে চাও না।”
চাঁপার কলির মতন কোমল তর্জনীর আস্ফালন দেখে হেসে ফেলে রিশু, প্রেয়সীর অনুযোগ একদম মিথ্যে নয়। আর চোখে একবার সামনে বসা ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে দেখে। নেশায় মত্ত ঝিনুকের হাবভাব দেখে একটু বিব্রতবোধ করে রিশু, এখুনি শান্ত না করতে পারলে ট্যাক্সির মধ্যেই না কেঁদে ফেলে, “বাড়ি গিয়ে তোমার সব কথা শুনবো।”
কাঁচুমাচু মুখ করে তর্জনী হেলিয়ে বলে ওর প্রেয়সী, “সত্যি বলছ ত?”
মাথা দোলায় রিশু, “হ্যাঁ রে বাবা বলছি ত শুনবো।”
সুরার নেশায় ঝিনুক ভুলে যায় সামনে বসা রিশুর চরিত্র বেশ গম্ভির প্রকৃতির, ভুলে যায় রিশু ওর স্বামী। ওর হৃদয় ওকে বলে সামনে বসা মানুষ ওর অনেক কাছের লোক যার ক্রোড়ে ঝিনুক চোখ বন্ধ করে মাথা রেখে ঘুমাতে পারে। রিশুর আশ্বাস শুনে মিষ্টি হেসে বলে, “আজ রাতে তুমি ঘুমাবে না, আজ রাতে আমরা কেউই ঘুমাবো না।”
ফাঁদে পরে গেছে রিশু, কিন্তু প্রেয়সীকে শান্ত করা খুব দরকার, “আচ্ছা ঘুমাবো না।”
রিশুর গায়ের ওপরে ঢলে বাজু দিয়ে রিশুর বুকের ওপরে আলতো ধাক্কা মেরে বলে, “আমার না গান গাইতে ইচ্ছে করছে। এই রাত তোমার আমার…”
এই সেরেছে রে, ট্যাক্সির মধ্যে এইভাবে গান শুরু করলে মহামুশকিল। রিশু সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় নেশামত্ত ঝিনুক কে চুপ করতে অনুরোধ করে। রিশুর পেশার জন্য ওর ফ্লাটের সবাই রিশুকে বেশ সন্মানের চোখে দেখে, ওর স্ত্রী মদের নেশায় চুড় হয়ে ফ্লাটে ঢোকার সময়ে কেউ যদি দেখে ফেলে বিশেষ করে প্রমথেশ বাবু তাহলে পাড়ায় ঢিঢি পরে যাবে। তবে দুষ্টু মিষ্টি প্রেয়সীর মাতলামি দেখে দুর্নামের ভয় কাটিয়ে ফেলে রিশু।
আবার ঝিনুকের কাঁধের ওপরে হাত রেখে কাছে টেনে শান্ত করে বলে, “বাড়ি চল তারপরে তোমার গান শুনবো।”
এপাশ ওপাশ তাকিয়ে ট্যাক্সির জানালার বাইরে দেখে রিশুকে জিজ্ঞেস করে, “আর কতক্ষন লাগবে বাড়ি পৌঁছাতে?”
এতক্ষন জানালার বাইরে তাকানোর ইচ্ছে ছিল না রিশু, মত্ত সুন্দরী প্রেয়সীর রুপের সাগরে এমন ভাবেই নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল যে সময়ের আর পথের খেয়াল একদম মন থেকে মুছে গিয়েছিল। জানালার বাইরে একবার তাকিয়ে দেখে উত্তর দেয়, “এই ব্যাস পাঁচ মিনিটে আমরা পৌঁছে যাবো।”
নরম হাত দুটো দয়িতের কোলের ওপরে রেখে, রিশুর বুকের কাছে ঘন হয়ে এসে কুহু রবে বলে, “তুমি ঘুমাবে না, প্রমিজ?”
বাধ্য ছেলের মতন মাথা দোলায় রিশু, “একদম ঘুমাবো না, কিন্তু এখন চুপ।”
কোলের ওপরে চাঁপার কলি আঙ্গুলের পরশে রিশুর তলপেটের পেশি শক্ত হয়ে আসে, তড়িৎ গতিতে ওর মাথার মধ্যে রক্ত এলোপাথাড়ি দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয়। ওর মাথা আপনা হতেই নেমে আসে ঝিনুকের মুখমন্ডলের ওপরে, লাল রঙের ঠোঁট জোড়ার তীব্র আহবান উপেক্ষা করার মতন শক্তি হারাতে থাকে রিশু। ভীষণ ইচ্ছে কমলালেবুর কোয়ার মতন অধর ওষ্ঠ নিজের ঠোঁটে চেপে ধরে ঝিনুকের বুলি থামিয়ে দেয়। বাড়ি না আসা পর্যন্ত চুপচাপ রিশুর কাঁধে মাথা রেখে বুকের কাছে জড়সড় হয়ে পড়েছিল ঝিনুক। রিশুর মনে হয় যেন কোন অচিনপুরীর রাজকন্যের সাথে নৈশ ভ্রমনে দুর দিগন্তে পাড়ি লাগিয়েছে। বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত ঝিনুক কোন কথা বলেনি, রিশুর বাহুডোরে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত চিত্তে চুপ করে বসেছিল। ট্যাক্সি থেকে নামার আগে ঘড়ি দেখে রিশু, রাত বারোটা বেজে গেছে। সেই বিকেলে হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে একবার মায়ের সাথে কথা হয়েছিল, তারপরে বাইরে বেড়িয়ে যাওয়াতে আর ফোন করতে পারেনি। ভেবেছিল ট্যাক্সিতে উঠে মাকে একটা ফোন করবে, কিন্তু ঝিনুকের অনর্গল বকবকানির জন্য আর ফোন করা হয়ে ওঠেনি। সকালেই ফোন করতে হবে, বোন ছাড়া এতক্ষনে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বাড়ির সামনে ট্যাক্সি দাঁড়াতেই নড়ে চড়ে বসে ঝিনুক। উষ্ণ বাহুডোরে ওর চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছিল, আর কিছুক্ষন হলে রিশুর বুকের ওপরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ত। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দেয় ঝিনুকের দিকে। বড় বড় কাজল কালো চোখ তুলে রিশুর দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। নরম হাতখানি হাতের মধ্যে নিয়ে চাপ দেয় রিশু। ঝিনুকের ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি খেলে যায়।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময়ে, চোখের সামনে ভারী নিতম্বের দুলুনি দেখে আর উঁচু হিল পরিহিত ফর্সা পায়ের গোড়ালিতে বাঁধা পাতলা নুপুরের নিক্কনের আওয়াজে রিশুর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। জ্যাকেট পরা থাকলেও পাতলা শাড়িটা যেমন ভাবে ইতরের মতন ঝিনুকের পেলব দেহ পল্লবের সাথে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে তাতে নধর দেহকান্ডের আঁকিবুঁকি অনায়াসে পরিস্ফুটিত হয়ে পরে রিশুর চোখের সামনে। মত্ত হস্তিনীর মতন পা ফেলে একের পর এক সিঁড়ি ভেঙ্গে ওঠার সময়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তির্যক দৃষ্টি হেনে ওর দিকে তাকিয়ে দেখে ঝিনুক। রিশু চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করে, কি হল? নিচের ঠোঁট দাঁতে কামড়ে দুষ্টুমি মাখানো হাসি দিয়ে ইশারায় বলে, ওই ভাবে তাকাতে নেই।
দরজার চাবি খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে রিশু ঝিনুককে জিজ্ঞেস করে, “ফিলিং টায়ার্ড? (ক্লান্ত লাগছে?)”
মত্ত রমণী চোখের তারায় তির্যক বান হেনে ওর সামনে তর্জনী হেলিয়ে আদেশ করে বলে, “ইউ প্রমিজড মি যে তুমি ঘুমাবে না।”
ঝিনুকের শিশু সুলভ আচরন দেখে হেসে ফেলে রিশু, “আচ্ছা বাবা ঘুমাবো না। যাও আগে ফ্রেস হয়ে নাও।”
সারা শরীর জুড়ে মত্ত ছন্দ তুলে নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকে পরে ঝিনুক। দরজার আড়াল হয়ে যাওয়ার আগে উঁকি মেরে তাকায় রিশুর দিকে, যেন বলতে চায় তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে। রিশু নিজের ঘরে ঢুকে বাড়ির পরা জামা কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পরে। বিকেলের পর থেকে ঝিনুক কে যত দেখছে তত বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে ওর রূপে, ওর শিশুসুলভ আচরনে ওর হাসিতে ওর মত্ত চলার ছন্দে ওর কাজল কালো চোখের ভাষায় ওর চাঁপার কলি আঙ্গুলের পরশে ওর গায়ের মিষ্টি গন্ধে ওর এলো চুলের রেশমি পরশে ওর আলতো কুনুইয়ের ধাক্কায় ওর উষ্ণ শ্বাসের ঢেউয়ে।
বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিফলনের দিকে তাকিয়ে থাকে রিশু।
আয়নার প্রতিফলন ওকে প্রশ্ন করে, ভীষণ চঞ্চল আগুনের লেলিহান শিখার মতন সুন্দরী তোমার তন্বী রূপবতী স্ত্রী। তোমার সামনে দুটো রাস্তা খোলা, তুমি কি এই আগুনে নিজেকে জ্বালাতে প্রস্তুত নাকি এই আগুনকে নিয়ন্ত্রনে আনতে চাও, বেঁধে রাখতে চাও?
মাথা দুলিয়ে উত্তর দেয় নিজেকে, মায়ের ইচ্ছেতে যেদিন বিয়ে করে এনেছি সেদিন থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছি।
ওর উত্তর শুনে হেসে ফেলে ওর প্রতিফলন, নিজেকে মিথ্যে বলছ কেন? এই কয়দিনে কি প্রস্তুতি নিয়েছ? আগুন জ্বালাতে হলে ছোট এক দেশলাই কাঠির ঘর্ষণ যথেষ্ট। তুমি তার কিছুই করনি এতদিনে।
রিশুও হেসে ফেলে, আগুন না হয় নাই জ্বালালাম, বন্ধু হতেই পারা যায়।
অট্টহাসিতে ফেটে পরে ওর প্রতিফলন, মায়ের অতি বাধ্য ছেলে, বন্ধুত্ত পাতানোর জন্য তোমাকে বিয়ে দিয়েছে তোমার মা? যদি ভেবে থাকো যে বন্ধু পাতানোর জন্য বিয়ে দিয়েছে তাহলে সেটাও ত এতদিনে পূর্ণ করনি, তাই না?
বুক ভরে শ্বাস নেয় রিশু, না তা ঠিক নয়, তবে ওর অনেক কিছুই আমার ঠিক লাগে না।
প্রতিফলন ওকে প্রশ্ন করে, তুমি কি ওকে সেই নিয়ে কোনদিন কিছু বলেছ?
মাথা নাড়ায় রিশু, না বলিনি। তবে এই মদের কথা ধর। ওর ইউরিনে প্রচন্ড আসিডিক দুর্গন্ধ ছিল, মেয়েটা একদম জল খায় না, বিয়ের আগে শরীরের প্রতি নিশ্চয় অনেক অত্যাচার করেছে, যার ফলে এই কচি বয়সে ওর শরীরে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে যদিও খুব নগন্য তাও সময় থাকতে সেই সমস্যার প্রতিকার না করলে ভবিষ্যতে প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে। বেশির ভাগ মেয়েদের ইউরিন ইনফেক্সান হয় সময় থাকতে তার ওষুধ নিলে ভালো হয়, এইসব নিয়েই চিন্তা হয়।
আবার অট্টহাসিতে ফেটে পরে ওর প্রতিফলন, তুমি কি ভাবো তোমার প্রেয়সী অন্তর্যামী? তোমার না বলা কথা সব বুঝে যাবে? তুমি এখন ওর সাথে মেশোনি, তুমি ওকে এখন জানতে চাওনি চিনতে চাওনি।
বেশ কিছুক্ষন মাথা নিচু করে থাকার পরে প্রশ্ন করে, ঠিক আছে, সব বুঝলাম, কি করতে বলছ তাহলে?
ওর প্রতিফলন বাঁকা হাসি হেসে ওকে বলে, এত কিছু বলার পরেও তোমাকে বলতে হবে কি করতে হবে? তুমি না তোমার প্রেয়সীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ যে আজকে রাতে ঘুমাবে না, গল্প করবে?
মাথা দোলায় রিশু প্রতিফলনের কাছে হার মানতে হয় ওকে, হ্যাঁ।
মৃদু হেসে ওর প্রতিফলন ওকে বলে, তাহলে এই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কি করছ? ডানা মেলে ধরার সময় এসে গেছে, তোমার আকাশে ওড়ার স্বপ্ন পূরণ করার সময় এসে গেছে, অসীম দিগন্ত তোমাকে হাতছানি দিয়ে আহবান করছে, পাল তোলার মানুষ তোমার পাশেই তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে, তুমি কান্ডারি হয়ে সেই তরীর দাঁড়ে বস, ভাসিয়ে দাও তোমার তরী।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাথরুমের দরজায় দুম দুম আওয়াজ, সেই সাথে দরজার ওপাশ থেকে ঝিনুকের জড়ানো গলার আওয়াজ, “এই তাড়াতাড়ি কর।”

বাথরুমে ঢুকেই গিজার চালিয়ে দিয়েছিল, তাড়াতাড়ি মুখের ওপরে গরম জলের ঝাপটা মেরে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ এই হয়ে গেছে।”
বেশি দেরি করলে ওর সুন্দরী প্রেয়সী ক্ষেপে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাড়াতাড়ি হাত পা ধুয়ে বাইরের জামা কাপড় ছেড়ে ঘরের জামা কাপড় পরে বাথরুম থেকে বেড়িয়ে পরে রিশু। দরজা খোলা মাত্রই ঝিনুকের সাথে চখাচুখি হয়। বাইরের পোশাক ছেড়ে একটা ঢিলে টপ ওপরে পরে নিয়েছে, টপের বাঁ দিকটা বাঁ কাঁধ ছাড়িয়ে বাজুর ওপরে নেমে যাওয়াতে ফর্সা গোল কাঁধের অনেকাংশ বেড়িয়ে পড়েছে। বাঁধন খোলা এলো চুলের কয়েক গোছা মুখের ওপরে একপাশে দুলতে থাকে। চিবুক ছাড়িয়ে রিশুর চোখ নেমে যায় মরালী গর্দানের ওপরে। টপের নিচে অন্তর্বাস পরে না থাকায় পিনোন্নত স্তন জোড়া ভীষণ ভাবেই টপ ফুঁড়ে সামনের দিকে উঁচিয়ে থাকে। এই কয়দিনে বাড়িতে বসে থাকার ফলে শরীরে কিঞ্চিত মেদ জমে যাওয়ার ফলে ঝিনুকের নধর দেহের গঠন আরো বেশি লোভনীয় হয়ে ওঠে। পরনে একটা চাপা পায়জামা, যেটা ঝিনুকের কোমরের নিচের দেহের আঁকিবুঁকি আঁকার অবয়াব আরো বেশি করে ফুটিয়ে তুলেছে। স্বর্গের অপ্সরার মতন ভারী নিতম্ব দুলিয়ে রিশুকে একটু ঠেলে দিয়ে ঢুলু ঢুলু কাজল কালো নয়নে ওর দিকে বাঁকা হাসি হেসে বাথরুমে ঢুকে পরে।
দরজা বন্ধ করার আগে রিশুর দিকে একটা দুষ্টু মিষ্টি হাসি ছুঁড়ে বলে, “ডোন্ট ব্রেক ইউর প্রমিজ। (প্রতিশ্রুতির খেলাপ করোনা কিন্তু)।”
মাথা নাড়িয়ে হেসে উত্তর দেয়, “এট ইওর সার্ভিস ম্যাডাম (এই বান্দা তোমার সেবায় হাজির)।”
নেশার ঘোরে ট্যাক্সির মধ্যে কতকি রিশুকে বলেছে ভেবেই মনে মনে হেসে ফেলে ঝিনুক। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে ওর চোখ জোড়াতে লালচে রঙ ধরে গেছে। এই ভাবে রিশুর সামনে যেতে ভীষণ বিব্রতবোধ করে। রিশু নিজে ড্রিঙ্ক করে না কিন্তু তাও ওকে মানা করেনি, ভেবে বেশ ভালো লাগে, অন্তত ওর স্বাধীনতায় এখন হস্তক্ষেপ করেনি কিন্তু নিজের জীবন শৈলী বদলাতে হবে। ওকে সত্যি কি কেউ বুঝেছে? যাকে ভেবেছিল ভালোবাসে সে আঘাত হেনেছে, আর অচেনা যে মানুষটার সাথে চোখ বুজে এতদুর পাড়ি দিয়েছে সে তার মনের কথা কোনদিন জানতে চায়নি। এক সপ্তাহের ওপরে হয়ে গেল কিন্তু এখন পর্যন্ত রিশুর দিক থেকে কোন পদক্ষেপ নেই। সারাদিন একা বাড়িতে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছে, এতদিন গৃহবন্দী হয়ে কোনদিন কাটায়নি। আজ রাতেই একটা বিহিত করতে হবে না হলে আর থাকতে পারছে না এইভাবে। ট্রেনের যাত্রীরাও সুদুর পথ পাড়ি দেওয়ার সময়ে গল্পে মেতে ওঠে, কিন্তু রিশু ভীষণ চুপচাপ প্রকৃতির মানুষ, একটু বেশি বাড়ি ঘেঁষা, অতীব মার্জিত রুচি সম্পন্ন ব্যাক্তি। চরিত্রগত দিক থেকে দুইজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর নর নারী। ভালো করে সাবান দিয়ে মুখ হাত ধুয়ে নেয়। চোখে মুখে বারেবারে জলের ঝাপটা দিয়ে নেশার ঘোর কাটিয়ে নেয়, মত্ত অবস্থায় ওর সামনে যেতে ভীষণ লজ্জা করে ঝিনুকের। হাতে করে একটা জ্যাকেট নিয়ে এসেছিল,সেটা টপের ওপরে পরে বাথরুম থেকে বেড়িয়ে আসে ঝিনুক।
একটা জ্যাকেট পরে বসার ঘরের সোফায় বসে ঝিনুকের জন্য অপেক্ষা করছিল রিশু। কথা দিয়েছে রাতে ওর সাথে গল্প করবে, কথা রাখতেই হবে প্রেয়সীর না হলে আবার মুখ ভার করে বসে থাকবে। যদিও এর আগে ওর মুখের দিকে চেয়ে দেখা হয়নি তবে বিকেলের পর থেকে ঝিনুকের রূপে ঝিনুকের আচরনে মুগ্ধ হয়ে গেছে, তীব্র আকর্ষণ জেগে উঠেছে ওর হৃদয়ের কোণে।
বাথরুম থেকে বেড়িয়ে রিশুকে সোফায় বসে থাকতে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তোমার ঘুম পাচ্ছে না?”
আলতো মাথা নাড়ায় রিশু, “ঘুমটাকে আসতে বারণ করে দিলাম।”
বাথরুম থেকে বেড়িয়ে ভীষণ ঠান্ডা লাগছিল ঝিনুকের, বুকের কাছে হাত দুটো জড় করে মৃদু কাঁপতে কাঁপতে রিশুকে বলে, “আমার ঠান্ডা লাগছে, ঘরে চল।”
সোফা ছেড়ে উঠে পরে রিশু, নিজের ঘরের দিকে পা না বাড়িয়ে শোয়ার ঘরে ঢুকে বিছানার ওপরে বসে পরে। গত এক সপ্তাহ ধরে এই ঘর ওর বেহাত হয়ে গেছে, ঝিনুকের কবলে চলে গেছে ওর শোয়ার ঘর। পিঠের দিকে একটা বালিশ রেখে হেলান দিয়ে বসে ঝিনুককে বলে, “আরে একটা জ্যাকেট পড়বে ত, এই ভাবে থাকলে ঠান্ডা ত লাগবেই।”
বাথরুম থেকে বেশ একটা ঝগড়া করার প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়েছিল, কিন্তু ওইভাবে রিশুকে বসে থাকতে দেখে সেইসব কোথায় যেন হাওয়ায় মিশে গেল। একটা পাতলা জ্যাকেট পরে বিছানার ওপরে একটু তফাতে বসে ওকে জিজ্ঞেস করে, “কাল তাহলে ছুটি নিতে পারছ না?”
রিশু মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়, “না গো, পসিবেল নয়। তুমি আমার প্রফেশান ঠিক বুঝতে পারছ না। আমি এমেসের ডাক্তার, হটাত করে না বলে কয়ে ছুটি নেওয়া সত্যি অসম্ভব।”
খুব ইচ্ছে করছিল ওর সাথেই শপিং করতে তাই একটু আহত হয়েই বলে, “আচ্ছা যদি কারুর হটাত করে শরীর খারাপ করে তখন সে কি করবে?”
মাথা নাড়িয়ে হেসে ফেলে রিশু, “শরীর খারাপ হলে সে কথা আলাদা। তুমি বল শুধু মাত্র শপিং করার জন্য ছুটি নেওয়া কি ঠিক?”
গোমড়া মুখ করে উত্তর দেয়, “ভেবেছিলাম তোমার সাথে যাবো।”
রিশু ওকে বলে, “তুমি ত বলছিলে তোমার কোন বান্ধবীর সাথে শপিং করতে যাবে।”
মাথা দোলায় ঝিনুক, “হ্যাঁ রিতিকার সাথে যাওয়ার একটা প্লান আছে কিন্তু…”
রিশু ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “কিন্তু কি? সত্যি রিতিকা বলে কেউ আছে নাকি…”
মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে ফেলে ঝিনুক, “না না আছে কিন্তু” নিজের হাত নিয়ে খেলতে খেলতে বলে, “মানে কলেজে পড়ার সময়ে তেমন ভাবে পরিচয় ছিল না তাই ভাবছিলাম যে…”
কথাটা ঠিক বুঝতে না পেরে আবার প্রশ্ন করে রিশু, “তার মানে রিতিকা তোমার বান্ধবী নয়? শুধু মাত্র ব্যাচমেট?”
মাথা দোলায় ঝিনুক, “হ্যাঁ, আমার ব্যাচমেট।” রিশুর কাছে কিছু লুকিয়ে লাভ নেই, তাই বলতে শুরু করে নিজের কলেজের কথা, “আসলে কি জানো, এমবিএ পড়ার সময়ে আমাদের মধ্যে তেমন কথাবার্তা হত না।” ঠোঁট চেপে হেসে বলে, “ক্যাট ফাইট, আমাদের মধ্যে একটা রেশারেশি ছিল, কে বেশি সুন্দরী।” বলেই লজ্জায় অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
ঝিনুকের লাজে রাঙ্গা মুখমন্ডল দেখে ওর কাছে সরে এসে বলে, “ইউ আর ডেফিনিটলি গরজিয়াস (তুমি প্রকৃত অর্থে সুন্দরী)।” ভীষণ ইচ্ছে করছিল লাজে রাঙ্গা সুন্দরীকে জড়িয়ে ধরতে।
একদম পাশে সরে আসাতে ঝিনুক একটু নড়ে বসে রিশুর হাতের ওপরে আলতো চাঁটি মেরে লাজুক হেসে বলে, “ধ্যাত যাও ত…”
নিজের কাঁধ দিয়ে ঝিনুকের কাঁধে আলতো ধাক্কা মেরে ইয়ার্কি মেরে বলে, “তাহলে কি বলব, তুমি শাকচুন্নির মতন দেখতে, এই বলব।”
দুই হাত দিয়ে রিশুর বাজুতে ধাক্কা মেরে বিষণ্ণতার ভান করে মুখ ঝামটা মেরে বলে, “যাও, আর তোমার সাথে কথা বলব না।”
ওদের মধ্যে কথা আর বলা হয় কোথায়। দুপুরের পর থেকেই সেই যে বুকের মধ্যে একটা ভেসে যাওয়ার টান জেগেছে সেই উজানের টানে এত সহজে ভাঁটা পড়তে দিতে চায়না রিশু। প্রেয়সীকে একটু খেপিয়ে তোলার জন্য বলে, “কথা যখন বলবে না তাহলে আর বসে থেকে কি লাভ, আমি তাহলে ঘুমাতে যাই।”
রেগে মেগে বিছানা ছেড়ে উঠে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, “হ্যাঁ তুমি ঘুমাতে যাও।”
রাগলে ঝিনুককে আরো বেশি মিষ্টি দেখায়, বিয়ের প্রথম রাতেই সেই রূপ দেখে আকর্ষণ অনুভব করেছিল। এইবারের রাগে মিষ্টি অনুরাগ মিশে আছে। ঝিনুক উঠে দাঁড়ানো মাত্র ওর হাত ধরে টান মেরে বলে, “যাও কোথায়?”
কব্জিতে মোচড় দিয়ে নিজের হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে দাঁতে দাঁত পিষে উত্তর দেয় সুন্দরী ললনা, “যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবো, আর ভালো লাগে না।” ওর চোখ জোড়া ভীষণ ভাবেই জ্বালা করে ওঠে, নাকের পাটা ফুলে ওঠে এক অজানা ব্যাথায়, “কেউ আমাকে ভালোবাসে না, কেউ আমাকে বোঝে না।”
ঝিনুককে ব্যাথা দেওয়ার অভিপ্রায় একদম ছিল না রিশুর, ওকে এইভাবে কাঁদতে দেখে ভীষণ ভাবেই অপ্রস্তুত হয়ে পরে। হাত ধরে টেনে পাশে বসিয়ে প্রেয়সীর মুখ দুই হাতে আঁজলা করে তুলে ধরে। ঝিনুকের চোখ জোড়া জলে উপচে পড়েছে, দুই চোখের কোনা বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু ওর কোমল গন্ড বেয়ে নিচের দিকে নেমে যেতেই বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে সেই অশ্রুর দাগ মুছিয়ে দেয়। নরম মসৃণ ত্বকের ওপরে রিশুর উষ্ণ হাতের পরশে ঝিনুকের মোমের মতন হৃদয় গলে যায়। সুন্দরী ললনাকে কাঁদতে দেখে রিশুর হৃদয় গলে যায়, ভীষণ ভালোবাসে শুধু মাত্র মুখে স্বীকার করেনি তাই’ত রোজদিন বাজার থেকে ওর জন্য ফল কিনে নিয়ে আসে, রাতে বাড়ি ফিরে স্নান করার পরে ওর জামা কাপড় শুকিয়ে দেয় কিন্তু কোনদিন সেই নিয়ে ওকে বকাবকি করেনি। ও বোঝে যে ঝিনুকের ক্ষত হৃদয়ের ব্যাথা, সেই ক্ষত খুঁড়ে বেশি ব্যাথা দিতে চায়নি। ওর আদরের রমণীর চোখের জল ভীষণ ভাবেই কাঁদিয়ে তোলে রিশুকে।
অশ্রুর ফোঁটা মুছিয়ে দিয়ে আদর করে বলে, “আমি তোমায় ভীষণ ভালোবাসি, ঝিনুক।”
সেই বিয়ের রাতে রিশুর মুখে নিজের নাম শুনেছিল তারপরে কোনদিন ওকে নাম ধরে ডাকেনি। প্রথমবার রিশুর মুখে সরাসরি নিজের নাম শুনে বুক কেঁপে ওঠে গলা ধরে আসে ঝিনুকের। রিশুর মাথা নেমে আসে ঝিনুকের মুখের ওপরে। ঝিনুকের চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে আসন্ন এক প্রেমাস্পদ স্পর্শের আকাঙ্ক্ষায়। রিশুর বুকের কাছে জড়সড় হয়ে আপ্রান চেষ্টা করে নধর দেহপল্লব রিশুর বুকের সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দিতে। ঝিনুকের মুখখানি আঁজলা করে নিজের দিকে তুলে ধরে প্রসস্থ ললাটে অধর চেপে ধরে। প্রেমিক স্বামীর প্রথম ঠোঁটের পরশে গলে যায় ঝিনুকের হৃদয়। ওর সারা শরীর অবশ হয়ে যায় রিশুর ঠোঁটের উষ্ণ পরশে।
বেশ কিছুক্ষন ঝিনুকের কপালে ভালোবাসার প্রথম চুম্বন এঁকে মৃদু করে বলে, “তুমি আমাকে বল, আমি তোমার সব কথা শুনবো ঝিনুক।” চোখের জল মুছিয়ে আদর করে বলে, “প্লিজ কেঁদো না।”
রিশুর জ্যাকেটের কলার চেপে ওর প্রসস্থ বুকের ওপরে নিজেকে সঁপে দিয়ে ভেঙ্গে পরে ঝিনুক, “তুমি মিথ্যুক, তুমি আমাকে একদম ভালোবাসো না।”
অভিমানের কান্নায় ফুলে ওঠা নরম পিঠের ওপরে হাত বুলিয়ে আদর করে বলে, “কে বলেছে যে আমি তোমাকে ভালোবাসি না?”
দুম করে রিশুর বুকের বাঁদিকে একটা কিল মেরে বলে, “এটা মহা শয়তান, কিছুই বলে না।”
হৃদয়ের ওপরে ঝিনুকের নরম হাত চেপে ধরে বলে, “আমি তোমার প্রেমে কবে পড়েছিলাম জানো?”
ঝিনুক রিশুর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে জলা ভরা চোখ থাকা স্বত্তেও ঠোঁটে হাসি টেনে বলে, “কবে?”
রিশু, ঝিনুকের লালচে নাকের ডগায় নাকের ডগা ঘষে আদর করে বলে, “কোলকাতা এয়ারপোরটে সিকিউরিটি চেকের পরে যখন তুমি আমায় না পেয়ে চারপাশে খুঁজছিলে, তখন আমি তোমার প্রেমে পরে যাই।”
রিশুর কথা শুনে সব ব্যাথা ভুলে নিচের ঠোঁট চেপে লাজুক হেসে ওর বুকের ওপরে আরো জোরে দুম দুম করে কয়েকটা কিল মেরে বলে, “আচ্ছা, আমাকে একা ছেড়ে দিয়ে শয়তানি করা হচ্ছিল তাহলে।”
মৃদু হেসে রিশু বলে, “আই অয়াজ জাস্ট চেকিং মাই ডারলিং (আমি আমার প্রেয়সীকে একটু পরীক্ষা করছিলাম মাত্র)।”
ঝিনুক নিচের ঠোঁট দাঁতে কেটে কাজল কালো বড় বড় চোখ করে লাজুক হেসে বলে, “আমি একটা কথা বলব?”
রিশু ভুরু কুঁচকে ওর দিকে দেখে মাথা দুলিয়ে বলে, “হ্যাঁ?”
কথাটা বলার আগেই লজ্জায় ঝিনুকের কান লাল হয়ে যায়, লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে রিশুর প্রসস্থ ছাতির ওপরে মাথা রেখে বলে, “দিল্লীতে নেমে যখন তুমি আমার মাথায় গলায় শাল জড়িয়ে দিলে, সেই মুহূর্তে না আমি…”
ঝিনুকের থুঁতনিতে তর্জনী ঠেকিয়ে নিজের দিকে তুলে ধরে দুষ্টুমি করেই প্রশ্ন করে, “সেই মুহূর্তে কি হয়েছিল?”
ঝিনুক ওর হাত ধরে তর্জনীতে আলতো কামড় দিয়ে বলে, “সেই মুহূর্তে তোমাকে কেটে ফেলতে ইচ্ছে করছিল আর কি।” বলেই লাজুক হেসে ওর বুকের ওপরে মাথা রেখে চোখ বুজে শিথিল হয়ে চুপ করে যায়।
বাঁ হাত দিয়ে ঝিনুককে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ওর মাথার ওপরে ঠোঁট চেপে ধরে রিশু। বাহুপাশ নিবিড় করে হৃদয়ের উষ্ণতায় ঝিনুকের শুন্য হৃদয় ভরিয়ে তুলতে আপ্রান চেষ্টা করে। ঝিনুকের উষ্ণ শ্বাসের ঢেউ ওর প্রসস্থ ছাতির ওপরে বয়ে বুকের ভেতর আলোড়ন সৃষ্টি করে। পিনোন্নত স্তন যুগলের কোমল উষ্ণ পরশে রিশুর বুকে জমে থাকা ঝড় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। নুজের বুকের ওপরে ঝিনুকের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারে রিশু, ধুকধুক ধুকধুক করে ধিমে তালে ওর হৃদ স্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে মাতোয়ারা হয়ে উঠছে ধিরে ধিরে। হিটার জ্বালানো হয়নি, কনকনে ঠান্ডায় ওর বুকের ওপরে ঝিনুকের কোমল দেহপল্লবের মৃদু কম্পন অনুভব করে মন কেমন করে ওঠে রিশুর। ইসস, মেয়েটা কেমন ভাবে কাঁপছে তাও মুখে কিছুই বলবে না।
ঝিনুকের রেশমি চুলের মধ্যে নাক ঘষে আদর করে জিজ্ঞেস করে, “এই…”
এই উষ্ণ পরশ ছাড়িয়ে কার উঠতে ভালো লাগে, তাই মাথা না উঠিয়েই মিহি কন্ঠে প্রশ্ন করে, “মমম… কিইইই…”
বাহুডোর বিন্দুমাত্র শিথিল না করে আরো বেশি ঝিনুকের লোভনীয় দেহপল্লব জড়িয়ে ধরে মিহি কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, “তোমার ঠান্ডা লাগছে?”
রিশুর ছাতির ওপরে ওপরে নাক ঘষে হরিণীর মতন মিহি কন্ঠে বলে, “হুমমম…”
পাশে পরে থাকা লেপটা টেনে ঝিনুকের গায়ের ওপরে জড়িয়ে দেয় রিশু। গায়ের ওপরে লেপ পড়তেই আরো বেশি রিশুর বুকের কাছে জড়সড় হয়ে বসে পরে। কিছু পরে রিশুর দিকে মাথা তুলে ওর চশমা ভেদ করে গভীর চোখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে ঝিনুক। ওর মনের মানুষটা সেই সাত সকালে উঠে হসপিটাল গিয়ে কয়েক’শ রুগী দেখে আবার বাড়ি ফিরে ডিনারের জন্য বাইরে গিয়ে তারপর রাতে ফিরে ওর গল্প শুনতে বসেছে ভাবতেই ওর মন ভরে ওঠে।
মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করে, “তুমি খুব টায়ার্ড তাই না?”
ডিনার শেষে ট্যাক্সিতে ওঠার আগে পর্যন্ত ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছিল রিশুর কিন্তু ট্যাক্সিতে উঠে ঝিনুকের কোমল দেহপল্লবের ছোঁয়ায় আর ওর অনর্গল মিষ্টি আবোলতাবোল বুলি শুনে ক্লান্তভাবটা অনেক আগেই কেটে গেছে। মাথা নাড়িয়ে বলে, “না না একদম না, তুমি থাকলে ক্লান্তি আসে নাকি?”
নিচের ঠোঁট চেপে লাজুক হেসে ফেলে ঝিনুক, “এইই চা খাবে?”
ঝিনুককে ছাড়তে একদম ইচ্ছে করছিল না রিশুর তাই বাহুবেষ্টনি আরো নিবিড় করে বলে, “না এত রাতে চা খায় না।”
চশমার ভেতর থেকে রিশুর চোখের মনির মাঝে নিজের প্রতিফলন দেখে চোখের তারায় লাজুক হাসি মাখিয়ে বলে, “একদম তোমার মতন করে চা বানাবো, সত্যি বলছি।”

বল তো আরশি তুমি মুখটি দেখে
যদিও কাজল আমি পরিনি, যদিও কবরী আজ বাঁধিনি,
তবু বল তো রূপসী কে তোমার চোখে,
আমি নই বিম্ববতি রাজার ঘরে,
হাসিতে পান্না তো নয়, কান্না ঝরে
বল তো আরশি, তুমি মুখটি দেখে
কেতকী লজ্জা না পায়, আমায় দেখে,
তবু বলো, বল তো আরশি তুমি মুখটি দেখে, রূপসী কে তোমার চোখে।

বিছানা ছেড়ে দুইজনে উঠে পড়ল। রান্না ঘরে গিয়ে গ্যাস জ্বালিয়ে একটা ডেকচিতে দুই কাপ জল চাপিয়ে ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, “এর পর?”
রিশু ওকে চা বানানোর পদ্ধতি বুঝিয়ে দেয়, “জল একটু গরম হলে একটু আদা থেঁতো করে দেবে আর তুলসি পাতার গুঁড়ো দেবে…”
ঝিনুক চোখ বড় বড় করে, “তুলসি পাতার গুড়ো, হোয়াট দ্যা … কোথায় পেলে?”
মৃদু হেসে রিশু উত্তর দেয়, “মা যখন আসে তখন বাড়ি থেকে তুলসি পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে নিয়ে আসে।”
ঝিনুক ভুরু নাচিয়ে হেসে বলে, “চা নাকি না অন্য কিছু।”
রিশু হেসে উত্তর দেয়, “আরে খেয়ে দেখো। জল গরম হবে কিন্তু ফোটার আগেই একটু চায়ের পাতা দিয়ে বন্ধ করে দেবে, তারপর প্রায় পাঁচ মিনিট একটু ভিজতে দেবে, ব্রিউ হতে দেবে পাতা। পাতা খুলে নিচে পরে যাবে তখন চায়ের জল তৈরি হয়ে যাবে।”
বাধ্য মেয়ের মতন মাথা দুলিয়ে রিশুর পদ্ধতি অনুযায়ী চা বানাতে শুরু করে দেয় ঝিনুক। পাঁচ মিনিট পরে চা ছেঁকে ওকে জিজ্ঞেস করে, “ক চামচ চিনি দেবো?”
মুচকি হাসে রিশু, “না না চিনি নয়, এবারে চায়ে এক চামচ করে মধু দাও তার পরে লেবুর স্লাইস করে কেটে দাও।”
লেবু পাতলা করে কাটতে কাটতে চোখ বড় বড় করে ওকে জিজ্ঞেস করে, “এটা কি চা গো?”
রিশু হেসে বলে, “দারুন লাগবে খেয়ে দেখো।”
ঝিনুক এমন চা কোনদিন খায়নি। সেদিন একের পর এক যা ঘটে চলেছে সব কিছুই ওর কাছে প্রথমবার আর বারেবারে অবাক করে দেওয়ার মতন। বিকেল বেলায় যেমন হটাত করেই ওর মুখ থেকে ভেতরের উদ্বেগ ঠিকরে বেড়িয়ে এসছিল, সাবধানে এসো। তারপরে শালিনীর সাথে দেখা, রিশুকে বড় দাদার মতন সন্মান করে, দেখতে সুন্দরী নিওন্যাটোলজিস্ট কিন্তু কোন অহঙ্কার নেই কত সহজে ওর সাথে মিশে গেল, ওকে বুঝতেই দিল না যে ওদের আগে দেখা হয়নি। ডিনারের খাবারের বহরের নাম কোনদিন আগে শোনেনি। অন্ধকার ট্যাক্সিতে দয়িতের উষ্ণ পরশে ওর হৃদয় গলে গিয়েছিল। রিশুর প্রথম চুম্বনে ওর সারা শরীর অসাড় হয়ে গিয়েছিল, যদিও সেই চুম্বন ওর অধরে নয় ললাটে প্রস্থাপিত কিন্তু সেই ললাটের চুম্বনের প্রশান্তির প্রলেপ অধরের চুম্বনের মাধুর্যের ভাষার কাছে হার মেনে যায়। এটা ওর জীবনের প্রথম চুম্বন নয় তবে কেউ ওর কপালে এইভাবে এর আগে চুমু খায়নি।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বেশ ভালো লাগে ঝিনুকের, হাসি মুখে রিশুকে বলে, “এর টেস্ট বেশ অন্যরকম।”
রিশু প্রশ্ন করে, “ভালো লেগেছে?” মাথা দোলায় ঝিনুক, হ্যাঁ। রিশু ওকে বলে, “আমাদের বাড়িতে এই চা খাওয়া হয়। বোন বলে পথ্য খাচ্ছি। আসলে আমার একটু সর্দির ধাত আছে তাই সেই ছোটবেলা থেকে মা আমাকে এই চা খাওয়ায় আর নিজেও খায়, আর সেই থেকেই বাড়ির সবাইকে এই চা খেতে হয়।” বলেই হেসে ফেলে।
ঝিনুক মুচকি হেসে রিশুর পাশ ঘেঁষে বলে, “আসলে কি জানো আই ওয়াজ ফিলিং ভেরি ডিজি…” কথাটা শেষ করার আগেই লাজুক হেসে মাথা নিচু অস্ফুট স্বরে বলে, “আমার অতটা ড্রিঙ্ক করা উচিত হয়নি।”
ওর সামনে ড্রিঙ্ক করে কুন্ঠিত বোধ করছে দেখে বেশ ভালো লাগে রিশুর, মানুষের উচিত সময় থাকতে নিজের ভুল বোঝার। অনেক সময়ে মানুষ নিজের ভুল ত্রুটি দেখতে পারে না আর সেই ভুল পথেই চলে যায়। ঝিনুকের অপ্রস্তুতভাব কাটানোর জন্য কাঁধ দিয়ে আলতো ধাক্কা মেরে বলে, “ইট ইজ অল রাইট। এক আধ দিন ড্রিঙ্ক করলে ক্ষতি নেই। মা আমাকে একটা গল্প বলত, এক রাজার একটা পোষা বাঁদর ছিল, সেই রাজা তার পোষা বাঁদরকে ভীষণ ভালবাসত। পোষা বাঁদরটা খুব জ্বালাতন করত সেই রাজাকে সব সময়ে এইটা ধরে টান মারে অইটা ধরে টান মারে, কিন্তু সেই রাজা কোনদিন সেই বাঁদরটাকে কিছু বলত না। একদিন সেই বাঁদর সেই রাজার ঘাড়ে চেপে বসলো, রাজা তখন সেই বাঁদর কে আদর করে মাটিতে নামিয়ে দিল কিন্তু কিছুই বলল না। এই ভাবে সেই বাঁদরের আরো সাহস বেড়ে গেল। একদিন সেই বাঁদর রাজার ঘাড়ের বদলে মাথায় চেপে বসতে গেল, ঠিক তখনি সেই রাজা সেই বাঁদরটাকে তুলে আছাড় মেরে মাটিতে ফেলে দিল। রাজার আদরের বাঁদরের সাথে এই ব্যাবহারে সভাসদেরা অবাক হয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলে রাজা উত্তরে বলেন, অভ্যেস অথবা মানুষ কাউকেই কোনদিন মাথায় চড়তে দিতে নেই, মাথায় বসালেই সে তোমার মাথায় চড়ে নাচতে শুরু করে দেবে, তোমার জীবন শেষ করে দেবে।”
এই গল্পের নিগূড় অর্থ অনুধাবন করতে পেরে ঝিনুক চুপ করে যায়, ছোট একটা গল্পের মাধ্যমে অনেক কিছুই ওকে জানিয়ে দিল রিশু। রিশুকে দেখতে একদম রিশুর মায়ের মতন, এক ছাঁচে তৈরি, প্রকৃত অর্থে মায়ের ছেলে। কুন্ঠা বোধে ওর বুক ভেঙ্গে যায়। রিশুর কাছ ঘেঁষে নরম কন্ঠে বলে, “আর কোনদিন এমন করব না।”
পাপ বোধে জর্জরিত ঝিনুকের গলা শুনে আহত হয়েই ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “আরে না না, বললাম তো কালে ভদ্রে ড্রিঙ্ক কর ক্ষতি নেই।” চায়ের কাপ ছোট চুমুক দিয়ে বাঁ হাত দিয়ে ঝিনুকের কাঁধ জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে বলে, “এই তোমার নাকি মাথা ঝিমঝিম করছিল?”
চায়ের কাপ চুমুক দিয়ে ওর কোল ঘেঁষে মিহি কন্ঠে বলে, “এখন আর নেই” বলেই মুচকি হাসি দেয় ঝিনুক।
অনেকদিন থেকেই মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন উঁকি মারছিল ঝিনুকের, কি কারনে গত রবিবার ওর রক্ত আর ইউরিন পরীক্ষা করেছিল রিশু। প্রশ্ন করে রিশুকে, “আচ্ছা একটা প্রশ্ন করব?” রিশু মাথা দোলায়। ঝিনুক ওকে প্রশ্ন করে, “আমার কি হয়েছে যে ব্লাড টেস্ট করতে দিয়েছিলে?”
ঝিনুককে আসস্থ করার জন্য মাথা নাড়ায় রিশু, “তোমার কিছুই হয়নি, তুমি ফিট এন্ড ফাইন আছো।”
ঝিনুক মুখ গোমড়া করে বলে, “না প্লিজ বল না।”
বুক ভরে শ্বাস নিয়ে রিশু ওর প্রশ্নের উত্তরে বলে, “তুমি জল খাও না একদম…”
তেড়ে ওঠে ঝিনুক, “কই খাই ত।”
হেসে ফেলে রিশু, “সে তো আমার বলার পরে।”
লাজুক হাসি দেয় ঝিনুক, “হুম”
রিশু ওকে বলে, “সঞ্জনা ম্যাডাম যে ওষুধ গুলো দিয়েছে সেই গুলো ঠিক মতন খেয়ে যাও আর জল খেও তাহলে কিছু হবে না।”
তাও ঝিনুকের ভীষণ ভাবেই জানতে ইচ্ছে করে আসলে ওর শরীরে কি হয়েছে, হটাত করেই কেন ওর রক্ত পরীক্ষা করার ইউরিন পরীক্ষা করার দরকার পড়ল রিশুর, “তুমি না বললে কাল থেকে ফল খাবো না কিন্তু।”
রিশু হেসে ফেলে, “আচ্ছা বাবা, আসলে হয়ত কিছুই নয় সব কিছুই আমার মনের ভুল কিন্তু তাও একটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। তোমার ইউরিনে এমোনিয়ার মানে এসিডিক গন্ধ ছিল তাই ইউরিন টেস্ট করিয়েছিলাম, পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলাম ইউরিন ইনফেক্সান আছে নাকি। মেয়েদের ভ্যাজাইনা আর এনাস খুব কাছাকাছি, পটি করার পরে ধোয়ার সময়ে সেই জল ভ্যাজাইনাতে ঢুকে পরে আর তাতে ইনফেক্সানের চান্স অনেক বেড়ে যায়। যদিও তোমার ইনফেক্সান নেই তবে তুমি যেহেতু জল খাও না তাই এলএফটি করার দরকার ছিল, লিভারের কি অবস্থা সেটা জানার দরকার ছিল, তাই ব্লাড টেস্ট করতে হল। সিস্টের একটা সম্ভাবনা আছে তবে সেটা আশা করি সঞ্জনা ম্যাডামের ওষুধে ঠিক হয়ে যাবে।”
যখন ওর রক্ত নেওয়া হয় তখন বাড়ি মাথায় করে তুলেছিল, তখন রিশুকে সঠিক ভাবে চিনত না পর্যন্ত কিন্তু ওর জন্য দুশ্চিন্তা হয়েছে জানতে পেরে ওকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে ঝিনুকের। মিহি কন্ঠে ওকে বলে, “এত ভাবতে আমার জন্য?”
হেসে ফেলে রিশু, বুকের বাঁ দিকে কিল মেরে বলে, “বললাম তো, এয়ারপোরটে সিকিউরিটি চেকের পরে যখন তোমার চোখ আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল তখন থেকেই তোমার জন্য ভাবতে শুরু করেছি।” চায়ের কাপ বেসিনে রেখে জিজ্ঞেস করে ললনাকে, “রাতে কি রান্নাঘরে কাটানোর ইচ্ছে আছে নাকি?”
চায়ের কাপ শেষ করে, রিশুর বুকের ওপরে কিল মেরে বলে, “হ্যাঁ এইখানে সারারাত তোমাকে দাঁড় করিয়ে রাখব।”
রিশু প্রশ্ন করে, “কেন বাবা কি করলাম আবার?”
ঝিনুক হটাত এক দৌড়ে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে ওর মুখের সামনে দরজা বন্ধ করে দিয়ে খিলখিল করে হেসে বলে, “সিকিউরিটি চেকের পরে আমাকে ওইভাবে ছেড়ে যাওয়ার শাস্তি।”
নিস্তব্ধ নিঝুম রাতের নীরবতা ভঙ্গ করে সুন্দরী ললনার ফর্সা পায়ের নুপুরের নিক্কন সারা ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়, সেই নুপুরের আওয়াজ সোজা রিশুর হৃদয়ে শক্তিশেলের মতন বিঁধে যায়। রান্নাঘরের দরজা খুলে দেখে ওর রূপসী ললনা শোয়ার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ওর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। মিটিমিটি হাসি নিয়ে তাকিয়ে যেন কিছু বলতে চাইছে, আসবে নাকি ওই রান্নাঘরেই দাঁড়িয়ে থাকবে। রিশু মুচকি এক হাসি ধির পায়ে রূপসী ললনার দিকে পা বাড়ায়, গুটিগুটি পায়ে যেন এক সিংহ তার সিংহীর দিকে মিলনেচ্ছুক হৃদয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে। মনে মনে প্রমাদ গোনে ঝিনুক, রক্তে লেগেছে শুরার নেশা সেই সাথে চোখের তারায় প্রেমে বিভোর হওয়ার উন্মাদনা। রিশু যতই ওর দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসে, ততই ঝিনুক এক পা এক পা করে পিছিয়ে যায়। নুপুরের নিক্কন, প্রেয়সীর নধর দেহপল্লবের উন্মত্ত ঘ্রাণ আর মদালসা ছন্দের মত্ত চলনে রিশুর বুকের ভেতর রক্ত এলোপাথাড়ি ছোটাছুটি শুরু করে দেয়।
ঝিনুক দুষ্টুমি করে বিছানায় উঠে গলা পর্যন্ত লেপ টেনে খিলখিল করে হেসে বলে, “আর একদম কাছে আসবে না।”
বিছানার ওপরে দুই হাতে ভর দিয়ে ঝিনুকের দিকে ঝুঁকে পরে রিশু। ডান হাতের মুঠোতে লেপের এক কোনা ধরে একটু টান মেরে বলে, “আমাকে শুতে দেবে না?”
গোলাপি জিব বের করে নাক কুঁচকে রিশুকে ভেঙ্গিয়ে বলে, “তুমি তো নিশাচর প্রাণী, তোমার ঘুমের কিসের দরকার।”
হেসে ফেলে রিশু, “কে বলেছে আমি নিশাচর প্রাণী?”
নিচের ঠোঁট দাঁতে কেটে চোখের তারায় দুষ্টু মিষ্টি হাসি মাখিয়ে বলে, “কেন রোজ রাতে খাওয়ার পরে কত রাত পর্যন্ত ল্যাপটপে বসে কি সব কর যে? তুমি কি ভাবো আমি কিছু জানি না?”
সত্যি কোনদিন খেয়াল করেনি রিশু, রাতে খাওয়ার পরে ওর পড়াশুনা, ক্যালিফোর্নিয়ায় ওর একজন ডাক্তার বন্ধুর সাথে আজকাল রাতে ভিডিও কল করে নতুন পেপারের আলোচনা করতে হয়, সেই করতে করতেই অনেক রাত হয়ে যায়। ভুরু কুঁচকে ঝিনুককে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তার মানে রাতে না ঘুমিয়ে আমার ওপরে চর গিরি কর।” বলেই হেসে ফেলে।
মাথা নাড়ায় ঝিনুক, “নো নো নট দ্যাট, তবে রাতে ঘুম না এলে কি করবো? তাই মাঝে মাঝে উঠে তোমার ঘরে উঁকি মেরে দেখি তুমি কি করছ।”
হেসে ফেলে রিশু, “আচ্ছা এটা দেখতে চাও যে আমি রাতে কার সাথে ভিডিও কল করছি।” ওর চোখ চলে যায় ঝিনুকের গোলাপি ফোলা নরম গালের ওপরে, খুব কাছ থেকে না দেখলে আঁচড়ের দাগ আর বোঝা যায় না। ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে ঝিনুকের নরম গাল ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন করতে গিয়েছিলে?”
সেই দিনের কথা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই চোখ ফেটে জল চলে আসে ঝিনুকের। দয়িতের ভালোবাসার উষ্ণ পরশে ঝিনুকের মোমের হৃদয় গলে যায়, ধরা গলায় বলে, “তুমি জানো দ্যাট সন অফ বিচ জঘন্য ভাবে আমার গালের ওপরে জিব দিয়ে চেটেছিল।”
কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই চরম ক্রোধে রিশুর মাথার রক্ত গরম হয়ে যায়। লেপ ছেড়ে বিছানায় উঠে ঝিনুকের মাথা বুকের ওপরে চেপে ধরে বলে, “আর সেই সব মনে করতে হবে না…”
রিশুর প্রসস্থ ছাতির উষ্ণ পরশে ভেঙ্গে পরে ঝিনুক, দুই হাত দিয়ে রিশুকে জড়িয়ে ধরে বুকের ওপরে ভেঙ্গে পরে “আমাকে কেউ ভালবাসেনা জানো, নো ওয়ান লাভস মি।”
ঝিনুক কে বুকের ওপরে জড়িয়ে ধরে বিছানায় আধাশোয়া হয়ে রিশু ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে, “আমি তোমায় ভালোবাসি ঝিনুক।”
রিশুর বুকের ওপরে লুটিয়ে পরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে চোখের সামনে ফুটে ওঠা সেই বিভীষিকাময় সন্ধ্যের বিবরন দেয়, “তুমি জানো, আমাকে কি ভাবে ডিচ করেছে ওই শয়তানটা? পার্টি করার নাম করে সেদিন আমাকে ওর এক বন্ধুর ফ্লাটে ডেকে নিয়ে গেল। এর আগেও অনেকবার পরেশের ফ্লাটে গিয়ে পার্টি করেছি। তুমি জানো ও আমাকে খুব করে মদ খাওয়াত জানো, আই গট এডিক্টেড।” কথা গুলো শুনে ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠে রিশু। ঝিনুক থামে না, “জানি না কেন ওই শয়তানটার জন্য অত পাগল হয়েছিলাম। মা বাবার কথা অমান্য করে সেদিন ওর সাথে দেখা করতে চলে গিয়েছিলাম। আমাকে মদ খাওয়াল তারপরে আমাকে জোর করে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে আমাকে রেপ করতে…”
ধর্ষণের কথা কানে যেতেই রিশুর মনে হল কেউ যেন ওর কানের ওপরে গরম লাভা ঢেলে দিয়েছে। এই পার্থ কে উচিত শিক্ষা দিতেই হবে, ওর ঝিনুকের চোখের জলের দাম ওকে দিতেই হবে। অনায়াসে এই ইতর মানুষটাকে ছেড়ে দেবে না রিশু। ঝিনুকের মুখের ওপরে আঙ্গুল চেপে শান্ত করে বলে, “আই প্রমিজ দ্যাট আই উইল এভেঞ্জ দিস।”
ঝিনুক ওর বুকের ওপরে মাথা গুঁজে এক নাগারে কেঁদে চলে, “নো ওয়ান লাভস মি…”
ঝিনুকের চিবুকে আঙ্গুল দিয়ে নিজের দিকে তুলে ধরে বলে, “এই পাগলি আমি তোমার সাথে আছি তো।”
ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে বলে, “নট ইউ। দশ বছর আগে বাবার ট্রান্সফার হল কোলকাতায়। রানীগঞ্জের সব বন্ধু বান্ধবী ছেড়ে আসতে আমার ভীষণ খারাপ লেগেছিল, কিন্তু কিছুই করার ছিল না। আমার খুব নাচের শখ ছিল জানো। আমার মামতো দিদি রুহি খুব সুন্দর নাচতে জানে, শান্তিনিকেতন থেকে নাচে বি মিউজ করেছে। রুহিদিকে দেখে আমারও শখ হয়েছিল যে আমিও নাচ শিখবো। কিন্তু যেহেতু আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার, আমার পিসতুতো দাদা আর দিদি দুইজনেই ইঞ্জিনিয়ার তাই আমাকেও বলা হল যেন আমি সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা করি। আমি মাকে কত করে বললাম যে আমি শান্তি নিকেতনে নাচ নিয়ে পড়াশুনা করতে চাই। কেউ শুনলো না, মা আমাকে শাসিয়ে বললে যে নাচে ভবিষ্যৎ নেই, জীবন নেই, এই সিনেমা টিভিতে হয়ত নেচে বেড়াতে হবে। যখন আমাকে নাচ শিখতে দেওয়া হল না তখন আমি বেপরোয়া হয়ে গেলাম। উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট আর করলাম না।” রিশুর বুকের ওপরে আবার আছড়ে পরে কেঁদে ফেলে, “আমি খুব বাজে মেয়ে রিশু… আমি খুব খারাপ মেয়ে…”
শরীরের শেষ শক্তি টুকু নিঙরে দুই হাতের মধ্যে জড় করে ঝিনুককে বুকের ওপরে জড়িয়ে ধরে রিশু, “কে বলেছে তুমি বাজে মেয়ে?” ওর চোখের জল মুছিয়ে মাথায় ঠোঁট চেপে ধরে স্বান্তনা দিয়ে বলে, “কোন বড় কার্যসিদ্ধি করে অহংকারী হওয়ার চেয়ে নিজের ভুল শুধরে বিনম্র নিরহঙ্কার হওয়া অনেক ভালো।”
কথাটা শুনে কান্না ভুলে রিশুর দিকে মুখ তুলে তাকায় ঝিনুক, “হু আর ইউ?”
ঝিনুকের নাকের ওপরে নাক ঘষে আদর করে বলে, “তোমার ঘুড়ির লাটাই।”
রিশুর বুকের কাছে সরে এসে ওর বাম বাজুর ওপরে মাথা রেখে চুপ করে চোখ বুজে নেয় ঝিনুক। রিশুর শরীরের তাপে ঝিনুকের বুকের মাঝে প্রশান্তির ছায়া নেমে আসে, চোখের পাতা ভারি হয়ে যায়। শরীরের ছোঁয়া এর আগেও পেয়েছিল ঝিনুক কিন্তু সেই পরশে এই ভালোবাসা ছিল না। রূপসী প্রেয়সীর নধর দেহটাকে ডান হাতে জড়িয়ে বুকের কাছে টেনে আনে রিশু। পানপাতার আকারের মুখবয়াবের দিকে নিস্পলক তাকিয়ে থাকে রিশু, কেমন চোখ বুজে ওর বুকের কাছে কুঁকড়ে চোখ বুজে শুয়ে। প্রেয়সীর বুকের বেদনা অনুভব করতে চেষ্টা করে, কোন মানুষ জন্মেই উশ্রিঙ্খল হয় না, পরিস্থিতি মানুষকে কখন কোন পথে নিয়ে যাবে কেউ জানে না। এরপর থেকে যথা সম্ভব চেষ্টা করবে প্রেয়সীর চলার পথ কন্টকমুক্ত করতে। রিশুর বুকের ওপরে হাত রেখে এক সময়ে নিদ্রাদেবীর কোলে ঢলে পরে ঝিনুক। এক বিছানায় একটা লেপের তলায় একে অপরকে নিজ নিজ বাহুপাশে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ধরে ওরা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সেটা আর ওদের খেয়াল নেই।

=================== পর্ব সাত সমাপ্ত ===================

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment