শেষের পাতায় শুরু [পর্ব ৯][২]

Written by Pinuram

শোয়ার ঘরের মধ্যেই পাঁচ জন সুন্দরীর জটলা। রূপসীরা যতক্ষণ পোশাকে ব্যাস্ত ততক্ষন শালিনীর আনা হুইস্কির শেষ অংশটুকু একটা গ্লাসে ঢেলে শেষ করে ফেলে ইন্দ্রজিৎ। মুখের সাজ চুলের সাজ আগে থেকেই করা ছিল, বাকি ছিল শুধু জামা আর জুতো পরা। পাঁচজন সুন্দরীকে দেখে ইন্দ্রজিৎ হেসে ফেলে।
শালিনী পরনে একটা হাল্কা নীল রঙের বেশ লম্বা বিশাল ঘেরের কাঁধ বিহীন ইভিং গাউন। ঘেরের ওপরে অসংখ্য ছোট ছোট রূপোলী ফুল ভর্তি। মাথার চুল পেছনে একটা খোঁপায় বাঁধা, পোশাকের রঙের সাথে মিলিয়েই ওর চোখের সাজ, চোখের পাতার ওপরে হাল্কা করে গাড় নীল রঙের আইশ্যাডো, চোখের কোনায় কাজল, ঠোঁট জোড়া লাল রঙের। কানে গলায় সোনার দুল, ঠান্ডার জন্যে গায়ে একটা ভারী জ্যাকেট চড়িয়ে নিয়েছে, অবশ্য সেটা হোটেলে গিয়ে খুলে ফেলবে। বাম হাতের অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে একটা সলিটেয়ার, বিয়ের পরে ইন্দ্রজিৎ উপহার দিয়েছিল।
বিশেষ করে নিজের স্ত্রী, শালিনীকে দেখে বুকের বাঁ দিকে একটা কিল মেরে বলে, “চাক্কু ছুরিয়া তেজ করালো। মার হি ডালোগে…”
শালিনী একটু লজ্জা পেয়ে হেসে বলে, “ধ্যাত, পাগলা।”
ইন্দ্রজিতের ওই ভাবে বুকের ওপরে কিল মারাতে হেসে ফেলে ঝিনুক, “উফফ পারি না।”
ঝিনুকের পরনে একটা হাঁটু পর্যন্ত কাঁধ বিহীন বারগেন্ডি রঙের ছোট পার্টি পোশাক। ঝিনুকের নধর দেহপল্লবের পরতে পরতে ত্বকের মতন লেপটে। পীনোন্নত স্তন অর্ধেক ঢেকে দুই নধর পুরুষ্টু জঙ্ঘার মাঝ দীর্ঘ পর্যন্ত এসে শেষ হয়ে গেছে। মাথার চুল একপাশে করে আঁচড়ানো, চোখের পাতায় লালচে আইশ্যাডো, চোখের কোনায় কাজল, দুই মিষ্টি অধর একটু গাড় লালে রাঙ্গানো। দুই উদ্ধত পীনোন্নত স্তন যুগল ভীষণ ভাবেই সামনের দিকে উঁচিয়ে, পোশাক ফাটিয়ে ঠিকরে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। ফর্সা মসৃণ উপরিবক্ষ ভীষণ ভাবেই মসৃণ, গভীর বক্ষবিদলনের অনেকটাই সেই ছোট পোশাক ঢেকে রাখতে পারছে না। মরালী গর্দানে রিশুর দেওয়া সোনার হার, দুই পীনোন্নত স্তনের খাঁজে দুলছে মুক্তোর লকেট। ফর্সা পায়ে থাই হাই বুট, গায়ে ঘিয়ে রঙের একটা ভারী জ্যাকেট। বাম হাতের কব্জিতে মোটা একটা ক্রিস্টালের ব্রেসলেট, দুই কানে আয়তাকারের ক্রিস্টালের কানের দুল। শালিনীকে দেখে ঝিনুকের অবচেতন মনের মধ্যে একটু হিংসে হয়েছিল, নীল রঙের গাউনটা ভীষণ সুন্দর দেখতে আর শালিনীর নম্র শালীন চরিত্রের সাথে একদম খাপ খেয়ে যেন পোশাকটা তৈরি। বিয়ের আগে এইসব পোশাকে কোনদিন রুচি ছিল না, ওর কাছে পার্টি করার পোশাক মানেই ছোট পোশাক হাঁটুর অনেক ওপরে যা শেষ হয়ে যাবে। শুধু মাত্র যে টুকু ঢেকে রাখার সেইটুকু ঢাকা থাকবে, এমন পোশাক পছন্দ ছিল।
রিতিকা ঝিনুকের কাঁধে আলতো ধাক্কা মেরে বলে, “তুই কম কিসে রে?”
ঝিনুক রিতিকার থুঁতনি নাড়িয়ে মুচকি হেসে বলে, “কলেজের দিন গুলো মনে পরে যাচ্ছে রে।”
রিতিকার পরনে রূপোলী রঙের হাত বিহীন নুডুল স্ট্রাপের ছোট চাপা বডিকন ড্রেস, দুই পুরুষ্টু জঙ্ঘার অধিকাংশ অনাবৃত, কোন রকমে নধর নিটোল নিতম্ব জোড়া ঢাকতে সক্ষম ওর পোশাক। পুরুষ্টু দুই নধর মোটা মসৃণ জঙ্ঘার অধিকাংশ অনাবৃত। সামনের দিকে বক্ষের কাছে অনেকটাই কাটা আর গভীর, বক্ষ বিদলনের অনেকাংশ অনাবৃত, পিঠের দিকের অধিকাংশ অনাবৃত। রূপোলী রঙের পোশাকের সাথে মিলিয়ে চোখের পাতায় কালচে আর রূপোলী রঙের আইশ্যাডো, মিষ্টি পুরু ঠোঁট জোড়া কালচে লাল রঙে রঞ্জিত। হাতে গলায় ছোট ছোট পাথরের হার আর ব্রেসলেট, দুই কানে লম্বা চেনের কানের দুল।
ঝিলিক দুই দিদিকে দেখে হেসে বলে, “উফফ তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে সেই কলেজেই আছো।”
শালিনী ঝিলিককে দেখে বলে, “তুই আর দিয়া তো মনে হচ্ছে ড্যান্স ফ্লোরে আগুন লাগিয়ে দিবি।”
দিয়া মুচকি হেসে বলে, “তুমি আর বল না। তুমি তো দাদাভাইয়ের বিয়েতে একটুও নাচলে না।”
দিয়ার পরনে একটা হাতা ওয়ালা ছোট সিকুইন নীল রঙের বডিকন পোশাক। হাতা দুটো থাকলেও না থাকার মতন, কাঁধ থেকে কুনুই পর্যন্ত সরু সরু সুতোয় ভর্তি। তরুণী তন্বী সপ্তদশী সুন্দরীর চোখের পাতায় নীলচে রঙের আইশ্যাডো, চোখের কোলে একটু কাজল টেনে চোখ দুটো একটু টানাটানা করে আঁকা। কানে আর হাতে দাদার কিনে দেওয়া ওর পছন্দের ক্রিস্টালের গয়না। গলায় একটা চাপা কালো রঙের চোকার আর কন্ঠির কাছে একটা বেশ বড় ক্রিস্টালের ব্রোচের মতন। নরম গোলাপি ঠোঁট জোড়া হাল্কা লাল রঙে রঞ্জিত।
হেসে ফেলে শালিনী, “ভাইয়া আর সেই ভাবে বিয়ে করল কই।” ঝিনুকের থুঁতনি নাড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলে, “টুক করে উড়ে গেলো আর টুক করে ঝিনুক তুলে নিয়ে পালিয়ে চলে এলো। কত ইচ্ছে ছিল ভাইয়ার বিয়েতে নাচবো, সেটা আর হল না।” ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি তোমার দিদির বিয়েতে নাচলে না কেন?”
ঝিলিক ম্লান হেসে বলে, “তখন আর সেই মুড ছিল না।” তারপরে চকচকে চোখে বলে, “আজ ফাটিয়ে দেব, কিন্তু জিজু নেই।” বলেই একটু আক্ষেপ করে।
তন্বী রূপসী ঝিলিকের পরনে একটা ছোট চাপা কালো রঙের স্কারট আর ওপরে একটা চাপা রূপোলী রঙের টপ। ঝিলিকের ফর্সা ত্বকের সাথে স্কারট আর টপটা দারুন ভাবেই মানিয়েছে। হাত কাটা টপটা বেশ ছোট, নব পল্লবিত স্তন জোড়া ভীষণ ভাবেই সামনের দিকে উঁচিয়ে। ঝিলিকের নধর একটু মাংসল পেটের একটু খানি ঢাকতে সক্ষম। টপের নিচ থেকে ঈষৎ ফোলা পেটের মাঝে গভীর সুগোল নাভি মাঝে মাঝেই উঁকিঝুঁকি মারে। চাপা স্কারট শুধু মাত্র কচি তন্বী তরুণীর নিতম্ব জোড়া কোন রকমে ঢাকতে সক্ষম। কোমরে একটা পাতলা সোনালী রঙের চেন, ছোট সুগোল নাভির কাছে একটা গিঁট বাঁধা। দুই পায়ে স্বচ্ছ কালচে রঙের স্টকিংস। মাথার চুল দিদির মতন গাড় বাদামি রঙ করা, একপাশ করে আঁচড়ানো। কানে দুটো বড় বড় রিং, গলায় দিয়ার মতন একটা কালো রঙের চোকার। কালো রঙের পোশাকের সাথে মিলিয়ে দুই চোখের পাতায় কালো রঙের আইশ্যাডো, ঠোঁট জোড়া ভীষণ ভাবেই লাল।
ইন্দ্রজিৎ আরো একবার ফোনে রিশুকে ধরার বৃথা চেষ্টা করে ওদের বলে, “মনে হয় বেড়িয়ে পড়েছে, আমাদের বেড়িয়ে পরা উচিত।” ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “আসো শালী সাহিবা” অন্য হাত রিতিকার দিকে বাড়িয়ে বলে, “তুমিও আসো।” স্ত্রী আর ঝিনুকের দিকে দেখে ইয়ার্কি মেরে বলে, “তোমরা তো অলরেডি এনগেজড।” ওর কথা শুনে শালিনী আর ঝিনুক হেসে ফেলে।
দিয়া ইন্দ্রজিৎকে বলে, “আমি তাহলে…”
হেসে ফেলে ইন্দ্রজিৎ, “তুমি তো আদরের বোন, তোমার জায়গা কাঁধে পিঠে মাথায় সব জায়গায়।”
শালিনী সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলে, “এত গুলো একটা গাড়িতে কি করে হবে?”
একটু ভেবে ইন্দ্রজিৎ একটা ট্রাভেল এজেন্সিকে ফোন করে একটা ইনোভা ভাড়া করে নেয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে গাড়ি এসে যায় বাড়ির সামনে। ঝিনুকের মুখ একটু শুকনো তাও সবার সাথে মিলে হাসি মুখেই বেড়িয়ে পরে নাইট ক্লাবের উদ্দেশ্যে।
গাড়িতে বসে ঝিলিক দিয়ার কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, “কিরে মেসেজ করেছিলিস?”
সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলায় দিয়া, “হ্যাঁ করে দিয়েছি।”
ফিক করে হেসে ফেলে ঝিলিক, “দুটো পুরো পাগলা মাল।”
দিয়া মুখ টিপে হেসে বলে, “আরে সেই সকাল থেকেই খুব মেসেজ করছিল রে। মিসিং ইউ বেবি, কখন দেখা করবে।”
ঝিলিকও হেসে বলে, “আমাকেও। আই লাভ ইউ, ইউ আর টু সেক্সি, এই সব।”
দুই বান্ধবী হেসে ফেলে দিয়া ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আমরা তো ফাইভ স্টারে যাচ্ছি, ওরা আসবে তো?”
ঝিলিক চোখ টিপে হেসে বলে, “হাতে ধরে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে আসবে দেখিস।” হাসিতে ফেটে পরে দুই তন্বী সপ্তদশী তরুণী।
একদম সামনের সিটে ইন্দ্রজিৎ বসে ছিল, ঘাড় ঘুরিয়ে ঝিনুককে বলে, “তুমি শালা বোকাচোদাকে একটা মেসেজ করে দাও যে আমরা বেড়িয়ে গেছি।”
মেসেজ করতে করতে ঝিনুক একটু ভারাক্রান্ত হয়েই বলে, “এক সাথে থাকলে ভীষণ মজা হত।”
শালিনী মুচকি হেসে বলে, “আরে বাবা চলে আসবে তো এত টেন্সান নিচ্ছ কেন?”
কিছুক্ষনের মধ্যে ওদের গাড়ি হোটেলের সামনে পৌঁছে যায়। ফ্রন্ট ডেস্কে গিয়ে শালিনী সুজিত বাবুর নাম নিতেই ফ্রন্ট ডেস্কের মেয়েটা ফোন করে দেয় সুজিত বাবুকে। সুজিত বাবু সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে এসে ওদের সাথে দেখা করে। সুজিত বাবু জানায় যে বছরের শেষ দিনে হোটেলে প্রচুর লোকজন তাই নিজে থেকে শালিনীদের দেখাশোনা হয়ত করতে পারবেন না, তবে একটা মেয়ে এটেন্ডেন্টকে ডেকে সব কিছু বুঝিয়ে দেন। শালিনীও মাথা দুলিয়ে শায় দেয়, বোঝে এত বড় একটা হোটেলের ম্যানেজারের কাঁধে অনেক ভার। এটেন্ডেন্ট ওদের নিয়ে একটা বড় হলের মধ্যে নিয়ে যায়। দরজা খুলতেই ভীষণ জোরে হিন্দি গানের আওয়াজ ওদের কানে ভেসে আসে। বছরের শেষ দিনের পার্টি উপলক্ষে একটা বিশাল ব্যাঙ্কুয়েট হল কে নাইটক্লাবের মতন করে সাজানো হয়েছে। একদিকে নাচের জন্য একটা জায়গা তৈরি, তার সামনেই একটা টেবিলের ওপরে বিভিন্ন যন্ত্র রেখে একজন ডিজে উচ্চ শব্দে বিভিন্ন গান চালিয়ে ছেলে মেয়েদের মনোরঞ্জন করে চলেছে। ডান্স ফ্লোরে বিভিন্ন বয়সের ছেলে মেয়েরা নর নারীরা উদ্দাম নাচে মত্ত। গানের শব্দ কানে যেতেই মেয়েদের পা নেচে ওঠে। এটেন্ডেন্ট কোনার দিকে একটা বেশ বড় টেবিলে ওদের বসতে বলে, ফ্লোর ম্যানেজারের কানে কানে কিছু একটা বলে গেল। গানের জোর শব্দে কেউ কারুর কথা শোনার মতন অবস্থায় থাকে না। বেয়ারা ওদের এসে ড্রিঙ্কের কথা জিজ্ঞেস করতেই সবাই হুইস্কির অর্ডার দেয়। ফ্লোর ম্যানেজার নিজে এসে ওদের খাবারের কথা জিজ্ঞেস করাতে ঝিনুক বলে, পরে অর্ডার দেবে।
দিয়া ইন্দ্রজিতের চিকে তাকাতেই মুচকি হেসে ইন্দ্রজিৎ ওকে বলে, “তোর দাদা না আসা পর্যন্ত যা পারছিস মেরে দে।” ইন্দ্রজিতের কথা শুনে সবাই হেসে ফেলে।
প্রচন্ড শব্দের জন্য কথা শোনা দায় তাই শালিনী ইন্দ্রজিতের কানে কানে বলে, “ভাইয়াকে একবার ফোন করে দেখো।”
খুব তাড়াতাড়ি বাইক চালিয়ে বাড়িতে ফেরে রিশু। ওপিডি করতে করতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল, ভেবেছিল বাড়ি ফিরে একটু ঘুমিয়ে তারপরে সবার সাথে নাইটক্লাবে আসবে একটু মজা হই হুল্লোড় করতে। সেই কলেজে থাকাকালীন ইন্দ্রজিৎ আর কয়েকজন বন্ধুদের সাথে বেশ কয়েকবার ডিস্কোথেক আর পাবে গিয়েছিল। এম এস করার পর থেকে কোনদিন কোন পাবে অথবা নাইটক্লাবে যায়নি। দুষ্টু মিষ্টি রূপসী স্ত্রীর আগমনে ওর জীবন এক ভিন্ন খাতে বয়ে চলেছে।
ওপিডি শেষে বেড়িয়েই যেত কিন্তু তখন এমারজেন্সি থেকে ডাক পরে। বছরের শেষ তাই অনেক ডাক্তার ছুটিতে ছিল অথবা অনেকে হাফ ডে করেই চলে গেছে। অগত্যা রিশুকেই সেই অপারেশান করতে হয়। বেশি বয়স নয় ছেলেটার এই বাইশ তেইশ হবে, পোশাক দেখে খুব একটা স্বচ্ছল বাড়ির ছেলে বলে মনে হয় না। হয়ত কোন দোকানে কাজ করে। বাইকে করে হয়ত কোথাও যাচ্ছিল, পেছন থেকে একটা গাড়ি এসে ধাক্কা মারে। হাঁটুর ওপর দিয়ে চাকা চলে যাওয়াতে পাটেলা আর মেডিয়াল কন্ডাইল একদম গুঁড়িয়ে গেছে, টিবিয়া ফিবুলা দুটোতেই কম্মিনিউটেড ফ্রাকচার। এই দৃশ্য রোজদিন প্রায় দেখতে হয় ওকে। তবে ওর ব্যাথাটা অন্য জায়গায়, অপারেশান করার জন্য ওটি তে ঢুকতে যাবে তখন ওর পা দুটো জড়িয়ে ধরে ছেলেটার বিধবা মা হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। ডাক্তার বাবু মেরে বচ্চে কো বাঁচা লিজিয়ে, মেরা এক হি বেটা হ্যায় আউর মেরা কোই নেহি হ্যায়। কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটার মা তার হাতের কয়েক গাছা সোনার চুড়ি ওর দিকে এগিয়ে দিয়েছিল, মেরে বচ্চে কো বাঁচা লিজিয়ে ডাক্তার বাবু। এমনিতে ওটিতে যাওয়ার আগে কোন রুগীর কোন আত্মীয়র সাথে রিশু দেখা করে না, তবে কি ভাবে যেন ওই ছেলেটার মা সেই জায়গায় কাঁদতে কাঁদতে ঢুকে পড়েছিল। প্রান হানির আশঙ্কা নেই তবে টানা তিন ঘন্টা যুদ্ধ করে ছয় খানা স্ক্রু আর দুই পায়ে চারখানা প্লেট লাগিয়ে জোড়া লাগিয়েছে। অপারেশান থেকে বেড়িয়ে ছেলেটার মাকে জানিয়ে দেয় যে তাঁর ছেলে বেঁচে যাবে। রিশুর গালে মাথায় হাত বুলিয়ে বুক ভরা আশীর্বাদ করেন সেই মধ্যবয়সী মহিলা। ভীষণ ভাবেই তখন মায়ের কথা মনে পরে যায় রিশুর।
বাড়ি ফিরে স্নান সেরে বেড়িয়ে ফোন তুলে দেখে ঝিনুকের ইন্দ্রজিতের প্রচুর মিস কল। মৃদু হেসে মাথা দুলিয়ে সব থেকে আগে মাকে ফোন করে রিশু, “কি করছ?”
আম্বালিকা টিভিতে একটা সিরিয়াল দেখতে ব্যাস্ত ছিল তখন। এই অসময়ে ছেলের ফোন পেয়ে চমকে যায়, “তুই পার্টিতে এখন যাস নি? দিয়া বলল তোর…”
মৃদু হেসে উত্তর দেয় রিশু, “হ্যাঁ একটা এমারজেন্সি ছিল তাই দেরি হয়ে গেল। এই তো স্নান হয়ে গেছে, এবারে জামা কাপড় পরে বেড়িয়ে যাবো।”
ছেলের গলা শুনে জিজ্ঞেস করে, “আজকে তোকে খুব টায়ার্ড মনে হচ্ছে? কি হয়েছে?”
মৃদু হাসে রিশু, “না এই আর কি, সারাদিন ওপিডি তারপরে আবার একটা এমারজেন্সি ওটি ছিল তাই।”
আম্বালিকা একটু হেসে স্নেহ ভরা কন্ঠে বলে, “লন্ডন থেকে ফিরে কয়েক দিনের জন্য বাড়িতে আসিস।”
মায়ের গলা শুনে গলা ধরে আসে রিশুর, “দিয়ার সাথে তুমি ও তো আসতে পারতে?”
আম্বালিকা মৃদু হেসে বলে, “জানিস তো তোর পাপা আজকাল একটু কেমন হয়ে গেছে।”
গত গ্রীষ্মে পাপার ছোট একটা এটাক হওয়ার পরে পাপাকে একা রেখে ওর মা বেশি দিন ওর কাছেও থাকে না। রিশু বলে, “পাপাকেও নিয়ে আসতে।”
কারণ ওর অজানা তবে ওর পাপা খুব কম, বিগত দশ বছরে শুধু মাত্র তিন বার দিল্লীতে ওর বাড়িতে এসেছিল। বাড়ি গেলেই অনেকবার বলে পাপাকে দিল্লী যেতে বলে, প্রত্যেক বার পাপা বলে আসবে কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাজের আছিলায় কোনদিন আসেনি। মাকে জিজ্ঞেস করলেও কোনদিন তার সঠিক উত্তর মেলেনি।
মৃদু হাসে আম্বালিকা, “তোর ওইদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
মায়ের সাথে কথা বলার পরে, ঝিনুককে ফোন করতে চেষ্টা করে, অনেক বার ফোন বেজে যায় কিন্তু ফোন তোলে না দেখে শেষ পর্যন্ত একটা মেসেজ করে জামা কাপড় পরে বেড়িয়ে পরে। ইচ্ছে করেই বাইক নেয় না রিশু, একটা ট্যাক্সি করেই যাত্রা করে হোটেলের দিকে।
ঠিক তখন ইন্দ্রজিতের ফোন আসে, “এই বোকাচোদা কোথায় তুই?”
রিশু হেসে বলে, “আসছি রে আসছি।” ওর কানে উদ্দাম সঙ্গীত উচ্চ আওয়াজ ভেসে আসে। ইন্দ্রজিতকে জিজ্ঞেস করে, “কি অবস্থা?”
ইন্দ্রজিৎ হেসে উত্তর দেয়, “সব বিন্দাস, তুই তাড়াতাড়ি আয়।” গলা নামিয়ে মুচকি হেসে বলে, “সব ফুলঝুরি আজকে বে।”
কথাটা শুনে হেসে ফেলে রিশু। হোটেলে পৌঁছে ফ্রন্ট ডেস্কে সুজিত বাবুর নাম নিতেই ওকেও একজন ছেলে এসে ওকে নিয়ে ক্লাবের জায়গায় নিয়ে যায়। দরজা খুলতেই কানে ভেসে আসে খুব জোর গানের আওয়াজ। হলের ভেতর অন্ধকার, ছেলেটা একজনকে ইশারা করতেই ফ্লোর ম্যানেজার এগিয়ে এসে ওকে নিয়ে যায় কোনার টেবিলে যেখানে সবাই বসেছিল। এমনিতেই নাইট ক্লাবের ভেতরে বিশেষ আলো ছিল না, তবে মৃদু আলোতেই আর নানা ধরনের আলোর ঝলকানিতেই মেয়েদের দিকে তাকিয়ে দেখে। বিশেষ করে রূপসী স্ত্রীর পোশাকের বহর দেখে মনে মনে হেসে ফেলে। রূপসী লাস্যময়ী ললনার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে ইশারায় বলে, দারুন লাগছে। শালিনীর দিকে তাকিয়ে একটু মাথা নোয়ায় রিশু, ভারী সুন্দরী লাগছে শালিনীকে। ইন্দ্রজিৎ ওকে টেনে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করাতে এক্সিডেন্টের কথাটা বলে। ঝিনুক, শালিনী আর ইন্দ্রজিতের হাতে মদের গ্লাসে দেখে রূপসী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। নাক কুঁচকে আদর করে উত্তর দেয় ঝিনুক, এই একটু খানি ব্যাস। ফ্লোর ম্যানেজার ওদের কাছে এসে রিশুকে ড্রিঙ্কের কথা জিজ্ঞেস করাতে রিশু জানায় টেরাগো জিন লেমোনেড নেবে দুটো অলিভ একটু স্টিয়ার করে। ঝিনুক ভুরু কুঁচকে তাকায় ওর ড্রিঙ্কের কথা শুনে, রিশু মুচকি হেসে বলে, হুইস্কি ওর সয় না।
রিতিকা, দিয়া আর ঝিলিক ততক্ষনে নাচের জায়গায় নাচতে চলে গেছে। দিয়ার সাথে একটা ছেলেকে নাচতে দেখে সেই সাথে ঝিলিকের পাশেও একটা ছেলেকে নাচতে দেখে রিশু। রিতিকা নিজের খেয়ালে এক হাতে মদের গ্লাস নিয়ে ওর দিকে তাকিয়েই নধর লাস্যময়ী দেহবল্লরি তরঙ্গায়িত করে এগিয়ে আসে।
ওকে দেখে রিতিকা মুচকি হেসে বলে, “এতক্ষনে তোমার সময় হল?”
রিশু মুচকি হেসে বলে, “হ্যাঁ, তা কেমন এঞ্জয় করছ?”
রিতিকা হাতের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলে, “একদম ফাটাফাটি, চলো চলো ড্যান্স ফ্লোরে…” বলে ওর দিকে কোমল হাত বাড়িয়ে দেয়।
রিতিকার মদির আঁখিতে নেশার রঙ ধরে গেছে সেটা ঝিনুকের বুঝতে অসুবিধে হয় না, তাই রিতিকাকে বিরত করে বলে, “তুই চল আমরা এই আসছি।”
ইন্দ্রজিৎ রিতিকার দিকে এক হাত বাড়িয়ে অন্য হাতে মদের গ্লাস নিয়ে বলে, “আরে সুন্দরী আমি আছি তো।”
ইন্দ্রজিৎ আর রিতিকা হাতে হাত রেখে ড্যান্স ফ্লোরের দিকে চলে যায় নাচতে নাচতে।
ঝিনুক ওর গা ঘেঁষে বসে বলে, “তোমার কি হয়েছিল?”
ড্রিঙ্কে একটা ছোট চুমুক দিয়ে রূপসী স্ত্রীর গায়ের গন্ধে নিজেকে মাতাল করে তুলে মুচকি হেসে বলে, “এমারজেন্সি ছিল আর কি, এই তো এসে গেছি।”
ঝিনুক আদর করে আবদার করে, “চলো না প্লিজ একটু নাচবো।”
হেসে ফেলে রিশু, তর্জনী দিয়ে ঝিনুকের লালচে নাকের ডগায় আলতো করে বুলিয়ে আদর করে বলে, “তুমি এঞ্জয় কর, আমি ততক্ষনে এই লেমোনেড শেষ করি।” বলে প্রেয়সীর মিষ্টি লাল নরম ঠোঁটে আলতো করে আঙ্গুল বুলিয়ে দেয়।
হাতের গ্লাস শেষ করে ঝিনুক রিশুর চোখের ভেতরে গভীর ভাবে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, “আমি সত্যি যাবো তো?”
মাথা দোলায় রিশু, “হ্যাঁ বাবা যাও। তুমি এঞ্জয় কর কোন আপত্তি নেই।”
অনেকক্ষণ ধরেই ভীষণ ভাবে নাচতে ইচ্ছে করছিল ঝিনুকের। সারা অঙ্গে ঢেউ তুলে নাচতে নাচতে এগিয়ে যায় ড্যান্স ফ্লোরে।
রিশু শালিনীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে, “তোমার কি হল আজকে?”
শালিনী রিশুর পাশে এসে হাতের গ্লাসে ছোট চুমুক দিয়ে মুচকি হেসে বলে, “এই ড্রেস পরে নাচা যায় নাকি?”
রিশু হেসে ফেলে, “এই গাউন কে পড়তে বলেছিল তোমাকে?” বাকিদের দিকে দেখিয়ে বলে, “ওরা দেখো কি সব ড্রেস পরে এসেছে আর তুমি ইংল্যান্ডের মহারানী সেজে বসে আছো।”
মৃদু হাসে শালিনী, “ভাইয়া প্লিজ, ইউ নো দ্যাট…”
মৃদু হাসে রিশু, শালিনী একজন ডাক্তার, পেশার সাথে সাথে এই হোটেলের ম্যানেজার ওর চেনাশোনা। ছোট পোশাকে একজন নিওন্যাটোলজিস্ট কে মানায় না সেটা বোঝে রিশু।

প্রভাত দিয়ার চোখে চোখ রেখে কোমর ধরে গানের তালে তালে নেচে চলেছে। দুটো লারজ হুইস্কি খেয়ে ততক্ষনে দিয়ার চোখ জোড়া লালচে হয়ে গেছে। এর আগে কোনদিন একটা লারজ ও খায়নি দিয়া। মনের আনন্দে দিয়া সব কিছু ভুলে উচ্চ গানের সাথে তাল মিলিয়ে মনের আনন্দে নেচে চলেছে। ওর পাশেই শুভেন্দু ঝিলিকের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে জড়িয়ে ধরে নেচে চলেছে। দুই তন্বী তরুণী নেশায় মত্ত সেই সাথে গানের সাথে নেচে নেচে সেই নেশা আরো বেশি যেন করেই যেন নেশাটাকে চাগিয়ে দিয়েছে।
প্রভাত নাচতে নাচতে দিয়ার গালে নাক ঘষে কানে কানে বলে, “হে বেব, ইউ আর টু সেক্সি।”
দিয়া মুচকি হাসে, “ইউ লাইক ইট?”
প্রভাত বলে, “ভেরি হট।”
হেসে ফেলে দিয়া, “আচ্ছা… আর কত জন কে এই ডায়লগ মেরেছ?”
প্রভাতের একটা হাত ওর পিঠের ওপরে ঘাড়ের কাছাকাছি অন্য হাত নেমে গেছে কোমরে, দিয়ার নব অঙ্কুরিত নধর দেহপল্লব নিজের শরীরের সাথে পিষে ধরে নাচতে নাচতে বলে, “রুম বুক করব? যাবে?”
হেসে ফেলে দিয়া, “ধ্যাত, আই স্টিল ডোন্ট নো ইউ।”
প্রভাত মুচকি হেসে বলে, “কি আছে, রুমে গিয়ে বাকি পরিচয় হয়ে যাবে।”
শুভেন্দু ঝিলিকের কোমরে হাত রেখে ওকে ঘুরিয়ে দেয়, একটু নেশা ধরে গেছে ঝিলিকের চোখে। পরপর দুটো লারজ হুইস্কি এই ভাবে এর আগে কোনদিন খায়নি। শুভেন্দু ওর পেটের ওপরে এক হাত বুলাতে বুলাতে ওর উন্নত স্তনের নিচে চলে এসেছে সেটা আর খেয়াল নেই। অন্য হাত ওর নাভির নিচে চেপে ধরে ওর নধর নব অঙ্কুরিত দেহ পল্লব শুভেন্দুর শরীরের সাথে মিশিয়ে ধরেছে। নিটোল দুই নিতম্বের খাঁজে একটা কিছুর ধাক্কা খায় ঝিলিক। উচ্চ গানের তালে তালে নাচে মত্ত ওর শরীর যেন আর ওর আয়ত্তে নেই।
ঘাড়ের কাছে শুভেন্দুর গরম শ্বাস অনুভব করে ঝিলিক মিহি কন্ঠে বলে, “উফফ তুমি না ভীষণ নটি।”
ঘাড়ের ওপরে ঠোঁট চেপে ঝিলিকের পিঠের সাথে বুক মিশিয়ে আদর করে বলে, “ইউ আর টু সেক্সি বেবি।”
নাচতে নাচতেই মুচকি হেসে বলে ঝিলিক, “উফফ তাই নাকি?”
শুভেন্দু ওর নিতম্বে নিজের জানুসন্ধি চেপে ধরে বলে, “হবে নাকি কিছু?”
হেসে ফেলে ঝিলিক, “ইউ আর গোয়িং টু ফাস্ট।”
শুভেন্দু হেসে ফেলে, “জমানা এয়সা হ্যায় বেবি।”
ওদের পাশেই রিতিকা আর ঝিনুক হাত তুলে সারা অঙ্গে ঢেউ তুলে কোমর বেঁকিয়ে নেচে চলেছে। ঝিনুক একটু চেঁচিয়ে দিয়াকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু গানের তীব্র আওয়াজে সেই আওয়াজ ঢাকা পরে যায়। হটাত করে এমন সময়ে দিয়ার কাঁধে একটা শক্ত হাত এসে পড়াতে নাচ থামিয়ে দেয় দিয়া। নেশাগ্রস্ত চোখে ঘাড় ঘুরে তাকাতেই একটা হ্যাঁচকা টান অনুভব করে হাতের ওপরে। একটা বিশাল থাবা প্রভাতকে জোরে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে ওর শরীর থেকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাজু ধরে নাচের জায়গা থেকে টেনে আনে ওর দাদাভাই। প্রভাত কিছু একটা বলতে চেষ্টা করে কিন্তু নাকের সামনে রিশুর ডান হাতের তর্জনী আর চশমার পেছনে আগুন ঝরানো চোখ জোড়া দেখে আর সাহস হয় না। শুভেন্দু ততক্ষনে ঝিলিককে ছেড়ে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে পড়েছে। রিতিকা, ঝিনুক ইন্দ্রজিৎ নাচ বন্ধ করে রিশু আর দিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। দিয়ার হাত ধরে রিশু নাচের জায়গা থেকে টেনে বের করে আনে। ঝিনুকের বুকের মধ্যে দুরুদুরু করা শুরু হয়ে যায়। রিশুর চোখ দেখে ওর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার যোগার হয়। দাদাভাইয়ের চোখ দেখে দিয়ার নেশার ঘোর কেটে যায়, কেউ যেন ওর গলার ওপরে পা দিয়ে পিষে ধরেছে। সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করে দেয় দিয়ার। ঝিলিক দিদির হাত ধরে কুঁকড়ে একপাশে দাঁড়িয়ে। কারুর মুখে কোন কথা নেই।
খুব ঠান্ডা গলায় রিশু দিয়াকে বলে, “বাড়ি চল।”
ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে দিয়া কেঁদে ফেলে, “দাদাভাই আই এম সরি, দাদাভাই।”
হিমশিতল কন্ঠে গর্জে ওঠে রিশু, “বাড়ি চল।” আগুন ঝরানো চোখে ঝিনুক আর ঝিলিকের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে বলে, “আর নাচতে হবে না, অনেক নেচে নিয়েছ।”
কথাটা কানে যেতেই ভীষণ ভাবে ব্যাথা পায় ঝিনুক, কিন্তু রিশুর গলা শুনে ওর বুকের রক্ত শুকিয়ে গেছে। রিতিকা, শালিনী ইন্দ্রজিৎ সবার মুখ থমথমে। কারুর কোন আওয়াজ করার ক্ষমতা নেই। বোনের গায়ে জ্যাকেট জড়িয়ে হোটেলের বাইরে চলে আসে রিশু। ওর পেছন পেছন বাকি সবাই বেড়িয়ে আসে হোটেল থেকে। রাত অনেক, রাস্তায় একটু কুয়াশা হয়েছে, ফাঁকা রাস্তা গাড়ি চলাচল অনেক কমে গেছে। ফুটপাথের ওপরে সবাই দাঁড়িয়ে, একপাশে রিশু আর তার পাশে দিয়া, বাকি সবাই ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে। ল্যাম্প পোস্টের হলদে আলো আর চারপাশের কুয়াশায় ওদের মাঝের টানটান উত্তেজনাকে আরো বেশি করে চাগিয়ে তোলে। সবার চোখে মুখে থমথমে ভাব শুধু মাত্র রিশুর চোখ জোড়া ভীষণ ভাবেই জ্বলছে। রিতিকা কিছুই বুঝতে পারছে না কি ঘটে চলেছে। বাকি সবার চেহারায় হাজার প্রশ্ন, হটাত করে কি হল, রিশু কেন দিয়াকে নাচের জায়গা থেকে টেনে বার করে এনে একদম হোটেল ছেড়ে বেড়িয়ে এলো।
বাইরে বেড়িয়ে ইন্দ্রজিৎ রিশুকে বলে, “কি হয়েছে? তুই এই ভাবে রিয়াক্ট করছিস কেন।”
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হটাত করেই ঠাস করে জোরে একটা আওয়াজ হয়। দিয়ার নরম গালে ব্যাথা শুরু হয়ে যায়, গালে হাত দিয়ে কেঁদে ফেলে দিয়া। দাদাভাই এইভাবে সবার সামনে ওকে চড় মারবে সেটা স্বপ্নেও ভাবেনি।
শালিনী সঙ্গে সঙ্গে দিয়াকে জড়িয়ে ধরে রিশুর দিকে আঙ্গুল তুলে গর্জে ওঠে, “তুমি ওকে মারলে কেন?”
রাগে রিশুর গলা কেঁপে ওঠে, “থাপ্পড়টা মনে হয় অনেক আগেই দরকার ছিল।”
দিয়া শালিনীর বুকের ওপরে মাথা রেখে কেঁদে ফেলে। ইন্দ্রজিৎ ওর হাত ধরে ফেলে, “তোর মাথার ঠিক নেই নাকি? এত বড় একটা মেয়ের গায়ে হাত দিলি?”
সেই সাথে ঝিনুক গর্জে ওঠে, “তোমার সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি তাই না?”
যেভাবে ওই ছেলেটা ওর বোনের গায়ে হাত দিয়েছিল তাতে ওর শরীর জ্বলে উঠেছিল। ছেলেটার ওপরে খুব ঘৃণা হচ্ছিল কিন্তু দিয়ার চোখ মুখের অভিব্যাক্তি দেখে ওর মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। দিয়া প্রশ্রয় না দিলে ওই ছেলেটা নিশ্চয় এতটা সাহস পেত না।
ঝিনুকের চোখে চোখ রেখে চাপা গর্জন করে ওঠে, “কিসের বাড়াবাড়ি? তুমি কি চোখে অন্ধ নাকি? ঝিলিক আর দিয়ার প্রশ্রয় না থাকলে ওই ছেলে দুটো কি ভাবে ওদের গায়ে হাত দেয়?” ঝিলিকের দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তোদের সাথে যে দুটো ছেলে ছিল তারা কে?”
রিশুর ভীষণ জ্বলন্ত চোখ দেখে ঝিলিক ততক্ষনে দিদির হাত জড়িয়ে ধরে পিঠের পেছনে লুকিয়ে গেছে। ওর শরীর ঠান্ডায় নয়, সামনে দাঁড়ানো বাঘের ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে। রিশুর এই অগ্নিশর্মা চোখের অর্থ ধিরে ধিরে সবার সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।
ঝিনুক ওর দিকে ডান হাতের তর্জনী উঁচিয়ে জোরে বলে, “দিলে সব ভেস্তে। থারটি ফার্স্ট নাইটে ছেলে মেয়েরা একটু মজা করবে, তা না। নিজে কর না আর কাউকে দেখলে তোমার সহ্য হয় না।”
ঝিনুকের কথা শুনে শালিনী থমকে যায়, ওর দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বলে ওঠে, “তুমি কি বলছ?”
ঝিনুক থামে না, ওর স্বপ্ন যেন ওর সামনে গুঁড়িয়ে গেছে। একটু স্বাধীনতা চেয়েছিল এই নাকি স্বাধীনতা। চেঁচিয়ে ওঠে রিশুর দিকে, “তোমার কাছে ফ্রিডমের কোন অর্থ নেই। সব জায়গায় দাদাগিরি দেখাতে হবে। তোমার কাছে সময়ের দাম ও নেই…”
শালিনী আর থাকতে না পেরে ঝিনুককে বলে, “ঝিনুক চুপ।”
ঝিনুক ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “চুপ কেন চুপ? এই আজকে, বলল পাঁচটার মধ্যে আসবে কিন্তু দেখো কখন এলো। এমারজেন্সি ছিল নাকি ওর।” নেশার মধ্যে আর রাগে কি বলছে ঝিনুক নিজেই জানে না, “আমি একটা সিম্পেল লাইফ চেয়েছিলাম, একটু ফ্রিডম একটু ভালোবাসা। বাড়িতে সবাই ওর জন্য অপেক্ষা করছে সেটা ও জানে না।”
আর থাকতে পারল না রিশু, ঝিনুকের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে, “তোমার ডিক্সানারির ফ্রিডম আমার কাছে পাবে না। ফ্রিডম মানে নোংরামো করা নয়। তোমার ফ্রিডমের অর্থের পরিনতি তুমি নিজেকে দেখেও শেখোনি এখন…”
ঝিনুক চাপা চেঁচিয়ে ওঠে রিশুর দিকে তাকিয়ে, “কি বলতে চাও তুমি?” মাথা ঝাঁকিয়ে ব্যাথিত কন্ঠে বলে ওঠে, “তোমার সাথে না আর এক বিন্দু…”
কথাটা শেষ করতে পারে না ঝিনুক। রিশুর চোখ জোড়া ভীষণ ভাবেই জ্বলে ওঠে। সবাই চুপ, থমথমে পরিবেশ নেমে আসে সবার মধ্যে।
বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পরে হিমশীতল কন্ঠে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে রিশু বলে, “যাও, আজ থেকে তোমাকে সব ফ্রিডম দিলাম।”
শালিনী দিয়াকে ছেড়ে মুখে হাত দিয়ে চাপা চেঁচিয়ে ওঠে, “ভাইয়াআআ…”
বাক্যের তাৎপর্য একটু দেরি করেই বুঝতে পারে ঝিনুক। কথাটা বুঝতে পেরে চোখ জোড়া জলে ভেস যায় ওর, রাগে বিতৃষ্ণায় কাঁপতে কাঁপতে বলে, “শেষ পর্যন্ত তুমিও…”
শালিনী ইন্দ্রজিতকে বলে, “তুমি ভাইয়াকে নিয়ে বাড়ি যাও আমি এদের নিয়ে আমাদের বাড়ি যাচ্ছি।”
ইন্দ্রজিৎ রিশুর কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করে বলে, “মাথা গরম করিস না বাড়ি চল।”
দুই চোখে নিভে আসা আগুন আর একটু জল নিয়েই ইন্দ্রজিতের দিকে তাকায় রিশু। মোবাইল খুলে উবেরে একটা ক্যাব বুক করে বলে, “ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিক্সান।”
রিতিকা অনেকক্ষণ ধরেই চুপ করে ছিল এদের মধ্যে একটা ঝড় উঠেছে সেই ঝড়টাকে কি ভাবে থামানো যায় সেই চিন্তায় মগ্ন ছিল, কিন্তু রিশু আর ঝিনুকের শেষ বাক্যে মনে হল যেন ঝড়টা হটাত করেই সব কিছু ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়ে চলে গেছে।
একটু পরেই ক্যাব এসে যায়, ক্যাবের দরজা খুলে দিয়ার দিকে আঙ্গুল তুলে রিশু ঠান্ডা গলায় ডাক দেয়, “বাড়ি চল।”
জল ভরা চোখে ঝিনুক ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। দিয়া একবার শালিনীর দিকে তাকায় একবার ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঝিনুক দিয়ার দিকে দেখে বলে, “তুই এদিকে আয়।” রিশুর দিকে আঙ্গুল নাড়িয়ে বলে, “ও তোমার সাথে যাবে না।”
দাদাভাইয়ের দিকে জল ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে দিয়া তারপরে ঝিনুকের দিকে দেখে মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ দাদার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পরে। দাদাভাই ওর গলায় পাড়া দিলেও ওর অন্য কারুর সাথে যাওয়ার ভরসা নেই। দিয়ার চুপ থাকা দেখে স্তব্দ হয়ে যায় ঝিনুক।
এইভাবে সবার সামনে বোনের গায়ে হাত উঠানো একদম উচিত হয়নি। রিশু বোনকে জড়িয়ে ধরতেই বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে দিয়া।
ওর মাথায় ঠোঁট চেপে ধরে নরম গলায় বলে, “সরি…”
ঝিলিক দিদির জ্যাকেট খামচে ধরে দিদির জল ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলে, “দিদি, বাড়ি চল।”
ঝিনুক কি করবে ভেবে পায় না। ক্ষোভে আর বিতৃষ্ণায় ওর ভুকের ভেতরটা দাউদাউ করে জ্বলছে। ভাবনা চিন্তা ধিরে ধিরে লোপ পেয়ে গেছে। সব কিছু এক লহমায় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে কিন্তু মচকাতে নারাজ ঝিনুক। ক্যাবের ড্রাইভার রিশুকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাওয়াতে রিশু ওকে থামিয়ে দেয়। দিয়া চুপচাপ ক্যাবের মধ্যে বসে পরে।
রিশু দিয়াকে বলে, “আমি মাম্মাকে ফোন করছি, তুই কাল সকালেই কোলকাতা ফিরে যাবি।”
শেষে ঝিনুক থাকতে না পেরে ভাঙা বুক নিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “তোমার শুধু মাম্মা আর মাম্মা। আঁচলের তলায় থাকতে পারতে।”
কথাটা কানে যেতেই রিশুর চোয়াল কঠিন হয়ে যায়, মায়ের নামে এই কথা শুনে ওর দুই চোখে আগুন ঝরে পরে। কঠিন চোয়ালে দাঁতে দাঁত পিষে চিবিয়ে চিবিয়ে ঝিনুকের দিকে আঙ্গুল তুলে গর্জে ওঠে, “সঙ্ঘমিত্রা, তুমি তোমার লিমিট ক্রস করে ফেলেছ। ডোন্ট এভার ক্রস মাই পাথ অর এলস …”
শালিনী ওর ভাইয়ার এই রুদ্ররূপ আগেও একবার দেখেছে। ছয় বছর আগের সেই দুঃস্বপ্নের রাতে ইন্দ্রজিৎ রিশুর বাড়িতে এসেছিল। রাগে দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে মারতে মারতে ইন্দ্রজিতের নাক মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিল ওর ভাইয়া।
শালিনী রিশুর মুখ চেপে ধরে বলে, “ভাইয়া প্লিজ চুপ করো।”
শালিনীর হাত ছাড়িয়ে রিশু বলে, “চুপ করার আর কি বাকি আছে। ওর মনের মধ্যে যা ছিল বলে দিয়েছে, ভালো হয়েছে।” অদুরে দাঁড়িয়ে রিতিকার দিকে তাকিয়ে বলে, “সরি তোমার পার্টি নষ্ট করে দিলাম।”
গাড়ি ছেড়ে দেয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাঁচজন স্থম্ভিত হয়ে যায়। ক্যাব ছেড়ে চলে যেতেই প্রবল অনুশোচনায় অনুতাপের কান্নায় ভেঙ্গে পরে ঝিনুক। হটাত করে মামনিকে নিয়ে কথাটা বলা একদম ঠিক হয়নি। মামনি কোনদিন ওকে কোন কিছু নিয়ে খোঁটা শুনায়নি। ওর দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, বললে বলতেও পারত মামনি, কোনদিন মামনি ওকে এটা বলেনি, রিশুকে টিফিনটা অন্তত বানিয়ে দিতে পারো, না সে কথাও কোনদিন শোনায়নি। রিশু এটা খেতে ভালোবাসে, এটা একটু বানিয়ে দিও, না সে কথাও কোনদিন ঠেস মেরে বলেনি ওর মামনি।
শালিনী ঝিনুককে জড়িয়ে ধরতেই আরো বেশি ভেঙ্গে পরে, “আমি কোন খারাপ কিছু বলেছি?” শালিনী কি বলবে কিছুই ভেবে পায় না।
ঝিলিক দিদিকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলে, “কাঁদিস না বাড়ি চল, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
জোরে জোরে মাথা নাড়ায় ঝিনুক, “না রে কিছুই আর ঠিক হবে না।”
ইন্দ্রজিৎ মোবাইল খুলে একটা ক্যাব বুক করে রিতিকাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমাকে কোথাও ড্রপ করতে হবে কি?”
রিতিকা মাথা নাড়িয়ে বলে, “না না আমি একা চলে যেতে পারব।”
গাড়ির মধ্যে উঠে দিয়া দাদার কোলের মধ্যে মাথা গুঁজে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে। বোনের মাথা কোলের মধ্যে চেপে ধরে সারাটা রাস্তা চুপচাপ বসে থাকে রিশু। মনের মধ্যে ঝিনুকের প্রতি একটা ভীষণ বিতৃষ্ণা জন্মায়, বিয়ের আগেই মাকে জানিয়েছিল, এই মেয়ে নিজের বাবা মাকে সন্মান দিতে জানে না সে ওর পরিবারকে আপন করে নিতে পারবে না। মন কে বোঝায় রিশু, এতদিন একা থেকেছে বাকি জীবন একা থাকা কোন দুস্কর নয় ওর পক্ষে। লন্ডন থেকে ফিরে এমসের হস্পিটাল ছেড়ে কোলকাতা ফিরে যাবে। পাপার মাইল্ড এটাক হওয়ার পরে মাম্মা একটু চিন্তিত পাপার শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে, বাড়িতে ফিরলে সবাই ওর চোখের সামনে থাকবে সবার দেখাশুনা করতে পারবে। বাড়ির সামনে গাড়ি পৌঁছানর পরে ঘড়ির দিকে তাকায় রিশু, রাত এগারোটা বাজে তখন। দিয়া কাঁদতে কাঁদতে ওর কোলের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
গাড়ি থামতেই বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “এই ওঠ, বাড়ি এসে গেছে।”
বহুদুর থেকে দাদার গলার আওয়াজ পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে দাদার দিকে তাকায় দিয়া। চোখ মুছে দাদার দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে বলে, “দাদাভাই সরি।”
ম্লান হেসে রিশু ওকে বলে, “ঠিক আছে, যা হওয়ার হয়ে গছে।”
তালা খুলে বাড়িতে ঢুকে দিয়াকে বলে, “বিকেলের পরে তো কিছুই খাস নি?” মাথা দোলায় দিয়া, না। রিশু ওকে বলে, “হাত মুখ ধুয়ে নে আমি দেখি কিছুর অর্ডার করে দেই। তারপরে সুটকেস গুছিয়ে নে আমি ফ্লাইটের টিকিট কাটছি।”
দাদার সামনে হাত জোড় করে বলে দিয়া, “দাদাভাই প্লিজ।”
রিশু বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে ধরা গলায় বলে, “তুই কেন এমন করলি? তোকে আমি কি দেইনি? তুই যখন যা চেয়েছিস আমি কিনে দিয়েছি। যখন যা বলেছিস তাই করেছি। মাম্মার সাথে ঝগড়া করে তোকে তোর বন্ধুদের পার্টিতে যাওয়ার পারমিশান করিয়ে দিয়েছি। বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়া, সিনেমা যাওয়া, কোন কিছুতেই কোনদিন মানা করিনি। তারপরেও তুই?” একটু থেমে প্রশ্ন করে, “ছেলেটা কে?”
দাদার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে গলা শুকিয়ে আসে দিয়ার। দাদার কাঁপা গলা শুনে ওর মনে হচ্ছে, মা ধরণী দ্বিধা হও।
পায়ের নখ দিয়ে মেঝে খুঁটতে খুঁটতে নিচু কন্ঠে বলে, “আর কোনদিন করব না দাদাভাই।”
বোনকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করে বলে, “যা চোখ মুখ ধুয়ে নে।”
ঠিক তখনি দরজায় কলিং বেল বেজে উঠতেই সজাগ হয়ে যায় রিশু। দিয়া একবার দাদার মুখের দিকে তাকায় একবার দরজার দিকে তাকায়। রিশু ইশারায় ওকে দরজা খুলতে বলে। দিয়া দরজা খুলে দিতেই ইন্দ্রজিৎ আর শালিনী বাড়ির মধ্যে ঢুকে পরে, পেছনে ধির পায়ে ঝিনুক আর ঝিলিক বাড়ির মধ্যে ঢুকে পরে।
দিয়া কিছু একটা বলতে গেলেই রিশু ওদের দেখেও না দেখার ভান করে দিয়াকে বলে, “তুই জামা কাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে সুটকেস গুছিয়ে ফেল।” শোয়ার ঘরের মধ্যে যেতে যেতে ওকে বলে, “আমি দেখি কিছু একটা খাবার অর্ডার করে তোর ফ্লাইট টিকিট কাটি।”
বাড়ির মধ্যে থমথমে পরিবেশ, বুকের ধুকপুকানি পর্যন্ত শোনা যায় এমন নিশ্চুপ হয়ে রয়েছে সবাই। ঝিনুকের চোখ জোড়া ভীষণ ভাবেই লাল হয়ে গেছে। সত্যি কি ওকে কোলকাতা পাঠিয়ে দেবে? রিশুর এই রুদ্র মূর্তি এর আগে কোনদিন ঝিনুক দেখেনি। তবে এই কয়দিনে ভালো ভাবেই এটা অনুধাবন করতে পেরেছে যে রিশু যাকে ভালোবাসে তাকে সত্যি বুকের মাঝে আঁকরে ধরেই ভালোবাসে, ওকে, নিজের মাকে, নিজের ভাই বোনকে। কি ভাবে এই মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইবে সেটাই বড় প্রশ্ন। তবে যে ভাবে ওর নাকের সামনে আঙ্গুল নাড়িয়ে ওকে সাবধান করে দিয়ে একাই গাড়িতে উঠে চলে এসেছে, তারপরে মনে হয় কিছুই এই ঋজু মানুষের দৃঢ় প্রত্যয়কে টলাতে সক্ষম হবে না।
ইন্দ্রজিৎ, ঝিনুক আর ঝিলিককে ইশারায় সোফায় বসতে অনুরোধ করে। ঝিলিকের মুখ থমথমে, ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বাড়িতে বাবা মায়ের ওপরে চোটপাট করা যায়, কিন্তু সামনে যে মানুষটা তার ওপরে ওর দিদি যেভাবে চোটপাট করতে শুরু করল তাতে সম্পূর্ণ হিতে বিপরিত হয়ে গেল। ওর আর দিয়ার ভুলের মাশুল ওর দিদিকে গুনতে হবে ভেবেই ওর মন বিষিয়ে যায়। কিন্তু জিজুর সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস ওর নেই। অদুরে দাঁড়িয়ে ওর প্রিয় বান্ধবী যার দাদার সাথে এই দিন কুড়ি আগেই ওর দিদির বিয়ে হয়েছে, সে ওর দিকে বেদনা মুখর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে।
শালিনী শোয়ার ঘরে ঢুকে রিশুর হাত ধরে বলে, “ভাইয়া, প্লিজ আমি বলছি এই লাস্ট টাইমের জন্য দিয়াকে…”
মাথা নাড়ায় রিশু, “আমার বোনের জন্য আমার চিন্তা নেই, আমার বোনকে আমি সঠিক পথে ফিরিয়ে আনব। তবে…”
শালিনীর কাঁধের ওপর থেকে বসার ঘরের সোফায় বসা স্ত্রীর দিকে তাকায়। এক অব্যাক্ত বেদনায় ঝিনুকের মুখমণ্ডল পাংশু হয়ে গেছে, চোখ জোড়া লাল হয়ে ফুলে গেছে। ঝিনুকের সাথে চোখে চোখ মেলাতেই ঝিনুকের ফ্যাকাসে রঙ ওঠা ঠোঁট জোড়া কেঁপে ওঠে, কোলের ওপরে হাত দুটো জড় করে রাখা।

বুক ভরে শ্বাস নিয়ে শালিনীর কাঁধে হাত রেখে বলে, “দেখো আর মাত্র দুই দিন পরে আমার সেমিনার আর ওয়ার্কশপ, আমাকে লন্ডন যেতে হবে। একটা পেপার তৈরি করতে কতটা পরিশ্রম লাগে সেটা তোমাকে নতুন করে তো বুঝিয়ে বলার কিছু নেই। আমি বাড়িতে একটু শান্তি চাই তাই দিয়াকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
শালিনী, ঘাড় ঘুরিয়ে ঝিনুক আর ঝিলিকের দিকে দেখে রিশুকে প্রশ্ন করে, “তুমি কি ভাবতে পারছ, এইভাবে ওদের পাঠিয়ে দিলে আন্টির কি অবস্থা হবে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রিশু উত্তর দেয়, “আমি মাম্মাকে বুঝিয়ে বলে দেব।”
ওর চোখে চোখ রেখে শেষ বারের মতন প্রশ্ন করে, “এটাই তাহলে তোমার ফাইনাল ডিসিসান?”
মাথা নাড়ায় রিশু, “জানি না, তবে বর্তমানে আমি একটু একা থাকতে চাই। বাকি সিদ্ধান্ত আমি লন্ডন থেকে ফিরে আসার পরে নেবো।” ছোট একটা শ্বাস ছেড়ে বাঁকা হেসে ইন্দ্রজিতকে বলে, “তোকে সেদিন বলেছিলাম, ইচ্ছে করেই কি আর কেউ কাউকে ছাড়তে চায় রে।” কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পরে শালিনীকে বলে, “অনেক রাত হয়েছে তোমরা বাড়ি যাও।”
অগত্যা ইন্দ্রজিৎ মাথা দোলায়, রিশুকে টলানো অসম্ভব ব্যাপার। শোয়ার ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে শালিনী। একবার ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে দেখে একবার রিশুর দিকে তাকিয়ে দেখে। ঝিনুক মাথা নিচু করে সোফায় বসে, কোলের কাছে হাত দুটো জড় করে রাখা। ফর্সা নাকের লালচে ডগা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে আশ্রু ওর হাত জোড়া ভিজিয়ে দিয়েছে। ঝিলিক বাকরুদ্ধ হয়ে একবার দিদির দিকে একবার শালিনীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
শালিনী ঝিনুকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ওর গালে হাত জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি আমাদের সাথে আমার বাড়ি যাবে?”
মৃদু মাথা নাড়ায় ঝিনুক, অস্ফুট ধরা গলায় উত্তর দেয়, “না।”
মাথা নাড়িয়ে অগত্যা শালিনী উঠে পরে, রিশুর দিকে হাত নাড়িয়ে বিদায় নেয় ইন্দ্রজিৎ আর শালিনী। দিয়া দরজা বন্ধ করে দিতেই ঘরের ভেতরটা আরো বেশি শীতল হয়ে যায়। দিয়া ছোট পায়ে ঝিনুকের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পরে ঝিনুকের অশ্রু ভেজা নরম হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে তুলে নেয়। দিয়ার দিকে জল ভরা রাঙ্গা চোখে তাকায় ঝিনুক, ঠোঁট জোড়া অব্যাক্ত বেদনায় কেঁপে ওঠে ওর।
দিয়া, ঝিনুককে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “ওঠো, চোখ মুখ ধুয়ে নাও।”
বান্ধবীর দেখা দেখি ঝিলিকও দিদির হাত দুটো ধরে বলে, “ওঠ, যা হওয়ার সেটা হয়েই গেছে।”
শুন্য দৃষ্টি নিয়ে দিয়ার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে ঝিনুক। তারপরে ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে ভগ্ন হৃদয় নিয়েই বলে, “আমার কপালে জানিস সুখ শান্তি বলে কিছুই নেই।”
রিশু ওর জামা কাপড় নিয়ে ততক্ষণে বাথরুমে ঢুকে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষন সোফার ওপরে চুপচাপ বসে থাকার পরে, ঝিনুক সোফা ছেড়ে উঠে শোয়ার ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। বাথরুম থেকে বেড়িয়ে রিশু দিয়াকে আর ঝিলিককে হাত মুখ ধুয়ে নিতে বলে। পাশের ছোট শোয়ার ঘরের মধ্যে ঢুকে ল্যাপটপ খুলে বসে পরে। রাত বারোটা বাজে, এতরাতে মাকে ফোন করা ঠিক হবে কি হবে না সেটা চিন্তা করে। সকাল বেলা এয়ারপোর্টে গাড়ি না আসলে ভীষণ মুশকিল, কিন্তু হটাত এত রাতে কি বলবে মাকে, সেই চিন্তায় পরে যায়। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত পরেরদিন সকালের ফ্লাইটের তিনটে টিকিট কেটে ফেলে রিশু।
শোয়ার ঘরের বিছানার ওপরে জুবুথুবু হয়ে বসে থাকে ঝিনুক। ওর চিন্তা শক্তি সম্পূর্ণ লোপ পেয়ে গেছে, মাথা একদম খালি, মনের মধ্যে শুধু একটি মাত্র চিন্তা, বাড়িতে মায়ের সামনে বাবার সামনে কি করে মুখ দেখাবে? সব রাগ গিয়ে পরে ছোট দুটো মেয়ের ওপরে। সুখে থাকতে ভুতে কিলায় বলে সেটাই হয়েছে, রিশু সেমিনারের জন্য লন্ডন চলে যেত, ঝিনুক কয়েক দিনের জন্য কোলকাতা চলে যেতে পারত। দিন কয়েক মামনির সাথে কাটিয়ে আসতে পারত, বাবা মায়ের সাথে কাটিয়ে আসতে পারত। রাগটা ঘুরে ফিরে আবার নিজের ওপরে এসে পরে, কি দরকার ছিল মামনির নাম তোলার? ঠাস ঠাস করে নিজের গালে চড় মারে ঝিনুক। চড়ের আওয়াজ পেয়েই দিয়া আর ঝিলিক দৌড়ে শোয়ার ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখে যে ওদের ঝিনুক দিদি বিছানায় হাঁটু মুড়ে জুবুথুবু হয়ে বসে হাত দুটো মুঠো করে সমানে কপালে করাঘাত করে চলেছে।
ঝিলিক সঙ্গে সঙ্গে ওর হাত ধরে ফেলে বলে, “এই কি করছিস?”
ঝিনুক শুন্য চোখে বোনের দিকে আর দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি বাড়ি যাবো না। আমায় একটু বিষ দিবি?”
দিয়া ওকে বলে, “ঝিনুকদি এমন করে না প্লিজ।”
ঝিলিক ওর দিদিকে বলে, “প্লিজ পাগলামি করিস না দিদি। একটু শান্ত হ।”
শান্ত হওয়ার কথা কানে যেতেই সব রাগ ওই দুই মেয়ের ওপরে পরে ঝিনুকের। দাঁতে দাঁত পিষে দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “সব তোদের জন্য হয়েছে।” বোনের সামনে আঙ্গুল নাড়িয়ে বলে, “আমি আগে থেকে সাবধান করে দিয়েছিলাম তোদের। তোর জিজু জানতে পারলে আমাকে কেটে ফেলবে।” কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পরে প্রশ্ন করে, “ওরা কি করে জানলো আমরা কোথায় পার্টি করতে যাবো?”
ঝিলিক অপরাধীর মতন দিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। দিয়া আমতা আমতা করে বলে, “আমরা মেসেজ করেছিলাম।”
ঝিনুক থাকতে না পেরে ঠাস করে ঝিলিকের গালে সজোরে একটা চড় কষিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “আমার সুখ তোর সহ্য হয় না তাই না?”
গালে হাত দিয়ে ঝিলিক দিদির দিকে তাকিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, আমতা আমতা করে বলে, “সরি দিদি।”
ঝিনুক চেঁচিয়ে ওঠে, “সরি, এখন আর সরি বলে কি হবে? হ্যাঁ? যা হওয়ার সব শেষ করে দিয়েছিস তোরা।” দুই হাতে মাথার চুল আঁকরে ধরে বলে, “আমার পোড়া কপাল।”
নিস্তব্দ বাড়িতে পাশের ঘরের সব আওয়াজ পরিস্কার রিশুর কানে যায়। ঠিক তখনি ওদের বাড়ির দরজায় কলিং বেল বেজে উঠতেই ওরা সবাই চুপ করে যায়। রিশু উঠে দরজা খুলে খাবারের ডেলিভারি নিয়ে খাওয়ার টেবিলে রেখে শোয়ার ঘরের মধ্যে উঁকি মেরে দেখে। রিশু ঝিনুকের বিধ্বস্ত চেহারার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে। জল ভরা আঁখি দুটো ভীষণ ভাবেই বেদনায় ভরা। ওর দিকে কাতর অব্যাক্ত ভাষা নিয়ে চেয়ে রয়েছে, প্লিজ শেষ বারের মতন।
রিশু সেই ব্যাথাভরা আঁখি উপেক্ষা করে দিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তোদের সুটকেস গুছানো হয়েছে কি? কাল সকাল সাতটার ফ্লাইট। ভোর সাড়ে চারটের মধ্যে আমাদের বেড়িয়ে যেতে হবে।” ঝিলিকের দিকে দেখে বলে, “তাড়াতাড়ি তোর সুটকেস গুছিয়ে নে, তারপরে খেয়ে একটু রেস্ট নে।”
দিয়া দাদার আদেশ অমান্য করতে পারতে না। গুটি পায়ে উঠে গিয়ে সুটকেস খুলে নিজের জামা কাপড় গুছাতে শুরু করে দেয়। জিজুর হিম শীতল কন্ঠস্বর শুনে ঝিলিকের বুক পুনরায় কেঁপে ওঠে। দিদির দিকে একবার তাকিয়ে দেখে নিজের সুটকেস ঘুছাতে চলে যায়। রিশু চুপচাপ হাতে ফোন নিয়ে বসার ঘরের সোফায় বসে পরে। বেশ কিছুক্ষন পরে ঝিনুক নিজের জামা কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়।
বাথরুমে ঢুকে শেষ বারের মতন আয়নায় নিজের মুখ দেখে ঝিনুক। মনে পরে যায় সেই প্রথম রাতে কথা, একটা তোয়ালে জড়িয়ে কোন রকমে সেই শীতে দরজা খুলে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। যদিও সেই মানুষটা আজও ওই দরজার বাইরে ঠিক সেইদিনের মতন সোফায় বসে আছে কিন্তু ভেতরের মানুষটা বদলে গেছে। মনে হল কেউ যেন দরজায় ঠক ঠক করল, গম্ভির এক কন্ঠস্বর, গিজার চালিয়ে নাও না হলে এই ঠান্ডায় হাইপোথারমিয়া হয়ে যাবে। কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে সেই আওয়াজ, না ওর চারপাশে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। গলার আওয়াজ দরজার বাইরে নয়, ওর বুকের ভেতরে বেজে ওঠে। পরনের জামা কাপড় গুলো যেন ওর চামড়া জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে উদ্যত। একটানে গায়ের থেকে খুলে ফেলে বডিকন ড্রেসটা। টেনে খুলতে গিয়ে জামার বুকের জায়গাটা একটু ছিঁড়ে যায়। বিতৃষ্ণায় রিরি করে জ্বলে ওঠে ঝিনুকের সারা শরীর। এক টানে চরচর করে ছিঁড়ে ফেলে এক সময়ের সাধের বডিকন ড্রেসটা। গলায় ওর দেওয়া মোটা সোনার হার ভীষণ জ্বলজল করছে, নীলচে স্বচ্ছ বক্ষবন্ধনীর মাঝে আটকে থাকা পীনোন্নত স্তনের গভীর খাঁজে আটকে রয়েছে বড় মুক্তোর লকেট। চোখে মুখে জলের ছিটা দিয়ে একটা টপ আর ঢিলে একটা প্যান্ট পরে মাথা নিচু করে বেড়িয়ে আসে বাথরুম থেকে। সোফার দিকে না তাকালেও ওর সজাগ ষষ্ট ইন্দ্রিয় ভীষণ ভাবেই জানে যে সোফায় বসা মানুষটা ওর দিকেই নিস্পলক চোখে তাকিয়ে রয়েছে।
ফর্সা সরু গোড়ালিতে বাঁধা রুপোর পাতলা নুপুরের নিক্কন কানে যেতেই সম্বিত ফিরে পায় রিশু। ওর দৃষ্টি ভীষণ ভাবেই আটকে যায় ওই রাঙ্গা চরনে। রিশু নিস্পলক চোখে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে থাকে, ভীষণ ভাবেই ভালোবেসে ফেলেছিল মেয়েটার ভাসা ভাসা কাজল কালো আঁখি জোড়া। ভীষণ কথা বলে ওই দুই চোখ, আগে ছিল ব্যাথার ছবি। সেই ছবি বদলে ফিরে পেয়েছিল উচ্ছল উজ্জ্বল দুরন্ত এক ছবি। গালের হাতের আঁচড়ের দাগ দেখে ভীষণ ভাবেই সেদিন কাতর হয়ে পড়েছিল। ভেবেছিল ধিরে ধিরে মেয়েটা হয়ত ওর পরিস্থিতি বুঝবে ওর সাথে মানিয়ে নিতে পারবে। ওর দেরি করে আসা, কোন কোন দিন ভীষণ ভাবেই চুপ করে থাকা, কখন সারা রাত বই নিয়ে পরে থাকা। ওর বন্ধুদের দেখেছে, যাদের স্ত্রী অথবা স্বামী পেশায় ডাক্তার নয় সেই পরিবারে মাঝে মাঝেই একটু আধটু এইসব নিয়ে মনোমালিন্য হয়েই থাকে। সেই নিয়ে ওর দুঃখ নেই, ওর দুঃখটা শুধু মাত্র এক জায়গায়, মা। হাত মুঠো করে মুখের সামনে চেপে ধরে বুকের পাঁজর আর্ত চিৎকার করে ওঠে ওই বাথরুমের বন্ধ দরজার পেছনের ললনার দিকে, কেন কেন তুমি মাকে নিয়ে কথা উঠালে? বিতৃষ্ণায় পুনরায় ওর বুকের ভেতরটা জ্বলে ওঠে।
নিজের সুটকেস গুছিয়ে দিয়া ছোট শোয়ার ঘরে শুতে চলে যায়। রিশু উঁকি মেরে ওদের শোয়ার ঘরের মধ্যে দেখে। বিছানার ওপরে ঝিনুক হাঁটু মুড়ে হাঁটুর ওপরে থুঁতনি রেখে জুবুথুবু হয়ে বসে। ওর সামনে সুটকেস খুলে নিজের জামা কাপড় গুছাতে ব্যাস্ত ওর বোন। কানে ভেসে আসে ঝিলিকের গলা, কি নিবি? মাথা নাড়ায় ঝিনুক, কিছু না। তুই শুতে যা। ঝিলিক সুটকেস বন্ধ করে বসার ঘরে উঁকি মারতেই রিশুর সাথে চোখাচুখি হয়ে যায়। চোখাচুখি হতেই চোখ নামিয়ে নেয় ঝিলিক। মাথা নিচু করে শোয়ার ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পাশের ঘরে ঢুকে দিয়ার পাশে চুপচাপ শুয়ে পরে। সারা রাত কেটে যায়, শোয়ার ঘরের বিছানায় জলে ভরা চোখ নিয়ে ঠায় বসে থাকে ঝিনুক আর বসার ঘরের সোফায় বসে থাকে রিশু। শেষ রাতের দিকে ঝিনুকের চোখে ক্লান্তি নেমে আসে, ওর শরীর এলিয়ে পরে বিছানায়। হাত পা অবশ হয়ে এসেছে। কোন রকমে গায়ে লেপ টেনে চোখ বুজে চুপ করে পরে থাকে। খাওয়ার টেবিলে ল্যাপটপ খুলে বসে পরে রিশু, নিজের দুশ্চিন্তা ঢাকার জন্য একটা মেডিকেল জার্নাল খুলে পড়তে বসে যায়।
কখন যে ওর চোখ লেগে যায় তার খেয়াল নেই। খট করে একটা কিছু আওয়াজ হতেই চোখ মেলে তাকায় রিশু। চোখের সামনে খুব চেনা পরিচিত ফর্সা গোল হাতের কব্জি, কব্জিতে বাঁধা সোনায় বাঁধানো শাঁখা পলা। অতি পরিচিত একটা চায়ের কাপে ওর অতি পরিচিত গ্রিন টি। কখন ঝিনুকের ঘুম ভেঙ্গেছে সেটা টের পায়নি রিশু। মুখ তুলে সেই পরিচিত মুখের দিকে তাকাতেই মুখটা ওর কাছ থেকে সরে যায়। ঝিনুকের পরনে ওর দেওয়া সেই তুঁতে রঙের সালোয়ার কামিজ। সারা রাত ঘুমায়নি ঝিনুক সেটা ওর চোখে মুখে ভীষণ ভাবেই ফুটে উঠেছে। ধির পায়ে ছোট শোয়ার ঘরে ঢুকে ঝিলিকের গায়ে হাত দিয়ে জাগিয়ে দেয়। ল্যাপটপের ডান পাশের নিচের কোনায় সময় দেখে রিশু, চারটে দশ বেজে গেছে। গরম চায়ে কয়েক বার চুমুক দিয়ে রেখে দেয়। ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পরে। আলমারি খুলে নিজের জামা কাপড় বের করতে গিয়ে চোখ পরে ঝিনুকের জামা কাপড়ের দিকে। বলতে গেলে সব কিছুই আলমারিতে সেই ভাবেই গুছিয়ে রাখা, সাজার বাক্স, জিন্স গুলো, এক গাদা টপ এমন কি ওর সাথে মার্কেটে গিয়ে যে দুটো জ্যাকেট কিনেছিল সে গুলো পর্যন্ত আলমারিতে রয়েছে, কিছুই নেয়নি। জামা কাপড় পরে বাথরুমে ঢুকে ব্রাশ করে নেয় রিশু।
দিয়া আর ঝিলিক উঠে পরে। এক এক করে মুখ ধুয়ে জামা কাপড় পরে তৈরি হয়ে নেয়। কারুর মুখে কোন কথা নেই, সবাই চাবি দেওয়া কলের যন্ত্রের মতন কাজ করে চলেছে। গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে বসার ঘরে বসে ক্যাব বুক করে। দিয়া আর ঝিলিক হাতে সুটকেস নিয়ে তৈরি, শুধু মাত্র ঝিনুকের হাতে কিছুই নেই। গায়ে ওর দেওয়া সেই গাড় নীল রঙের ভারী ওভারকোট আর নিজের ল্যাপটপের ব্যাগ আর একটা কাঁধে ঝোলান ব্যাগ ছাড়া আর কিছুই নেয়নি সাথে। হয়ত ঝিলিকের সুটকেসে মধ্যে কিছু নিয়ে নিয়েছে।
কিছুক্ষনের মধ্যে ক্যাব এসে ওদের ফ্লাটের সামনে দাঁড়ায়। নিস্তব্দ রাতে গাড়ির আওয়াজ পেতেই সবার কান সজাগ হয়ে ওঠে। এবারে বেড়িয়ে পড়তে হবে। দিয়ার বুক দুরুদুরু করে ওঠে। ঝিলিক দিদির হাত চেপে ধরে। রিশু ঘাড় ঘুরিয়ে ঝিনুকের দিকে একবার তাকায়। লম্বা চুল একটা এলো হাত খোঁপা করে মাথার পেছনে বাঁধা, গলায় জ্বলজ্বল করছে ওর দেওয়া সোনার হার, মেয়েটার সর্বাঙ্গে যেন ওর ছোঁয়া। দরজা খুলে দিয়ার আর ঝিলিকের সুটকেস হাতে নিয়ে বেড়িয়ে পরে রিশু। দরজায় তালা মেরে দিয়ার হাতে চাবি ধরিয়ে দেয় ঝিনুক। সিঁড়ি বেয়ে সবাই নিচে নেমে ট্যাক্সিতে উঠে বসে। ট্যাক্সি ছেড়ে দেয়।
শীতকালের ভোর রাতের অন্ধকার চিড়ে হুহু করে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে চলে ট্যাক্সি। কারুর মুখে কোন কথা নেই। ঝিনুক জানালার বাইরে একভাবে তাকিয়ে দেখে। মাঝখানে ঝিলিক মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে। অন্য পাশে দিয়া চুপ করে বসে প্রমাদ গোনে, যদিও ওর একটাই ভরসা দাদাভাই হয়ত বাড়িতে কিছুই বলবে না। সামনের সিটে বসে ঘড়ি দেখে রিশু, পাঁচটা বাজে, এতক্ষনে মা উঠে পড়েছে।
হাতে ফোন নিয়ে কয়েকবার নড়াচড়া করার পরে শেষ পর্যন্ত মাকে ফোন করে, “কি করছ?”
এত ভোরে ছেলের ফোন পেয়ে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে যায় আম্বালিকা, “কি রে কি হয়েছে? এত সকালে ফোন করেছিস? সব ঠিক আছে তো? তোর গলা এমন কেন শুনাচ্ছে? রাতে ঘুমাস নি?”
পাঁজর দুমড়ে গলার কাছে ঠিকরে আসে, শুধু মাত্র “কি করছ” শুনে কি করে ওর মা এত কিছু জেনে ফেলে? একটা ঢোঁক গিলে মৃদু হেসে বলে, “না না কিছু হয়নি আমি ঠিক আছে। গতকাল রাতে দিয়া আর ঝিলিক পার্টি করে শরীর খারাপ করে ফেলেছে।” বলেই হেসে ফেলে।
হাঁপ ছাড়ে আম্বালিকা, হেসে ফেলে ওর কথা শুনে, “ওহ তাই নাকি? তা বাবা, তুই এত সকালে ফোন করলি?”
ট্যাক্সির রিয়ার ভিউ আয়নায় তাকাতেই ঝিনুকের সাথে চোখা চুখি হয় ওর। ওর দিকে অবাক দৃষ্টি নিয়ে একভাবে তাকিয়ে রয়েছে। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে মাকে জানায় রিশু, “ওরা আজ সকালের ফ্লাইটে বাড়ি যাচ্ছে।”
অবাক হয়ে যায় আম্বালিকা, “কি বলছিস?”
হাসতে হাসতে মাথা দোলায় রিশু, “আরে আর বল না, কাল রাতে পার্টিতে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে বাঁদর দুটো আর কি। সারা রাত ঘুমায়নি, বমি করে করে একসা হয়ে গেছে। এই আমি ওষুধ দিয়েছি তবেই একটু নরম হয়েছে। তারপরে ভাবলাম এরপরে আমি থাকবো না, লন্ডন চলে যাবো। আমার অবর্তমানে কি না কি করে বসবে তাই আজকেই ওদের বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
আম্বালিকা বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পরে ওকে জিজ্ঞেস করে, “কখন ফ্লাইট?”
রিশু উত্তর দেয়, “সাতটার ফ্লাইট, এই ধর ন’টার মধ্যে কোলকাতা পৌঁছে যাবে।”
ছোট একটা উত্তর দেয় আম্বালিকা, “হুম” কন্ঠের স্বরে অপ্রত্যয়, “দিয়া কোথায়?”
উত্তর দেয় রিশু, “এই তো পেছনের সিটে বসে আছে।”
আম্বালিকা প্রশ্ন করে, “ঝিনুক?”
ছোট উত্তর দেয় রিশু, “এই ভাবে একা একা তো আর ছাড়তে পারি না, তাই ও ওদের সাথেই যাচ্ছে।”
আম্বালিকা ছেলেকে বলে, “দিয়াকে ফোন দে।” মায়ের কন্ঠের স্বরে একটু অবিশ্বাস ফুটে উঠেছে সেটা বুঝতে পারে রিশু।
রিশু হেসে বলে, “আরে বাবা না না, তুমি আবার এই সাত সকালে বকাঝকা করতে শুরু করে দেবে। তুমি ও না…”
আম্বালিকা শেষ পর্যন্ত হেসে ফেলে, “তোর জন্য তোর বোন বাঁদর হয়ে গেল।”
হেসে ফেলে রিশু, “আচ্ছা শোনও না, গাড়িটা পাঠিয়ে দিও।”
আম্বালিকাও হেসে ফেলে, “আচ্ছা বাবা।”
ফোন রাখার আগে রিশু মাকে বলে, “ওদের ফ্লাইটে চড়িয়ে দিয়ে তোমাকে ফোন করছি।”
রিশুর কথা শুনে সবাই ভীষণ ভাবেই আশ্চর্য হয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষনের মধ্যেই ট্যাক্সি এয়ারপোর্টে পৌঁছে যায়।
ট্যাক্সি থেকে নেমেই দিয়া দাদাভাইকে জড়িয়ে ধরে থমথমে মুখে বলে, “সরি দাদা ভাই।” সেই ছোট বেলায় দাদার খাতা ছিঁড়ে দিলে যেমন ভাবে কান ধরত তেমন ভাবে কান ধরে কাঁচুমাচু মুখ করে বলে, “আর করব না।”
বোনকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলে, “ভালো ভাবে পড়াশুনা করিস।” নাকের ওপরে তর্জনী দিয়ে ঘষে মৃদু হেসে বলে, “লিভাইসের জিন্স।” চোখের কোল মুছে হেসে ফেলে দিয়া।
ওদের একটু তফাতে ঝিলিক আর ঝিনুক দাঁড়িয়ে। ক্যাবের ড্রাইভার গাড়ির ডিগি খুলে সুটকেস নামিয়ে দেয় ওদের সামনে। রিশু ঝিনুকের দিকে তাকাতেই ঝিনুকের ঠোঁট জোড়া অল্প কেঁপে ওঠে, কাজল কালো চোখ জোড়া প্লবিত হয়ে যায়। রিশু ঝিলিকের দিকে দেখে মৃদু হেসে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানায়। ঝিনুক মাথা নিচু করে এয়ারপোর্টের গেটের দিকে হেঁটে চলে যায়, ওর একটু পেছনে দিয়া আর ঝিলিক নিজেদের সুটকেস নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়। বুকের ওপরে হাত ভাঁজ করে চোয়াল চেপে সুন্দরী প্রেয়সীকে নিস্পলক চোখে তাকিয়ে দেখে রিশু। পার্স খুলে আইডি কার্ড বের করে তিনজনে এয়ারপোর্টে ঢোকার গেটের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে পরে। রিশু ওদের দেখে একটু হাত নাড়ায়, সেই উত্তরে দিয়াও ওর দিকে দেখে হাত নাড়ায়। ঝিনুকের পা কেউ যেন পেরেক দিয়ে গেটের সামনের মেঝেতে গেঁথে দিয়েছে। রিশু ওর চোখের দিকে আর তাকাতে পারে না, চুপ করে মাথা নিচু করে চোখ বুজে নেয়।
হটাত করে ওর কানে ভেসে আসে “রুশুউউ…” চোখ মেলে তাকায় সেই চেনা গলার স্বরের দিকে। মাথা দোলায় রিশু, না ওর কান ভুল শুনেছে, ঝিনুক দিয়ার হাত ধরে তখন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। ঝিলিক ওর দিকে প্রানপন জোরে দৌড়ে আসছে, “জিজুউউউউ…” প্রানপন দৌড়ে রিশুর বুকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পরে শরীরের সব শক্তি নিঙরে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বুকের ওপরে মাথা গুঁজে কেঁদে ফেলে। “জিজু আই এম সরি, জিজু।”
রিশু ঝিলিকের মাথা বুকের ওপরে চেপে ধরে আদর করে বলে, “কাঁদিস না। যাওয়ার সময়ে এই ভাবে কাঁদতে নেই।”
ঝিলিক কিছুতেই রিশুকে ছাড়বে না, বুকের ওপরে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বারেবারে বলে, “জিজু আই এম সরি, জিজু।”
ঝিলিকের হাত ধরেই শেষ পর্যন্ত গেটের দিকে এগিয়ে যায় রিশু। ওর গালে আদর করে হাত বুলিয়ে বলে, “সাবধানে যাস, আর বাড়ি পৌঁছে একটা ফোন করিস।”
ওরা তিনজনে গেটের ভেতরে না ঢুকে যাওয়া পর্যন্ত রিশু ওইখানে স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে থাকে। গেটের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার পরেও, কাঁচের দরজা দিয়ে বাইরে দাঁড়ানো শেষ ভালোবাসার একমাত্র পুরুষের দিকে নিস্পলক বাষ্পীভূত কাজল কালো নয়ন মেলে তাকিয়ে থাকে ঝিনুক। রিশুর বুকের ওপরে ভাঁজ করা হাত খুলে যায়, আপনা হতেই ওর ডান হাতের তর্জনী মধ্যমা অনামিকা কনিষ্ঠা দুলে উঠে বিদায় জানায় কাঁচের দরজার ওইপাশে দাঁড়ানো প্রেয়সীকে।

================= পর্ব নয় সমাপ্ত =================

গল্পটি কেমন লাগলো ?

ভোট দিতে স্টার এর ওপর ক্লিক করুন!

সার্বিক ফলাফল 0 / 5. মোট ভোটঃ 0

এখন পর্যন্ত কোন ভোট নেই! আপনি এই পোস্টটির প্রথম ভোটার হন।

Leave a Comment